কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

সাত

 

কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। হালদারমশাই সাবধানে নস্যি নিচ্ছিলেন। কর্নেল তার নিভে যাওয়া চুরুট যত্ন করে ধরালেন। তারপর শ্রীলেখা মৃদুস্বরে বললেন, আপনি কাল রাতে জয়ের কম্পিউটার থেকে যে ডেটা বের করে নিয়ে গেলেন, তাতেই কি এসব কথা আছে?

 

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। আমি তো অন্তর্যামী নই।

 

এবার আমাকে দুটো ডেটাই দেখাতে আপত্তি থাকার কথা নয়।

 

নাহ্! কর্নেল হাসলেন। তবে প্রথমটা তেমন কিছু নয়। ওটা দেখলে অকারণ দুঃখ পাবেন। তাই দ্বিতীয়টা আপনাকে দেব। এটাতেই হীরেগুলোর সন্ধান আছে।

 

কোথায় আছে সেগুলো?

 

এই বাড়িতে।

 

বাড়িতে কোথায়?

 

আপনার বেডরুমে একটা জাপানি ছবি আছে তো?

 

শ্রীলেখা উত্তেজিতভাবে বললেন, আছে। বাঁধানো ছবি। ছবিতে একটা বড় রঙীন ফুল আঁকা আছে। তার পাপড়িতে একটা জলের ফোঁটা। ছবিটার ক্যাপশানে লেখা আছে : হিউম্যান লাইফ ইজ দা টাইনিপ্ল্যাশ অব এ রেনড্রপ।

 

আপনি ছবিটা নিয়ে আসুন।

 

ছবিটা উঁচুতে আছে। আমি একা নামাতে পারব না।

 

তা হলে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে রজি। জয়ন্ত! হালদারমশাই! চলুন।

 

আমরা বেডরুমে গেলাম। হালদারমশাই লম্বা মানুষ। একটা টুলে উঠে ছবিটা নামালেন। কর্নেল বললেন, এবার চলুন ও ঘরে যাওয়া যাক।

 

আগের ঘরে ফিরে কর্নেল বেডরুমে ঢোকার এবং করিডরে যাওয়ার দরজা দুটো ভেতর থেকে আটকে দিলেন। তারপর ছবিটা টেবিলে উল্টো করে রেখে পকেট থেকে ছোট্ট ছুরি বের করলেন। ছুরির ডগা দিয়ে ছবির পেছনের কাগজ, তারপর পিচবোর্ড কেটে সাবধানে তুলে নিলেন। একটা চৌকো ঘন নীলরঙের ভেলভেট কাপড় বিছানো আছে দেখা গেল। কাপড়টা কর্নেল একটুখানি তুলতেই নিচে আরেকটা চৌকো নীল ভেলভেট কাপড়ের ওপর ঝকমক করে উঠল ছোট ছোট হীরের টুকরো! আকাশের একঝাক নক্ষত্রের মতো। টুকরোগুলো। খোপে খোপে বসানো আছে।

 

হালদারমশাই বলে উঠলেন, কী কাণ্ড! তারপর সারগুলো ঝটপট গুনে বললেন, টেন ইনটু টেন। শওখান। ওয়ান হান্ড্রেড পিসেস অব ডায়ামন্ড!

 

কর্নেল বললেন, মিসেস ব্যানার্জি! আপাতত এগুলো এই কাপড়েই বেঁধে আলমারির লকারে রেখে দিন। বাট আই মাস্ট ওয়ার্ন ইউ–এগুলো চোরাচালানি হীরে। তা ছাড়া এগুলো ফেরত পাওয়ার জন্য বিমলারঞ্জন সোম আবার সুযোগ খুঁজবে। সে ববের খুনী, এটা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করা যাবে না। যদি তার জেল হয়, আবার সে ছাড়া পাবে। তখন আপনি আপনার স্বামীর মতোই বিপন্ন হবেন। কাজেই আজ রাতের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকে।

 

শ্রীলেখা ঠোঁট কামড়ে ধরে ভাবছিলেন। আস্তে বললেন, আপনি যা বলবেন, তাই করব। আমি জয়ের মতো লোভী নই। স্বার্থপর নই। আপনিই বলুন, আমার কী করা উচিত।

 

আগে ওগুলো আলমারির লকারে রেখে আসুন।

 

শ্বশুরমশাইয়ের আমলের আয়রনচেস্ট আছে। সেখানে রাখাই নিরাপদ।

 

ঠিক আছে। তবে সাবধান। কেউ যেন– কর্নেল চাপা গলায় বললেন, আই মিন, মালতীও টের না পায়। জুয়েলসের লোভ মানুষের মাথা খারাপ করে দেয়।

 

শ্রীলেখা ভেলভেটের ভেতর হীরেগুলো গুছিয়ে পুঁটলি তৈরি করলেন। তার গায়ে জড়ানো ছিল রঙিন পশমি চাদর। সেই চাদরের ভেতর পুঁটলিটা নিয়ে গম্ভীরমুখে চলে গেলেন।

 

হালদারমশাই হঠাৎ খি খি করে হেসেই জিভ কেটে থেমে গেলেন। বললাম, কী হলো হালদারমশাই? হাসলেন যে?

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ ফিসফিস করে বললেন, ম্যাডাম য্যান নিজেই চুরি করছেন! কীভাবে পাও ফেইলা যাইতেছেন দেখলেন না?

 

কর্নেল কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, হু! চোরাই মাল এরকমই। হাতে নিলে নিজেকে চোর-চোর লাগে।

 

বললাম, দুটো প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাচ্ছি না বস্!

 

যেমন?

 

বি আর সোমের চেলা যখন শেখর বা সি এস সিনহা, তখন ঘড়িটা দেওয়ার জন্য আউট্রাম ঘাট বেছে নেওয়া হলো কেন? তা ছাড়া আপনি বলছিলেন, সাড়ে পাঁচটায় শীতের সন্ধ্যা–

 

আমাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, ওরা জানে শ্রীলেখা প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়েছেন, এমনকি আমারও দ্বারস্থ হয়েছেন। তাই এই সতর্কতা। দেখবে, শেখর কাল দিব্যি ভালমানুষ সেজে অফিসে যাবে। সোমও তার অফিসে যাবে। শুধু সুসান ওরফে সুদেষ্ণাকে গা ঢাকা দিতে হবে। কারণ তার ফ্ল্যাটে পুলিশ গেছে। তার চেয়ে বড় কথা, সে দিনদুপুরে কম্পিউটার চুরি করেছে।

 

বললাম, দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনি আজ সকালে মিসেস ব্যানার্জিকে অমন ভয় দেখিয়ে তার কোম্পানি অফিসে যেতে বললেন। না গেলে নাকি সর্বনাশ হবে। কিন্তু তেমন কোনও আভাস মিসেস ব্যানার্জির কাছে এখনও পাইনি। ব্যাপারটা কী?

 

কর্নেল হাসলেন। কম্পিউটার চুরির সুযোগ দিয়েছিলাম চোরকে। জাস্ট এ শর্ট অব ট্র্যাপ। তবে তখনও জানতাম না কে যন্ত্রটা চুরি করবে। শুধু বুঝতে পারছিলাম, যন্ত্রটা চুরি যাবেই এবং চুরি গেলে আমার থিওরি সঠিক প্রমাণিত হবে। আই ওয়াজ কারেক্ট।

 

শ্রীলেখা ফিরে এলেন। তাকে খুব আড়ষ্ট দেখাচ্ছিল। মৃদুস্বরে বললেন, আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে কর্নেল সরকার! আপনিই বলুন, এবার কী করা উচিত।

 

কর্নেল চোখ বুজে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, এক ঢিলে দুই পাখি মারা পড়বে, যদি আপনি একটু ট্যাক্টফুল হন।

 

বলুন কী করব?

 

আপনার কর্মচারী শেখর কাল যথারীতি অফিস যাবে। তার গা ঢাকা দেওয়ার কারণ নেই। আপনি কিন্তু তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করবেন। তারপর সুদেষ্ণার কম্পিউটার চুরি করার কথা তাকে বলবেন। সেইসঙ্গে এ-ও জানিয়ে দেবেন, আপনিই কম্পিউটারের ফাস্ট কি ওয়ার্ড ব্রেড এবং তা থেকে ঘড়ির পেছনে খোদাই করা নাম্বারের সাহায্যে মিঃ ব্যানার্জির দুটো গোপন ডেটা উদ্ধার করেছিলেন। আপনি ডেটা দুটো বুদ্ধি করে মুছে দিয়েছিলেন। তারপর চোরাচালানি হীরে আপনি খুঁজে পেয়েছেন।

 

শ্রীলেখা চমকে উঠেছিলেন! সে কী! বলে সোজা হয়ে বসলেন।

 

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, হ্যাঁ। আপনি শেখরের সঙ্গে পরামর্শের ভান করবেন। আপনি বলবেন, চোরাই হীরে কী ভাবে বিক্রি করা যায় বুঝতে পারছেন না। তাই আপনার কোম্পানির ট্রেড কনসালট্যান্ট বি আর সোমের সাহায্য চান। ও কে?

 

শ্রীলেখা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না।

 

হালদারমশাই নড়ে বসলেন। কন কী?

 

আমিও বললাম, সোম হীরেগুলোর জন্যই এত কাণ্ড করল। আর শেষ অব্দি তাকেই হীরের কথা বলতে যাওয়ার মানে হয়?

 

কর্নেল আমাদের কথায় কান না দিয়ে বললেন, মিসেস ব্যানার্জি! আপনি কাল সঙ্গে হীরেগুলো নিয়ে যাবেন। শেখরের সঙ্গে পরামর্শের ভান করার পর ফোনে সোমকে জানাবেন, একটা জরুরি ব্যাপারে তাঁর কাছে যাচ্ছেন। সোম অফিসে থাকবে–সিওর। কারণ সে মণিহারা ফণী। মণির জন্য সে মরিয়া।

 

শ্রীলেখা একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, তারপর?

 

তারপর তার অফিসে হীরেগুলো ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে যাবেন। সঙ্গে শেখরকে নেবেন। শেখরকে যা যা জানিয়েছেন, তাকেও তা-ই জানাবেন। হীরেগুলো বিক্রির ব্যবস্থা করতে বলবেন। সে সেগুলো দেখতে চাইবে। আপনি তাকে হীরেগুলো দেবেন। ও কে?

 

শ্রীলেখা আস্তে বললেন, আপনার প্ল্যানটা বুঝতে পারছি না।

 

কর্নেল হাসলেন। এক ঢিলে দুই পাখি বধ। প্লিজ ডোন্ট ওয়ারি। বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর উইশ ইউ গুড লাক বলে পা বাড়ালেন!

 

আমরা কর্নেলকে অনুসরণ করলাম। গাড়িতে উঠে হালদারমশাই উত্তেজনাবশে আবার একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর আপনমনে বলেন, এক ঢিলে দুই পাখি বধ! কিন্তু আমার বিজ্ঞাপনের ফান্দে পা দিল না!

 

পরদিন সকালে সল্টলেক থেকে কর্নেলকে ফোন করলাম। ষষ্ঠী বলল, বাবামশাই বাইরে গেছেন। কখন ফিরবেন ঠিক নেই।

 

আবার দুপুরে ফোন করলাম। ষষ্ঠী বলল, হালদারমশাই এসেছিলেন, বাবামশায়ের জন্য বসে থেকে থেকে টায়ার হয়ে চলে গেছেন।

 

আমিও টায়ার হয়ে যাচ্ছি, ষষ্ঠী!

 

ষষ্ঠী বলল, হয়তো পাখি-টাখির খোঁজে গেছেন। বাবামশাইকে তো জানেন?

 

না ষষ্ঠী। উনি পাখি মারতে গেছেন। ফিরলে আমাকে ফোন করতে বলো যেন।

 

ষষ্ঠী হাসতে হাসতে অস্থির হচ্ছিল। ফোন রেখে দিলাম।

 

কর্নেলের টেলিফোন পেলাম দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে। তখন প্রায় আড়াইটে বাজে। বললেন, ডার্লিং! এক ঢিলে দুই পাখি বধ হয়েছে। সোম আর তার চেলা শেখর ধরা পড়েছে। কাস্টমস অফিসাররা এবং ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের পুলিশ অফিসাররা সাদা পোশাকে তৈরি ছিলেন। যাই হোক, কুখ্যাত আন্তর্জাতিক স্মাগলারকে বমাল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য শ্রীলেখা ব্যানার্জি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের সুনজরে পড়লেন। এতে ওঁর ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি হবে। আর সুসান ওরফে সুদেষ্ণা ধরা পড়েছে সোমের লেকভিউ রোডের বাড়িতে। হ্যাঁ, সেই কম্পিউটারসহ। আচ্ছা! ছাড়ি। ফুল স্টোরির জন্য চলে এস।

 

ফোন রেখে তখনই হন্তদন্ত লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা আগামীকাল একটা চাঞ্চল্যকর এক্সক্লুসিভ স্টোরি ছাপতে পারবে।….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *