মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বত্রিশ
মহেশ্বর চৌধুরি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, কাকের মুখে খবর ছড়ায়। ঠিকই লিখেছিলেন। গোবিন্দকে যখন সাপে কাটে, রাত ফুরোতে তখনও কয়েক ঘন্টা বাকি। অথচ খবরটা দেখলুম রাত না-কাটতেই ছড়িয়ে পড়েছে। তা নইলে আর সূর্যোদয়ের আগেই চৌধুরি-বাড়ির বাইরের উঠোনে গাঁয়ের লোকেদের ভিড় জমে যাবে কেন।
সবার আগে এলেন রঙ্গনাথ। তারপরে একে-একে আরও অনেকে। সাধুবাবাকে অবশ্য কোথাও দেখতে পেলুম না। শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে, ত্রিশূল হাতে নিয়ে, ‘জয় শঙ্কর’ হাঁকার পেড়ে যিনি গোটা গাঁয়ে টহল মারতে বেরোন, খবরটা তো তাঁরই সবচেয়ে আগে পাবার কথা। অথচ তাঁকেই কিনা দেখতে পাচ্ছি না। ব্যাপার কী? রঙ্গনাথকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, বাগানের ধার দিয়ে আসবার সময়ে ভিতরে ঢুকে সাধুবাবাকে বারকয়েক ডেকেছিলেন, কিন্তু সাড়া পাননি। “দরজা খোলাই ছিল, কিন্তু মনে হল ভিতরে কেউ নেই; কে জানে হয়তো পাশের গাঁয়ে টহল মারতে গেছেন।”
ইতিমধ্যে নিরু একবার উঠোনেই আমাদের চা দিয়ে গিয়েছিল। মা আর পিসিমা খানিক আগে ভিতর-বাড়িতে চলে গিয়েছেন। আমরা আর উঠোন থেকে নড়িনি।
সত্যপ্রকাশের ফিরে আসতে-আসতে আটটা বাজল। একাই ফিরেছেন। তাঁর মুখচোখের ভাব দেখেই সব বোঝা যাচ্ছিল, আগ বাড়িয়ে তাই আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলুম না। শুধু ভাদুড়িমশাই বললেন, “গোবিন্দর আত্মীয়স্বজনদের একটা খবর দেওয়া দরকার।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “হাসিমারায় ওর এক দাদা থাকে। বলত তো মামাতো দাদা, তবে গোবিন্দর আপন মামার ছেলে কি না, তা জানি না। যাই হোক, বর্ধমানের গ্রামে খবর পাঠাবার দায়িত্ব সে-ই নিয়েছে।” তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ডাক্তার সরকারের বাড়ি তো পথেই পড়ে, ঘুম থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে হেল্থ সেন্টারে গিয়েছিলুম। এ-সব হেল্থ সেন্টারের স্টকে তো বলতে গেলে কোনও ওষুধই থাকে না, তা অ্যান্টি-ভেনম সিরাম ছিল, যাওয়ামাত্র ইঞ্জেকশান দেওয়াও হয়েছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, ভোর হবার আগেই সব শেষ।”
“ডেড বডি এখন কোথায়?”
“হেলথ সেন্টারেই ছিল। তা সেই দাদা নিশ্চয় লোকজন জুটিয়ে এনে এতক্ষণে সেখান থেকে শ্মশানে নিয়ে গেছে। আমি তো একেবারে একবস্ত্রে এখান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলুম, টাকা পয়সা নিয়ে যাবারও সময় পাইনি। অথচ এখন কিছু খর্চা-পত্তর হবে, তাই ডাক্তার সরকারের কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে গোবিন্দর দাদাকে দিয়ে এসেছি। এখনকার মতো ওতেই সব কুলিয়ে যাবে। এরপরে শ্রাদ্ধশান্তির জন্যে যা দরকার হয়, সবই দেব। গোবিন্দর দাদাকে বলেও দিয়ে এসেছি যে, শ্মশানের কাজ মিটে যাক, তারপর কাল যেন একবার সময় করে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে।”
নিরু আবার চা নিয়ে এসেছিল। চায়ের কাগটা হাতে নিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিরু, ডাক্তার সরকার একটু বাদেই একবার রঙ্গিলাকে দেখতে আসবেন। পিসিমার কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে রাখো, ডাক্তারবাবুর কাছে ধার করেছি, সেটা মেটাতে হবে।”
নিরু ভিতর-বাড়িতে চলে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “চলুন, আমরাও ভিতরে গিয়ে বসি।” বেলা বাড়ছে; তার সঙ্গে বাড়ছে রোদ্দুর। ইঁদারার চত্বরটা ছায়ায় ঢাকা বলে উঠোন থেকে খানিক আগে আমরা সরে এসেছিলুম। এবারে সত্যপ্রকাশের কথায় সেখান থেকে তাঁর ড্রইংরুমে এসে বসলুম।
সত্যপ্রকাশকে খুব টিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললেন, “গোবিন্দকে নিয়ে এখান থেকে রওনা হবার সময় তাড়াহুড়োর মধ্যে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু মনে হল যেন চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে রঙ্গিলার গলাও তখন পেয়েছিলুম। ওর জ্ঞান কি তা হলে ফিরে এসেছে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুরোপুরি ফিরেছে। কথাও বলছে খুব স্বাভাবিকভাবে।”
“বটে? এটা কী করে সম্ভব হল?”
ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। বলা হল না। মোটর-বাইকের শব্দ শুনে বোঝা গেল, ডাক্তারবাবু এসে পড়েছেন। ড্রইংরুম থেকে আমরাও তাড়াতাড়ি বাইরে চলে এলুম। ডাক্তারবাবু সরাসরি রঙ্গিলার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। রঙ্গিলার দৃষ্টি আজ স্বাভাবিক। ডাক্তারবাবুকে দেখে ক্লান্তভাবে একটু হাসলও। ডাক্তার সরকার তার জ্বর নিলেন, প্রেশার মাপলেন, চোখের পাতা টেনে দেখলেন, তারপর একগাল হেসে বললেন, “বাবা, খুব চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলি! কেমন লাগছে এখন?”
“খুব দুর্বল লাগছে।” রঙ্গিলা বলল, “কী হয়েছিল আমার?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “কেন, তোর কিছু মনে নেই?”
“না তো।”
ডাক্তার সরকার এক পলকের জন্যে আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর রঙ্গিলাকে বললেন, “শেষ-রাত্তিরে উঠেছিলি তো, ঘুম-চোখে ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলি।”
“কবে?”
“এই তো, কালই তো পড়ে গেলি। কেন, তোর মনে পড়ছে না?”
“কই, কিচ্ছু মনে পড়ছে না তো।”
“থাক, এখন আর কিছু মনে করবার দরকার নেই। চুপচাপ শুয়ে থাক। তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে উঠতে হবে। নইলে পুজোর কাজ কে কর1ে?”
“এখন পুজোর কাজ কে করছে?”
নিরু যে কখন ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করিনি। রঙ্গিলার কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “আমি করছি, তবে তোর মতো অত সুন্দর করে তো করতে পারি না। তাড়াতাড়ি তাই ভাল হয়ে ওঠ, তারপর তোর কাজ তুই বুঝে নে।”
রঙ্গিলার ঘর থেকে বেরিয়ে ফের সত্যপ্রকাশের বসবার ঘরে চলে এলুম আমরা। ডাক্তারবাবু আমাদের সঙ্গে এলেন। নিরু ইতিমধ্যে সত্যপ্রকাশকে একটা খাম দিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার সরকারের হাতে সেটা ধরিয়ে দিয়ে সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেই টাকাটা। ধার কক্ষনো ফেলে রাখতে নেই।…কিন্তু তা তো হল, রঙ্গিলাকে কেমন দেখলেন বলুন?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “যা দেখলুম, তাকে একটা মিরাকল বললেই হয়। ও একেবারে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। খুব দুর্বল, তবে তা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে।” তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কাল রাত্তিরেও তো ওকে দেখে গিয়েছিলুম। বাত্তিরের মধ্যেই যে ওর জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে আসবে, তা তো তখন কল্পনাও করতে পারিনি।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “সে কী, কাল রাত্তিরেই তো আপনি বললেন যে, জ্ঞান তো ফিরে আসছেই, সকালের মধ্যেই কথা বলতেও পেরে যাবে। এখন তা হলে এতে এত অবাক হচ্ছেন কেন?”
ডাক্তারবাবু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মশাই, বলব?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখন আর বলতে বাধা কীসের, বলেই দিন।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “তা হলে শুনুন মিঃ চৌধুরি, রঙ্গিলা সম্পর্কে কাল যা আমি বলেছিলুম, সেটা মোটেই ডাক্তার হিসেবে আমার ওপিনিয়ন নয়, ভাদুড়িমশাই আমাকে যা-যা বলতে হবে বলে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ঠিক তা-ই আমি কাল বলেছি।
কথাটা শুনে আমরা অর্থাৎ আমি আর সত্যপ্রকাশ তো অবাক। তারপর দু’জনে প্রায় একই সঙ্গে বললুম, “তার মানে?”
ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন। ঘড়ি দেখে সত্যপ্রকাশকে বললেন, “আমার একটা জরুরি কল রয়েছে, এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। মানেটা আপনারা বরং ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে জেনে নেবেন। যাবার আগে দুটো কথা বলে যাচ্ছি। প্রথম কথাটা এই যে, রঙ্গিলাকে নিয়ে সত্যি আর চিন্তার কিছু নেই। না, এটা কারও শেখানো কথা নয়, ডাক্তার হিসেবেই এটা বলছি। তবে ওকে এখন আসল কথা না জানানোই ভাল। আর দ্বিতীয় কথাটা এই যে, গোবিন্দর জন্যে দুঃখ করে লাভ নেই। লোকটা একে চোর, তায় অকৃতজ্ঞ, তার উপরে আবার রঙ্গিলাকে খুন করতে এসেছিল। ওকে সাপে কেটে এক পক্ষে ভালই হয়েছে। মরতে তো ওকে হতই,–”থ্যাঙ্ক গড, রিভলভারের গুলি খেয়ে মরতে হয়নি।”
কথাটা বলে ডাক্তারবাবু আর দাঁড়ালেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ভাদুড়িমশাই হাসছিলেন। সত্যপ্রকাশ বললেন, “ব্যাপারটা কী বলুন দেখি।”
হাসতে-হাসতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে মশাই, কাল শিলিগুড়ি যাবার পথেই হাসিমারায় গাড়ি থামিয়ে ডাক্তারবাবুকে আমি বলে গিয়েছিলুম যে, রঙ্গিলার জ্ঞান যে ফিরে আসছে, আর রাত্তিরের মধ্যেই যে সে কথাও বলতে পারবে, এই কথাটাই মুকুন্দপুরে এসে সক্কলের সামনে এঁদে বলতে হবে।”
“কেন, অমন কথা ওঁকে বলতে বলেছিলেন কেন?”
“সেটাও বুঝলেন না? রঙ্গিলাকে যে জখম করেছিল, তাকে আমি ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলুম। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, রঙ্গিলার জ্ঞান ফিরে আসছে আর শিগগিরই সে কথাও বলবে, ডাক্তারবাবুকে দিয়ে এই কথাটা সকলের সামনে বলিয়ে নিতে পারলেই মূর্তিচোর ভীষণ ভয় পেয়ে যাবে। ভয়টা যে শনাক্ত হবার, সে তো বুঝতেই পারছেন। আর সেই ভয়েই সে চেষ্টা করবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রঙ্গিলাকে খতম করে দেবার। ডাক্তারবাবুকে দিয়ে ওই কথাটা কেন বলিয়েছিলুম, এবারে সেটা ধরতে পেরেছেন আশা করি। আসলে ভয় পাইয়ে দিয়ে কালপ্রিটকে আমি রঙ্গিলার দিকে টেনে আনতে চেয়েছিলুম।”
“তাতে অবশ্য রঙ্গিলারও ভালই হল। তাই না?”
“তা তো হলই। হিতে বিপরীত বলে একটা কথা আছে না? এ হল তার উলটো ব্যাপার। বিপরীতে হিত। সাপে কেটেছে বুঝতে পেরে গোবিন্দ এমন ভীষণভাবে চেঁচিয়ে ওঠে যে, রঙ্গিলার ঘুম তাতে আচমকা ভেঙে গিয়েছিল। জেগে উঠে ও ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ওর গোটা চেতনায় ভয়ঙ্কর একটা ঝাঁকুনি লেগেছিল। তাতে ভালই হয়েছে—মানে একটা শক-থেরাপির কাজ হয়েছে। ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে, ও কথা বলতে পারছে। এ-রকম হয়।”
সত্যপ্রকাশ দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন। কার উদ্দেশে প্রণাম জানালেন, বুঝলুম না। সম্ভবত নিজের ভাগ্যকে, অথবা হয়তো মনসাদেবীকে। তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি, কালপ্রিট রঙ্গিলাকে খুন করতে আসবে, এইটে আঁচ করে যে আপনি ফাঁদ পেতে তার জন্যে ওখানে বসে অপেক্ষা করছিলেন তা তো বুঝলুম, কিন্তু গোবিন্দই যে কালপ্রিট, সেটা আপনি বুঝলেন কী করে?”
“বুঝিনি তো, সন্দেহ করেছিলুম মাত্র। তা সেটাও তো শুধু গোবিন্দকে নয়, আরও কাউকে-কাউকে করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। কী যেন ভাবলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর সত্যপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী জানেন, যখনই দেখি যে, কোনও একটা ক্রাইমের ঘটনার পরে-কাছে যারা ছিল, কিংবা সেটা করা যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, কিংবা সেই ঘটনাটা ঘটবার ফলে াদের পক্ষে লাভ হবার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ-একজন মিথ্যে কথা বলছে, আমাদের সন্দেহটাও তখন স্বাভাবিকভাবে তারই উপরে গিয়ে পড়ে। তা এ-ক্ষেত্রে আমি কী দেখলুম?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী দেখলেন আপনি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখলুম যে, মিথ্যেকণা যে শুধু গোবিন্দই বলছে, তা নয়, বলছেন অন্তত আরও তিনজন। আলিবাবার গপ্পোটা জানেন গে? ডাকাতরা এসে আলিবাবার বাড়ির দরজায় ঢ্যারা দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মর্জিনা তাদের মতলবটা বুঝতে পেরে সব বাড়িতেই ঢ্যারা দিয়ে রাখল। কেন? না আলিবাবার বাড়িটা তা হলে আর অলাদা করে চিনতে পারা যাবে না।। আমার হল উলটো ফ্যাসাদ। এত লোক যদি মিথ্যেকথা বলে, তো তাদের ভিতর থেকে চোরকে ‘মামি আলাদা করে চিনে নেব কী করে? কখনও যদি একে।ন্দেহ হয়, তো কখনও ওকে। তারপর তেবে দেখলুম যে, অনেকেই মিথ্যে বলছে বটে, তবে এক-একজন বলছে এক-এক কারণে। ছবিটা ত ন একটু-একটু করে পরিষ্কার হতে লাগল।”
নিরু এসে ঘরে ঢুকল। বলল, “আপনাদের জলখাবার দিতে বলি?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, ও সব পরে হবে। ভাল করে মুখই ধোয়া হয়নি, এখন কিছু দাঁতে কাটতে পারব না। ঘুমও ভাল হয়নি। বরং পারো তো বেশ কড়া করে একটু চা খাওয়াও দেখি।’
নিরু চা আনতে গেল। সত্যপ্রকাশ বললেন, “থামলেন কেন মিঃ ভাদুড়ি, বলে যান।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা বলছিলুম…….ওই মানে এক-এক জনের মিথ্যে এক-এক রকমের। প্রথমেই ধরা যাক সাধুবাবার কথা। আমি আপনাকে বলেছিলুম যে, অর্থলোভই হয়তো একমাত্র কারণ নয়, অন্য কোনও কারণেও মনসাব মূর্তিটি কেউ হয়তো সরিয়ে থাকতে পারে। এটা বলেছিলুম আপনারই মুখে এই কথাটা শুনে যে, মনসার উপরে উনি বেদম খাপ্পা। ভদ্রলোক শৈব সন্ন্যাসী। সাধনমার্গে কদ্দুর এগিয়েছেন ঈশ্বর জানেন, তবে কিনা ওঁর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলুম যে, মানুষটি বড় অসহিষ্ণু। তার উপরে আবার চাঁদসদাগরের সঙ্গে মনসার ঝগড়ার গপ্পোটা কে না জানে। উনিও জানেন। কিন্তু তার থেকে ওঁর এই একটা উদ্ভট বিশ্বাস জন্মে গিয়েছে যে, মনসাকে যে যত গালমন্দ করতে পারবে, শিবের সে তত বড় ভক্ত। তাই এক সময়ে আমার মনেও হয়েছিল যে, কী জানি, মনসামূর্তিটিকে উনিই হয়তো মন্দির থেকে সরিয়ে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। তার উপরে আবার এটাও দেখলুম যে, মানুষটির কথায় আর কাজে কোনও মিল নেই। কিরণবাবুকে সে-কথা বলেওছি। সাধুবাবা মুখে বলছেন যে, মুকুন্দপুরে সাপ নেই, এদিকে কিন্তু সাপের ভয়ে নিজের ঘরের চারদিকে কারবলিক অ্যাসিড ছড়াতেও তাঁর ভুল হচ্ছে না।”
আমি বললুম, “সত্যি সত্যপ্রকাশবাবু, ওঁর আখড়ায় সেদিন আমরা কারবলিক অ্যাসিডের ঝাঁঝালো গন্ধে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলুম।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা তো হল, কিন্তু মিথ্যে কথাটা উনি কী বললেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা যে আপনি ধরতে পারেননি, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। আপনাকে উনি জানিয়েছেন যে, কলকাতায় হস্টেল থেকে বেরিয়ে সেই যে এক সাধুর সঙ্গে উনি পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন, তারপর থেকে এতকাল উনি শুধু পশ্চিমের নানান তীর্থে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এদিকে একবারও আসেননি, বাংলার মাটিতে অ্যাদ্দিন বাদে এই প্রথম ফিরলেন। তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“এটাই তো একটা ডাহা মিথ্যেকথা।”
“কী করে বুঝলেন?”
“আরে মশাই, ওঁর কথা শুনেই সেটা বোঝা যায়। পঞ্চাশ বছর একটানা যদি উনি পশ্চিমে থাকতেন, তো ওঁর কথাবার্তার মধ্যে নির্ঘাত একটা পশ্চিমী টান এসে যেত। তা কিন্তু একেবারেই আসেনি। উনি যে বাংলা বলছেন, সে তো একেবারে চাঁচাছোলা বাংলা।”
চায়ের ট্রে নিয়ে নিরু এসে ঘরে ঢুকল। তারপর ট্রে-টা সেন্টার টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে একেবারে মুখস্থ বলার মতন করে বলল, “চা খেয়েই আপনারা চান করে নিন। জলখাবার খেতে হবে না; চান করে দুটি ডাল-ভাত মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে নিন কিছুক্ষণ। রাত্তিরে ঘুম হয়নি, এখন খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করুন। নইলে শরীর খারাপ হবে।
পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ-সব কথা তোমাকে কে বলতে বলল? মা, না পিসিমা?”
“পিসিমা।”
“ওরে বাবা,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা হলে তো একেবারে সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার। ঠিক আছে, ঠিক আছে, পিসিমাকে গিয়ে বলো, এক্ষুনি আমরা চান করে নিচ্ছি।”
