মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

নয়

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন সত্যবাবু, মূর্তি উধাও হবার সঙ্গে যদি আপনাদের এই পারিবারিক ঘটনা…মানে ওই যাকে আপনি ‘স্ক্যান্ডাল’ বলছেন সেই ব্যাপারটার কোনও সম্পর্ক না থাকে, তা হলে তার বিষয়ে আমাদের কোনও কৌতূহল থাকবে কেন? না না, ও-সব আমরা শুনতে চাই না।”

 

সত্যপ্রকাশ ইতিমধ্যে কিছুটা সামলে উঠেছিলেন। বললেন, “বলতে যখন বসেছি, তখন সবটাই বলব। আর তা ছাড়া মূর্তিটিকে সঙ্গে করে আমার ঠাকুর্দা কেন তাঁর পৈতৃক ভিটে ছেড়ে হঠাৎ উত্তরবঙ্গে চলে এসেছিলেন, সব কথা খুলে না বললে হয়তো তা নিয়েও আপনাদের মনের মধ্যে কিছু না কিছু সন্দেহ থেকে যেতে পারে।”

 

আমি বললুম, “আরে ছিছি, সন্দেহ আবার কিসের?”

 

“এই ধরুন, আপনারা ভাবতে পারেন যে, ও-সব স্বপ্নাদেশ-টপ্নাদেশ সব বাজে গালগপ্পো, আসলে একেবারে গোড়াতেই এই মনসামূর্তি একটি চোরাই মাল, যা কিনা বর্ধমানের কোনও মন্দির থেকে আমার কোনও পূর্বপুরষ একদিন হাপিস করে দিয়েছিলেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা আমরা ভাবব না।”

 

“কেন ভাববেন না? ভাবাটা তো কিছু অস্বাভাবিক নয়।”

 

“এই জন্যে ভাবব না যে, চোরাই মালের পাবলিসিটি কেউ চায় না। তাই না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অথচ আপনি যখন কলকাতার সেই ইতিহাসের অধ্যাপককে আপনাদের মনসামূর্তির একটি ফোটোগ্রাফ দিয়েছিলেন, তখন আপনি ভালই জানতেন যে, মূর্তিটি যদি সত্যিই খুব প্রাচীন হয়, তা হলে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে, চাই কী খবরের কাগজে সেই ছবিটা হয়তো ছাপাও হয়ে যেতে পারে। আর তা যদি হয়, তা হলে বর্ধমান থেকেই কেউ হয়তো বলে বসবে যে, সেখানকার এক মন্দির থেকে ওই মূর্তি চুরি গিয়েছিল। বলুন, এমন একটা সম্ভাবনা কি ছিল না?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, তা ছিল বটে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তবু আপনি ফোটোগ্রাফটি তাঁকে দিয়েছিলেন। ফোটোগ্রাফটি যে ছাপা হতে পারে, তা জেনেও দিয়েছিলেন। তার কারণ, আপনি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত ছিলেন যে, অমন কথা কেউ বলবে না, কেননা মূর্তিটি সত্যিই মাটি খুঁড়ে পাওয়া, ওটি চোরাই মাল নয়।”

 

“তা হলে কি সেই ঘটনাটার কথা বলব না?”

 

“বলবার দরকার এমনিতে নেই। কিন্তু ঠিক আছে, না-বলা পর্যন্ত যখন একটা অস্বস্তি আপনার থেকেই যাচ্ছে, তখন বলুন।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, বলাই ভাল। ব্যাপারটা আসলে আমার বাবার সেই বালবিধবা পিসিকে নিয়ে। আমি তো বলেছি যে, মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁর স্বামীকে হারিয়ে তিনি বাপের বাড়ি চলে আসেন। আমার পিসির সঙ্গে আমার বাবার পিসির এইখানে মস্ত মিল। আর মস্ত অমল এইখানে যে, আমার পিসি যেমন এই সংসারটাকে তাঁর নিজের সংসার করে নিলেন, আর সেই সঙ্গে পুজো-আচ্চা নিয়েই হাসিমুখে কাটিয়ে দিলেন তাঁর জীবন, আমার বাবার পিসি সেটা পারেননি।”

 

এই পর্যন্ত বলে একটুক্ষণের জন্য চুপ করে রইলেন সত্যপ্রকাশ। আবার একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সিগারেট টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “আমার পপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরির মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই বালবিধবা কন্যাটি গৃহত্যাগ করেন।”

 

আমি বললুম, “এই ব্যাপার? এর জন্যে আপনি এত সংকোচ বোধ করছিলেন কেন? এ তো অতি স্বাভাবিক ঘটনা। একটি মেয়ের স্বামী মারা গেছে, তাও সে মারা গেছে মেয়েটির বয়স যখন নেহাতই অল্প, তখন। স্বামীর সঙ্গে তার যে কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাও নয়। নতু। করে সে যদি আবার কারও সঙ্গে সংসার পাততে চায় তো পাতুক না, এর মধ্যে তো অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর তা ছাড়া, যদ্দুর মনে পড়ছে বিদ্যাসাগরমশাইয়ের চেষ্টায় ১৮৫৬ সালেই তো বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়েছিল। তাই না?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা হয়েছিল।”

 

“তবে আর তার গৃহত্যাগেরই বা দরকার হল কেন? আইনমোতাবেকই তো আপনার প্রপিতামহ আর পিতামহ একটু উদ্যোগী হয়ে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারতেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কি স্বপ্নলোকে বাস করছেন নাকি কিরণবাবু? সেখান থেকে একটু বাস্তবে নেমে আসুন। নামলে বুঝতে পারবেন যে, আইন পাশ করানোই যথেষ্ট নয়, সমাজকে দিয়ে সেটা গ্রহণ করিয়ে নেওয়া চাই। বিদ্যাসাগরমশাই তার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কষ্টও নেহাত কম ভোগ করেনি, কিন্তু এই পোড়া সমাজ যে তবু বিধবা বিবাহের ব্যাপারটাকে দীর্ঘকাল ধরে মেনে নেয়নি, এখনও নানা জায়গায় মেনে নেয় না, এটাই হচ্ছে সত্যি কথা। তার উপরে আবার যেখানকার কথা হচ্ছে, সেটা কলকাতা শহর নয়, নেহাতই গ্রামঞ্চল।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ঘটনাটা নিয়ে গোটা তলাটে একেবারে ঢিঢি পড়ে যায়। সমাজের যাঁরা কর্তাব্যক্তি, আমার পিতামহকে তাঁরা জাতিচ্যুত করলেন, তাঁকে একঘরে করা হয়েছিল। তাঁর বাড়িতে কেউ জলগ্রহণ করত না, তাঁরও কোনও অধিকার ছিল না অন্য কারও বাড়িতে ঢুকবার। এই যে ঘটনা, এর বেদনা, অপমান আর গ্লানি তিনি সহ্য করতে পারেননি! জমিজমা ঘরবাড়ি সব পিছনে ফেলে রেখে শুধু কিছু টাকাকড়ি আর মনসামূর্তিটি সঙ্গে নিয়ে একদিন গভীর রাত্রে তিনি তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে চলে আসেন।”

 

“তখনও তিনি বিবাহ করেননি?”

 

“না। সে-কথা বোধহয় আগেই আপনাদের বলেছি। বিবাহ করেন তার বেশ কিছুকাল পরে।”

 

“আপনি এত সব কথা জানলেন কী করে সত্যবাবু?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “বিশেষ করে আপনার প্রপিতামহের বালবিধবা কন্যাটির গৃহত্যাগের কথা? একটু আগেই আপনি বলছিলেন যে, আপনাদের এই পারিবারিক স্ক্যান্ডালের কথা আপনার বাবাও সম্ভবত জানতেন না। তা হলে আপনি কী করে জানলেন?”

 

“আমি জেনেছি আমার পিতামহের ডায়েরি পড়ে।” সত্যপ্রকা। বললেন, “পুরনো কিছু বইপত্তর, পঞ্জিকা আর কাগজপত্রের সঙ্গে এই ডায়েরিখানাও একটা তোরঙ্গের মধ্যে আমি পেয়ে যাই। ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর বাবা একদিন তোরঙ্গটা খুলেছিলেন। কিন্তু বই-টই সম্পর্কে তাঁর তো স্টিশেষ আগ্রহ ছিল না, তাই আর কিছু হাট্‌কে দেখেননি। যেমন খুলেছিলেন, তেমনি আবার ডাল। বন্ধ করে তালাচাবি দিয়ে দেন। আমি একদিন তোরঙ্গটা সম্পর্কে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলুন, শতে তিনি বললেন, ওর মধ্যে সেকানে লেখা গুটিকয় বই ছাড়া আর কিছু নেই।”

 

“তোরঙ্গটা ছিল কোথায়?”

 

“এই বাড়িতেই ছিল। আমাদের ঘরগুলো সব দেখেছেন তো, এর ছাত টিনের, কিন্তু সিলিং কাঠের। ওই টিন আর কাঠের মাঝখানে বিস্তর জায়গা থেকে যায়, ওই মানে নিচু ছাতের অ্যাটিকের মতন অনেকটা জায়গা। নিত্য যেসব জিনিসের দরকার হয় না, সেগুলো আমরা ওইখানে তুলে রাখি। তোরঙ্গটাও ছিল ওইখানেই।”

 

“ওটা খুলবার কথা আপনার মনে হল কেন?”

 

“এমনিতে তো মনে হবার কথা নয়,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “মনে হতও না। কিন্তু হল কী, বছর তিনেক আগে কলকাতা থেকে এক ভদ্রলোক এদিকে এলেন। ভদ্রলোক পুরনো বইয়ের কারবারি। যে-কোনও পুরনো বই নয়, ওই যাকে আপনারা ‘দুষ্প্রাপ্য’ বলেন আর কী। তা জেলায় জেলায় তিনি সেই ধরনের রেয়ার বুকসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।”

 

বললুম, “পেয়েও যাচ্ছিলেন নিশ্চয়?”

 

“তা পচ্ছিলেন বই কী! বেশির ভাগই পাচ্ছিলেন পুরনো আমলের সব জমিদার-বাড়ি থেকে। সেকালের জমিদারদের সব্বাই যে শুধু ফূর্তিফার্তা করে আর বাই নাচিয়ে সময় কাটাতেন তা ভাববেন না, তাঁদের অনেকেই রীতিমতো লেখাপড়ার চর্চা করতেন, বাইরে থেকে নিয়মিত বই আনাতেন, বাংলা বই তো ছিলই, থ্যাকার স্পিংক আর নিউম্যানের দৌলতে তাঁদের ইংরেজি বইনের কালেকশন ও নেহাত খারাপ ছিল না।”

 

“ভদ্রলোক সে-সব বই কিনে নিচ্ছিলেন?”

 

“জলের দরে কিনছিলেন।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “বংশধরদের অনেকেই তো অপদার্থ। ফলে যা হয় আর কি।”

 

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সঙ্গে তাঁর আলাপ হল কোথায়?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কোচবিহারে। একটা কাজে ওদিকে গিয়েছিলুম। ঘটনাচক্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। তা আলাপ হবার পরে তাঁর পরিচয় জেনে ভাবলুম, ভদ্রলোক তো জহুরি মানুষ, আমার ঠাকুর্দার তোরঙ্গে যে-সব বই রয়েছে, সেগুলি একবার ওঁকে দেখিয়ে নিলে মন্দ হয় না। তা তিনিও খুব উৎসাহ করে আমার সঙ্গে আমাদের এই বাড়িতে চলে এলেন। রামদাসকে দিয়ে সিলিংয়ের উপর থেকে নামানো হল সেই তোরঙ্গ। খুলে দেখা গেল, বই যা রয়েছে, তার কোনওটাই খুব দুষ্প্রাপ্য নয়, বাজারে তার প্রায় সবগুলিরই রিপ্রিন্ট পাওয়া যায়, ওই শুধু ফার্স্ট এডিশনের বই বলেই তার যা-কিছু দাম। বইয়ের সঙ্গে অবশ্য পুরনো দুখানা পুঁথিও পাওয়া গিয়েছিল। দুখানাই মনসামঙ্গলের। মূল নয়, সে-কথা বলাই বাহুল্য। হাতে লেখা কপি। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের কপি। তা সেই কপির বয়সও নাকি তা প্রায় আড়াইশো বছর হল। ভদ্রলোক সে দুখানা কিনতে চেয়েছিলেন। আমি বেচিনি। ভাবছি, এশিয়াটিক সোসাইটিকে দিয়ে দেব। তোরঙ্গের মধ্যে আর যে বস্তুটি পেয়েছি, তা আমার পিতামহের ওই ডায়েরি।”

 

“ডায়েরিটি এখন কোথায়?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন।

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “পাছে আর কারও হাতে পড়ে, তাই শিলিগুড়িতে আমার ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিয়েছিলুম। তবে আপনাদের কাজে লাগতে পারে ভেবে লকার থেকে আজই বার করে আমার সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আপনারা দেখবেন?”

 

“এখন দেখব না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যদি দরকার বুঝি তো পরে দেখব। আপাতত শুধু দুটি প্রশ্ন করব আপনাকে।”

 

“করুন।”

 

“আমার প্রথম প্রশ্ন, আমি যে কলকাতায় আছি, তা আপনি জানলেন কী করে? কলকাতার কোন্ ফোন-নম্বরে ট্রাঙ্ককল করলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে তা-ই বা আপনাকে কে জানাল?”

 

একগাল হেসে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে মশাই, আপনি বিখ্যাত লোক, বীরভূমের মন্দির থেকে উধাও হওয়া বিষ্ণুমূর্তির সন্ধান করতে যে আপনি ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় এসেছেন, সে খবর তো দিন সাতেক আগেই কাগজে দেখেছিলুম।”

 

বললুম, “মূর্তিটি যে উদ্ধার হয়েছে তা জানেন?”

 

“জানি বই কী। যে প্লেনে আপনারা কলকাতা থেকে এলেন, সেই প্লেনেই তো আজকের কাগজ এল। আপনাদের হোটেলে রেখে আমার অফিসে ফিরে গিয়ে কাগজ খুলে দেখি, খবরটা তাতে খুব ফলাও করে বেরিয়েছে।”

 

“কিন্তু কলকাতায় যে বাড়িতে আমি উঠেছি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার ফোন নাম্বার আপনাকে কে দিল?”

 

“দিল আমার বড়মেয়ে সুজাতা। একে তো তার শ্বশুরবাড়ি আপনার বোনের বাড়ির খুব কাছেই, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের দক্ষিণে, তার উপরে আবার তার ছোট দেওর রন্টু নাকি আপনার ভাগ্নের ক্লাস-ফ্রেন্ড। সকালবেলা সুজাতাকে ফোন করেছিলুম, তাতে সে রন্টুর কাছ থেকে আপনার বোনের বাড়ির ফোন-নাম্বারটা জেনে নিয়ে আমাকে বলল, ‘এক্ষুনি এই নাম্বারে একটা ফোন করো, বাবা, রন্টুর বন্ধুর মামা মিঃ ভাদুড়ি একজন নামজাদা গোয়েন্দা, তিনি নিশ্চয় আমাদের মনসামূর্তি উদ্ধার করে দিতে পারবেন।’ ব্যাস, তার আধঘন্টার মধ্যেই সেই নাম্বারে আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করলুম।”

 

বলে হোহো করে হেসে উঠলেন সত্যপ্রকাশ। হাসতে হাসতে বললেন, “ইট্‌স এ স্মল ওয়ার্লড, মিঃ ভাদুড়ি!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন রঙ্গিলা সম্পর্কে। তার অসুখটা কীসের?”

 

সত্যপ্রকাশের হাসিটা নিমেষে মুছে গেল। বিষণ্ণ গলায় বললেন, “মূর্তিটি চুরি করবার জন্য মন্দিরে যে ঢুকেছিল, রঙ্গিলা তার সামনে পড়ে যায়, মেয়েটাকে জখম করে সে পালিয়েছে। মাথা ফেটে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।”

 

“এখন কেমন আছে?”

 

“বেঁচে আছে। কিন্তু কাউকে চিনতে পারছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত স্মৃতিভ্রংশের ব্যাপার। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কোনও কথাও বলছে না।”

 

“চোরকে সে দেখেছিল?”

 

“মনে তো হয় দেখেছিল। অবশ্য পিছন থেকে যদি আঘাত করে থাকে তো অন্য কথা। তবে মাথার যে জায়গায় লেগেছে তাতে মনে হয়, সামনে থেকেই ভারী কিছু দিয়ে মেরেছে।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের চাউনি আবার ধারালো হয়ে উঠেছে। তবে একটু বাদেই সেটা আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। বললেন, “রঙ্গিলা যদি সুস্থ হয়ে ওঠে, তা হলে একমাত্র ওর পক্ষেই মূর্তিচোরকে শনাক্ত করা সম্ভব, তাই না?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে তো বটেই। অবশ্য চোর যদি স্থানীয় লোক হয় তবেই রঙ্গিলা তাকে শনাক্ত করতে পারবে।”

 

“আমার ধারণা, চোর স্থানীয় লোক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অন্তত সেই সম্ভাবনাই চোদ্দো আনা।”

 

“কিন্তু ও তো এখন কাউকে চিনতেও পারছে না, কথাও বলতে পারছে না।”

 

এতক্ষণে একটু হাসি ফুটল চারু ভাদুড়ির মুখে। রহস্যময় হাসি। বললেন, “সেই জন্যেই আপাতত ওকে নিয়ে আমার কোনও দুশ্চিন্তা নেই।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কথাটার মানে বুঝলাম না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আপনার না-বুঝলেও ক্ষতি নেই। শুনুন সত্যবাবু, আপনাদের পারিবারিক ইতিহাস তো শুনলুম, মনসামূর্তির পশ্চাৎপট সম্পর্কে স্পষ্ট একটা ধারণাও তাতে হল, তবে চুরির ব্যাপারে ডিটেলস আর এখন শুনব না, কালকের জন্যে ওটা মুলতুবি থাক। রাত দুটো বাজে, এবারে আমরা শুয়ে পড়ব।”

 

তারপব কিছু একটা ভেবে বললেন, “ঠিক আছে, ডায়েরিটা দিন, কিছু একটা ক্ল হয়তো ওর মধ্যে পেয়েও যেতে পারি।”

 

সত্যপ্রকাশ তাঁর টেবিলের টানা থেকে ডায়েরিটা বার করে আনলেন। মোটা লাল কাপড়ে মোড়া একটা খাতা। সেই খেরোর খাতাখানা ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, “সাবধানে রাখবেন, আপনারা ছাড়া আর কারও হাতে না পড়ে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কোথায় শোব, সে তো জেনেই গেছি। আপনাকে আর কষ্ট করে পৌঁছে দিতে হবে না। আসি তা হলে।”

 

সত্যপ্রকাশ তবু বারান্দা পর্যন্ত এলেন।

 

উঠোনে যে হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছিল, সেটা নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। টর্চের আলোয় পথ দেখে আমরা ভিতরকার উঠোনের পুব দিকের ঘরে এসে ঢুকলুম।

 

ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছে। তবে জানালাগুলো সবই বন্ধ। সম্ভবত ঠান্ডা আটকাবার জন্য। ঘরের দরজায় খিল তুলে দিয়ে বললুম, “বড্ড গুমোট লাগছে। অন্তত একটা জানালা খুলে দেওয়া দরকার।”

 

ভাদুড়িমশাই চাপা গলায় বললেন, “তার আগে হ্যারিকেনটা নেবান। এক্ষুনি। কথা বলবেন না।” আলোটা নিবিয়ে দিতে-দিতেই লক্ষ করলুম, ভাদুড়িমশাই ভিতরের উঠোনের দিকের একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ঘর অন্ধকার। তবু তারই মধ্যে ঠাহর করা গেল যে, সেই জানালার একটা পান্না সামান্য ফাঁক করে সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মিনিট দুয়েক সেইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি পাল্লাটা ফের নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিয়ে আপন মনেই বললেন, “ও, এই ব্যাপার।”

 

আমি বললুম, “কী ব্যাপার?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু না। নিন, এবারে আলো জ্বালুন। তারপর যতগুলি খুশি জানালা খুলে দিন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *