(৩)
শোভন চৌধুরি এলেন চারটের খানিক বাদে। আমাদের দুপুরের খাওয়া তো বটেই, আহারাস্তিক আড্ডা কাম বিশ্রামের পর্বও তখন শেষ। সদানন্দবাবু আর আমি সবে উঠি-উঠি করতে শুরু করেছি, এই সময় ডোর-বেল বাজল। দরজা খুলে যে ভদ্রলোককে সঙ্গে করে কৌশিক এসে ড্রইংরুমে ঢুকল, তাঁর বয়স বছর-চল্লিশের বেশি হবে না। শরীরে মেদ জমেনি, মুখখানা ধারালো, চোখে সামান্য উদ্বেগের ছাপ, কানের পাশের চুলে অল্প-স্বল্প পাক ধরেছে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোসো শোভন, অনেক দিন বাদে আবার দেখা হল, তা তোমার খবর কী?”
“আগে আপনার খবর বলুন। শরীর-স্বাস্থ্য কেমন চলছে?”
“দেখে কী মনে হয়?”
“দেখে তো মনে হয় অ্যাজ ইয়াং অ্যাজ এভার।” শোভন চৌধুরি হাসলেন। “না দাদা, আপনি আর বুড়ো হলেন না।”
“থ্যাংক্স ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট। নাও, এখন তোমার খবর বলো।”
“আমার খবর খুব ভাল নয়, দাদা।”
“কেন?”
“তাও বুঝিয়ে বলতে হবে? বোম্বাইয়ের জের মিটতে-না-মিটতেই কলকাতায় যা ঘটে গেল, তার পরে আর ভাল থাকার উপায় নেই। সবাই সারাক্ষণ একেবারে তটস্থ হয়ে আছি। সব ভাবনা চুলোয় গেছে, এখন শুধু বিস্ফোরণ আর বিস্ফোরণ!”
“কিন্তু বোমা-বারুদ তো এদিকে-ওদিকে কিছু কম পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তা পাওয়া যাচ্ছে।” শোভন চৌধুরি ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “কিন্তু উড়ো ফোন পাওয়া যাচ্ছে তার চতুর্গুণ। যত রাজ্যের বেসলেস খবর! ফোনে কেউ নিজের নামটা পর্যন্ত বলে না, স্রেফ অমুক রাস্তার তমুক জায়গায় ‘সন্দেহজনক একটা পুঁটলি পড়ে আছে’ বলেই ফোনটা নামিয়ে রাখে।”
“সবই কি আর বেসলেস খবর? …ওরে কৌশিক, তোর মা’কে ক’কাপ চা পাঠাতে বল দিকিনি। … কিছু-কিছু খবর তো মিলেও যাচ্ছে।”
“তা মিলছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের খাটুনি যে কী পরিমাণ বেড়ে গেছে সে আর বলবার নয়। আর তা ছাড়া, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখছি স্রেফ ছাই ঘাঁটাই সার হচ্ছে। উঃ, পুলিশের চাকরি নিয়ে যে এত ময়লা ঘাঁটতে হবে, তা কখনও ভাবিনি।”
“আমি খুবই দুঃখিত, শোভন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আমিও বোধহয় তোমাকে স্রেফ ময়লা ঘাঁটিয়ে ছাড়লুম। ওটা তা হলে গুলি চালিয়ে টায়ার ফাটাবার ব্যাপার নয়, কেমন?”
এক মুহূর্তে পালটে গেল শোভন চৌধুরির চেহারা। বললেন, “বাট অফ কোর্স ইউ আর রাইট! আসল কথাটাই আপনাকে বলা হয়নি। আপনি ঠিকই ধরেছেন। ওটা গুলি চালাবার ব্যাপারই বটে। বুলেটটাও আমরা পেয়ে গেছি।”
“কোথায় পেলে?”
“বেরিয়ে যেতে পারেনি, টায়ারের মধ্যেই ছিল। তা ছাড়া আরও কয়েকটা জিনিস পেয়েছি।”
“কী?”
“দুটো এয়ার-টিকিট আর একটা পাসপোর্ট।”
“কোথায় পেলে?”
“গাড়ির গ্লাস কম্পার্টমেন্টের মধ্যে।”
চা-বিস্কুট এসে গিয়েছিল। শোভন চৌধুরি প্লেট থেকে একটা বিস্কুট তুলে নিলেন। তারপর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”
“ব্যাপারটা একটু ঘোরালো মনে হচ্ছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “টিকিট দুটো কি দু’জনের নামে, না একজনের?”
“একজনের। একটা টিকিট ডোমেসটিক ফ্লাইটের, ক্যালকাটা টু দিল্লি।”
“আর অন্যটা?”
“দিল্লি টু লন্ডন। ডোমেসটিক ফ্লাইট ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের, আর ইন্টারন্যাশন্যাল ফ্লাইট লুক্তহানসার। ফ্রাংকফুর্টে নেমে কানেকটিং ফ্লাইটে লন্ডন। ফ্লাইটের ডেট যা দেখছি, তাতে প্রথমটা আজ বিকেলে ছাড়বার কথা আর দ্বিতীয়টা আজ শেষ রাত্তিরে। টিকিট দুটো আর পাসপোর্ট আমি সঙ্গে করে এনেছি। দেখবেন?”
“টিকিট দেখতে চাইছি না, পাসপোর্টটা দেখাও।”
শোভন চৌধুরি তাঁর অ্যাটাশে-কেস থেকে একটা পাসপোর্ট বার করে এগিয়ে ধরলেন। ভাদুড়িমশাই তার একটা পাতাও উলটে দেখলেন না। কৌশিক তাঁর পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। পিছনে হাত বাড়িয়ে কৌশিকের হাতে সেটা ধরিয়ে বললেন, “প্রথম পৃষ্ঠায় পাসপোর্ট হোল্ডারের নাম আর তৃতীয় পৃষ্ঠায় ছবি। দ্যাখ্ তো ছবিটা চিনতে পারিস কি না।”
কৌশিক বলল, “আরে, এই তো সেই লোক! অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা তো এই চালাচ্ছিল। এরই তো কপাল কেটে গিয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল দেখলুম। কিন্তু এ নাম তার কী করে হবে?”
শোভন চৌধুরি বললেন, “তার মানে?”
“এর তো নাম দেখছি প্রকাশ চৌহান, অথচ সে-লোকটা দিব্যি বাংলা বলছিল।”
অরুণ সান্যাল বললেন, “বাংলা বলছিল বলেই তুই ধরে নিলি যে, সে বাঙালি? আরে, আমাদের এখানে যারা দু’-তিন পুরুষ ধরে রয়েছে, তাদের অনেকেই বেহার কি ইউ.পি.র লোক হলেও চমৎকার বাংলা বলতে পারে।”
কৌশিক বলল, “তাই বলে অমন ইডিয়মেটিক বাংলা? না বাবা, ও যে বাঙালি, তাতে সন্দেহ নেই।”
ভাগ্নের হাত থেকে পাসপোর্টটা নিয়ে নিলেন ভাদুড়িয়শাই। তারপর বারান্দায় যাবার দরজাটার দিকে এগিয়ে গিয়ে ছবির পাতাটাকে রোদ্দুরের দিকে তুলে ধরে খানিকক্ষণ সেটা দেখে নিয়ে বললেন, “এটা তো জাল পাসপোর্ট!”
শোভন চৌধুরি বললেন, “সে কী দাদা!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মানে পাসপোর্টটা ঠিকই আছে, তবে ছবিটা জাল। মূল ছবির উপরে কিঞ্চিৎ কারিকুরি করা হয়েছে। তবে এত নিপুণ হাতে সেটা করা হয়েছে যে, চট করে কেউ ধরতে পারবে না।”
“তার মানে একটা জাল নামে জাল পাসপোর্ট নিয়ে লোকটা সরে পড়বার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হল না, কেমন?”
“ওটাকে একটা হঠাৎ-হয়ে-যাওয়া ব্যাপার বলছ কেন? অ্যাক্সিডেন্টই যদি হত, তা হলে ওই বুলেটটা তোমরা পেতে না।”
শোভন চৌধুরির মুখ দেখে মনে হল, ভদ্রলোক একটু চিন্তায় পড়ে গেছেন। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ব্যাপারটা কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
“আমার কী মনে হয়, এখুনি তা জেনে তোমার লাভ নেই।” ভাদুড়িমশাই তাঁর হাতঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বললেন, “আপাতত একটা কাজ করো তো, এখানে তো ফোন রয়েছে, এয়ারপোর্ট পুলিশকে ফোন করে একটা খবর নাও।”
“কী খবর নেব?”
“সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের দিল্লি-ফ্লাইট এতক্ষণে টেক অফ করে থাকবে। খবর নাও যে, ওই ফ্লাইটে প্রকাশ চৌহান নামে কোনও প্যাসেঞ্জার আছে কি না।”
“তা কী করে থাকবে? তার পাসপোর্ট আর এয়ার-টিকিট তো আমাদের কাছে।”
“আরে বাবা, দিল্লি পর্যন্ত তো ডোমেসটিক ফ্লাইট, তার জন্যে পাসপোর্টের দরকার হয় না।”
“কিন্তু ডোমেসটিক ফ্লাইটের টিকিটটা তো চাই।”
“আসন খালি থাকলে এয়ারপোর্টেও টিকিট কেনা যায়। …ও হ্যাঁ, আজ যদি সিটি-লিংক এয়ারলাইনের কোনও ফ্লাইট থাকে, তো তারও প্যাসেঞ্জারস’ লিস্টের খবর নেবে।”
শোভন চৌধুরি আর দেরি করলেন না, টেলিফোন করার জন্যে কৌশিককে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
পুলিশ-অফিসার যতক্ষণ ঘরে ছিলেন, সদানন্দবাবু একটুও নড়াচড়া করেননি, নিজের আসনে একেবারে নিষ্প্রাণ একটা কাঠের পুতুলের মতন বসে ছিলেন তিনি। এবারে শোভন চৌধুরি স্থানত্যাগ করায় নিজের জায়গা ছেড়ে তিনি আমার পাশে এসে নিচু গলায় বললেন, “একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“একটু আগে ওই যে উনি উড়ো-ফোনের কথা বলছিলেন, মানে ওই যে অনেকে পুলিশকে ফোন করে খবর দেয়, কিন্তু নিজের নাম-ঠিকানা জানায় না, পুলিশ ওগুলো ট্রেস করতে পারে না তো?”
“কেন, আপনি ওই রকমের ফোন করেছেন নাকি?”
“আজই সকালে করেছি।” পাংশু মুখে সদানন্দবাবু বলেন, “গোলদিঘিতে গিয়ে মর্নিং ওয়াক করছিলুম, সেই সময়ে দেখি যে, বিদ্যেসাগরমশাইয়ের স্ট্যাচুর কাছে একটা পুঁটলি-মতো পড়ে রয়েচে। কী জানি কেন মনে হল যে ওটা বোমা না হয়ে যায় না। তাই…”
যতই নিচু গলায় কথাটা সদানন্দবাবু বলে থাকুন, ভাদুড়িমশাই ঠিকই সব শুনতে পেয়েছিলেন। বললেন, “তাই তক্ষুনি আপনি ফোন করে পুলিশকে সে-কথা জানিয়ে দিলেন, কেমন?”
“না না, তক্ষুনি নয়।” ঢোক গিলে সদানন্দবাবু বললেন, “বাড়িতে ফিরে, মাদার ডেয়ারির দুধ এনে দিয়ে তারপর চাকলাদারের ডিসপেনসারিতে গিয়ে লালবাজারে ফোন করে জানিয়েছিলুম। ওরা আমার নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিল। আমি বলিনি, মশাই। খুব অন্যায় হয়ে গেচে, কী বলেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশকে জানানোটা অন্যায় হয়নি, তবে নিজের নাম-ঠিকানা না-জানানোটা অন্যায় হয়েছে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “বড্ড ঘাবড়ে গেলুম যে। কথায় বলে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে তিনশো আঠারো। তা মশাই, আমিই যে উড়ো ফোন করেছিলুম, তা ওরা জানতে পারবে না তো?”
কথাটার আর উত্তর দেওয়া হল না, ফোন সেরে শোভন চৌধুরি ঘরে এসে ঢুকলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী খবর?”
“নাঃ, ইভনিং ফ্লাইটে ওই নামের কোনও প্যাসেঞ্জার নেই। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের লিস্টে নাম আছে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে রিপোর্ট করেনি।”
“তবে তো দেখছি ভাবনা আরও বেড়েই গেল!”
“এ-কথা কেন বলছেন?”
“আরে কাছাকাছি কোনও নার্সিংহোমে ওর যাবার কথা। অন্তত সেই কথা বলেই ইনজিওর্ড লোকটাকে এক ভদ্রলোক এখান থেকে তুলে নিয়ে গেছেন। এদিকে কাছাকাছি সব ক’টা নার্সিং হোমে ফোন করে করে জানা গেল যে, তার একটাতেও ওকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। যদি শুনতুম যে, লোকটা ইভনিং ফ্লাইটে দিল্লি গেছে, তা হলেও খানিকটা নিশ্চিন্ত থাকা যেত।”
“তার মানে?”
“তাও বুঝতে পারছ না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে-ক্ষেত্রে এস.টি.ডি. করে দিল্লি-পুলিশকে বলতুম যে, প্রকাশ চৌহান নামের যে লোকটা ইভনিং ফ্লাইটে কলকাতা থেকে দিল্লিতে যাচ্ছে, পালাম এয়ারপোর্টে নামবার পর থেকেই তার উপরে নজর রাখো। কিন্তু লোকটা না গিয়েছে নার্সিং হোমে, না গিয়েছে দিল্লিতে। তা হলে সে গেল কোথায়? আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে, হি মে হ্যাভ বিন টেক্ ফর আ রাইড।”
