মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

ঊনিশ

সত্যপ্রকাশের গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। বুঝতে পারলুম, সুবিমলকে নিয়ে তিনি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেলেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রওনা হবার কথা ছিল বারোটায়, সেখানে দুটো বাজল। শিলিগুড়িতে পৌঁছে ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে হবে; তা নেহাত শুকনো কথায় তো আর চিঁড়ে ভিজবে না, তাই ভদ্রলোককে হোটেলে নিয়ে এসে যথাসাধ্য খাতিরযত্নও করতে হবে নিশ্চয়। তার উপরে আবার শিলিগুড়ি পর্যন্ত যখন এসেছেন, ম্যানেজার-মশাই তখন কি আর একদিনের জন্যে দার্জিলিং থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইবেন না?”

 

বললুম, “চাইতেই পারেন।”

 

“তার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেটা অবশ্য সুবিমলই করে দিতে পারবে। তবে হ্যাঁ, লোনটা যাতে এবারে পাওয়াই যায়, তার জন্যে আজ রাত্তিরে যে একটা জব্বর ডিনারের ব্যবস্থা থাকবে, সেটাও আমরা ধরে নিতে পারি। ঠিক কি না?”

 

“বিলক্ষণ। ডিনারের ব্যবস্থা তো থাকবেই।”

 

“তার হোস্ট হচ্ছেন সত্যপ্রকাশ। সুতরাং ডিনারের পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ছুটি নেই। কেমন, ঠিক বলছি তো?”

 

“ষোলো-আনা বললে কমই বলা হয়, আঠারো আনা ঠিক।”

 

“ভাল। তা ডিনার-পর্ব শেষ হবে কখন?”

 

“এ-সব ডিনারে কি অ’র শুধু চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য থাকে ভাদুড়িমশাই?” হেসে বললুম, “পঞ্চাশ লাখ টাকা লোনের ব্যাপার তো, তাই ধরেই নেওয়া যায় যে, পেয়ও থাকবে প্রচুর। সুতরাং…”

 

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুতরাং রাত বারোটার আগে ডিনার শেষ হবার আশা নেই; আর তা যদি না থাকে, তো সত্যপ্রকাশ আজ আর মুকুন্দপুরে ফিরছেন না।”

 

“তা হলে?”

 

“তা হলে আর কী, কাল রাত্তিরে তো আপনার ঘুম হয়নি, এখন বরং একটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা করুন।”

 

বললুম, “ঘুম তো কাল আপনারও হয়নি, আপনিও একটু শুয়ে পড়লে পারেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুপুরে আমার ঘুম হয় ন।।”

 

বললুম, “আমার হয়, তবে আজ আর হবে না। খাওয়ার পরে দুচোখের পাতা একটু জুড়ে আছিল ঠিকই, কিন্তু যে-ভাবে লোক আসতে শুরু করল, তাতে কি আর ঘুম হয়। প্রথমে এলেন রঙ্গনাথ, তারপর এলেন সত্যপ্রকাশ। আর রামদাস তে. কাজে-অকাজে মাঝে-মাঝেই আসছে। তার উপরে আবার যে-সর্দিজ্বর আপনার হয়নি, তার ওষুধ দিতে ডাক্তার সরকারও বোধহয় খানিক বাদেই এসে পড়বেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তার সরকার আসার আগে এ-ঘরে সম্ভবত আরও একজন আসবে।”

 

“কে আসবে?”

 

“নিরু। দেখা যাক আমার অনুমানটা ঠিক কি না।”

 

নিরুর কথা তুলেই গিয়েছিলুম। বললুম, “সত্যপ্রকারে স্ত্রী কি সত্যি ওর দিদি হতেন নাকি?”

 

“আমার তো তা-ই মনে হয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি অবশ্য মুখ-চোখের মিল দেখে আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়েছিলুম। কিন্তু সেটা বোধহয় ঠিক জায়গাতেই লেগেছে। তার ফলে কী হল বলতে পারেন?”

 

“কী হল?”

 

“কেসটা আরও জটিল হয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ এটা আর নেহাত একটা চুরির ব্যাপার হয়ে থাকল না। যা ছিল শুধুই একটা মূর্তি-চুরির ঘটনা, হঠাৎ তা একেবারে আলাদা একটা ডাইমেনশন পেয়ে যাচ্ছে।”

 

“আলাদা ডাইমেনশানের কথা পরে হবে। আগে বরং চুরির কথাটাই হোক। ওটার কিনারা হবে তো?”

 

“না-হবার কী আছে?” ভাদুড়িমশাই নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, “চাবির ব্যাপারট। যখন ধরতে পেরেছি, তখন ওটার কিন’র।ও করে ফেলতে পারব।”

 

“চাবির ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”

 

“বুঝিয়ে বলবার তো বিহু নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চাবির গায়ে মাটি লেগে ছিল। শুকনো কাদামাটি। সেটা নদি আপনার নজরে পড়ত, তো আপনিও ব্যাপারটা বুঝতে পারতেন। কথা হচ্ছে, মাটি এল কোত্থেকে।”

 

“আপনার কী মনে হয়

 

“রামদাসের যা মনে হয়, আমার তা মনে হয় না।”

 

“অর্থাৎ?”

 

“রামদাস কী বলণ শুনলেন না? ওর ধারণা, সোমবার চাবিটা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে কিনা হারানো-চাবিটা আবার খানিক বাদেই খুঁজে পাওয়া যায়। কোথায় পাওয়া যায়? না মেঝেয় ইট পেতে তার উপরে হোমের আগুন জ্বালে তো, তা সেই ইট পাতার জন্যে যে নরম মাটির দরকার হয়, ঠাকুরঘরের মধ্যে রাখা সেই মাটির উপরেই চাবিটা পড়ে ছিল। এবারে আমার কথাটা শুনুন। আমার ধারণা, চাবিটা হারিয়ে যায়নি, ওটা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।”

 

“কে সরিয়েছিল?”

 

“যে-কেউ সরিয়ে থাকতে পারে। সারাদিন ধরে তো ঠাকুরঘরের মধ্যে লোকজন নেহাত কম ঢোকে না। তাদের যে-কারও পক্ষেই কাজটা করা সম্ভব। কিন্তু মজাটা কী জানেন?”

 

“কী?”

 

“এমনভাবে ওটা সরানো হয়েছিল, যাতে কারও কোনও সন্দেহ না হয়।”

 

আবার জিজ্ঞেস করলুম, “কে সরিয়েছিল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে মশাই, সেটাই যদি জানতুম, তবে আর ভাবনা ছিল কী? এক্ষুনি গিয়ে শ্যাক করে তার ঘাড় কামড়ে ধরতুম। সেই সকাল থেকেই ভেবে যাচ্ছি যে, কে হতে পারে। আপনিও ভাবতে থাকুন। তবে কিনা, কে সরিয়েছিল, শুধু এইটুকু ভাবলেই হবে না। কেন সরিয়েছিল, অর্থাৎ মতলবটা কী, আর সেই মতলব কীভাবে হাসিল হওয়া সম্ভব, সেটাও আপনাকে ভাবতে হবে।”

 

“আমার তো ধারণা, ওই বউটাই চাবি সরিয়েছিল।”

 

“তা হলে আবার খানিক বাদেই চাবিটা ওখানে পাওয়া গেল কেন?”

 

“কী জানি।”

 

“কী জানি বললে হবে না। আসলে ওই যে একটুক্ষণের জন্যে চাবিটা সরানো হয়েছিল, তারই মধ্যে চোরের মতলব হাসিল হয়ে যায়। অন্তত এইটুকু আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে যে কে, সেটা বুঝতে পারছি না।”

 

“বউটাকে সন্দেহ করছেন না কেন?”

 

“সন্দেহের কারণ নেই বলেই করছি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-কাজ ওর দ্বারা হয়নি।”

 

“কী করে বুঝলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উত্তরটা আর শোনা হল না। নিরু এসে ঘরে ঢুকল। হাতে মশলার ডিবে। টিপয়ের উপর ডিবেটাকে রেখে মুখ না তুলেই বলল, “আমার কয়েকটা কথা ছিল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, বলো।….কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ঘরে তো বসবার জায়গার অভাব নেই। ওই তো, ওদিকের ওই টেবিলের সামনে যে চেয়ারটা রয়েছে, ওটায় বোসো। তারপর বীরেসুস্থে বলো কী বলবে।”

 

নিরু বসল না। বলল, “এখন নয়। সন্ধের সময় আপনারা কি ঘরে থাকবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকব।”

 

“মা আর পিসিমা তখন ঘন্টা দেড়-দুই ঠাকুরঘরে বসে জপ করেন। তখন আমার কোনও কাজ থাকে না। যদি বলেন তো তখন আসতে পারি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, তখনই এসো।”

 

নিরু বেরিয়ে গেল।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখলেন তো, ঠিকই আন্দাজ করেছিলুম। বলেছিলুম যে, ডাক্তার সরকার আসার আগেই নিরু আসবে। ভুল বলিনি, কেমন?”

 

বললুম, “ঠিকই বলেছিলেন।” তারপর নিরু এসে ঘরে ঢুকবার আগে যে আলোচনা হচ্ছিল, তার জের টেনে বললুম, “দেখা যাচ্ছে, একমাত্র ওই চাষি-বউটিকেই আপনি সন্দেহ করছেন না। কী, ঠিক বলছি তো?”

 

“পুরোপুরি ঠিক বলছেন না।”

 

“তার মানে আরও দু-চারনকে সন্দেহ করছেন না। কেমন?”

 

“আরও দু-চারজনকে নয়, তারও একজনকে।”

 

“সেই ভাগ্যবানটি কে?”

 

“তাঁকে ভাগ্যবানই বা ভাবছেন কেন? ভাগ্যবতীও তো তিনি হতে পারেন।” একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন ভাদুড়িমশাই। তারপর হঠাৎ একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখুন, ঘটনা ঘটবার সময়ে মুকুন্দপুরে যারা ছিল না, এক হিসেবে তাদের কাউকেই আমার সন্দেহ করা উচিত নয়। কিন্তু তবু যে শেহ করছি, তার কারণ, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও তারা দূর থেকে কলকাঠি নাড়তে পারে, মানে নিজের হাতে চুরি না করে অন্যকে দিয়ে করিয়ে থাকতে পারে এই কাজ। সেটা কি খুবই অসম্ভব ব্যাপার?…কী, অমন হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম। বলল, “ব্যাপার কী বলুন তো? আপনি কি সত্যপ্রকাশকেও সন্দেহ করছেন নাকি?”

 

“কেন করব না? ভদ্রলোক যদি সত্যি কথা বলে থাকেন, তা হলে ঠিক আছে। কিন্তু তিনি যে সত্যি কথা বলছেন তার প্রমাণ কী? এমন তো হতেই পারে যে, মঙ্গলবার রাত্তির তা ধরুন এগারোটা বারোটা পর্যন্ত তিনি শিলিগুড়িতে ছিলেন, তারপর গাড়ি হাঁকিয়ে চলে এসেছিলেন মুকুন্দপুরে। নিজে হয়তো তিনি মন্দিরে ঢোকেননি, কিন্তু যে-লোক ঢুকেছিল, সে তাঁরই লোক। মনসামূর্তি চুরি করে সে সত্যবাবুর গাড়িতে সেটা পৌঁছে দেয়। তারপর সত্যবাবু ফের গাড়ি হাঁকিয়ে শিলিগুড়িতে চলে আসেন।……কী, এটা কি হতেই পারে না?”

 

আমার মন কিছুতেই ভাদুড়িমশাইয়ের কথায় সায় দিচ্ছিল না। বললুম, “কিন্তু মূর্তিটা তিনি চুরি করবেন কেন?”

 

“বা রে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশের টাকার দরকার নেই? শুনলেনই তো যে, তিনি একটা লাক্সারি-হোটেল খুলতে চান। সেই দ্বিতীয় হোটেলের পিছনে তিনি অলরেডি বিস্তর টাকা ঢেলে বসে আছেন, অথচ কাজটা শেষ করানোর জন্যে ব্যাঙ্ক থেকে যে লোন পাওয়া দরকার, সেটা পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কিনা প্রচুর টাকার দরকার আছে তাঁরও।”

 

“তার জন্যে তিনি নিজের জিনিস চুরি করবেন?”

 

“কেন করবেন না? বিষাণগড়ের দেওয়ানের কথা ভাবুন। অর্থলোভে নিজেদের হিরে তিনি কি নিজেই চুরি করেননি?”

 

“সেখানে তো ইনসিওরেন্স কোম্পানিকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ পাবার লোভ ছিল।”

 

“এখানেও তেমনি বিদেশিদের কাছে মূর্তি বেচে টাকা পাবার লোভ থাকতে পারে। মূর্তিটার ইতিহাস তো শুনলেন, ফোটোও দেখেছেন, অমন একটি জিনিস পাবার জন্যে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবার মতো বিদেশি ধনকুবেরের অভাব নেই মশাই। আর তাদের দালাল হয়ে যারা কাজ করে, তাদের সংখ্যাও বাড়ছে বই কমছে না। বলতে গেলে এখন গোটা দেশ জুড়েই তাদের জাল পাতা।”

 

“তা হলে কি আপনার ধারণা সত্যপ্রকাশই চোর?”

 

“অমন কথা কিন্তু আমি একবারও বলিনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমি যেমন কাউকে সাধু বলছি না, তেমনি আবার কাউকে চোরও বলছি না। আমি শুধু আমার সন্দেহের কথাটাই বলছি। তবে হ্যাঁ, যাদের সম্পর্কে আমার সন্দেহ, তাদের মধ্যে সত্যপ্রকাশও আছেন বই কী।”

 

আমার মুখ দিয়ে যেন কথাই সরছিল না। ভাদুড়িমশাইও চুপ করে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, একটা কথা তা হলে খুলেই বলি। লেবার কনট্রাক্টর হিসেবেই হোক আর যে-হিসেবেই হোক, সালালের সঙ্গে সত্যপ্রকাশের যোগাযোগটা আমার ভাল ঠে না। লোকটাকে আমি চিনি। ও একটা হাড়ে বজ্জাত লোক। ফকিরার কথা তো বলেছি; তার গ্যাংয়ের লোকরা শুধুই যে ওয়াগন ভাঙত তা নয়, ড্রাগসও পাচার করত। কখনও কোনও মূর্তি-টুর্তি পাচার করেছে বলে অবশ্য শুনিনি। তবে কিনা করতে কতক্ষণ। বিশেষ করে নেপালের বর্ডার যখন শিলিগুড়ি থেকে কাছেই। না মশাই, সত্যবাবুর সঙ্গে সম্পৎলালের কোনও যোগাযোগ না-থাকলেই ‘আমি খুশি হতুম।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *