লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৭)

সদানন্দবাবু কিছুক্ষণ ধরেই উশখুশ করছিলেন। বুঝতে পারছিলুম, তিনি এবারে উঠে পড়তে চান। সেটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ভাদুড়িমশাইও। বললেন, “কী হল সদানন্দবাবু, এত ঘনঘন ঘড়ি দেখছেন কেন?”

 

“বাঃ,” সদানন্দবাবু বললেন, “বাড়ি ফিরতে হবে না?”

 

“তার জন্যে এত তাড়া কীসের, সবে তো পৌনে আটটা বাজে। অরুণ ফিরে আসুক, তারপর উঠবেন।”

 

“ওরে বাবা, তা হলেই হয়েচে। তাঁর তো শুনিচি ধর্মতলার চেম্বার থেকে ফিরতে-ফিরতে আজকাল এগারোটা-বারোটা বেজে যায়।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আজ ছুটির দিন, চেম্বার বন্ধ। অরুণ এক বন্ধুর বাড়িতে গেছে, এক্ষুনি এসে পড়বে।”

 

“কিন্তু আর যদি দেরি করি তো ট্রাম-বাস পাব তো?”

 

বললুম, “ও-সব নিয়ে মাথা ঘামবার দরকার নেই, আমি আপনাকে ট্যাক্সিতে করে বাড়িতে পৌঁছে দেব অখন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ট্যাক্সি নেবারও দরকার হবে না, আমি তো বলেইছি যে, কৌশিক আপনাদের ছেড়ে দিয়ে আসবে।”

 

কৌশিক বলল, “সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন।” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মামাবাবু, তোমার কী মনে হয়? গুলি চালিয়ে টায়ার ফাটানো, আর নার্সিং হোমে নিয়ে যাবার অছিলায় ইনজিওর্ড ড্রাইভারটিকে এখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা, এ দুটো কি একই লোকের কাজ?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, আমার তা মনে হয় না।”

 

‘কেন মনে হয় না?”

 

“ব্যাপারটা যদি একটু ভাল করে ভেবে দেখিস, তা হলে তোরও তা মনে হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রথমে ভেবে দ্যাখ, অ্যাম্বাসাডর গাড়ির চারটে টায়ারের কোন্ টায়ারের উপরে গুলি চালানো হয়েছিল।”

 

“সামনের বাঁ-দিকের টায়ারের উপরে।”

 

“ভাল কথা। এখন আমাদের ধরে নিতে হবে যে, গুলিটা কেউ রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থেকে চালায়নি। কথাটা এই জন্যে বলছি যে, যে-রাস্তায় লোক-চলাচলের কামাই নেই, সেখানে ওইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি চালানো খুবই রিস্কি ব্যাপার, তাতে ধরা পড়ে যাবার ভয় আছে।”

 

“তা হলে কি অন্য কোনও গাড়ি থেকে গুলি চালানো হয়েছিল?”

 

“সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে আবার প্রশ্ন উঠবে যে, তা যদি চালানো হয়ে থাকে তো কীভাবে চালানো হল?”

 

“কেন?” আমি বললুম, “অ্যাম্বাসাডরটাকে ওভারটেক করার সময় চালানো যায় না?”

 

“তা যায়, তবে তার জন্যে নিয়ম ভাঙতে হয়।” ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অন্তত ওভারটেক করার যা নিয়ম, সেইভাবে ওভারটেক করলে সেটা পারা যায় না। আপনি তো মশাই গাড়ি চালান, তা সামনের গাড়িকে ওভারটেক করতে হলে কোন্ দিক দিয়ে আপনি তা করেন?

 

“কেন, ডান দিক দিয়ে।”

 

“ব্যস্, এবার ভেবে দেখুন, ডান দিক দিয়ে যে-গাড়িকে আপনি ওভারটেক করছেন, গুলি চালিয়ে সেই গাড়ির বাঁ-দিকের টায়ার আপনি ফাটাতে পারবেন? না মশাই, আপনি যদি হরিহর বাঁড়ুজ্যের মতন চ্যাম্পিয়ন-শুটার হতেন, তা হলেও ওটা আপনার অসাধ্য হত। ট্রাউজার্সের ডান পকেটে বরং বাঁ-হাত ঢোকানো যায়, কিন্তু না, ওটা মশাই পারা যায় না।”

 

কৌশিক বলল, “তা হলে কি বাঁ-দিক দিয়ে ওভারটেক করেছিল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা বে-আইনি। তবে হতে পারে যে, এটা না-করে তার উপায় ছিল না।”

 

আমি বললুম, “উপায় ছিল না বলছেন কেন? এমন তো নয় যে, অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে একটা গাড়িকে থামাবার জন্যে তার বাঁ দিকের টায়ারেই গুলি চালাতে হবে। গাড়িটার ডান দিকের টায়ার ফাটিয়েও স্বচ্ছন্দে সে ওই একই অ্যাক্সিডেন্ট ঘটাতে পারত। সে-ক্ষেত্রে তাকে ট্রাফিক-রুল ভেঙে বাঁ-দিক দিয়ে ওভারটেক করতে হত না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “একটা কথা বলব?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলুন।”

 

“আমি মশাই সিধে-সরল মানুষ, তাই একটা কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।”

 

“কোন্ কথাটা বুঝতে পারছেন না?”

 

“বুঝতে পারছি না যে, গুলি চালাবার জন্যে ওভারটেক করতে হবে কেন। পিছন থেকে গুলি চালিয়েও তো টায়ার ফাটিয়ে দেওয়া যায়।”

 

“তা যায়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সে-ক্ষেত্রে ফাটাতে হয় পিছনের টায়ার। তাতে তো বড়-রকমের কোনও অ্যাক্সিডেন্ট ঘটানো যাবে না।”

 

“কেন যাবে না?”

 

“এই জন্যে যাবে না যে, পিছনের চাকার সঙ্গে স্টিয়ারিঙের কোনও সম্পর্ক নেই। স্টিয়ারিঙের যা-কিছু সম্পর্ক, তা শুধু সামনের দুটো চাকার সঙ্গে। আচমকা যদি সামনের টায়ার ফাটে, ড্রাইভার তা হলে টাল সামলাতে পারে না, কেন না, গাড়ির ব্যালান্স সে-ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যায়। পিছনের টায়ার ফাটলে সেটা হয় না। আর তা ছাড়া, পিছন থেকে গুলি চালাবার আরও একটা অসুবিধে রয়েছে। ওরে কৌশিক, কী অসুবিধে বল্ তো।”

 

কৌশিক বলল, “এ তো খুবই সহজ কথা। ওভারটেক করতে-করতে যদি গুলি চালাই, তো যে গাড়িটাকে ওভারটেক করছি, তার আড়ালে থাকবার সুবিধে পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু পিছন থেকে গুলি চালালে সেই কভারটা পাওয়া যাচ্ছে না?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক্সলেন্ট। ব্যাপারটা তা হলে এই দাঁড়াল যে, ওভারটেকই করা হয়েছে, তবে ডান দিক দিয়ে নয়, বাঁ দিক দিয়ে।”

 

বললুম, “নর্মালি যে-ভাবে ওভারটেক করা হয়, সেইভাবে, অর্থাৎ ডান দিক দিয়ে যে ওভারটেক করা হয়নি, তা তো বুঝতে পারছি। কিন্তু সেটা করা হল না কেন?”

 

“নিশ্চয় সেটা করতে পারেনি। হতে পারে যে, যে-গাড়িটাকে ওভারটেক করা হবে, সেটা রাস্তার একেবারে ডান দিক ঘেঁষে চলছিল। কিংবা তার ড্রাইভার বুঝতে পেয়েছিল যে, পিছনের গাড়িটার মতলব ভাল নয়। বাঁ-দিক থেকে নিজের গাড়িটাকে সে তাই একটু ডাইনে সরিয়ে নিয়ে যায়। মোট কথা, পিছনের গাড়িটাকে সে পাস দেয়নি। তবে কিনা, এই সবই তো আসলে রি-কনস্ট্রাকশনের ব্যাপার; ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছিল, স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতে সেটা সাজিয়ে নিতে হচ্ছে।”

 

“তা ছাড়া আর উপায় কী।” আমি বললুম, “এ-সব ক্ষেত্রে কিছু-না-কিছু গেস্-ওয়ার্ক তো করতেই হয়। তো, রি-কনস্ট্রাকশন থেকে যা দাঁড়াল, তাতে তো আমরা ধরে নিতে পারি যে, বাঁ-দিক দিয়ে গাড়িটাকে ওভারটেক করা হয়েছিল, আর গুলিটাও চালানো হয়েছিল সেই সময়েই।”

 

শুনে, ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি-তক্ষুনি কিছু বললেন না। মিনিট খানেক একেবারে ঝিম মেরে বসে রইলেন। তারপর, নিচু গলায়, অনেকটা যেন নিজেকে শুনিয়ে, ধীরে-ধীরে বললেন, “না, সে-ব্যাপারেও একেবারে নিশ্চিন্ত হবার উপায় নেই।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “যাচ্চলে! এ তো মহা মজার ব্যাপার হল দেখচি! এই তো বললেন ডান দিক দিয়ে ওভারটেক করেনি, সেটা করেচে বে-আইনিভাবে বাঁ-দিক দিয়ে, আবার এখন বলচেন যে, সে-ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত হবার উপায় নেই। এদিকে আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা পিছন থেকে গুলি চালিয়েচে বলেও মানতে পারচেন না।”

 

“কী করে মানব? সারাক্ষণই যেখানে ভিড় লেগে রয়েছে, সেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি করলে বিস্তর লোক সেটা দেখতে পেত, আর তাদের মধ্যে কেউ-না-কেউ সে-কথা পুলিশকে জানাতও। কিন্তু কই, পুলিশকে তো অমন কিছু কেউ এখনও বলেনি। তার থেকে মনে হচ্ছে যে, এটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি চালাবার ব্যাপার নয়। আর ওই পিছন থেকে গুলি করা? তা যদি করত, তবে সেটাও কারও-না-কারও চোখে পড়ত ঠিকই, কেন না সে-ক্ষেত্রেও তার কোনও আড়াল-আবডাল থাকত না। সদানন্দবাবু, যার ধরা পড়বার ভয় রয়েছে, সে কি কখনও পাঁচজনের চোখের সামনে গুলি চালায়? আর তা ছাড়া, পিছন থেকে গুলি চালিয়ে যে সামনের টায়ার ফাটানো খুবই শক্ত ব্যাপার, তাও তো আমি বলেছি।”

 

আমি বললুম, “তা বলেছেন বটে। তবে, ধরা পড়বার পরোয়া যদি কেউ না করে, তা হলে কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়ে খুব স্বচ্ছন্দেই যে-কোনও গাড়ির সামনের টায়ার ফাটিয়ে দেওয়া যায়। আপনি বলবেন, আসলে আপনি বলেছেনও যে, তা-ই যদি হয়ে থাকে তবে পুলিশকে সে-কথা কেউ জানায়নি কেন? কিন্তু সেটা কি একটা জোরালো যুক্তি হল? পুলিশের উপরে কি আর সাধারণ মানুষের সেই আস্থা এখন আছে? চোখের সামনে কত অনাচারই তো কত লোক দেখতে পায়। কিন্তু পুলিশকে তারা তা জানায় নাকি? জানায় না। কেন জানায় না জানেন? প্রথমত তাদের অনেকের মনেই এই একটা ধারণা জন্মে গেছে যে, জানিয়ে কোনও লাভ নেই। দ্বিতীয়ত, তারা ভয় পায় যে, জানাতে গেলেই নাহক একটা ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে হবে।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কথাটা আপনি নেহাত মন্দ বলেননি, কিরণবাবু, কিন্তু আপনার যুক্তির মধ্যে একটা লুপহোল রয়েছে।”

 

“কী লুপহোল?”

 

“বলছি। চোখের সামনে একটা অপরাধ ঘটতে দেখেও অনেক ক্ষেত্রে সেটা পুলিশকে জানায় না বটে, কিন্তু কেউ যে কিছু জানাবেই না, এমন কোনও নিশ্চয়তাও তো নেই। ফলে, অপরাধীকে যথাসম্ভব সতর্ক থাকতেই হয়। এমন প্রিকশান তাকে নিতেই হয়, যাতে তার অপরাধটা কারও চোখে না পড়ে।”

 

কৌশিক বলল, “কিন্তু মামাবাবু, কিরণমামা যা বলছিলেন, ধরা পড়বার পরোয়াই যদি কেউ না করে? তা হলে তো তার পক্ষে আড়াল-আবডাল না-খুঁজেই এ-কাজ করা সম্ভব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধরা পড়বার ভয় কারা করে না? একমাত্র টেররিস্টরাই করে না। কিন্তু এখনও পর্যন্ত যেটুকু যা ঘটেছে, তাতে আমি লিখে দিতে পারি যে, এ-কাজ কোনও টেররিস্ট গ্রুপের নয়। এরা হিসেবি লোক। এরা আটঘাট বেঁধে কাজ করে। এরা সামনা-সামনি কাউকে খুন করে না। খুন করবার আগে এরা তাকে ফল্স নাম্বার-প্লেট-লাগানো গাড়িতে উঠিয়ে সকলের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এ পর্যন্ত যা দেখলুম, তাতে আমার সন্দেহ নেই যে, যাকে আমরা ক্ল্যাসিক্যাল ক্রাইম বলি, এদের কাজেকর্মে তার ছাপটা একেবারে স্পষ্ট। এ হচ্ছে পাকা মাথার নির্ভুল পদক্ষেপ। তবে হ্যাঁ, একটা ভুল এরা ইতিমধ্যে করেছে।”

 

“সেটা কী?”

 

“আমাকে ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখেছে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এটাকে কিন্তু পাকা মাথার কাজ বলে ভাবতে পারছি না।”

 

কৌশিক বলল, “বাব্বা, তুমি বটে নিজের সম্পর্কে বড়াই করতে পারো!”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “করতেই পারেন। উঃ, যে-ভাবে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন সেবার!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, আমাকে থ্রেটন করে চিঠি লিখেছে বলেই যে ও কথা বলছি, তা নয়, আসলে আদৌ যে চিঠি লিখেছে, সেটাই হয়েছে কাঁচা কাজ।”

 

বললুম, “এ-কথা বলছেন কেন?”

 

“এই জন্যে বলছি যে, ওই চিঠির মধ্যে দিয়েই একটা ভাইটাল ক্লু সে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে।”

 

“কিন্তু চিঠিটা তো হাতে-লেখা নয়, ওটা তো টাইপ-করা চিঠি।”

 

“ঠিক। কিন্তু যে টাইপরাইটারে ওটা টাইপ করা হয়েছে, তার ছোট হাতের ‘এ’ আর বড় হাতের ‘টি’ যে ভাঙা, সেটা ভুলে যাচ্ছেন কেন?…এটা একটা মস্ত বড় ক্লু।”

 

শুনে, চকিতে একটা প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল। কিন্তু কী প্রশ্ন, ভাদুড়িমশাই সেটা নিশ্চয় আঁচ করতে পেরেছিলেন। নইলে প্রসঙ্গটা তিনি ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন না। বললেন, “ও-কথায় পরে আসা যাবে। তার আগে ওভারটেকিংয়ের কথাটা নিয়ে ভাবুন। আমি বলছি যে অ্যাম্বাসাডরটিকে যে বাঁ-দিক দিয়ে অর্থাৎ বে-আইনিভাবে ওভারটেক করা হয়েছিল, সে-ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত হবার উপায় নেই। কথাটা কেন বলছি, জানেন?”

 

“কেন?”

 

“এই বাড়ির সামনে রাস্তার বাঁ-দিকে পরপর কয়েকটা গাড়ি রোজই সকাল থেকে পার্ক করা থাকে। ফলে, এ গানে যদি একটা গাড়ি আর-একটা গাড়িকে ওভারটেক করতে যায়, তাও বাঁ-দিক দিয়ে, তা হলে র্ক-করা গাড়িগুলোর মধ্যে যে কটা ওনার-ড্রিন নয়, তাদের ড্রাইভারদের কারও-না-কারও সেটা মনে থাকবেই। আজই বাড়ি থেকে বেরুবার সময় ড্রাইভারদের আমি জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, কাল সকালে যখন অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে, তখন ওইভাবে অর্থাৎ বাঁ-দিক দিয়ে অন্য-কোনও গাড়ি অ্যাম্বাসাডরটাকে ওভারটেক করে বেরিয়ে গিয়েছিল কি না। তাতে একবাক্যে প্রায় সকলেই বলল যে, না, ওভাবে কাউকে ওভারটেক করতে তারা দেখেনি।”

 

“তা হলে? এটা তা হলে বাঁ-দিক দিয়ে ওভারটেকিংয়ের ব্যাপারও নয়? বাঁ-দিকের টায়ারে তা হলে গুলি লাগল কী করে?” প্রশ্নটা কৌশিকের।

 

“কেন, ওভারটেক না-করে কি বাঁ-দিক থেকে গুলি চালানো যায় না?”

 

“রাস্তায় দাঁড়িয়ে? পাঁচজনের চোখের সামনে?”

 

“তা ছাড়াও একটা উপায় আছে।”

 

“কী উপায়?”

 

তীব্র চোখে কৌশিকের দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “ক্রিমিন্যালের মনটা একটু বোঝবার চেষ্টা কর কৌশিক। নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে তার যে, তোকে যদি এই কাজটা করতে বলা হত, আর তুই যদি দেখতি যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি করলে ধরা পড়ে যাবি, আবার ওভারটেক করাও সম্ভব হচ্ছে না, তা হলে তুই কী করতি?”

 

ঝাড়া এক মিনিট চুপ করে রইল কৌশিক। তারপর আস্তে-আস্তে মুখ তুলে মামাবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলি করতুম না, কেন না তাতে ধরা পড়বার ভয় রয়েছে। এদিকে আবার ওভারটেক করতেও পারছি না। এই তো?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“আচ্ছা, মামাবাবু, বাঁ-দিক দিয়ে যে ওভারটেক করতে পারছি না, তার কারণ, বাঁ-দিকে পরপর কয়েকটা গাড়ি ওখানে পার্ক করা রয়েছে, কেমন?”

 

“এগজ্যাক্টলি।”

 

আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইল কৌশিক। তারপর একেবারে হঠাৎই সে হাসতে শুরু করল। সদানন্দবাবু বললেন, “হাসচ কেন? এ কি হাসির ব্যাপার? মামাবাবু যে প্রশ্ন করেচেন, বেশ ভেবেচিন্তে তার অ্যানসার দাও দিকি। অত হেসো না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন হাসছে তা বুঝতে পারছেন না সদানন্দবাবু? উত্তরটা ও পেয়ে গেছে।”

 

কৌশিক বলল, “হ্যাঁ, মামাবাবু, পেয়ে গেছি।”

 

“তা হলে বলে ফ্যাল্।”

 

“বলছি। জায়গাটা মোড়ের কাছে, সবসময়ে ভিড়ভাট্টা লেগে থাকে। যেমন গাড়ির ভিড়, তেমন লোকের ভিড়। আগেই তাই আমি বুঝে যেতুম যে, ওখানে ওভারটেক করা যাবে না। আর তাই…’

 

“আর তাই কী?”

 

“পার্ক-করা ওই গাড়িগুলির যে-কোনও একটার মধ্যে বসে অপেক্ষা করতুম ওই অ্যাম্বাসাডর গাড়িটার জন্য। ব্যস্, তারপর ওই গাড়িটা ওখানে এসে পৌঁছবামাত্র গুলি চালাতুম।”

 

“রাইট ও!” নিজের সোফা থেকে উঠে এসে কৌশিকের পিঠ চাপড়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার বিশ্বাস, ঠিক তা-ই করা হয়েছে। অর্থাৎ গুলি চালানো হয়েছে রাস্তার বাঁ-দিকে পার্ক-করা ওই গাড়িগুলিরই যে-কোনও একটার ভিতর থেকে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *