মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

তেত্রিশ

দুপুরের খাওয়া চটপট মিটে গেল। খাবার টেবিলে মা আর আজ আসেননি; কাকে কী দিতে হবে, পিসিমাই সব বলে দিচ্ছিলেন। পিসিমা দেখলুম শক্ত ধাতের মানুষ। পুরুতঠাকুরকে সাপে কাটায় যেমন মা তেমনি পিসিমাও প্রথমটায় ভেঙে পড়েছিলেন বটে, কিন্তু পিসিমা ইতিমধ্যেই ধাক্কাটা সামলে নিয়েছেন।

 

শুধু তা-ই নয়, সত্যপ্রকাশ তাঁর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করায় পিসিমা বললেন, “বৌদির মন যে কত নরম, তা তো জানিস সতু, এখনও মন খারাপ করে শুয়ে আছে আর বলছে, এমন হল কেন। তা আমি বললুম, হবে না-ই বা কেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, পুরুত হোক আর যা-ই হোক, চোর তো বটে, তার উপরে আবার ধরা পড়বার ভয়ে ওই নির্দোষ মেয়েটাকে খুন করতে গিয়েছিল, ওর উচিত-শান্তি হয়েছে, তুমি আর ও নিয়ে মন খারাপ কোরো না ‘

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ কালীপুজো। ভেবেছিলুম, কাজ মিটিয়ে আজ কলকাতায় ফিরব, সে আর হল না। কালকের ফ্লাইটে কিন্তু যেমন করেই হোক ফিরতে হবে।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে কী। মূর্তি উদ্ধার না করেই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মূর্তি এখন বিশ-বাঁও জলের তলায়।”

 

কথাটা শুনে যেন এক্ট্রোরে ভেঙে পড়লেন সত্যপ্রকাশ। কাতরভাবে বললেন, “না না, ও কথা বলবেন না। আপনি মশাই সব পারেন। আমার জন্যে আপনি অনেক করেছেন, এমনকি চোরও ধরে দিয়েছেন, এবারে মূর্তিটাও দয়া করে উদ্ধার করে দিন। নইলে আপনাকে ছাড়ছি না।”

 

খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। ঘড়ি দেখে বললেন, “বারোটা বাজে। কাল আমি ঘুমোইনি। কিরণবাবুও সারারাত জেগে ছিলেন। এখন আমরা ঘরে গিয়ে ঝাড়া তিন ঘন্টা ঘুমোব। নিরু, সাড়ে তিনটেয় যদি আমাদের বেশ কড়া করে দুকাপ কফি দাও তো বড্ড ভাল হয়। দুধ দেবে না, চিনিও দেবে না। স্রেফ কড়া লিকার।”

 

ঠিক সাড়ে-তিনটেতেই টোকা পড়ল। আমরা অবশ্য তার খানিক আগে ঘুম থেকে উঠে, চোখ-মুখ ধুরে একেবারে রেডি হয়েই ছিলুম। ঘন্টা তিনেক একটানা ঘুমিয়ে নেওয়ায় শরীরটাও বেশ ঝরঝরে লাগছিল আমার। দরজা খুলে দিতেই কফি নিয়ে নিরু এসে ঢুকল; তার পিছনে পিছনে সত্যপ্রকাশও এসে গেলেন।

 

টেবিলের উপরে ট্রে-টা নামিয়ে রেখে নিরু বেরিয়ে যাওয়ার পরে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আমি মশাই দুধ-চিনি ছাড়া কফি খেতে পারি না। ও-বস্তু আপনারা খান, আমার কফি আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি।”

 

পট থেকে দুটো পেয়ালায় ব্ল্যাক কফি ঢেলে একটা পেয়ালা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই, তারপ নিজের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সত্যপ্রকাশকে বললেন, “আপনিও একটু ঘুমিয়ে নিয়েছেন তো?”

 

“তা নিয়েছি, কিন্তু ব্যাপারটা এখনও বোঝা গেল না। মানে সবটা আপনি এখনও বুঝিয়ে বলেননি।”

 

“ওই মিথ্যেকথা বলবার ব্যাপারটা তো?’

 

“হ্যাঁ, গোবিন্দ ছাড়া আরও অন্তত তিনজন নাকি মিথ্যেকথা বলেছে। তার মধ্যে খুড়োমশাইয়ের

 

কথাটা আপনি মনে হচ্ছে ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু বাকি দুজন কে?”

 

“বাকি দুজনের একজন অবশ্যই রঙ্গনাথ।”

 

“সে কী।” সত্যপ্রকাশ যেন আঁতকে উঠলেন। ‘উনি তো নিপাট ভালমানুষ!”

 

“রনাথবাবু যে খারাপ মানুষ, তা তো আমি বলিনি, মিঃ চৌধুরি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পরোপকারী লোক, গাঁয়ের লোকেরা সেজন্যে ওঁকে মান্যিও নেহাত কম করে না।…..কী জানেন, আপদে-বিপদে পরামর্শ দিতে পারেন, হাতের কাছে এমন কেউ থাকলে লোকে স্বস্তি পায়, সেটাই স্বাভাবিক। তা আপনি তো মশাই বলতে গেলে শিলিগুড়িতেই থাকেন, গাঁয়ের লোকেবা হাতের কাছে আপনাকে পাচ্ছে কোথায়, তাই পরামর্শ নেবার দরকার হলে ওঁর কাছে ছুটে যায় তারা। মঙ্গলবার সকালে ওঁর বাড়িতে গিয়েছিলুম তো, বেশিক্ষণ বসিনি, কিন্তু তারই মধ্যে দেখলুম যে, গাঁয়ের এক চাষি-বউ ওঁর কাছে পরামর্শ নিতে এসেছে। কিরণবাবুও দেখেছেন ব্যাপারটা।”

 

আমি বললুম, “দেখেছি, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারিনি। রঙ্গনাথবাবু ওই যে বললেন, যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো, ও কথাটার অর্থ কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রঙ্গনাথবাবু তখন ঘরের মধ্যে কথা বলছিলেন, আর আমরা বসে ছিলুম দাওয়ায়। তাঁর কথার সবটা আপনি শোনেননি, তাই যেটুকু শুনেছেন, তার ভুল অর্থ করেছেন। কনটেক্সট থেকে আলাদা করে নিয়ে কোনও-কিছুর অর্থ করার ওই হচ্ছে মস্ত বিপদ। সবটা শুনলে বুঝতে পারতেন যে, এটা একেবারেই অন্য ব্যাপার।”

 

“অন্য ব্যাপার মানে কী ব্যাপার?”

 

“একটা পারিবারিক সমস্যার ব্যাপার।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওই যে চাষিবউটিকে দেখলেন, ওর মেয়ের বিয়ে হয়েছে পাশের গাঁয়ে, কিন্তু শাশুড়ির সঙ্গে মেয়েটির বনিবনা হচ্ছে না, একটু-আধটু অশান্তিও হয়ে থাকবে, তাই বোধহয় কাউকে দিয়ে বাপের বাড়িতে খবর পাঠিয়েছিল। আর মেয়ের বাপও অমনি ছুটে গিয়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে এখানে নিয়ে এসেছে। এ হল দিন দশ-বারো আগের ব্যাপার। তা এই দশ-বারো দিনের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ আর মেয়েটিকে ফিরিয়ে নিতেও আসেনি, খোঁজখবরও করেনি। মেয়ের বাপ সম্ভবত গোঁয়ার টাইপের লোক। কিন্তু মা’টি বুদ্ধিমতী, সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে, লক্ষণ সুবিধের নয়। তাই রঙ্গনাথকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল যে, এখন কী করা উচিত। রঙ্গনাথও বুঝতে পেরেছেন, গোঁয়ার্তুমির ফল ভাল হবে না, তাই বললেন, ‘যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেইখানেই আবার রেখে এসো।’ অর্থাৎ মেয়েটিকে আবার নিজেরাই গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসবার পরামর্শ দিলেন তিনি। আমার তো মনে হয়, ঠিক-পরামর্শই দিয়েছেন।”

 

যাচ্চলে, এই ব্যাপার। আর আমি কিনা ভাবছিলুম যে, মনসামূর্তি ওই চাষিবউটি চুরি করেছে, আর রঙ্গনাথ তাকে পরামর্শ দিচ্ছেন মূর্তিটিকে আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে রেখে আসতে।

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হল, কিন্তু মিথ্যে কথাটা উনি কী বললেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুনুন তা হলে। ভদ্রলোক তো মানুষ মোটেই খারাপ নন, আপনি ওঁকে কাজ দিয়েছেন, বুড়ো বয়সে মাথা গোঁজার মতো একটা আশ্রয়ও দিয়েছেন, রঙ্গনাথ তার জন্যে কৃতজ্ঞও খুব। তবে কিনা ওঁর কোনও দুঃখ নেই, সেইটে জানাবার জন্যে ওই সেদিন সকালেই কথায়-কথায় উনি বলে বসলেন যে, ছেলেপুলের ঝামেলা ওঁদের নেই তো, তাই আপনি যে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ওঁদের জন্যে, ওঁরা বুড়োবুড়ি সেখানে দিব্যি আছেন। তা ওঁরা আছেন ঠিকই, তবে কিনা ওই যে উনি বললেন, ছেলেপুলের ঝামেলা নেই, ওই কথাটা কিন্তু সত্যি নয়। রামদাসের কাছে শুনলুম, রঙ্গনাথের একটি ছেলে আছে; শুধু তা-ই নয়, ছেলেটাকে নিয়ে ঝামেলাও আছে বিস্তর। তখন মনে হল, সেই ছেলেটা? এই মূর্তিচুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় তো, আর ছেলেপুলের ঝামেলা নেই বলে রঙ্গনাথ সেই ছেলের অস্তিত্বকে আমাদের কাছে গোপন করতে চাইছেন না তো?” শুনে সত্যপ্রকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “কিছুই দেখছি আপনার নজর এড়ায় না। তা খুড়োমশাই আর রঙ্গনাথের ব্যাপারটা তো বুঝলুম, তৃতীয় মিথ্যুকটি কে?”

 

“তৃতীয়জনের কথা পরে হবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আগে বরং গোবিন্দর কথাটাই বলি। মঙ্গলবার সকালে আপনার ঘরে বসে যখন কথা হচ্ছিল, তখন রামদাস বলল, আর-কেউ কিছু শুনতে পায়নি বটে, তবে গোবিন্দ নাকি বাগানের দিক দিয়ে লোকজন ছুটে পালাবার শব্দ শুনেছিল। একই দিক থেকে পেয়েছিল একটা গাড়ির শব্দও। মঙ্গলবার রাত্তিরে গোবিন্দুকে জিজ্ঞেস করতে সেও বলল যে, হ্যাঁ, লোকজন ছুটে পালাবার আর একটা গাড়ি স্টার্ট নেবার শব্দ সে শুনেছিল ঠিকই। সেই সঙ্গে এটাও বলল যে, শব্দ এসেছিল ফলের বাগানের দিক থেকে। একেবারে ডাহা মিথ্যে কথা!”

 

“কী করে বুঝলেন?

 

“আরে মশাই, এমন শব্দ যদি হতই, তা হলে একা গোবিন্দ কেন, অন্যেরাও তা শুনতে পেত। নিরু তো পেতই, রামদাসও পেত। শুনতে পেতেন মা আর পিসিমাও। মিঃ চৌধুরি, আপনি সম্ভবত ভাবছেন যে, রামদাস, মা আর পিসিমা বুড়ো মানুষ, কানে খাটো, তাই কিছু শুনতে পাননি, তাই না?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হতেই পারে।’

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “না, পারে না। রামদাস যে কানে মোটেই খাটো নয়, পরশু রাতে ওদের ঘরের পিছনে টল মারতে গিয়েই সেটা আমি টের পেয়েছি। অন্ধকারে আমাকে দেখতে পায়নি ঠিকই, কিন্তু সামান্য একটু পায়ের শব্দ হয়েছে।ক হয়নি, তাতেই দেখলুম ঘরের ভিতর থেকে রামদাস হঠাৎ ‘কে ওখানে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। এবারে মা আর পিসিমার কথা বলি। কাল সকালে দেখলুম ননদ-ভাজে কথা হচ্ছে। একজন কথা বলছেন উঠোনের টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে, আর অন্যজন কথা বলছেন রান্নাঘর থেকে। দুটো জায়গার মধ্যে দূরত্ব অন্তত পনেরো ফুট, কেউ যে খুব উঁচু গলায় কথা বলছিলেন তাও নয়, অথচ দুজনের কারুরই যে অন্যের কথা শুনতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে, এমন কিন্তু মনে হল না। আর নিরুর কথা তো ছেড়েই দিচ্ছি। এঁরা কেউই কিন্তু কোনও শব্দ শোনেননি। শুনেছে নাকি একমাত্র গোবিন্দ। আসলে গোবিন্দও কিছু শোনেনি।”

 

“তা হলে সে শুনেছে বলল কেন?”

 

“বলল আমাদের সন্দেহটাকে একেবারে অন্য দিকে চালান করে দেবার জন্যে। কিন্তু মিথ্যেটাও একটু ভেবেচিন্তে বলবে তো। গোবিন্দ কিন্তু ভাবনাচিন্তার ধারই ধারেনি ফলে সে ধরা পড়ে গেল। গোবিন্দ যদি হ্ শব্দ শোনার কথা বলত, তাতেও হয়তো আমার ততটা সন্দেহ হত না, অন্তত তক্ষুনি-তক্ষুনি হত না; এমনকি যদি ও বলত যে, লোক পালাবার আর গাড়ি স্টার্ট নেবার শব্দটা এ-বাড়ির দক্ষিণ দিক থেকে অর্থাৎ রাস্তার দিক থেকে এসেছিল, তবে সেটাও হয়তো তখনকার মতো আমি বিশ্বাস করে নিতুম। ভাবতুম যে, হবেও বা, ভোর-রাত্তিরে এ-বাড়ির বাদবাকি সবাই এমন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল যে, শব্দটা তারা শোনেনি। কিন্তু ওই যে গোবিন্দ বলল, লোক পালাবার আর গাড়ির স্টার্ট নেবার শব্দটা এসেছিল বাগানের দিক থেকে, তাতেই আমি বুঝে গেলুম যে, লোকটা একেবারে ঘোর মিথ্যেবাদী।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “কেন, বাগানের দিক দিয়েও তো পালানো যায়। ওদিক দিয়েও তো পৌঁছনো যায় রাস্তার উপরে।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা যায়, কিন্তু মাটিতে সে-ক্ষেত্রে মানুষের পায়ের আর গাড়ির টায়ারের ছাপ থাকবে তো। সেটা আরও এইজন্যে থাকবে যে, যে-দিন চুরি হয়, তার আগের কদিন এখানে খুব বৃষ্টি হয়েছিল শুনলুম। এমনকি, আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছই, উঠোন দুটো তার মধ্যে শুকিয়ে খটখটে হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু বড়-বড় সব গাছপালার আওতায় ছিল বলে বাগানের মাটি তখনও ভাল করে শুকোয়নি। অথচ সেখানে না দেখলুম কারও পায়ের ছাপ, না দেখলুম কারও জুতোর ছাপ, না দেখলুম কোনও গাড়ির টায়ারের ছাপ।”

 

গোপালের মা ইতিমধ্যে চা আর ঘরে-ভাজা নিমকি দিয়ে গিয়েছিল। আমি একটা নিমকি তুলে নিয়ে বললুম, “তারপর?”

 

ভাদুড়িমশাই ঢায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “তারপর আর কী, চাবিটা তো আগেই দেখেছিলুম।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ঠিক, ঠিক, ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। চাবিটা দেখেই আপনি বলেছিলেন, ‘বুঝেছি’। ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুলে বলবার তো কিছু নেই। চাবির গায়ে অল্প-একটু মাটি লেগে ছিল, কাদামাটি শুকিয়ে গেলে যেমন হয় সেইরকম আর কি। ওই মাটি দেখেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। অথচ শুনলুম, চাবিটা রঙ্গিলা সব সময়ে যত্ন করে নিজের কাছে রাখত, কক্ষনো হাতছাড়া করত না। তবে হ্যাঁ, আপনি তো মঙ্গলবার শিলিগুড়ি গেলেন, কথায়-কথায় রামদাস সেদিন বলল যে, চাবিটা এর মধ্যে একদিন ঘন্টাখানেকের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিল। কবে? না বুধবার ভোর রাত্তিরে তো চুরিটা হল, এটা তার দু’দিন আগের অর্থাৎ সোমবারের ঘটনা। কোথায় পাওয়া গেল? না হোম করবার জেন্য আনা নরম মাটির উপরে।”

 

“তাতে কী বুঝলেন?”

 

“বুঝলুম যে, চাবিটা আসলে হারায়নি, ওটাকে সরানো হয়েছিল। সরিয়ে ওই মাটির উপরে রেখে দেওয়া হয়েছিল। আর রাখবার সময়ে একটু চাপও দেওয়া হয়েছিল, নরম মাটির উপরে যাতে চাবিটার একটি ছাপ পড়ে যায়। গোবিন্দ নিশ্চয় মাঝে-মাঝেই হাসিমারায় তার মামাতো দাদার কাছে যেত, তাই না?”

 

“তা যেত বই কী।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “মাঝে-মাঝেই যেত।”

 

“বাঃ, তা হলে তো কথাই নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, নরম মাটিতে তো চাবির ছাপ পড়েছিল, শুকিয়ে যাবার পরে সেইদিন কি তার পরদিন সেই মাটি নিয়ে হাসিমারায় গিয়েছিল গোবিন্দ। গিয়ে সেখানকার কোনও কামারশালা থেকে সে নিশ্চয় ওই ছাপমতন একটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে আনে। ফলে তাকে আর তালা ভাঙতে হয়নি, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়েই ভোর-রাত্তিরে গিয়ে ঠাকুরঘরের তালা খুলে সে ভিতরে ঢুকেছিল।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওরেব্বাবা, এই ব্যাপার? তারপর?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপরেই দেখা দিল সমস্যা। এমনই যোগাযোগ যে, রঙ্গিলা সেদিন নিশ্চয়ই অন্যান্য দিনের চেয়ে আরও খানিক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। ঠাকুরঘর থেকে একটা শব্দও পেয়েছিল নিশ্চয়। তাই তক্ষুনি সে মন্দিরের দিকে ছুটে যায়, আর গিয়েই পড়ে যায় গোবিন্দর সামনে। বেদী থেকে মূর্তি তুলে নিয়ে গোবিন্দ তখন পালাচ্ছে। সেই অবস্থায় রঙ্গিলাকে জখম না-করে আর তার উপায় কী। একেবারে খতম করতেই চেয়েছিল, তবে পারেনি। কী দিয়ে জখম করল ভেবে দেখুন।”

 

আমি বললুম, “সেটা পরে ভাবলেও চলবে। আগের কথাটা আগে ভাবা দরকার। মুর্তিটা গেল কোথায়?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোথায় গেল, সে তো ভাবতেই হবে। কিন্তু তারও আগে যা ভাবা চাই, তা হচ্ছে গেল কী কবে? যদি ভুটানে কি নেপালে কি কলকাতায় ও-মূর্তি পাচার হয়ে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, কাজটা একা গোবিন্দর নয়, তার অন্তত একজন সঙ্গী ছিল। কেন না, গোবিন্দ তো আর মুকুন্দপুর থেকে কোথাও যায়নি।……দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। রঙ্গিলা চেঁচিয়ে উঠল, তাকে জখমও করা হল। কিন্তু রঙ্গিলার চিৎকার শুনে রামদাস যে একেবারে তক্ষুনি সেখানে ছুটে আসতে পেরেছিল তা তো নয়, ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে আলো জ্বেলে তবেই সে আসে। ইতিমধ্যে অন্তত দেড়-দুই মিনিট সময় নিশ্চয় কেটে গিয়ে থাকবে। হতে পারে যে, তারই মধ্যে সেই সঙ্গীর হাত দিয়ে মূর্তিটা পাচার করেছে গোবিন্দ। সঙ্গী সরে পড়ে, কিন্তু গোবিন্দ পালায় না। মন্দির থেকে সে বেরিয়ে এসেছিল, ঢুকেও পড়েছিল নিঃশব্দে নিজের ঘরের মধ্যে। কিন্তু আলো নিয়ে রামদাস তার ঘর থেকে বেরোবার সঙ্গে-সঙ্গে গোবিন্দও নিজের ঘর থেকে আবার এমনভাবে মন্দিরের দিকে ছুটে যায়, যেন সেও ওই চিৎকার শুনেই তার ঘর থেকে ছুটে এসেছে।…..এ হল রিকনস্ট্রাকশন। যা আমরা চোখে দেখিনি, অনুমানের ভিত্তিতে তাকে আমরা রিকনস্ট্রাকট করে নিলুম, ঐতিহাসিকেরাও এইভাবে অনেক প্রাচীন ঘটনার চেহারাকে আবার নতুন করে বানিয়ে নেন। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে যে ঠিক এইরকম হয়েছিল, তা আমার মনে হয় না।”

 

“কেন হয় না?” সত্যপ্রকাশ জিজ্ঞেস করলেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দি রিজন ইজ সিম্পল। গোবিন্দর যদি সত্যি কোনও সঙ্গী থাকত, তা হলে কেউ যখন কারও পালানোর শব্দ শোনেনি, গোবিন্দও তখন আগ বাড়িয়ে ওই অন্য-লোকের পালানোর শব্দ শুনতে পাবার কথা বলত না। না মশাই, আমার ধারণা, গোবিন্দ এ-কাজ একাই করেছে, আর সন্দেহটা যাতে তার উপরে না পড়ে, তারই জন্যে বলেছে যে, অন্য লোকজনের পালানোর শব্দ সে শুনেছিল।’

 

বললুম,”মূর্তি তা হলে বাইরে পাচার হয়নি?”

 

“হয়নি বলেই তো মনে হয়।”

 

সত্যপ্রকাশ ব্যাকুলভাবে বললেন, “মূর্তিটা তা হলে কোথায়?”

 

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বড় রহস্যময় সেই হাসি। একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “আমি তো গতকার নই, তাই মূর্তিটি এখন কোথায়, খড়ি পেতে তা আপনাকে বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, আন্দাজ একটা করতে পারি। আন্দাজের কথাটা যে আপনাকে জানাইনি, তাও নয়, দুপুরবেলায় খাবার ঘরে বসেই জানিয়েছি যে, মূর্তি এখন বিশ বাঁও জলের তলায়।”

 

“তার মানে সেটা আর পাওয়া যাবে না?” আর্ত গলায় সত্যপ্রকাশ জিজ্ঞেস করলেন।

 

“যাবে,যাবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার আন্দাজে যদি ভুল না থাকে তো নিশ্চয় পাওয়া যাবে।”

 

“কোথায় পাওয়া যাবে?”

 

“অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? এক বাঁও মানে চার হাত, তা হলে বিশ বাঁওয়ের মানে দাঁড়াচ্ছে আশি হাত। তা আপনাদের ইঁদারাটা ঠিক অতটা গভীর না হলেও অন্তত দশ বাঁও গভীর তো হবেই।”

 

যেমন সত্যপ্রকাশ, তেমনি আমিও যেন ঘোর অন্ধকারের মধ্যে এতক্ষণে একটা আলোর রেখা দেখতে পেলুম। কিন্তু তবু যেন কথাটা বিশ্বাস করতে ঠিক ভরসা হচ্ছিল না। সত্যপ্রকাশ বললেন, “মূর্তিটিকে ইঁদারার মধ্যে ফেলে দিলে তো খুব জোরে একটা শব্দ হবার কথা। কিন্তু কই, তেমন কোনও শব্দ তো হয়নি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হবার কথা, কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি, সেটাও আন্দাজ করা কঠিন নয়। মূর্তির হাইট তো মাত্র এক ফুট। ওজনও তাই খুব বেশি নয়। ইঁদারার জলের লেভেলও বিশেষ নীচে নেমে যায়নি। তা মূর্তিটিকে একটা দড়িতে বেঁধে ইঁদারার জল পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে যদি দড়িটা ছেড়ে দিই, তো শব্দ হবে কেন? টুপ করে সেটা তলিয়ে যাবে। চৌধুরিমশাই, আর দেরি না করে ইঁদারায় লোক নামান।”

 

তা-ই নামানো হল। আর মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যেই ইঁদারা থেকে উঠে এল সেই কষ্টিপাথরের মনসামূর্তি। ভাদুড়িমশাই ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন। মূর্তির কোমরে লম্বা একটা দড়ি বাঁধা।

 

সত্যপ্রকাশের মা নরম মনের মানুষ। ব্যাপার দেখে আবার তিনি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। এবারকার কানা অবশ্য দুঃখের নয়, আনন্দের। পিসিমা বললেন, “মাগো, আমার ঠাকুর্দা তোমাকে মাটির তলা থেকে তুলে এনেছিলেন, আর আজ তোমাকে জলের তলা থেকে তুলে আনা হল। আর তুমি কোথাও চলে যেও না, মা, এই চৌধুরি-বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেও না।”

 

স্থির চোখে আমি মুর্তিটিকে দেখছিলুম। দেবীর ক্ষীণ কটিদেশ বেষ্টন করে তাঁর বক্ষের উপরে উঠে এসেছে একটি সাপ, আর সেই সাপের মুণ্ডটিকে দক্ষিণ হস্তে ধারণ করে দেবী তার প্রসারিত ফণার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেমন তাঁর চোখে, তেমনি তাঁর ওষ্ঠের বঙ্কিম ভঙ্গিমায় একটু হাসির আভাস। সে-হাসি স্নেহের হতে পারে, প্রশ্রয়ের হতে পারে, আবার কৌতুকেরও হতে পারে।

 

সত্যপ্রকাশের ড্রইংরুমের আমরা বসে আছি। এ হল ঘন্টা-দুই পরের কথা। ইতিমধ্যে রঙ্গনাথবাবুকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। মূর্তি আবার শোধন করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নতুন একজন পুরোহিতেরও দরকার হবে, এইসব ব্যাপার নিয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল তাঁর। রঙ্গনাথ কথা দিয়ে গিয়েছেন, ব্যবস্থা যা যা করবার, তিনিই সব করে দেবেন। ধূপগুড়িতে তাঁর খুব চেনা একটি পরিবার নাকি রয়েছে, তাঁদের পেশাই হল পুজো-আচ্চা করা, বিশ্বাসী লোক, তাঁদেরই কাউকে এখানে নিত্য-পূজার জন্যে তিনি আনিয়ে দেবেন, সত্যপ্রকাশকে ও-সব নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না।

 

এসেছিল গোবিন্দর সেই মামাতো দাদাটিও। সে বলল, গোবিন্দর শ্রাদ্ধশাস্তির জন্যে অন্তত হাজার খানেক টাকা দরকার। নিরুকে ডেকে সত্যপ্রকাশ বলে দিলেন, পিসিমার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে সে যেন গোবিন্দর মামাতো দাদাকে দিয়ে দেয়।

 

ঘরে এখন শুধুই আমরা তিনজন মানুষ। সত্যপ্রকাশ ভাদুড়িমশাই আর আমি। সত্যপ্রকাশ ভাদুড়িমশাইকে বললেন, “অনুমতি দেন তো একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”

 

“করুন না। যা খুশি জিজ্ঞেস করুন। অত কিন্তু-কিন্তু করছেন কেন?”

 

“মানে ওই যে ডাক্তারবাবু আজ সকালবেলায় এসে বললেন, থ্যাঙ্ক গড, গোবিন্দকে রিভলভারের গুলি খেয়ে মরতে হয়নি, ও-কথাটার অর্থ কী? আপনি কি সত্যি রিভলভার নিয়ে চোরের প্রতীক্ষায় বসে ছিলেন নাকি?”

 

“তা ছিলুম বই কী, তবে কিনা সেটা ‘একটা জাপানি টয়-রিভলভার, শিলিগুড়ির হংকং-বাজার থেকে কাল কিনে নিয়ে এসেছিলুম। না মশাই, ওটা ভয় দেখাবার অস্ত্র, মারবার অস্ত্র নয়।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর মুখ তুলে তীব্র চোখে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিঃ চৌধুরি, কথাটা যখন উঠল, তখন বলা-ই ভাল। যে রিভলভার দিয়ে মানুষ মারা যায়, আমার তা নেই ঠিকই, তবে আপনার বোধহয় আছে। যদি বলি যে, তা-ই দিয়ে একটা মানুষকে আপনি মেরেওছেন, তা হলে কি ভুল বলা হবে? অবশ্য মানুষ না বলে তাকে অমানুষও বলা যায়।”

 

সত্যপ্রকাশ চমকে উঠলেন। বললেন, “তার মানে?”

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর চোখ সরিয়ে নিলেন না, যে-ভাবে সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, ঠিক সেইভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, “মানেটা মোটেই জটিল নয়, মিঃ চৌধুরি, ববং খুবই সহজ। কাল তো আমি শিলিগুড়িতে বেশিক্ষণ থাকিনি, নেহাত ঘন্টা কয়েক ছিলুম। কিন্তু তারই মধ্যে জোগাড় করেছি দুটো জরুরি খবর। প্রথম খবরটা এই যে, রাজদেও কুর্মির উপরে জগদীশ কেন, কেউই ছোরাছুরি চালায়নি; আসলে কুলি-বস্তির কাছাকাছি সেই অন্ধকার রাস্তায় সেদিন রাত্তিরে তাকে গুলি করে মারা হয়েছিল। শিলিগুড়িতে শুনলুম ব্যাপারটা নিয়ে তখন হৈ-চৈ হয়েছিল খুব।”

 

সত্যপ্রকাশ কিছুই বলছিলেন না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে তা হলে দ্বিতীয় খবরটা বলি। সেটা এই যে, রাজদেও ছিল সম্পৎলালের ডান হাত। সুতরাং সম্পৎ যে এই খুনের বদলা নেবে, এটাই স্বাভাবিক। বদলা নেবার কথাটা সে নাকি প্রকাশ্যে বলেওছিল। কীভাবে বদলা নেবে? না আদালতে সে প্রমাণ করে ছাড়বে যে, জগদীশ খুনি নয়, সে ছুরি চালাতে পারে ঠিকই, কিন্তু জীবনে কখনও ফায়ার আর্মস চালায়নি, আসলে সে অন্যের হয়ে আসামি সেজে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।”

 

সত্যপ্রকাশ চুপ। পাথরের একটা মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে তিনি বসে আছেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “সম্পৎলাল নাকি এমন কথাও তখন তিনবাত্তির মোড়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল যে, আদালতে সে-কথা যদি প্রমাণ করা না-ও যায়, তো রাজদেওয়ের খুনির তাতেও রেহাই মিলবে না। তাঁকে তো সে চেনেই, ওই তিনবাত্তির মোড়েই সে তাঁর মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে।”

 

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আসলে কিন্তু কিছুই হল না। জগদীশ রিভলভার চালাতে জানে কি না, আদালতে তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই তুলল না কেউ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জগদীশ বলল, সে-ই গুলি চালিয়ে রাজদেওকে মেরেছে, আর তার হয়ে লড়বার জন্যে কলকাতার যে নামজাদা ল-ইয়ারকে লাগানো হয়েছিল, তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন যে, গুলি না-চালিয়ে জগদীশের উপায় ছিল না, হি হ্যাড টু ডু ইট ইন সেলফ ডিফেন্স। এদিকে সম্পৎলালও দেখা গেল নট নড়ন-চড়ন নট কিচ্ছু। অত তো সে লম্ফঝম্প করেছিল; বলেছিল যে, বদলা নিয়ে ছাড়বে। কাজের বেলায় সে কিন্তু কিছুই করল না। না গেল আদালতে সাক্ষ্য দিতে, না ওড়াল তিনবাত্তির মোড়ে আসল-খুনির খুলি।”

 

সত্যপ্রকাশের মুখ একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ঘরের মধ্যে এমন জমাট নৈঃশব্দ্য যে, একটা পিন পড়লেও বোধ করি তার শব্দ শোনা যেত। সেই স্তব্ধতাকে ভাদুড়িমশাই-ই ভাঙলেন। বললেন, “ঘটনাটাকে সম্ভবত এই চেহারা দেওয়া হল যে, রিভলভারটা আপনারই, কিন্তু দিন-কয়েক আগে সেটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। তাই না?”

 

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “হ্যাঁ।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, সত্যপ্রকাশবাবু। যদ্দুর বুঝতে পারছি, জগদীশ অমানুষ নয়। সে যখন জেল খাটছিল, তার সংসারকে তখন আপনিই দেখেছেন। তার ছেলেকে আপনার কাঠের কারবারে চাকরি দিয়েছেন বলেও শুনেছি। জগদীশ কৃতজ্ঞ মানুষ, আসল কথাটা সে প্রাণ গেলেও কাউকে বলবে না। আর আমার কথা যদি জিজ্ঞেস করেন তো বলি, রাজদেও কুর্মি কীভাবে মারা গেল, ছুরি খেয়ে না গুলি খেয়ে, তার তদন্ত করতে তো ডাকা হয়নি আমাকে। আমি এসেছিলুম মূর্তি-চুরির তদন্তের কাজ নিয়ে, তো সে-কাজ মিটে গেছে। ব্যাস, অন্য কোনও ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাতে যাব কেন?”

 

ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে গিয়ে সত্যপ্রকাশের মুখচোখ আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। বললেন, “রাজদেওকে মেরে কি আমি অন্যায় করেছি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা আপনার হিসেব, আপনি আমার চেয়ে ভাল বুঝবেন, আমার কিছু না-বলাই ভাল। আমি বরং আমার একটা আন্দাজের কথা বলি।”

 

“বলুন।”

 

“সম্পৎলাল যে আদালতেও গেল না, সরাসরি বদলাও নিল না, তার কারণ আর কিছুই নয়, ইউ সিম্পলি পারচেজড ইয়োর প্রোটেকশান। সম্পৎলালও বুঝে গিয়েছিল যে, আপনাকে জেলে পাঠিয়ে কি খুন করে ‘তার লাভ নেই, তার চেয়ে বরং আপনি বহাল-তবিয়তে থাকলেই তার সুবিধে। তা গত পাঁচ বছর ধরেই সে আপনাকে চুষে খাচ্ছিল, তাই না?’

 

করুণ হেসে সত্যপ্রকাশ বললেন, “চুষে চুষে আমাকে একেবার ছিবড়ে করে ফেলেছিল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, সম্পৎলাল তো মরেছে, সুতরাং সে-দিক থেকেও এখন আপনি নিশ্চিন্ত। যা-ই হোক, এখন তা হলে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, তৃতীয় মিথ্যেবাদীটির নাম আমি করছিলুম না কেন?”

 

“বুঝেছি।” সত্যপ্রকাশ বললেন, “আপনি টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে, আমিই সেই তৃতীয় ব্যক্তি।” ভাদুড়িমশাই হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, “বিলক্ষণ। রাজদেওয়ের মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ে আপনি মিথ্যে কথা বলেছিলেন, সম্পৎলালের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ব্যাপারেও আপনি সত্য গোপন করেছিলেন। আর হ্যাঁ, নিরুর ব্যাপারেও আপনি সত্যি কথা বলেননি।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেটাও আপনি বুঝতে পেরেছেন?”

 

“বুঝব না কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি বলেছিলেন, নিরু এ-বাড়িতে বছর-দশেক হল কাজে ঢুকেছে। অথচ আমি জানতে পারলুম যে, নিরু এ-বাড়িতে কাজ করছে মোটামুটি পাঁচ বছর। আর, কাজের মেয়ে বলতে যা আপনি বুঝিয়েছেন, নিরু যে সত্যি তা নয়, আসলে সে যে আপনার স্বৰ্গতা স্ত্রী সুভাষিণী দেবীর ছোট বোন, সে তো ওই ফোটোতে আপনার স্ত্রীর মুখ দেখেই আমি বুঝেছি।”

 

সত্যপ্রকাশ মস্ত একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “ভুল করেছি। নিরুর ব্যাপারে আগাগোড়া আমি ভুল করেছি!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো করেইছেন। কিন্তু সেটা যখন বুঝতে পেরেছেন, তখন দয়া করে আর সেই ভুলের জের টেনে চলবেন না। মা আর পিসিমাকে আজই জানিয়ে দিন যে, ও নিরু নয়, হাসি। আর ওকে ছাড়া যে আপনার চলবে না, সেও তো আমি প্রথম দিনই বুঝতে পেরেছি। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে না-করার যে-সব কারণ আপনি দেখিয়েছেন, তার একটাও তো সত্যি নয়, আসল কারণ হল হাসি, যার জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে আপনি জড়িয়ে ফেলেছেন। তা আমি বলি কী, হাসিকে আপনি বিয়ে করে ফেলুন। লোকে কী বলবে না-বলবে, তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমার তো ধারণা, যেমন আপনাব মা আর পিসিমা, তেমনি আপনার ছেলেময়েরাও তাতে খুশিই হবে। হাসির আসল পরিচয় এ-বাড়িতে একমাত্র রামদাস জানে, এবারে অন্যদেরও জানিয়ে দিন।”

 

সত্যপ্রকাশ কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, ভাদুড়িমশাই তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “আর কথা নয়, চলুন রঙ্গিলাকে একবার দেখে আসা যাক।”

 

ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের উঠোনে পৌঁছে দেখলুম, ঝুমরি আজও শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভাদুড়িমশাই তার দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর রঙ্গিলাদের ঘরের পিছনে কুড়িয়ে-পাওয়া সেই চুলের কাঁটা তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে বার করে ঝুমরির দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, “এটা নিশ্চয় তোমার জিনিস। সোমবার রাত্তিরে সম্ভবত পিছনের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে তোমার মেয়েকে তুমি দেখতে গিয়েছিলে, আর রঙ্গিলার আয়াও নিশ্চয় তোমাকে দেখেই তখন ভূতের ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল। তা অমন অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে দেখবার দরকার কী, মেয়ে তো তোমারই। ভয় পেও না, আমার সঙ্গে এসো, তোমার মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে, কথা বলছে, তাকে দেখে যাও, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *