মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চার
কথা বলতে-বলতে এয়ারপোর্টের বাইরে চলে এসেছিলুম।
চন্দ্রমাধব তার লাগেজ কালেক্ট করতে গিয়েছে। তাকে বলেছিলুম যে, আমাদের জন্যে সম্ভবত একটা গাড়ি আসবে। ইচ্ছে করলে সেই গাড়িতে সে শিলিগুড়ি শহর পর্যন্ত একটা লিফ্ট পেতে পারে। তাতে সে বলল, “আমার দেরি হবে কিরণদা। আপনারা এগোন।”
এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই ট্যাক্সিওয়ালারা ছেঁকে ধরেছিল আমাদের। তাদের সরিয়ে দিয়ে মধ্যবয়সী একজন ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আশা করছি আপনারাই মিঃ ভাদুড়ি আর মিঃ চ্যাটার্জি?
ভাদুড়িমশাই ‘হ্যাঁ’ বলতেই ভদ্রলোক বললেন, “নমস্কার। আমি সত্যপ্রকাশ চৌধুরি। পথে কোনও কষ্ট হয়নি তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, কষ্ট হবে কেন? তা ছাড়া প্লেন আজকে ঠিক সময়েই ছেড়েছিল, দমদম এয়ারপোর্টে অনর্থক বসে থাকতে হয়নি।”
“বিপিন ঠিক সময়ে টিকিট পৌঁছে দিয়েছিল?”
“বিলক্ষণ। ভদ্রলোক আমাদের আগেই এয়ারপোর্টে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু উনি কে?”
“বিপিন আর সঞ্জীব আমার অনেক দিনের চেনা লোক। কলকাতায় ওদের দুজনেরই মস্ত বড় কাঠের ব্যাবসা। পরস্পরের ওরা খুব বন্ধুও বটে। ওরা আমার কাছ থেকে কাঠ কিনে সেই কাঠ চেরাই করে বিক্রি করে। কাঠ কেনার ব্যাপারেই মাঝে-মাঝে ওদের শিলিগুড়িতে আসতে হয়। যখন আসে তখন একসঙ্গেই আসে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল আমাকে ফোন করে আপনি যখন জানলেন যে, আমরা দুজনে আসব, তখন টিকিটের জন্যে ওঁকে ফোন করলেন বুঝি?”
“হ্যাঁ।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি তো জানতুমই ওরা আজ সকালের ফ্লাইটে শিলিগুড়িতে আসবে। তাই ফোন করে বিপিনকে বললুম যে, তার আর সঞ্জীবের টিকিট দুখানা যেন আপনাদের দিয়ে দেয়। ওরা দু-চার দিন পরে এলেও ক্ষতি নেই।”
“ভদ্রলোককে টিকিটের দাম দিতে গিয়েছিলুম। কিন্তু উনি নিলেন না।”
“কেন নেবে? ওদের সঙ্গে তো আমার টাকা-পয়সার লেনদেন হয়, সেই খাতে এই টিকিট দুখানার দাম অ্যাডজাস্ট করে নেব। এমন তো আমরা হামেশাই করি।”
প্রাইভেট গাড়িগুলো যেখানে পার্ক করা রয়েছে, কথা বলতে বলতে সেইখানে এসে দাঁড়িয়েছিলুম আমরা। সত্যপ্রকাশ একটা অ্যাম্বাসাডারের দরজা খুলে দিয়ে বললেন, “উঠে পড়ুন। গাড়ি আমি নিজেই চালাই, সুতরাং একজন এসে সামনে বসতে পারেন।”
কাল সকালে যখন চারু ভাদুড়িকে ফোন করেন, সত্যপ্রকাশ তখন তাঁর ব্যাবসার বিবরণও জানিয়ে রেখেছিলেন। ভদ্রলোক মূলত কাঠের কারবারি। তা ছাড়া, শিলিগুড়ি শহরের যে-বাজারটাকে ‘হংকং বাজার’ বলে, অর্থাৎ যেখানে দোকানে দোকানে বিদেশি জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি দেখে তাক লেগে যায়, তার খুব কাছেই তাঁর একটা বড়সড় হোটেলও রয়েছে। আর আছে গোটা পাঁচেক ট্রাক। তার মধ্যে দুটো তাঁর নিজেরই কারবারের কাজে লাগে, বাকি তিনটেকে তিনি ভাড়া খাটান।
সত্যপ্রকাশের বয়স বছর-পঁয়তাল্লিশের বেশি হবে না। চেহারা এখনও শক্তসমর্থ, তবে মাথার চুল সামনের দিকে কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। মানুষটি যে শৌখিন, তা তাঁর গাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। এয়ার-কন্ডিশন্ড গাড়ি, ড্যাস-বোর্ডে ইলেকট্রিক ঘড়ি বসানো, আমরা উঠে বসতেই ক্যাসেটে কিশোরকুমারের গান শুরু হয়ে গেল। ক্যা হুয়া, ক্যায়সে হুয়া…। ‘অমর প্রেম’-এর হিট্-গান।
ভদ্রলোকের পোশাকও একেবারে ফিটফাট। মিহি সুতোর ধুতির সঙ্গে সাবুদানার কাজ করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরেছেন, পায়ে জরির কাজ করা কোলাপুরী চপ্পল। স্টিয়ারিং হুইল ডাইনে-বাঁয়ে ঘোরানোর সঙ্গে-সঙ্গে বাঁ বাতের অনামিকায় যে আংটিটি বার-বার ঝকমক করে জ্বলে উঠছিল, তার নীলচে আভাযুক্ত হিরেটা নেহাত ছোট নয়।
বাগডোগরা থেকে গাড়ি চালিয়ে সত্যপ্রকাশ একেবারে সরাসরি তাঁর হোটেলে আমাদের নিয়ে এলেন। হোটেলের বার-লাইসেন্স রয়েছে, আর শিলিগুড়ি তো কাঁচা-পয়সার জায়গা, ফলে সন্ধের পর এই হোটেলে নাকি কাঁঠালে মাছি পড়ার মতো ভিড় জমে যায়। সত্যপ্রকাশ আমাদের ড্রিংকস অফার করেছিলেন, আমরা ও-রসে বঞ্চিত শুনে আর পীড়াপীড়ি করলেন না, নিজের জন্যে একটা জিন অ্যান্ড লাইম নিয়ে বেয়ারাকে বললেন, “তা হলে যা, কে কী খাবেন জেনে নিয়ে লাঞ্চের ব্যবস্থা কর।”
খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরে সত্যপ্রকাশ বললেন, “একটা ডাল-বেড ঘর আপনাদের খুলে দিচ্ছি, আপনারা একটু বিশ্রাম করে নিন, আর সেই ফাঁকে আমি আমার ব্যাবসার কাজটা একটু দেখে আসি। বিকেল নাগাদ শিলিগুড়ি থেকে আমরা বেরিয়ে পড়ব।”
সত্যপ্রকাশ চলে গেলেন।
হোটেলে যে ঘরটা আমাদের দেওয়া হয়েছিল, সেটা চারতলায়। যে বেয়ারাটি আমাদের সঙ্গে এসেছিল, তার কাছে শুনলুম, আকাশ যেদিন পরিষ্কার থাকে, সেদিন সকালবেলায় আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘা একেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। বেলা বাড়লে অবশ্য কিছুই আর চোখে পড়ে না।
ঘরখানা চমৎকার। অ্যাটাচ্ড বাথ তো আছেই, তার ফিটিংসও একেবারে হ’ল-ফ্যাশানের। বিছানার পাশে একটা টেলিফোনও দেখলুম। মস্ত জানালা। তাতে ব্রোকেডের কাজ করা মোটা কাপড়ের বাহারি পর্দা ঝুলছে। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, এটা বেশ চড়া-ভাড়ার শৌখিন হোটেল : তা শিলিগুড়িতে এখন এমন হোটেলও নেহাত একটি-দুটি নয়, বেশ কয়েকটি রয়েছে। তাও নাকি আগে থাকতে বুক্ করে না রাখলে ঘর মেলে না।
সেটা অবশ্য অস্বাভাবিকও নয়। তার কারণ দেশ স্বাধীন হবার পরে জলপাইগুড়ি শহরের যদিও বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি, শিলিগুড়ি একেবারে হু-হু করে বেড়েছে। যেমন বেড়েছে ব্যাবসা, তেমনি বেড়েছে লোকসংখ্যা, আর লোকসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শহরের আয়তন। তিপ্পান্ন সালে একবার শিলিগুড়িতে এসেছিলুম। মনে আছে, রাত আটটার সময়ে সেবারে স্টেশন থেকে বেরিয়ে শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই বিশেষ চোখে পড়েনি। সেই শিলিগুড়ির সঙ্গে এই শহরের বিস্তর ফারাক। ব্যাবসার সঙ্গে বেড়েছে চোরাই কারবার। তার সূত্রেও নেহাত কম লোক এখন শিলিগুড়িতে আসে না। থলি বোঝাই করে যেমন তারা টাকা নিয়ে যাচ্ছে এখান থেকে, তেমনি আবার উড়িয়েও দিচ্ছে তাড়া-তাড়া নোট। শিলিগুড়িও তাই আর সেই মফস্বল-বাংলার ছোট শহরটি নেই, ভারতবর্ষের হরেক এলাকা, হরেক কিসিমের ব্যবসায়ী আর ধান্দাবাজ মানুষদের সে এখন নতুন আর-একটি বড়বাজার।
ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “কী ভাবছেন এত?”
বললুম, “শিলিগুড়ির কথা। সত্যি, জায়গাটা একেবারে পালটে গেছে। কিন্তু সে-কথা থাক, আপনি কী ভাবছিলেন বলুন।”
“আমি ভাবছিলুম সত্যপ্রকাশবাবুর কথা।”
“মানুষটিকে কেমন লাগল?”
“এখনও খারাপ লাগেনি। উদ্যমী, পরিশ্রমী মানুষ। তা ছাড়া, কথাবার্তাতেও বেশ সজ্জন বলেই মনে হয়। তবে হ্যাঁ, কাজের কথা তো কিছুই হল না।”
বললুম, “সেটা বোধহয় ওঁদের সেই গ্রামের বাড়িতে যেতে-যেতে হবে।”
বলতে-না-বলতে সত্যপ্রকাশ এসে গেলেন। হাতে একটা প্যাকেট। বললেন, “এখানকার কোন মিষ্টি বিখ্যাত, আপনারা জানেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ক্ষীরের শিঙাড়া।”
“শাবাশ!” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনাদের জন্যে সেই ক্ষীরের শিঙাড়া নিয়ে এসেছি। খেয়ে নিন, তারপরেই আমরা মুকুন্দপুর রওনা হব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন খাব না। প্যাকেটটা সঙ্গে নিয়ে চলুন, যেখানে যাচ্ছি, সেখানে পৌঁছে খাওয়া যাবে।”
আমি বললুম, “আপনাদের গ্রামের নাম কি মুকুন্দপুর?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ, এই মুকুন্দপুরেই আমাদের পৈতৃক বাড়ি। জায়গাটা আলিপুরদুয়ারের খুব কাছে।”
বেরিয়ে পড়লুম। রাস্তা নেহাত কম নয়। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে খানিকটা এগোবার পরে ময়নাগুড়িতে একবার গাড়ি থামানো হল। কিনা সেখানকার রসগোল্লা অতি চমৎকার। রসগোল্লার সঙ্গে খেতে হল চা। বলা বাহুল্য, এর চেয়ে খারাপ কম্বিনেশন আর কিছুই হতে পারে না, কিন্তু তবু যে একেবারে সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিলুম, তার কারণ, আমার মনে হচ্ছিল যে, একে তো ক্ষীরের শিঙাড়া এখনও খাইনি, তার উপরে যদি রসগোল্লাও না-খাই তো ভদ্রলোক খুবই দুঃখিত হবেন।
ময়নাগুড়ির পরে গয়েরকাটা এবং আরও কয়েকটা জায়গা ছুঁয়ে হাসিমারা ছাড়িয়ে বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে, হাইওয়ে থেকে সরু একটা রাস্তায় পড়ে আরও বেশ কয়েক মাইল পেরিয়ে যখন আমরা মুকুন্দপুরে পৌঁছলুম, তখন রাত হয়ে গেছে।
কৃষ্ণপক্ষের রাত। চাঁদ ওঠেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, এই কার্তিকমাসেও বিশেষ কুয়াশা জমেনি, নক্ষত্রগুলি যেন হিরের কুচির মতন ঝকমক করছে। নীচের অন্ধকার তাতে অবশ্য কিছুমাত্র কাটছে না। গাড়ি যেখানে থামল, তার কাছেই বড়-বড় ঝুপসি কয়েকটা গাছ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তবে গাছপালার আড়ালে কয়েকটা ঘরবাড়ি চোখে পড়ে। তবে সে-সব ঘরবাড়ি যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ন’টা বাজে। এরই মধ্যে কি সবাই ঘুমিয়ে পড়ল নাকি?
একটু বাদেই অবশ্য একটা আলো দুলে উঠল। লন্ঠন হাতে কে একজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে। কাছে এসে দাঁড়াতে সত্যপ্রকাশ বললেন, ‘কী রামদাস, এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”
রামদাসের মাথার চুল যেমন ধবধপে সাদা, গায়ের রং তেমনি কুচকুচে কালো। বয়স মনে হল সত্তর-পঁচাত্তর, তবে শরীর এখনও সটান। সত্যপ্রকাশের কথা শুনে একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, “না খোকাবাবু, ঘুমোব কেন? মা আর পিসিমা এই খানিক আগে শুয়ে পড়েছেন, কিন্তু আমি তো জানি যে, তোমার কথার নড়চড় হয় না, যখন আসবে জানিয়েছ তখন ঠিকই আসবে। তাই জেগেই ছিলুম।”
“তা হলে আলো নিয়ে আসতে এত দেরি হল কেন? গাড়ির শব্দ পাওনি?”
“পেয়েছিলুম। কিন্তু রঙ্গিলার জ্বর নিচ্ছিলুম তো। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”
হঠাৎ পালটে গেল সত্যপ্রকাশের গলা। একটু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছে রঙ্গিলা এখন? জ্বর নেই তো?”
“আছে। তবে কম। একশো।”
“কথা বলছে?”
রামদাস বলল, “না, যখন জেগে থাকে, তখন শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কাউকে যে চিনতে পারছে, তাও মনে হয় না।”
ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “রঙ্গিলা কে?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “রামদাসের নাতনি।”
