লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২২)

অনেক দিন বাদে কাল রাত্তিরটা বেশ আরাম করে ঘুমোনো গেছে। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে আটটা। আড়ামোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়তে-ছাড়তে মনে পড়ল যে, তিনদিনের ছুটি নিয়েছি, সুতরাং আজও আপিসে যেতে হচ্ছে না। তার মানে দুপুরে ফের জম্পেস করে ঘুম দেওয়া যাবে।

 

বাসন্তী এসে বলল, “দুটো খবর। ফোটোগ্রাফার বিমল বরাট ফোন করেছিলেন। তুমি ঘুম থেকে ওঠোনি শুনে বললেন, ডেকে দেবার দররকার নেই, পরে আবার ফোন করবেন। তো এই হল এক-নম্বর।”

 

“আর দু’নম্বর?”

 

“সদানন্দবাবু বৈঠকখানা ঘরে বসে আছেন।”

 

চোখে-মুখে জল দিয়ে বৈঠকখানা-ঘরে ঢুকে দেখলুম সদানন্দবাবু খবরের কাগজ পড়ছেন। আমাকে দেখে কাগজখানা সরিয়ে রেখে বললেন, “ঘুম ভাঙল?”

 

বললুম, “না-ভাঙলে আর শোবার ঘর থেকে বৈঠকখানা-ঘরে এলুম কী করে?”

 

“আপনি বড্ড বেঁকিয়ে কথা বলেন, মশাই।” সদানন্দবাবু বললেন, “ওই জন্যেই আপনার সঙ্গে কথা কয়ে ঠিক সুখ হয় না।”

 

হেসে বললুম, “কথাটা বাসন্তীও বলে বটে। তা কাল সন্ধেয় তো কাঁকুড়গাছি থেকে এলিয়ট রোড পর্যন্ত সারাটা পথ মিস রবিনসনের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে এলেন। তখন সুখ হয়েছিল?”

 

উত্তরে সদানন্দবাবু এক গাল হেসে বললেন, “ওহ্ শি ইজ এ গ্রেট লেডি। যেমন দেখতে, তেমনি স্বভাব। কথাও তেমনি মিষ্টি। আমি যা-ই বলি, তাতেই হেসে বলেন, হাউ ভেরি ইন্টারেস্টিং। … তো আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব?”

 

“পিছনের সিটে বসে মেমসাহেবের সঙ্গে সারাক্ষণ হাসাহাসি করেছেন, এটা…

 

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “এটা আমার ওয়াইফকে বলে দেবেন না, মশাই।”

 

বললুম, “কেন, বললে কী হবে?”

 

কী যে হবে তা আর শোনা হল না। শোবার ঘরে ফোন বেজে উঠল। বৈঠকখানা-ঘর থেকে শোবার ঘরে গিয়ে ফোন ধরে বললুম, “হ্যালো।”

 

ওদিক থেকে বিমল বরাটের গলা ভেসে এল, “কিরণদা?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“আমি বিমল। উঃ, কী যে আনন্দ হচ্ছে, সেই কথাটা জানাবার জন্যেই আপনাকে ফোন করেছিলুম।”

 

“এখন আর তোমার চলাফেরার ব্যাপারে কোনও রেসট্রিকশন নেই তো?”

 

“একদম না।” বিমল বলল, “একটু বাদেই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব। দেখি যদি কোনও ভাল ছবি পেয়ে যাই। …আচ্ছা, তা হলে ওই কথাই রইল।”

 

ফোন ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরুতে না বেরুতেই আবার ক্রিরিরিং। ক্রেড্‌ল থেকে ফের রিসিভার তুলে বললুম, “হ্যালো।”

 

“কী করছেন মশাই?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের গলা। বললুম, “দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। এবারে চা খেয়ে খবরের কাগজগুলো দেখব। …ও হ্যাঁ, সদানন্দবাবু এসে গেছেন।”

 

“আমার এখানকার কাজ তো ফুরিয়েছে, পরশু ব্যাঙ্গালোরে ফিরব। ভাবছিলুম যে, তার আগে মিস রবিনসনের সঙ্গে একবার দেখা করে গেলে হয়।”

 

“কোনও কাজ আছে?”

 

“ওঁকে বলব যে, আমাদের ব্যাঙ্গালোরের আপিসে একজন স্টেনো-টাইপিস্ট দরকার। ইচ্ছে করলে কাজটা উনি’ নিতে পারেন।”

 

“এখানে থাকলে কি কেউ ওঁকে হ্যারাস করবে?”

 

“কী জানি, তবে আমার কাছে থাকলে করবে না। ফ্যাক্ট ইজ শি হ্যাজ সাফার্ড মাচ। ওঁর কলকাতার স্মৃতি তো মধুর নয়। তাই একটা অফার দিচ্ছি, যাতে এখান থেকে উনি সরে যেতে পারেন।”

 

ভাদুড়িমশাইকে যে এত ভাল লাগে, সেটা আসলে এইজন্যেই। ক্রাইম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন বটে, কিন্তু মানবিক বৃত্তিগুলিকে তাই বলে শুকিয়ে যেতে দেননি।

 

বললুম, “কবে ওঁর কাছে যেতে চান?”

 

“আপনি যদি সঙ্গে যান, তো আজই যাব। এই ধরুন বিকেল ছ’টা নাগাদ আপনার বাড়ি থেকে যদি আপনাকে তুলে নিই, কোনও অসুবিধে হবে?”

 

“কিছু না।”

 

“সদানন্দবাবু যদি যেতে চান, তো তাঁকেও সঙ্গে নেওয়া যাবে।”

 

“বেশ তো, এখুনি তাঁকে বলে রাখছি।”

 

“তা হলে ওই কথাই রইল। বিকেল ছ’টা।

 

ভাদুড়িমশাই লাইন কেটে দিলেন। বৈঠকখানা ঘরে ফিরে এসে সদানন্দবাবুকে বললুম, “আপনার

 

জন্যে একটা মস্ত সুখবর আছে মশাই।”

 

সদানন্দবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অ্যাঁ? সুখবর? তার মানে?”

 

“আজ সন্ধের সময় ফের সেই একই মেমসাহেবের সঙ্গে আপনার দেখা হচ্ছে।”

 

সদানন্দবাবু আবারও সেই একই কথা বললেন, “তার মানে?”

 

সবটা অতএব বুঝিয়ে বলতে হল। তারপর বললুম, “ভাদুড়িমশাইয়ের কথা থেকে মনে হল, আপনাকে সঙ্গে না নিয়ে উনি মেমসাহেবের কাছে যাবেন না।”

 

শুনে, সদানন্দবাবুর মুখ একেবারে অমলিন হাসিতে উদ্‌ভাসিত হয়ে উঠল। বললেন, “তা ভাদুড়িমশাই যখন চাইচেন যে, আমি তাঁর সঙ্গে যাই, তখন যেতে হবে বই কী। নিশ্চয় যাব। তবে দেখবেন মশাই…”

 

বললুম, “আপনি যে মেমসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, মিসেস বসু তা যেন জানতে না পারেন, এই তো? ঠিক আছে, তিনি জানবেন না।”

 

সাদনন্দবাবু তাঁর পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সাড়ে পাঁচটাতেই আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। ভাদুড়িমশাইও তাঁর গাড়ি নিয়ে এসে যান ছ’টাতেই। রওনাও বলতে গেলে সঙ্গে-সঙ্গেই হয়েছিলুম। তবু যে এলিয়ট রোডে, মিস রবিনসনের ফ্ল্যাটে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাতটা বেজে গেল, তার কারণ আর কিছুই নয়, অসম্ভব ট্রাফিক-জ্যাম। বড় রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকে, বাঁ-দিকের সেই বাড়িটার কম্পাউন্ড-ওয়ালের গায়ে গাড়িটাকে একেবারে সাঁটিয়ে পার্ক করে, মিস রবিনসনের দোতলার ফ্ল্যাটে উঠে কলিং বেল টিপতে যে বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা এসে দরজা খুলে দিলেন, আগের দিন তাঁকে দেখিনি।

 

বললুম, “আমরা মিস ডরোথি রবিনসনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”

 

“ডরোথি আমার মেয়ে।” কাঁপা কাঁপা গলায় বৃদ্ধ বললেন, “আপনারা ভিতরে এসে বসুন। ডরোথিকে আমি ডেকে দিচ্ছি।”

 

বললুম, “আপনার মেয়ের কাছে আপনার কথা শুনেছি। দিন কয়েকের জন্যে আপনি বাইরে চলে গিয়েছিলেন, তাই না?”

 

“হ্যাঁ, কাল সকালে ফিরেছি। ফিরে দেখি, মেয়ে বাড়িতে নেই। নীচের ফ্ল্যাটের লোকেরা বলল, একটু আগে বেরিয়ে গেছে, ফিরতে দেরি হবে।”

 

“তা হলে তো খুবই মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলেন আপনি। মেয়ে নিশ্চয় ফ্ল্যাট বন্ধ করে বেরিয়েছিলেন।”

 

“না, না, কোনও মুশকিল হয়নি। আমার সঙ্গে তো একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। তাই ফ্ল্যাটে ঢুকতে কিছু অসুবিধে হয়নি আমার। …কিন্তু এ কী, আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? ভিতরে এসে বসুন।”

 

ভিতরে ঢুকে বেতের চেয়ারে বসে পড়লুম আমরা। ডরোথির মা ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। বেরিয়ে এলেন মিনিট খানেক বাদেই। বললেন, “মেয়ে বাথরুমে স্নান করতে ঢুকেছে। বেরোতে দেরি হবে না। ততক্ষণ আপনারা একটু বসুন। আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “না না, মিষ্টি-ফিস্টি আনতে যাবেন না, নো ফর্মালিটি।”

 

বৃদ্ধা হেসে বললেন, “মিষ্টি কিনতে যাচ্ছি না, আজ সকালে বাজার হয়নি, তাই কিছু আলু, সবজি আর ডিম কিনতে যাচ্ছি। আপনারা তাই বলে চলে যাবেন না, একটু অপেক্ষা করুন।”

 

হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগ, ভদ্রমহিলা বাজার করতে বেরিয়ে গেলেন।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এ ভেরি অ্যাফেকশনেট মাদার।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী করে বুঝলেন?”

 

“আরে মশাই, ও-সব দেখলেই বোঝা যায়। শুধু যে অ্যাফেকশনেট, তা নয়, ভেরি হার্ডওয়ার্কিং।”

 

“তা-ই বা কী করে বুঝলেন?”

 

“বাঃ, এই বয়সেও ব্যাগ হাতে নিয়ে বাজার করতে বেরোচ্ছেন, তাও বুঝব না? নিশ্চয়ই রোজ সকালে উঠে অন্তত মাইল-খানেক মর্নিং ওয়াক করেন।”

 

হাতঘড়ি দেখে আমি বললুম, “আমরা এখানে আসার পর মিনিট দশেক কেটে গেছে, কিন্তু কই, ডরোথি তো বাথরুম থেকে বেরুচ্ছে না। কী ব্যাপার বলুন তো?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি?”

 

“না।”

 

“আমরা যদি এক ঘন্টাও অপেক্ষা করি, তা হলেও ডরোথি বাথরুম থেকে বেরুবে না। কিন্তু তার দরকার কী, বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া গেছে। এবারে চলুন, ফেরা যাক।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তার মানে?”

 

“মানে আর কিছুই নয়, যে বৃদ্ধাটিকে আমরা সবাই হাতে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখলুম, সে-ই ডরোথি। মেক-আপটা দারুণ নিয়েছে। তাতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। বেনারসে থাকতে ও যে একটা থিয়েটার-গ্রুপে অভিনয় করত, তা তো আমরা ওরই কাছে শুনেছি।”

 

আমার মুখ দিয়ে খানিকক্ষণ কোনও কথাই সরল না। সদানন্দবাবুও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার পরক্ষণেই ধপ করে বসে পড়লেন। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন বোধহয়, কিন্তু বিস্ময়ের ধাক্কায় কথাগুলো জড়িয়ে গিয়ে তাঁর মুখ থেকে শুধু একটা ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া আর কিছুই বেরিয়ে এল না।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল, কেউ কিছু বলছেন না যে?”

 

বললুম, “আপনি কখন ধরতে পারলেন?”

 

“প্রথম থেকেই। তবু যে কিছু বলিনি, তার কারণ, আমি ওকে পালিয়ে যাবার মতো সময় দিতে চাইছিলাম। তা ছাড়া, সত্যিই তো ওর কোনও দোষ নেই।”

 

“দোষ নেই তো পালাল কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হয়তো হ্যারাসমেন্টের ভয়ে। তার মানে আমি যে ওকে আশ্বাস দিয়েছিলুম পুলিশ ওকে নাহক হ্যারাস করবে না, সেটা ও বিশ্বাস করতে পারেনি।”

 

একটু চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বিষণ্ণ হেসে বললেন, “শুধু পুলিশ কেন, নিজের কাছ থেকেও তো অনেকে পালাতে চায়। প্রসাদের মৃত্যুতে—যতই ইনডিরেক্ট হোক—ওরও যে হাত রয়েছে, সেটা হয়তো ও ভুলতে পারছে না। কে জানে, সেইজন্যে হয়তো নিজের কাছ থেকেই ও পালাতে চাইছিল।”

 

রচনাকাল : ১৪০০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *