ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(২১)
মঙ্গলবার মে ৩১, ২০১১
ঘুম থেকে উঠতেই প্রমথ বলল, “কোথায় ছিলি কাল রাত্রে, ডঃ দাস তোকে ধরার চেষ্টা করছিলেন।”
ডঃ বিমল দাস কলাম্বিয়াতে ইকনমিক্স পড়ান, খুব সিনিয়র লোক। ওঁর বড় মেয়ে ডাক্তার, অনেকদিন বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটো মেয়ে ইন্দ্রাণী প্রায় আমাদের বয়সি। এমবিএ করে একটা কোম্পানিতে ভালো চাকরি করছে।
“কই আমি তো কোনও ফোন পাইনি!”
“কারণ তোর ফোন অফ ছিল। তোর ফোন অফ রাখার হ্যাবিটটা গেল না। মোবাইল ফোন রেখেছিস কেন?”
এ অভিযোগটা আমি অস্বীকার করতে পারি না। মিটিং বা সেমিনার থাকলে অনেক সময় ফোনটা বন্ধ করে রাখি, পরে চালু করতে ভুলে যাই।
“কেন ফোন করেছিলেন জানিস?”
“ডিনারে নেমন্তন্ন করার জন্যে।”
“কবে ডেকেছেন?”
“এই শুক্রবার।”
“তার মানে তো তোরশু, এত শর্ট নোটিস?”
“আমার ধারণা কেউ বোধহয় শেষ মুহূর্তে ক্যানসেল করেছে, তাই আমরা চান্স পেয়েছি।”
“এমনি ডাকছেন, না কোনও বিশেষ কারণে?”
“তুই ফোন করে জিজ্ঞেস কর না, মনে যখন প্রশ্ন জেগেছে?”
“স্টুপিডামো করিস না। যখন ফোন করলেন, তখন নেমন্তন্নের কারণটা জানতে চাইলি না! হয়তো বিবাহবার্ষিকী বা ওই ধরনের কিছু। সেই মতো একটা গিফট তো নিয়ে যেতে হবে।”
“বিগ ডিল। একটা ওয়াইনের বোতল নিয়ে যাব, চুকে যাবে।”
“ব্যাড আইডিয়া”, বলে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কী মত?”
একেনবাবু সোফার এক কোনে চোখ আধ বোজা করে কিউটিপ দিয়ে কান চুলকোচ্ছিলেন। আমার প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে বললেন, “আমার আবার কী মত স্যার, আপনাদের মত-ই আমার মত।”
“সেইজন্যেই তো আপনাকে প্রশ্ন করা, আমাদের তো মতের মিল হচ্ছে না।”
“তাহলে তো মুশকিল হল স্যার,” একেনবাবু কিউটিপটা কান থেকে বার করে বললেন, “কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল?”
“আপনি মশাই সামথিং, কোন জগতে থাকেন?” প্রমথ একটা ধমক লাগাল।
একেনবাবু অসহায় মুখ দেখে আমি বললাম, “ডঃ দাস শনিবার ডিনারে নেমন্তন্ন করেছেন, ওঁদের জন্য কী নিয়ে যাব, সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে।”
“এবার বুঝলাম স্যার, তা আপনি কী বলেন?”
“আমি বলেছি, কেন ডেকেছেন সেটা আগে জানা দরকার। তারপর গিফট কেনার কথা ভাবা যাবে।”
“এ তো স্যার খুবই যুক্তিযুক্ত কথা।” আমার কথায় সায় দিয়ে প্রমথকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন স্যার, এটা আপনি মানেন না?”
“খুবই মানি, কিন্তু বাপি ফোন করে নেমন্তন্নের কারণটা জানতে রাজি নয়।”
“তাহলে তো স্যার মুশকিল।”
“এক কাজ করুন না, আপনি তো একজন গোয়েন্দা–কেন ডেকেছেন, সেই রহস্যটা ভেদ করুন।”
.
ভাগ্যক্রমে ঠিক এই সময়ে অ্যান্ডি গুহর ফোন এল। অ্যান্ডির আসল নাম অনিন্দ্য, এখানে এসে ওটাকে অ্যান্ডি বানিয়ে নিয়েছে। কলকাতায় আমাদের সঙ্গেই কলেজে পড়ত। তারপর সিপিএ করে একটা অ্যাকাউন্টিং ফার্ম খুলেছে। সেই সঙ্গে ডাঃ দাসের ছোটো মেয়ে ইন্দ্রাণীর সঙ্গে প্রেম করছে। অ্যান্ডির কাছে নেমন্তন্নের কারণটা জানা গেল। ডাঃ দাসের এক ভাইপো কয়েকদিন আগে নিউ ইয়র্কে এসেছে। আমাদের ইউনিভার্সিটির ম্যাথম্যাটিক্স ডিপার্টমেন্টে অ্যাডমিশন পেয়েছে। ওর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যেই এই নেমন্তন্ন।
অ্যান্ডি অবশ্য ফোন করেছিল অন্য কারণে। ও ইন্ডিয়া যাবে, ভালো একজন ট্র্যাভেল এজেন্ট খুঁজছে। প্রমথকে মুরুব্বি ঠাউরেছে। প্রমথ নানান ব্যাপারে খোঁজখবর রাখে ঠিকই, কিন্তু যা জানে তার থেকেও বেশি বিজ্ঞতা জাহির করে।
