সাত
সত্যপ্রকাশের কথা শুনে তো আমি অবাক। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিন্তু মনে হল যে, এই রকমের একটা তাজ্জব ব্যাপারও তাঁকে বিশেষ বিচলিত করতে পারেনি। যেন এমন কান্ড নিত্যই ঘটছে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
তবে, মুখের রেখা পালটে না-গেলেও, তাঁর চোখের চাউনিটা যে পালটেছে, ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এক-পলক তাকিয়েই সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলুম। তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি; যেন সত্যপ্রকাশকে নয়, তাঁর ভেতর দিয়ে আর-কাউকে তিনি দেখে নিচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ সেইভাবে তিনি তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে-ধীরে তাঁর দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। সত্যপ্রকাশকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “যিনি ফিরে এসেছেন, তিনিই যে আপনার সেই হারানো-কাকা, তা আপনি বুঝলেন কী করে?”
“আমি বুঝতে পারিনি। মা আর পিসিমা বুঝতে পেরেছিলেন। আর বুঝতে পেরেছিল রামদাস। সে-ই শিলিগুড়িতে লোক পাঠিয়ে আমাকে খবর দেয় যে, কাকা ফিরে এসেছেন।”
“ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো।”
“ব্যাপার আর কী, জটাধারী একজন বুড়োমতন লোক একদিন আমাদের এই বাড়িতে এসে বললেন, যে, তিনি চিত্তপ্রকাশ চৌধুরি, মহেশ্বর চৌধুরির ছোট ছেলে। সকলকে একবার দেখবার জন্যে তিনি নাকি হরিদ্বার থেকে কামাখ্যা যাওয়ার পথে এখানে এসেছেন, হপ্তাখানেক এখানে থেকে কামাখ্যা যাবেন, তারপর কামাখ্যা থেকে আবার হরিদ্বারে ফিরবেন।”
“সকলেই সে-কথা বিশ্বাস করল?”
“প্রথমটায় করেনি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কিন্তু মা যখন রামদাসকে বললেন যে, ছেলেবেলায় পেয়ারাগাছ থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর দেও বের কপাল ফেটে গিয়েছিল, সেই দাগটা এখনও মিলিয়ে যায়নি, আর রামদাস যখন দেখল যে, যিনি এসেছেন তাঁর কপালে সত্যি মস্ত একটা কাটা-দাগ রয়েছে, তখন আর তাঁকে চিত্তপ্রকাশ বলে মেনে নিতে কারও আপত্তি হল না।”
“অর্থাৎ তিনি এখানেই রয়ে গেলেন?”
“হ্যাঁ,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “সবাই মেনে নিল যে, এটা ইপার্সোনেশানের ব্যাপার নয়। সত্যিই তিনি মহেশ্বর চৌধুরির কনিষ্ঠ পুত্র – নিত্যপ্রকাশের ছোট ভাই।”
“আপনার মা তাঁকে ছেলেবেলায় পেয়ারাগাছ থেকে পড়ে যেতে দেখেছিলেন?”
“তা কী করে দেখবেন? মা’র তো তখনও বিয়েই হয়নি। তবে হ্যাঁ, পিসিমা দেখেছিলেন। মা শুনেছিলেন বিয়ের পরে তাঁর শাশুড়ি অর্থাৎ আমার ঠাকুমার কাছে।”
“খাবার সময়ে তো তাঁকে দেখলুম না। আগেই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছেন নাকি?”
“তিনি সন্নিসি মানুষ, তাই আমাদের সঙ্গে খান না। আমাদের এই বাড়ির মধ্যে থাকেনও না তিনি।”
“আপনারা থাকতে বলেছিলেন?”
“বিলক্ষণ।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তিনি আমার কাকা, তাঁকে থাকতে বলব না?”
“তাতে তিনি কী বললেন?”
“বললেন, ওরেব্বাবা, একবার যখন সংসারের খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়েছি, তখন আর ওর মধ্যে ঢুকি? আমাকে নিয়ে ভাবিস না, আমি গাছতলাতেই দিব্যি থাকব।”
“তা-ই রয়েছেন?”
“তাও কি হয়? মন্দিরের উত্তরে আমাদের একটা ফলের বাগান আছে, লোকজন ডেকে সাত-তাড়াতাড়ি সেই বাগানের মধ্যে একটা একচালা ঘর তুলে দেওয়া হল। কাকা এখন তাতেই থাকেন। পুজো-আচ্চা করেন, আর মাঝে-মাঝে হাঁক ছাড়েন ‘জয় শিবশম্ভু, জয় শঙ্কর’।”
“আপনার কাকার বয়েস এখন কত?”
“দাঁড়ান মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “একটু হিসেব করে বলতে হবে। আমার যখন জন্ম হয়, আমার মায়ের বয়েস তখন সতেরো। তা আমার বয়স এখন ছেচল্লিশ। তা হলে আমার মায়ের বয়স হল গিয়ে ছেচল্লিশ প্লাস সতেরো অর্থাৎ তেষট্টি বছর। কাকা শুনেছি আমার মায়ের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তা হলে হি শুড বি সিক্সটি এইট নাউ।
“অর্থাৎ কলেজে পড়তে-পড়তে যিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন, বছর পঞ্চাশেক বাদে তিনি ফিরে এসেছন। তা এই পঞ্চাশটা বছর তিনি ছিলেন কোথায়?”
“হরিদ্বার, কনখল, ঋষিকেশ, এইরকম নানান জায়গায়। এক রমৃতা সাধুর সঙ্গে হস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন, এলাহাবাদে তাঁর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সেখান থেকে যান হরিদ্বারে। বলেন যে, ওই হরিদ্বারেই এক শৈব সাধুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন।”
“শৈবদের তো নানান সম্প্রদায় রয়েছে,” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “ইনি কোন সম্প্রদায়ের সাধু?”
“তা তো জানি না। তবে শুনেছি যে, সেই সাধুর সঙ্গেই তিনি ভৈরোঘাটে গিয়েছিলেন। ভৈরোঘাটের নাম শুনেছেন নিশ্চয়, জায়গাটা গঙ্গোত্রীর খুব কাছে। সেখানে এক গুহার মধ্যে বসে নাকি পুরো পাঁচ পছর একটানা তপস্যাও করেছেন। আর তার ফলে এমন একটা শক্তি পেয়েছেন, যা নাকি কেউ পায় না।”
“শক্তিটা কী?”
“তা কিছুতেই বলতে চান না। জিজ্ঞেস করলে শুধু হাসেন, আর বলেন, ‘জয় শঙ্কর’।”
“কদ্দিন এখানে থাকবেন বলেছিলেন?”
“হপ্তাখানেক। এদিকে দিন দশ-বারো তো কেটে গেল, কিন্তু…”
“কিন্তু এখান থেকে আর নড়তে চাইছেন না, কেমন?”
“ঠিক ধরেছেন,” সত্যপ্রকাশ একটু কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “আর সেটাই হয়ছে সমস্যা।”
ভাদুড়িমশাইয়ের চাউনিটা আবার ধারালো হয়ে উঠল। বললেন, “সমস্যা কীসের?”
সত্যপ্রকাশ সেই একইরকম কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “এমনিতে তো কোনও সমস্যা হবার কথা নয়। খান তো শুধু ফলমূল আর দুধ, যার জোগান আমরা হাসিমুখেই দিচ্ছি। আর থাকেনও তো বাড়ির বাইরে, বাগানের মধ্যে; কারও তাতে কোনও অসুবিধা হবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আর তা ছাড়া, এটাও তো ঠিক যে, এখানকার যা-কিছু জমিজমা, তা আমার বাবা করেননি, করেছেন আমার ঠাকুর্দা। এই বাড়িও তাঁরই করা। তার মানে এই ভূসম্পত্তি আর এই ঘরবাড়ি, এর উপরে আমার যতটা অধিকার, কাকার অধিকার তার চেয়ে এক-কড়াও কম নয়। একেবারে ফিটি-ফিফটি মালিকানার ব্যাপার। সুতরাং তিনি তো থাকতেই পারেন।”
“তা হলে তো মিটেই গেল, সমস্যাটা কোথায়?”
“সমস্যা ওঁর চালচলন নিয়ে, সমস্যা ওঁর বিশ্বাস নিয়ে, সমস্যা ওঁর কথাবার্তা নিয়ে। মনসা আমাদের উপাস্য দেবী, আমার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরীর সময় থেকে আমরা মা-মনসার পুজো করে আসছি, সেই মনসাকেই উনি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। কী বলেন জানেন?”
“কী বলেন?”
“বলেন যে, ওটা দেবী নয়, ওটা ব্যাং-খেকো সাপ! শুধু যে আমাদের বাড়ির লোককেই বলেন, তা নয়, ত্রিশূল হাতে নিয়ে গোটা গাঁয়ে টহল মেরে বেড়ান, আর প্রত্যেককে বলেন, ‘ওটাকে ফেলে দে, তারপর ওই মন্দিরের মধ্যে শিব প্রতিষ্ঠা করে শিবের পুজো শুরু কর!’ মূর্তিটি নিখোঁজ হওয়ায় সবাই যখন ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে আছে, আর ভাবছে যে, গোটা গ্রামের এতে ঘোর অমঙ্গল হবে, তখন কাকা কিন্তু দারুণ খুশি। আনন্দে তিনি লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভাবতে পারেন?”
“পারব না কেন, খুব পারি। রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, যত মত তত পথ। কিন্তু তাঁর মতো সহিষ্ণুতা আর ক’জন সাধক দেখাতে পেরেছেন? সাধকরা যদি-বা পারেন, তাঁদের চেলারা পারে না। চেলারা ভাবেন যে, তাঁরা যে ধর্মপন্থায় চলেছেন সেটাই ঠিক, আর বাদবাকি সমস্ত পথই ভুল পথ। অন্যের মত, অন্যের পথকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ না করে তাঁদের শান্তি নেই। যদ্দুর বুঝতে পারছি, আপনার খুড়োমশাইটিও এই রকমের অসহিষ্ণু একজন মানুষ। তিনি সাধু হতে পারেন, কিন্তু সহিষ্ণু নন।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “সহিষ্ণু নয় এখানকার গ্রামের লোকজনও। রামদাসের কাছে শুনলুম, মা-মনসা সম্পর্কে কাকা যে-সব ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে বেড়াচ্ছেন, তারা তাতে খেপে গেছে। এমন কথাও তারা নাকি বলছে যে, এবারে ওই বাগানে ঢুকে তারা চালাঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে। মা-মনসার নিন্দে তারা সহ্য করবে না।”
ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনি বলছিলেন যে, আপনার প্রপিতামহ বীরেশ্বর চৌধুরির আমল থেকে আপনারা মনসার পুজো করে আসছেন। তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“তাঁর আগে আপনাদের পরিবারে এই পুজোর প্রচলন ছিল না?”
“হয়তো ছিল, আমি জানি না।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তবে এইটে জানি যে, মনসা দেবীর এই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমার প্রপিতামহের আমলেই। মূর্তিটি তিনি কীভাবে পেয়েছিলেন, সেই গল্পও আমি বাবার মুখে শুনেছি। বাবা শুনেছিলেন আমার ঠাকুর্দার কাছে।”
“কীভাবে পেয়েছিলেন? কোনও সাধু-সন্নিসির কাছ থেকে?”
“না না,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না, আর বিশ্বাস না করলে আমি আপনাদের দোষও দেব না, তার কারণ, আমার নিজের মনেই এ নিয়ে অনেক দ্বিধা-সংশয় আর সন্দেহ রয়েছে। আমি বিশ-শতকের মানুষ; যা শুনেছি, আমি নিজেই তা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি। কোনও সাধু-সন্নিসি যদি একদিন আমার প্রপিতামহের দরজায় এসে দাঁড়াতেন আর তাঁর ঝোলার থেকে একটা মনসা মূর্তি বার করে আমার প্রপিতামহের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, ‘নে ব্যাটা, এই যে মুর্তিটা তোকে দিলুম, একে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে থাক, তাতেই তোর দুঃখ-কষ্ট ঘুচে যাবে,’ তো সেটাকে আমি খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলে মনে করতুম না। এমন তো কতই ঘটে। কিন্তু যা শুনেছি, তা যে সত্যিই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কী বলব, এটা একেবারে অলৌকিকের পর্যায়ে পড়ে।”
আবার সেই একই রকম তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই— বললেন, “কী শুনেছেন?”
তখনই এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না সত্যপ্রকাশ। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমার প্রপিতামহ একদিন রাত্তিরে একটা স্বপ্ন দেখেন। অদ্ভুত সেই স্বপ্ন। যেন এক। অন্ধকার পথ দিয়ে তিনি হাঁটছেন। কোথাও কোনও বাড়িঘর নেই, দু’পাশে শুধু উঁচু-উঁচু সব গাছ। যেন সেটা কোনও লোকালয় নয়, বিরাট একটা জঙ্গল। সেই জঙ্গল হঠাৎ আলোয় ঝলমল করে উঠল। ‘অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ যখন তীব্র কোনও আলোর ঝলক এসে পড়ে, তখন প্রথমটায় কিছুই ঠাহর হয় না। আমার প্রপিতামহেরও কিছু ঠাহর হয়নি। তাঁর দৃষ্টি বাঁধিয়ে গিয়েছিল, তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন। তারপর যখন চোখ খুললেন, তখন দেখতে পেলেন যে, সেই আলোর মধ্যে এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর গায়ের রঙ আবলুস কাঠের মতো কালো, কিন্তু রঙ কালো হলে কী হয়, তাঁর রূপের নাকি কেনাও তুলনা হয় না। চোখ দুটি টানা-টানা, নাকটি টিকোলো, ঠোঁট দুটি পাতলা, আর শরীর অসম্ভব রকমের সরু।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “জরৎকারু নামটা তো এইজন্যেই।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “তার মানে?”
“পরে বলব। স্বপ্নের সবটা আগে শুনি।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “স্বপ্নে আমার প্রপিতামহ নাকি এও দেখতে পেয়েছিলেন যে, একটি সাপ সেই নারীমূর্তিকে বেষ্টন করে রয়েছে। সেই নারী তবু সারাক্ষণ হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই আমার প্রপিতামহকে তিনি বললেন, ‘বীরেশ্বর, আমাকে তুমি উদ্ধার করো।’ প্রপিতামহ বললেন, তুমি কে?’ সেই নারী বললেন, ‘আমি মনসা। যে গ্রামে তুমি থাকো, তার দক্ষিণে যে ডাঙাজমি রয়েছে, তার বটগাছের তলায় আমি বন্দি হয়ে আছি। তুমি আমাকে উদ্ধার করে আনো।’ বলেই তিনি আলোর মধ্যে মিলিয়ে গেলেন, আর আমার প্রপিতামহেরও ঘুম তৎক্ষণাৎ ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন যে, সকাল হয়েছে, সূর্য উঠেছে, জানলা দিয়ে রোদ্দুর এসে পড়েছে তাঁর ঘরের মধ্যে।”
আমি বললুম, “তারপর?”
“তারপরেই ঘটল আশ্চর্য সেই ঘটনা।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমার প্রপিতামহ যে অমন একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন, এর মধ্যে তো বিস্ময়ের কিছু নেই, এই ধরনের দেবদেবীর স্বপ্ন অনেকেই দেখে থাকে। কে জানে, সেই সময়ে তাঁদের গ্রামে হয়তো সাপের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল, গ্রামের লোকেরাও হয়তো বলাবলি করছিল যে, মা-মনসা নিশ্চয়ই খুব কুপিত হয়েছেন, তা নইলে এমন হত না, আমার প্রণিতামহের মনও হয়তো এই ধরনের চিন্তাতেই তখন তোলপাড় হচ্ছিল, আর তারই ফলে হয়তো অমন একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। না মশাই, এমন স্বপ্ন অনেকেই দেখতে পায়, শুধু যে দেখতে পায় তা নয়, ঘুম ভাঙবার পরে স্বপ্নের উপরে আরও কিছু রং চড়িয়ে ফলাও করে সবাইকে তা বলেও বেড়ায় তারা। এই ধরনের স্বপ্নের গপ্পো আমি অনেক শুনেছি, আপনারাও নিশ্চয় শুনে থাকবেন। কিন্তু বীরেশ্বর চৌধুরির ক্ষেত্রে ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, বাস্তবের সঙ্গে সেটা মিলে গেল। তাঁদের গ্রামের দক্ষিণ দিকের মাঠের মধ্যে সতিই একটা উঁচু ডাঙাজমি ছিল। ডাঙাজমির উপরে বটগাছও ছিল একটা। সেই বটগাছের কাছে, স্বপ্নে যেমন-যেমন নিশানা পেয়েছিলেন সেই অনুযায়ী হাত-চারেক গভীর করে মাটি খুঁড়তেই ঠং করে একটা আওয়াজ হল, আর বীরেশ্বর চৌধুরিও অমনি শাবল ফেলে দিয়ে হাত দিয়ে সেখানকার ঝুরো-মাটি সরিয়ে গর্তের ভিতর থেকে তুলে আনলেন একটি পাথরের মুর্তি।”
সত্যপ্রকাশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমরাও কেউ কোনও কথা বলছিলুম না। হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলেন সত্যপ্রকাশ। সেটা ধরিয়ে বেশ বড় করে একটা টান দিলেন। গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “স্বপ্নে যে নারীমূর্তি তিনি দেখেছিলেন, অবিকল সেই মুর্তি। অতি অশ্চর্য মুর্তি। …এই ছবিটা দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন।”
সত্যপ্রকাশ তাঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ফোটোগ্রাফ বার করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমাদের মন্দির থেকে এই মূর্তিটা চুরি হয়েছে। মিঃ ভাদুড়ি, যেমন করেই হোক, এই মূর্তি আপনাকে উদ্ধার করে দিতে হবে।”
