মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

আঠেরো

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার রামদাস?”

 

“খোকাবাবু আমাকে দেখতে পাঠালেন আপনারা ঘুমিয়ে পড়েছেন কি না। আসলে সুবিমলবাবুকে দিয়ে গোটা দুই চিঠি টাইপ করিয়ে নিচ্ছেন তো, তাই আসতে একটু দেরি হচ্ছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হোক, আমি বরং সেই ফাঁকে তোমার সঙ্গে দু-একটা কথা সেরে নিই।”

 

রামদাস বলল, “কী কথা?”

 

“ওই চাবির কথা। আচ্ছা রামদাস, রঙ্গিলা যে ঠাকুরঘরের চাবিটা কক্ষনো কাউকে দিত না, তা তো তুমি বলেইছ। এখন বলো তো, ঢাবিটা কি গত দু’বছরের মধ্যে কক্ষনো সে হারিয়েও ফেলেনি? মানে এক-আধ ঘন্টার জন্যেও না?”

 

অবাক হয়ে রামদাস বলল, “এক-আধ ঘন্টার জন্যে? তার পর মাথা চুলকে একটু ভেবে বলল, ও হ্যাঁ, এই সেদিনই একবার হারিয়েছিল বটে, তবে ঘন্টাখানেকের মধ্যে আবার পেয়েও যায়।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল হঠাৎ। বললেন, “এটা কবেকার কথা?”

 

“বুধবার তো সর্বনাশটা হল, এটা তার একদিন…..না না, একদিন নয়, দু’দিন আগের ব্যাপার।”

 

“অর্থাৎ সোমবার চাবিটা হারিয়েছিল?”

 

“হ্যাঁ বাবু, কাল সোমবারের আগের সোমবার। তবে ওই যে বললুম, খানিক বাদে আবার পেয়েও গিয়েছিল।”

 

“কোথায় হারিয়েছিল?”

 

“ঠাকুরঘরের মধ্যে।”

 

“পেল কোথায়?”

 

“সেইখানেই। হোম করবার জন্যে নরম মাটির দরকার হয় তো। বালি হলেও অবিশ্যি চলে। তবে এখানে আর নিত্যি-নিত্যি বালি পাওয়া যাবে কোথায়। তাই নেঝের উপর নরম মাটির বেদীমতন করে তার উপরে ইট সাজিয়ে হোমের আগুন জ্বালতে হয়, নইলে মেঝের শান ফেটে যাবার ভয় থাকে। তো ঠাকুরঘরের মেঝেয় এক তাল নরম মাটি রাখা ছিল, খুঁজতে খুঁজতে দেখা গেল যে, সেই মাটির উপরেই চাবিটা পড়ে রয়েছে।”

 

“ব্যাস, আর-কিছু জিজ্ঞেস করবার দরকার নেই। এবারে তুমি যেতে পারো।”

 

রামদাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

 

ভাদুড়িমশাই একগাল হেসে বললেন, “জট অন্তত একটুখানি খুলে গেল। এতক্ষণ তো শুধুই সন্দেহ করছিলুম, কিরণবাবু, এবারে নিশ্চিত হয়ে বলি তালাটা ভাঙা হয়নি। যে ঢুকেছিল, সে চাবি দিয়ে তালা খুলেই ঢুকেছিল।”

 

“কিন্তু সে কে?”

 

“তা কী করে বলব? তবে আপনি যাকে সন্দেহ করছেন সেই বউটি বোধহয় নয়। গাঁয়ের এক চাষিবাড়ির বউয়ের মাথায় কি আর এত প্যাঁচ খেলবে? ও হ্যাঁ, রঙ্গনাথ তো এসেছিলেন, কিন্তু কই, আপনি তো তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।”

 

“ভুলে গিয়েছিলুম।”

 

“তার জন্যে আক্ষেপ করবেন না। মাঝে-মাঝে এমন এক-আধটা কথা ভুলে যাওয়াহ্ ভাল।”

 

“এ-কথা বলছেন কেন?”

 

“এইজন্যে বলছি যে, চাষিবাড়ির বউটিকে রঙ্গনাথ যা বলেছেন, তার ব্যাখ্যা শুনলে আপনার পিলে চমকে যেত।”

 

বুঝতে পারলুম, ভাদুড়িমশাই এখন আর কিছু বলবেন না, স্রেফ য়ালির ভালায় কথা চালিয়ে যাবেন। তা হলে বরং একটু ঘুমিয়ে নেওয়াই ভাল।

 

কিন্তু ঘুমোনো গেল না। চেয়ার ছেড়ে বিছানার দিকে এগোবার উপক্রম করতে-না-করতেই সত্যপ্রকাশ ঘরে ঢুকে বললেন, “একটু দেরি হয়ে গেল। রঙ্গনাথবাবু এসেছিলেন তো?”

 

“তা এসেছিলেন।”

 

“ওঁকে যা বলবার সব বলে দিয়েছি। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, ছেটকাকার উপরে অন্তত এখুনি কোনও হামলা হবে না। …..ও হ্যাঁ, জগদীশকে যা ইসস্ট্রাকশন দেবার, তা আশা করি দিয়েছেন?”

 

“তা দিয়েছি,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু লোকটা সত্যি নির্ভরযোগ্য তো?”

 

“একেবারে হানড্রেড পার্সেন্ট।”

 

“রঙ্গিলার উপরে হামলা হলে আটকাতে পারবে?”

 

“ওকে আপনি ছুরি চালাতে দেখেননি বলেই প্রশ্নটা করলেন। অন্ধকারেও ওর তাক কখনও ফশকায় না। জগদীশ যে খুনের আসামি, তা কি বলেছি আপনাদের?”

 

“বলেছেন।”

 

“কিন্তু কেন খুন করেছিল, তা বোধহয় বলিনি। আসলে খুনটা না করলে ও নিজেই সেদিন খতম হয়ে যেত। রাত্তিরবেলা ভাটিখানা থেকে একটা অন্ধকার পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল, সেই সময়ে ওর উপরে হামলা হয়। লাঠি চালিয়েছিল। তবে লাঠিটা ওর মাথায় পড়েনি, কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। বাস, অন্ধকারের মধ্যেই ছুরি চালিয়ে দেয় জগদীশ। চিৎকার শুনে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসে। এসে টর্চ ফেলে যা দেখতে পায়, তাতে তাদের চক্ষুঃস্থির। কুলিবস্তির রাজদেও কুর্মি রাস্তার উপরে চিত হয়ে পড়ে আছে। আর তার গলার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে রয়েছে একটা ছুরির ফলা।”

 

বললুম, “বটে?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তবে আর বলছি কী। তবে কিনা স্রেফ ওই ছুরিটার জন্যেই জগদীশ ধরা পড়ে গেল। ফাঁসিই হয়ে যেত, কিন্তু আমি ভাল ল-ইয়ারের ব্যবস্থা করেছিলুম তো, তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন যে, ছুরিটা চালানো হয়েছিল ইন সেল্ফ ডিফেন্স। লাঠির বাড়ি লেগে ভাগ্যিস ওর কাঁধটা জখম হয়েছিল, তা সেইটেই হয়ে দাঁড়াল আমাদের ল-ইয়ারের তুরুপের তাস। ফলে আর ফাঁসি হল না, তার বদলে হল পাঁচ বছরের জেল। তারও কিছুটা মকুব হয়ে গিয়ে মাস কয়েক আগে ছাড়া পেয়েছে।”

 

আমি বললুম, “ওরে বাবা, এ যে ভয়ানক ব্যাপার।”

 

“ভয়ানক বলে ভয়ানক,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা ছুরি চালাবার ব্যাপারে ওর হাতযশের কথাটা এখানেও সবাই জানে তো, তাই রাত্তিরে ও যদি পাহারায় থাকে, তো রঙ্গিলার ঘরের ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষবে না।

 

বুঝতে পারছিলুম যে, ভদ্রলোক আমাদের একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিন্ত করতে চাইছেন। হয়তো সেই কারণেই কথাবার্তাও বলছেন একটু বেশি-মাত্রায় সপ্রতিভ ভঙ্গিতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কিংবা হয়তো সেইজন্যেই, আমার মনে হচ্ছিল যে, এ-ব্যাপারে সত্যপ্রকাশ নিজেও বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। রঙ্গিলার উপরে যে হামলা হতে পারে, ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে এই সম্ভাবনার কথাটা শুনে একটু ভয়ও পেয়েছেন হয়তো।

 

ভাদুড়িমশাইও সেটা বুঝতে পেরে থাকবেন। সম্ভবত সেইজন্যেই তিনি সত্যপ্রকাশকে বললেন, “জগদীশ যখন এতই নির্ভরযোগ্য লোক, তখন আর ভয় কী। যান, তা হলে শিলিগুড়িতে গিয়ে কাজটা সেরেই আসুন।”

 

সত্যপ্রকাশ বলেন, “কী জানেন, শিলিগুড়িতে যে আজই যেতে হবে, সেটা আগে বুঝতে পারিনি। যাবার বিশেষ ইচ্ছেও আমার নেই। কিন্তু …..”

 

“না গেলে ব্যাবসার ক্ষতি হবে, এই তো?”

 

“এমনিতে কোনও ক্ষতি হবার কথা নয়, মিঃ ভাদুড়ি,” সত্যপ্রকাশ অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘ব্যাবসার কাজকর্ম যাকে যা বোঝাবার সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি, এখন যদি তিন-চার দিন শিলিগুড়িতে না যাই তো কোনও অসুবিধে হবে না, ওরা ঠিকই চালিয়ে নিতে পারনে।”

 

“তা হলে আর যাচ্ছেন কেন?”

 

“সুবিমল কী বলল শুনলে না?”

 

“শুনেছি। একটা ব্যাঙ্ক-লোনের কথা বলছিলেন।”

 

“ঠিকই শুনেছেন। নতুন যে হোটেলটার কাজে হাত দিয়েছি, তার জন্যে এখুনি অন্তত লাখ পঞ্চাশেক টাকা দরকার। অথচ ব্যাঙ্ক থেকে এই কাজের জন্যে যে লোন পাবার কথা, প্রায় এক বছর ধরে সেটা আটকে আছে।”

 

“আটকে আছে কেন?”

 

“সেইটেই বুঝতে পারছি না।” হাত উল্টে সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাগজপত্র পরিষ্কার, কেউ কোনও অবজেকশান দেয়নি, প্ল্যানও সেই কবেই পাশ হয়ে গেছে, অ্যান্ড ইয়েট দে আর সিটিং টাইট অন মাই অ্যাপ্লিকেশান। ন্যাশনালাইজড হবার পরে ব্যাঙ্কগুলো একেবারে গোল্লায় গেছে মশাই।”

 

“ঘুষ চায়?”

 

“চাইতেই পারে। কাট-মানির কারবার সর্বত্র চলে, এখানেই বা চলবে না কেন? আমি তোমাকে পঞ্চাশ লাখ পাইয়ে দিচ্ছি, তার থেকে তুমিও আমাকে হাজার পাঁচ-দশ পাইয়ে দাও, এ তো অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। পঞ্চাশ হাজার চেয়ে বসলেও কিছু বলবার নেই। তা সেটা খুলে বলবে তো। তাও বলছে না, আবার লোনটাকেও নাহক আটকে রেখেছে।”

 

“কেন আটকে রেখেছে, আন্দাজ করতে পারছেন কিছু?”

 

“একেবারে যে পারছি না, তা নয়, সত্যপ্রকাশ বললেন, “দমদম এয়ারপোর্টে তো বিপিনবিহারী অনেকে আপনারা দেখেছেন। বিপিন যে শুধু আমার কাস্টমার, তা নয়, বন্ধুও বটে। সে তো বলছে, কলকাতার এক অবাঙালি ব্যবসায়ীও শিলিগুড়িতে একটা থ্রি-স্টার হোটেল খুলতে চায়। লোটা আসলে লোহার কারবারি, এখন সে তার কালো টাকাকে সাদা করবার জন্যে অন্য দিকে হাত বাড়াতে চাইছে। বিপিনের খবর, আমিও যে আর-একটা লাক্সারি হোটেল খুলতে চলেছি, এটা তার পছন্দ নয়। লাইন থেকে লোকটা আমাকে হটাতে চায়। তাই আমার ব্যাঙ্কের লোকাল এজেন্টকে ঘুষ খাইয়ে হাত করেছে, যাতে আ’মি লোনটা না পাই।”

 

“কিন্তু সেটা না-পেলে তো আপনি খুবই অসুবিধেয় পড়বেন, তাই না?”

 

“পড়ব কী মশাই, অলরেডি পড়েছি।” তেতো গলায় সত্যপ্রকাশ বললেন, “নিজের বলতে যেখানে যা-কিছু ছিল সবই তো ওর মধ্যে ঢেলেছি আমি। ফার্স্ট ফেজের কনস্ট্রাকশানও কমপ্লিট, এখন ব্যাঙ্ক যদি না লোনটা স্যাংশান করে, তা হলে তো একেবারে ধনেপ্রাণে মারা পড়ব। একদিকে যেমন আমার বিস্তর টাকা ওই লোহা আর সিমেন্টের খাঁচার মধ্যে ব্লকড হয়ে রইল, অন্যদিকে তেমনি ক্রেডিটেও তো নেহাত কম কাজ হয়নি, সেকেন্ড ফেজের কনস্ট্রাকশান শুরু হবার আগে তার অন্তত বারো-আনা পেমেন্ট করা চাই, সেটার ব্যবস্থা না হলে পাওনাদারেরা কী করবে জানেন?”

 

বললুম, “মামলা করবে?”

 

“সবাই করবে না। আগে যারা আমার সঙ্গে কাজ-কারবার করেনি, একমাত্র তাদেরই কেউ-কেউ হয়তো করতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে আমি ভাবছি না, মামলার ফয়সালা তো আর তক্ষুনি-তক্ষুনি হয় না, ফরসালা হতে বছরের পর বছর কেটে যায়, তার মধ্যে আমি টাকা তোলার একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় করে ফেলতে পারব। আমার ভাবনা লেবার-কনট্রাক্টর সম্পৎলালকে নিয়ে। তাকে আপনারা চেনেন না, সে মামলা-মোকদ্দমার ধার ধারে না, কালীপুজোর আগেই যদি না তার পাওনা মেটাই তো তিনবাত্তির কাছে গাড়ি আটকে দিয়ে সে আমার মাথা ফাটাবে।”

 

ফ্লাশ খেলাকে অনেকে তিনপাত্তির খেলা বলে, সেটা জানতুম। কিন্তু এই। তিনবাত্তিটা আবার কী ব্যাপার? কথাটা জিজ্ঞেস করতে সত্যপ্রকাশ ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “বড়রাস্তার একটা মোড়। ওই মোড় ঘুরেই তো কাল শিলিগুড়ি থেকে বেরুলুম।”

 

ভাদুড়িমশাই কিছু ভাবছিলেন। বললেন, “সম্পৎলাল সম্পর্কে যা বললেন, তাতে লোকটা সম্পর্কে একটু কৌতূহল হচ্ছে। কেমন দেখতে বলুন তো? রং টকটকে ফর্সা?”

 

“হ্যাঁ। কিন্তু এ-সব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?” সত্যপ্রকাশ বললেন, “লোকটাকে আপনি চেনেন নাকি?”

 

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভুরু নেই, কপালে মস্ত জরুর। কী, মিলছে?”

 

সত্যপ্রকাশ হাঁ করে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর বললন, “বুঝতে পারছি, সম্পৎলালকে আপনি চেনেন।”

 

“চিনি বই কী।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বছর বারো আগে ধানবাদে যে ব্যাঙ্ক-ডাকাতি হয়, ব্যাঙ্কের তরফে তার তদন্তের ভার আমার উপরেই পড়েছিল যে। ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার খুন হয়েছিলেন। খুন করেছিল শুনীশ্বর। সে অবশ্য ডাকাত দলের লিডার ছিল না। লিডারের নাম ফকিরা সিং। ওযান অব দা মোস্ট নোটোরিয়াস নাফিয়া লিডারস অব ধানবাদ। আগে ছিল ওয়াগন-ব্রেকার। সেইসঙ্গে রেল-কলোনির প্রতিটি দোকান থেকে প্রোটেকশান-মানি আদায় করত। হঠাৎ পুলিশ-পাহারায় কড়াকড়ি হওয়ায় দিন কয়েক একটু চুপচাপ থেকে তারপর একদিন এই ব্যাঙ্কে এসে হানা দেয়। তাও ধরা পড়ত না, ক্যাশিয়ারটি যদি না তাঁর ডাইং ডিক্লারেশনে ফকিরার গ্যাঙের একটা লোকের চেহারার একেবারে নিখুঁত ডেসক্রিপশান দিতেন। ডেসক্রিপশান অনুযায়ী লোকটিকে তো ধরা হল। তারপর সে-ই হয়ে গেল রাজসাক্ষী। ভাগ্যিস হয়েছিল। নইলে মুনীশ্বরেরও ফাঁসি হত না আর ফকিরাকেও দশ বছরের জন্যে ঘানি ঘোরাতে হত না। সত্যি বলতে কী, লোকটা যদি না মুখ খুলত, গ্যাঙের একজনও ধরা পড়ত না তা হলে।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ-সব কথা উঠছে কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এইজন্যে উঠছে যে, ধানবাদের সেই রাজসাক্ষীটিরও গায়ের রং ছিল টকটকে ফর্সা, তারও ভুরু বলতে কিছু ছিল না, আর তারও কপালে ছিল মস্ক জরুল। শুধু তা-ই নয়, নাম ছিল তারও সম্পৎলাল। অর্থাৎ কিনা ধানবাদের ওয়াগন-ব্রেকার এখন শিলিগুড়িতে এসে মিস্ত্রি-মজুর সাপ্লাইয়ের কারবার চালাচ্ছে। আশ্চর্য, লোকটা নিজের নাম পর্যন্ত পালটায়নি।”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “ওরেব্বাবা, লোকটা যে দাঙ্গাবাজ, তা আমি জানতুম, কিন্তু ওর অ্যান্টিসিডেন্ট যে এইরকম, তা তো কল্পনাও করিনি। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”

 

আমি বললুম, “নামটা কেন পালটায়নি বলুন তো?”

 

বললুম,”নামটা

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পালটাবার কোনও দরকার আছে বলেই হয়তো মনে করেনি। শিলিগুড়িতে “ আর জানতে যাচ্ছে যে, ধানবাদে কী হয়েছিল। আর তা ছাড়া, সম্পৎলালের ভয় তো একমাত্র ফকিরাকে। তা সেই ফকিরারও দশ বছর জেল হয়ে গেল। দশ বছর তো আর নেহাত কম সময় নয়। তার মধ্যে কত কী ওলটপালট হয়ে যায়। যায় না?”

 

সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা যায় বটে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যায়, আবার সব ক্ষেত্রে যে যায় না, তাও ঠিক। বিশেষ করে পালটে যায় না আন্ডারওয়ার্লডের কয়েকটা নিয়মকানুন, যা মান্য না-করার শাস্তি বড় ভয়ঙ্কর। যাদের সঙ্গে সে ওয়াগন ভেঙেছে, ব্যাঙ্ক লুঠ করেছে, লুঠের বখরা নিতেও ছাড়েনি, তাদের ধরিয়ে দিয়ে সেই নিয়ম ভেঙেছে সম্পৎলাল। তার শাস্তি তাকে পেতে হবে।”

 

“কে শাস্তি দেবে?” আমি জিজ্ঞেস করলুম।

 

“যে দেবে, বছর খানেক আগে সে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। … মিঃ চৌধুরি, সম্পংলাল যে শিলিগুড়িতে রয়েছে ফকিরা ত। নিশ্চয় জানে না। কিন্তু তা না-ই জানুক, আপনি যদি কালীপুজোর আগে সম্পৎলালের পাওনা না-ও মেটাতে পারেন, তবে তাতেও আপনার ভয় পাবার কিছু নেই।”

 

“এ-কথা বলছেন কেন?”

 

“ট্রেচারি করে কোনও নাফিয়োসো কখনও পার পায় না বলেই বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন শুধু একটা কাজই আপনাকে করতে হবে।”

 

“কী কাজ?”

 

“যে-কাউকে দিয়ে সম্পৎলালের কানে ধু এই কথাটা একবার তুলে দিতে হবে যে, ফকিরা সিং নামের একটা লোক শিলিগুড়িতে এসে সম্পৎলালের খোঁজ করছে। বাস, তারপর কী হয় দেখুন।”

 

সত্যপ্রকাশ তবুও যেন ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বললেন, “তারপর কী হবে?”

 

“আর-কিছু হবে না, স্রেফ ফকিরার হাত থেকে জান বাঁচাবার তাগিদেই সম্পৎ অন্তত কিছুদিনের জন্যে শিলিগুড়ি থেকে সরে পড়বে।”

 

“তারপর যখন জানতে পারবে যে, ফকিরা বলে কেউ শিলিগুড়িতে আসেনি?”

 

“তখন সে আবার শিলিগুড়িতে ফিরে আসবে। তা আসুক না, আপনি তো ইতিমধ্যে বেশ কিছুটা সময় পেয়ে যাচ্ছেন। তার মধ্যে কি আর ব্যাঙ্ক-লোনের একটা হিল্লে হয়ে যাবে না?”

 

এতক্ষণে সত্যপ্রকাশের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, “বাঁচালেন মশাই। কথাটা আমি আজই সম্পৎলালের কানে তুলে দেবার ব্যবস্থা করছি। ঠিক আছে, তা হলে আর দেরি করব না, বেরিয়ে পড়ি। যাবার পথে হাসিমারায় ডাক্তার সরকারকে বলে যাচ্ছি যে, বিকেলে এখানে এসে প্রথমেই যেন আপনার সঙ্গে দেখা করেন। চলি তা হলে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু একটা কথা বলে যান। সম্পৎলালের মতন লোককে আপনি লেবার-কনট্রাক্টের কাজটা দিয়েছিলেন কেন?”

 

“সাধে কি আর দিয়েছি,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “কাজটা ও নিজে এসে চাইল যে। মুশকিল কী জানেন, একবার যে-কাজ ও-লোকটা চেয়ে বসে, অন্য-কোনও লেবার-কনট্রাক্টর সে-কাজ আর ছুঁতেও সাহস পায় না।”

 

সত্যপ্রকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *