লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১০)

“প্রশ্ন? আমাকে?” ঢোক গিলে বিমল বলল, “আমি তো কোনও দোষ করিনি। চোখের সামনে দেখলুম যে, রাস্তার উপর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল! তা আমার সঙ্গে সবসময়েই ক্যামেরা থাকে, সেদিনও ছিল, বাস, সঙ্গে-সঙ্গে রাস্তার ওদিক থেকেই আমি প্রথম ছবিটা তুলে ফেলি। তারপর গাড়ি থেকে নেমে, একছুটে রাস্তা পেরিয়ে এসে ঝপাঝপ তার আরও কয়েকটা ছবি তুলে ফেললুম। সেটা কি কোনও দোষের ব্যাপার হয়েছে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি তা-ই বুঝলেন? আরে দূর দূর, ওটা দোষের ব্যাপার হবে কেন? বরং ছবিগুলো তুলেছেন বলেই তো বিস্তর খাটুনি আমাদের বেঁচে গেল। না না, আপনি প্রেস-ফোটোগ্রাফার, ছবি তোলাই তো আপনার কাজ, নিশ্চয় আপনি ছবি তুলবেন। তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না।”

 

বিমল বলল, “তা হলে?”

 

“আসলে আমি জানতে চাইছি যে, ওই সময়ে আপনি যে ওখান দিয়ে গাড়ি করে যাচ্ছিলেন, সেটা নিশ্চয় কোনও কাজেই যাচ্ছিলেন, তাই না?”

 

“কাজ করতে যাচ্ছিলুম না, কাজ সেরে ফিরে আসছিলুম।”

 

“কাজটা উত্তরে কোথাও ছিল, কেমন?”

 

“হ্যাঁ।” বিমল বলল, “কিন্তু আপনি সেটা কী করে জানলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনারই কথা থেকে জানলুম। অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে আমাদের এই সি. আই. টি. রোডের পশ্চিম দিককার লেনে, অর্থাৎ যে-লেন দিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে যেতে হয়। এদিকে আপনি বলছেন যে, গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে এসে আপনি তার ছবি তুলেছেন। অর্থাৎ আপনার গাড়িটা ছিল অ্যাক্সিডেন্টের উলটো দিকের লেনে, মানে যে-লেন দিয়ে উত্তরের গাড়ি দক্ষিণে যায়। তা নইলে আর এদিকে আসবার জন্যে আপনাকে রাস্তা পেরোতে হবে কেন? এ তো খুবই সহজ কথা। তা, উত্তরে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”

 

“এয়ারপোর্টে।”

 

“সেখানে গিয়েছিলেন কেন? কোনও ভি. আই. পি.-র ছবি তুলতে?”

 

তাকে যে দোষী ঠাউরে প্রশ্ন করা হচ্ছে না, সেটা বুঝতে পারায় বিমলের অস্বস্তির ভাবটা ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছিল। কথাবার্তাও স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল অনেকটা। ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, “না না, ভি. আই. পি.টি. আই. পি. -র ব্যাপার নয়। এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর ছেলে বিলেত যাবে, আর্লি মর্নিংয়ের ফ্লাইটে তার দিল্লি যাবার কথা, শুনলুম সেখানে সেন্টর হোটেলে একদিন কাটিয়ে তারপর মাঝরাত্তিরে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ধরবে, তাই দমদম এয়ারপোর্টে তার মালা গলায় ছবি তোলবার ডাক পড়েছিল।”

 

“এ-সব ছবিও আপনি তোলেন নাকি?”

 

“না-তুললে সংসার চালাব কী করে?” বিমল তিক্ত হেসে বলল, “বড়লোকের বাড়িতে বিয়ের ছবি তুলি, অন্নপ্রাশনের ছবি তুলি, মালটিমিলিওনিয়ার বুড়ো বাপের ডেডবডির পাশে তার হুমদো-জোয়ান ছেলে আর নাতিরা বেজার-মুখে দাঁড়িয়ে আছে, ডাক পড়লে এ-সব ছবিও তুলতে হয়। না-তুলে উপায়টা কী বলুন।” আমার দিকে আঙুল তুলে, “এঁরা তো আমার ছবি আজকাল ছাপতেই চান না। ফলে, এ-সব আজেবাজে প্রাইভেট অ্যাসাইনমেন্ট নিতেই হচ্ছে।”

 

বিমলের দুঃখের কথাটা ভাদুড়িমশাই খুব মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের আর্লি মর্নিংয়ের দিল্লি ফ্লাইট তো আজকাল ছ’টায় ছাড়ে। তাই না?”

 

“ছাড়ে তো ছ’টায়। কিন্তু রিপোর্টিং টাইম চারটে পঁয়তাল্লিশ। ওই সময়েই আমাকে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়েছিল।”

 

“সে তো শেষ রাত্তিরের ব্যাপার। গেলেন কী করে?”

 

“গাড়ি পাঠিয়ে ওরাই আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেসল। তা অত তাড়াতাড়ি না-গেলেও কোনও ক্ষতি ছিল না।”

 

“ফ্লাইট লেট ছিল, কেমন?”

 

“পুরো দু’ঘন্টা লেট। ছ’টায় টেক অফ করার কথা, আটটায় করল।”

 

“কিন্তু সেখানে আপনার ছবি তো তার আগেই তোলা হয়ে গিয়েছিল। তারপরে আর দেরি না-করে চলে এলেই পারতেন।”

 

“ছাড়লে তো চলে আসব। গুষ্টিসুদ্ধ সি-অফ করতে গিয়েছিল। প্রত্যেকেই চায়, যে বিলেতে যাচ্ছে, তার সঙ্গে আলাদা করে তার একখানা ছবি তোলা হোক। সবাই বলে, আউর একঠো ফোটো খিচিয়ে… আউর একঠো! সে এক মহা জ্বালা। এ-সব পয়সাওলা লোকের বিলেতযাত্রা কখনও দেখেছেন? এয়ারপোর্টে যেন মেলা বসে যায়।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা সেই মেলা থেকে কখন ছাড়া পেলেন?”

 

“প্লেন টেক-অফ করারও প্রায় আধঘন্টা বাদে। তার পরে আর দেরি করিনি। আমার জন্যে তো আলাদা গাড়ি বরাদ্দই ছিল, সেই গাড়িতে উঠে সোজা এ-দিকে চলে আসি।”

 

“অর্থাৎ কাঁকুড়গাছির মোড়ে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে ন’টা থেকে সওয়া ন’টা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, সময়টা আমি মনে করে রেখেছি, এখানকার অ্যাক্সিডেন্টটা ঠিক ওই সময়েই ঘটেছিল। বিমলবাবু, আপনি যা বলেছেন তার মধ্যে কোথাও কোনও অসংগতি আমি দেখতে পাচ্ছি না। এখন কথা হচ্ছে, আদালতে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলি ঠিক এইভাবেই আপনি বলতে পারবেন তো?”

 

বিমল বলল, “অ্যাঁ, আমাকে আদালতে যেতে হবে নাকি?”

 

শোভন চৌধুরি এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে বললেন, “যেতে যে হবেই, তা কিন্তু উনি আপনাকে এখনও বলেননি। তবে যেতে যদি হয়ই, তাতেই বা আপনার ভয় কীসের?”

 

যে সদানন্দবাবু এতক্ষণ একেবারে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন, এখানে আসা অবধি টু-শব্দটি করেননি, এবারে তাঁকেও মুখ খুলতে দেখা গেল। বিমল বরাটের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে তিনি বললেন, “কিচ্ছু ভয় নেই, কিচ্ছু ভয় নেই! আরে মশাই, আপনাকে তো আর বাঘের খাঁচায় ঢুকতে বলা হচ্চে না! ডোন্ট বি অ্যাফ্রেড!”

 

বলেই শোভন চৌধুরির দিকে এমনভাবে তাকালেন, যার একটাই মাত্র অর্থ হতে পারে। ‘কী, ঠিক বলিনি?”

 

বিমলের অস্বস্তির ভাবটা ইতিমধ্যে আবার ফিরে এসেছিল। সদানন্দবাবু ‘ডোন্ট বি অ্যাফ্রেড’ বলায় সে যে বিশেষ স্বস্তি পেয়েছে, এমন মনে হল না। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আদৌ আমাকে আদালতে যেতে হবে কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাক্ষ্য দেবার জন্যে। কিন্তু সে তো অনেক পরের ব্যাপার। আসামি ধরা পড়ুক, কেসটা ঠিকমতো সাজাই, তারপর ও-সব কথা হবে।”

 

“কিন্তু আপনি যে জিজ্ঞেস করলেন আদালতে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলি আমি ঠিক এইভাবে বলতে পারব কি না।”

 

“ওহ্, ওই জন্যে আপনি ভাবছেন? আই ওয়াজ জাস্ট থিংকিং অ্যালাউড। এক্ষুনি ও-সব কথা উঠছে না।”

 

বিমল বলল, “কিন্তু পরেই বা উঠবে কেন? টায়ার ফেঁসে অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া তো খুবই সিম্পল ব্যাপার। এর মধ্যে এত আইন-আদালত সাক্ষী-সাবুদের কথা কোত্থেকে আসছে? আর তা ছাড়া, অ্যাক্সিডেন্টের ছবি তুলে আমি যে নিজের অজান্তে একটা ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে গেছি, এটাই বা আপনি কেন বললেন? এমন ছবি এই কি আমি প্রথম তুললুম? আগেও বিস্তর তুলেছি। তারপর ধরুন যে-অ্যাক্সিডেন্টের ছবি তুলেছি, তাতে কেউ মরলেও নাহয় কথা ছিল। কিন্তু একমাত্র ড্রাইভারেরই কপাল দেখলুম খানিকটা কেটে গেছে, তা ছাড়া আর কেউ মরা তো দূরের কথা, জখম হয়েছে বলেও তো মনে হল না।”

 

ভাদুড়িমশাই চুপচাপ বিমলের কথাগুলি শুনে গেলেন, তারপর এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “দেখুন বিমলবাবু, যা সত্যি, সেটা বোধহয় আপনার জেনে রাখাই ভাল। প্রথমত, এটা একটা সহজ-সরল অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপার নয়, গুলি করে টায়ার ফাটিয়ে এটা ঘটানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অ্যাক্সিডেন্টে কেউ মরেনি ঠিকই, কিন্তু জখম যে ড্রাইভারটিকে আপনি দেখেছিলেন, ওখান থেকে তুলে নিয়ে সেইদিনই শেষ রাত্তিরে তাকে মার্ডার করা হয়েছে। … কী শোভন, টাইমের কথাটা মোটামুটি মিলছে তো?”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “আজ এখানে আসবার আগে ডাক্তারের যে রিপোর্ট পেয়েছি, তাতে মার্ডারের সময় সম্পর্কে আপনি যা বলেলেন, তা-ই বলা হয়েছে। মার্ডার করে ডেডবডিটা খালের জলে ফেলে দেওয়া হয়।”

 

বিমল বলল, “বলেন কী!”

 

আমি বললুম, “কলকাতার কাগজগুলোতে তো সেই ড্রাইভারের ছবি সমেত একটা বিজ্ঞাপনও বেরিয়ে গেছে। কেন, তুমি সেটা দ্যাখোনি বিমল?”

 

“না।” বিমল বলল, “সকালে সেই যে আপনার বাড়িতে গিয়েছিলুম, তারপর বাড়িতে ফিরে এসে ছবিগুলো ডেভেলাপ করতে লেগে যাই। মাঝখানে আবার সেই ভদ্রলোক এসে ছবি কিনবার জন্যে ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন। এত সব ব্যাপারের মধ্যে আর কাগজ পড়বার সময় পাইনি। অবিশ্যি কাগজ পড়লেই যে বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ত, তাও নয়। খবরই তো সব পড়ে উঠতে পারি না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে শোভন, ড্রাইভারটি সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা জেনেছ, সেটাও এঁদের শুনিয়ে দাও।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে ব্রেবোর্ন রোডের এক ইলেকট্রিক্যাল গুড্‌ড্স কোম্পানির ম্যানেজার আমাদের সঙ্গে আজই যোগযোগ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন যে, লোকটির নাম প্রসাদ গুপ্ত, গত জানুয়ারিতে ওঁদের ফার্মে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের চাকরিতে বহাল হয়েছিল, কিন্তু তার সার্টিফিকেট, টেস্টিমোনিয়াল ইত্যাদি সবই যে জাল, চেকিংয়ে এটা ধরা পড়ার পরে গত মাসে তার চাকরি যায়। অর্থাৎ এক মাসের বেশি চাকরি করতে পারেনি। এদিকে একটা উড়ো কও আজ এসেছিল আমাদের। মহিলা। যার ছবি আমরা ছেপেছি, সে কখন খুন হয়েছে, কীভাবে খুন হয়েছে, পার্ফেক্ট ইংরিজিতে সে-সব ডিটেল্স জানতে চাইছিলেন। নিজের নাম-ধাম অবশ্য জানাননি। সম্ভবত সন্দেহ করেছিলেন যে, একটা লং-ড্রন কনভার্সেশনে আটকে রেখে থ্র সাম চ্যানেল আমরা হয়তো ওঁর টেলিফোন নাম্বার ট্রেস করবার চেষ্টা করতে পারি। তা নইলে নিশ্চয় লাইনটা অমন ঝপ্ করে কেটে দিতেন না!”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ভূতুড়ে কল একটা আমিও পেয়েছি। কোত্থেকে যে আমার ফোন-নাম্বার পেল কে জানে, তবে শোভনের কথা থেকে মনে হচ্ছে মাস্ট বি দ্য সেম উয়োম্যান।”

 

বললুম, “কিছু কথা হল?”

 

“ওই একই কথা। কোথায় মার্ডার করা হয়েছে, কারা মার্ডার করেছে, এই আর কী। বেশিক্ষণ কথা বলেনি। শোভন ঠিকই বলেছে, বোধহয় ভয় পাচ্ছিল যে, এক-আধ মিনিটের বেশি কথা বললেই ওর ফোন নাম্বারটা আমরা ট্রেস করতে পারব। ওলি শি ডাজন্ট নো দ্যাট উই ডু নট হ্যাভ এনি সাচ ডিভাইস।”

 

বললুম “আপনার আর কোনও কভার রইল না, ভাদুড়িমশাই। কাল উড়ো-চিঠি পেয়েছেন, আজ উড়ো-কল পেলেন। অর্থাৎ আপনার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার, দুটোই ওরা জোগাড় করে ফেলেছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অর্থাৎ ওরা জেনে গেছে যে, কেসটা আমিই হ্যান্ডল করছি। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার মশাই! শনিবার রাত্তিরে লালবাজার থেকে ফোন করে এই কেসটা আমাকে নিতে বলল, আর সঙ্গে-সঙ্গে ওরা সেটা জেনে গেল। তা যদি না জানত, তা হলে রবিবার সকালে লেটার-বক্সে ওই চিঠিটা আমি পেতুম না। কী করে যে এত তাড়াতাড়ি সবাই সব জেনে যায়! আশ্চর্য!”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আপনার অ্যাড্রেস যখন জানে, তখন আমাদেরটাও জেনে গেছে! মানে এই ব্যাপারটায় আমরাও তো আপনার সঙ্গে রয়েচি কিনা। এখন আবার আমাদের কাছেও না উড়ো-চিঠি আর ভূতুড়ে ফোন আসতে শুরু করে!”

 

আমি আর হাসি চাপতে পারলুম না। বললুম, “দূর মশাই, আপনার বাড়িতে তো ফোনই নেই।”

 

সদানন্দবাবু দমবার পাত্র নন। বললেন, তা না-ই বা থাকল, আপনার বাড়িতে তো আছে। সেখানে ফোন করে আমাকে ডেকে দিতে বলতে পারে না? আমি অবশ্য তাতে ভয় পাবার পাত্তর নই।”

 

“তা তো জানিই।” কৌশিক বলল, “উড়ো-ফোন কেউ একবার করলেই হল, ইংরিজিতে আপনি যে তাকে তুডুম ঠুকে দেবেন, তা কি আমরা জানি না?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আঃ কৌশিক, কী হচ্ছে? আর তা ছাড়া, সদানন্দবাবুর ভয়ের কারণ না-ই থাক, বিমলবাবুর যে সেটা বিলক্ষণ আছে, সেটা ভুলে যাচ্ছিস কেন?…শুনুন বিমলবাবু, এতক্ষণ যা- সব শুনলেন, তাতে এই সহজ কথাটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন যে, এই কেসটার ডিটেকশানে আপনার তোলা ছবিগুলিই আপাতত আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়। তা ছবিগুলি যে আপনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেটা ওদের না-জানবার কথা নয়। সেই কারণে আপনার উপরে ওদের রেগে যাওয়াই স্বাভাবিক।”

 

বললুম, “ছবি যখন ওদের হাতছাড়াই হয়ে গেছে, তখন আর ওদের রেগে গিয়েই বা লাভ কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাও বুঝতে পারছেন না? একটু এগিয়ে ভাবুন দেখি। বিমলবাবুর ছবিগুলো এই যে আমার হাতে এসে গেল, এর ফলে ওরা হয়তো ধরেই নিচ্ছে যে, অ্যাজ ফার অ্যাজ দ্য ডিটেকশন অব দিস ক্রাইম ইজ কনসার্নড, ভেরি সুন আই শ্যাল বি অন দ্য রাইট ট্র্যাক। ফলে কিছু লোককে অ্যারেস্ট করিয়ে একটা মামলা আমি দাঁড় করাতে পারব। তখন ওরা কী করবে? ছবিগুলো যে ফেক্, জাল, এটা প্রমাণ করবার চেষ্টা করবে না? সেটা প্রমাণ করা শক্ত হবে, যদি বিমলবাবু আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেন। সুতরাং, ওঁকে যাতে না কোর্টে হাজির করানো যায়, তার চেষ্টা ওরা করবেই। আসলে আমি এইজন্যেই বলছিলুম যে, এখন অন্তত কয়েকটা দিন বিমলবাবুর একটু সতর্ক থাকা দরকার।”

 

বিমল বলল, “কীভাবে সতর্ক থাকব?”

 

“সন্ধের পর বাড়ি থেকে বেরুনো চলবে না। দিনের বেলাতেও যথাসম্ভব কম বেরুবেন। আদৌ যদি বেরোতে হয়, তো কেউ যেন আপনার সঙ্গে থাকে। তেমন কেউ আপনার বাড়িতে আছেন তো?”

 

“তা আছে। ছোট ভাইটাই তো রয়েছে। কিন্তু আমার চলাফেরা যদি রেসট্রিকটেড হয়ে যায়, তো রাস্তায় বেরিয়ে ছবি তুলব কী করে?”

 

“আপাতত তিন-চারদিন একটু চালিয়ে নিন। তারপরেও যদি দরকার হয় তো একটা ব্যবস্থা করা যাবে।”

 

বললুম, “একটা কথা বলব ভাদুড়িমশাই?”

 

“বলুন।”

 

“ছবিগুলোর মধ্যে কি এমন-কিছু পেয়েছেন, যাতে মনে হচ্ছে যে, দ্যাট উইল লিড আস টু দ্য পিপল হু কমিটেড দ্য ক্রাইম?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “যাক, এখনও তা হলে বিশুদ্ধ একটি বাঁধাকপিতে পরিণত হননি দেখছি। মাথাটা মাঝে-মাঝে দিব্যি খুলে যায়।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “আমি এবারে যেতে পারি?”

 

“তা পারো।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে নেগেটিভগুলো নিয়ে যাও। প্রিন্টগুলোর মধ্যে যে-দুটোর পিছনে আমি একটা স্টার দিয়ে রেখেছি, রাস্তার ধারে পার্ক-করা গাড়িগুলো সেখানে দেখতে পাবে। দুটো ছবিরই দরকারি জায়গাটুকু আমি দাগ দিয়ে রেখেছি। সেই অংশটা ব্লো-আপ করিয়ে রেখো। কাল দুপুরে একটা থেকে দুটোর মধ্যে তোমার আপিসে যাচ্ছি, তখন ওটা দেখতে চাই।”

 

শোভন চৌধুরি বিদায় নিলেন। সাড়ে আটটা নাগাদ আমরাও উঠে পড়লুম। গাড়িতে ঢুকে সদানন্দবাবু বললে, “ইয়ে, জানলাগুলো বন্ধই থাক্, এমন কিছু গরম পড়েনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *