লকারের চাবি (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১)

রাস্তার দিক থেকে যে শব্দটা হঠাৎ ছুটে এল, শহুরে মানুষরা হামেশা না হলেও মাঝেমধ্যেই অমন শব্দ শুনতে পান। শুনে, পথচারীরা ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকান না পর্যন্ত, আশেপাশে তেমন কোনও চাঞ্চল্যও জাগে না, শহরের জীবনস্রোতে কোনও ছেদ পড়ে না, চতুর্দিকের হাঁটাচলা বিক্রিবাটা যেমন চলছিল, তেমন চলতেই থাকে।

 

ইদানীং অবশ্য আর তেমনটা হবার জো নেই। বোম্বাই শহরের হরেক এলাকায় একেবারে দিন-দুপুরে পরপর যে-সব ভয়ংকর রকমের বিস্ফোরণ ঘটে গেছে, আর তারও পরে আমাদের এই কলকাতা শহরের বউবাজার স্ট্রিটের উপরে হালে গোটাকয় বাড়ি যেভাবে মধ্যরাতে হুড়মুড় করে ধসে পড়ল, তাতে আর কেউ নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না। হঠাৎ কোনও বড় রকমের শব্দ একবার শুনলেই হল, অমনি সকলের পিলে চমকে যাচ্ছে।

 

সদানন্দবাবু পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন। শব্দটা কানে যাওয়া মাত্র পা দুটোকে সড়াক করে মেঝে থেকে সোফার উপরে টেনে নিয়ে, দুই কানে দুটো আঙুল গুঁজে বললেন, “বোমা!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার তা-ই মনে হয়?”

 

কানের মধ্যে আঙুল গোঁজা, ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্নটা তাই সদানন্দবাবু শুনতে পাননি, ফলে কোনও উত্তরও তিনি দিলেন না।

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “তা ছাড়া আর কী হতে পারে?”

 

কী যে হতে পারে, সেটা বুঝবার জন্যই—শব্দটা শুনবামাত্র—ঘর থেকে কৌশিক বারান্দার দিকে ছুটে গিয়েছিল। এবার সেখান থেকেই ভাদুড়িমশাইয়ের উদ্দেশে বলল, “মামাবাবু, কাণ্ডটা একবার দেখে যাও।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে অরুণ সান্যাল আর আমিও এবারে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। গিয়ে, নীচের দিকে তাকাতে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চোখে পড়ল যে, স্টিল-গ্রে রঙের একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি ফুটপাথের উপরে উঠে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই গাড়িটাকে ঘিরে লোকজন নেহাত কম জমেনি। অ্যাম্বাসাডর গাড়ির সামনের দিকটা তোবড়ানো। রাস্তার ধারের একটা ল্যাম্পপোস্ট যে ফুটপাথের উপরে আড়াআড়িভাবে ধরাশায়ী হয়ে রয়েছে তাও চোখে পড়ল।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গাড়িটার সামনের বাঁ দিকের টায়ারটা ফ্ল্যাট। উইন্ডস্ক্রিনও দেখছি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বোধহয় খুব স্পিডের মাথায় বেরোচ্ছিল। আচমকা টায়ার ফেঁসে যাওয়ায় টাল সামলাতে পারেনি, ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা লাগিয়ে ফুটপাথে উঠে পড়েছে। ওরে কৌশিক, নীচে গিয়ে একবার খবর করে আয় তো।”

 

কৌশিক নীচে নেমে গেল। আমরা আবার ড্রইংরুমে ফিরে এলুম। এসে দেখি, সদানন্দবাবু সেই আগের মতোই কানে আঙুল গুঁজে সোফার উপরে জোড়াসন হয়ে বসে আছেন। আমরা এসে যে-যার জায়গায় ফের বসে পড়তে কান থেকে আঙুল সরিয়ে বললেন, “মিটে গেছে তো? নাকি আরও ফাটবে?”

 

বললুম, “বোমা নয়, টায়ার ফাটার আওয়াজ?”

 

কিন্তু ভদ্রলোক যে তাতে বিশেষ আশ্বস্ত হয়েছেন, এমন মনে হল না।

 

চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে মালতী এসে ঘরে ঢুকল। তারপর সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রেটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কই কিরণদা, ফ্ল্যাটটা কীরকম হয়েছে বললেন না তো?”

 

ফ্ল্যাটটা মালতীরা সদ্য কিনেছে। এই ফ্ল্যাট দেখতেই আজ আমাদের এখানে আসা। কৌশিক অবশ্য মাসখানেকের ছুটি নিয়ে দিন-পনেরো আগেই এখানে চলে এসেছিল। তবে ভাদুড়িমশাইও যে ব্যাঙ্গালোর থেকে পরশু এখানে চলে আসেন, সেও তাঁর বোনের এই নতুন ফ্ল্যাট দেখবার জন্যই।

 

একটা ফ্ল্যাট না-কিনে ওদের উপায়ও ছিল না। অরুণ সান্যাল নিজে ডাক্তার, কিন্তু তাঁর হার্টের অবস্থা খুব ভাল নয়, কিছুদিন আগে ছোটখাটো একটা অ্যাটাকও হয়ে গেছে, তাই দক্ষিণ কলকাতার যতীন বাগচি রোডের তিনতলার সেই ফ্ল্যাটটা যে ওরা ছেড়ে দেবার চেষ্টা করছিল, তা জানতুম। কিন্তু ছেড়ে দিয়ে যাবে কোথায়? দোতলার ফ্ল্যাটে যাঁরা থাকেন, তাঁদের সঙ্গে পালটাপালটির চেষ্টা করে সুবিধে হয়নি, নাকি তাঁদেরও একজন হার্টের পেশেন্ট রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দালাল লাগানো হয়। কাছাকাছি এলাকায় দু’চারটে ফ্ল্যাটের সন্ধান তারা দিচ্ছিল বটে, কিন্তু তার কোনওটাই মালতীর পছন্দ হচ্ছিল না। অগত্যা কাঁকুড়গাছির মোড়ের কাছে সি. আই. টি. রোডের উপরে এই ফ্ল্যাটটা ওরা কিনতে বাধ্য হয়েছে। মাল্টিস্টোরেড বাড়ির সাততলার উপরে ফ্ল্যাট। কিন্তু হার্টের রুগি অরুণ সান্যালের তাতে কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। বাড়িতে লিফ্‌ট আছে। আছে তেজি একটা জেনারেটরও। লোডশেডিংয়ের সময়েও লিফট বন্ধ থাকে না। সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠার প্রশ্নও তাই নেই।

 

বললুম, “ফ্ল্যাট তো চমৎকার কিনেছ। দিব্যি খোলামেলা, আর তা ছাড়া যতীন বাগচি রোডের সেই ফ্ল্যাটের তুলনায় এখানে জায়গাও দেখছি অনেক বেশি। কিন্তু তোমার কর্তার পেশেন্টদের বেশির ভাগই তো দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। ওদিককার চেম্বারে ও রোজ যায় কী করে?”

 

উত্তরটা ভাদুড়িমশাই দিলেন। “যায় না, মশাই, যায় না। ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের কাছে ওর যে চেম্বার ছিল, মানে সকাল আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত যেখানে বসে ও রুগি দেখতে, সেটা ওর এক জুনিয়রকে ও ছেড়ে দিয়েছে। সে-ই সেটা সামলায়। গত মাস থেকে অরুণ শুধু ওর ধর্মতলার চেম্বারে বসছে।”

 

বললুম, “তা-ই?”

 

অরুণ সান্যাল হেসে বললেন, “কী করব বলুন, একে তো মালতী রোজ গঞ্জনা দিচ্ছিল, তার উপরে সত্যি বলতে কী, আমিও যেন আর পেরে উঠছিলুম না। তাই সকালে এখন আর রুগি দেখি না, শুধু ওই বিকেলবেলায় ধর্মতলার চেম্বারে গিয়ে বসি।”

 

বললুম, “যাক, সকালটা তা হলে পুরো বিশ্রাম পাচ্ছ, কেমন?”

 

মালতী বলল, “তা পাচ্ছে ঠিকই, তবে বিকেলের খাটুনি বেড়ে গেছে। ধর্মতলার চেম্বার থেকে আগে তো রাত ন’টার মধ্যে বাড়ি ফিরত, এখন ফিরতে-ফিরতে এগারোটা বেজে যায়।”

 

“কী করব বলুন।” অরুণ সান্যাল বললেন, “আমি বালিগঞ্জ ছাড়লে কী হয়, বালিগঞ্জের পেশেন্টরা তো সবাই আমাকে ছাড়েনি, তারা ঠিকই ধর্মতলার চেম্বারে এসে হানা দিচ্ছে। যারা খুব পুরনো পেশেন্ট, মানে অনেক কাল ধরে যাদের দেখছি, তেমন-তেমন দরকার পড়লে মাঝেমধ্যে তাদের বাড়িতে গিয়েও দেখে আসতে হয়।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “উপায় কী, লোকে যেভাবে জামাজুতো পালটায়, সেইভাবে তো আর ডাক্তার পালটানো চলে না। যে-ডাক্তার অনেক বছর ধরে একজন রুগিকে দেখছেন, রুগির ধাতটাও তাঁর জানা হয়ে গেছে, সেই ধাত বুঝে তিনি ওষুধ দেন, তাতে কাজও হয় একজন নতুন ডাক্তারের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে, একটু কষ্ট করেও রুগি যে তাঁরই কাছে ছুটে আসবে, কাছাকাছি অন্য ডাক্তারের কাছে যাবে না, এ তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।”

 

সদানন্দবাবু এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। যা ফেটেছে, তা যে বোমা নয়, টায়ার, এটা জানবার পরে তিনি আবার স্বস্তিবোধ করতে শুরু করেছিলেন। আলোচনাটা অসুখ-বিসুখের দিকে মোড় নেওয়ায় তিনি বললেন, “ কিন্তু অসুখ-বিসুখ হবে কেন, সেটাই তো আমি বুঝি না। রোজ ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে, চোখে-মুখে জল দিয়ে, মাইল দুয়েক মর্নিং ওয়াক করে এলেই তো হয়।

 

বললুম, “থামুন তো, ওই এক হয়েছে আপনার মর্নিং ওয়াক! আপনি দেখছি হাঁটিয়েই সবাইকে পাগল করে ছাড়বেন।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “না না, মর্নিং ওয়াক খুবই ভাল জিনিস। আমি তো বেশ উপকারও পাচ্ছি, কিরণদা।”

 

আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “তবেই বুঝুন, কিরণবাবু! আপনি তো আমাকে পাত্তাই দিতে চান না, কিন্তু ডাক্তার হয়েও কথাটা ওঁকে মান্যি করতে হচ্চে।”

 

“তা কেন করব না?” অরুণ সান্যাল বললেন, “তবে কিনা হার্টে একটু চোট খেয়ে গেছি তো, তাই আপনার প্রেসক্রিপশন-মতো দু’মাইল হাঁটা আর সম্ভব নয়, মাইল খানেক হাঁটলেই এখন হাঁফ ধরে যায়।”

 

বললুম, “তা সেই মাইল খানেক হাঁটার মতো ফাঁকা জায়গা-জমিই বা এখানে পাচ্ছ কোথায়? সবই তো ভরাট করে-করে পাঁচ-সাততলা বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ওখানে তোমাদের বাড়ির পাশে বিবেকানন্দ পার্ক ছিল, সাদার্ন অ্যাভিনিউ ক্রস করলে লেকটাও পেয়ে যেতে।”

 

মালতী বলল, “লেক একটা এ-দিকেও আছে, কিরণদা।”

 

“সুভাষ সরোবরের কথা বলছ তো? সেটা কিন্তু তোমাদের এই বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “লেকে গিয়ে যে হাঁটতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই। মালতীদের এই বাড়ির পিছনদিককার রাস্তা ধারে পশ্চিম দিকে মিনিট খানেক হাঁটলেই দেখেছি দিব্যি একটা পার্ক পাওয়া যায়।”

 

“ঠিক বলেছেন বড়দা।” অরুশ সান্যাল বললেন, “ভোরে উঠে আমি তো রোজ ওই পার্কে গিয়েই গোটাকয় চক্কর মেরে আসি। আজ অবশ্য যাওয়া হয়নি, ঘুম থেকে উঠতে-উঠতে বড্ড বেলা হয়ে গেল।”

 

“এটা ঠিক করলেন না মশাই।” সদানন্দবাবু বললেন, “মর্নিং ওয়াকটা যখন একবার ধরেচেন, তখন উইদাউট এনি ব্রেক ওটাকে চালিয়ে যেতে হবে।”

 

মালতী বলল, “নইলে কী হয়?”

 

“নইলে ওর যা গুণ, সেটা নষ্ট হয়ে যায়। আমি তো গত তিরিশ- পঁয়ত্রিশ বছর ধরে মর্নিং ওয়াক করচি, কিন্তু একটা দিনও যে বাদ দিয়েচি, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। এক ওই…”

 

সদানন্দবাবু তাঁর কথাটা শেষ করলেন না। তবে যেমন ভাদুড়িমশাই, তেমন আমিও ঠিকই বুঝতে পারলুম যে, শ্যাম-নিবাসের সেই ভয়ংকর ঘটনাটার কথা তাঁর মনে পড়ে গেছে। মিথ্যে একটা খুনের মামলায় সেবারে তিনি জড়িয়ে যান। তখন দিন-কয়েকের জন্য তাঁকে হাজতবাসও করতে হয়েছিল। সেই সময়ে তাঁর মর্নিং ওয়াকেও ছেদ পড়ে যায়।

 

ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে সদানন্দবাবুর যোগাযোগটা সেই সময়ে আমিই ঘটিয়ে দিই। ভাগ্যিস দিয়েছিলুম। তা নইলে কি আর ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে এই পরোপকারী সদানন্দ মানুষটিকে বার করে আনা যেত? সেই যে যোগাযোগ, আজও সেটা অটুট রয়েছে। সদানন্দবাবু যেমন কৃতজ্ঞতায় সারাক্ষণ আপ্লুত হয়ে আছেন, তেমন ভাদুড়িমশাইও দেখেছি যখনই বাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় আসেন, সদানন্দবাবুর খোঁজ নিতে তাঁর ভুল হয় না।

 

কালও নিয়েছিলেন। রাত্তিরে যখন ফোন করেন, তখন হরেক কথার পর বলেছিলেন, “কাল সকালে তো মালতীদের ফ্ল্যাট দেখতে আসছেন। সেই সময়ে সদানন্দবাবুকেও নিয়ে আসুন।”

 

তা সদানন্দবাবু খুব খুশি হয়েই এসেছিলেন।

 

মর্নিং ওয়াকের ব্যাপারে তাঁর নিষ্ঠার বিবরণ শোনাতে শোনাতে ভদ্রলোক একটু আটকে গিয়েছিলেন বটে, তবে সেই হাজতবাসের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে আরও দু’চার কথা তিনি বলতেন নিশ্চয়। কিন্তু তার সুযোগ তিনি আর পেলেন না। কেন না, ঠিক এই সময়েই কৌশিক এসে ঘরে ঢুকল।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী দেখলি কৌশিক? কেউ বিশেষ জখম-টখম হয়নি তো?”

 

কৌশিক বলল, “যে ভদ্রলোক ড্রাইভ করছিলেন, তিনি ইনজিওর্ড। গাড়িটা গিয়ে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খাবার পর ভদ্রলোক নিশ্চয় নিজের সিট থেকে ছিটকে যান।

 

“কী করে বুঝলি?”

 

“ভদ্রলোকের কপাল বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল।

 

“অন্যান্য প্যাসেঞ্জারদের দেখলি?”

 

“থাকলে তো দেখব।” কৌশিক বলল, “গাড়িতে শুনলুম আর কোনও প্যাসেঞ্জার ছিল না।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “যাক্, একজনের উপর দিয়ে গেছে। তা ড্রাইভার-ভদ্রলোকের ফার্স্ট এড দেবার ব্যবস্থা হয়েছে তো? নাকি সে-ব্যাপারে কেউ খেয়ালই করেনি?”

 

কৌশিক হেসে বলল, “ফার্স্ট এড কী বলছ, এতক্ষণে বোধহয় নার্সিং হোমে ভর্তি করে দিয়ে তাঁর থরো মেডিক্যাল চেক-আপের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কথাবার্তা যা শুনলুম, তাতে তো মনে হল, ব্রেন-স্ক্যানিংটাও বাদ পড়বে না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মানে?”

 

“মানে আর কী;” কৌশিক বলল, “তোমরা তো বলো যে, কলকাতা শহরটা একেবারে উচ্ছন্নে গেছে…”

 

কৌশিককে বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভাগ্, অমন কথা আমি কক্ষনো বলি না। …

 

কী হে অরুণ, তুমি বলো নাকি?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “খেপেছেন? আমি তো কোনও ব্যাপারে কোনও কথাই বলি না। তবে হ্যাঁ, আপনার বোন মাঝে-মাঝে ওই রকমের একটা কথা বলে বটে।”

 

মালতী বলল, “কেন বলব না? ঘরে গ্যাস নেই, রাস্তায় জঞ্জাল, বাসে-ট্রামে লোকগুলো সব বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করছে, তার উপরে হকারের দাপটে তো ফুটপাতে পা ফেলার জো নেই, উচ্ছন্নে যাবার তবে আর বাকি রইল কী?”

 

কৌশিক বলল, “তা হোক, এখানকার লোকগুলো কিন্তু বড্ড ভাল। গায়ে পড়ে যত লোককে এখানে অন্যের উপকার করতে দেখি, তেমন আর অন্য কোথাও দেখি না। আজই তো একজন গুড সামারিটানকে যেচে এসে উপকার করতে দেখলুম।”

 

“বটে?”

 

“তবে আর বলছি কী! ভদ্রলোক তাঁর গাড়িতে করে এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। যে-ই দেখলেন যে, একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, অমনি তাঁর নিজের গাড়ি থেকে নেমে এসে তোবড়ানো গাড়ির ড্রাইভারের অবস্থা দেখে বললেন, ‘এ কী, এই অবস্থায় এঁকে ফেলে রেখেছেন কেন? এক্ষুনি এঁকে নার্সিং হোমে ভর্তি করা দরকার।’ একজন নাকি ডাক্তার ডাকতে গিয়েছিল। সেই কথা শুনে ভদ্রলোক বললেন, ‘না না, ডাক্তার এসে তো স্রেফ একটু ডেটল লাগিয়ে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দেবে, তাতে হবে না। যে-রকম ইনজুরি দেখছি, তাতে একটা কন্কাশন হওয়া কিছু অসম্ভব নয়। তার চেয়ে বরং আমার গাড়িতে তুলে দিন, কাছেই আমার নার্সিং হোম, সেখানে ওঁকে ভর্তি করে নিচ্ছি।’…ব্যস, সবাই অমনি…”

 

“ইনজিওর্ড লোকটাকে ওই গাড়িতে তুলে দিল, কেমন?” প্রশ্নটা ভাদুড়িমশাইয়ের।

 

“বাঃ, দেবে না? তক্ষুনি সবাই মিলে জোরজার করে তুলে দিল।”

 

উত্তর শুনে ভুরু কুঁচকে গেল ভাদুড়িমশাইয়ের। বললেন, “জোরজার করতে হল কেন? যিনি ইনজিওর্ড, তিনি কি যেতে চাইছিলেন না?”

 

প্রশ্নটার সরাসরি উত্তর দিল না কৌশিক। বলল, “ বুঝলে মামাবাবু, আমাদের বাঙালি বাবুদের যেমন অনেক গুণ, তেমন দোষও নেহাত কম নয়। সবচেয়ে বড় দোষ, সুযোগ পেলেও নেবে না। আরে বাবা, এত চক্ষুলজ্জা কীসের, সুযোগ যখন পেয়েছিস তখন নিয়ে নে। দয়া করে এক ভদ্রলোক তোকে তাঁর নার্সিং হোমে নিয়ে যেতে চাইছেন, তা হলে তুই যাবি না কেন? কোনও মানে হয়?”

 

“সত্যিই তা হলে তিনি যেতে চাইছিলেন না, কেমন?”

 

“তা তো চাইছিলেনই না, একটু ডেড-মতন হয়ে গিয়েছিলেন তো, সেই অবস্থায় খালি-খালি বলছিলেন যে, নার্সিং হোমে যাবার দরকার নেই, ও একটু টিংচার আয়োডিন লাগিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

 

“বুঝেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঙালিদের দোষের কথা বলছিলি না? তা হলে জেনে রাখ, কোথাও যেতে না-চাইলেও বাঙালিরা যে জোর করে তাকে সেখানে পাঠিয়ে দেয়, এও তাদের একটা মস্ত দোষ।”

 

কৌশিকের মুখ দেখে মনে হল, বেচারা তার মামাবাবুর কথা শুনে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। বলল, “তার মানে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মানে কি ছাই আমিই বুঝতে পারছি? বারান্দা থেকে একবার দ্যাখ্ তো, তোবড়ানো গাড়িটা এখনও ফুটপাথের উপরে পড়ে রয়েছে কি না।”

 

বারান্দা থেকে ঘুরে এসে কৌশিক বলল, “একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে।”

 

ভাদুড়িমশাই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চলুন কিরণবাবু, পুলিশ এসে সরিয়ে নেবার আগে নীচে গিয়ে গাড়িটা একবার দেখে আসা যাক।”

 

নীচে গিয়ে যা দেখলুম, কলকাতার রাস্তাঘাটে সে-রকম দৃশ্য আকছার চোখে পড়ে। তফাত শুধু এই যে, রাস্তায় নয়, গাড়িটা এ-ক্ষেত্রে ফুটপাথের উপরে পড়ে আছে। যাতায়াত করতে লোকজনদের তাই কষ্ট নেহাত কম হচ্ছে না। সেই কারণে কটুকাটব্যেরও কামাই নেই। প্রাইভেট গাড়ির মালিকগুলোকে যে ধরে-ধরে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত, এমন মন্তব্যও একজনকে করতে শুনলুম। চতুর্দিকে যা সাবুদানার মতন ছড়িয়ে আছে, দেখেই বুঝলুম, সেগুলো উইন্ডস্ক্রিনের কাচের গুঁড়ো ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

সরেজমিন সব দেখে নিয়ে সাততলার ফ্ল্যাটে ফিরে আবার যে-যার জায়গায় অধিষ্ঠিত হওয়া গেল। অরুণ সান্যাল বললেন, “কিছু সন্দেহ করছেন বড়দা?”

 

“তা করছি বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর হ্যাঁ, যা দেখলুম, তা তো খবরের কাগজের ভাষায় দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।”

 

সদানন্দবাবু ইতিমধ্যেই আবার তাঁর পা দুটো গুটিয়ে সোফার উপর তুলে নিয়েছিলেন, সেই অবস্থাতেই যতটা সম্ভব সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ফ্যাসফেসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী দেখলেন মশাই? বোমা?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, বোমা নয়, বুলেট।”

 

“তার মানে?”

 

“তার মানে এটা নেহাতই মামুলি একটা টায়ার ফেঁসে দুর্ঘটনা ঘটার ব্যাপার নয়, কেউ নিশ্চয় গুলি চালিয়ে টায়ার ফাঁসিয়ে এটা ঘটিয়েছে। …কৌশিক, লালবাজারে ফোন করে শোভন চৌধুরিকে একবার ডাক তো। বলবি যে, আমি কথা বলতে চাইছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *