কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আলুথালু বেশে একজন অল্পবয়সি মহিলা ঘরে এলেন। বুঝলাম যে ইনিই ইবোবা সিং-এর স্ত্রী যমুনা। ঋজুদাকে সে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। যমুনার চেহারাতে ভারী একটা শান্ত শ্ৰী আছে। সানাহানবি একধরনের সুন্দরী আর যমুনা অন্যধরনের। সৌন্দর্যেরও কতরকম থাকে। সত্যি।

ঋজুদা এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত দিল। ঘরের সকলে এই অপরিচিত ঋজুদাকে দেখে, ইবোবা সিং-এর স্ত্রীর শোক কেন উথলে উঠল তা বুঝতে না পেরে, অবাক চোখে যমুনা, ঋজুদা এবং থাঙ্গজম সিং-এর দিকে চেয়ে রইল। ফিসফিস করে কী সব বলাবলি করতে লাগল।

থাঙ্গজম সিং বললেন হাঞ্জোও..শুনেছেন তো! একেকজনের গায়ে, কম করে কুড়িটা গুলি লেগেছিল। গভর্নমেন্ট কী যে করছে, কে জানে! মানুষের পক্ষে তো ঘরের বাইরে বার হওয়া অসম্ভব। মোরের কাঠগোদাম থেকে কয়েক লক্ষ টাকার সেগুনের লগ পাচার হয়ে গেছে বার্মাতে, এই খবর পেয়েই হাঞ্জো আর ইবোবাকে পাঠালাম–তাদের সঙ্গে রিভলভারও ছিল। কিন্তু তা বের করার সময় পেল কই। থেংনোপালের ঘাটিতে একটা হেয়ারপিন বেন্ড পেরোনোর পরেই, রোড ব্লক। আর কী ব্যাপার বোঝার আগেই, গুলিতে মারুতি ওয়ান থাউজ্যান্ড ঝাঁঝরা হয়ে গেল। আমার একমাত্র ছেলে–বোস সাহেব।…কত কী ভেবেছিলাম। একটা লিমিটেড কোম্পানি করব। কলকাতা থেকে অনীক সেন সাহেবকে…।

এতবড় লম্বাচওড়া গুণ্ডার মতো মানুষটা, হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। ২৫৪

ঋজুদা ওর কাছে গিয়ে, কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, দু একদিনের মধ্যে আমি আবার আসব। কী করবেন বলুন? ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস।

ওদের কাছে বিদায় নিয়ে ঋজুদা বেরিয়ে এল। আমার চোখের সামনে প্রকাণ্ড ঝাড়লণ্ঠন জ্বালা, আলো ঝলমল পিওর বার্মাটিকের আসবাবে ভরা, ঐশ্বর্যের প্রতিমূর্তি, ওই বসবার ঘরে–সেই সন্তানহারা বাবার মূর্তিটা চিরজীবনের মতো আঁকা হয়ে গেল।

গেট অবধিও যাইনি, এমন সময়ে যোগেন কুণ্ডু দৌড়ে এল। টাটা সিয়েরা গাড়িতে সে অন্য দুজন ড্রাইভারের সঙ্গে বসে গল্প করছিল। দৌড়ে এসে বলল, সেদিন না-আইয়া ভালই করছেন। দাহ হইতে হইতে আজ ভোর। পোস্টমর্টেম-টর্টেম–পুলিশের যা হ্যাঁপা। অবশ্য এক দিক দিয়া ভালই হইছে– বৌদির মামা, যে নাকি গুয়াহাটিতে ইনক্যামটাক্সো কষেন, তিনিও দাহর আগে আগে আইস্যা পৌঁছাইয়া গেলেন।

তোমার পেট কেমন আছে, যোগেন বাবু?

আমি বললাম।

হ। এহনে ভালই কম। তবে প্যাটের কথা ভাবনের সময় কই কন? তবে একটা ডিসিশিন লইয়া লিছি। আমার ওয়াইফেরেও কইয়া দিছি যে, লাইফে ঘোষেগো দুকান থিক্যা আর কোনও মিষ্টিই কিনুম না। আমার ওয়াইফতো এখনও এক্কেরে ন্যাতাইয়া আছে দেহি। বিচারি! অবলা জীব!

বলেই, ঋজুদাকে বলল, আপনাগো অবস্থা কেমন। তাই কহেন দেহি।

একই রকম। আর কী হবে! ঋজুদা, বলেই, চুপ করে, সামান্য বিরক্তির সঙ্গে আমার দিকে চেয়েছিল। আমি বললাম, এক যাত্রায় পৃথক ফল তো হয় না।

ভালবেসে কি পান্তুয়াই যে খাওয়ালেন,যোগেন বাবু! যুধিষ্ঠির ঋজু বোসও মিথ্যে কথা বলল, পাণ্ডব বংশকে বাঁচাতে।

আমাদের জিপসি অবধি পায়ে হেঁটে পৌঁছে দিয়ে যোগেন বলল, বাসরে! ঘণ্টায় ঘণ্টায় গাড়ি বদলাইতে আছেন দেহি আপনারা। ব্যাপারটা কী?

আরে ভাড়ার গাড়ি, বোঝো তো। যখন যেমন দেয়। আমাদের কি আর বাছাবাছির উপায় আছে? তবে ড্রাইভার ছাড়া তো। ভাড়াটা একটু কম পড়ে, আর মারুতিতে তেলের খরচ নেই বললেই চলে। এই আর কী!

বড় রাস্তায় পড়তেই ঋজুদা বলল, জোরে চালা। আর, কোনও গাড়ি আমাদের ফলো করছে কি না তা দেখবি মাঝে মাঝেই, রিয়ার-ভিউ মিরারে। ভুলে যাস না। মিরারটা তো তোর দিকেই ঘোরানো।

যাব কোথায়?

চল না। জোরে চল। বলব।

মিনিট সাতেক চালাবার পরই ঋজুদা বলল, সামনে ওই যে, বাঁদিকে প্রকাণ্ড কম্পাউন্ডওয়ালা বাংলোটা–আলো জ্বলছে গেটের দুপাশে। পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে, ওর ভিতরে ঢোকা। গেটে স্লো করিস গাড়ি। সিকিউরিটির খুব কড়াকড়ি, টেররিস্টদের যা দৌরাত্ম।

এটা কার বাড়ি?

ডি.জি. অফ পুলিশ। ডিরেক্টর জেনারেল।

এটি ডি.জি-র বাড়ি। বাড়িতেও পুরোদস্তুর অফিস একটি। পি. বি. এক্স বোর্ড থেকে শুরু করে, সব কিছু। এঁদের চব্বিশ ঘণ্টাই কাজ।

কাম ইন, কাম ইন, বলে দাঁড়িয়ে উঠে আপ্যায়ন করলেন ডি.জি.। দেখলে মনে ‘ হয়, ইংরিজির অ্যাবসেন্ড-মাইন্ডেড প্রফেসর। বুদ্ধিমান, সংস্কৃতিসম্পন্ন। পুলিশ বললে আমাদের মনে যে ছবি ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে কোনওই মিল নেই।

ঋজুদা জিজ্ঞেস করল, উ-মঙ্গ কি আজ মোরে থেকে এসেছে, তম্বি সিং-এর বাড়িতে?

হ্যাঁ, এসেছে। বিকেলের বাসে। ইওর গেস ইর্জ হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট।

তম্বি সিং কি বাড়িতেই আছেন, না কাঙ্গপোকপির দিকে বেরিয়ে পড়েছেন?

আজ বোধহয় বেরোতে পারবেন না। কারণ উ-মঙ্গ-এর বাসই পৌঁছেছে। বিকেলে। আমার মনে হয় আগামীকাল দুপুরের দিকে বেরোবে। আমার লোক। ওদের কনস্ট্যান্টলি ওয়াচ করছে। হয়তো থাঙ্গজম সিং-এর সঙ্গে দেখা করবে। তার কোনও গাড়িও নেবে হয়তো। নয়তো, ভাড়া গাড়ি। এবং ওরা কাঙ্গলোটংবী থেকে হেঁটে যেতে পারবে না রাতের বেলা। মনে হয়, কাঙ্গপোকপি থেকেই। যাবার চেষ্টা করবে। দুজনেরই তো পায়ে আর্থারাইটিস। বয়স তো কম হল না।

বয়স হল বটে, কিন্তু লোভ তো কমল না।

হাসলেন ডি. জি.। বললেন, দেখা যাক কী করে ওরা। ওরা এখান থেকে রওয়ানা হলেই, কাঙ্গপোকপিতে আপনাদের ফোন করে দেব।

ঋজুদা বলল, তম্বি সিং এবং উ-মঙ্গ দুজনের কারোই যেন মৃত্যু না হয় পুলিশের গুলিতে। স্ট্রিক্ট ইনস্ট্রাকশন দিয়ে রাখবেন।

ইয়েস। ইয়েস। দেওয়া আছে। প্লিজ ডোন্ট ওয়ারি। ডি. জি. বললেন, ইবোবা সিং-এর মার্ডারটা সম্বন্ধে আপনার কোনও হাঞ্চ আছে? বোস সাহেব? আপনি যদি বলেন তো ওই কেসটাও আপনাকে…

না না। ওতো আপনারাও ভাল করেই জানেন যে টেররিস্টদের কাজ। কোনও পার্সোনাল লিঙ্কস ছিল না হয়ত। নেহাতই ভুল করে মেরেছে। যুদ্ধ যখন আরম্ভ হয়, তখন গুলিগোলা ছোঁড়ার পেছনে কোনও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থাকে না। পুরো ব্যাপারটা ইমপারসোনাল হয়ে ওঠে। ব্যাড লাক। তা ছাড়া আপনি তো জানেন যে, আমি এখানে এসেছি রুবিটা খুঁজে বের করতে, আর রাজা ইবোহাল সিং-এর খুনের তদন্ত করতে।

আ! বোস সাহেব। ডোন্ট কল হিম আ রাজা। হি ওয়াজ অ্যান ইমপোস্টর রাইট ফ্রম দ্যা বিগিনিং।

বাট হিজ ম্যানারস, অ্যান্ড লাইফস্টাইল ওয়ার ভেরি মাচ লাইক আ রাজা। হি ওয়াজ অ্যান অ্যারিস্টোক্রাটবাই হোয়াটেভার নেম ইউ মে কল হিম।

ঋজুদা ডি. জি-র অফার করা চায়ে এক চুমুক দিয়ে বলল, একটা কথা, এখানের মানে, এই খুন প্রসঙ্গে যাঁরাই জড়িত, তাঁরা প্রত্যেকেই জেনে আশ্চর্য হচ্ছেন হয়তো যে, মণিপুর ও নাগাল্যান্ড এমনকী বার্মার তামু ইত্যাদি জায়গাও এত ভাল করে জানলাম কী করে। এতে বাহাদুরি কিছুই নেই কারণ, নানা সূত্রে উনিশশো ছাপান্ন থেকে সত্তরের দশকের গোড়া অবধি আমি প্রায় বার দশেক এসেছি এখানে। একবার এসেছিলাম মণিপুর বার্মা এবং নাগাল্যান্ড, এই দুই প্রদেশ এবং এক দেশে যার বিচরণ ছিল, এমন এক নরখাদক বাঘ মারতে। অবশ্যই একা আসিনি। সঙ্গে আরও নানাজনে এসেছিলেন। তাদের নামোল্লেখ করছি না। কারণ, করলে, আপনি বোর হবেন প্রথমত, এবং দ্বিতীয়ত ভাবতেও পারেন যে, নেমড্রপিং করছি।

ডি. জি. হেসে বললেন, নেমড্রপিং করেন তাঁরাই, যাঁরা নিজেরা নন-এনটিটি। আপনি কোন দুঃখে নেমড্রপিং করতে যাবেন?

ঋজুদা হেসে বলল, সেই সব সময়েই আলাপ হয়েছিল থেংনোপাল-এর অত্যন্ত অবস্থাপন্ন চাষি রঘুমণি এবং আরও কত অগণ্য মানুষের সঙ্গে। থংগল-বাজার ও পাওনা বাজার এবং খইরামবন্দবাজারের বহু ব্যবসায়ীর সঙ্গে। এই তথ্যটা, আমাকে যে নিয়োগ করেছেন, তিনি আগে জানলে হয়তো, প্রকৃত খুনিকে ধরবার জন্যে, নিজে অপাপবিদ্ধ বলে নিজেকে প্রমাণ করার জন্যে, ওভার কনভিডেন্ট হয়ে আমাকে ডেকে এনে নিজের বিপদ ঘটাতেন না।

আপনাকে আপ্যায়ন করেছেন কে? যদি আপত্তি না থাকে তা জানতে পারি কি, মিস্টার বোস?

প্রথমত, আপত্তি আছে স্বাভাবিক কারণে, তাঁর নাম এখনই জানাতে। দ্বিতীয়ত, আমার কাছে যিনি গেছিলেন প্রকৃত নিয়োগকারীর একজন দূত মাত্র। তিনি আসলে কার হয়ে সে কাজটি করেছিলেন, সে সম্বন্ধে এখনও আমি নিঃসংশয় নই। তবে নিঃসংশয় হব। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আপনার সহযোগিতার খুবই প্রয়োজন হবে, কারণ আমার মনে হওয়া, অর্থাৎ ASSUMPTIONS-কে সত্যে পরিণত করতে পারবে, আপনার বিভাগের অফিসারদের জেরাই! অপরাধী সবসময়েই মিথ্যা বলবে, অপরাধ অস্বীকার করবে, কিন্তু আমার দেওয়া Clueগুলো নিয়ে আপনার অফিসারেরা যদি সিরিয়াসলি, ওঁদের পেশাদারি যোগ্যতা এবং সততা, আই রিপিট স্যার, সততা, যদি সতোর সঙ্গে এগোন, তা হলে আমার কাজ আর বারো ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

তারপরই থেমে বলল, আশা করি, আপনার সঙ্গে আমার আগের মিটিং-এ যে কটি অনুরোধ করেছিলাম, তা ঠিকঠাক পালন করবার জন্যে আপনার অফিসারদের বলে দিয়েছিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে। এবং এমন সিক্রেসির সঙ্গে তা করা হয়েছে যে, ক্রাইম ডিটেকশনের যে সব অফিসারেরা সাধারণত এই সব কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁদের পর্যন্ত জানানো হয়নি। য়ু মে রেস্ট অ্যাসিওরড, মিস্টার বোস। দিনে রাতের চব্বিশ ঘণ্টা…

আরও চব্বিশ ঘণ্টা লাগবে না।…

আমার আই. জি. ক্রাইম কি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না?

না, না, তা রাখছেন। ওঁর নিজের রাখার প্রয়োজন নেই। যাঁদের রাখার, তাঁরা রাখছেন।

তবু, যখনই দরকার হবে আমাকে ফোন করবেন। যদি কোনও কারণে আমাকে পান তবে আমার পি. এ-কে জানাবেন। আপনার কথা তাকে সবই বলা আছে। উনি জানেনও, সঙ্গে সঙ্গে কাজ হবে। আমি না থাকলে আমার ডায়রেক্ট লাইনের কল উনিই ওঠাবেন। দিনে রাতে দুজনে থাকেন। টোয়েন্টিফোর আওয়ার্স। আপনি শুধু বলবেন আর. বি. বলছি–ডি. জি-কে এই মেসেজটা দিয়ে দেবেন।

থ্যাঙ্ক য়ু স্যার।

ঋজুদা বলল।

.

ঋজুদা ঘুম থেকে উঠল, প্রায় আটটাতে। এমনটি কখনওই করে না। গতরাতে যদিও আমাদের পৌঁছতে এমন কিছু দেরি হয়নি, কাঙ্গপোকপিতে।

গতরাতে ইম্ফল আসবার সময়ে আমরা মৈরাঙ্গখম-এ তম্বি সিং-এর সঙ্গে ও দেখা করে এসেছিলাম। সে এক অভিজ্ঞতা।

না বলে-কয়ে যাওয়াতে তম্বি সিং চমকে গেলেন। এই তম্বি সিং সেই শহুরে তম্বি সিং নন। একেবারেই অন্য তম্বি সিং। ঋজুদা তাঁর ভেকটা কলকাতায় প্রথম দর্শনেই ধরে ফেলেছিল যে তা এখন বোঝা গেল।

পরনে এখন ধুতি তাঁর। গায়ে ছিটের একটা বগল-ছেঁড়া শার্ট। হাতে, পাহাড়িদের মতো পাইপ। তামার তার দিয়ে বাঁধা, ঋজুদা যেমন বলেছিল, থুথুতে-তামাকে একাকার। কখনও বোধহয় পাইপটা পরিষ্কারও করেন না তম্বি সিং, পাইপ ক্লিনার দিয়ে। টেবলের ওপরে একটা বোতল। লালরঙা কিছু তার মধ্যে। পানীয়। তম্বি সিং-এর উলটোদিকের চেয়ারে বসে একজন বুড়ো চেকচেক লুঙ্গি-পরা। মাথায় বার্মিজ টুপি। গায়ে লাল-রঙা হাফশার্ট।

ঋজুদাকে দেখেই, দুজনেই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন।

বয়সও হয়েছে দুজনেরই। মনে হচ্ছে, আর্থারাইটিসও আছে।

ঋজুদা ফিসফিস করে বলল।

তম্বি সিং-এর উলটোদিকে-বসা সেই বুড়োকে ঋজুদা বলল, আমার কাজটা কি করেছ? কী উ-মঙ্গ, শরীর ভাল তো?

না কাজটা করিনি। সেই জন্যেই তো মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে এখানে চলে এলাম।

তোমার উপরে ইবোহাল সিং-এর বাড়ির জিম্মা, আর তুমি…।

না। এখানে এলাম, কারণ, কাজ নেই সেখানে। তম্বি সিং-এরও শরীরটা ভাল। আসার আরও একটা কারণ, থাঙ্গজম সিং-এর সঙ্গে দেখা করা। এত বড় শোক! আর জানাশোনা তো আমাদের সঙ্গে কম দিনের নয়! একটা মাত্র ছেলে, এরকম…

ভালই করেছ।

তা, মোরের বাড়ি এখন দেখছে কে?

আমার এক ভাইপোকে রেখে এসেছি। ঝাড়পোঁছ করবে। আর কাউকে যে ঠিক করব পয়সা দিয়ে, উপায় তারও নেই। বাড়ির মালিক যে কে, তাইতো জানি না। আমি টাকাই বা পাব কোথা থেকে?

ঋজুদা কী যেন বলতে গেছিল, বলতে গিয়েই থেমে গেল। উ-মঙ্গ নামক বার্মিজ লোক্টা ঋজুদার দিকে চোখ তুলে চাইল।

তা হলে আমি চলি। তোমরাও বেরোবে। সাড়ে সাতটা তো বাজে।

এই ছেলেটা কে? আপনার ছেলে?

না, না, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। এও গোয়েন্দা।

আর সেদিন যাঁকে এনেছিলেন?

উ-মঙ্গ বলল।

সেও। তারপরে বলল, চলি। তোমরা বেরোবে না?

ইচ্ছে করেই দেরি করে যাব একটু। যাতে ভিড় কমে। এ সব দুর্গন্ধ পানীয় খেয়ে দশজনের সামনে শোকের বাড়িতে যেতে চাই না।

ঠিক।

আমার কেস-এর সলুশানের কী হল? কাঙ্গপোকপিতে যত্ন-আত্তির ত্রুটি হচ্ছে না তো? তম্বি সিং বললেন।

বিন্দুমাত্র না।

হ্যাঁ। পাইপে একটা টান দিয়ে তম্বি সিং বলল, হয়। যত্ন-আত্তি সকলেরই হয়। নিজের বাপের ছাড়া।

বলেই বলল, একটু ভাল তামাক দিন তো মি: বোস আপনার। কী তামাক এটা? ভারী সুগন্ধ ছাড়ছে তো!

হ্যাঁ, কিন্তু আমি যে তামাকটা খাই, সেটা পাইনি বলেই এটা খাচ্ছি। এইটা, যে-মানুষেরা কাছে থাকেন তাঁদের খুশির জন্যে যতটা খাওয়া, তাঁর নিজের জন্য ততটা নয়।

তাই? নাম কী এই তামাকের?

অ্যাম্ফোরা। ডাচ তামাক।

সেটা কোথায়?

ডাচ আবার কোন দেশ?

ডাচ কোনও দেশের নাম নয়?

না না। ডাচ মানে, হল্যান্ডের মানুষ, জিনিস।

ও, আই সি।

বার্মিজ লোকটা কড়া এবং খুব কটুগন্ধের সিগার খাচ্ছিল।

আমার অবাক লাগল, তম্বি সিং-এর পোশাক ও রাজাগিরির এমন হঠাৎ পরিবর্তন সম্বন্ধে ঋজুদা একটিও প্রশ্ন করল না দেখে।

চলি আমরা তা হলে।

ঋজুদা বলল।

আচ্ছা।

এবারও দুজনে একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতে গেল।

ঋজুদা মানা করল।

.

আজ দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর, আমরা সকলে মিলে কোহিমাতে গেছিলাম। নাগাল্যান্ডের রাজধানী। মাও’তে বর্ডার পেরিয়ে। সিকিওরিটির বড় কড়াকড়ি, বর্ডারে। অদ্ভুত অদ্ভুত নাম সব এদিকের জায়গাগুলোর। গভীর জঙ্গল, পাহাড়, উপত্যকা আর শুধুই মিলিটারি, চারদিকে। নাগা টেররিজমও চলছে আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছর হয়ে গেল। এখন মণিপুরে নাগা কুকিদের লড়াই জোরদার হয়েছে। কুকিরাও বাধ্য হয়ে টেররিস্ট হয়েছে।

ভটকাই বলল, কী সব নাম রে বাবা!

মারান, মাও, খুজামা, জুকুমা, কিগওয়েমা, তারপরে কোহিমা।

কোহিমাতে পৌঁছে সিমেটরি দেখতে গেলাম আমরা। কবরখানা। বাচ্চাবাচ্চা সব ইংরেজ, স্কটিশ, ওয়েলস ছেলেদের কবরে, তাদের মা-বাবারা যা লিখে পাঠিয়েছেন এবং লেখা আছে স্মৃতি ফলকে, মাৰ্বল ট্যাবে তা পড়লে, চোখে জল আসে।

ঋজুদা বলল, এইরকম সিমেটরি এবং এর চেয়ে অনেকেই বড় আছে। ইলেও। পারলে, দেখিস।

ভটকাই বলল, তোরা তো দেখলিই না এখনও, ‘মোরে’র পথের দুপাশে কত ট্যাঙ্ক পড়ে আছে দুপক্ষেরই। জাপানিরা তো প্রায় ডিমাপুর অবধি পৌঁছে গেছিল। সেখানেই তো রেইল-হেড। পৌঁছতে পারলে আর কথাই ছিল না। দুপক্ষেরই কত সৈন্য মরেছে তখন, আর মরেছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বার্মা থেকে যারা ওই পথেই মান্দালয় হয়ে, তামু হয়ে, মোরে হয়ে বার্মা ছেড়ে পালিয়ে আসতে চেয়েছিল, প্রাণ নিয়ে। গুলিতে, বোমাতে, মাইনে মরেছে অগণ্য মানুষ। তার চেয়েও বেশি মরেছে পথে, অসুখে, খিদেতে, জলের অভাবে।

সানাহানবি বলল, এইসব কবরখানা দেখে একটা কথাই মনে হয় বারে বারে, যুদ্ধ করে মূর্খরা। সে নিজের ঘরের মধ্যে যুদ্ধই হোক আর সিভিল ওয়ারই তোক অথবা একদেশের সঙ্গে অন্য দেশের যুদ্ধই হোক। এখনও যদি মানুষের শিক্ষা সম্পূর্ণ না হয়ে থাকে, তো আর হবে না কোনওদিনও।

ঠিকই!

ঋজুদা বলল।

ফিরে আসার সময়ে, দারুণ মেঘ করে বৃষ্টি এল। আর সে বৃষ্টির কী শোভা! নাগাল্যান্ডের এলাকা তখনও ছাড়াইনি আমরা, একটা জায়গাতে পৌঁছেই তীব্র সুগন্ধে, যেন চমকে উঠলাম সকলে।

এ কী?

তীব্র চিৎকার করে উঠল ভটকাই। ওর চিৎকারে আমাদের হার্ট ফেল হবার জোগাড় হল।

কীসের গন্ধ?

তিতির শুধোল, সানাহানবিকে। মারুতি জিপসিটা সেই চালাচ্ছিল।

পেছন থেকে ঋজুদা বলল, চাঁপা।

আমি বললাম, কী চাঁপা?

কনকচাঁপা।

কনকচাঁপা? দেখি। দেখি বলে, ভটকাই এমন করে তার ঘাড় সারসের মতো লম্বা করল, যে মনে হল ছিঁড়েই যাবে। তারপর ঘাড় ভিতরে করে বলল, সেই ছেলেবেলাতে পড়েছিলুম বাঁশবনের কাছে, ভঁড়োশেয়ালি নাচে, তার গোঁফজোড়াটি পাকা, তার মাথায় কনকচাঁপা।

তারপরই বলল, আমাদের বাড়ির দুজ্ঞন্দ চাঁপাকে নিয়ে একবার এই চাঁপার গন্ধ শুকিয়ে নিয়ে যেতেই হবে।

দুজ্ঞন্দ চাঁপা মানে?

তিতির বলল।

আমাদের ঠিকে ঝি। ঈসসরে, কী দুষ্মন্দ যে হতে পারে, তা না শুকলে বিশ্বাস করবি না। তার মাথায় দুষ্মন্দ। তার গায়ে দুষ্মন্দ, তার শাড়িতে দুগ্নন্দ…

থাম। থাম। বললাম আমি।

ভটকাই-এর এই দোষ। আরম্ভটা ভালই করে, কিন্তু কোথায় যে থামতে হবে তা জানে না।

তিতির, সানাহানবিকে ইংরিজিতে অনুবাদ করে করে, ভটকাইয়ের রসিকতা বুঝিয়ে দিচ্ছিল। আর সানাহানবি হেসে কুটোপাটি হচ্ছিল।

হাসলে যে সানাহানবিকে কী সুন্দরই দেখায়!

সকলের হাসি থামলে সানাহানবি বলল, আরও মাসখানেক আগে এলে কদমফুলের গন্ধ পেতে। মাইলের পর মাইল কদমের বন আছে, এই সব বনে। পাগল হয়ে যেতে তা হলে। মিস্টার হাচিনসন আমার মাকে ডাকতেন কাডাম্বা’ বলে। কাড়াম্বা’ মানে, স্যাংস্ক্রিট কডম্ব। উচ্চারণ করতে পারতেন না তো ঠিক মতো।

ভটকাই হেসে উঠল। বিড়বিড়িয়ে বলল, গোয়েন্দাগিরিতে ফেল করলাম বটে আমরা তবে কনকচাঁপা আর কদম্বগাছের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে যাব। খালি হাতে যে যাব না তাই বা কম কী!

বিকেল বেলাটা, দুপুরের হেভি-লাঞ্চের পরে আমি আর ভটকাই ঘুমিয়ে কাটালাম। কাজ থাকলে ঋজুদা বলত। তবে ঋজুদা সানাহানবিকে নিয়ে লাঞ্চের পরই ফার্মে গেছিল। ঘুমের মাঝে আমি একবার বাথরুমে গেছিলাম। বিছানাতে ফেরার সময়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখি, অনেক নীচে ঋজুদা আর সানাহানবি সাদা রং করা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে আছে, উপত্যকার কাছে। তাদের গায়ের কাছ দিয়ে বয়ে বয়ে চলেছে একটা পাহাড়ি ঝোরা। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর গাছগাছালি থেকে টুপটাপ জল ঝরছে। ঋজুদাই মনে হল কথা বলছে, সানাহানবি শুনছে। হলুদরঙা প্রজাপতি উড়ছে একঝাঁক।

আমার মন বলল, একটা হেস্তনেস্ত হতে চলেছে। আমাদের আসাটা ব্যর্থ হবে। কারণ, আমি যেন ঋজুদাকে একবার বলতেও শুনলাম তিতিরকে, দুপুরে ভাল করে ঘুমিয়ে নে তিতির, রাত জাগতে হতে পারে। ঘুম থেকে উঠে, আমি আর ভটকাই বারান্দাতে বসে আছি। চায়ের সময় হয়ে গেছে। অথচ নেতা না এলে চা খাওয়ার কথা বলাও যাচ্ছে না। ভটকাই বিড়বিড় করে নিজের মনেই একটার পর একটা কল্পিত খাবারের নাম বলে চলেছে, যা এই বৃষ্টিভেজা পূর্ব-পার্বতী কাঙ্গপোকপির বারান্দায় বসে চা-এর সঙ্গে খাওয়া চলে। ঠিক সেই সময়ে খুব জোরে একটা গাড়ি মোরম বিছানো পথে টায়ারের শব্দ তুলে এসে ঢুকল। আমি আর ভটকাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম। আমার পিস্তলটা বালিশের নীচে রেখে দুপুরে ঘুমিয়ে ছিলাম। দৌড়ে গেলাম সেটাকে আনতে। ফিরেই দেখি, একটি সাদা মারুতি। মারুতি পার্ক করে থৈবী দৈবী নামলেন। একটা সাদা শাড়ি। উস্কোখুস্কো চুল। লাল চোখ।

থৈবী বললেন ইংরেজিতে, সানাহানবি কোথায়? আপনারা কারা?

আমি বললাম, আমরা মিস্টার ঋজু বোসের সঙ্গে এসেছি। মিস্টার বোস আর সানাহানবি ফার্মে গেছেন। আপনি বসুন না ড্রয়িংরুমে। লোকজনদের ডাকব কি?

এমন সময় তিতির তার ঘর থেকে বেরুলো। শাড়ি পরে। একটা হলুদের উপর হালকা সাদা পোলকা ডট-এর মুর্শিদাবাদ সিল্ক-এর শাড়ি। গায়ে সাদা ব্লাউজ। হাত কাটা।

বলল, হাই।

হাই, বলল থৈবী। বলেই বলল, মাই নেম ইজ থৈ..

আমি বললাম, আপনার বিষয়ে, আপনার পরিবারের লোক-এর বিষয়ে আমরা সকলেই জানি। মিস্টার বোস তো খবরটা শোনার পর আপনাদের বাড়িও গেছিলেন।

থৈবী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, উইল সামওয়ান টেল দ্যা কুক টু ব্রিঙ্গ মি আ পটফুল অফ কফি।

তিতির বলল, আমি নিয়ে আসছি। আপনি বসুন। আমার নাম তিতির সেন। আমিও মিস্টার বোসের সঙ্গেই এসেছি।

ও।

আমি বললাম, দেখে মনে হচ্ছে সারারাত আপনার ঘুম হয়নি।

না। হবে কী করে? হওয়ার কথা তো নয়। আমার বউদিটা! এত ভাল মেয়ে। বেচারি।

আর বাবার কথাও তো ভাববার।

ভটকাই বলল, তার বাগবাজারি হিন্দিতে। এত হিন্দি ফিল্ম দেখে, তবুও হিন্দি উচ্চারণটা ঠিক করতে পারল না।

থৈবী দেবী বললেন, না, বাবার কথা আলাদা। বাবা মানুষ নন। মানুষের দুঃখকষ্ট তাঁকে ছোঁয় না।

বলছেন, সুপারম্যান?

তা আমি জানি না। তুষারমানবও হতে পারেন।

ইয়েতি?

ভটকাই বলল।

আমি ওর হাঁটুতে চিমটি কেটে চুপ করতে বললাম। কোন কথার পিঠে কোন কথা বলতে হয় সেটুকুও শিখল না।

থৈবী দেবীর মুখে শেষ-বেলার সিঁদুরে আলো এসে পড়েছিল, সেদিন যেমন পড়েছিল সানাহানবির মুখে। কী বীভৎস দানবীর মতো দেখাচ্ছিল থৈবীকে। যতই বড়লোক হোক, যতই বাড়িতে ছ’খানা গাড়ি থাকুক না কেন, ঐশ্বর্য মানুষকে কিছু দিতে পারে। সব নয়। চেহারা, ব্যবহার, চালচলন, চরিত্র এই সব মিলিয়েই সম্ৰান্ততার সৃষ্টি হয়। শুধু টাকা, শুধু সম্পত্তি, শুধু যশ, যা ন্যায্যমূল্যে পাওয়া হয়নি, তা আর যাই দিক, সম্ভ্রান্ত কোনও মানুষকেই দিতে পারে না। তার জ্বলন্ত উদাহরণ চোখের সামনে এই থৈবী দেবী।

তিতির নিজে ট্রেতে করে কফির কাপ আর বিস্কিট নিয়ে আসছিল। পেছনে পেছনে কুলা সিং।

থৈবী বলল, টাইগারের কবরে কি মাৰ্বল ফলকটা বসে গেছে?

তিতিরই বলল, না, না আপনার জন্যেই তো উনি অপেক্ষা করছেন। তা ছাড়া, শুনলাম মাৰ্বল-ট্যাবটা আসেওনি। যা শুরু হয়েছে সারা মণিপুর জুড়ে।

তা ঠিক। আপনারা বহিরাগত। আপনাদের উচিত, যত তাড়াতাড়ি পারেন এখান থেকে চলে যাওয়া। পারলে, আজই চলে যান ইম্ফল। যাতে প্লেন ধরে কলকাতা পৌঁছতে পারেন।

আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছিল যে, তাইতো যাচ্ছি। কিন্তু ঋজুদার ট্রেনিং, প্রাণ যাবে তো, মুখ দিয়ে কথা বেরোবে না। তিতির আর ভটকাইও যা জানে না, তা থৈবী দেবীকে বলতে যাব কেন? আর উনি তো আমাদের বিদেয় করতে পারলেই বাঁচেন।

ইতিমধ্যে ঋজুদা আর সানাহানবি ফিরে এল। সারা দুপুর দুজনে কী যে এত কথা বলল, কে জানে। কিন্তু সানাহানবির চোখ দুটি তখনও ভিজে ছিল। বোঝাই গেল যে, একটু আগেই কাঁদছিল।

কিন্তু কেন?

কিন্তু কেন? কথা না বলে আমি তিতিরের মুখের দিকে তাকালাম।

কিন্তু কেন? কথা না বলে ভটকাই, আমার মুখের দিকে তাকাল।

কিন্তু কেন? কথা না বলে আমি ঋজুদার মুখের দিকে তাকালাম, কারণ ঋজুদাকে আমিই সবচেয়ে বেশি দিন থেকে জানি।

কিন্তু আমিও এই প্রথমবার, ঋজুদার চোখের ভাষা পড়তে পড়লাম না।

সানাহানবিকে দেখতে পেয়েই থৈবী উঠে দাঁড়াল। সানাহানবি তার ওভারশুটা তারের পাপোষের উপরেই খুলে রেখে, বড় বড় পায়ে এগিয়ে এল থৈবীর দিকে। তারপর দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। একজন কাঁদতে লাগল, গ্রাম্য অশিক্ষিত রমণীর মতো চিৎকার করে, প্রেতিনীর মতো। আর অন্যজন দেবীর মতো; নিরুচ্চারে।

আমি তিতির আর ভটকাই একটু হাঁটতে বেরোলাম।

ভটকাই বলল, জানিস তো, ঋজুদা বলছিল যে, এখানে থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের চলে যেতে হবে।

কেন? গদাধরদার অসুখের জন্যে?

সেজন্যে তো বটেই, তবে শুধু সেই জন্যেই নয়।

তার মানে?

মানে, মণিপুরের অবস্থা প্রতিদিনই খারাপের দিকে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ রীতিমতো অরাজক অবস্থা হয়ে যাবে। মানে, সেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের মতো অবস্থা আর কী। কে দেখবে মান্নার জাত? কে দেয় কার পেছনে হাত।

আঃ। ভটকাই। মেয়েদের সামনে কী ভাবে কথা বলতে হয়, তাও শিখলে না।

তিতির বলল।

তোমরা কখন যে কী ভেক ধরো, তা বোঝা আমার মতো মাথামোটা মানুষের কর্ম নয়। চাকরি পাওয়ার বেলাতে ছেলে। আহা-তে রুদ্রর চেয়ে কোনও অংশে কম ছেলে নও। অথচ আবার ট্রামের সিটের বেলাতে, ঘোরতর মেয়ে। তোমাদের তল পাওয়া ভার।

আমি বললাম, পৃথিবীতে এত ও এতরকম ঝগড়া চলছে তার মধ্যে বাতাসের গলায় দড়ি দিয়ে এমন কাজিয়ার দরকার কী আছে? বন্ধ কর। ওই শোন কতরকম পাখি ডাকছে।

ভটকাই চটেই ছিল। বলল, হু। শোন তোর স্বপ্নের পাখির ডাক। পাখি-ফাখি আর আছে না কি? সব মেরে আর খেয়ে হাপিস করে দিয়েছে।

ভটকাই বলল, কেন জানি না, প্রথম দর্শন থেকেই আমার ওই ডাইনিকেই সন্দেহ হচ্ছে। তোদের হচ্ছে না কারও?

আমাদেরও হচ্ছে নিশ্চয়ই, কাউকে না কাউকে, তবে সেটা তোর মতের সঙ্গে মিলতে নাও পারে।

ভটকাই বলল, তোমার কী গেসস, তিতির?

আমার কেন জানি না…

কী? বলেই ফেল না। নিজেদের মধ্যেও আলোচনা না করলে এসে লাভ কী হল। ঋজুদাকে তো একাই আসতে দেওয়া উচিত ছিল তা হলে।

হয়তো তাই ছিল। আমরা কোন উপকারে আসছি ঋজুকাকার?

আহা, ঝেড়ে কাশো না। তোমার কাকে সন্দেহ হয়?

তোমার লেডি ডাই, সানাহানবিকে।

আর রুদ্র, তোর?

আমার তো কোনও চয়েসই রইল না। এবার তো ঋজুদা তোকে গোয়েন্দা বানাবার জন্যে তোকেই সবচেয়ে বেশি ইম্পট্যান্স দিচ্ছে, তোর সঙ্গে শলাপরমার্শ করছে, তুইই ভাল জানবি।

ন্যাকামি না করে, বলবি? তোর মতো হিঃ আর দুটো নেই।

‘হিঃ’ মানে, হিংসুক আর কী?

তাতো বলবিই। ছিলি বাগবাজারের রকবাজ, ঋজুদার হাতে পায়ে ধরে দলে ভেড়ালাম। এমন করেই তো বন্ধুকৃত্য করবি।

আচ্ছা ইয়ে তো তুই। বলবি কি না বল?

আমার সন্দেহ হয় তোর জালি-তম্বিকে। সেই যেদিন কলকাতায় গেছিলেন, সেইদিন থেকেই।

হুঁ, আচ্ছা এবার মনে মনে ভাব। আমাদের প্রত্যেকেরই এই মনে হওয়ার মধ্যে কোথায় কোথায় ফাঁক থাকতে পারে।

তিতির বলল, ওক্কে!

আমরা বাংলোতে ফিরে গিয়ে দেখলাম সানাহানবি আর থৈবী, থৈবীর ঘরের মধ্যেই ছিল।

এক কাপ করে চা খেয়ে আবার একটু হাঁটতে বেরুলাম। ঋজুদাও সঙ্গে এল।

ঋজুদা বলল, ভটকাই, তুই আমার সঙ্গে থাকবি। তিতির আর রুদ্র ফিরে যাবে বাংলোতে। রুদ্র, তুই তোর পিস্তলটা তিতিরকে দিয়ে দিবি। তিতির, তুই যদি দেখিস যে, সানাহানবি বা থৈবীর কোনও ক্ষতি করতে আসছে কেউ, সে তোর কোনও পরিচিত লোক হলেও, সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাতে দ্বিধা করবি না। আর তোর ঘর থেকে সন্ধের পর থেকেই কবরটার দিকে নজর রাখবি।

সন্ধের পর থেকেই চাঁদ যা জোর হবে। তোর দেখতে কোনও অসুবিধা হবে না।

ভটকাই বলল।

আকাশের অবস্থা দেখেছিস। আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে এবং সে বৃষ্টি চলবে সারারাত।

ঋজুদা বলল।

কী করে বুঝলে?

ভটকাই শুধোল।

এখন বেশি কথা বলার সময় নয়। যা বলছি শুনতে দে ওদের। যদি কবরটা কেউ খুঁড়তে আসে তা হলে নজর রাখবি। কিছু বলবি না। কবরটা খুঁড়ে ওরা গ্রেট-ডেন কুকুরটাকে বের করবে। কী যেন নাম তার?

টাইগার।

ভটকাই বলল।

হ্যাঁ, টাইগার। টাইগারকে খুঁড়ে বের করলে বিচ্ছিরি পচা গন্ধ বেরুবে না?

ভটকাই আবারও বলল।

তা, বেরুবে। কিন্তু তুই চুপ করবি ভটকাই? তবুও তখনও তাদের কিছু বলবি না। যখন তারা কুকুরটার গলা অথবা পেট চিরে ফেলার আয়োজন করবে তখনই তিতির আর রুদ্র, উপরে নয় কিন্তু তাদের খুব কাছে, মাটিতে গুলি করবি। তাদের ওয়ার্নিং দেবারও কোনও দরকার নেই। বাড়ির চাকর-বাকরদেরও কিছু বলার দরকার নেই। আমার ধারণা, যারা আসবে তারা রাত এগারোটার পরে আসবে। পিস্তলটা কে নিবি, ঠিক করে নিস।

কেনেলে অতগুলো কুকুর, তারা কি লম্ফঝম্প করবে না? ডাকবে না? তাতেই তো পালাবে আগন্তুকেরা।

না। আজ রাতে কোনও কুকুরই যাতে না ডাকে, তার বন্দোবস্ত আমি করে রেখেছি। তা নিয়ে কারওই চিন্তা নেই। তোরা এবারে যা, সন্ধে হয়ে এল। তোরা তো ভাল বাবুর্চির খানা খাবি, পেটে কিল দিয়ে জেগে থাকতে হবে ভটকাই-এর।

তোমাদের কথা জিজ্ঞেস করলে কী বলব?

তিতির শুধোল।

বলবি, আমরা বিশেষ কাজে ইম্ফলে গেছি। যা রুদ্র, জিপসিটা নিয়ে আয় বাড়ি থেকে।

মিনিট দশেকের মধ্যেই রুদ্র জিপসি নিয়ে এলে, ঋজুদা উঠে বসে ভটকাইকে উঠে পড়তে বলল।

ভটকাই বলল, রাতে ঠাণ্ডা লাগবে না? সোয়েটারটা নিয়ে আসব?

কিছু আনবে না। খিদে-তৃষ্ণা-গরম-ঠাণ্ডা এ সব থাকলে গোয়েন্দা হবার শিক্ষানবিশি করা যায় না। বুঝেছ!

.

আমি আর তিতির বাংলোয় ফিরে গল্প ফাঁদলাম যে, ঋজুদারা হাইওয়ের উপরের এস. টি. ডি. বুথ থেকে কলকাতাতে গদাধরদার খোঁজ নিতে গেছে। যদি তার জ্বর ভাল না হয়ে গিয়ে থাকে তবে হয়তো সোজা ইম্ফলেই যাবে, কালকের টিকিটের বন্দোবস্ত করতে।

কালকেই!

খুব হতাশ ও আশাভঙ্গতার গলাতে বলল, সানাহানবি।

বলেই, থৈবীকে কী যেন বলতে গিয়ে, থেমে গিয়ে বলল, যদিও বয়সে আমার চেয়ে অনেকই বড় হবেন, কিন্তু মিস্টার ঋজু বোসের প্রেমেই পড়ে গেছি আমি।

তিতির হেসে বলল, নো ওয়ান্ডার। অনেকেই পড়েন।

থৈবী দুঃখের মধ্যেই হেসে উঠল।

সানাহানবি হাসল না। ওর চোয়ালদুটি শক্ত হয়ে এল।

.

ভটকাইকে না-খেয়ে থাকতে হয়নি। জিপসি নিয়ে কাংলোটোংবির সেই ধাবাতে আজকে আন্ডা কারী আর তড়কা-রোটি খেয়েছিল ওরা। তারপর কাংলোটংবী আর কাঙ্গপোকপির মধ্যে, হাচিনসনন’স লজ-এর কাছেই একটা সরু কাঁচা পথের মধ্যে ঢুকিয়ে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে জিপসিটাকে পার্ক করে, ঋজুদা ভটকাইকে সঙ্গে করে এগোল। ঋজুদার ভবিষ্যদ্বাণী আজ ফলেনি। আকাশে এখনও ফুটফুটে জ্যোৎস্না। ঋজুদা বলল, চল, আলো থাকতে থাকতে আমরা নীচে নেমে যাই। তোকে পদে পদে আছাড় খেয়ে নাক-দাঁত ভাঙতে হবে না।

সাবধানে নামতে নামতে ভটকাই বলল, এখন কী হবে, ঋজুদা?

আলো থাকলেও, পিছল কম নয়; পাথুরে মাটিতে।

ঋজুদা বলল শনৈঃ, শনৈঃ।

ভটকাই নিজের কথাগুলো, এই যাত্রায় দুবার গিলল।

যে-বেঞ্চে ঋজুদা আর সানাহানবি বসেছিল বিকেলে, সেই বেঞ্চ অবধি পৌঁছেই, ভটকাই ভীষণ হাঁপাতে লাগল। ধাবার খাওয়া ততক্ষণে হজম হয়ে গেছে।

ঋজুদা বলল, তোকে দেখে মনে হচ্ছে, তুই আমার জ্যাঠামশাই। কম খাবি। শিকারই বল, গোয়েন্দাগিরিই বল, চাই কি ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্যেই বল, কম খাওয়াটা খুবই জরুরি। বিকাম আ বিলিভার ইন কোয়ালিটি, নট ইন কোয়ানটিটি। এই বেঞ্চটাতে ইচ্ছে করলে শুয়ে থাকতে পারিস। তোর সাদা জামাটা খুলে, খালি গায়ে শুয়ে পড়।

এ মাঃ! ভেজা যে!

তা হলে, বসে থাক। কারণ, জামাটা খুলতেই হবে। চাঁদের আলো যদি এমনই থাকে, তবে রুদ্রও তোকে দেখতে পাবে বাংলা থেকে। সাদা রঙের মতো এমন সহজে দৃষ্টিগোচর আর কিছু তো নেই।

কেন? সাদা মন? আমার মতন। সেটাতো কারও চোখে পড়ে না! সাদা জামাটাই শুধু পড়ে।

আমরাও তো তোমাদের দেখছিলাম। দুপুরে।

আমাদের?

হ্যাঁ। তোমাকে আর সানাহানবিকে। তোমরা যখন দুপুরে এই বেঞ্চটাকে বসে, সারা দুপুর গল্প করছিলে।

ঋজুদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, তাই?

ইয়েস।

ভটকাই বলল, আচ্ছা ঋজুদা এখানে টেররিজম চলছে–এত দৌরাত্ম্য টেরটিরস্টদের, কেন?

সেতো অনেক লম্বা কাহিনী রে। নাগাল্যান্ডে তো ছিলই। আমরা যখন স্কুলের ছাত্র, প্রায় তখন থেকেই বলা হত, insurgency। নাগারা আলাদা রাজ্য চেয়ে টেররিজম শুরু করেছিল। এবং তার পেছনে চীনের ও বার্মারও হয়তো মদত ছিল। আজকে যে সারা ভারত জুড়ে এই বিচ্ছিন্নতাবাদ, ভারতবর্ষ যে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার মুখে, তার জন্যে কিন্তু ইংরেজরাই দায়ী। স্বাধীনতা তারা দিয়ে গেছিল বটে এবং সেই দেশকে টুকরো করা স্বাধীনতা নেবার জন্যে নেতাদের আকুলি বিকুলিও কম ছিল না, কিন্তু সেই খণ্ড স্বাধীনতার মধ্যে, তোর পান্তুয়ার মধ্যে লুকিয়ে রাখা ডালকুলাক্স-এরই মতো; খণ্ড-বীজ লুকোনো ছিল। ওরা বলত, ডিভাইড অ্যান্ড রুল।

অবশ্য এখনকার সন্ত্রাসবাদীরা অধুনা ভারতবর্ষকেও একই অপবাদ দেয়। তবে এই এখনকার মারামারিটা নাগা আর কুকিদের মধ্যে। কুকিরা যাযাবর ছিল। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে পাহাড়ে বসতি গড়ত। ওদের কোনও কোনও প্রবক্তারা বলেন যে, চীন হিলস থেকে ১৮৩০-১৮৪০ নাগাদ ওরা মণিপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসে। তবে কুকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পছন্দ করে। নাগাদের মতো বিরাট গ্রাম কুকিদের মধ্যে পাবি না।

এই গোলমালটার বাড়াবাড়ি হয়েছে জুন মাসের গোড়া থেকে, নাগাদের এন. এস. সি. এন. আছে, ন্যাশনালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড, মুইডা ফ্যাকশন। কুকিরা কিন্তু কোনওদিনই এমন দাবি করেনি যে, তাঁদের আলাদা রাজ্য চাই। মণিপুরের মতো। নাগাল্যান্ডেও অনেক কুকি আছে। কুকিদের নাগাল্যান্ডের অন্যতম উপজাতি বলে স্বীকারও করা হয়। নাগা ও কুকিরা অধিকাংশই কিন্তু খ্রিস্টান। যাই হোক, তেসরা জুন ওনথুলেট হাওকিপকে, যিনি একজন কুকি স্কুলমাস্টার ছিলেন, নাগারা বলজাঙ্গ বলে একটা গ্রামে খুন করে, তুলে নিয়ে গিয়ে। নাগারা বলছেন যে, এন. এস. সি. এন. (নাগা সন্ত্রাসবাদীদল) আর কে. এন. এ. (কুকি ন্যাশনালিস্ট আর্মি) কুকিদের সন্ত্রাসবাদী দলের মধ্যে লড়াইয়ে হাওকিপ খুন হন। যাই হোক, এই খুনের পরে কুকি ছাত্ররা মণিপুরের চান্ডেল জেলাতে (যার মধ্যে মোরেও পড়ে) বনধ ডাকে পরদিন এবং তখন থেকেই এই গণ্ডগোল বাড়তে থাকে। প্রতিদিনই এই গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়ছে। মাস দুয়েকের মধ্যে মণিপুরেই প্রায় একশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আহত যে কত হয়েছে, কত মানুষ গৃহহীন হয়েছে; তার ইয়ত্তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা এই গোলমালের পরিবেশে চাষবাসও করতে পারছে না এবং মণিপুর মূলত কৃষি রাজ্য–তোদের বলছিলাম নামণিপুরকে আগে বলত দ্যা গ্রানারি অফ দি ইস্ট–পারছে না বলেই দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়বে বৃষ্টির পরই। যখন ধান কাটবার সময় তখন ধানই থাকবে না ক্ষেতে।

এখন পর্যন্ত নাগাল্যান্ডে গোলমাল ছড়ায়নি। নাগাল্যান্ড শান্তিপূর্ণই আছে। কিন্তু নাগারা এইভাবে কুকি নিধন করতে থাকলে, কুকিরাও তার বদলা নিতে থাকলে, কতদিন পাশাপাশি রাজ্য নাগাল্যান্ড এই তাপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে, তাতে আমার বিশেষ সন্দেহ আছে।

শুনে তো ভটকাইচন্দ্রর চোখের ঘুম চলে গেল। ও বলল, চতুর্দিকেই তো রোড ব্লক। কোথাও যাওয়া আসার উপায়ও তো নেই।

হ্যাঁ। এই সব নানা কারণে এবং গদাধরের অসুখের কারণেও আমি ঠিক করেছি, কাল পরশুই ফিরে যাব।

ভটকাই বলল, আচ্ছা ঋজুদা, আচ্চাও সিং-এর ব্যাপারটা কী বলে মনে হয় তোমার?

আসলে ইবোহাল সিং এবং আচ্চাও সিং নাগা টেররিস্টদের সঙ্গে ছিল। ইবোহালের পরেই যে ওর পালা, তা ও বুঝেছিল বলেই বার্মাতে পালিয়ে গেছিল। পরে বলব ও সব তোদের। এখনও সময় হয়নি। এই মার্ডারগুলো আমার মনে হয় স্মাগলিং-এর কারণে যতটা, ততটাই রাজনৈতিক কারণে।

একটু চুপ করে থেকে ঋজুদা বলল, একটু আগেই ভাবছিলাম উনিশ শো ছাপান্নতে যখন প্রথমবার এখানে এসেছিলাম–মা, বাবা, দাশগুপ্ত কাকা, কাকিমা, সেন জেঠু, জেঠিমা, পিক হোটেলে ছিলাম। শীতকাল, সঙ্গে নেপালদাও ছিলেন। কী সুন্দর, শান্ত, শান্তির ছবির মতোই না ছিল এই শহর। আসলে, বুঝলি ভটকাই, আমরা নিজেরাই কোনও সুন্দর কিছুর যোগ্য নেই। ইঁদুরের মতো নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে করে এখন নিজেদেরই জায়গা নেই থাকবার, খাদ্য নেই খাবার, গাছ নেই ছায়াতে বসবার বা তার কাঠ জ্বেলে রান্না করবার বা আগুন পোহাবার। অথচ তুই পশ্চিমি দেশের অনেক জায়গাতেই দেখবি, বিশেষ করে ইয়ারোপে এক-একটি শহর, এক-একটি গ্রাম, পঞ্চাশ ষাট বছর আগে যেমন ছিল, তা থেকে খুব একটা বেশি বদলায়নি। সব মানুষেরই যে সুবুদ্ধি থাকে তা নয়। কিন্তু সেই সব দেশে আইনের শাসন কায়েম আছে। দুবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা আইন মানতে বাধ্য হয়। তা ছাড়া জনসংখ্যা শুয়োর বা ইঁদুরের মতো না বাড়াতে, মানুষ এখনও মানুষের জীবন যাপন করার সুযোগ পায়। আমাদের এই স্বাধীনতা পাওয়ার চল্লিশ বছর পরে, আমরা পরম নির্লজ্জতার সঙ্গে প্রমাণ করেছি যে, আমরা স্বাধীন আফগানিস্থান বা জায়রে বা উগান্ডার মানুষদের চেয়ে খুব বেশি উঁচুদরের মানুষ নই। দিল্লি শহর, আর কিছু ফ্লাইওভার আর আলো-জ্বলা ব্রিজ, এমনকী অ্যাটম-বোমাও একটা দেশের অগ্রগতির পরিচায়ক নয়। তার পরিচায়ক একজন গড়পড়তা মানুষ। তার শিক্ষা, তার, রুচি, তার চরিত্র, তার মানসিকতা, আমার, তোর, গদাধরের মতো সাধারণ সব মানুষের মানসিকতা। উচ্চাশা।

আমরা তো আর দশ কুড়ি বছরের মধ্যে ফেঁসে গিয়ে বেঁচে যাব। তোদের জন্যে যে কী অভিশাপ, কী দুঃস্বপ্ন আমরা রেখে যাচ্ছি, সে কথা ভাবলে আত্মহত্যা করে মরে যেতে ইচ্ছে হয়।

ভটকাই-এর চোখ জ্বালা করছিল। এতখানি উত্তেজিত বিক্ষুব্ধ ও দুঃখিত হয়েছিল ও, ঋজুদার হৃদয়-মথিত এ সব কথা শুনে, যে হয়তো ভ্যাঁ করে কেঁদেই ফেলত। কোনওক্রমে মুখটা ঘুরিয়ে, সামলে নিল।

তারপর একটু পরে, ঋজুদার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, শান্ত হও ঋজুদা। তোমার কথা আমি বুঝেছি। তোমার কথা আমরা, আমি, রুদ্র, তিতির, আমরা বুঝি, বুঝব। আমরা মানুষের মতো মানুষ হব, ঋজুদা। তুমি দেখো, শুধু মানুষের চেহারার মানুষ নয়, মানুষের মতো মানুষ। যে-মানুষে একটা দেশকে গড়ে তোলে, তুমি দেখো। তোমার আশীর্বাদের অপমান আমরা করব না।

আধঘণ্টার মধ্যেই চাঁদ আবার নেমে গেল এবং এমন মেঘ করল যে পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা ঋজুদাকেও দেখতে পাচ্ছিল না ভটকাই।

ঋজুদা পাইপটা ভরে ভটকাইকে বলল, আমার পেছনে, ডানপাশে দাঁড়িয়ে, আমাকে একটু কভার করত। লাইটারের আলো দেখা যাবে নইলে। পাইপের আগুনটা শুধু ধরাবার সময় দেখা যায়। ধরে গেলে, আগুনটা সোজা উপর থেকে ছাড়া, দেখাই যায় না। পাইপ ধরিয়ে ঋজুদা বলল, তুই ইচ্ছে করলে রিল্যাক্স করতে পারিস। আমি তো আছিই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই এমন ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হল যে, বলার নয়। আর ঘন ঘন বিদ্যুৎচমক একে চারিদিকে ঝড়ের দমকে দমকে দোলা খাওয়া এই সব পর্বতবেষ্টিত বন পাহাড়ে উপত্যকার গভীর অরণ্যানী তার উপর আবার এই ইম্ফল-কোহিমা বার্মা এ সব নামের মধ্যেই এমন সব গুপ্ত উত্তেজনা লুকিয়ে আছে যে, বাজ পড়ার শব্দে ভটকাই কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।

ঘণ্টা খানেক অমনি চলার পরও যখন দুর্যোগ থামার লক্ষণ দেখা গেল না, তখন ঋজুদা বলল, চল, আমরা আস্তে আস্তে বাংলোর দিকে এগোই। এখন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারিস। যা তর্জন-গর্জন চলছে, আধমাইলের মধ্যেও আমাদের কথা কেউ শুনতে পাবে না।

এত তাড়াতাড়ি উপরে যাবে?

হ্যাঁ। এই ওয়েদারের অ্যাডভান্টেজ নিতে পারে, যারা আসবে, তারা। এই আবহাওয়ার আড়ালে আধঘণ্টার মধ্যেই কাজ হাসিল করে চলে যেতে পারলে কোন বোকা সারা রাত অপেক্ষা করে? তা ছাড়া, ওরা তো জানে না, যে কুকুরদের আমি ঘুম পাড়িয়ে রাখার বন্দোবস্ত করেছি। ওদের সবচেয়ে বড় ভয় তো কুকুরেরাই। যারা আসবে তারা তো জানে না, আমি তাদের মতলব আগেই জেনে গেছি। চাইকি, তারা কবরখোঁড়ার কলংকটা আমাদেরই উপরে চাপিয়ে দিতে পারে। কারণ, আমরাই এখানে আগন্তুক।

থৈবী দেবী যখনই এসে পৌঁছল সন্ধের মুখে মুখে তখনই জানি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ভটকাই বলল।

তোর থৈবীর উপরে এত রাগ কেন?

রাগ হবে না? ওর চেহারা দেখলেই তো মনে হয় ও নরকের জীব।

তা হলে তোর মনটা অন্যে সহজে দেখতে পায় না বলে আর দুঃখ করিস। কেন? যা-কিছুই দেখতে সুন্দর, তাই কি সুন্দর?

ভটকাই-এর মনের খটকাটা আরও বেড়ে গেল। ওর এখন পাগল-পাগল লাগছে। প্রত্যেকটা মানুষকেই সন্দেহ হচ্ছে এদের মধ্যে কে যে কে, আর কে যে না, তা ঋজুদা কেন তাড়াতাড়ি বলে দিচ্ছে না তা ওর বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না। পোষা কুকুর। সে মরল। কবর হল। সে কবরে স্মৃতিফলক পড়বে। এই সময়ে সেই কবর খুঁড়তেই বা এল কারা? পুলিশের সন্দেহ হলে, কবর থেকে ডেড বডি এক্সহিউম করে পরীক্ষা চালায় নতুন করে তা ও শুনেছে। কিন্তু কুকুরের ডেডবডি নিয়ে, একী?

ওরা পায়ে পায়ে প্রায় অর্ধেক পথ উঠে গেছে। যখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে তখন কেনেলটাকে দেখা যাচ্ছে, এক সারি নিচু লম্বা ঘর। বাংলোটা–আলোঝলমল নানা শৌখিন গাছগাছালির মধ্যে মধ্যে দারুণ দেখাচ্ছে। কে যেন স্টিরিও চালিয়েছে। কার আবার চিত্তে এত সুখ হল? কী চিৎকাররে বাবা!

কোন পাগলে চিৎকার করে, ঋজুদা?

চুপ কর। মাইকেল জ্যাকসন।

সেডা আবার কেডা? খালি গায়ে, ভিজে ঝোড়ো কাকের মতো, ভটকাই বলল।

আঃ। কথা বলিস না এখন।

সর্বনাশ হয়ে গেল ঋজুদা।

কী হল? সাপে কামড়াল না কি? দেখি দাঁড়া।

না না। টিকিটগুলো। বিভাস চক্রবর্তীর মাধব-মালঞ্চী কইন্যা আর উষা গাঙ্গুলীর হোলি-র। সব গেল। দক্ষিণী’র অরূপরতনের টিকিটও ছিল। সেও। ছ্যাঃ। ছ্যাঃ।

টিকিট কেউ সঙ্গে করে আনে? ইডিয়ট।

আমি তো ইডিয়টই। নইলে অন্যেরা যখন সাইকেল স্যাকসন শোনে সোফায় বসে বসে, চা খেতে খেতে, তখন আমার এমন–হুঁ।

সাইকেল নয়, মাইকেল! স্যাকসন নয়, জ্যাকসন।

ভটকাই-এর এই কথার সঙ্গে সঙ্গে, টক্ করে একটা শব্দ হল উপর থেকে।

ঋজুদা, বাঁ হাত দিয়ে ভটকাই-এর গলা টিপে ধরল।

ভটকাই দু হাতে দু কান ধরে বোঝাল যে, আর কথা নয়। আর একটু, মানে গজ বিশেক উঠে, ঋজুদা একটা বড় ঝোপের আড়ালে একেবারে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ল। নিজের সাধের প্যান্টটার দিকে একবার করুণ চোখে চেয়ে, ভটকাইও শুয়ে পড়ল।

আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাতেই, দেখা গেল, দুজন লোকে মিলে সত্যি সত্যিই কবরটাকে খুঁড়ছে। বৃষ্টিতে মাটি আরও নরম হয়ে গেছে বলে, সুবিধে যেমন হচ্ছে ওদের, তেমন মাটি ভারী হয়ে গেছে বলে মাটি সরাতে কষ্টও হচ্ছে।

ঠোঁটে আঙুল দিয়ে কথা বলতে বারণ করে দিয়ে, ঋজুদা দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে দুই হাতের তেলের মধ্যে মুখটি রেখে সেদিকে চেয়ে রইল। প্রায় আধঘণ্টার চেষ্টাতে তারা মাটি সরিয়ে সম্ভবত কুকুরটার নাগাল পেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই কুকুরটাকে বের না করে, দুজনে একটি ঝোপের আড়ালে এসে, ভটকাইদের দিকে পিছন করে, যাতে বাংলা থেকে দেখা না যায়, দুটো পাথরে বসে, দেশলাই জ্বালাল। দুজনের মধ্যে একটা লোককে ভটকাই-এর চেনা চেনা মনে হল। যে ধাবাতে আজ সন্ধেতে খেয়েছিল, সেই ধাবাতেই লোকটাও ওদের পাশে বসে খাচ্ছিল। কোনও ট্রাকের ড্রাইভার হবে। ভেবেছিল, ভটকাই।

লোকদুটো আরেকবার দেশলাই জ্বালল। একটা বোতল থেকে সাদা জল খাচ্ছিল ওরা। একজন সম্ভবত পাইপ খাচ্ছে। ওই লোকটার কথাই ভাবছিল ভটকাই। অন্যজন বোধহয় সিগারেট খাচ্ছে। টানের সঙ্গে সঙ্গে আগুনটা জোর হচ্ছে আর কম হচ্ছে।

গায়ে একটু জোর করে নিয়ে, ততক্ষণে বৃষ্টিটাও ধরে গেছে; লোকদুটো আরও উঠে গিয়ে, কবর থেকে কুকুরটাকে তুলল। একজন নীচে নেমে গেল কোমর-সমান গর্তে, অন্যজন সম্ভবত কুকুরের পায়ের দিকটা ধরে টেনে হেঁচড়ে তাকে উপরে তুলল। তোলর পরে কুকুরটার শরীরে আধখানা আবার কবরের মধ্যে ঢুকে গেল। আবারও দশ মিনিট কসরত করে তারা তুলল, কুকুরটাকে। তোলার পর কবরের পাশে লম্বা করে শুইয়ে, মাটিতে শোয়ানো ঝোলা থেকে কী যেন বের করল। জিনিসটা কী, তা প্রথমে বুঝতে পারল না ভটকাই। তারপরই একবার বিদ্যুৎ-চমকে বুঝতে পারল যে, একটা দা। সেইটা দিয়ে একজন কুকুরটাকে কাটতে গেল।

ঠিক সেই সময়ে ঋজুদা ভটকাইকে বলল, সিগন্যাল।

ভটকাই-এর পকেটে একটা টিনের কটকটি রাখতে দিয়েছিল, ঋজুদা। আগেই বলে রেখেছিল যে, যখন বলবে, সমানে বাজিয়ে যেতে হবে। উঠে পড়ে পকেট থেকে কটকটি বের করে, কটকটি ব্যাঙ হয়ে গেল ও। এবং ঋজুদার সঙ্গে উপরে উঠে ওই দিকে এগোতে লাগল।

.

কটকটির আওয়াজ এই বৃষ্টিভেজা নিঝুম পরিবেশে কতদূরে যে ছড়িয়ে গেল, তা বলার নয়। এবং ওই শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বাংলো থেকে সুতীব্র সার্চ লাইট একের পর এক জ্বলে উঠে, সমস্ত জায়গাটাকে আলোকিত করে দিল। প্রতি ঘরে ঘরেও আলো জ্বলে উঠল। বাড়ির সমস্ত কাজের লোকজনও যে যা পেয়েছে হাতের কাছে, লাঠি, দা, বল্লম নিয়ে, বেরিয়ে এল।

আমি আর তিতির দেখলাম যে হতভম্ব হয়ে গিয়ে একজন লোক ঝোলা থেকে কী একটা বের করতেই ঋজুদা গুলি করল, তার গোড়ালি থেকে এক হাত পেছনে। আমিও গুলি করলাম, ওদের কাছেই। এবং এদিক থেকে আমি পিস্তল ও টর্চ হাতে নিয়ে এবং ওদিক থেকে ঋজুদা আর পেছনে পেছনে খালি গায়ে নাদুবাগানো, ফরসা, ভটকাই বাবু এগিয়ে আসতে লাগল।

ঋজুদা গলা তুলে বলল, ওটা হাত থেকে ফেলে দিন মিস্টার তম্বি সিং।

তম্বি সিং?

চমকে গেল, ভটকাই।

তম্বি সিং তার চেয়েও বেশি চমকে গিয়ে, পেছনে ফিরে তাকাল, ঋজুদার পিস্তলটার দিকে।

ততক্ষণে ভটকাইরা ওদের কাছে পৌঁছে গেছে। আমিও কাছে চলে এসেছি।

ঋজুদা বলল, পিস্তলটা ফেলে দিন মিস্টার সিং। প্লিজ।

হঃ হাঃ হঃ হঃ করে, অদ্ভুত এক অট্টহাসি হেসে উঠলেন মিস্টার তম্বি সিং। বললেন, মিস্টার বোস। য়ু হ্যাভ ডান আ ফাইন জব। বাট য়ু উইল নট গেট মি।

বলেই, গাছের গোড়ায় যে বোতলটা রাখা ছিল, সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *