কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ডোন্ট মুভ মিস্টার সিং। আমি আপনাকে ওটা দিচ্ছি। বলেই বলল, ভটকাই, বোতলটা মিস্টার সিংকে দে। বি কেয়ারফুল মিস্টার সিং। ডোন্ট ট্রাই টু বি ফানি। তা হলে মাথার ঘিলু উড়ে যাবে।

হঃ। হঃ। হঃ। আমার মাথাতে যদি ঘিলুই থাকবে তা হলে কি আমার জীবনের এই অবস্থা হয়? ভটকাই বোতলটা নিয়ে, ওঁর হাতে দিল। ওঁর হাত থেকে পিস্তলটা নিতে যেতেই উনি হিন্দিতে বললেন, খবরদার ছোকরা, আমি জিন্দা থাকতে আমার হাত থেকে পিস্তল কেউ নিতে পারবে না। এটা শেষ করেনি। আমি নিজেই দেব।

ঋজুদা আমাকে বলল, রুদ্র, য়ু টেক কেয়ার অফ দ্যা আদার গাই।

উ-মঙ্গ?

ভটকাই বলল।

ভটকাই উ-মঙ্গকে চেনে দেখে আমি অবাক হলাম। ভটকাই গুটি গুটি আমার পেছনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে সানাহানবি, থৈবী ও তিতিরও এসে দাঁড়িয়েছে একটু দূরে। টাইগারের দুর্গন্ধ গলিত দেহ দেখে সানাহানবি আর থৈবী দেবী নতুন করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

ঋজুদা সানাহানবিকে বলল, হ্যাভ য়ু ফোনড দ্য নাম্বার আই গেভ অ্য?

ইয়া।

থ্যাঙ্ক য়ু।

তোমরা সবাই এখন ঘরে যাও। ওরা এক্ষুনি এসে পড়বে।

ওরা কারা?

তম্বি সিং বলল।

পুলিশ।

পুলিশ, বলেই আবার হাসল হঃ হঃ হঃ করে।

সানাহাবিরা ফিরে গেল। শুধু আমরা রইলাম। আর কাজের লোকজন। তম্বি সিং আর উ-মঙ্গ দুজনেই ভাগাভাগি করে ওই সাদা জল খাচ্ছিল।

এমন সময় পি-পাঁ পি-পাঁ করে বাঁশি বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি এল। এবং ঠিক সেই সময়েই পিস্তল-ধরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই একই সঙ্গে দুটি গুলির শব্দ হল। এবং কিছু বোঝার আগেই, আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। এবং মিস্টার তম্বি সিংও। ভটকাই বাঘের মতো সাহসে, খালি হাতে, তম্বি সিং-এর উপরে লাফিয়ে পড়ে তাকে চেপে রেখে, তার পাশে পড়ে থাকা পিস্তলটা তুলে নিয়ে, রাগের চোটে পিস্তলের বাঁটের এক বাড়ি মারল, তার মাথায়। বলল, নিমক হারাম। তুই আমার বন্ধুকে…এত্ব সাহস। তোর মাথা আমি কচুর শাক দিয়ে রান্না করে খাব।

তম্বি সিং-এর গুলিটা আমার ডান বাহু ছুঁয়ে চলে গিয়ে বাংলোর একটি থামে লেগে ছিটকে গিয়ে, বৃষ্টির জল জমানোর জন্যে রাখা একটা টিনের ড্রামে গিয়ে আঘাত করায়, সেই ড্রাম ফুটো হয়ে, তীরের বেগে জল পড়তে লাগল। আসলে তম্বি মারতে চেয়েছিল উ-মঙ্গকে। তারপরে নিজেকে মারত। কিন্তু ওর গুলি বেরুবার আগের মুহূর্তে ঋজুদার নির্ভুল নিশানাতে করা গুলি গিয়ে তম্বির কবজিতে লাগে–আর লাগার ফলেই উ-মঙ্গ বেঁচে গেল এ-যাত্রা। এবং হয়তো আমিও।

গুলির শব্দ শুনে সানাহানবিরা বেরিয়ে আসতে আসতেই পুলিশও এসে গেল। আমাকে ও তম্বি সিংকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে মেয়েরা চেঁচামেচি করে উঠল। মেয়েরা বলতে, থৈবী এবং সানাহানবি। তিতির নয়।

পুলিশের অফিসারকে ঋজুদা বললেন, এদের দুজনকে অ্যারেস্ট করুন। লোকাল ডাক্তারকে এখুনি ধরে নিয়ে আসুন নিয়ারেস্ট হসপিটাল থেকে এবং অপারেশনের সব সরঞ্জাম, নার্সসমেত; এখানেই আনানোর বন্দোবস্ত করুন। ওয়্যারলেসে খবর পাঠান। ইমিডিয়েটলি।

আমি ততক্ষণে উঠে বসেছিলাম। তম্বি সিংও। শুনলাম ঋজুদা বলছে, সানাহানবিকে, আই অ্যাম সরি। আই হ্যাভ টু টেক দেম ইনসাইড। ইওর বিউটিফুল বাংলো উইল বি ব্লাডি।

সানাহানবি নিচু স্বরে বলল, লেট ইট বি। আই কুড নট কেয়ারলেস। অ্যাট লিস্ট, আই অ্যাম লাকি দ্যাট আই অ্যাম নট ব্লাডি ইনসাইড মি।

বলেই একটু থেমে, প্রায় কেঁদে বলল, ইট রিয়্যালি হার্টস; হার্টস। অ্যান্ড আই ট্রিটেড দিস ম্যান অ্যাজ মাই ফাদার।

ঋজুদা পুলিশ অফিসারকে বললেন, দশজন আর্মড পুলিশকে দিন, কুকুরটাকে পাহারা দেবার জন্য, যতখন না ভেট আসছেন ইম্ফল থেকে।

রাইট স্যার।

অফিসার বললেন।

ডি. আই. জি. ক্রাইম আসছেন?

হ্যাঁ, স্যার। মেসেজ তো পৌঁছে গেছে। উনি পথেই এই মেসেজ-এর জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আমার তো মনে হয়, মিনিট পনেরোর মধ্যে এসে পৌঁছবেন।

আমাকে এবং তম্বিকে ধরে ধরে বাড়ির লোকেরাই নিয়ে গিয়ে সোফাতে বসালেন। আমি বললাম, বারান্দাতে বসি। রক্ত পড়ে কার্পেট নষ্ট হবে, সোফা নষ্ট হবে।

ঋজুদা বলল, বারান্দাতে বসলে গুলি খেয়ে মরতে পারিস। তুই তো পারিসই, আমরা সকলেই পারি। পুলিশ যেমন খবর পেয়েছে, তম্বি সিং এর মালিকেরাও খবর পেয়েছে। ভেতরে চল।

সানাহানবি বলল, কী যে বলেন! আমার জন্যে আপনার প্রাণটাই যাচ্ছিল আর আমার কার্পেট আর সোফাই কি বেশি দামি হল, প্রাণের চেয়ে?

সানাহানবির কাছে প্রক্সিভন ছিল। তাই দুটো করে ঋজুদা খাইয়ে দিল আমাকে ও তম্বি সিংকে। রক্তে চ্যাটচ্যাট করছে শরীর।

ঋজুদা বলল, কী খাবেন মিস্টার সিং? যে কোনও ভাল জিনিসের নাম করুন। সবই আছে সানাহানবির কাছে। চা খাবেন? কফি? অন্য কিছু?

হুইস্কি আছে? মিস্টার বোস? স্কচ হুইস্কি? আপনাকে সেদিন আমি মিথ্যে বলেছিলাম।

আপনাকে আমি খুব ভাল জিনিস পাঠিয়ে দেব, আমার বন্ধু অনীক সেনের কাছ থেকে নিয়ে।

কোথায়? জেলে? হঃ। হঃ। হঃ।

হ্যাঁ। প্রয়োজন হলে জেলেও।

মিস্টার সিং হাসলেন। বললেন, আপনার মতো প্রেমিক দেখা যায় না। গুলি করে, জেলে পাঠিয়ে; তাও আবার স্বপ্ন পূরণ করবেন বলছেন।

ঋজুদাই সানাহানবি ও থৈবীকে বলে, কীসের যেন একটা বোতল তম্বি সিংকে আর অন্য একটি বোতল উ-মঙ্গকে আনিয়ে দিল। উ-মঙ্গ-এর তখনও শক কাটেনি। তম্বি সিং যে তাকে মেরে ফেলতে যাচ্ছিল একটু আগে, এ কথা সে যেন বিশ্বাসও করতে পারছিল না।

সে বলল, আমার কিছু চাই না এ সব। বিষ থাকলে সানাহানবি, বিষ এনে দাও একটু আমাকে।

.

এখন রাত কত, কে জানে! ভোর হতে বেশি দেরি নেই। ডি. আই. জি. ক্রাইম, কোহিমার ভেটেরিনারি সার্জন, মি. হোর্কেকেসিমা, উখরুলের বৃদ্ধ উকিল…জরাগ্রস্ত মিস্টার ছাওবি সিং–আরও অনেকে এসেছেন। ডি. আই. জি. মি. আলুয়ালিয়া, পাঞ্জাবের লোক। কে. পি. এস. গিলের অধীনে চাকরি করেছেন। তাঁর একজন ব্লু-আইড বয়, তাই মণিপুরের ডি. জি. বিশেষ তদ্বির করে ওঁকে আনিয়েছেন এখানে। উনি হয়তো শিগগির নতুন পদ, ডি. আই. জি. টেররিস্ট কন্ট্রোল-এর দায়িত্ব নেবেন।

মি. আলুয়ালিয়া বললেন, আমার চেয়েও বেশি ইন্টারেস্ট অন্যদের। আপনি সামিং-আপ করুন, মি. বোস। ওঃ। এই যে আপনাদের টিকিট। ওক্কে করা আছে। কালকের।

ঋজুদা সেগুলো নিয়ে বুক পকেটে রেখে বলল, ধন্যবাদ।

প্রথমে বলুন, রুবিটার কথা।

ঘরে সকলেই বসে ছিলেন। আমি, ভটকাই, তিতির, সানাহানবি, থৈবী দেবী ছাড়াও পুলিশের নানা অফিসার এবং ভেট। দরজার সামনে ভিড় করেছিল কাজের লোকজন। এবং বাংলোর চারপাশ ঘিরে ছিল সেমি-অটোমেটিক ওয়েপন নিয়ে কমপক্ষে দশটি পুলিশের গাড়ি। এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স ভ্যানও দাঁড়িয়েছিল বাইরে।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, দেখুন, প্রথমেই মি. তম্বি সিং আমার মনে সন্দেহ ঢুকিয়েছিলেন যে, তিনি নিজে মালিক নন। তাই এখানে এসেই আমার প্রথম কাজ খুঁজে বের করা, তাঁর আসল মালিককে। সানাহানবির উপরে অন্য যে-কোনও মানুষেরই সন্দেহ হতে পারত। কিন্তু আমি ফেস-রিডিং কিছুটা করতে পারি না, শাস্ত্র পড়ে নয়। শিশুকাল থেকেই উৎসাহ ছিল এ ব্যাপারে তারপর সারা পৃথিবীর অগণ্য দেশের অগণ্য নারী পুরুষের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতাও আমাকে সাহায্য করেছে। অনেক জ্যোতিষিও যা না বলতে পারবেন, আমি হয়তো শুধুমাত্র মুখ দেখেই, একজন মানুষ সম্বন্ধে তার চেয়ে বেশি বলতে না পারলেও, বুঝতে পারি।

এতগুলো ভাল ভাল কথা নিজের সম্বন্ধে একসঙ্গে বলে ফেলে ঋজুদাকে ক্লান্ত ও লজ্জিত দেখাচ্ছিল। নিজের প্রশংসা নিজে করা অথবা ধূর্তামি দেখিয়ে অন্যদের দিয়ে কাজ করানোর বিদ্যা ঋজুদার তো জানা নেইই, বরং এ সব তীব্রভাবে অপছন্দই করে।

এটাতো আপনারই ধারণা, বোস সাহেব।

রাইট। শুধুমাত্র ধারণাই। কিন্তু সমস্ত বিজ্ঞান, সমস্ত সিদ্ধান্তের জন্মই তো নিছকই কোনও এক একাধিক জনের ধারণা থেকেই। এই ধারণা শব্দটা ফেলে দেওয়ার নয়। এটি একটি বীজ, যা থেকে মহীরূহ জন্মায়।

আমিই বললাম, ঋজুদাকে যাতে নিজমুখে উত্তর দিতে না হয়, সে জন্যে।

থাঙ্গজম সিং-এর কাছে গিয়েই, আমার প্রথমে যা মনে হয়েছিল তা এই যে, মানুষটা গত কয়েক বছরে বদলে গেছেন অনেকই। ওর স্ত্রীকেও আমি জানতাম। মানে, যখন আগে ওর সঙ্গে আলাপিত হয়েছিলাম। মহীয়সী, ধার্মিক, নম্র মহিলা। মনে হয় যে, সেই মহিলার প্রভাব থাঙ্গজম সিং-এর স্বাভাবিক প্রকৃতির মধ্যের খারাপ, বন্য, লোভী ও নিষ্ঠুর দিকটাকে প্রতিমুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলেই হয়তো, এইরকম বদলে গেলেন মানুষটা।

হঠাৎই থৈবী সিং বলে উঠলেন, আপনি ঠিক বলেছেন দাদা। আপনি জ্যোতিষির চেয়ে অনেক ভাল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। তা ছাড়া মানুষকে বোঝার ক্ষমতা আপনার অসাধারণ!

আমরা ঘর সুদ্ধ সকলেই চমকে উঠলাম, থৈবী সিং-এর কথা শুনে।

ঋজুদা বললেন, তোমার বাবা সম্বন্ধে আমার অ্যাসেসমেন্ট যে ঠিক তা তোমার কাছ থেকে শুনে, আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেল থৈবী। ধন্যবাদ।

একটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম যে, থাঙ্গজম সিং, তম্বি সিংকে মানুষ বলেই গণ্য করেন না। বললেন, ও লোকটা একটা ক্লাউন, একটা বাফুন।

তারপর পাইপে আরেক টান দিয়ে বলল, তোমার বাবুর্চিকে আমাদের একটু চা দিতে বলতে পারো সানাহানবি? সময় তো বেশি বাকি নেই। আলো ফুটলেই আমরা বেরুব।

অনেক মানুষই ক্লাউন বা বাফুন কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই জীবনের এবং সংসারের হাতে মার খেয়ে এমন হয়ে যান। যাঁরা এমন ভাবে বাফুন বা ক্লাউন হয়ে ওঠেন, তাঁদের প্রতি অনুকম্পা, ক্ষমা, এবং দয়া থাকা উচিত।

কার? সমাজের?

ডি. আই. জি. সাহেব প্রচণ্ড বোদ্ধার মতো বললেন।

ঋজুদার উচিত, সোজা কেসটার তলাতে চলে গিয়ে যা বলার বলে দেওয়া, অথচ এটাও ঠিক যে, খুনের মোটিভ ব্যাখ্যা করতে খুনির এবং যে খুন হয়েছে। তার, খুনির সাহায্যকারীদের সকলেরই মনস্তত্ত্বর ব্যাখ্যারও দরকার। কিন্তু এই ডি. আই. জি-র বোধহয় অত ধৈর্য-টৈর্য নেই।

ঋজুদা বলল, সমাজ তো একটা ধারণা-বিশেষ। আমি মানুষের কথা বলছি। অনেক মানুষে মিলে মিশে যাই করে, তাই সমাজ-স্বীকৃত; সামাজিক।

তারপর বলল, ভটকাই অধৈর্য গলাতে বলল।

তম্বি সিংকে যেমন থাঙ্গজম সিং মনুষ্যেতর জীব বলে গণ্য করেন, তেমনি ইবোহাল সিং-এর উপরও দেখলাম ওর প্রচণ্ড রাগ এবং ঘৃণা। বললেন, ও তো রাজাই নয়, রাজ পরিবারের আস্তাবলের কোনও সহিসের সঙ্গেও ওর কোনওদিন আত্মীয়তা ছিল না। তম্বি যেমন ওর চামচে ছিল ইবোহালের বাবাও ছিল তেমনই রাজা লাইহারোবার চামচে। সেই সুবাদে কাকা বলত।

যা মনে হয়েছিল আমার, থাঙ্গজম সিং-এর কথা শুনে; তা হল, দেখতে শুনতে ভাল ছিল ইবোহাল, বুদ্ধিমান ছিল, পড়াশোনাতেও ভাল ছিল। অথচ বিনয়ের বদলে এদেশের নিরানব্বই ভাগ শিক্ষিত মানুষেরই মধ্যে যা থাকেই, অর্থহীন অন্ধ অহং, লজ্জাকর একধরনের গর্ব; তা ইবোহালের ছিল না, সে গান বেয়ারার থেকে সহিস, কুক থেকে ম্যানেজার, ম্যানেজার থেকে সেক্রেটারি, সব কাজই করতে পারত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে–যেমন করত আচ্চাও সিং, ইবোহালের জন্যে। এবং সে কারণে, রাজা লাইহারোবারই মতো সম্ভবত ইবোহালেরও আচ্চা সিং-এর উপরে এক বিশেষ দুর্বলতা ছিল…

এবং দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই আচ্চাও সিং…

ডি. আই. জি. সাহেব বললেন…

ঋজুদা থেমে, তাঁর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, আপনি তো তা হলে কেসের সশান করেই ফেলেছেন। আমরা তা হলে চা টা এলেই খেয়ে উঠে পড়ি।

ডি. আই. জি. সাহেব নিজের ভুল বুঝতে পেরে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আই বেগ ইওর আনকন্ডিশনাল পার্ডন স্যার। আপনি বলুন। আর আমি ইন্টারাপট করব না।

ইন্টারাপট অবশ্যই করবেন। না হলে, জিনিসটা পরিষ্কার না হলে, চার্জ ফ্রেম কী করে? আসামিদের দায়রাতে সোর্পদ করবেন কী করে?

রাইট স্যার।

পুলিশের টেপ রেকর্ডারটা নিঃশব্দে ঘুরছিল যে, এটা ডি. আই. জি. সাহেব ভুলে গেছিলেন। ভটকাই-এর সামনে রাখা আমাদের টেপ-রেকর্ডারও ঘুরছিল। দেখতে ছোট, কিন্তু মাইক্রো-ক্যাসেট ভরা যায়। বহুক্ষণ টেপ করা যায়। জাপান থেকে মিস্টার নাকাটাসো, ঋজুদার জাপানি মক্কেল পাঠিয়েছে ঋজুদাকে, কাজের সুবিধার জন্যে।

সানাহানবি বলল, বলুন মিস্টার বোস। থৈবী বলল, ইবোহাল আংকল-এর মার্ডার আর রুবিটা চুরি যাওয়া তো একদিনেই ঘটেনি। তরোয়ালটা তো কদিন আগে চুরি গেছিল। বাগান থেকে যখন পাওয়া গেল, তখন দেখা গেল যে, রুবিটা নেই। ইবোহাল আংকল-এর মার্ডার তো তার কদিন পরে হল।

দ্যাটস রাইট।

তা এমন করলেন কেন, আংকল তম্বি আর উ-মঙ্গ? পুলিশকে ধোঁকা দেবার জন্যেই কি?

না।

তবে?

রুবিটা চুরি করেছিল তম্বি আর উ-মঙ্গ, সানাহানবি সেদিন মোরেতে গেছিল টাইগারকে নিয়ে। সাধারণত সঙ্গে সাদা বুলটেরিয়ার ‘জিম’ যায়। থৈবী সেদিন বড় গাড়ি নিয়ে গেছিল বলেই একটু চেঞ্জ হবে বলে, টাইগারকে নিয়ে গেছিল সঙ্গে, সানাহানবি। আর ঠিক সেইদিনই তরোয়ালটা খুঁজে পাওয়া যায় বাগানে, পোঁতা অবস্থায়। টাইগারকে দেখে তম্বির মাথাতে রুবিটাকে টাইগারের পেটে চালান করে দেওয়ার কথা আসে। টাইগারের শরীর এমনিতেই ভাল যাচ্ছিল না। খিদে কম ছিল। বয়সও হয়ে গেছিল মরার মতো। কি মানুষ আর কি কুকুর মরার বয়সে পৌঁছলে তাকে কোনও না কোনও ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মরতেই হয়, এর কোনও ব্যতিক্রম হয় না। সেই সুযোগটাও ওরা নিয়েছিল। সানাহানবি যখন আচ্চাও-এর সঙ্গে তামুতে বেড়াতে গেল তখন থৈবী টাইগারকে খাওয়ানোর ভার নিয়েছিল। না থৈবী?

হ্যাঁ।

বলেই, থৈবী রুমাল দিয়ে নাক মুছল।

কিন্তু তুমি শেষ পর্যন্ত খাওয়াওনি টাইগারকে?

সানাহানবি চমকে উঠল। কী। একটা চাপা অভিব্যক্তি করল। আর সঙ্গে সঙ্গে থৈবী, সানাহানবির হাত ধরে কেঁদে উঠল।

না। থৈবীর এ ব্যাপারে কোনও দোষ নেই। বলতে গেলে, চক্রান্ত করেই তম্বি আর উ-মঙ্গ যত্ন করে খাওয়াবে বলে এবং ইবোহাল সাহেব ডাকছে বলে ওকে ভিতরে পাঠিয়ে, কাণ্ডটা ঘটায়।

কাণ্ডটা ঘটাল কী করে?

তিতির শুধোল।

গ্রেট গেন কুকুর তো কম বড় নয়! বাঘেরই মতো। বিস্তারিত না জানিয়ে, শত্রু কুকুরকে পাথর খাইয়ে মারবে বলে–এই প্রক্রিয়া ভেট-এর কাছ থেকে জেনে নিয়ে তম্বি ভেটকে দুশোটাকা ঘুষ দিয়ে এসেছিল। এদিকে টাইগারের মতো বড় কুকুরও, অতবড় রুবিটা গিলতে পারেনি। যতখানি ঠেলতে পেরেছিল তম্বি এবং উ-মঙ্গ ততখানিই গেছিল এবং এমন একটা জায়গাতে গিয়ে আটকে গেছিল যাতে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল না বটে, কোনও খাবারও নামতে পারছিল না। ওরা জানত যে, কয়েকদিনের মধ্যেই টাইগার মরবে এবং মরলে ফার্মেরই মধ্যে কবর দেবে সানাহানবি, আর তখন ধীরে-সুস্থে সময় বুঝে, টাইগারের বডি কবর থেকে তুলে রুবিটাকে কেটে বের করে নেবে।

কিন্তু থৈবী ভিতরে চলে গেছিল কেন, নিজে টাইগারকে না খাইয়ে?

আমি বললাম।

ইবোহাল সিং দুপুরে ভদকা খেতেন অ্যাঙ্গোডুরা বিটার্স দিয়ে। তার মধ্যে আবার মণিপুরের তীব্র গন্ধ-ওয়ালা গোঁড় লেবুর একটি স্লাইস ফেলে দিতেন। তার মধ্যে একটি কাঁচা লঙ্কা ভেঙে দু টুকরো করে, সিডলেস অবস্থাতে গ্লাসের মধ্যে ফেলে দিতেন।

তাতে কী হত?

ডি. আই. জি. সাহেব, উদ্বেগের সঙ্গে শুধোলেন।

আমার মনে হল যে, উনি নিশ্চয়ই ওই পানীয় ইস্তেমাল করেন।

ঋজুদা বলল, কাঁচা লঙ্কা আর গোঁড় লেবুর গন্ধ, ইটালিয়ান অ্যাঙ্গোঁরা বিটার্স-এর সঙ্গে মিশে রীতিমতো এক গান্ধর্ব সুগন্ধর পায়দা করত। তা, এইসব বানিয়ে দিত আচ্চাও। ইবোহালের শরীরে রাজরক্ত না থাকলেও অনেক রাজাকে সে কান ধরে ‘রইসি’ শেখাতে পারত। থৈবীকে ভিতরে পাঠিয়েছিল, তম্বি, ইবোহালকে ড্রিংঙ্ক ফিক্স করে দিতে। তারপর থৈবীকেও অফার করেছিল ইবোহাল। থৈবী বেশি খায়নি হয়তো ছোট-পেগ দুয়েক–কিন্তু সেই সময়টুকুই তম্বি আর উ-মঙ্গ-এর পক্ষে যথেষ্ট ছিল।

তারপর?

সানাহানবি যখন কাঙ্গপোকপিতে ফিরে এল, তখন বুঝতে পারল যে, টাইগার অসুস্থ। কিছু খেতে পারছে না। তখন কোহিমা থেকে ভেটকে ডেকে পাঠাল না কেন?

ভটকাই বলল।

তম্বি, রুবিটা’ গিলিয়ে দেওয়ার পরদিনই ইম্ফলের ভেট সাহেবকে ‘ভেট’ পাঠাল। দুটো বড় বড় মোরগ, দু বোতল বার্মিজ মদ এবং পাঁচশো টাকা। লিখে দিল যে, রাতের বাসে গিয়ে দেখা করবে। রাতে গিয়ে আরও পাঁচশো টাকা দিয়ে ভেটকে বলে এল, কাঙ্গপোকপি থেকে একটা কল আসতে পারে। যেও, তবে যদি বোঝো যে, সে কুকুর কোনও কিছু গিলেছে এবং সেই জন্যেই খেতে পারছে না, তবে অন্য কিছু হয়েছে বলে দিয়ে চলে এসো। এক্স-রে করতে বললে বলবে, মেশিন খারাপ। ফিরে এলে, আবারও হাজার টাকা পাবে। পারলে, এমন কিছু করো, যাতে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় কুকুর। ভেট বলেছিল, এমনিতেই অনেক অন্যায় করছি। সেটা আমি করতে পারব না। তম্বি বুঝিয়েছিল কেসটা খুবই গণ্ডগোলের–ফেরার সময় পথে মার্ডার হয়ে যাবে। যদি তোমাকে ডাকে তুমি যাবে না কথা দিলে, তোমাকে আরও হাজার টাকা আমি কালই লোক মারফত পাঠিয়ে দেব। ভেবে দেখ। A Bird in hand is as good as two in the bush। ভেট টোপ খেলেন। ভবিষ্যতে কোনও টাকা পাওয়া যাবে না যাবে–তা ছাড়া নতুন এক ছোকরা, গৌহাটি থেকে পাশ করে এসে থংগলবাজারে চেম্বার খুলেছে, এমনিতেই রুজি রোজগার খুবই কমে গেছে।

নতুন ভেট যে এসেছে, সে কুকি। এসেছিল যে, তাও জানত তম্বি। তম্বি সিংকে যত ভোলেভালা মানুষে ভাবে, তা নয়। এক কোটি টাকার জিনিস হস্তগত হলে বোকারও বুদ্ধি খুলে যায়। সে ন্যাশানাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড–মুইভা ফ্যাকশানের (সংক্ষেপে এন. এস. সি. এন) নামে প্যাড ছাপিয়ে, সেই প্যাডে হুমকি দিয়ে চিঠি লিখে দেয় যে, ইম্ফল শহরের মধ্যে প্র্যাকটিস করতে পার। যদি শহরের বাইরে যাও, বিশেষ করে কাঙ্গলোটোংবীর দিকে তা হলে, তোমার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাবে। ইচ্ছা করে কাঙ্গপোকপি লেখেনি। ওই সব অঞ্চলই নাগাল্যান্ডে যাওয়ার পথেই পড়ে। অতএব সানাহানবি যে তাকে নিয়ে যাবে, সে পথও বন্ধ করে রেখেছিল। কোহিমার একমাত্র ভেট ওযে ডিমাপুরে গিয়ে মারাত্মক হার্ট-অ্যাটাকে শয্যাশায়ী থাকবেন আরও মাসখানেক, তাও তম্বি খোঁজ নিয়ে রেখেছিল। অতএব বিনা চিকিৎসাতে নয়, ভুয়া চিকিৎসাতে মারা গেল, টাইগার। ইম্ফলের ভেট এসেছিলেন। তম্বির টাকাও হজম করেছিলেন এবং থৈবীর দেওয়া মোটা টাকাও। সানাহানবি এবং থৈবী টাইগারকে বাঁচাবার চেষ্টার কোনও কসুর করেনি।

আচ্ছা রুবিটা যে টাইগারকে গেলানো হয়েছে, তা তোমার মনে এল কীভাবে?

ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

কুকুরদের নানারকম রোগ হয়। ইনফেকশাস ডিজিজ। এর মধ্যে আছে ভাইরাল ডিজিজ, রিকেটসিয়াল ডিজিজ, ফাঙ্গাল ডিজিজ। আবার নন ইনফেকসাস ডিজিজের মধ্যে আছে..

আরে, তুমি শর্টকার্টে বলো। ভটকাই বলল।

তবে শোন, বলেইছি তো তোদের যে, ইম্ফলের ভেট বলে গেছিলেন যে, টাইগারের পাপিলোমাটোসিস হয়েছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়। তখন আমি রাত দুটোতে কলকাতাতে সনৎদাকে ফোন করে শিওর হই পাপিলোমাটোসিস হয় বাচ্চা কুকুরদের। দেখবি এখন জেরার মুখে পড়ে ভেট বাবাজি সবই স্বীকার করে নেবেন। পুলিশের জেরা যে কী জিনিস তা তো সকলে জানে না। মারধোরের বাবা তা! এই জেরা ব্যাপারটা এঁরা একটা আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

আপনি এত ডিটেইলস-এ এ সব জানলেন কী করে, মিস্টার বোস?

ডি. আই. জি. বললেন।

ডিটেইলসগুলো আমার অনুমান। সঠিক তথ্য আপনাদের জেরা আর মারের মুখে বেরিয়ে আসবে। তবে আমার কনক্ল্যশানে কোনও ভুল নেই। ডিটেইলসে পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ ভুল বেরোবে হয়তো, কিন্তু ডিসিশান হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট।

তম্বি সিং উ-মঙ্গকে মারতে গেল কেন, গুলি ছুঁড়ে? মত্ত অবস্থাতে ছিল বলে?

হ্যাঁ। আমাদের সামনে মারতে যাওয়া, মত্ততারই কারণে। তবে উ-মঙ্গকে ও আজই মারত এবং এই ফার্মেরই মধ্যে। নীচে গিয়ে। হয়তো ওই ঝোরার পাশের বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতেই। তারপর পা দিয়ে ডেডবডি ঠেলে ফেলে দিত জলে। উ-মঙ্গকে ও ব্যবহার করেছিল। আরেকজনকেও করেছিল, সে হাঞ্জো। ওরা যখন টাইগারকে রুবিটা গেলাচ্ছিল তখন হাঞ্জোকে বলেছিল, থৈবী মেম সাহেবের বা সাহেবের খিদমদগারী করতে। ওদের নোকরি বাঁচাতে। ওকে মদ খাওয়ার জন্যে কুড়ি টাকা দিয়েছিল। ব্যাপারটা ওরা উ-মঙ্গের কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে করেছিল। রুবি রহস্যের কথা হাঞ্জো জানত না।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু তম্বি আর উ-মঙ্গ ইবোহাল সিংকে খুন করল কখন?

তিতির বলল।

ঋজুদা চায়ের কাপটা তুলে নিল। একটা বড় চুমুক দিল। সকলেই চায়ে চুমুক দিলেন। ডাক্তার সঙ্গে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এসে তম্বি সিং এবং উ-মঙ্গকে নিয়ে গেছে, একটু আগে। পেছনে পেছনে গেছে প্রিজন ভ্যান। আমাকে এখানেই চিকিৎসা করে পেইনকিলার ও অন্য ইনজেকশান দিয়ে, হাতটাকে ব্যান্ডেজের একটি স্লিং লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছেন ডাক্তার। ওষুধও দিয়ে গেছেন, চারঘণ্টা অন্তর খেতে। ব্যথা বাড়লেও খাবার জন্যে একটা ওষুধ দিয়ে গেছেন। বাকিটা কলকাতাতে গিয়ে হবে।

ঋজুদা আরও এক চুমুক চা খেয়ে, পাইপটা ধরিয়ে দু তিনটি বড় টান লাগিয়ে বলল, তম্বি সিং বা উ-মঙ্গ খুন করেনি ইবোহাল সিংকে।

ওরা খুন করেনি?

ঘরের মধ্যে আমাদের সম্মিলিত রুদ্ধ করে রাখা শ্বাস, একসঙ্গে পড়ল।

ঋজুদা বলল।

তারপরই থৈবীর দিকে ফিরে বলল, তোমাদের বাড়িতে যে পুলিশ সার্চ করেছিল তন্ন তন্ন করে, ইবোহাল সিং-এর তরোয়াল নিখোঁজ হওয়ার পরে রুবির খোঁজে–তা কি তুমি জানতে?

সানাহানবি চমকে উঠে তাকাল, থৈবীর দিকে।

থৈবী মুখ নামিয়ে জানাল, হ্যাঁ।

কাউকে জানাওনি কেন?

লজ্জায়।

লজ্জা কীসের? থাঙ্গজম সিং-এর মতো অবস্থাপন্ন মানুষ তো এক কোটি টাকার জন্যে বন্ধুস্থানীয় মানুষের রুবি চুরি করতে যেতেন না। এই সার্চ করানো ব্যাপারটা ইবোহাল সিংই করিয়েছিলেন, পুলিশকে ইনফ্লুয়েন্স করে। এবং থাঙ্গজম সিং যে চুরি করেননি, তা জেনেও।

তবে? কেন?

রুবি চুরি যাওয়ার সাতদিন আগে ইবোহাল সিং ইম্ফলে এসেছিলেন। সেখানে থংগল বাজারের এক মদের দোকানে ওদের মধ্যে প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হয়। দোকানের নাম আমি বলে দেব। জেরাতেও বলবেন, থাঙ্গজম সিং। ইবোহাল সিং নাকি বলেন যে, চাকর-বাকরের পয়সা হলেই কি তারা বাবুর সমান হয়ে যেতে পারে? না যায়?

কেন? এ কথা উনি বললেন কেন?

থাঙ্গজম সিং নাকি বছর পঁয়ত্রিশ আগে সত্যিই চাকরের কাজ করতেন ইবোহাল সিং-এর কাছে। তম্বি সিং এবং উ-মঙ্গ তা জানে। এই কথাতে থাঙ্গজম সিং নাকি বলেন, যে নাম-ভাঁড়িয়ে রাজা, সে আবার রাজা না কি? আর যা করে তুমি বড়লোক আমিও তো তাই করেই বড়লোক। বাইরের ভড়ং আমাদের যাই থাক। এই রাগেই ইবোহাল চুরির দায়ে থাঙ্গজম সিং-এর বাড়ি সার্চ করিয়ে তার বদলা নেয়। তবে থাঙ্গজম বাড়ির চাকর বাকর সকলকে মোটা টাকা দিয়ে, কথাটা যাতে প্রচার না হয়, তার সর্বতোভাবে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাড়ির আশেপাশের মানুষেরা জেনে তাকে টিটকিরি দিতে থাকেন। থৈবী ও তার দাদা ইবোবা এবং ইবোবার স্ত্রী যমুনাকেও এর জন্যে অনেক অপমান সইতে হয়। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে থাঙ্গজম সিং হাঞ্জোকে দিয়ে খুন করান ইবোহাল সিংকে। তা ছাড়া অন্য কারণও ছিল। তা আমি ডি. জি-কে জানাব।

ঋজুদা এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে থৈবী একটি আর্তনাদ করে সোফা থেকে মূর্ছা গিয়ে কার্পেটে পড়ে গেল।

ঋজুদা দাঁড়িয়ে উঠে বলল, স্মেলিং-সল্ট আছে, সানাহানবি? থাকলে এক্ষুনি দাও। না থাকলে গরম দুধের সঙ্গে দু চামচ ব্র্যান্ডি দিয়ে খাইয়ে দাও। ও ঠিক হয়ে যাবে।

ডি.আই.জি বললেন, হাঞ্জো কী করে খুন করল, ইবোহাল সিংকে?

ওকে নিয়ে গেছিল পুরনো ড্রাইভার ইরাবন্ত সিং। রাতের বেলা, স্টিল-গ্রে মারুতি ওয়ান থাউজ্যান্ড নিয়ে। ড্রাইভার জানত না, যাবার উদ্দেশ্য। তবে সন্দেহ একটু করে, যখন গাড়িটা বাড়ির ভিতরে না ঢুকিয়ে ইরাবন্ত সিংকে বাজার থেকে খাওয়া দাওয়া করে এসে বাড়ির বাইরের দেওয়ালের পাশে একটি বিশেষ জায়গাতে দাঁড় করিয়ে রেখে, ঘুমিয়ে থাকতে বলে। বলে, ওর ফিরতে রাত হবে। বলে, ইবোহাল সাহেবকে বিরক্ত করতে চায় না। ওর কাজ আছে উ-মঙ্গ এর সঙ্গে। উ-মঙ্গ-এর সঙ্গে আগেই টেলিফোনে যুক্তি করে রাখে। তম্বি সিং তখন ইম্ফলে ছিল। একটা ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছের গা বেয়ে কম্পাউন্ডের ভিতরে নামে হাঞ্জো সিং। হাঞ্জো এমনিতেই দাগি খুনি। সবরকম খুন-জখমে সিদ্ধহস্ত। আপনাদের রেকর্ডস ও বার্মা পুলিশের রেকর্ডস দেখলে ওর সম্বন্ধে জানতে পারবেন। ওইরকম লোক বলেই বডিগার্ড হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন থাঙ্গজম সিং।

তারপর?

তারপর, উ-মঙ্গ তাকে, সে যেখানে শোয়; সেখানে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে রাখে। নিজে গিয়ে খেয়ে আসে। সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের সব আলো নিভে গেলে, ফিরে আসে। ইবোহাল তখনও পড়েছিলেন। ইবোহাল যে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ এবং তাঁর সম্বন্ধে যে যাই বলুক, তিনি যে ও সব বাজে ব্যাপারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন– তা আমার মনে হয় না। আমার ভুল হতে পারে না, এমন নয়–কিন্তু আমি জোর দিয়ে বলব যে, মনে হয় না। তারপর কী করে খুন করে, তা তো ভটকাইই তোদের বলেছে।

ডি.আই.জি. সাহেবও বললেন, হ্যাঁ। আমার কাছেও সেই রিপোর্ট আছে। তবে ইবোহাল সাহেবের ওভারশটা পরে অপকর্মটি করাতে পুলিশ পিরপ্লেক্সড হয়ে গেছিল।

ভাল করে চারদিকে দেখলে, ভিজে মাটিতে, বাগানের অন্য প্রান্তে যেখানে ওই ভারী শরীর নিয়ে হাঞ্জো লাফিয়ে পড়েছিল, সেখানে তার পায়ের চামড়ার জুতো পরা দাগ খুঁজে পেতে পারত। যত্ন নিয়ে খোঁজেনি। থাক, হাঞ্জো নিজেই যখন নেই, তখন এই আলোচনা অনর্থক। কিন্তু ছাঁচটি আমি প্লাস্টার অফ প্যারিসে তুলে রেখেছি–যা তো রুদ্র। আমার স্যুটকেস থেকে নিয়ে এনে দে ডি.আই.জি. সাহেবকে। ফোটোও ভোলা আছে। হত্যাকারী কে, তা স্থিরীকৃত না হলে তো বহুবছর ধরে অগণ্য মানুষের হয়রানি হবে।

তা ঠিক।

ব্র্যান্ডি মেশানো দুধ খেয়ে থৈবী আবার উঠে বসেছে, কিন্তু ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে যে, ও যেন ভাল না হলেই খুশি হত।

থৈবী যেন বহুদূর থেকে কথা বলছে, এমনভাবে বলল, তা হলে বাবার তো জেল হয়ে যাবে।

নাও হতে পারে। কিছু মনে কোরো না থৈবী, এই দেশে কেন, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই যাদের পয়সা আছে, তাদের জেল প্রায়ই হয় না, ফাঁসিও হয় না। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা থেকে বড় বড় ফৌজদারি উকিল, ব্যারিস্টার নিয়ে আসতে বলবে। তাঁদের সওয়ালের ভারে এই ছোট জায়গার জজ সাহেব এবং আমার দেওয়া তথ্য-প্রমাণ ধুলোর মতো উড়ে যাবে। তবে জেল হবে তম্বি সিং-এর আর উ-মঙ্গ-এর, অবশ্যই। তাদের বাঁচাবার তো কেউই নেই! এদেশের জেল গরিবরাই চিরদিন ভরে এসেছে।

আমার ভাই ইবোবা সিংকে কে খুন করেছে?

ওঁরা তো টেররিস্টদের গুলিতে মারা গেছেন। তা ছাড়া থৈবী, আমি তো এসেছিলাম ইবোহাল সিং-এর মৃত্যুর তদন্ত করতে। টেররিস্টদের গুলিতে মারা যাবার সম্ভাবনাই বেশি। রোড-ব্লকও তো করে রেখেছিল তারা।

থৈবী কী যেন ভাবছিল। কথা বলল না।

ঋজুদা বলল, তোমার বাবা, তিন তিনটে হঠকারিতা করেছিলেন, যে জন্যে আমার সন্দেহ জোরদার হল। (১) তম্বি সিংকে আমার কাছে পাঠানো উচিত হয়নি ওঁর। তম্বি সিং-এর পটভূমি, অবস্থা এবং আরও সবকিছু তাঁর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলে শুধু আমি কেন, এই এরাও বুঝেছিল। পঞ্চাশ হাজার টাকা অ্যাডভান্স ওর পক্ষে দেওয়া যে সম্ভব নয়, এমন সন্দেহ প্রথমেই হয়েছিল। (২) উনি ওঁর বাড়িতে পুলিশের তল্লাসির খবরটা আমার কাছে চেপে গিয়ে ভাল করেননি। বিশেষত আমাকে যখন আগে থেকেই চিনতেন। অথচ আমি যমুনার মুখের বিষাদ দেখেই বুঝেছিলাম যে এ বাড়িতে তাকে বিষণ্ণ করার মতো কিছু ঘটেছে। (৩) ইরাবন্ত সিং, পুরনো ড্রাইভারকে সঙ্গে সঙ্গে ছাড়িয়ে দিয়ে আমাদেরই জন্যে বাঙালি ড্রাইভার যোগেনকে রাখা উচিত হয়নি। বাঙালিরা গরিব সন্দেহ নেই, কিন্তু এখনও খুঁজলে অন্য প্রদেশীয়দের তুলনাতে বাঙালিদের মধ্যেই সমানুষের সংখ্যা বেশি হবে। যোগেন বেশি কথা বলে, গরিব; কিন্তু অসৎ নয় সে। পয়সার জন্যে আমাদের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করতে রাজি হয়নি। এটাই সৌভাগ্যের কথা যে পয়সা এখনও সব মানুষকে কিনতে পারে না। (৪) নতুন মারুতি ওয়ান থাউজ্যান্ড এর স্টিল-গ্রে রংকে কেউ কাঁটক্যাটে লাল রং করায় না, প্রায় রাতারাতি। এতেও আমার সন্দেহ হয়। তা ছাড়া আমি ইরাবন্ত সিং-এর বাড়িও গেছিলাম। তাকে টাকা দিয়ে এবং জেলের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে জবানবন্দিও নিয়ে এসেছি যে, সে তোমার বাবার আদেশে হাঞ্জো সিংকে সঙ্গে নিয়ে সেই রাতে ‘মোরে’তে গেছিল–এবং চারঘণ্টা বাজারে খেয়ে দেয়ে আড্ডা মেরে, হাঞ্জোর নির্দেশমতো গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল বাংলোর বাইরে রাত বারোটা অবধি। তারপর দেওয়াল টপকে লাফিয়ে-আসা হাঞ্জোকে নিয়ে ফিরে আসা ছাড়া, অন্য কোনও কাজও তার ছিল না। তোমার বাবা তার মুখ বন্ধ করার জন্যে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তাও সে কবুল করেছে।

ভটকাই বলল, আচ্ছা ঋজুদা, উ-মঙ্গ যদি খুনের কথা জানতই, তবে তাকে অ্যারেস্ট করা দূরে থাক, তাকে জেরা করার জন্যেও পুলিশে ধরে কেন নিয়ে গেল না, তাতে আমার বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না।

তোর বুদ্ধি নেই, তাই। পুলিশেরা ইচ্ছে করেই তা করেনি। আর কেন করেনি তা ডি. আই. জি. সাহেবকে বল, যেন তদন্ত করে অপরাধীদের সাসপেন্ড করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশান নেন স্যাক করেন।

তিতির বলল, ইবোহাল সিং-এর সম্পত্তি কে পাবে? আর রুবিটা?

রুবিটা টেবলের পরে রাখা ছিল। ভাল করে ধুয়ে, স্পিরিট দিয়ে মুছে রেখেছিলেন ভেট।

এই ভেট-এরও শাস্তি হবে। জেরার মুখে সব স্বীকার করবেন। বুদ্ধিমান হলে, প্রথমেই স্বীকার করবেন। তা ছাড়া, সানাহানবি তুমি টাইগারের মৃত্যুর জন্যে ওঁর উপরে ড্যামেজ স্যুটও ফাইল করবে। যাতে ড্যামেজ দিতে গিয়ে বাড়ি, ঘর বিক্রি করে তাকেও ইম্ফল ছেড়ে চলে যেতে হয়। দুর্নীতি যে সমাজের কোন স্তরে, কোন মহল্লাতে না পৌঁছেছে এখন, তা ঈশ্বরই জানেন। এমন না হলে, দুর্নীতি আর চোরাচালান আর খুন আরও বাড়বে। রসাতলে যাবে পুরো দেশ।

এই চোরাচালানের টাকা শেষ অবধি কোথায় যায়, ঋজুকাকা?

তিতির শুধোল।

দেশের যেখানেই চোরাচালানি জিনিস কিনিস, তা সুগন্ধ সাবান বা পারফুম বা টেপ-ডেক বা ভি. সি. আরই হোক, তা ফিরে আসছে এ. কে. ফর্টিসেভেন রাইফেল, গোলা বারুদ আর আর. ডি. এক্স, বিস্ফোরক, বোমা, রিমোট কন্ট্রোল; এই সব হয়ে। এ কথা শিক্ষিত মানুষেরাই বোঝে না তা সাধারণদের দোষ দিয়ে লাভ কী। চোরাচালানের পথে যা কিছু আসে–থৈবী তোমার বাবার ব্লু-লেবেল হুইস্কি থেকে আরম্ভ করে তোমার নেইল পালিশ–হেয়ার-ড্রায়ার, জাপানিজ সিল্কের শাড়ি, সব কিছুইতা ব্যবহার যারা করেন, তাঁরা সমান অপরাধী। আমার এই অ্যাস্ফোরা তামাকও! আমিও…

হঠাৎ থেমে ঋজুদা বলল, একী। ভোর হয়ে গেল যে! এবার আমরা বেরিয়ে পড়ব, সানাহানবি। আরেক কাপ করে চা কি হবে? সঙ্গে দুটো করে বিস্কিট?

সানাহানবি উঠে পড়ে বলল, একেবারে ক্রিসপ, গরম গরম চিজ-টোস্ট করে দিচ্ছি আপনাদের।

যা দাও। বড় চিন্তায় আছি, আমার গদাধরের জন্যে।

কলিং বেল টিপতেই বাবুর্চি এসে দাঁড়াল। অর্ডার দিয়ে দিল সানাহানবি।

তিতির বলল, বললে না তো মিস্টার ইবোহাল সিং-এর সব সম্পত্তির, এই রুবিটা সুষ্ঠু কে মালিক হবে?

ঋজুদা বলল, আমি মালিক হলে কি তুই খুশি হতিস?

হতাম না? ওরকম দুটো বাংলো। নদী পেরুলেই বার্মা? ব্যাঙ্কে কত টাকা কে জানে! ওই রকম সব ফার্নিচার, ক্রকারী, কাটলারি…দ্যা রিট্রিট!

থাম থাম। এ সবের তো শেষ নেইরে। জীবনে সত্যিকারের শিক্ষা যাদের আছে, তারা প্লেইন-লিভিং হাই-থিংকিং-এ বিশ্বাস করে। আনন্দ তাতেই। আড়ম্বরে আনন্দ নেই। তবে না। আমি পাব না। এ সব পাবে, সানাহানবি।

ঘর সুষ্ঠু লোক একসঙ্গে বলে উঠল, সানাহানবি?

সানাহানবি আর থৈবী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

হ্যাঁ, তোরা ভাবছিস যে, আচ্চাও সিংকে দিয়ে গেছেন ইবোহাল সিং সাহেব?। লাইহারোবা সিং-এর, অকৃতদার কাকার সম্পত্তি পেয়ে নিজের জীবনেই একটা সত্য ইবোহাল সিং জেনে গেছিলেন, হয়তো, নিজে শিক্ষিত ছিলেন বলেই যে, পড়ে-পাওয়া ধন আর বসে-খাওয়া জীবন মানুষকে নষ্ট করে দেয়। যতটুকু মানুষ সৎ পরিশ্রমে পায়, সেইটুকুর স্বাদই আলাদা, সেটুকুই শেষ পর্যন্ত থাকে। আর থাকে মান-সম্মান। এই সত্য বুঝতে দেরি হয় মানুষের, কিন্তু এইটাই সত্য। আচ্চাও সিং ভাল ছেলে এবং ইবোহাল সিং তাঁকে সত্যিই ভালবাসতেন বলে জাগতিক সম্পত্তি দিয়ে যাননি। তাঁর মনের মতো গড়ে দিয়ে গেছিলেন তাঁকে, সেইটাই সবচেয়ে বড় সম্পত্তি। চিরদিনের সম্পত্তি।

বলেই বলল, ডি. আই. জি. সাহেবকে, বলুন স্যার, আর কোনও প্রশ্ন আছে। আপনার? ক্যাসেটটাও বোধহয় ভরে এল। অনেক কথাই বাকি রইল। ডি. জি-কে চিঠি লিখে জানাব।

ওয়েলকাম।

তারপর ঋজুদা বলল, আমার একটা অনুরোধ। এই টাকাটা তম্বি সিংকে ফেরত দেবেন–এ টাকা তিনি তাঁর মামলার খরচ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যদিও টাকাটা থাঙ্গজম সিং-এর, কিন্তু এখন এর মালিক আমি। রসিদও দিয়েছি। মোট পঞ্চাশ হাজার থেকে আমাদের খরচ হয়েছে পনেরোশ ছাপান্ন টাকাকী করে ভটকাই?

ইয়েস। ইনক্লডিং, কস্ট আফ পান্তুয়া অ্যান্ড ডালকুলাক্স।

কত আছে হাতে?

দাঁড়াও। ক্যালকুলেটরটা বের কর না, রুদ্র।

ভটকাই উত্তেজিত হয়ে বলল।

তিতির হেসে বলল, আটচল্লিশ হাজার চারশো চুয়াল্লিশ।

একটা খাম, সানাহানবি।

সানাহানবি উঠে গেল, খাম আনতে।

একটা রসিদ…।

ডি.আই.জি. সাহেব বললেন, এতো ট্রেজারিতে জমা পড়বে না। আমি পার্সোনাল রসিদ দিয়ে সানাহানবি মেমসাহেবকে দিয়ে উইটনেস করিয়ে নিচ্ছি।

ঠিক আছে। সকলেরই যখন বাঁচার চেষ্টা করার অধিকার আছে, তখন তম্বি সিংই বা করবে না কেন? তবে উ-মঙ্গ-এর প্রতি আমার কোনও সিমপ্যাথি নেই। ও শুধু চোরই নয়, মিথ্যেবাদী, লোভী, চক্রান্তকারী। উ-মঙ্গ মেরে ফেলতে পারত তম্বিকে, রুবিটা হাতাবার পর। বিরাশির বুড়োরও যখন লোভের নিবৃত্তি হল না, ও থাকুক বাকি জীবনটা জেলে।

আমার বাবা যদি পালিয়ে গিয়ে থাকেন?

থৈবী প্রশ্ন করল।

পালাবার সম্ভাবনা নেই, থৈবী। তোমার বাবাকে পুলিশ মনে হয়, রাত বারোটা নাগাদ অ্যারেস্ট করেছেন।

সেকী! তা হলে যমুনা যে বাড়িতে একা আছে।

ও, এই যমুনা। ভারী ভাল মেয়ে, তোমার মতো থৈবী। তোমার বাবাকে তোমরা বাঁচাতে পারো। ভাল উকিল দিয়ে দেখো। আইনের অনেক ফাঁক-ফোকর থাকে। কিন্তু বাঁচাতে পারলে, ওঁকে সৎপথে চালিত কোরো। সভাবে কাজ করে, মাথা উঁচু করে কোটি কোটি মানুষ সব রকম বৃত্তিতে, আজও বেঁচে আছে। উনিই বা পারবেন না কেন? তোমার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় সুকৃতি তুমি এবং যমুনা। তোমার দাদাকে আমি দেখিনি, মিশিনি; বলতে পারব না তাই তার সম্বন্ধে।

দাদা খুব ভাল ছেলে। এই সব কারণেই বাবার সঙ্গে বনত না দাদার। দাদার মৃত্যুর রহস্য ভেদ করার ভার আপনি কি নেবেন? কলকাতায় কদিন থেকে ফিরে এসে?

ভেবে দেখব। তুমি ফোন কোরো।

নাম্বার?

সব আছে সানাহানবির কাছে। তুমি ডি. জি-র সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। তিনিই বলবেন, যা বলার।

সানাহানবি খাম নিয়ে ফিরে এল। মুখ নিচু করে বলল, কী প্রমাণ যে, আমিই ইবোহাল আংকল এর সব সম্পত্তির মালিক?

উইল আছে। উখরুলের উকিল একজন এগজিক্টর এবং তম্বি সিং নিজে আরেকজন।

তম্বি সিং? চমকে উঠল সানাহানবি এবং থৈবীও।

ডি. আই.জি. সাহেব, আপনি উইলটার একটা প্রোবেট করিয়ে নেবেন উকিল দিয়ে, কারণ ওই বুড়ো উকিলের শরীরের অবস্থা ভাল নয়। ওঁর পক্ষে দু একদিনের বেশি ইম্ফলে থাকাও সম্ভব নয়। ডি. জি. সব জানেন। জবানবন্দি নিয়ে ও প্রবেট করিয়ে ওঁকে ছেড়ে দেবেন।

ততক্ষণে চা আর চিজ টোস্ট এসে গেছে। রোদও উঠে গেছে। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। একটু দূরের ন্যাশানাল হাইওয়ে দিয়ে কোহিমা ও ইম্ফলের দিকে গাড়ি বাস ও ট্রাকের যাতায়াতের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

সানাহানবি ও থৈবী সকলের প্লেটে প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে আবার বসল।

ঋজুদা বলল, কনগ্রাচুলেশনস!

সানাহানবি, লেডি ডাই; মুখ নিচু করে এমন একটা স্মাইল দিল, ভটকাই-এর ভাষাতে, যে রিয়্যাল লেডি ডাইও লজ্জা পেতেন দেখলে।

একটা ফোন করো থৈবী, যমুনাকে।

ঠিক বলেছেন।

থৈবী বলল।

ফোনের ডায়াল যখন থৈবী ঘঘারাচ্ছিল, ঋজুদা বলল, টাইগারকে নতুন করে কবর দিয়েই তোমরা দুজনেই চলে যাও ইম্ফলে, তারপর যমুনাকে গৌহাটি পাঠিয়ে দাও।

ও যেতে চায় না।

ওর বাবার কাছে?

বাবার কাছেও নয়।

বাবার প্যারালিসিস। ও না দেখলে, কে দেখবে?

ও ওর বাবাকে ঘেন্না করে।

ও ভগবান! এ কোন পৃথিবীতে বাস করছি আমরা!

ভটকাই হঠাৎ বলল, আচ্ছা ঋজুদা, তুমি আমাকে দিয়ে উ-মঙ্গকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করালে কেন?

ঋজুদা হেসে উঠল।

বলল, সরি। করিয়েছিলাম, যাতে ধূর্ত, ভণ্ড, পাজি, লোভী উ-মঙ্গ বুঝতে না পারে যে, ওর আসল রূপ আমি ধরে ফেলেছি।

তোর প্রণামটা ও খেয়েছিল। বল?

একটা চিজ টোস্ট মুখে দিয়ে ঋজুদা বলল, তা হলে যমুনাকে তোমরা তোমাদের সঙ্গে করে এখানে নিয়ে এসো। কদিন তোমরা তিনজনে একসঙ্গে থাক, মজা করো। জীবনটা তোমাদেরই। আর, মাত্র একটাই জীবন। কালো মেঘ আসে, ভেসে যায়, আবার সকাল হয়, ফুল ফোটে, পাখি ডাকে। দুঃখ, কষ্ট, আঘাত, শোক, জীবন থাকলেই থাকে। তা সত্ত্বেও বাঁচতে হবে। বাঁচবে। আনন্দে বাঁচবে তোমরা থ্রি কমরেডস।

বলেই, চায়ে বড় একটা চুমুক দিয়েই ঋজুদা উঠে পড়ে চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দাতে এল। বলল আঃ। কী সুন্দর সকালটা!

সকলেই সঙ্গে সঙ্গে এলেন।

সানাহানবিকে, এই রুবিটা ইম্ফলের ব্যাঙ্কের লকারে রাখতে সাহায্য করবেন একটু আপনি। আজই। ঋজুদা বলল।

নিশ্চয়। ডি. আই. জি. বললেন।

যতদিন না উনি উঠিয়ে নিতে বলছেন, ততদিন আর্ম-পিকেটও থাকবে এ বাড়িতে। কোনও চিন্তা নেই আপনার। এয়ারপোর্ট অবধি আপনাদের সঙ্গেও দুটি জিপ যাবে এসকর্ট হিসেবে।

ডি.আই.জি. বললেন।

ফাইন।

হাতঘড়ির দিকে একবার চেয়ে নিয়ে ঋজুদা বলল, তা হলে আমরা এগোই। এই রুদ্র, জিপসিটা যে পড়ে রইল সেই কোন বাদাড়ে? যা তো, সেটাকে নিয়ে আয়। চাবিটা নিয়ে যা।

আমি হেসে উঠলাম। বললাম, চল ভটকাই। চল কলকাতা এবারে, দেখিস এবারে তোকে কেমন চটকাই।

ঋজুদা বলল, প্লেন থেকে নেমে ভটকাই-এর প্রথম কাজ মোটর-ট্রেনিং স্কুলে গিয়ে ভর্তি হওয়া।

বাংলো থেকে বেরিয়ে ভটকাই বলল, আমার মনে হচ্ছে ঋজুদা সব কথা খোলসা করে বলল না এখনও।

বলেনিই তো। আর বলবেই বা কেন? খুনিকে ধরা, চুরি-যাওয়া রুবির হদিস করা; এ সব তো পুলিশেরই কাজ। তাদের কি চামচে করে তুলে পায়েস খাইয়ে দেওয়া কাজ ঋজুদার? তা ছাড়া আরও একটা কারণ আছে।

কী?

তা হলে আমাদের পরীক্ষাটা নেবে কীভাবে? আমি তোকে বলে দিলাম কলকাতাতে ফিরে আমাদেরই বলবে ইবোবা সিংকে কে বা কারা মারল তা বুদ্ধি খাঁটিয়ে খুঁজে বের করতে। ঋজুদাই যদি সব করবে, তবে আমরা কি শোভা?

তাই?

ইয়েস স্যার। তা ছাড়া মদের দোকানের ঝগড়াই শুধু নয়, বাড়ি তল্লাশিও নয়; আমার ধারণা ইবোহাল সিং-এর খুন, ইবোবা সিংয়ের মৃত্যু এবং আচ্চাও সিং-এর বার্মাতে পালিয়ে যাওয়ার পেছনে নাগা ও কুকি টেররিস্টদেরও হাত আছে। ইবোহাল সিং নাগাদের মদত দিতেন আর থাঙ্গজম সিং কুকিদের। ঋজুদা সেটা ভাল করেই জানে। কিন্তু এই কথা অত লোকের সামনে বলাতে অনেকই অসুবিধা ছিল। কারণ, ইস্যুটা পোলিটিক্যাল। এই কথাই নিশ্চয়ই পরে লিখবে ডি.জি-কে, দেখিস।

মারুতি জিপসিটা কোথায় ছিল, তা ভটকাই জানত। সেই জায়গাতে পৌঁছে দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে, জিপসিটা ব্যাক করে বড় রাস্তাতে পড়ে হাচিনসন’স লজ’-এর দিকে মুখ ঘোরাতে যাব জিপসির, এমন সময় ভটকাই বলল, একটু আগেই কাঙ্গপোকপির সেই ধাবা। চল, দুটো করে পোড়া মবিলে ভাজা জিলিপি আর কচুরি লড়িয়ে আসি। আলুর তরকারিটার যা স্বাদ না! ইসস। নিশ্চয়ই দাদ চুলকোতে চুলকোতে ঝোলের মধ্যে দাদের ঝাল দিয়ে দেয়।

ইস। স্টুপিড। সকালবেলা, এমন একটা সবদিক দিয়ে সুন্দর সকালবেলা, আর তুই…

কাঙ্গপোকপির ধাবাতে পৌঁছেই তাড়াতাড়ি অর্ডার দিয়ে দিল ভটকাই নেমে। আমি জিপসিটা সরিয়ে নিয়ে একটা মস্ত সেগুনগাছের নীচে রাখলাম ওটাকে। খাবার এলে, গাড়িতে বসেই খেলাম। তারপর চাও। বেশি দুধ, বেশি চিনি দিয়ে।

সানাহানবির বাড়ির এত ভাল চায়ের স্বাদটা এতক্ষণ মুখে লেগে ছিল। দিলি সব মাটি করে।

হ্যাঁরে। একদিন সবই মাটি হয়। এই নে মর্নিং নিউজপেপার। ইংলিশ।

কাগজের নামটা ভাল করে পড়ার আগেই ভটকাই ছোঁ মেরে কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিল। চায়ের গ্লাস থেকে চা চলকে পড়ল আমার জিনস-এর উপরে।

চটে গিয়ে বললাম, কী হল? এটা?

আরে সেই লোকটাও মার্ডারড?

কে?

আরে ঋজুদার পুরনো বন্ধু। থেংনোপালের পাহাড়ের জোতদার রঘুমণি সিং। যেখানে ইবোবা সিংদের রোড ব্লক করে মারা হয়েছে, তার কাছেই তার বাড়ি।

আমি বললাম। হুমম।

বাবাঃ। তুইও দেখি দিল হুম্ হুম করছিস–ঋজুদা স্টাইলে।

ভটকাই বলল।

না। ব্যাপারটা সিরিয়াস। এই খুনের বদলা আবার কাল অন্যেরা নেবে। আসলে এই মণিপুরের এই নাগা এবং কুকিদের বিরোধের সঙ্গে অগণ্য বড়লোক ও গরিব শান্তিপ্রিয় মণিপুরিও জড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কারণ, অগণ্য মানুষের ভেস্টেড ইন্টারেস্ট আছে একদলের সুরক্ষা এবং অন্যদলের বিনাশের পিছনে। বড়ই চিন্তার কথারে ভটকাই। এমনি করে ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পথেই এগিয়ে চলেছে।

আমি জানতাম।

কী জানতিস?

ছাগলের দুধ খেয়ে, চরকা কেটে, খদ্দর পরে আর নেহরু সাহেব আর জিন্না সাহেবের জ্বালাময়ী ইংরিজি বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে যে স্বাধীনতা এসেছিল, তা থাকবার নয়। স্বাধীনতা, রক্তর মূল্যে না কিনলে সে স্বাধীনতা বাঁচিয়ে রাখা ভারী মুশকিল। ঠাকুমার হাতের মোয়া নয় এ, যে হাত ঘোরালি আর ঠাকুমা তোর হাতে তুলে দিল। বাংলাদেশের মানুষ বুকের রক্ত আর নারীর সম্মানের মূল্যে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। দেখিস, ওরা স্বাধীনতার দাম বুঝবেন।

হুমম।

ভটকাই বলল, তুই দিচ্ছিস বটে গুরু। একেই বলে গুরু গুড় আর চেলা চিনি।

মানে কী হল?

মানে জানিস না? বিখ্যাত হিন্দি প্রবচন রে। মানে, গুরু যে সে গুড়ই রয়ে গেল, কিন্তু চেলা যে, সে সুপারফাইন চিনি হয়ে বেরিয়ে গেল।

আমি বললাম, কী জানি। গদাধরাতো ঋজুদাকে বলে, তোকে দেখিয়েই, তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।

আমরা লজ-এর ভিতরে জিপসিটা ঢুকিয়ে দিতেই, ঋজুদা আর তিতির তাদের ব্যাগ হাতে করে এগিয়ে গেল। পেছনে পেছনে অন্যরা। সানাহানবি, থৈবী, ডি.আই.জি. সাহেব এবং তাঁর অগণ্য চেলা-চামুণ্ডারা।

ঋজুদা বলল আমাদের, যা, নেমে তোদের ব্যাগ তোল। অনেক সময় লাগবে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে।

সকলেই এখন গাড়িতে উঠেছি। ঋজুদা পাশে বসেছে, তিতির চালাবে। আমরা পেছনে। সানাহানবি ঋজুদার কাছে এসে স্বগতোক্তির মতো বলল, আবার কবে আসবেন?

আমি বুঝলাম, যে এই প্রশ্নর মধ্যে, অনেকই প্রশ্ন জড়িয়ে-মড়িয়ে ছিল।

ঋজুদা কাঁধ শ্রাগ করে বলল, (কখনওই করে না। অবাক হলাম আমরা, ঋজুদার এই অধঃপতন দেখে) যাওয়াটা সোজা, ফিরে আসাটাই ভারী কঠিন।

বলেই, এক মুহূর্তের জন্যে বিষণ্ণ ও উদাস হয়ে গেল। সানাহানবি ও থৈবীকে বাই বলে, তিতির জিপসিটা ব্যাক করল। তারপর ড্রাইভের কোনাতে ঘুরিয়ে নেবার পর, সকলে মিলে হাত নাড়লাম। ওরাও হাত নাড়ল। সানাহানবির সুন্দর, শিষ্ট, বিশিষ্ট, সম্ভ্রান্ত দাঁড়িয়ে-থাকার ভঙ্গিটি, আমাদের সকলেরই চোখের মণিতে, চিরদিনের মতো আঁকা রইল।

জিপসির চাকা পিচ-এর পথে পড়েই জোরে ঘুরতে লাগল। হঠাৎ ভটকাই গেয়ে উঠল,

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে
তখন ছিলেম বহুদূরে কীসের অন্বেষণে।
কুলে যখন এলেম ফিরে তখন অস্ত শিখরশিরে
চাইল রবি শেষ চাওয়া তার কনকচাঁপার বনে।
আমার ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।

বাঃ! ভারী ভাল গাস তো তুই, ভটকাই!

ঋজুদা নিজের মনেই বলল।

ভটকাই রঘুমণি সিং খুন হবার খবর-ছাপা খবরের কাগজটা, ঋজুদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ঋজুদা।

আমি এক টানে কাগজটা ওর হাত থেকে নিয়ে তার উপর চেপে বসলাম।

ভটকাই আমার চোখের দিকে চেয়ে আমার চোখের ভাষা বুঝল।

ঋজুদা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, কী?

ভটকাই বলল, কিছু না।

আমি বললাম, গানটা শেষ কর না।

ঋজুদা কিছু বলল না।

ভটকাই আবার ধরল:

লিখন তোমার বিনিসুতোর শিউলিফুলের মালা,
বাণী যে তার সোনায় ছোঁওয়া অরুণ-আলোয় ঢালা–
এল আমার ক্লান্ত হাতে, ফুল-ঝরানো শীতের রাতে।
কুহেলিকায় মন্থর কোন মৌন সমীরণে।
তখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে,
তুমি আমায়…….

আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথ না থাকলে আমাদের যে কী দশা হত!

ভটকাই বলল, কী আবার হত! কাকে-চিলে ঠোঁটে করে তুলে নিয়ে গিয়ে ভাগাড়ে ফেলত।

জিপসিটা জোরে চলছিল। চারদিকের বন-পাহাড়ের সকালবেলার গন্ধ, সকালবেলার আলো, হু হু করে কলুষহীন হাওয়া আসছে, উড়ে যাওয়া পাখির চিকন স্বর……।

তিতিরের, আমার, ভটাকই-এর এবং হয়তো ঋজুদারও, সানাহানবির কথা মনে পড়ছিল খুবই। পৃথিবীটা ছোট্ট হলে; পায়ে হেঁটেই একে অন্যের কাছে এমন সুগন্ধি সকালবেলায় পৌঁছতে পারলে, কী ভালই না হত!

ভাবছিলাম আমি।

(এই উপন্যাসের পটভূমি বাস্তব কিন্তু প্রত্যেকটি চরিত্রই কাল্পনিক।)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *