মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
এক
বছর পনরো আগের কথা। বেশ-কিছুদিন আগেই পাক-ভারত যুদ্ধ শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। খান-সেনাদের অত্যাচারে যারা সীমান্ত পার হয়ে এদিকে চলে এসেছিল, তাদেরও অধিকাংশই আবার যে যার জায়গায় ফিরে গেছে। বাতাসে আর বারুদের গন্ধ নেই।
আমি তখন পার্ক সার্কাস এলাকার একটা গলিতে থাকি। খবরের কাগজে কাজ করি; তা ছাড়া আছে নিজের লেখালেখির কাজ। পুজো-সংখ্যা বেরিয়ে যাওয়ায় হাত তখন অনেকটা হালকা। বারোয়ারি পুজোর হট্টগোলে অবশ্য দিন কয়েক আগেও প্রাণ একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সত্যিই তা-ই। আমাদের এই সরু গলির মধ্যেও একটা বারোয়ারি পুজো হয়। সেখানে অষ্টপ্রহর যে ফিল্মি গানার দাপট চলছিল, তাতে প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল যে, আর নয়, প্রাণপাখি এবারে নির্ঘাত খাঁচা ভেঙে পালাবে।
তা সেই হট্টগোল এখন অনেকটা ঝিমিয়ে এসেছে। লক্ষ্মীপুজোও শেষ। রেলগাড়িতেও আর সেই আগের মতো ভিড় নেই। এর মধ্যে এক আত্মীয়কে একদিন দিল্লি মেলে তুলে দেবার জন্যে হাওড়া স্টেশনে যেতে হয়েছিল। গিয়ে দেখলুম, তিনি যেখানে জায়গা পেয়েছেন, সেই কিউবিকূলের চারটে বার্থের মধ্যে দুটোই খালি। দেখে মনে হল, রিজার্ভেশনের জন্যে এখন আর তিন মাস আগে থাকতে লাইন লাগাবার, কি সেটা না-পারলে রেল কোম্পানির কোনও কর্তাব্যক্তির কাছে গিয়ে উমেদারি করবার, দরকার নেই। তা হলে তো দিন পনরো-কুড়ি ছুটি নিয়ে আমিও একটু বাইরের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আসতে পারি। দফতরে এখন কাজের চাপও অনেক কম। হাওড়া স্টেশন থেকে ফিরে আসতে-আসতে তাই ভাবছিলুম যে কলকাতা থেকে এবারে বেরিয়ে পড়লে নেহাত মন্দ হয় না।
সেদিন রাত্তিরেও তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। খাওয়ার পাট চুকিয়ে, মুখে এক কুচি সুপুরি ফেলে, একটা সিগারেট ধরিয়ে ইজিচেয়ারে এসে গা ঢেলে দিয়েছি, ছেলেপুলের মা বললেন, “বেরিয়ে যে পড়বে বলছ, যাবেটা কোথায়?”
“কেন, সে তো ঠিক করাই আছে। ব্যাঙ্গালোর। চারু ভাদুড়ি ফি-বছর বিজয়ার চিঠিতে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখেন যে, এবারে যেন দিন কয়েকের জন্যে ওঁর ওখানে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসি। তা কোনও বারেই কি আমাদের যাওয়া হয়? হয় না। একটা-না-একটা ঝঞ্ঝাটে শেষ পর্যন্ত আটকে যাই। চলো, এবারে গিয়ে ওঁকে চমকে দেব।”
“তা হলে তো ভালই হয়। তবে কিনা মাদ্রাজ হয়ে তারপর যাব।”
ভদ্রমহিলা যে কেন মাদ্রাজ যেতে চান সেটা আর তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলতে হল না। মাদ্রাজে তাঁর দিদি থাকেন। তিনিও ফি-বছর বিজয়ার চিঠিতে মাথার দিব্যি দিয়ে জানান, দিন কয়েকের জন্য আমরা যেন অতি অবশ্য তাঁর কাছে গিয়ে ছুটি কাটাই। যদি যাই, তা হলে মাদ্রাজের স্নেক-পিট আর ক্রোকোডাইল পার্কে তো তিনি আমাদের নিয়ে যাবেনই, উপরন্তু গোল্ডেন বিচ রিজর্ট থেকে মহাবলীপুরম পর্যন্ত ধারেকাছে যা-কিছু দর্শনীয় জায়গা আছে, সবই দেখিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন।
বললুম, “বেশ তো। দিন কয়েক মাদ্রাজে থেকে তারপরেই নাহয় ব্যাঙ্গালোর যাওয়া যাবে। বৃন্দাবন এক্সপ্রেসের নাম শুনেছ তো? অতি চমৎকার ট্রেন। মাদ্রাজ থেকে ব্যাঙ্গালোর যাওয়াটা কোনও ব্যাপারই নয়।”
“কবে নাগাদ রওনা হব?”
“যে-দিন বলবে, সেই দিনই। কী জানো, আমারও মন বড্ড যাই-যাই করছে। বলো তো পরশু দিনই রওনা হতে পারি। টুকিটাকি যা-কিছু কেনাকাটা করবার, কাল করে নেব। তারপর পরশু দিনই ট্যাক্সি ডেকে হাওড়া স্টেশন। গুডবাই ক্যালকাটা!”
“বা রে, রিজার্ভেশন করতে হবে না?”
“রিজার্ভেশন এখন আর কোনও সমস্যাই নয়। ভিড় কেটে গেছে।”
“ঠিক আছে, পরশু না-হলে তরশু। তবে কিনা…।”
“আবার ‘তবে’ কেন? আটকাচ্ছেটা কোথায়?”
“আটকাবার কথা তো বলিনি। তবে কিনা ভাদুড়িমশাই এখন ব্যাঙ্গালোরে আছেন কি না, সেটা ঠিক জানো তো?”
“নেই, এমন কথা ভাবছ কেন?”
“এই জন্যে ভাবছি যে, ফি-বছর তো বিজয়ার পর দিন-দুয়েকের মধ্যেই তাঁর চিঠি পাই। এবারে কিন্তু লক্ষ্মীপুজোও চলে গেল, তবু তাঁর চিঠি পাইনি।”
ভদ্রমহিলা ভুল বলেননি। সত্যিই এবার চিঠি আসেনি ব্যাঙ্গালোর থেকে। কেন আসেনি, কে জানে। ভাদুড়িমশাই অসুস্থ হয়ে পড়েননি তো? নাকি ব্যাঙ্গালোর থেকে কোনও কাজ নিয়ে তিনি অন্য কোথাও গেছেন? নাকি চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু ডাক-বিভাগের গাফিলতিতে সে-চিঠি আজও আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়নি? সেও কিছু বিচিত্ৰ নয়।
বললুন, “তাই তো, বড় চিন্তায় ফেললে দেখছি। যাঁর কাছে থাকব বলে যাওয়া, গিয়ে যদি দেখি যে, তিনিই নেই, তবে তো চিত্তির!”
ভদ্রমহিলা বললেন, “এত ভাবছ কেন? ওঁর ব্যাঙ্গালোরের বাড়ির ফোন নাম্বার তো তোমার ডায়েরিতে টোকাই আছে, রাতও বেশি হয়নি, একটা ট্রাঙ্ক-কল করলেই তো হয়।”
পকেট-ডায়েরি থেকে ফোন-নাম্বারটা দেখে নিয়ে রিসিভার তুলতে যাব, ঠিক তখনই আমাকে চমকে দিয়ে ঝন্ঝন্ করে ফোন বেজে উঠল।
“হ্যালো…”
“কেমন আছেন মশাই?”
গলা শুনে চমকে উঠলুম। চারু ভাদুড়ি। এমন কিছু মানুষ আছেন, আড়াল থেকে কথা বললেও যাঁদের কন্ঠস্বর থেকেই চোখের কৌতুক আর ঠোঁটের বঙ্কিম রেখাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখে নেওয়া যায়। ভাদুড়িমশাই সেই রকমের মানুষ। বললুম, “আগে বলুন, কোত্থেকে ফোন করছেন। তারপরে আমি বলব, ভাল আছি না মন্দ আছি।”
“ব্যাঙ্গালোর থেকে নয়, আপনাদের এই কলকাতা শহর থেকেই।”
“তা হলে আমি ভাল নেই।”
“কেন, কেন?”
“আরে, মশাই, আমি তো কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়বার প্ল্যান এঁটেিেছ। এখান থেকে মাদ্রাজ যাব। তারপর সেখানে বাসন্তীর দিদির বাড়িতে দিন তিন-চার কাটিয়ে চলে যাব ব্যাঙ্গালোর। সেঁই জন্যে আপনাকে ট্রাঙ্ক-কলও করতে যাচ্ছিলুম। তা ঠিক তক্ষুনি আপনার ফোন এল। কোত্থেকে এল? না কলকাতা থেকে। অর্থাৎ কিনা আমি যাঁর টানে ব্যাঙ্গালোর যাবার প্ল্যান আঁটছিলুম, ছুটি কাটাবার জন্যে তিনিই চলে এসেছেন কলকাতায়। তা হলে আর ব্যাঙ্গালোর যাওয়া হল না, প্ল্যানের দফা রফা হয়ে গেল। এই অবস্থায় আর ভাল থাকি কী করে?”
শুনে হোহো করে হেসে উঠলেন চারু ভাদুড়ি। তারপর বললেন, “এই কথা? তা হলে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনার প্ল্যান মোটেই ভেস্তে যাচ্ছে না। আমি মোটেই ছুটি কাটাতে আসিনি। একটা কাজ নিয়ে এসেছিলুম। সেটা মিটেছে। কালই ফিরে গেলে হয়।”
“কবে এসেছেন?”
“তা দিন পনরো তো হবেই।”
“আমাকে জানাননি কেন?”
“সময় পেলুম কোথায়? আরে মশাই, সকাল থেকে রাত বারোটা অবধি হন্যে হয়ে গোটা শহর ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। না না, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দর্শনের জন্যে নয়, মহা ধুরন্ধর এক স্মাগলারের খোঁজে। এর মধ্যে একদিন আবার চন্দননগরেও যেতে হয়েছিল। সময় পেলে কি আর আপনাকে একটা ফোন করতুম না? নিশ্চয় করতুম। তা মশাই, বিশ্বাস করুন, দম ফেলবারও সময় পাইনি। যাই হোক, কাজটা আজ বিকেলে মিটল।”
“কালই চলে যাবেন?”
“কালও যেতে পারি, পরশু গেলেও ক্ষতি নেই। কী জানেন, অনেক কাল বাদে এলুম তো, তাই ভাবছিলুম যে, আরও দু’চারটে দিন এখানে কাটিয়ে গেলে নেহাত মন্দ হত না। আবার কবে আসা হবে, কে জানে।”
“আমি তো পরশুই কলকাতা ছাড়ার কথা ভাবছি।”
“বটে? তা বেশ তো, আপনারা মাদ্রাজে গিয়ে তিন-চারদিন কাটিয়ে তারপর ব্যাঙ্গালোরে চলে আসুন। তার আগেই আমি ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছে আপনাদের প্রতীক্ষায় থাকব।”
“কোথায় উঠেছেন?”
“যতীন বাগচি রোডে, আমার ছোট বোন মালতীর বাড়িতে।”
“তারা তো বেহালায় থাকত, যতীন বাগচি রোডে উঠে এল কবে?”
“তা বছর তিন-চার তো হলই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, নম্বরটা লিখে রাখুন… চোদ্দর সাতের দুয়ের বি। হলদে রঙের তিনতলা বাড়ি, পার্কের খুব কাছে। বোনের ফ্ল্যাট দোতলায়। কাল তো রবিবার। হাতে কোনও জরুরি কাজ না থাকলে সকাল সাতটার মধ্যেই এখানে চলে আসুন। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”
বললুম, “অত সকালে যাব কী করে? আমি দেরিতে ঘুমোই, আটটার আগে ঘুম ভাঙে না। চা-টা খেয়ে ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে অন্তত নটা বাজবে।”
“আরে মশাই,” ভাদুড়িমশাই অনুযোগের গলায় বললেন, “বাড়ি থেকে চা খেয়ে বেরুবেন কেন, ও-বস্তু কি আমরা খাই না? এখানে এসে চা খাবেন। আর চেষ্টা যদি করেন, তা হলে একটা দিন নিশ্চয়ই একটু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠাও বিশেষ শক্ত হবে না। দরকার হয় তো ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে শোবেন। দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটু ধরুন তো…”
বুঝলুম,পাশে কারও সঙ্গে কথা বলছেন। একটু বাদেই আবার তাঁর গলা পাওয়া গেল। “শুনুন কিরণবাবু, কাল আমার ভাগ্নে কৌশিকের জন্মদিন, তাই মালতী বলছে, দুপুরের খাওয়াটাও আপনাকে এখানেই সেরে নিতে হবে। …না না, বিশেষ কিছু আয়োজন করা হয়নি। আর হ্যাঁ, মালতী বলছে, বাসন্তীকেও নিয়ে আসুন।”
“বাসন্তী কী করে যাবে? পরশু মাদ্রাজ যাব, তার গোছগাছ আছে না?
“ঠিক আছে, তা হলে আপনি একাই আসুন। মোট কথা,দেরি করবেন না, আটটার মধ্যে আপনাকে এক্সপেক্ট করছি।”
ভাদুড়িমশাই ফোন নামিয়ে রাখলেন।
ছেলেপুলের মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সব শুনে তিনি বললেন, “কী গেরো রে বাবা! পরশু কলকাতা ছাড়ছি, ভাবলুম কাল দু’জনে মিলে কিছু কেনাকাটা করে নেব, তা তুমি তো কাল সারাটা দিনই আড্ডা দিয়ে কাটাচ্ছ, রাজ্যের ঝক্কি এখন আমাকে একাই সামলাতে হবে। তাও নাহয় সামলালুম, কিন্তু ছুটির দরখাস্তটা তো তোমাকেই করতে হবে, সেটা করবে কখন?”
“ওটা এখনই করছি না। সন্তোষকে কাল এক সময় ফোন করে জানিয়ে দেব যে, দিন কয়েকের জন্যে একটু বাইরে যাচ্ছি, তাড়াহুড়োর মধ্যে এখন লিভ অ্যাপ্লিকেশনটা দিয়ে যেতে পারলুম না, ফিরে এসে দেব।”
“অর্থাৎ কিনা তুমি একটা বেআইনি কাজ করবে, তোমার বন্ধুরা সেটার সামাল দেবেন, এই তো? চমৎকার চাকরি।”
ভদ্রমহিলা মুখ টিপে হাসলেন। আমিও হাসলুম। এইসব টিপ্পনী শুনে এককালে খুব রেগে যেতুম, এখন আর রাগি না।
