(১৬)
ফ্লাই ওভার পেরিয়ে মৌলালির মোড়ে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগল। সেখানে মিনিট তিনেক আটকা থেকে তারপর ফের আটকে গেলুম সুরেন বাঁড়ুজ্যে রোডের মোড়ে। এন্টালি মার্কেট আর জোড়াগির্জে ছাড়িয়ে এলিয়ট রোডের মোড়ে পৌঁছতে-পৌঁছতে প্রায় আটটা। প্রথমে ভেবেছিলুম, আজও আমাদের গন্তব্য বোধহয় সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের সেই হাই-রাইজ বিল্ডিং। ভাদুড়িমশাই ডাইনে বাঁক নিয়ে এলিয়ট রোড ধরতে আমার ভুল ভাঙল। রাস্তাটার পুব-দিককার অংশ মোটামুটি চওড়া হলেও খানিক বাদেই ক্রমশ সরু হয়ে এসেছে। তার উপরে রয়েছে ট্রাম-লাইন। সেই সঙ্গে ঠেলা আর রিকশার ভিড়ও কম নয়। ফলে মাঝে-মাঝেই গিয়ার পালটে স্পিড কমিয়ে বাড়িয়ে এগোতে হচ্ছে। এটা বুঝতে পারছিলুম যে, আর খানিকটা এগোলেই আমরা ওয়েলেসলি স্ট্রিটে পৌঁছে যাব।
কিন্তু না, ওয়েলেসলি স্ট্রিটে পৌঁছবার আগেই হঠাৎ বাঁয়ে টার্ন নিয়ে আমাদের গাড়ি একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। বড় রাস্তাটাই যে আলোয় একেবারে ঝলমল করছিল তা নয়, তবে গলির মধ্যে সেই তুলনায় আলো আরও অনেক কম। স্ট্রিট-ল্যাম্প জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু তার ম্যাড়মেড়ে আলোয় অন্ধকার বিশেষ ঘোচেনি। তারই মধ্যে একটু ঠাহর করে দেখে বোঝা গেল যে, দু’দিকের বাড়িগুলোর একটাও নতুন নয়, সবই পুরনো আমলের। দেওয়াল নোনা-ধরা, আস্তর খসে গিয়ে এখানে-ওখানে ইট বেরিয়ে পড়েছে, কার্নিসে-কার্নিসে বট-অশথের চারাও নেহাত কম গজায়নি। এখনও যে মান্ধাতার আমলের এই সব বাড়ি প্রোমোটারদের দখলে চলে যায়নি, এইটে ভেবে অবাক লাগল। বাঁ-দিকের একটা পুরনো দোতলা বাড়ির কম্পাউন্ড-ওয়ালের একেবারে গা ঘেঁষে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানলার কাচ তুলে পিছনটা লক করে ডানদিক দিয়ে নেমে পড়ুন, আমি সামনেটা লক করে নামছি।”
রাস্তায় নেমে বললুম, “এতক্ষণ তো একটাও কথা বলেননি, এইবারে বলবেন?”
গাড়িতে চাবি লাগিয়ে ভাদুড়িমশাই টান হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর দু’হাত মাথার উপরে তুলে শরীরের ঊর্ধ্বাংশকে ডাইনে-বাঁয়ে বেঁকিয়ে আড়ামোড়া ভেঙে বললেন, “কী বলব?”
“এখন আমরা কার খোঁজ এসেছি?”
“যার খোঁজ এসেছি, তাকে দেখলেই আপনি চিনতে পারবেন। কিন্তু তার বাড়িটা তো আগে খুঁজে পাওয়া দরকার।”
নম্বর মিলিয়ে বাড়ি খুঁজে পেতে অবশ্য পাঁচ মিনিটও লাগল না। এটাও একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। রাস্তা থেকেই একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। যাঁর খোঁজে আসা, তিনি যে দোতলাতে থাকেন, ভাদুড়িমশাই এই খবরটাও সম্ভবত আগেই সংগ্রহ করে থাকবেন, নইলে একতলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা না বলে সরাসরি তিনি দোতলায় উঠে কলিং বেল বাজাতেন না।
ভিতর থেকে যিনি জিজ্ঞেস করলেন “কে”, গলা শুনে বুঝেছিলুম তিনি মহিলা। উত্তরের জন্যে অবশ্য তিনি অপেক্ষা করলেন না। তবে, দরজা খুলে আমাদের দেখে যে-ভাবে চমকে উঠলেন, তাতেই বোঝা গেল যে, আমাদের নয়, তিনি অন্য কাউকে আশা করেছিলেন।
চমকে অবশ্য আমিও কিছু কম যাইনি। তার কারণ, সত্যিই এই মুখটা আমার চেনা। এঁর পরনে অবশ্য এখন আর মেমসাহেবি পোশাক নয়, আটপৌরে শাড়ি-ব্লাউজ, তবে মাত্র তিনদিন আগে, রবিবার সকালে, প্রকাশ চৌহানের ফ্ল্যাটে যে এঁকেই আমি দেখেছি, তাতে ভুল নেই। ইনি মিস রবিনসন। মিস রবিনসন যে শুধুই চমকে যাননি, কিছুটা ভয়ও পেয়েছেন, সেটা তাঁর চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। দরজাটা আমাদের মুখের উপরেই হয়তো বন্ধ করে দিতেন, কিন্তু ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে যেহেতু তাঁর একটা পা ভিতরে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাই সেটা আর সম্ভব হল না। সেই অবস্থাতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাদের আপনি আগেও দেখেছেন। ভয় পাবেন না, চেঁচাবেন না, উই হ্যাভ কাম অ্যাজ ফ্রেন্ডস!”
বুঝতে পারছিলুম, ভাদুড়িমশাইয়ের কথায় ভদ্রমহিলার ভয় কাটেনি। তা যদি কাটত, তা হলে তাঁর মুখখানা অত ফ্যাকাশে দেখাত না। স্খলিত গলায় বললেন, “কী চান আপনারা?”
“কী চাই, সেটা বলব বলেই তো এসেছি।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে তো সমস্ত কথা বলা যাবে না, একটু বসা দরকার।”
মিস রবিনসন দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালেন। চৌকাঠ পেরিয়ে আমরা যে ঘরের মধ্যে ঢুকলুম, সেটা ড্রইং রুম। ঘরটা, বড়, কিন্তু আসবাবপত্র মলিন। মেঝের একদিকে বেতের খানকয় সস্তা চেয়ার। প্লাইউডের একটা সেন্টার টেবিল। তার নীচে রংচটা পাতলা একটা গালচে পাতা। দেওয়ালগুলো ওয়াল-পেপার দিয়ে মোড়া বটে, কিন্তু তা-ও দেখলুম জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। সিলিং থেকে অল্প-পাওয়ারের একটা বাল্ব ঝুলছে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে বোঝা যায় যে, দারিদ্রকে ঢেকে রাখবার একটা চেষ্টা এখানে আছে ঠিকই, কিন্তু দারিদ্র তাতে ঢাকা পড়েনি, আরও প্রকট হয়েছে মাত্র।
চেয়ারে বসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখানে আপনার সঙ্গে কে থাকেন?”
“আমার মা থাকেন। তবে এখন তিনি কলকাতায় নেই, দিন কয়েকের জন্য বেনারসে গেছেন। …কেন, তাঁকে কিছু বলবার ছিল?”
“না। আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। কথা বলেই চলে যাব। তার আগে বলি, আপনি বোধহয় এখনও আমাদের চিনতে পারেননি, মিস রবিনসন।”
“প্রথমে পারিনি, কিন্তু পরে পেরেছি। আপনারাই তো গত রবিবার সকালে আমাদের সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের আপিসে মিঃ চৌহানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাই না?”
“হ্যাঁ। আমার নাম চারুচন্দ্র ভাদুড়ি, আর আমার এই বন্ধুটির নাম কিরণ চট্টোপাধ্যায়। আমরা গিয়েছিলুম মিঃ চৌহানের পাসপোর্টের ব্যাপারে একটা খোঁজ নিতে। পাসপোর্টটা খোয়া গেছে, কিন্তু মিঃ চৌহান সে-কথা না জানিয়েছেন পুলিশকে, না জানিয়েছেন রিজিওনাল পাসপোর্ট আপিসে।”
শুনে মিস রবিনসনকে স্পষ্টতই বিভ্রান্ত দেখাল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “কিন্তু আমি এ-ব্যাপারে কী করতে পারি?”
“সম্ভবত কিছুই করতে পারেন না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু মিঃ চৌহানের পাসপোর্টটা যে একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির গ্লাস কম্পার্টমেন্টের মধ্যে পাওয়া গেছে, সেটা বোধহয় আপনার জেনে রাখা ভাল।”
“আমার জেনে কী হবে, জানা দরকার তো মিঃ চৌহানের। তিনি জানেন?”
“সে-কথায় পরে আসছি। তার আগে একটা প্রশ্ন করি। মিঃ মানিকচাঁদ রুংতাকে আপনি চেনেন?”
“চিনি না, তবে নামে জানি। মিঃ চৌহানের তিনি পার্টনার।”
“আপনাদের আপিসে তিনি আসেন?”
এক মুহূর্তে ভেবে নিয়ে মিস রবিনসন বললেন, “সম্ভবত ওয়ার্কিং আওয়ারে আসেন না।”
“এ-কথা কেন বলছেন?”
“আমি এই আপিসে কাজে ঢুকেছি তা প্রায় বছর খানেক হল। কাজ করি দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে কখনও তাঁকে আমাদের আপিসে আসতে দেখিনি।”
“অথচ আপনি জানেন যে, মিঃ রুংতা আপনার বসের পার্টনার?”
“সে তো খাতা-পত্তর থেকে জানি।”
এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “যে-গাড়ির গ্লাস কম্পার্টমেন্টে মিঃ চৌহানের পাসপোর্ট পাওয়া গেছে, সেটা মিঃ রুংতার গাড়ি।”
“তা-ই?”
“হ্যাঁ। তবে শুধু পাসপোর্টই যে পাওয়া গেছে, তা কিন্তু নয়।”
“আর কী পাওয়া গেছে?”
“দুটো এয়ার-টিকিট। দুটোই মিঃ চৌহানের নামে। একটা ডোমেসটিক ফ্লাইটের। ফ্রম ক্যালকাটা টু দিল্লি। অন্যটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের। ফ্রম দিল্লি টু লন্ডন। এটা অবশ্য নন-স্টপ ফ্লাইট নয়, ফ্রাংকফুর্টে প্লেন পালটে লন্ডনে যেতে হবে।”
মিস রবিনসন সম্ভবত ফ্লাইটের ডিটেল্স্ খুব মন দিয়ে শুনছিলেন না। পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে বললেন, “পাসপোর্ট আর এয়ার-টিকিট তা হলে মিঃ রুংতার গাড়িতেই পাওয়া গেছে, কেমন?”
“হ্যাঁ।”
“যখন অ্যাক্সিডেন্ট হয়, তখন গাড়িটা কি মিঃ রুংতাই চালাচ্ছিলেন?”
ভাদুড়িমশাই হাসলেন। তারপর, হঠাৎই একেবারে গম্ভীর হয়ে গিয়ে স্থির চোখে মিস রবিনসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সো ইউ নো?”
“কী জানব?”
“অ্যাক্সিডেন্টের কথা। আমি কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলিনি। আপনি জানলেন কী করে?”
“আমি…আমি…” আমতা-আমতা করে মিস রবিনসন বললেন, “যদ্দুর মনে পড়ছে, কাগজে একটা অ্যাক্সিডেন্টের খবর পড়েছিলুম।”
“কী করে পড়লেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কোনও কাগজেই তো খবরটা বেরোয়নি।”
“একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল।”
“পুলিশের বিজ্ঞাপন। কিন্তু তাতে কোনও দুর্ঘটনার কথা ছিল না। জাস্ট একটা ছবি ছেপে বলা হয়েছিল যে, লোকটির ডেডবডি পাওয়া গেছে, কেউ যদি তাকে চিনতে পারেন, তা হলে পুলিশের সঙ্গে যোগযোগ করলে তদন্তের সুবিধে হবে। অ্যান্ড আই রিপিট, তাতে কোনও অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলা হয়নি। আপনি তা হলে জানলেন কী করে যে, মিঃ রুংতা যার মালিক, সেই গাড়িটার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল?”
হঠাৎই দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন মিস রবিনসন। মুখে কোনও শব্দ নেই, এমনকি চাপা একটা গোঙানির শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু যে-ভাবে ফুলে-ফুলে উঠছে তাঁর শরীর, তাতে বোঝা যায় যে, তিনি কাঁদছেন।
ভাদুড়িমশাই তাঁর পকেট থেকে পাট-করা একটা রুমাল বার করে মিস রবিনসনের দিকে এগিয়ে দিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “আই অ্যাম সরি, মিস রবিনসন, এক্সট্রিমলি সরি। আই নো দ্যাট ইউ হ্যাভ বিন গোয়িং গ্লু হেল, অ্যান্ড দ্যাট্স হোয়াই আই হ্যাভ কাম টু হেলপ্ ইউ। নিন, রুমালটা নিয়ে চোখের জল মুছে ফেলুন, তারপর আমার কথার জবাব দিন। এটা আমি জানি যে, প্রসাদ গুপ্তকে আপনি চিনতেন। কিন্তু শুধু ওইটুকু জানলে তো আমার চলবে না। আরও কয়েকটা কথা আমাকে জানতে হবে। আপনার নিজের স্বার্থেই সেগুলি আমাকে আপনার জানানো দরকার।”
মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে মিস রবিনসন বললেন, “কী জানতে চান বলুন।”
“আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে দু-একটা কথা জানতে চাই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা কি বরাবর কলকাতাতেই ছিলেন?”
“না, আমার ছেলেবেলা জামালপুরে কেটেছে।”
“জামালপুর তো রেল-কলোনি। আপনার বাবা কি রেলে কাজ করতেন?”
“হ্যাঁ। পরে তিনি বেনারসে ট্রান্সফার্ড হন।”
“প্রসাদ গুপ্তের সঙ্গে আপনার পরিচয় তা হলে বেনারসেই?”
“হ্যাঁ। প্রসাদ ওখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত।”
“কিন্তু আপনি তো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী ছিলেন না, পরিচয়টা তা হলে হল কী করে? থ্রু কমন ফ্রেন্ডস?”
“আসলে আমাদের একটা থিয়েটার-গ্রুপ ছিল। তার রিহার্সাল হত লাকশা’র ওদিকে একটা বাড়িতে। সেখানে প্রসাদও আসত। সেই সূত্রেই আমাদের পরিচয়।”
“বেনারস থেকে আপনি কলকাতায় চলে এলেন কেন?”
“না এসে উপায় ছিল না।” মিস রবিনসন বললেন, “বাবা হঠাৎ মারা যান। ফলে তাঁর কোয়ার্টার্স আমাদের ছেড়ে দিতে হয়। ইতিমধ্যে আমি ছ’মাসের একটা সেক্রেটারিয়েল কোর্স করে রেখেছিলুম। তার জোরে কলকাতার এই চাকরিটা পেয়ে যাই।”
“এটা কবেকার কথা?”
“গত বছর মার্চ মাসের?”
“প্রসাদ গুপ্ত তার আগেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, তার দু’বছর আগে ও পাস করে বেরোয়। পাস করে বেনারসেই একটা কাজেও ঢুকেছিল। কিন্তু আমি কলকাতায় চলে আসায় প্রসাদও সেই কাজ ছেড়ে এখানে চলে আসবার চেষ্টা করতে থাকে।”
“শেষ পর্যন্ত এই বছরের গোড়ার দিকে এখানে কাজ একটা তিনি পেয়েও যান। আই মিন ব্রেবোর্ন রোডের এই ইলেকট্রিক কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের কাজ। …কী, ঠিক বলছি তো?”
“অ্যাবসল্যুটলি।” মিস রবিনসন বললেন, “তবে কাজটা প্রসাদ কীভাবে পেয়েছিল, তা বোধহয় আপনি জানেন না।”
“কীভাবে পেয়েছিলেন?”
“মিঃ চৌহানই প্রসাদকে ওটা জোগাড় করে দেন। ইট ওয়াজ রিয়েলি ভেরি কাইন্ড অব হিম। ব্রেবোর্ন রোডের ওই ফার্মের যিনি মালিক, মিঃ চৌহানের সঙ্গে তাঁর জানাশোনা রয়েছে। সো মিঃ চৌহান পুট ইন আ গুড ওয়র্ড ফর প্রসাদ, অ্যান্ড প্রসাদ গট দ্য জব। ইট ওয়জ দ্যাট সিম্পল।”
“তা তো বুঝলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু মিঃ চৌহান কেন প্রসাদ গুপ্তকে এই চাকরিটা জোগাড় করে দিলেন, সেটা বুঝলুম না। প্রসাদ গুপ্তকে কি তিনি আগে থেকেই চিনতেন?”
“না, তা চিনতেন না।” মিস রবিনসন বললেন, “আসলে, প্রসাদ এখানে চাকরি পাচ্ছিল না বলে আমিই আবার বেনারসে ফিরে যাবার চেষ্টা করছিলুম। সেখানে একটা চাকরি আমি পেয়েও যাই। তবে তার মাইনে এখানে যা পাচ্ছি, সেই তুলনায় অনেক কম। তা বেশি মাইনের চাকরি ছেড়ে কম মাইনের * চাকরি নিচ্ছি শুনে মিঃ চৌহান অবাক হয়ে যান। তখন আমার প্রবলেমের কথা আমি তাঁকে খুলে বলি। সব শুনে তিনি বলেন যে, এটা কোনও সমস্যাই নয়, আমার বেনারসে ফিরে যাবার দরকার নেই, বরং প্রসাদকেই আমি যেন বেনারসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে আসতে বলি, মিঃ চৌহানের এক বন্ধুর একটা ইলেকট্রিক্যাল গুড়সের ব্যাবসা রয়েছে, সেখানে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দরকার, তা প্রসাদকে তিনি সেই চাকরিটা পাইয়ে দেবেন।”
“যদ্দুর বুঝতে পারছি, তা তিনি দিয়েছিলেনও।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সো ফার সো গুড। কিন্তু সত্যিই যিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তাঁকে জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে কেন চাকরিতে ঢুকতে হল, সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। এ-ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?”
“তা কেন জানব না?” মিস রবিনসন বললেন, “মিঃ চৌহানের কাছে ভরসা পেয়ে প্রসাদকে আমি চিঠি লিখি। চিঠি পেয়ে বেনারসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে গত ডিসেম্বরের শেষ হপ্তায় সে কলকাতায় চলে আসে। উঠেছিল আমারই এখানে। ইন ফ্যাক্ট, স্টেশনে পাছে ট্যাক্সি পেতে দেরি হয়, মিঃ চৌহান তাঁর গাড়িটা তাই আমাকে ঘন্টা কয়েকের জন্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন, হি ওয়াজ সো কাইন্ড, সেই গাড়িতে করেই হাওড়া স্টেশন থেকে প্রসাদকে আমি এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু গাড়ি থেকে নামবার খানিক বাদে ধরা পড়ে যে, অন্য সব মালপত্র নামানো হয়েছে বটে, কিন্তু অ্যাটাশে কেস মিসিং। আর তারই মধ্যে…”
“তারই মধ্যে ছিল প্রসাদ গুপ্তর আসল সার্টিফিকেট অ্যান্ড অল আদার রেলিভ্যান্ট পেপার্স! কেমন?”
মিস রবিনসন একেবারে অবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, “আপনি কী করে জানলেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবকিছু কি আর জানা যায়? কিছুটা জানা যায়, আর বাদবাকিটা অনুমান করে নিতে হয়। তা এ-ক্ষেত্রে বোধহয় অনুমানটা ভুল করিনি। কেমন?”
“ঠিকই অনুমান করেছেন! সার্টিফিকেট, টেস্টিমোনিয়াল, সবই ছিল ওই অ্যাটাশে-কেসের মধ্যে ভেবেছিলুম, গাড়ি তো মিঃ চৌহানের, পরদিন গিয়ে খোঁজ করলে নিশ্চয় পাওয়া যাবে।”
“কিন্তু পাওয়া গেল না, এই তো?”
“হ্যাঁ। তার চেয়েও তাজ্জব ব্যাপার, যে ড্রাইভার গাড়িটা চালাচ্ছিল, পরদিন থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না। শুনলুম, গাড়ি নিয়ে ফেরার পরে মিঃ চৌহানের সঙ্গে কী-একটা ব্যাপার নিয়ে মুখে-মুখে তর্ক করেছিল, তাই আগের রাত্তিরেই তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”
“গাড়ির মধ্যে যে একটা অ্যাটাশে-কেস ছিল, আর তারই মধ্যে যে ছিল প্রসাদ গুপ্তের সার্টিফিকেট, মিঃ চৌহানকে সে-কথা আপনি বলেছিলেন?”
“বলেছিলুম। তাতে তিনি বললেন যে, তা হলে নিশ্চয় ড্রাইভার সরিয়েছে। বাট হি অ্যাশুয়োর্ড মি দ্যাট ইট ওয়জ আ মাইনর ম্যাটার, সার্টিফিকেটের জন্যে চাকরি পাওয়া আটকাবে না, কথাবার্তা তো পাকা হয়েই রয়েছে, প্রসাদ যখন জেনুইন ডিগ্রি-হোল্ডার, আপাতত তখন জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে কাজে ঢুকলে কোনও ক্ষতি নেই, পরে বেনারস থেকে আসল সার্টিফিকেটের একটা অ্যাটেস্টেড কপি আনিয়ে জালটাকে রিপ্লেস করে দিলেই চলবে।”
“জাল সার্টিফিকেটটা কে সাপ্লাই করলেন?”
“মিঃ চৌহানই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।”
“আর সেই জাল সার্টিফিকেট দেখিয়েই প্রসাদ গুপ্ত চাকরিতে ঢুকলেন, কেমন?”
“হ্যাঁ।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “চমৎকার! এমন কথা প্রসাদ গুপ্তের কিংবা আপনার একবারও মনে হল না যে, এটা একটা ঘোর বে-আইনি কাজ হচ্ছে! এমনও সন্দেহ হল না যে, এই নিয়ে পরে ওকে বিপদে পড়তে হতে পারে!”
“কিন্তু তখন তো আর কোনও উপায়ও ছিল না!” মিস রবিনসন প্রায় ডুকরে উঠে বললেন, “আর তা ছাড়া, ও তো জালিয়াত ছিল না, ও তো জেনুইন ডিগ্রি হোল্ডার, তা হলে আর এই নিয়ে ওর বিপদ হবে কেন? কে ওকে বিপদে ফেলতে চাইবে?”
“তা আমি জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে অনুমান এ-ক্ষেত্রেও ঠিকই করতে পারি। কিন্তু সে-কথা এখন থাক। রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে, এবারে আমাকে উঠতে হবে। যাবার আগে একটা কথা বলে যাই। ভয় পাবেন না। গলির মোড়ে একজন পুলিশ অফিসার আমার নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমি তাঁকে বলে দিয়ে যাচ্ছি, আপনার বাড়ির উপরে পুলিশ থেকে আজ সমস্ত রাত নজর রাখা হবে। যাতে আপনার উপরে কোনও হামলা না হয়।”
মিস রবিনসনকে দেখে মনে হল, তাঁর মুখ থেকে সমস্ত রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। স্খলিত গলায় বললেন, “হামলা হবে কেন?”
“তাও বুঝতে পারছেন না?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, কাল সকাল ন’টা নাগাদ পুলিশ থেকে একজন এসকর্ট দিয়ে আপনাকে কাঁকুড়গাছিতে আমার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেওয়া হবে, তখনই নাহয় বুঝিয়ে বলব। তার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। প্রসাদ গুপ্তের মৃত্যুর পরে আপনিই আমাকে ফোন করেছিলেন, তাই না?”
মাথা নিচু করে মিস রবিনসন বললেন, “কিন্তু আমি তো আমার নাম বলিনি।”
“তা বলেননি, কিন্তু গলাটা আমার মনে আছে। কথা বলবারও ধরনও। ফোনটা যে সেদিন আপনিই করেছিলেন, এখানে এসে আপনার সঙ্গে এক মিনিট কথা বলেই তা আমি বুঝতে পেরেছি। যা-ই হোক, যেটা আমার বলবার কথা, সেটা এই যে, প্রসাদ গুপ্তকে যারা খুন করেছে, আমার সঙ্গে আপনার ওই ফোনে কথা বলবার ব্যাপারটা তাদের অজানা থাকবার কথা নয়। এটা তারা ভাল চোখে দেখবে না।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “প্রসাদ গুপ্তকে লেখা আপনার খানকয় চিঠি যে আমার কাছে রয়েছে, তাও হয়তো তারা জানে। আপনি ওই চিঠিতে যা লিখেছেন, তাতে আপনার বিপদ বেড়েছে বই কমেনি।”
“কিন্তু চিঠিতে তো আমার নাম নেই। ওগুলো যে আমার চিঠি, তা আপনি কী করে জানলেন?”
“জানা কি সত্যি খুব কঠিন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার পদবি তো রবিনসন, আর প্রথম নামটা নিশ্চয় ‘ডি’ দিয়ে শুরু হয়েছে, তাই না? যদিও সেটা ডেইজি না ডেবোরা, তা আমার জানা নেই।”
অস্ফুট গলায় মিস রবিনসন বললেন, “ডরোথি।”
“বাঃ, ডরোথি রবিনসন! অর্থাৎ সংক্ষেপে ডি. আর.। ওহ ডিয়ার মি, যোগফলগুলো দেখছি পরপর ঠিকই মিলে যাচ্ছে!”
