মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

আট

ফোটোগ্রাফটির দিকে তাকিয়ে আমার নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। ভারতবর্ষের নানা জাদুঘরে আর মন্দিরে-মন্দিরে কত অসংখ্যা দেবদেবীর কত অসংখ্য মূর্তিই তো দেখেছি, কিন্তু এত অপরূপ মুর্তি আমি এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে হল না। দেবীমূর্তি এত অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর হয়। মনসার যে শারীর বিভঙ্গ এই বিগ্রহের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে, শুধু তা-ই যে আমার বিস্ময় জাগিয়েছিল, তা নয়, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলুম তার গঠনসৌকর্য দেখেও। মূর্তিটির গড়ন একেবারে ষোলো-আনা নিখুঁত। কে এই কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরি করেছিলেন, তা হয়তো কোনও কালেই কেউ জানবে না, কিন্তু সেই ভাস্করের যে রূপকল্পনা এই মূর্তির মধ্যে ধরা পড়েছে, শুধু সেইটুকুর পরিচয় পেয়েই তাজ্জব মানবেন যে-কোনও শিল্প-সমালোচক। দন্ডায়মানা মনসা দেবীর কটিদেশ বেষ্টন করে তাঁর বক্ষের উপরে উঠে এসেছে একটি সাপ, আর সেই সাপের মুন্ডটিকে দক্ষিণ হস্তে ধারণ করে দেবী তার প্রসারিত ফণার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেমন তাঁর চোখে, তেমনি তাঁর ওষ্ঠের বঙ্কিম ভঙ্গিমায় একটু হাসির আভাস। সে হাসি স্নেহের হাতে পারে, প্রশ্রয়ের হতে পারে, আবার কৌতুকেরও হতে পারে।

 

চারু ভাদুড়ির চোখে যেন পলক পড়ছিল না। স্থির দৃষ্টিতে তিনি ফোটোগ্রাফটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একসময়ে তিনি মুখ তুলে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন, তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “পালযুগের মূর্তি।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “অ্যাবসলিউটিলি রাইট।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পন্ডিতদের কেউ-কেউ বলেন যে, মনসা পূর্ব-ভারতের দেবী নন, দক্ষিণ-ভারতে ‘মন্‌চা-অন্মা’ অর্থাৎ ‘মন্‌চা মা’ বলে যে দেবীর পুজো হত, তিনিই পরে এক সময়ে ‘মনসা’ নামে এই পূর্ব-ভারতের ধর্মজীবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তবে অনেকেই এ-মত মানতে চান না। একটা কথা অবশ্য ঠিক। সেটা এই যে, আমাদের এই বঙ্গভূমিতে এ-পুজোর প্রচলন বিশেষ ছিল না। অন্তত সমাজের যেটা উঁচু স্তর, তাতে ছিল না। দ্রাবিড়ভূমি থেকেই আসুক আর অন্য যে-কোনও জায়গা থেকেই আসুক, সমাজের সেই উঁচু স্তরে এ পূজার প্রচলন হয়েছে মোটামুটি পালযুগ থেকেই। তবে সেক্ষেত্রেও বলতে হবে যে আপনাদের এই মনসা-মূর্তির বয়স নেহাত কম হবে না।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “মাস কয়েক আগে এক অধ্যাপক এদিকে এক চা-বাগানে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। ভদ্রলোক ইতিহাসের অধ্যাপক, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে এনসেন্ট ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি পড়ান। তা খবর পেয়ে তিনি এই মূর্তিটিকে দেখতে আসেন। বললেন যে, ইন্ডিয়ার সব ক’টা বিখ্যাত মিউজিয়াম তাঁর দেখা আছে, কিন্তু কষ্টিপাথরে গড়া এমন আশ্চর্য মনসা-মূর্তি তিনি কোথাও দেখেননি।”

 

আমি বললুম, “সত্যিই আশ্চর্য।”

 

চারু ভাদুড়ি বললেন, “ভদ্রলোক আর-কিছু বলেননি?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তখন-তখন বলেননি। পরে বলেছিলেন। আমি তো অনেকদিন আগেই এই মনসামূর্তির ফোটো তুলে অনেকগুলি প্রিন্ট করিয়ে রেখেছি, তা তার থেকে একটি প্রিন্ট তিনি চেয়ে নিয়ে যান। তার মাসখানেক বাদে কলকাতা থেকে একখানা চিঠি লিখে ভদ্রলোক আমাকে জানান যে, পালযুগ সম্পর্কে যে দু’জন অধ্যাপককে একালে অথরিটি বলে গণ্য করা হয়, তাঁদের দু’জনকেই তিনি প্রিন্টটি দেখিয়েছেন, আর দু’জনেই একবাক্যে বলেছেন, এ মূর্তি পালযুগের; সম্ভবত প্রথম মহীপালের সময়ে এটি তৈরি হয়েছিল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রথম মহীপাল তো পালবংশের দশম রাজা, যদ্দুর মনে পড়ছে ৯৮৮ থেকে ১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর আমলের একেবারে শেষ বছরেও যদি তৈরি হয়ে থাকে তো এ মূর্তির বয়েস তা প্রায় সাড়ে ন’শো বছর হল।”

 

আমি বললুম, “একে তো এত সুন্দর মুর্তি, তায় আবার এত পাচীন, বিদেশের যে-কোনও জাদুঘর তো এমন মূর্তি পেলে সঙ্গে-সঙ্গে লুফে নেবে।”

 

“জাদুঘর তো আছেই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্যে যারা যে-কোনও দাম দিতে রাজি, আছে সেই কোটিগতিরাও। সত্যি বলতে কী, প্রত্নদ্রব্যগুলিকে আগলে রাখার ব্যাপারে আমাদের মতো গরিব দেশগুলির পক্ষে এখন ইউরোপ-আমেরিকার এই প্রাইভেট কালেকটররাই সবচেয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিউজিয়ামগুলো তবু আইন-কানুন মেনে চলে, এরা সে-সবের ধারই ধারে না।”

 

“আপনাদের কি মনে হয় যে, তাদেরই কেউ এই মুর্তিটি সরিয়েছে?”

 

সত্যপ্রকাশের প্রশ্ন শুনে ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “নিজের হাতে তারা সরাবে কেন, তার দরকারই বা কী? তাদের হয়ে যারা দেশের শিল্প চোরাই পথে বিদেশে চালান করে, সেই এজেন্টরাই তো রয়েছে।”

 

“এটা তাদেরই কাজ?”

 

“তাদের কাজ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের মনসামূর্তির উপরে হামলাটা এসে থাকতে পারে একেবারে অন্যদিকে থেকেও।”

 

দরজায় কে যেন টোকা মারল।

 

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, সাড়ে বারোটা বাজে। এত রাতে কার কী দরকার পড়ল?

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কে?”

 

চাপা উত্তর এল, “আমি নিরু।”

 

সত্যপ্রকাশ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? …ও, এইজন্যে? তা ভালই করেছ।”

 

নিরু এসে ঘরে ঢুকল। হাতে মস্ত ট্রে। তাতে তিন কাপ কফি, আর বড় দুটো প্লেট। একটা প্লেটে কিছু বিস্কুট, আর একটা প্লেটে শিলিগুড়ি থেকে আনা সেই ক্ষীরের শিঙাড়া।

 

সেন্টার টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে রাখল নিরু, তারপর সত্যপ্রকাশকে বলল, “খানিক আগে মা একবার ঘুম থেকে উঠেছিলেন। জানলা দিয়ে দেখলেন যে, আপনার বসবার ঘরে আলো জ্বলছে। তাই আমাকে তুলে দিয়ে বললেন, ‘সতু এখনও ঘুমোয়নি, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, রাত জাগলে খিদে পায়, ওদের জন্যে বরং কফি আর হালকা কিছু খাবার দিয়ে আয় নিরু।’ আপনাদের যদি আরও কফি লাগে তো আমাকে ডাকবেন, আমি এসে দিয়ে যাব।”

 

ভাদুড়িমশাই শশব্যস্ত হয়ে বললেন, “না না, এই যথেষ্ট, আর লাগবে না।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমারও লাগবে না। তোমাকে তো সকাল-সকাল উঠতে হয়, তুমি শুয়ে পড়ো গিয়ে। মায়ের ঘরেই আজ শুয়েছ তো?”

 

মৃদু গলায় নিরু বলল “হ্যাঁ।” তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

 

সত্যপ্রকাশ দরজা বন্ধ করে ফিরে এলেন।

 

রাত জাগলে সত্যিই অনেকের খিদে পেয়ে যায়। সারা রাত্তিরের ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে এইজন্যেই হয়তো ডিনার সার্ভ করার পরেও ঘন্টা তিন-চার বাদে আবার স্টুয়ার্ডেসরা হালকা কিছু-না-কিছু খাবার নিয়ে আসে। আমার অন্তত একটু-একটু খিদে পাচ্ছিল। প্লেট থেকে তাই একটা ক্ষীরের শিঙাড়া তুলে নিলুম। ভাদুড়িমশাই কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “যা বলছিলা। মুর্তিটা যে চোরাই পথে চালান দেবার জন্যেই সরানো হয়েছে, এমন নাও হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, বিদেশি ধনকুবেরদের কাছে বিক্রি করে পয়সা পিটবার কোনও অভিসন্ধিই এক্ষেত্রে ছিল না, অন্য কোনও কারণে আপনাদের মনসা-মূর্তি চুরি করা হয়েছে। তা-ই যদি হয়, তো আমি অন্তত অবাক হব না।”

 

কফি খেতে-খেতে যেন বিষম খেলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “অন্য কোনও কারণে? কী বলছেন আপনি, আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না। আর কী কারণ থাকতে পারে মশাই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরে বলব। আর তা ছাড়া, এখনই যে আমি তেমন কোনও কারণ সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত হতে পারছি, তাও তো নয়। সুতরাং পরে তা নিয়ে ভাবলেও কোনও ক্ষতি নেই। অর্থলোভে এই ধরনের চুরি আজকাল আকছার হচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার, সুতরাং আপাতত এই নিয়েই ভাবনা-চিন্তা করা যাক। কিন্তু তার আগে একটা কথা আমায় বলুন। জরৎকারু তো বর্ধমানের গ্রামে ছিলেন, সেখান থেকে এই মুকুন্দপুরে তিনি এলেন কবে?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “দেখুন মশাই, হেঁয়ালি করবেন না। এই জরৎকারু নামটা আপনি আগেও একবার বলেছেন, কিন্তু আমি তো ও নামে কাউকে চিনি না। কে তিনি?”

 

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকালেন। চোখে কৌতুকের ঝিলিক। বললেন, “আপনি জানেন কিরণবাবু?”

 

বললুম, “আমার কৌলিক পদবি যখন চাটুজ্যে, আর গোত্র যখন কাশ্যপ, তখন আর আমার না জেনে উপায় কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক থাক, যেটুকু বলেছেন, তাতেই বুঝতে পারছি যে, আপনি জানেন। শুনুন সত্যপ্রকাশবাবু, মনসা হচ্ছেন মহর্ষি কশ্যপের মানসী কন্যা, আর এই কন্যাটির আর-এক নাম হল জরৎকারু। তবে কিনা জরৎকারু নামে এক মুনিও ছিলেন, আর সেই মুনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মনসা দেবীর। ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াল?”

 

হেসে বললুম, “কী আর দাঁড়াল, জরৎকারুর সঙ্গে জরৎকারুর বিয়ে হল।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “যাচ্চলে, স্বামী-স্ত্রীর একই নাম? এমনও হয় নাকি?”

 

“হবে না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যেখানে কলকাঠি নাড়ছেন, সেখানে সবই হয়। আসলে আমাদের এই জরৎকারু-মুনি ছিলেন খুবই রোগাভোগা পাতলা চেহারায় মানুষ। হয়তো সেই জন্যই তিনি ঠিক করেছিলেন যে, বিয়ে-থা করবেন না। পরে অবশ্য পাঁচজনের চাপে পড়ে তিনি মত পালটালেন, কিন্তু সেই সঙ্গে আবার এমন একটা শর্ত দিলেন যা মেটানো শক্ত। কিনা যাঁকে বিয়ে করবেন, সেই কন্যাটির নামও জরুৎকারু হওয়া চাই। মুনি বোধহয় ভেবেছিলেন যে, অমন নামের মেয়ে কোথাও মিলবে না, ফলে তাঁকেও আর বিয়ের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হবে না।”

 

“কিন্তু পড়তে তো হল।”

 

“হবেই তো। না হয়ে উপায় কী। কশ্যপের একটি কন্যা হয়েছে শুনে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে দেখতে এলেন। দেখে বললেন, আরে, মেয়ে তো অতি সুন্দরী, তবে কিনা বড্ড রোগা, একেবারে জরুৎকারু মুনির মতো হয়েছে দেখেছি। ঠিক আছে, আমি ওকে জরৎকারু বলেই ডাকব।”

 

আমি বললুম, “আমার তো মনে হয় কৃষ্ণ এ-কাজটা সব জেনেশুনেই করেছিলেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে আর বলতে! জরৎকারুর শর্তের কথাটা জেনে গিয়েছিলেন নিশ্চয়, তাই মনসার ওই একই নামকরণ করে পথটা একেবারে মেরে রাখলেন, যাতে কিনা বিয়েটা মুনিকে করতেই হয়, কিছুতেই তিনি ছটকে বেরিয়ে যেতে না পারেন।”

 

বললুম, “তা-ই হবে। নইলে ভাবুন, ‘মনসা’র মতো সুন্দর যাঁর নাম, তাঁকে আবার ‘জরৎকারু’র মতো বিদঘুটে নাম দেবার কোনও মানে হয়?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ যেন যে-মেয়ের এক নাম সুহাসিনী, তার আর-এক নাম জগদম্বা।”

 

আমি বললুম, “প্রাচীন পুরাণে অবশ্য মনসার কোনও উল্লেখ নেই। দেবী মনসার জন্ম, বিবাহ আর নামের যে-কথা ভাদুড়িমশাই শোনালেন, তার সবই পাওয়া যাচ্ছে অনেক পরবর্তী কালের পুরাণে। সেখানেও অবশ্য মতভেদের অন্ত নেই।”

 

“ও কথা থাক,” ভাদুড়িমশাই হাই তুলে বললেন, “একটা বাজে। আমার প্রশ্নের উত্তরটা এখনও পাইনি।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “মনসা-মূর্তি কবে বর্ধমানের গ্রাম থেকে এখানে এল, এই তো? এখুনি সেটা বলছি। বাকি কথা না হয় কাল হবে। মনে হচ্ছে আপনাদের ঘুম পেয়েছে। তা হলে বরং শুয়ে পড়ুন।” চারু ভাদুড়ি বললেন, “না না, ঘুম একটু পাচ্ছিল বটে, তবে কফি খেয়ে সেটা কেটে গেছে। আপনি বলে যান।”

 

“বলুন বলুন, ভাদুড়িমশাইয়ের একটা হাই উঠেছিল বটে,” আমি বললুম, “কিন্তু আমার একটুও ঘুম পায়নি।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরি খুব বেশিদিন বাঁচেননি। মাটি খুঁড়ে এই মনসা-মূর্তি উদ্ধার করবার বছর পাঁচেক বাদেই তিনি মারা যান। তাঁর বয়স তখন বছর পঞ্চাশ, আর আমার পিতামহ মহেশ্বর চৌধুরির বয়স তখন বছর কুড়ি।”

 

ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “বীরেশ্বর চৌধুরির কি তিনিই একমাত্র সন্তান?”

 

“না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার পিতামহের জন্মের আগে আরও দুটি ছেলে হয়েছিল বীরেশ্বরের, কিন্তু শৈশব পেরোবার আগে তাদের মৃত্যু ঘটে। ছেলে বলতে একমাত্র আনার ঠাকুর্দাই তখন জীবিত। আর ছিল এক মেয়ে। মেয়েটি বালবিধবা। আমার ঠাকুর্দার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল; তার মাত্র এক বছর বাদেই তাঁর সিঁথির সিঁদুর মুছে যায়। যেমন আমার গিসিমা, তেমনি আমার বাবার পিসিমাও তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর আর শ্বশুরবাড়িতে থাকেননি, পিত্রালয়ে চলে এসেছিলেন।”

 

“আপনার ঠাকুর্দার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়?”

 

“না। বিয়ে করবার কোনও ইচ্ছাও তখন নাকি তাঁর ছিল না। সংসারে এই বিধবা বোনটিই তখন তাঁর একমাত্র আপনজন। বোনকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। হয়তো তাঁর ভয় ছিল যে, দাদার সংসারে বোন যতটা স্নেহ আর আদর-যত্ন পাচ্ছে, বৌদির সংসারে সেটা পাবে না। হয়তো সেইজন্যেই তিনি বিয়ে করতে চাননি। হয়তো ভেবেছিলেন যে, বিয়ে না করেও তো স্বচ্ছন্দে কত লোকের জীবন কেটে যায়, তাঁরও কেটে যাবে।”

 

“কিন্তু কাটেনি, কেমন?”

 

“সত্যিই কাটেনি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহের মৃত্যুর মাত্র বছর দেড়েক বাদেই তিনি গৃহত্যাগ করেন। যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি পিছনে পড়ে রইল। শুধু যা-কিছু তিনি সঞ্চয় করেছিলেন কিংবা আমার প্রপিতামহের কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সেই টাকাকড়ি আর মনসাদেবীর মূর্তিটিকে সঙ্গে নিয়ে একদিন রাত-দুপুরে তিনি তাঁর গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে বর্ধমান শহর, তারপর কলকাতা, তারপর আরও কয়েকটা জায়গায় ঠেক খেতে-খেতে চলে এলেন এই মুকুন্দপুরে।”

 

জিজ্ঞেস করলুম, “চলে তো এলেন। কিন্তু কেন? নেহাতই ভাগ্যান্বেষণে?”

 

এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন সত্যপ্রকাশ। তারপর ভীষণ ক্লান্ত গলায় বলেন, “সকলকে আমরা তা-ই বলি বটে, কিন্তু আপনারা তো আর সকলের মতো নন, ভীষণ একটা বিপদে পড়ে আমি আপনাদের ডেকেছি, সেই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করবার জন্যে আপনারা এখানে এসেছেন, তাই আপনাদের কাছে কিছু গোপন করা আমার উচিত হবে না।”

 

ভাদুড়িমশাই ব্যস্ত হয়ে বললেন, “না না, আপনার যদি কোনও অসুবিধে থাকে তো…”

 

সত্যপ্রকাশ সেই একই রকমের ক্লান্ত গলায় বললেন, “সুবিধে-অসুবিধের ব্যাপার তো নয় মিঃ ভাদুড়ি, এটা একটা লজ্জার কথা, যা হয়তো আমাদের পরিবারেও আর কেউ জানে না, সম্ভবত আমার বাবাও জানতেন না, একমাত্র আমিই জানি। আসলে আমাদের পরিবারের একটা স্ক্যান্ডাল এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *