কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বললেন, বোস সাহেব, আপনার ডায়ালগটা যাত্রার ডায়ালগের মতো শোনাচ্ছে। আপনিও তো মুরুব্বি হতে পারেন। আপনিই বা আমার চেয়ে কম রিসোর্সফুল কীসে? আপনার মনও নরম। আপনি ন্যায়নিষ্ঠও। আপনি নন কেন?

ঋজু বোস বললেন, এই সব মহৎ ব্যাপার শুধুমাত্র ঘরের মধ্যেই আলোচনার এবং চায়ের কাপের তলানিরই মতো আলোচনা শেষে দূরে ছুঁড়ে ফেলার। এ নিয়ে লড়তে গেলে তো ডন কীয়টে (Quixot) হতে হবে। সাড়ে পাঁচ হাজার কোটির স্ক্যামের কিনারা হল না, হবেও না হয়তো, প্রধানমন্ত্রী ঘুষ নিয়েছেন কি নেননি, তাও প্রাঞ্জল হল না আর এক কোটি টাকা দামের একটা রুবি কোথায় গেল বা ক’জন নগণ্য সাধারণ নিরপরাধ লোক জেলে পচে মরল, এসব কথা স্বাধীন ভারতে কোনও দায়িত্বশীল নাগরিকের ভাবনার আদৌ নয়।

থাঙ্গজম সিং বললেন, হঃ। দিলেন সন্ধেটাই মাটি করে। এখন একটু হুইস্কি খাব। সময় হয়েছে অনেকক্ষণ। খাবেন নাকি একটু, আমার সঙ্গে? খুব ভাল ব্রান্ড দিয়েছে একজন। ব্লু-লেবেল।

ব্লু-লেবেল? বাবাঃ! লানডান এর হিথ্রো এয়ারপোর্টেই তো তার দাম শুনে অজ্ঞান হবার জোগাড় হয়েছিল আমার।

এটা ইম্ফল। কী চান আপনি? বাঘের দুধ চান তো তাও খাওয়াব। কেন আপনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে এসেছেন জানি না। আপনার ফিস দিচ্ছে কে? তম্বি সিং? সে তো নিজে খেতে পায় না। এ রহস্য সমাধানের নয়। আমি আজ রাতেই সেন সাহেবকে ফোন করছি। যাতে এই ওয়াইল্ড-গুজ-চেজ থেকে আপনাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন, তিনি। আপনার ফিস আসলে কে জোগাচ্ছে সেটাও নতুন রহস্য। এবং কী উদ্দেশ্যে জোগাচ্ছে সেটাও গভীরতর রহস্য।

ঋজু বোস হঠাৎ বললেন, চলি। অনেক উপকার হল আপনার এখানে এসে। কেসটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

এখন কি বুঝলেন কিছু? হঃ। হঃ।

বুঝিনি। আপনি বুঝতে সাহায্য তো করলেন কিছুটা। এই বা কম কী?

আবার আসবেন। ফোন করবেন। এখন মণিপুরের যা অবস্থা কেউই বাড়ি না-ফেরা অবধি নিশ্চিন্তি নেই। কোথায় কখন থাকেন জানিয়ে রাখবেন আপনার হ্যোয়ারাবাউটস। যখনই গাড়ির দরকার হবে, জানাবেন।

কার-রেন্টাল কোম্পানির নামটা?

ঋজু বোস শুধোলেন।

আরে ইম্ফল কি বম্বে কলকাতা নাকি? শোফার-ড্রিভন গাড়িই বা ক’গণ্ডা আছে? পয়সা কি বেশি হয়েছে আপনার? গাড়ির জন্যে আমাকেই ফোন করবেন। আর যদি বিবেকে কামড়ায়, তাহলে না হয় তেলটা নিজেই ভরে নেবেন। গাড়ি আমি পাঠিয়ে দেব, ড্রাইভার সুষ্ঠু। সেন সাহেব জানলে কী বলবেন?

ড্রাইভারের দরকার নেই আমার।

আরে স্যার, এত জানেন আর এটুকু জানেন না? আজকাল টেররিস্টদের খুবই ঝামেলা চলছে। কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়বেন। তা ছাড়া, আমার সবকটা গাড়িই এক-হাতে রাখি। মানে, এক-একজন ড্রাইভার একেকটা গাড়ি চালায় পাঁচ হাত হলে গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। আপনি না জানলে, কে জানবে। আমার কোনওই অসুবিধা হবে না-যতক্ষণ খুশি, যতদিন খুশি রাখবেন গাড়ি। আমার কাছে আপনি হলেন, ভি. ভি. আই. পি। বুঝলেন কিনা স্যার!

থ্যাঙ্ক য়ু, সিং সাহেব।

বলেই উঠলেন ঋজু বোস।

চলুন, আমি যাই গেট অবধি।

আরে আপনি বসুন। মৌজের সময় আপনার।

কোথায় গেলে যমুনা?

থাঙ্গজম সাহেব বললেন।

হ্যাঁ হ্যাঁ। যমুনাই পৌঁছে দেবে। আপনি ব্লু-লেবেল খুলুন।

যা বলেন। তাস খেলি না, জুয়া খেলি না, পুজো-আচ্চা করি আর একটু সন্ধেবেলা…। এবারে ইলেকশানে দাঁড়াব। বোঝেন তো, একটু ইমেজের কথাও ভাবতে হয়–সব জায়গায় গিয়ে তো সব কিছু সম্ভব নয়।

ঋজু বোস বললেন, তাতো বটেই! এখন ইমেজই তো সব। ইমেজ নিয়ে সকলেই মাথা ঘামায়, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়াতে চায় না কেউই। এটাই দুঃখের।

যমুনা গেট অবধি পৌঁছে দিল। মেয়েটি অত্যন্ত সপ্রতিভ কিন্তু মুখ দেখে মনে হল যেন ভীষণই অসুখী। কোনও আনন্দই নেই।

তোমার স্বামী কোথায় যমুনা? কী যেন নাম? ভুলে গেছি।

ও কাজে গেছে।

ফেরেনি এখনও?

না। এই তো বেরুল। বোধহয় কালকে ফিরবে। কালও নাও ফিরতে পারে।

সে কী! এ কেমন কাজ? যায় কোথায়? তোমাকেও বলে না?

সে কথার উত্তর না দিয়ে যমুনা বলল, কোথায় যায় বলে তো যায় না। যা দিনকাল।

হুমম। বললেন ঋজু বোস।

আমি অনেকবার এসেছি ইম্ফলে। তবে তোমার শ্বশুরের সঙ্গে অবশ্য বেশিদিনের আলাপ নয়। ন-দশ বছরের।

তাই? যমুনা বলল।

মনে মনে ভাবলেন, এই কবে ফিরবে তা পর্যন্ত বলে না-যাওয়া আশ্চর্যের বই কী! কী রকম কাজ? আর এই রকম পরিস্থিতিতে।

তোমার শ্বশুরমশাই-এর কাছে যে ভদ্রলোককে দেখলাম, তিনি কোথায় গেলেন মিস্টার হাঞ্জো না কী যেন নাম?

সেও আমার স্বামীর সঙ্গে গেছে। ও আমার শ্বশুরমশায়ের বডিগার্ড। আজকে ওর সঙ্গে কেন গেল কে জানে!

চিন্তা কোরো না। চলি যমুনা। ভাল থেকো।

ঋজু বোস বললেন।

কেন জানেন না, ঋজু বোসের মনটা এই মেয়েটির জন্যে ভারী হয়ে উঠল। এত বৈভব, এত বড় বাড়ি, এত গাড়ি, কিন্তু মনে সুখ বা শান্তি কিছুই নেই।

গেট দিয়ে বাইরে বেরুবার পূর্বমুহূর্তে একবার, অভ্যেসবশে পেছনে চাইলেন। দেখলেন, ছাদের আলসের পাশ থেকে একটি ছায়ামূর্তি হঠাৎ সরে গেল।

থাঙ্গজম সিং? ঋজু বোসকে নজর করছিল? কিন্তু কেন? কে জানে?

ঋজু বোস বাইরে বেরিয়ে ভাবলেন, একটু হেঁটে গিয়ে মোড় থেকে সাইকেল রিকশা ধরে থংগল বাজারে গিয়ে কমলা টাঁইওয়ালার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। দেখা যাক, ও কী বলে। তা ছাড়া, বিপদে-আপদে ওর সাহায্যও নিতে হতে পারে। থাঙ্গজম সিং এর হাবভাব বোলচালে একটা মাতব্বরি আছে। মাতব্বরি, ঋজু বোস একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। সে মাতব্বরি যেই করুক না কেন!

সাইকেল রিকশাতে উঠতে যাবেন, এমন সময়ে দেখলেন টাটা-সিয়েরা গাড়িটা, যে গাড়িতে ওঁরা সকালে এয়ারপোর্ট থেকে দ্য রিট্রিট পৌঁছেছিলেন, আসছে থাঙ্গজম সিং-এর বাড়ির দিকেই। সামনের সিটেই ড্রাইভারের পাশে বসে আছেন তম্বি সিং। আর সেই বাঙালি যোগেন ড্রাইভারই গাড়ি চালাচ্ছে।

তার মানে, রুদ্ররা, বাংলোয় ফিরে গেছে। এবং গাড়িটা থাঙ্গজম সিং-এর।

ওরা দেখতে পাননি ঋজুকে।

গাড়িটা পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই ঋজু রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন, হিন্দিতে, ভারী চমৎকার গাড়ি! কার গাড়ি হে?

আবার কার? থাঙ্গজম সিং লংজুর। এ-গলিতে যে সব গাড়ি ঢোকে সবই তো তারই।

যে গরিব সে বড়লোককে গালাগালি করে যে সুখ পায়, তার সেই সুখের কোনও তুলনা নেই। সেই সুখ দিয়ে দুবেলা মাখোমাখো করে ভাতও খাওয়া যায়। তবে সেই গালাগালি যে সবসময়ই অমূলক, এমনও নয়।

কী করেন ভদ্রলোক? মানে, যার গাড়ি।

কী না করেন তাই বলুন! আর ওকে ভদ্রলোকে বলবেন না বাবু।

কেন? তোমাদের এত রাগ কেন? ওঁর ওপরে?

রাগ হবে না? থাঙ্গজম সিং তো রিকশাই চালাত আমাদেরই মতো ক’ বছর আগে। এখন রিকশা দেখলে তার উপরেই গাড়ি চড়িয়ে দেয়। যে মানুষ নিজের অতীত এত সহজে ভুলে যায়, তাকে কি গোবিন্দজি কখনও ক্ষমা করতে পারেন?

গরিব অবস্থা থেকে যদি ভদ্রলোক বড়লোক হয়ে থাকেন নিজের চেষ্টাতে, মেহনতে; এতে তো তোমাদের গর্বই হওয়া উচিত। তুমিও একদিন এমন বড়লোক হতে পার।

আমার দরকার নেই। ফুঃ। খাটনি! মেহনত! তা হলে আর এত কথা বলব কেন। স্মাগলিং-এর পয়সা।

আন্দাজে কি এমন অনুযোগ করা ভাল?

আন্দাজে? আপনি বেড়াতে এসেছেন না কাজে? কী জানেন স্যার আপনি? এতে কী না করতে হয়? এত টাকা এত ক্ষমতা তাও কি শান্তি আছে? শুনছি এবার ভোটে দাঁড়াবে। সারা ভারতেই এমন নেতাই তো এখন বেশি। নইলে দেশের অবস্থা কি এমন হত বাবু?

তা যা বলেছ ভাই। এবার একটু জোরে চলো। থংগল-বাজারে যাব। হাতে সময় কম।

থংগল বাজারে পৌঁছে রিকশাওয়ালাকে দশটাকার নোট দিল একটা ঋজু।

লম্বা সেলাম দিল রিকশাওয়ালা। বলল, গোবিন্দজি আপনার ভাল করবেন। গরিবের কষ্ট বোঝেন আপনি।

নীচে কিরানার দোকান, উপরে বাড়ি। কমলা টাঁইওয়ালা দোকানে ছিল না। তার বড় ছেলে ছিল, পবন। আদর করে বসাল। বলল, কী খাবেন? ঠাণ্ডা না গরম? এলেন কবে? কাজে না বেড়াতে? একটু খবর তো দেবেন আগে।

বাবা কোথায়?

বাবা তো গেছেন ডিমাপুরে। কোহিমাতেও কাজ আছে একটু। ফিরতে ফিরতে রবিবার।

একটু কাজেই এসেছি পবন। মোরেতে যে ইবোহাল সিং খুন হল, সে সম্বন্ধে বাজারে লোকে কী বলছে?

ও, আপনি ভার নিয়েছেন? কিন্তু আনল কে আপনাকে?

তম্বি সিং!

এও তো এক নতুন রহস্য। আগে এ রহস্যই সমাধান করুন।

করব। তার আগে বলো, বাজারে…

বাজারের লোকের কথা শুনলে তো পাগল হয়ে যাবেন। কতরকম কথাই যে শুনছি। এমন মুখরোচক আলোচনা। যার যা খুশি বলছে। তবে, আমার অনেক সাপ্লায়ার আছে মোরের। কিছু লটর-পটর কামতো আমাদেরও করতে হয়। তবে আমরা খুন-খারাপির মধ্যে নেই স্যার। আমরা যেখানে দুটো পয়সা কামিয়ে নিতে পারি কামাই। আর সব শালাই যখন কামাচ্ছে তখন না কামানোটাই তো বোকামি। বার্মা থেকে বার্মীদের লাথি খেয়ে প্রায় এক কাপড়ে, এখানে একদিন আস্তানা গেড়েছিল দাদু। এখন যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি–এখান থেকেও লাথি খেয়ে কবে উদ্বাস্তু হতে হবে, কে বলতে পারে? আসাম থেকে চলে যেতে হয় নি কি, আমাদের কত রিস্তেদারের? সেদিক দিয়ে স্যার পশ্চিমবাংগাল, জ্যোতিবাবুর রাজ্য হচ্ছে বেস্ট। ওতো ছোট রাজস্থান। আপনাদের মতো এমন চুপচাপ, সহ্যশক্তি-ওয়ালা, নন-ইন্টারফেয়ারিং জাত আর ইন্ডিয়াতে নেই। খালি কাজকর্ম করেন না, এই দোষ আপনাদের। আপনি একসেপশান অবশ্য। বেওসাদারের স্বর্গ হচ্ছে পশ্চিমবাংগাল। পিতাজি তো সাচমুচ শোচতে আছেন কলকাতাই চলিয়ে যাবেন। এখানের সব পাট উঠিয়ে। টাকা পয়সাও সব হুন্ডি করিয়ে ওলরেডি পাঠিয়েই দিয়েছেন–যেটুকু ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল না থাকলেই নয়, সেটুকুই রেখে। অবস্থা দিনকে দিন যা হচ্ছে–যা ওরাজকতা–তাতে এখানে সোব গরবর-সরবর হয়ে যাবে মনে হয়।

পবনের সলিলকি শেষ হলে ঋজু বোস বললেন, ইবোহাল সিং-এর খুন সম্বন্ধে বাজারে কী শুনছ এবারে বলল।

আস্তে স্যার। আস্তে বলুন। দিনকাল খুবই খারাপ। কেউ জানতে পারলে আপনার জানকা খতরা হয়ে যাবে। স্মাগলিং এতো বেড়ে গেছে আজকাল যে বলার নয়। সবরকম আর্মস ও অমনিশানভি আসছে। জান বাঁচানো মুশকিল।

ঋজু বোস ভাবছিলেন, পবন নিজের গলার স্বর শুনতে খুব ভালবাসে। অবশ্য অধিকাংশ মানুষই তাই বাসেন।

বললেন, তাই?

না তো কী বলতেছি। চুপচাপ থাকবেন। আগের জমানা নেই স্যার।

লোকে কী বলছে বাজারে, তা বলবে না?

শুনতেছি, যে একটা রুবি নিয়েই আসল মামলা। মার্ডার কেন হল সে তা নিয়ে ভি নানা কোথা শুনতেছি–কে করাল তা নিয়ে ভি, কে করল একচুয়ালে সেও ভি, কিন্তু কোনটা সাচ কোনটা ঝুট, তা জানব কী কোরে বোলেন? ওই রুবিটা যদি বর্ডার পেরিয়ে চলে গিয়ে না থাকে তবে ওটা যার কাছে পাওয়া যাবে, সেই ফাঁসবে। সেই আসল কালপ্রিট। লোকটা দারু পিতাথা বহুতই–মগর জিন্দগিমে কভি কিসিসে উঁচু জবান সে বাত নেহি কিয়ে থে–এহি থা বিউটি।

একটু থেমে বলল, যেদিন মার্ডার হল, সেদিনের এক দুদিন আগে থাঙ্গজম সিং-এর লেড়কি আর তম্বি সিং-এর লেড়কি সানাহানবি হায়! হায়! কেয়া খাবসুরতি হ্যায় ওহি লেড়কি! দোনো মিলকে ইবোহাল সিংকো পাস গয়িথী।

মোরেতে? কেন?

ম্যায় কৈসে জানু স্যার?

সানাহানবি তো যাতিহি থী, মাহিনামে এক দো দফে। উনকি হিস্ট্রি জিওগ্রাফি আপকি মালুম না হ্যায়? মগর হাঁ, লেড়কি হোতি তো অ্যায়সাই। বি আর চোপড়া কি অফারভি ফেক দি থি উনোনে। আমির খান কি এগেনস্ট মে লিড রোল মিলে থি। তব ভি। আহা, পুরি মণিপুরকি প্রাইড হ্যায় উ লেড়কি! প্রাইড! যাঁহা ভি যাতি হ্যায়, ভিড় জম যাতি হ্যায়।

ঔর থাঙ্গজম সিং কি লেড়কি?

উনকি বাঁতে ছোড়িয়ে। য্যাইসা বাপ গন্ধা, ওইসি লেড়কি ভি গন্ধী। পাইসাকে লিয়ে উতো আপনি বাপকো ভি খা যায়েগা। সিয়ারাম! সিয়ারাম!

মুসলমানেরা তওবা! তওবা! বলে যে ভাবে দুকানে দু হাতের থাবা ঠেকায়, তেমন ভাবে বলল, পবন।

তম্বি সিং লোকটা কেমন?

ইডিয়ট হ্যায় শালা! সিধসাধা বিলকুল। মগর ইডিয়ট। ইবোহাল সিংকা চামচা থা। পিনেমে জবরদস্ত, কামমে ফসসস্ হামারা তো লাগতা উও বেচারা ভি মার্ডার হো যায়েগা। মার্ডার কি বারেমে উও আদমি কুছ জরুর জানতা তোগা। অ্যায়সা তো হ্যায় আদমি, ভেলেভালা। সাচমুচ। পাগলভি হ্যায়, লাগতা থোরা। মগর, আদমি জাদা লালচি নেহি হ্যায়। খানা-পিনা ঔর বট মিল জানেসেই খুশ।

তম্বি সিং তো ড্রিঙ্ক করে না।

ঋজু বোস বললেন।

তম্বি সিং? বলেই, জোরে হেসে উঠল, পবন টাঁইওয়ালা।

তারপর বলল, আপ বোস সাহাব অজীব বাঁতে করতে হ্যায়। এখানের মানুষের খবর আমার কাছ থেকেই শুনুন। ও ব্যাটাকে মনে হয় কেউ ফাঁসিয়েছে এই মামলাতে, ওর ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজের ফায়দা উঠিয়েছে। এখন জান দিয়ে দাম না দিতে হয় বেচারাকে।

ওই রুবিটার দাম কত হবে?

উও চিজ কোই দিখা হ্যায় থোরি!

এই বাজারের কোন জুহুরি নাকি দেখেছিল?

জি হাঁ। মগর ও বুড়ুয়া কব গুজর গ্যয়ে। মগর, শুনা তো থা কুছ কড়োয়রা রুপিয়া হোগা। আপ মার্ডারার কা পিছা নেহি করকে রুবিকো পিছে যাইয়ে। আপকি কাম শর্টকার্ট হো যায়গা। মগর, বহত সামালকে রহিয়েগা। টেররিজমকি ওজেসে ইতনা আর্মস-অ্যামুনিশান সব আদমিকো হাঁথোমে আ পঁহুছা, চারোতরফ বহল গ্যায়া, আপনা আপনা জান বঁচাকে চলনাহি মুশকিল কা কাম হো গয়া। হামলোগনেত স্যার, দুকান সাত বাজি বন্ধ কর দেকে; খা-পি কে শো যায় গা। ফিন সুবে সাত বাজি খুলেগা। না মর্নিং-ওয়াক–না কুছ। তবিয়তই গড়বড়া গিয়া স্যার। তো আভূভি বলিয়ে, ঠাহরে হুয়ে কাঁহা আপ?

দ্যা রিট্রিটি মে, কোহিমার পথে। ইবোহালের বাংলোয়। আমার একটা ভাল ট্যাক্সি লাগবে পবন। ডেইলি-বেসিসে। ভাল কন্ডিশনের, ভাল-গাড়ি। ড্রাইভার না হলেও চলবে।

কোনও লারাতে ফেঁসে যাবে না তো স্যার?

আমি তো লফরাবাজিতে নেই পবন। তোমরা তা ভাল করেই জান।

তবে নিয়ে যান, আমার সাডুভাই-এর গাড়ি। সে আমেরিকা গেছে, হাওয়াইয়ান আইল্যান্ডে পাইন-অ্যাপল ক্যানিং-এর কোলাবরেশানের ধান্দায়। ওখানে ডোল মান্ডি বলে এক সাহেবের বিরাট ফার্ম আছে। সবকিছু মেশিনে হয়, যদি…সেই ধান্দায়। এখানের আনারসও তো কিছু কম নয়। তার নতুন মারুতি ডেলিভারি পেয়েছি, মাত্র কাল। এখনও গারাজ নাম্বার লাগানো। রেজিষ্ট্রি যদিও হয়ে গেছে, নাম্বার প্লেট করা হয়নি। নীল মারুতি-ভ্যান। তেলও ভরা আছে ফুলট্যাঙ্ক। যতদিন খুশি ব্যবহার করুন। ড্রাইভার দিতে পারতাম। কিন্তু ভাল ড্রাইভার নেই। নতুন গাড়ি, খারাপ করে দেবে। আমাদের ভি কুছ কাম আছে কলকাতাতে, সেন সাহেবের কাছে। গৌহাটির ইনকামট্যাক্সের কমিশনার সাহেবের কাছে টু সিক্সটি ফোরের পিটিশান পড়ে আছে একটা। সেন সাহেব ছাড়া আর কাউকে দিয়ে হোবে না। ফাইলিং করতে ভি লেট হয়ে গেছে অনেকদিন। ডিলে কোনডোনেশানের বেপার ভি আছে।

ইনকামট্যাক্সের আমি কিছু বুঝি না। ওসব তুমি একটি চিঠিতে লিখে দিয়ে দিও। আমি নিজে পৌঁছে দেব। নয়তো, ফোনে কথা বলে নিও। অনীকের সঙ্গে।

ঋজু বোস বলল, এবারে লক্ষ্মী ছেলে, তুমি আমাকে মণিপুরের চিফ সেক্রেটারি আর আই, জি, সাহেবের বাড়ি আর অফিসের ফোন নাম্বারটা লিখে দাও তো। আমার কাছে টেলিফোন ডিরেক্টরি নেই।

আমার কাছে স্পেয়ার আছে এক কপি। আজই তো নতুন ডিরেক্টরি এল। আনতেই গেছিলাম, তো, দুটোই লিয়ে এলম। একটা গদিতে থাকবে। আর একটা বাড়িতে। আপনি নিয়ে যান। কাম হয়ে গেলে, যাওয়ার আগে দিলেই হবে।

তো তোমার গাড়ি কই? তোমার বাবা কিছু বলবেন না তো?

কী যে বলেন স্যার। আমরা বানিয়া হচ্ছি। আপনার জন্যে যাই করি না কেন। সব পরে পুষিয়ে লিব। কামকা আদমিকো খাতিরদারি করনা বাপদাদানে বচপনসে শিখলায়। আপনার জন্যে না করলে আমার নোকরি খেয়ে লিবে পিতাজি আর বুড়ুয়া ভি।

অব চোলেন স্যার।

মারুতি ভ্যানটা ওদের দোকানের গদির পেছনে যে ফাঁকা জায়গা আছে যেখানে চাল ডাল চিনি খোল-ভূষি-মশলার বস্তা ডাঁই করা থাকে; ওরা তো হোলসেলার; সেখানেই পার্ক করা ছিল। চাবিটা দিয়ে দিল পবন। বলল, আইয়ে স্যার। মেরা সাডুভাইকি খুশনসিবি যো আপহিকি হাতোসে গাড়ি বউনি হো রহি হ্যায়।

গাড়িতে স্টার্ট দিলেন, ঋজু বোস।

পবন বলল, নমস্তে স্যার। ঠাণ্ডা-গরম কুছ ভি নেহি লেকে আপ চল্ দেতে হেঁ, উসকি লিয়ে ভি হামকো ডাঁটেগা পিতাজি।

ঋজু বোস আস্তে গাড়ি চালিয়ে, বেরিয়ে এলেন ওদের কম্পাউন্ড থেকে। ভাবছিলেন, এই মারোয়াড়ি জাতটাকে যাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁর নিজের মতন, তাঁরা ভাল করে জানেন, জাতটার এই রকেটের মতন উত্থানের রহস্য। গুণ, কিছু কম নেই এই জাতের। সেই সব গুণের কিছু অন্তত বাঙালিরা শিখতে পারলে, আমাদের অনেকটাই উন্নতি হত। ব্যবসাতেও ব্যবহার, সময়ানুবর্তিতা, কথার দাম, এবং অবিশ্বাস্যরকম পরিশ্রম করার ক্ষমতার গুণেই ওঁরা এত উন্নতি করেছেন। আমরা বাঙালিরা এঁদের গুণগুলোর কথা একবারও বিবেচনা না করে দোষগুলো নিয়েই চর্চা করে আজকে নিজেদের ভিখিরি বানিয়েছি। এ লজ্জা আমাদের রাখার জায়গা নেই; লজ্জাবোধ বলে যদি আমাদের কিছুমাত্রও এখনও থেকে থাকে।

পেছন থেকে হঠাৎ পবন ডাকল, বোস সাব। বোস সাব।

তাড়াতাড়ি ব্রেকে পা দিয়ে গাড়ি দাঁড় করাতেই পবন পেছন থেকে দৌড়ে এসে বলল, আপনাকে এখানে কমিশান করে কোন পার্টি এনেছে? মানে, আপনার ফিস দেবে, কোন পার্টি?

তম্বি সিং। বললামই তো!

তম্বি সিং! সইত্যানাশ হো গ্যায়া। আভি তো হামকোভি ডিটেকটিভ বননা হ্যায়। আপকি ফিসতো গ্যায়াই, জানভি যানে শকতা হ্যায়। হামলোঁগোকা নেহিতো দুসরা কিসিকো আপ জারা পুছনে শকতা থা, হিয়া আনেকা পহিলে। যো আদমি আপকো জান-পুছকর লেতে আয়ে হুয়ে হ্যায়, উসকো জরুর কুছ মতলব হ্যায়। বেক। মগর ঊ্য হ্যায় কওন? পিতাজি আনেসেই আপকো পাস ভেজেগা। হামকো রোজ ফোন কিজিয়েগা একদফে, জরুরত কুছ পড়ে ইয়া নেহি৷ বহত চিন্তামে ডাল দিয়া আপ মুঝকো।

.

রাতে, খেতে বসে, ঋজুদা বলল, একটা ব্লাইন্ড ডিসিশান নিতে হবে। কাল কাকভোরে কাঙ্গপোকপিতে যাব, না মোরেতে? এই দু জায়গাতেই যাওয়াটা সমান দরকার। যাক, গাড়ির সমস্যা যে মিটেছে, এটাই মস্ত বড় কথা।

তুমি এত দেরি করলে! চিন্তা করছিলাম আমরা। ফোন ডিরেক্টরিটা থাকলেও…সেটাও তো সরিয়ে ফেলেছে।

সরায়নি, ফোন ডিরেক্টরি সত্যিই বদলাতে পাঠিয়েছিল। নতুনটা আনবার জন্যে।

কী করে জানলে?

জেনেছি।

খাওয়া দাওয়ার পর তিতির বলল, দু জায়গাতে যাওয়াই সমান দরকার হলে, টস্কর ভটকাই। হেড হলে মোরে, আর টেল হলে কাঙ্গপোকপি।

ডিনার চমৎকার করেছিল। ওয়েস্টার্ন। মুলিংগাটানি স্যুপ। তিতির দেখেই মুখ ভেটকেছিল। ও দেখতে পারে না। মাছের মেয়োনিজ। কী মাছের বোঝা গেল না। ভেটকিও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। চিকেন রোস্ট। পাইন্যাপল–পাই। সঙ্গে ব্রেড-রোলস, ক্রোঁশো এবং টোস্ট। যার যা খুশি।

এত সুন্দর রোল আর ক্রোঁশো কোথায় তৈরি হয়?

…বাবুর্চিকে শুধোলো তিতির।

শিলং-এর পাইনউড হোটেলের বেকারি ডিপার্টমেন্টের একজন চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসে ডাংজাথাং সাহেবের সঙ্গে পার্টনারশিপে বেকারি করেছেন। চিজ স্ট্র, নানারকম কেক, ব্ল্যাকফরেস্ট, প্যাটিস, কলকাতার কুকিজার’ থেকেও একজনকে ভাগিয়ে এনেছে। খুব ভাল বানাচ্ছে সব। ওদিকে আইজল, নাগালান্ডের কোহিমা এবং ডিমাপুর; বার্মার তামু, পান্থ, মিন্থ, থংডুট এবং পংবীন পর্যন্ত চালান যাচ্ছে। মণিপুরের মধ্যেও কম চাহিদা নেই।

বাঃ। ঋজুদা বলল। তারপর বলল, টসটা কর ভটকাই।

সঙ্গে সঙ্গে বারান্দাতে আলোর নীচে দাঁড়িয়ে টস করল ভটকাই। টেল হল। অতএব, কাঙ্গপোকপি।

তিতির বলল, ইচ্ছে করে টেল ফেলেছে। ওর প্রথম থেকেই কাঙ্গপোকপিতেই যাবার ইচ্ছে।

ভটকাই রেগে বলল, বেশ তো। তোমরা ফের করো, নতুন করে।

চল, বসার ঘরে গিয়ে বসি।

চলো।

বলল, ঋজুদা, কোথায় গেলে? কাদের সঙ্গে দেখা করলে? কী বুঝছ?

যতই বোঝার চেষ্টা করছি ততই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মিস্টার তম্বির ওয়ার্থ নাকি পাঁচ পয়সাও নয়। ওঁর পেছনে অন্য কেউ আছেন। তিনি পুরো ইস্যুটাকে কনফিউজ করে দেবার জন্যেই আমাকে এখানে ডেকেছেন, যাতে তাঁর সুবিধে হয়। আজ না হয় কাল পুলিশ আমার সঙ্গে যোগযোগ করবেই, কারণ, কৃষ্ণমূর্তি সাহেব এখানের চিফ-সেক্রেটারিকে টেলেক্স পাঠিয়ে দিয়েছেন।

এত উপর মহলে হল্লা হলে কেস আবার গুবলেট হয়ে যাবে না তো? আসল তো নিচুমহল।

ভটকাই বলল।

সেটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু উপায়ই বা কী ছিল? যাতে আসল অপরাধীকে ধরা পুলিশের পক্ষেও অসুবিধের হয়, অথবা পুলিশদের ভুল বা ইচ্ছে করে ভুল সিদ্ধান্ত যাতে আমার ভুল সিদ্ধান্তে আরও পাকা-পোক্ত হয়, সে জন্যেই আমাকে ডাকা। তম্বি সিংকেও মেরে দিতে পারে, যে আসলে তাকে পাঠিয়েছিল আমার কাছে, সে।

তম্বি সিং যে আসল লোক নয়, এটা কিন্তু আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল। মনে আছে, তোমার? কলকাতাতে তুমি যখন রশিদের কথা ওঠালে, তখন তম্বি সিং বললেন, যে টাকা পাঠিয়েছে তার রশিদের দরকার নেই। যখন বললে যে, দশহাজারের বেশি কোনও খরচ ইনকামট্যাক্সে মানবে না, তখনও উনি বললেন, ও যার ব্যাপার সে বুঝবে।

আমি বললাম।

ঋজুদা হাসল। বলল, মনে আছে।

তিতির বলল, এই কেসে আর ফিস টিস-এর কথা তোমার ভুলে যেতে হবে। এখন মানে মানে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফেরাই যথেষ্ট সকলের। বিশেষ করে, ঋজুদার। বেঁচে থাকলে অনেক গোয়েন্দাগিরি, শিকার ও অ্যাডভেঞ্চার হবে।

ভটকাই বলল, ছিঃ ছিঃ। একি শুনি মন্থরার মুখে? তুই কি ঋজুদারই সাগরেদ? ওপেন রিটার্ন টিকিট তো পকেটেই আছে। একটা কাজ করতে এসে শেষ না দেখে আমি অন্তত যাব না। ইচ্ছে করলে, তোমরা সকলে চলে যেতে পারো আমি একাই রয়ে যাব ঋজুদার সঙ্গে। রুদ্রর পিস্তলটা শুধু চাই। আমাদের বাগবাজারে একটাও দশতলা বাড়ি নেই কিন্তু তোরা কি জানিস যে, কলকাতা থেকে যত মাউন্টেনিয়র পাহাড় চড়তে যায়, তাদের মেজরিটিই আসে বাগবাজার থেকেই, তোদের সাউথ ক্যালকাটা থেকে নয়। অ্যাডভেঞ্চারের! বিপদের গন্ধ যখন পেয়েছি তখন পুলিশের কুকুরের মতো আমি তার পিছু নেব। যা কপালে আছে তা হবে।

ঋজুদা বলল, রাত সাড়ে দশটা। এবারে সকলেই শুয়ে পড়। আমরা ঠিক সাড়ে চারটেতে বেরোব। বাবুর্চিকে বলে রাখ চারটেতে চা চাই। তার ওঠার দরকার নেই। নাইটওয়াচম্যান ঘরে পৌঁছে দিলেই হবে।

শুধুই চা? একটু বিস্কুটও না?

ভটকাই বলল।

ঠিক আছে। শুধুই বিস্কিট। গুড নাইট। কাল কথা হবে। সময় লাগবে কাঙ্গপোকপি পৌঁছতে।

সকালে বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখি রীতিমতো, যাকে বলে ক্যালামিটি। ভটকাইচন্দ্রর ডান পাটি তার খাটের নীচে মশারি ভেদ করে ঝুলে রয়েছে, বাঁ পাটি খাটের ভিতরে আর তার মাথাটি, মাথাতো নয়, যেন আন্দামানের একটি দুষ্প্রাপ্য সাদা কচ্ছপ, মশারির সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। সাধু বাংলাতে যাকে বলে, অঙ্গাঙ্গীভাবে। আর ভটকাই জালে পড়া চিতাবাঘের মতো ফাঁসফোঁসস শব্দ করে যাচ্ছে সমানে, দুখানা হাত আর মশারিতেই আটকে-যাওয়া একখানি পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে।

ব্যাপারটা বুঝতে আমার সামান্য সময় লাগল এবং বুঝতে পেরেই হো হো করে হেসে উঠলাম আমি।

ভটকাই একটা সংক্ষিপ্ত বাক্য, উড়নতুবড়ির মতো আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। তার অর্থ, আমি ছাড়া, অথবা যিনি জঙ্গল মহল না পড়েছেন, আর কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব ছিল না। বাক্যটা হল খদ্দাকারেকছস। অর্থাৎ খবর্দার কাউরে যদি কইছস। জঙ্গল মহল-এর মাইরেন এবং মাইরেননা গল্পে জামাই বাবুর ডায়ালগ। জামাইবাবু ঘুমের মধ্যেও পান খেতেন–তাই তাঁর সব কথাই অমন জড়িয়ে যেত।

ভটকাই নিজের বাগবাজারত্ব সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে, বিপদে পড়ে সেই বাঙালপতিরই শরণাপন্ন হল।

আমি এসে মশারির ফাঁস থেকে উদ্ধার করে বললাম, আরও স্টান্ট দেবার জন্যে, তামিল ব্রাহ্মণ সাজবার জন্যে ন্যাড়া হতে যাও।

ওর ন্যাড়া মাথাতে দু তিন মিলিমিটার মতো চুল গজিয়ে গেছিল–শুয়োরের চুলের মতো খোঁচা খোঁচা; মোটা চুল। যেমন বুদ্ধির বাহার তেমনিই চুলের। ন্যাড়া হওয়ার পর কিছুদিন মশারি থেকে দূরে থাকাই ভাল। তখন মশারি, মশার অরি না হয়ে ন্যাড়ার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।

প্রথম প্রাতেই এমন কেলো করলি। ছিঃ।

আমি বললাম।

ভোরবেলা চা দিয়ে বেয়ারা দরজাতে ধাক্কা দিল। তিতির চা খায় না। তাই ভটকাই তিতিরের ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিয়ে গাইতে লাগল, ভোর হল দোর খোলো খুকুমণি ওঠো রে।

যখন গাড়িতে উঠছি আমরা, তখনও অন্ধকার। সবে আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। পাখি ডাকছে বাগান থেকে। নানারকম। তার মধ্যে ব্যবলার, থ্রাশার, বুলবুলি, টুনটুনি, শালিক এবং দাঁড় কাকেঁদের গলাই প্রধান। পেছনের ফাঁকা হয়ে যাওয়া জঙ্গল থেকে বনমোরগ। হঠাৎ একটা ময়ুর ডেকে উঠল, বুকের মধ্যে চমক তুলে। এখনই বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব একটা। দিনরাত্রের এই সময়টাতেই পৃথিবী সবচাইতে শান্ত, স্নিগ্ধ, সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশায় ভরা। রোদ উঠে গেলেই কারও আশা পূরবে, কারও আশা ভাঙবে। এই সময়টা আমার তাই সবচেয়ে ভাল লাগে।

ভটকাই আমার মুখের দিকে চেয়ে বলল, জানি কী ভাবছিস। আমি রোজ এই সময় উত্তর কলকাতার পথে পথে হেঁটে বেড়াই। ঘুম-ভাঙার আগে কলকাতার জীবন দেখতে দারুণ লাগে আমার। চোখে কেতুর-লেগে থাকা কলকাতা।

ঋজুদা বলেছিল, সকলের ব্যাগও সঙ্গে নিয়ে নিতে। কখন কোথায় থাকি ঠিক নেই। কাল রাতেই বাবুর্চি বেয়ারাদের বকশিস টকশিসও দিয়ে দিয়েছে। বলেছে, আমরা ফিরলে তখনই রান্না-বান্নার কথা বলব। কবে কখন ফিরব তার ঠিক নেই। আমরা যাচ্ছি লকটাক-এ। সেখান থেকে কোথায় যাব তাও জানা নেই।

গাড়িতে উঠতে যাব ঠিক এমন সময়ে ফোনটা বাজল। তিতিরই দৌড়ে গেল। ফোন ধরেই চেঁচিয়ে বলল, ঋজুদা তোমার ফোন।

এই সময়ে?

ভুরু কোঁচকাল ঋজুদা। তারপর ফোন ধরে এসে, মারুতি ভ্যানে উঠে পড়ে, সামনের, বাঁদিকের সিটে বসল। বলল, রুদ্র তুইই চালা। আর ভটকাই, তোর রসিকতা এখন কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ রাখ।

গাড়ি স্টার্ট করে, কম্পাউন্ড থেকে বেরিয়ে পথে পড়তেই ঋজুদা বলল, ব্যাড নিউজ…

কী? তিতির শুধোল।

তম্বি সিং…

তম্বি সিং মার্ডারড?

ভটকাই প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছিল।

না। তম্বি সিং ফোন করেছিলেন যে, ইবোবা সিংকে কে বা কারা কাল মধ্যরাতে মোরের পথে থেংনোপালের ঘাটিতে হঠাৎ একটি বাঁকে, রোড ব্লক সেট করে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। গাড়িটাও প্রায় খরচের খাতায়। খুন করেছে।

লোকটা কে? ইবোবা সিং?

থাঙ্গজম সিং-এর ছেলে।

থাঙ্গজম সিং? সে আবার কে?

থৈবী দেবীর বাবা।

থৈবী দেবী? সেই বা কে? থৈবী-খাম্বার কথা তো শুনেছি, সে তো… তুমিও হেঁয়ালি করছ ঋজুদা।

তিতির বলল।

না হেঁয়ালি নয়। এর নামও সেই লেজেন্ডারি রাজকুমারীর নামেই রাখা হয়েছে।

যাঃ বাবা। কী হেঁয়ালিরে।

হুঁ।

ঋজুদা আপন মনে বলল।

ফোনটা করল কে?

আমি বললাম।

তম্বি সিংই।

তিনি জানলেন কখন? কোত্থেকে। তিনি এখন কোথায়?

জানি না কোত্থেকে ফোন করলেন। কিন্তু তিনি খুব প্যানিকি হয়ে গেছেন। গলা শুনেই মনে হল, প্রকৃতিস্থও নেই। সারারাত হয়তো মদ-টদ খেয়েছেন।

তার মানে, খবরটা আগেই পেয়েছিলেন?

হতে পারে। তবে এখুনি তো জানা যাবে না। হাঞ্জো সিংও মারা গেছে।

এরা কারা? মানে, এই ইবোবা সিং, থৈবী সিং, থাঙ্গজম সিং? হাঞ্জো সিং?

পরে জানবি। এখন একটু ভাবতে দে আমাকে। গাড়িটা একটা মোড়ে এসে পৌঁছতে আমি বললাম, এবারে ডানদিকে না বাঁদিকে? কোনদিকে টার্ন নেব, ঋজুদা।

সোজা, সোজা। সোজা যা। তারপর ভাল করে শুনে নে। সামনে পাঁচ ছ’ কিলোমিটার গিয়েই আরেকটা মোড় পাবি। বাঁদিকে যাবি, সেখান থেকে দশ কিমি মতো যাবার পরই কাঙ্গলোটংবি। সেখান থেকে সোজা গেলে কাঙ্গপোকপি, বাইশ তেইশ কিলোমিটার মতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর জঙ্গল আরম্ভ হবে। আগে এই সমস্ত জায়গাই, যেখানে আমরা রয়েছি সেই দ্য রিট্রিট-এ, তার পাশেও অত্যন্ত গভীর জঙ্গল ছিল। আশ্চর্য! এমন একটা রাজ্য নেই ভারতবর্ষে, যেখানে বনজঙ্গল শেষ না করা হয়েছে। ভাবলেও কষ্ট হয়।

ভটকাই বলল, কাঙ্গপোকপি থেকে কোহিমা কত দূর?

কাঙ্গপোকপি থেকে?

হ্যাঁ?

কত আর বড়জোর একশো কি.মি. হবে।

আর মাও? নাগাল্যান্ডের বর্ডার?

মাও হবে পঁচাশি ছিয়াশি কিমি মতো।

আর, কোহিমা থেকে ডিমাপুর কতদূরে?

চুয়াত্তর পঁচাত্তর কিমি হবে। মুখস্থ করে রেখেছি কি? ডিমাপুর তো সমতলে। রেল স্টেশন আছে। কোহিমা থেকে ডিফু নদীকে বাঁ পাশে রেখে, পথটা বাঁক নিতে নিতে কোহিমাতে পৌঁছয়। সেই পথটুকু ভারী সুন্দর।

বলেই চুপ করে গেল।

শোন, তোদের একটা কথা বলে রাখি। এখুনি বলা দরকার। কাঙ্গপোকপিতে সানাহানবির ফার্মে গিয়ে থৈবী দেবী বলে একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হতে পারে তোদের। আমিও তাকে দেখিনি কখনও। মানে, না থৈবীকে না ইবোবাকে। সানাহানবির মতোই হবে হয়তো বয়স মেয়েটির। তবে দেখা যে হবেই, এমনও জোর করে বলতে পারি না। কারণ, তার এখন কোহিমাতে থাকার কথা। তবে মন বলছে, হবে। আমি বা তোরা কেউই তার কথা জানি বা জানিস তা ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করবি না। বুঝেছিস। আর তিতির, তুই তার সঙ্গে একটু বন্ধুত্ব করে রাখিস। যে থৈবী দেবীর কথা বলছি, তার দাদাই খুন হয়েছে গত রাতে। সে খবরটা সে হয়তো পেয়েও গেছে। নাও পেতে পারে। কিন্তু খুন হবার সম্ভাবনার কথা তার জানা আছে সম্ভবত! বেচারি যমুনা।

যমুনা আবার কে?

আছে। আছে। তোরা কি সকলকেই চিনিস? থৈবী যদি খবরটা কাঙ্গপোকপিতে পেয়ে থাকে, তবে রওনা হয়ে হয়তো ইম্ফলে এতক্ষণে চলে গেছে। এখনও কিছু সম্বন্ধেই শিওর নই। দেখি কোনও সাদা মারুতি কি দেখলাম আমরা? আমাদের ক্রস করে যেতে, ইম্ফলের দিকে?

না তো! আমি এমফ্যাটিকালি বললাম।

এমন সুন্দর সকালে একটা মৃত্যুর কথা শুনে আমাদের মন খারাপ হয়ে গেছিল। মৃত্যু, সে যার মৃত্যুই হোক না কেন, মনকে ব্যথিত করেই। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ফর হুম দ্য বেল টোলস উপন্যাসের আগে আছে না? For Whom the bell tolls, the bell tolls for thee! প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুর মধ্যেই আমাদের প্রত্যেকের মৃত্যুই নিহিত আছে।

সালুকি কুকুর সম্বন্ধে তুমি কিন্তু কিছুই বলোনি ঋজুদা, এখনও আমাদের।

আরম্ভ হল এভার-ইনকুইজিটিভ ভটকাই-এর অন্তহীন প্রশ্নবাণ। এই সুন্দর সকালে মৃত্যু থেকে ও পালাতে চাইছিল আসলে।

সালুকি হচ্ছে, কুকুরদের রাজা। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আর সালুকির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কারে দেখা গেছে যে, আদিমতম গুহাগাত্রের আঁকা ছবিতে, কবরের উপরে খোদিত ছবিতে, সালুকিদের ছবিও রয়েছে। তারাই হয়তো কুকুরদের আদিপুরুষ। খ্রিস্টপূর্ব দু-হাজার থেকে সাত-হাজার শতাব্দীতেও যে এরা ছিল তারও প্রমাণ আছে। এমনকী খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের ধর্মপুস্তক বাইবেলেও, যেখানেই কুকুরের কথা আছে, সেখানেই ধরে নেওয়া হয় যে, সালুকির কথাই বলা হচ্ছে। লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চির পৃথিবী বিখ্যাত ছবি, দা লাস্ট সাপার-এও সালুকিদের ছবি আছে। মুসলমানরা কুকুর আর শুয়োরকে হারাম’ বলেনকারণ, তারা নোংরা। এই দুই প্রাণী সম্বন্ধে তাঁদের ধর্মীয় অনুশাসনে নানা বিধিনিষেধ আছে। এই হারাম থেকেই হারামজাদা শব্দের উদ্ভব। কিন্তু সালুকির বেলা ইসলামেও ব্যতিক্রম করা হয়েছে। সালুকিরা শেখদের নিজের তাঁবুতে স্থান পেয়েছিল। এমনকী মিশরের ফারাওদের মতোই এদেরও মমি রাখা আছে। নীলনদ-এর উত্তরভাগের অসংখ্য প্রাচীন কবরের মধ্যেও নানা জাতের সালুকির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেছে। ক্যাসপিয়ান সি থেকে সাহারা, মিশর, অ্যারেবিয়া, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, অ্যানাথলিয়া এবং পারসিয়া পর্যন্ত এদের পাওয়া যেত, সেই সুপ্রাচীন কালেও।

তা এই কুকুর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেল কী করে?

তিতির শুধোল।

যে করে সমস্ত ভাল বা খারাপ জিনিসই ছড়িয়ে যায়।

তবু বলো না, বিশদ করে।

যতদূর আমি খোঁজ রাখি, অবশ্য বইপড়া বিদ্যায়; তাতে জেনেছি যে, আঠারশো চল্লিশ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ স্যার হ্যাঁমিলটন স্মিথ, একটি সালুকি কুকুরী নিয়ে আসেন ইংল্যান্ডে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে। একটা পুরুষ সালুকির কথাও শোনা যায়, ওই সময়েই লানডান-এর রিজেন্ট পার্ক চিড়িয়াখানাতে ছিল বলে। সমসময়েই, আরও একটি কুকুর ছিল চ্যাটসওয়ার্থ-এর ডিউক অফ ডেভনশায়ারের কাছে। এমনি করে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সেই সময়কার ইংল্যান্ডে বলা হত পারসিয়ান গ্রে হাউন্ড। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অফিসারদের কাছ থেকে এই কুকুর সম্বন্ধে ব্রিটেন ওয়াকিবহাল হয়।

একটা সময়ে, পৃথিবীতে ব্রিটেন আর জার্মানি যে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী, মেধাবী এবং প্রতিভাবান জাত বলে স্বীকৃত হয়েছিল এবং দুঃখজনক হলেও যার অমোঘ পরিণতি সংঘাত; সেই সময়ের ইতিহাস নাড়াচাড়া করলেই তোরা দেখতে পাবি যে, যে-কোনও জাত যখন বড় হয়, তখন সেই সব জাতের বড়ত্বর মাপ শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক সাফল্যের পরিমণ্ডলের এবং মাপ দিয়েই চিহ্নিত হয় না। ফুল, পাখি, প্রজাপতি, কুকুরের প্রতি আগ্রহ থেকে তা পুরাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, দর্শন এই সমস্ত বিষয়েই উপচে গিয়ে পরিব্যাপ্ত হয়। সভ্যতা ব্যাপারটা জীবনের কোনও এক বিশেষ ক্ষেত্রে কোনওদিন আবদ্ধ থাকেনি। থাকে না। যাঁরা অগ্রগণ্য, তাঁরা জীবনের সমস্ত টুকরো-টাকরাতেও অগ্রগণ্য হন।

আমাদের দেশ শাসন করতে এসে ইংরেজ আই. সি. এস. অফিসাররা আমাদের দেশের গহন গভীরে গিয়ে আমাদের আদিবাসীদের তত্ত্ব-তালাশ করে, ফুল পাখি, প্রজাপতি, জন্তু-জানোয়ার, উদ্ভিদ ও প্রাণীবিদ্যার ক্ষেত্রে তাঁদের গভীরতা ও তীক্ষ্ণ মেধার স্বাক্ষর যেমন রেখে গেছেন তাঁদের লেখা বিভিন্ন জেলার গেজেটিয়ারে, তেমন গত চল্লিশ বছরেই কোনও আই. এ. এস. অফিসারের কাছ থেকে তো পেলাম না। যাঁরা পারেন, তাঁরা শাসন যেমন করতে পারেন, ভালওবাসতে পারেন। আর যাঁরা ভালবাসতে শিখেছেন, যত্ন করতে শিখেছেন, তাঁরা নিজের জিনিস আর পরের জিনিসে তফাত করতে ভুলে যান। জার্মান মিশনারিরা যা কাজ করে গেছেন ভারতের নানা আদিবাসীদের সম্বন্ধে, যেমন ফাদার হফম্যান; তেমন মিশনারিদের দেখা কি আজকাল পাওয়া যায়?

তুমি বড় বুড়ো বুড়ো ভাব করছ আজকাল, ঋজুদা।

বুড়োরা যেমন এ যুগের সবকিছুই খারাপ দেখে–সবসময়েই আমাদের সময়ে এই ছিল, আমাদের সময়ে ওই ছিল,এখনকার ছেলে-ছোকরা খারাপ, তাদের পোশাক খারাপ, তাদের বুদ্ধি খারাপ, তাদের বড়দের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই, তাদের মাইকেল জ্যাকসন, উষা উথুপ, মাধুরী দীক্ষিত, রূপা গাঙ্গুলি সবাই খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি…তুমি তেমনই কর আজকাল। তুমিও কি বুড়ো হচ্ছ না কি?

আমি বললাম।

বার্ধক্য এমনই জিনিস যে, কারোকেই কোনও গেসসসওয়ার্ক-এর সুযোগ দেয় না। সে তো আসবেই একদিন না একদিন। আটকানো তো যাবে না। তবে যখন আসে, তখন তার পদধ্বনি ঘরে বাইরে সকলেই শুনতে পায়। প্রার্থনা করিস, যেন যতদিন সম্ভব তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারি। আর যখন আসবেও, যেন তার সঙ্গে লাঠালাঠি না করে গলাগলি করে দিন কাটাতে পারি।

তিতির বলল, ভাগ্যিস তুমি ওর মধ্যে গুরুর নামটাও ধরোনি। তা হলে নিজের বুমেরাংয়ে তো নিজেই কাৎ হয়ে যেতে, ঋজুকাকা। আমাদের সব গুরুরাই খারাপ, এ কথা আর যেই হোক, তুমি বলতে পারো না।

সকলেই হেসে উঠলাম আমরা।

ঋজুদা বলল, আমরা একটু বেশি আগে বেরিয়ে পড়েছি, বুঝলি। একজন মহিলার এবং তরুণীর বাড়িতে আগে না জানিয়ে চারজন আগন্তুকের পক্ষে ব্রেকফাস্ট টাইমের আগে হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হওয়া যায় না। একটু আস্তে চালা রুদ্র। আমরা কাঙ্গপোকপিতে পথপাশের কোনও চায়ের দোকানে, গরম গরম জিলিপি বা সিঙ্গারা বা কচুরি দিয়ে গরম চা খেয়ে তারপই সানাহানবির ফার্মে যাব।

জিলিপি-সিঙ্গারা পাওয়া যাবে? এইসব অঞ্চলে?

জিলিপি-সিঙ্গারা না হলেও চায়ের সঙ্গে অন্য কিছু মিষ্টি ও নোনতা অবশ্যই পাওয়া যাবে। যেখানেই পথ, সেখানেই সর্দারজি; সেখানেই ধাবা। আর বাবা থাকলেই কিছু না কিছু খাবার। যে সময়ের যেমন। যাই বলিস, অনেকদিন হয়ে গেল পুরনো-মবিলে ভাজা সিঙ্গারা খাইনি। মাঝে মাঝে অখাদ্য-কুখাদ্য না খেলে ইস্যুনিটি বাড়ে না। গদাধর সূর্যমুখীর তেলের রান্না খাইয়ে খাইয়ে জিবের স্বাদই দিয়েছে খারাপ করে। পুরনো, ব্যবহৃত-মোজাতে ছাঁকা এবং কাঠের গুঁড়ো মেশানো চায়ের গুঁড়োর চা, পুরনো-মবিলে ভাজা কচুরি সিঙ্গারা এবং জিলিপি, এ সব স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যে মাঝে মাঝে অবশ্যই খাওয়ার দরকার।

যা বলেছ ঋজুদা! সবসময় এই তিতিরের মতো পুতুপুতু–এখানে খাব না, ওখানে খাব না, এটা খাব না; সেটা খাব না–এদের নিয়ে বেরোনোই যায় না। সাধে কি শাস্ত্রে বলেছে, পথি নারী বিবর্জিতা! আমরা বাবা গরিব পাড়ার লোক। সকালে উঠে ম্যানাদার দোকান থেকে সারাদিনের পোড়া কালো বাসি তেলে ভাজা এক টাকার হাতে-গরম তেলে ভাজা খেয়ে নিই। ব্যসস। সারাদিন আর খাওয়ার খরচাই নেই। গরিব দেশের গরিব পাড়ার এই হচ্ছে প্রধান খাদ্য। তোমরা ইংজিরিতে যাকে বল স্টেপল ফুড।

সেকী? তাতেই সারাদিন?

তিতির অবাক হয়ে শুধোল ভটকাইকে।

না। তারপরই জল খেতে হবে দু’গ্লাস। খেলেই পেট একেবারে ভরে যাবে, টইটম্বুর ভরে থাকবে সারাটা দিন। আইঢাই করবে পেরান।

সে কী? কীসে?

কেন? অম্বলে। দিশি লাইফ-সেভিং ড্রাগে ভেজাল পাবে, কিন্তু অম্বলে নয়। পিওর বেঙ্গলি অম্বলে। র‍্যানটাক, পলিক্রল, জেলুসিল এম. পি. এস, কোনও অ্যানটাসিডের বাবার সাধ্য নেই যে, সেই বিশুদ্ধ অম্বলের কাছে ট্যাঁ-ফোঁ করে।

হো হো করে হেসে উঠল, ঋজুদা।

তারপরই গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, ওখানে পৌঁছে তো কথাবার্তা বলার সুবিধে হবে না। তা ছাড়া তেমন বুঝলে, সঙ্গে সঙ্গে কাঙ্গপোকপি ছেড়ে আমাদের অ্যাবাউট টার্ন করে মোরে তে চলে যেতে হতে পারে। সানাহানবির কাছে বড় জাতের কুকুর কী আছে, একটু ভাল করে খোঁজ করিস তো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *