মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

একুশ

ঘরে ঢুকতেই ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “রঙ্গিলাকে কেমন দেখলেন?”

 

বললুম, “ঠিক বোঝা গেল না। কাল রাত্তিরে নাকি আবার জ্বর এসেছিল।’

 

“ডাক্তারবাবু কিছু বললেন?”

 

“বললেন যে, অবস্থা খুব-একটা ভাল নয়। তবে কিনা ওই রকমের কথাই তো আপনি তাঁকে বলতে বলেছিলেন। জ্বর যাতে আর না আসে, তার জন্যে একটা ক্যাপসুল ফের রিপিট করতে বললেন।”

 

ভাদুড়িমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “ভাবিয়ে তুলন দেখছি। কে জানে, অবস্থা সত্যিই খারাপ কি না।”

 

বললুম, “সকালে একটি বউ আর একজন জোয়ান পুরুষকে রঙ্গিলাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। মনে পড়ছে?”

 

“পড়বে না কেন? কে ওরা?”

 

“জানি না। তবে বউটি এ-বেলাও এসেছিল দেখলুম। ঘরে ঢুকতে গিয়েছিল। কিন্তু রামদাস তাকে ঢুকতে দিল না।”

 

“ও-বেলাও দেয়নি। মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।”

 

“এ-বেলাও সেই একই ব্যাপার।”

 

শুনে ভাদুড়ি শাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।” বললুম, “সে কী মশাই, আপনি তো সর্দিজ্বরের ভান করে পড়ে আছেন। বাইরে বেরুলে লোকে সন্দেহ করবে না?”

 

“সন্দেহ করার কী আছে? সর্দিজ্বরে কি পায়চারি করাও নিষেধ নাকি?”

 

“সন্ধের সময় নিরুর আসবার কথা।”

 

“সন্ধের এখনও অনেক বাকি। সবে তো সাড়ে চারটে বাজে। ছটার মধ্যে ফিরে এলেই চলবে। চলুন, চলুন, আর দেরি করবেন ন।”

 

পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরাই ছিল। তার উপরে একটা জাম্পার চড়িয়ে নিচ্ছি, এমন সময় চায়ের ট্রে নিয়ে রামদাস এসে ঘরে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, চা-ও এসে গেছে দেখছি।”

 

ট্রে থেকে চায়ের কাপ আর বিস্কিটের প্লেট টেবিলে নামিয়ে রেখে রামদাস বলল, “আপনারা কি এক্ষুনি বেরুবেন?”

 

বললুম, “চা-না খেয়ে নিশ্চয় বেরুব না। কেন, তোমার কোনও কথা ছিল?”

 

“মেয়েটার জন্যে বড় চিন্তায় আছি, বাবু। বাঁচবে তো?”

 

“নিশ্চয় বাঁচবে। শুনলুম কাল রাত্তিরে নাকি আবার জ্বর এসেছিল। তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। ক্যাপসুলটা পড়লে আর জ্বর আসবে না।”

 

চায়ে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, রামদাস। সকালবেলায় একটি বউকে তোমাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। শুনলুম সে নাকি এ-বেলাও আবার এসেছিল। বউটি কে?”

 

রামদাস বলল, “একটা বাজে মেয়েছেলে।”

 

“এসেছিল কেন?”

 

রামদাস এ-কথার স্পষ্ট কোনও জবাব না-দিয়ে বলল, “মাঝে-মাঝেই আমাদের জ্বালাতে আসে, বাবু। হয়তো আপনাদের কাছেও আসবে। ওকে পাত্তা দেবেন না।”

 

আমাদের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ট্রের উপরে কাপ আর প্লেট তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রামদাস। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, বেরিয়ে পড়ি।”

 

ফলের বাগানটাকে বাঁয়ে রেখে বাড়ির পুব দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে-যেতে দূর থেকেই লক্ষ করলুম যে, সাধু-বাবা তাঁর ঘরের বারান্দায় পায়চারি করছেন। তিনিও আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন। বারান্দা থেকেই চেঁচিয়ে বললেন, “কোথায় যাচ্ছিস?”

 

আমিও গলা চড়িয়ে বললুম, “এই একটু ঘুরতে বেরিয়েছি।”

 

সাধুবাবা হাহা করে হেসে উঠে বললেন, “ঘোর ঘোর, এই গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরে মর।”

 

ভাদুড়িমশাই হাঁটতে-হাঁটতেই নিচু গলায় বললেন, “ইনি তো দেখছি তুই-তোকারি ছাড়া কথাই বলেন না।”

 

বললুম, “সাধু হবার এটাই একটা মস্ত সুবিধে।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কথাটা নেহাত মন্দ বলেননি। তবে কিনা সাধু হয়েছেন বলেই ইনি তুই-তোকারি করে বেড়াচ্ছেন, নাকি তুই-তোকারি করবার সুবিধে হবে বলেই সাধুর ভেক ধারণ করেছেন, সেটাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

 

উল্টো দিক থেকে একজন লোক আসছিল। আমাদের কাছাকাছি এসে লোকটা একটু থমকে দাড়াল, তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল চৌধুরিদের বাড়ির দিকে।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “চিনতে পারলেন?”

 

বললুম, “বিলক্ষণ। সকালবেলায় সেই বউটি যখন রঙ্গিলাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, একে তখন তার সঙ্গে দেখেছি। এ-বেলায় অবশ্য এ-লোকটি তার সঙ্গে ছিল না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু দাঁড়ান, ব্যাপারটা বুঝতে হচ্ছে।” বলে, পথের মধ্যে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে, চৌধুরিদের বাড়ির দিকেই আবার ফিরে গেলেন।

 

এক-একা দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছিল। বেশিক্ষণ অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভাদুড়িমশাই ফিরে এলেন। বললেন, “চলুন, রঙ্গনাথবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।”

 

বললুম, “লোকটা গেল কোথায়? চৌধুরিদের বাড়িতে?”

 

“না, বাড়িতে নয়, বাগানে।

 

“তার মানে?”

 

“তার মানে সে সাধুবাবার আখড়ায় গিয়ে ঢুকল।”

 

কথা বলতে-বলতে আমরা রঙ্গনাথবাবুর বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলুম। দেখলুম, ভদ্রলোক একটা ঝারি হাতে নিয়ে ফুলগাছের উপর জল ঢালছেন। আমাদের দেখে ঝারিটা নামিয়ে রেখে বললেন,

 

“কী সৌভাগ্য, আসুন আসুন।”

 

বারান্দায় মাদুর পাতাই ছিল। আমাদের সেখানে বসিয়ে রঙ্গনাথ বললেন, “গিন্নি এ-বেলা অনেক সুস্থ। একটু চা করতে বলি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “টা খেয়েই বেরিয়েছি। এখন আর খাব না। তা ছাড়া বসবও না বেশিক্ষণ। একটা কথা জিজ্ঞেস করবার ছিল।”

 

“বেশ তো, বলুন।”

 

“আজ সকালে যখন আপনার এখান থেকে চৌধুরিদের বাড়িতে ফিরে যাই, একটি বউ আর একজন জোয়ান মানুষকে তখন রামদাসের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম। মনে হল, রামদাস তাদের উপরে বিশেষ খুশি নয়। বউটি এ-বেলাও এসেছিল। আমি দেখিনি, তবে আমার এই বন্ধুটি দেখেছেন। তা এঁরই কাছে শুনলুম যে, এ-বেলাও নাকি রামদাস তার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেনি।”

 

চিন্তিতভাবে রঙ্গনাথ বললেন, “আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না। রামদাস তো এমনিতে খুবই শান্ত আর ভদ্র স্বভাবের মানুষ। তাকে তো কারও সঙ্গে কখনও দুর্ব্যবহার করতে দেখিনি। একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকালবেলায় এই বউটির মুখের উপরে রামদাসকে আমরা দরজা বন্ধ করে দিতে দেখেছি।।-বেলাও নাকি সেই একই ব্যাপার। রামদাসকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, বউটি কে। তা রামদাস বলল, একটা বাজে মেয়েছেলে।”

 

রঙ্গনাথ বললেন, “কী রকম দেখতে বলুন তো?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “প্রশ্নটা আপনি বরং কিরণবাবুকে করুন। মেয়েদের চেহারার বর্ণনা আমার ঠিক আসে না মশাই, ও-কাজটা কিরণবাবু অনেক ভাল পারবেন।”

 

আমি বললুম, “সুন্দরী নয়, তবে বেশ চটকদার চেহারা।”

 

“বয়েস?”

 

“বছর পঁয়ত্রিশ হবে। এক-আধ বছর বেশিও হতে পারে।”

 

“রং?”

 

“ফর্সা। একটু বেশি রকমের ফর্সাই বলতে হবে।”

 

বউটির চেহারা যে চটকদার আর বয়স যে বছর-পঁয়ত্রিশ, এইটে শুনেই রঙ্গনাথবাবুর ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। রং ফর্সা শুনে বললেন, “বটে?” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সকালবেলায় তার সঙ্গে যাকে দেখেছিলেন, সেই পুরুষটি কি খুব ষণ্ডামতো?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক বলেছেন। চিনতে পেরেছেন নিশ্চয়?”

 

রঙ্গনাথ বললেন, “ও তো ঝুমরি। সহদেব মারা যাবার মাস-খানেকের মধ্যেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল।”

 

আমি বললুম, “সহদেবটি আবার কে?”

 

“দেখুন মশাই,” রঙ্গনাথ বললেন, “মুকুন্দপুরে আমি মাত্র বছর-পাঁচেক হল এসেছি। এখানকার সব কথা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়, জানিও না। তবে গাঁয়ের লোকেরা হরেক ব্যাপার নিয়ে বলাবলি করে তো, তাই কিছু-কিছু কথা আমার কানেও পৌঁছে যায়। ঝুমরির ব্যাপারটাও ওইরকম। তা ওর সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে বলতে পারি যে, রামদাস কিছু অন্যায় করেনি। সত্যিই অতি বাজে মেয়েছেলে। তার উপরে আবার ঘোর বেহায়া। তা নইলে আর ওই মুখ এখানে দেখায় কী করে?”

 

রঙ্গনাথবাবু কী যে বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছিলুম না। ভাদুড়িমশাইয়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে, তাঁর অবস্থাও তথৈবচ। তবে রঙ্গনাথ চুপ করতেই তিনি যে প্রশ্ন করলেন, তাতেই বুঝলুম, ব্যাপারটা তিনি আঁচ করতে পেরেছেন।

 

“সহদেব নিশ্চয় রামদাসের ছেলে, তাই না?”

 

“একমাত্র ছেলে। টাইফয়েডে মারা যায়। শুনেছি রঙ্গিলার বয়েস তখন মাত্র এক বছর। তা সেই দুধের বাচ্চাকে ফেলে রেখেই ঝুমরি পালিয়ে গিয়েছিল। অমানুষ আর কাকে বলে!”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন রঙ্গনাথ। তারপর, বললেন, “অবশ্য ঝুমরির যা হিসটি তাতে বোধহয় মানুষের মতো আচরণ ওর কাছে আশাও কর যায় না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কীরকম?”

 

“কাছেই একটা চা-বাগান রয়েছে। দক্ষিণবাড়ি টি এস্টেট। মুকুন্দপুরে ঢুকবার পথে হয়তো আপনাদের চোখে পড়ে থাকতে পারে। বাগানটা ছিল সাহেবদের। ম্যানেজারও ছিল সাহেব। ঝুমরির মা ওখানে ম্যানেজারের বাড়িতে কাজ করত। বাপ ছিল চৌকিদার। লোকে বলে, সেই ম্যানেজারই ঝুমরির আসল বাপ। তা ঝুমরির গায়ের রং দেখে তো মনে হয়, কথাটা তারা মিথ্যে বলে না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”

 

“তারপর আর কী, রামদাসের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হল ঝুমরির। আর তারপর যা হল তা তো আগেই বলেছি। বিয়ের বছর দুই বাদে স্বামী ও মরল আর তার মাস তিনে েমধ্যেই দুধের বাচ্চাটাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল ঝুমরি। কিন্তু আবার বলি, এ-সবই আমার শোনা-কথা।”

 

“কার সঙ্গে পালিয়ে গেল?”

 

“তা কেউ বলতে পারে না। কোথায় গিয়েছিল, তাও না। তবে গত পাঁচ-ছবছর ধরে নাকি হিরালালের সঙ্গে আছে।”

 

“ওই যণ্ডামতন লোকটাই বুঝি হিরালাল?”

 

“আজ্ঞে হ্যাঁ। রঙ্গনাথ বললেন, “হিরালালও দক্ষিণবাড়ি টি এস্টেটে কাজ করে। কুলির সর্দার।”

 

“বটে! ওরই সঙ্গে ঝুমরি তা হলে এসেছিল।”

 

“সেইটেই তো মজার ব্যাপার।” রঙ্গনাথ বললেন, “ঘর-পালানো বউ, তার তো আর শ্বশুরবাড়িতে এসে মুখ দেখাবার কথা নয়, অথচ পালিয়ে যাওয়ার পরেও নাকি ঝুমরি এ-গাঁয়ে বার কয়েক এসেছিল। রঙ্গিলা জখম হবার পরে তো প্রায়ই আসছে শুনি। রামদাস তাড়িয়ে দেয়। তবু আসে।”

 

আমি বললুম, “কী আর করবে। মেয়ের টানে আসতেই হবে।”

 

রঙ্গনাথ বললেন, “এতই যদি টান, তো এক-বছরের মেয়েকে ফেলে রেখে পালিয়েছিল কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “তা বটে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *