লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৬)

ফের রাস্তা পেরিয়ে ভি.আই.পি. রোডের পশ্চিম দিকে চলে এলুম আমরা। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার তো লেখার তাড়া রয়েছে। এক্ষুনি যদি বাড়ি ফিরতে চান তো কৌশিক গিয়ে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে।”

 

যা দেখেছি তাতে যে আজ আর লিখতে বসতে পারব না, সেটা বুঝে গিয়েছিলুম। বললুম, “পৌঁছে দেবার দরকার হবে না, কাঁকুড়গাছি থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেব। কিন্তু তার জন্যে ব্যস্ত হবার দরকার নেই। চলুন, বড্ড ঘেমে গেছি, মালতীদের ফ্ল্যাটে গিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক।”

 

মালতীদের ফ্ল্যাটে পৌঁছতে-পৌঁছতে সাড়ে পাঁচটা বাজল। ডেডবডি সম্পর্কে যা-যা করণীয়, লোকাল থানার লোকটিকে সে-সব বুঝিয়ে দিয়ে শোভন চৌধুরিও তাঁর জিপে উঠে আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে চলে এলেন। সাততলায় উঠে লিফটের সামনে যে শান্ত চেহারার মানুষটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম, মনে হল তাঁকে আগে কোথাও দেখেছি। আমরা বেরিয়ে আসতে মৃদু হেসে তিনি লিফটের মধ্যে ঢুকে বোতাম টিপে নীচে নেমে গেলেন।

 

ড্রইংরুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলুম, “ভদ্রলোক কে রে কৌশিক? কেমন যেন চেনা-চেনা মনে হল।”

 

“বাঃ, উনিই তো ডঃ মিরচান্দানি। বিরাট সাইকিয়াট্রিস্ট।”

 

“তা-ই বল্। গত হপ্তায় টিভিতে ওঁর ছবি দেখলুম। কী একটা সেমিনারে যেন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন।”

 

“আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। চৌরঙ্গিতে টাইগার সিনেমা হলের পাশের একটা বাড়িতে চেম্বার। বিকেল ছ’টা থেকে সেখানে বসেন। তবে শুনছি যে, ওঁকে দিয়ে দেখাতে হলে দেড়-দু’মাস আগে থাকতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বাবা রে! ভাগ্যিস আমরা কেউ ওঁর পেশেন্ট নই।”

 

কাজের মেয়েটি কফি দিয়ে গেল। কফি খেয়ে শোভন চৌধুরি বললেন, “আমাকে কিন্তু এবারে উঠতে হবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাবার আগে কয়েকটা কথা শুনে নাও। কাল সকালে অ্যাক্সিডেন্টটা হবার পরে যে ভদ্রলোক নার্সিংহোমে পৌঁছে দেবেন বলে ওই লোকটিকে তাঁর গাড়িতে তুলে নেন, কৌশিক তাঁর ফিয়াট-গাড়ির নম্বরটা টুকে রেখেছিল। সেটা তোমাকে দিয়েছি। গাড়িটা ট্রেস করে যত তাড়াতাড়ি পারো আমাকে জানাবে। দুই, যে-গাড়িটার অ্যাক্সিডেন্ট হল, সেটা তো থানায় রয়েছে। তার মালিকের নাম জেনে নাও। এটাও আমার তাড়াতাড়ি জানা দরকার। তিন, এটা তো বোঝাই যাচ্ছে যে, অ্যাম্বাসাডর গাড়ির ইনজিওর্ড ড্রাইভারকে এখান থেকে জোর করে তুলে নেওয়া হয়েছিল কেন। নার্সিং হোমে পৌঁছে দেবার জন্যে নয়, খুন করবার জন্যে। ড্রাইভারটির পরিচয় আমাদের জানা দরকার।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “সেটা কীভাবে জানা যাবে?”

 

“আর-পাঁচটা ব্যাপারে তোমরা যে-ভাবে জানবার চেষ্টা করো, এ-ক্ষেত্রেও সেইভাবে চেষ্টা করবে।”

 

“অর্থাৎ কাগজে ওর ছবি ছেপে বিজ্ঞাপন দেব, কেমন?”

 

“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইংরিজি বাংলা সব কাগজেই ছবি সমেত বিজ্ঞাপন দেবে। আজ অবশ্য ছুটির দিন, কাগজের আপিসে বিজ্ঞাপন-বিভাগ আজ সম্ভবত খোলা পাবে না। কিন্তু কাল অতি অবশ্য বিজ্ঞাপনটা দেওয়া চাই, যাতে পরশু সকালেই ওটা বেরিয়ে যায়।”

 

“আর-কিছু বলবেন?”

 

“না। আপাতত এই যথেষ্ট। তবে হ্যাঁ, গাড়ি দুটোর ব্যাপারে কাল সকালের মধ্যেই তোমার কাছ থেকে কিছু খবর পাব বলে আশা করছি।”

 

“খবর পেলেই আপনাকে জানাব।”

 

শোভন চৌধুরি বেরিয়ে গেলেন।

 

তার মিনিট দু’-তিন বাদেই ঘরে এসে ঢুকলেন সদানন্দবাবু। সোফার উপরে আরাম করে বসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বউমার কাছে শুনলুম পুলিশের ফোন পেয়ে আপনারা শ্রীভূমির ওদিকে গেছেন। তা সেটা যে কোথায়, তা তো জানি না। তাই ভাবলুম, যেখানেই গিয়ে থাকুন, কাজ শেষ করে এখেনে চলে আসবেন নিশ্চয়। চুয়াল্লিশ নম্বর বাস ধরে তাই এখেনেই চলে এলুম।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ করেছেন। কফি চলবে?”

 

“কফি আমি খাই না, ওতে ঘুমের বড্ড ব্যাঘাত হয়। চা’ও খেয়ে বেরিয়েচি, এখন আর চলবে না। কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো, আবার কিছু ঘনিয়ে উঠল নাকি?”

 

“কালকের সেই ড্রাইভারটির কথা মনে আছে?”

 

“তা মনে আছে বই কী।” সদানন্দবাবু বললেন, “চোখে অবশ্য দেখিনি। তাকে তো শুনলুম…”

 

“নার্সিং হোমে পৌঁছে দেবেন বলে এক ভদ্রলোক তাকে তাঁর গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন।”

 

“সে তো আমিও শুনিচি। তাকে পাওয়া গেছে?”

 

“তা গেছে।” কৌশিক বলল, “তবে জ্যান্ত অবস্থায় নয়।”

 

“অ্যাঁ!” ভয় পেয়ে গেলে সদানন্দবাবু সচরাচর যা করে থাকেন, এ-ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটল না। মেঝে থেকে পা দু’খানা সড়াক করে তুলে নিয়ে সোফার উপরে জোড়াসন হয়ে বসলেন। খানিকক্ষণ তাঁর কোনও বাক্‌স্কৃতি হল না; তারপর মিনিট খানেক বাদে একটু ধাতস্থ হয়ে নিয়ে বললেন, “বলো কী হে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভি.আই.পি. রোডের পাশের খাল থেকে তার ডেডবডি উদ্ধার করা হয়েছে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “উরি বাবা রে বাবা! কাল সকালেও লোকটা জ্যান্ত ছিল, আর এরই মধ্যে সে ডেড! এ তো মহা মুশকিলের ব্যাপার হল মশাই। … দিন, এক কাপ কফিই দিন, খেয়ে দেখি, যদি তাতে টনিকের কাজ হয়।”

 

কৌশিক গিয়ে কফির কথা বলে এল। তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা কথা কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, মামাবাবু।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী জিজ্ঞেস করবি, কর।”

 

“ভি.আই.পি. রোডের পাশের খালে যে একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে, আমাকে ফোন করবার সময় শোভন চৌধুরি সে-কথা খুলে বলেননি। তোমাকে বলেছিলেন?”

 

“না, বলেননি। শুধু বলেছিলেন যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি যেন ভি.আই.পি রোড ধরে শ্রীভূমির কাছাকাছি চলে যাই।”

 

“তবু আসল ঘটনাটা জানবার আগে তুমি বলেছিলে যে, ব্যাপারটা তুমি আঁচ করতে পেরেছ। ঠিক কী তুমি আঁচ করেছিলে, বলো তো।”

 

“আঁচ করেছিলুম যে, কাল সকালের অ্যাক্সিডেন্টে যে-লোকটি জখম হয়েছে, তাকে আইডেনটিফাই করতে হবে। তবে সেটা যে তার ডেডবডি দেখে আইডেনটিফাই করার ব্যাপার, এতটা অবশ্য বুঝতে পারিনি।”

 

“কিন্তু মামাবাবু,” কৌশিক বলল, “জ্যান্তই হোক আর মরাই হোক, আদৌ যে তাকে শনাক্ত করতে হবে, এটা তুমি বুঝলে কী করে?”

 

“বাঃ, এটা কেন বুঝব না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “শোভন ওই যে বলল যে, যাবার সময় তোকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে যাই, তাতেই তো ব্যাপারটা বুঝে গেলুম।”

 

আমি বললুম, “বেশ কথা, আপনি বুঝে গেলেন। তাতে কী প্রমাণ হল? না আপনার আই কিউ আমাদের চেয়ে বেশি। এখন দয়া করে যদি আমাদেরও একটু বুঝিয়ে বলেন তো বড় ভাল হয়।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাচ্চলে, এর মধ্যে আই.কিউ. বেশি-কমের কী আছে, এ তো একেবারে জলের মতো সোজা জিনিস। ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখুন দেখি। ইনজিওর্ড ড্রাইভারটিকে কি আপনি দেখেছেন?”

 

বললুম, “না, আমি দেখিনি।”

 

“শুধু আপনি কেন, আমিও দেখিনি। দেখেননি সদানন্দবাবুও।”

 

“অরুণও দেখেনি।”

 

“ঠিক কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা কেউই তাকে দেখিনি। সাততলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে, শুধু একটা ভাঙাচোরা গাড়িই আমরা দেখতে পেয়েছিলুম। ইনজিওর্ড ড্রাইভারটিকে দেখেছিল একমাত্র কৌশিক। তার কারণ, সে নীচে নেমে গিয়েছিল। পরে সে যখন উপরে এসে জানায় যে, ড্রাইভারটির কপাল কেটে গেছে আর বুড়োমতন একজন ভদ্রলোক তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে নার্সিং হোমে পৌঁছে দিতে গেছেন, একমাত্র তখনই আমি আপনাকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নামি। কিন্তু নীচে তখন শুধু ভাঙাচোরা গাড়িটাই ছিল। না ছিল সেই ইনজিওর্ড ড্রাইভার, না ছিলেন সেই উপকারী ভদ্রলোকটি। …তা এর থেকে আপনি কী বুঝলেন?”

 

বললুম, “এর থেকেও কিছু বুঝবার আছে নাকি?”

 

“আছে, মশাই, আছে। অন্তত এইটুকু বুঝবার আছে যে, আমাদের মধ্যে একমাত্র কৌশিকের পক্ষেই ওই ড্রাইভারটিকে শনাক্ত করা সম্ভব।”

 

“তা বটে।”

 

“সুতরাং শোভন যখন জানিয়েছে যে, যাবার সময় আমি যেন কৌশিককে সঙ্গে করে নিয়ে যাই, আর কৌশিককেও সে আমার সঙ্গে ভি.আই.পি. রোড ধরে যাবার কথাটা বলে রেখেছে, তখনই বুঝে নিলুম, এটা সেই ড্রাইভারকে শনাক্ত করার ব্যাপার।”

 

বললুম, “কিন্তু খালের মধ্যে যে লাশ পাওয়া গিয়েছে, সেটা যে সেই ড্রাইভারেরই লাশ, শোভন চৌধুরিরই বা এমন সন্দেহ হল কেন? তিনিও তো সেই ড্রাইভারটিকে আগে কখনও দেখেননি।”

 

“সন্দেহ হল লাশের কপালের কাটা দাগটা দেখে। এ-বাড়ি থেকে কাল যখন আমি শোভনকে ফোন করি, তখন অ্যাক্সিডেন্টের কথাটা জানাতে গিয়ে আমি তাকে বলেছিলুম যে, ড্রাইভারের কপাল কেটে গেছে।”

 

কাজের মেয়েটি কফি দিয়ে গেল। সদানন্দবাবু দুধ-চিনি মেশানো চা খান না বটে, কিন্তু দুধ-চিনি-মেশানো কফি নিয়ে তাঁকে কোনও আপত্তি করতে দেখা গেল না। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “বাঃ, এ তো দেখছি দিব্যি জিনিস।” সোফা থেকে ফের পা নামিয়ে বসায় বুঝতে পারলুম যে, জ্যান্ত একটা লোক রাতারাতি ডেড হয়ে যাওয়ার খবর শুনে ভদ্রলোক খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু কফিটা সত্যি রেস্টোরেটিভের কাজ করেছে। সম্ভবত তিনি ভাবতে শুরু করেছেন যে, চারদিকে যতই খুনোখুনি হোক, ভাদুড়িমশাই যখন পাশেই রয়েছেন, তখন অন্তত এখানে কোনও বিপদই তাঁকে ছুঁতে পারবে না।

 

সদানন্দবাবুর কফি খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। শূন্য পেয়ালাটিকে সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সকালবেলায় ভাদুড়িমশায়ের সঙ্গে কোথায় যাওয়া হয়েছিল মশাই?”

 

“দক্ষিণ কলকাতায়।”

 

“তা তো বুঝলুম, কিন্তু গেসলেন কেন?”

 

পাশের ঘরের ফোনটা দু’-চার বার বেজে উঠে থেমে গেল। “হ্যালো” শব্দটা শুনে বুঝতে পারলুম, রান্নাঘর থেকে মালতী গিয়ে ফোন ধরেছে। একটু বাদেই ড্রইংরুমে ঢুকে মালতী বলল, “তোমার ফোন, দাদা।”

 

ভাদুড়িমশাই পাশের ঘরে গিয়ে ফোন ধরলেন।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কেন গেসলেন বললেন না তো?”

 

বললুম, “এই ব্যাপারেই একটা খোঁজ করতে একজনের কাছে গিয়েছিলুম।”

 

“সে কি আর আমি বুঝতে পারিনি ভেবেছেন? তা যাঁর কাছে গেসলেন, তাঁকে পেলেন?”

 

“পেয়েছি, কিন্তু কাজ বিশেষ এগোয়নি।”

 

“কাজ কি আর সহজে এগোয় মশাই?” সদানন্দবাবু বললেন, “আস্তে আস্তে এগোয়। তবে হ্যাঁ, ভাদুড়িমশাই যখন রয়েচেন, তখন আর ভাবনা নেই। শেষ পর্যন্ত ব্যাটাদের উনি ঠিক শায়েস্তা করে ছাড়বেন। কী, ঠিক বলিনি?”

 

সদানন্দবাবুর প্রশ্নের উত্তর এবারেও দেওয়া হল না। কেন না, ফোনের কথা সেরে ভাদুড়িমশাই ঠিক এই সময়েই বসবার ঘরে এসে ঢুকলেন। মুখ দেখে মনে হল একটু চিন্তিত। বললুম, “কী ব্যাপার?”

 

“শোভন ফোন করেছিল। বলল, ফিয়াট-গাড়িটার নাম্বার প্লেট ফল্স। তবে অ্যাম্বাসাডরের মালিককে ট্রেস করতে পারা গেছে। মালিকের নাম অবধেশপ্রসাদ রুংতা। মাইকা-মার্চেন্ট। …কিরণবাবু, রুংতা-পদবিটা আজ দু’বার শুনলুম। প্রথমবার কোথায় শুনেছিলুম বলুন তো?”

 

বললুম, “প্রকাশ চৌহানের আপিসে। আমরা গিয়ে তাঁর আপিস-ঘরে ঢুকতেই সে বলেছিল, আর ইউ কামিং ফ্রম মিস্টার রুংতা? কী, ভুল বললুম?”

 

“সেন্ট পারসেন্ট কারেক্ট।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *