কাঙ্গপোকপি (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ভটকাই নিচু গলাতে বলল, যাতে ঋজুদা শুনতে না পায়, পোলাপান! পোলাপান! তিনখান!

সানাহানবি বললেন, চলুনই তো। গিয়ে দেখবেন। তারপর পছন্দ না হলে কাঙ্গপোকপিতে আমার ফার্মেই না হয় থাকবেন। গরিবখানাতে। ছটি বেডরুম আছে। কষ্ট হবে না।

আমরা তো এখানে আরাম করতে আসিনি।

আমি বললাম।

আহা। তা তো জানিই। তবে, দেয়ারস নাথিং রং ইন মিক্সিং ওয়ার্ক উইথ প্লেজার। আরাম করেই যদি কাজের কাজটা করা যায়, তা হলে ক্ষতিটা কী?

ভটকাই ওয়ালট-ডিজনির মিকি-মাউসের মতো উত্তেজিত হয়ে, লাফালাফি শুরু করেছে।

ঋজুদা সানাহানবির গাড়িতে গিয়ে উঠল। বাঁদিকের দরজা খুলে। এমন কিছু গরম নেই এখন। তবে আকাশে মেঘ করলে বাইরে গুমোট হবে। এখন চমৎকার হাওয়া আছে বাইরে। এখনও সেপ্টেম্বরে পৌঁছয়নি বছর, কিন্তু আকাশ আর রোদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, পুজো এসে গেছে। পথপাশের কৃষ্ণচূড়া আর অমলতাসের গাছে গাছে কানাকানি করছে সে হাওয়া।

মিস্টার তম্বি সিং-এর টাটা-সিয়েরাতে আমরা তিনজন। শোফার-ড্রিন এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়ি। তিতির সামনে বসে প্রায় হারিয়েই গেছে অতবড় সিটটাতে। আর মনমরা ভটকাই, চোর-চোর মুখ করে বসে আছে আমার আর তম্বি সিং-এর মধ্যে। আহা, ছোঁড়ার খুব ইচ্ছে ছিল লেডি ডাইয়ের গাড়িতে যায়।

রাজকুমারীর গা দিয়ে কী দারুণ একটা গন্ধ বেরুচ্ছিল র‍্যা? তিতির? কী সেন্ট মেখে ছিল র‍্যা?

ফিসফিসে গলায় বলল ভটকাই, বাগবাজারি বাংলাতে।

তিতির হাসল। প্রায় নিঃশব্দে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল, আদিখ্যেতা কোরো, ভটকাই। আমরা একটা সিরিয়াস কাজে এসেছি। ওই পারফুমের নাম হল, রেড ডোর।

আমি বললাম, ইংরিজিতি কথা বলো, তিতির। অভদ্রতা হচ্ছে। উনি ভাবছেন আমরা হয়তো কোনও চক্রান্ত করছি।

ভটকাই বলল, আমরা তিনজন যেখানে, সেখানেই তো একটি চক্কর। চক্কান্ত হতে কতক্ষণ?

আচ্ছা, আর কতদূর?

তিতির শুধোল, যেন, হাঁপিয়ে গিয়ে, ইংরেজিতে।

অতবড় টাটা সিয়েরা, তাও বেশ জোরে চলছিল, আর রাজকুমারী সানাহানবি এত জোরে গাড়ি চালিয়ে কোথায় যে উধাও হয়ে গেলেন, যে ওঁর গাড়িকে এখন আর দেখাই যাচ্ছে না।

তম্বি সিং বললেন, আরও মিনিট পনেরো।

বাবা। তবে তো বেশ দূর আছে। অনেক পথ। ভটকাই বলল।

মোরে’টা কোনদিকে? যেখানে মিস্টার ইবোহাল সিং খুন হয়েছেন?

তিতির শুধোল।

ওঃ। সে তো এই পথেরই অন্য দিকে। আমরা যেদিকে যাচ্ছি, তার উল্টোপথ। এবং বেশ দূরেও। ইম্ফল থেকে একশো দশ কিলোমিটার। তাও পথে গভীর জঙ্গল আর থেংনোপালের ঘাট পেরোতে হবে, ছ’ হাজার ফিট উঁচু, ইম্ফল থেকে ঊনসত্তর কিমি–ওই পথেই টেররিস্টদের দারুণ ঝামেলা। থেংনোপাল খুব উঁচু। মেঘেদের চেয়েও উঁচু। যখন যাবেন দেখবেন মেঘেরা আপনাদের পায়ে চুমু খাচ্ছে।

টেররিস্টরা কারা এখানে? কীসের কারণে টেররিজম? কী চান ওঁরা?

সে অনেক কথা। বলব এখন পরে। আগে পৌঁছন তো জায়গামতো। রিল্যাক্স করুন।

যখন পৌঁছল ওরা, দেখল ছোট্ট হলেও অত্যন্ত সাজানো গোছানো চমৎকার একটি বাংলো। কটি বেডরুম আছে তা বোঝা গেল না, তবে পাঁচ ছ’টি তো হবেই। কম করে।

ঋজুদা আগেই পৌঁছে বারান্দার সাদা রং করা বেতের চেয়ারে বসে ততক্ষণে পায়ের ওপর পা তুলে পাইপ খাচ্ছে। আর সানাহানবি দেবী সামনে বসে ঋজুদাকে চা ঢেলে দিচ্ছে টি-পট থেকে। জাপানিজ টি-সেট, সবুজের ওপর কমলা-রঙা ড্রাগন আঁকা। টি পটের ওপরে কাশ্মীরী কিন্তু খুব দামি টি-কোজি।

না। দেখেই মনে হল, রাজা ইবোহাল সিং-এর শুধু পয়সাই ছিল না, রুচিও ছিল। একটা ক্লাস-এর ব্যাপার ছিল ভদ্রলোকের মধ্যে, শুধুমাত্র বড়লোক হলেই যা থাকে না। ব্যাচেলার হলে কী হয়, বাড়ির বারান্দাতে পা দিয়েই টবে টবে নানা ফুল, পাতা, ঝাড়, ক্রোটন, অর্কিড, সাকুলেন্টস, ক্যাকটাই, বাগানের গাছপালা, দারুণ ট্রিম করা লন, তারপর ফার্নিচারের রং, অ্যারেঞ্জমেন্ট, ঘরে না ঢুকেই ঘরের ফার্নিশিং-এর রুচি, বিভিন্ন প্যাস্টেল রঙা কুশন কভারের রং দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয়, কোনও আর্টিস্টের বাড়ি–এবং অত্যন্ত বিত্তবান আর্টিস্ট-এর।

তিতির ফিসফিস করে এই কথাই বলছিল, আমাকে।

আমাদের চা খাওয়ার আগে ভিতরে ঢুকে ড্রয়িং রুম, ডাইনিং রুম, আমাদের তিনটি বেডরুম, সব দেখিয়ে দিলেন সানাহানবি দেবী। বদরপুরী মুসলমান, সাদা দাড়িওয়ালা, একেবারে সাদা উর্দি পরা রজ্জাক মিঞা, (তিতিরের ভাষায়, ইন ইস্ম্যাকুলেট লিভারেজ-এ), বাবুর্চির সঙ্গে এবং দুজন মণিপুরি অভিজ্ঞ, বয়স্ক বেয়ারা, একজন নাগা দারোয়ান এবং দুজন কুকি মালীর সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দিলেন সানাহানবি দেবী। সবাইকে বললেন, দেখো, যেন মেহমানদের কোনওরকম অসুবিধেই না হয়। বলেই বললেন, আমি কিন্তু এবার যাব মিস্টার বোস। আপনি তো জানেনই কাঙ্গপোকপি কতদূর এখান থেকে। বাবার কাছে এবং এদের কাছেও আমার ফোন নাম্বার আছে। আপনাদের সঙ্গে টাটা-সিয়েরাটা থাকবে। শোফার ড্রিভন। যখন যেখানে খুশি যাবেন আপনারা। আর আজ যদি এক্ষুনি মোরে যেতে চান, প্লেস অ্যান্ড সাইট অফ মার্ডার দেখতে, তা হলে তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়ুন। ওই পথে কিন্তু আজকাল ভীষণ বিপদ। নানারকম বিপদ। রাত হয়ে গেলে প্রাণ বাঁচিয়ে ফেরাই মুশকিল হবে। এখন মণিপুরে যে-রকম টারময়েল চলছে, এই সময়ে বাবা আপনাদের যে কেন এখানে আসতে বললেন তা আমার মাথাতেই আসছে না।

ঋজুদা বলল, আজকে গেলে আমি একাই যাব। ওরা এখানে থাকুক সাইটসিয়িং করে বেড়াক–ঘুরে টুরে দেখুক। এর মধ্যে ওদের একদিন মৈরাঙ্গ, থৈবী-খাম্বার জায়গা, তারপর লেক লকটাক ইত্যাদি সব দেখিয়ে আনব। আর কাঙ্গপোকপিতে যেতেই হবে একবার, অন্য কুকুর না হোক, আপনার সালুকিদের দেখতে অবশ্যই যেতে হবে।

কিন্তু আমার মন ভারী খারাপ হয়ে আছে। আমার বড় প্রিয় কুকুর টাইগার মরে গেল।

কবে?

তা দিনকুড়ি হল। আঙ্কল ইবোহাল-এর মৃত্যুর কদিন পরই।

কী কুকুর?

গ্রেট-ডেন।

ইসস

বলল, ঋজুদা।

তারপর বলল, কুকুর ভালেবাসলেও এই কারণেই কুকুর পুষি না। ঈশ্বরের উচিত ছিল কুকুরদের মানুষের চেয়ে বেশি আয়ু দেওয়া।

বাঃ। খুব ভাল বলেছেন। সত্যিই তাই।

যাই হোক। আসুন আপনারা কাঙ্গপোকপিতে। আই উইল বি ডিলাইটেড। বলেই, আমাদের সবাইকে নরম করে বাই’ বলে, ডানহাতের তিনখানা আঙুল নাড়লেন। আর মিস্টার তম্বি সিংকে বললেন, বাই ড্যাড। লুক আফটার ইওর গেস্টস ওয়েল। অ্যান্ড ইউ শুড টক টু মি এভরি নাইট।

তম্বি সিং মাথা নাড়লেন।

আমি ভাবলাম, বাবা অক্সফোর্ড আর মেয়ে কি হারভার্ড এর? এই ইংরেজ সাহেব ও আমেরিকান মিসিবাবার পাশে তো দিশি লোকজনের প্রাণান্তকর অবস্থা!

একটু পরে মিস্টার তম্বি সিংও চলে গেলেন, বিদায় নিয়ে, তাঁর বাড়িতে। বললেন, বিকেলে ফোন করবেন চারটে নাগাদ। তবে মোরে আজ না যাওয়াই ভাল। গিয়েই গাড়িটা পাঠিয়ে দেবেন বলেই, চলে গেলেন।

ওরা চলে গেলে, আমরা সবাই বারান্দায় বসলাম। ভটকাই-এর ভাষায়, ‘জমিয়ে’ চা খেতে।

ঋজুদা বলল, ভটকাই, আমাকে আর এক কাপ চা। এও তো দার্জিলিং-এর। কিন্তু কোন বাগানের বলতো? বড় দুঃখ হচ্ছে রে, বুঝলি, এই দুর্দিনে এমন কাপ্তান রাজার সঙ্গে তার জীবদ্দশাতে আলাপ হল না!

ভটকাই বলল, আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, টাটা-সিয়েরা গাড়িটার ড্রাইভার বাঙালি। নাম যোগেন। ঢাকার বাঙাল। ওর বাবা পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে আগরতলাতে এসে আশ্রয় নেয়। পড়াশোনা বেশিদূর করেনি। তবে স্কুল-ফাইনালটা চার-গড়ানে পেরিয়েছিল। তারপর ফিলিম ডিরেকটর হবার খুব শখ হয়। ধবধবে পায়জামা আর ডোরাকাটা আলখাল্লার মতো পাঞ্জাবি পরে। সুযোগ পেলেই একটা সিগারেট ধরায়। লোকমুখে খবর পায় যে, ইম্ফলে বোম্বের কোনও ফিল্ম কোম্পানি এসেছে শুটিং করতে। রেখা আর রাখী দুজনেই এসেছে আর অমিতাভ বচ্চনও। বাবার ছিটকাপড়ের দোকানের ক্যাশ ভেঙে যা পায় তাই হাতিয়ে নিয়েই ইম্ফলে চলে আসে। ইম্ফলে ট্রেন নেই–অনেকই ঘুর পথে বাসে, ট্রেনে এসে যখন আধমরা হয়ে ইম্ফলে পৌঁছয়, তখন ফিলিম পার্টি শুটিং শেষ করে চলে গেছে। তারপর আর ফেরা হয় না। ফিলিম-ডিরেকটর না হতে পেরে গাড়ির ড্রাইভার হয়।

ঋজুদা বলল, লাঞ্চের জন্য তাড়া দেবার দরকার নেই। আজকের দিনটা আমরা। রিল্যাক্স করব। বাড়িটা তোরা ঘুরে টুরে দ্যাখ। আমি ততক্ষণে দারোয়ান, মালী, বেয়ারা, এদের সঙ্গে আলাপ করে দেখি। ইবোহাল সিং-এর মৃত্যুতে এরা যে কেউই বিশেষ খুশি হয়নি তা এদের চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নতুন মনিবকে যে খুব একটা পছন্দ, তাও মনে হচ্ছে না। কিন্তু কী করবে? বড় বড় আমলারাই, আই. এ. এস সেক্রেটারিরাই মন্ত্রী বদলালে, সরকার বদলালে, নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলতে বাধ্য হয়, আর এরা তো কোন ছার। সেই ম্যাক্সিম আছে না একটা দ্য কিং ইজ ডেড, লং লিভ দ্য কিং–পৃথিবীর সব চাকরেরই এটাই কোড অফ কনডাক্ট। বড়, ছোট সকলেরই। পঁচিশ হাজারি থেকে পাঁচশো পানেওয়ালার। তা তারা স্বীকার করুক আর নাই করুক। তবে এদের মধ্যেও যদিবা সততা কৃতজ্ঞতা আশা করলেও করতে পারিস, যতই ওপরে উঠবি, ততই তা কমে যাবে, মেরুদণ্ডর হাড় ততই পাবদা মাছের কাঁটার মতো পাতলা ফিনফিনে হচ্ছে; দেখতে পাবি। তা ছাড়াও মিস্টার ইবোহাল সিং সাধারণ ভাবে মারা যাননি। ভটকাই-এর ভাষাতে, এই হম্বিতম্বিরা রাতারাতি মালিক বনে গেছেন। এদের প্রত্যেকের মুখেই বিরক্তি এবং ঘেন্না চাপা দিয়ে রাখা একরকমের প্রসন্নতা দেখলি না? হম্বিতম্বিদের খুবই মান্য করছে এমন দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু এ হচ্ছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। এদের মধ্যে প্রত্যেকেই এই খুনের কিনারা হোক এটাই চায় এবং ঠিক মতো হ্যাঁন্ডেল করতে পারলে এদের প্রত্যেকেই আমাদের এজেন্টের কাজ করবে। তবে আমার দৃঢ় ধারণা এদের মধ্যে দু-একজন ডাবল এজেন্টও থাকবে। হম্বিতম্বিরা আগে থেকে সে সম্বন্ধে সাবধান হয়ে ওই বন্দোবস্ত অবশ্য পাকা করে রেখেছে। এবং তা যদি হয়, তবে যোগেনের পক্ষেই তা হবার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা।

কেন?

তিতির বলল।

প্রথমত, ও বাঙালি। ওর পক্ষে আমাদের প্রত্যেকটি কথাই বোঝা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আমরা মীরজাফরের দেশের লোক। না-খেটে বসে বসে খাবার মতো সুখ কল্পনা, আমাদের মতো আর কারও নেই। নইলে কি আর পুরো কলকাতা শহরটা, পশ্চিমবঙ্গটাকেই বেচে দিই! অবাঙালিদের যত টাকাই থাকুক না কেন, তাদের রক্তে বসে বসে কুঁজোর থেকে জল গড়িয়ে খেয়ে বাঁচব এমন লজ্জাকর অ্যামবিশান কারওই নেই।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, ফর এ চেঞ্জ, তুই এক্কেরে ঠিক কইছস।

তিতির বলল, ইংরেজি অক্ষরমালার আদ্যক্ষর ‘A’ অক্ষরটির উচ্চারণ এ নয়, আ। যদিও কোনও ইংরেজকে বলো বা যে কোনও শিক্ষিত পশ্চিমীকেও যে, আই অ্যাম এ গুড বয় তিনি হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন।

ভটকাইকে অপ্রতিভ করতে পারে, এমন শক্তি তিনলোকের কোনও লোকেই কেউ জন্মায়নি এখনও।

ভটকাই বলল, আমাদের বেঙ্গলি মিডিয়াম স্কুলে A-কে ‘আ’ বলে না, এই বলে। তোমাদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে কি কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই? খামতি নেই? আমরা বলি চানঘর, আমরা বলি পায়খানা আর ইংরেজিতে তোমাদের শেখায়, জেন্টস রুম’, ‘লেডিজ রুম’ ‘টয়লেট’, শাওয়ার’, ‘লু’, ‘ওয়াশরুম’, ‘থ্রোন’ ইত্যাদি। খেয়ে দেয়ে কাজ না থাকলে ওরকম বাহুল্য করা শোভা পায়। আমরা ভাই গরিব। আমাদের কথাবার্তাও সাদাসিধে। তা ছাড়া যে দেশে রাজা রানিরা এখনও আছেন, আর যুবরানি? যে দেশে লেডি ডায়নার মতো সুন্দরী যুবরানি, সে। দেশে ‘কমোড’কে কি ‘থ্রোন’ বলা উচিত? ব্যাড টেস্ট। আমাদের ওসব বালাই নেই। কমোড় বিদেশি জিনিস। কমোড ব্যবহার করলে আর্থরাইটিস হয়; গেঁটে বাত। আমাদের পায়খানা, ওড়িশা টাইপ। এই ভাল।

এইসব কি খুব গুড টেস্টের কথা হল, ভটকাই? তোর ভাঁড়ামো এবার বন্ধ কর। আমরা এখানে ভাঁড়ামো করতে আসিনি। সব ব্যাপারের একটা লিমিট আছে।

ভটকাই, সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে দুকান ধরে বসে পড়ল বারান্দাতেই। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মালী ও বেয়ারারা এমনকী দারোয়ানও দেখতে পেল।

এই জন্যেই বলে, লজ্জা, মান, ভয় তিন থাকতে নয়। বাকিটার মানে বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। ভটকাই-এর উন্নতি ঠেকিয়ে রাখে এমন কোনও শক্তিই নেই। বিশেষ করে, আমাদের দেশে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, চাকরি, রাজনীতি, ব্যবসা, যে পথই ও বেছে নিক না কেন, ওকে রুখনেওয়ালা কেউই নেই। চক্ষুলজ্জা, আত্মসম্মান, মেরুদণ্ডহীনতা উন্নতির পথের এই প্রতিবন্ধকতার সবকটিই ও জয় করেছে। মালিকের, সে যেই মালিক তোক না কেন, পা-চাটার কমপিটিশনে, গিনেস বুক অফ রেকর্ডস-এ নাম উঠতে পারে ওর।

ঋজুদা গম্ভীর হয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।

আমার খুব আনন্দ হল। ঋজুদাই আমাদের গার্জেন, লিডার। ঋজুদা অনেকক্ষণ পর, এই প্রথম ভটকাইকে স্নাবিং করল।

ভটকাই বকুনি খাওয়াতে আমি আর তিতির খুশি হয়েছিলাম।

আমরা বারান্দাতেই বসে রইলাম।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যোগেন ড্রাইভার টাটা-সিয়েরা নিয়ে চলে এল। বলল, চলেন স্যার। মোরে পৌঁছতে পৌঁছতেই রাত হইয়া যাইব গিয়া। সাতটার পরে যাইতেই দিব না পুলিশে। আর মিলিটারি। উদিকে যে বড়ই গণ্ডগোল।

দাঁড়াও, দাঁড়াও, খাওয়া দাওয়া করে আজকে রাজবাড়ি দেখব। কাল যাব এখন ভোর ভোর। তোমরা তাড়িয়ে দিতে চাও তো দেবে। আমাদের কাজ কী? কাজে তো এসেছেন বড় সাহেব।

তা তুমি ভাষাটা এখনও বদলাওনি দেখছি যোগেন বাবু।

আর বাবু ক্যান? ক্যান বদলামু? দ্যাশ বদলাইছি নেহরু সাহেবের গদিতে বসনের লোভে, বাধ্য হইয়া, ডেরেস (ড্রেস) পাল্টাইছি ফিলিমস্টার বা ডিরেক্টর হস্যু বইল্যা। আর ভাষাটাও যদি বদলাইয়া ফ্যালাই তো যোগেন কুণ্ডুর রইলডা কী?

ঠিক আছে ভাই। তুমিও একটু বিশ্রাম করো। আমরা খেয়েই বেরোব।

হঠাৎ ভটকাই বলল, আমার খুব পান্তুয়া খেতে ইচ্ছে করছে। এখানে পাওয়া যাবে?

ক্যান যাব না? আমারই মতো কত রিফিউজি বাঙালি আইস্যা ইখানে সেটল করছে। ঘোষেগো দোকান আছে। তাগো বাড়ি আছিল বরিশালে–ঝালকাটি। ফার্স্ট ক্লাস মিষ্টি বানায়। আমাগো দ্যাশও তো ছিল বরিশালে।

তা এই নাও। বলেই, ভটকাই একটি একশো টাকার নোট বার করল হিপ পকেট থেকে, আমাদের তাক লাগিয়ে দিয়ে। তারপর বলল, পান্তুয়া খেতে তুমি ভালবাস তো ভাই? যোগেন?

আমারও ফার্স্ট ফেভারিট। তা হলে আপনি পঞ্চাশ টাকার পান্তুয়াই নিয়ে আসুন। আর আমার পেটটা ব্যথা করছে–এই একটা ওষুধ। লিখে দিচ্ছি। বলেই, বুক পকেট থেকে একটা স্লিপ প্যাড বের করে, বুক পকেট থেকেই বলপয়েন্ট পেন বের করে, কী একটা ওষুধের নাম লিখল।

তিতির পাশ থেকে উঁকি মারল।

ভটকাই বলল, এই নিন ভাই, এখুনি নিয়ে আসুন! দোকান কি দূরে?

আবার আপনে–আজ্ঞা ক্যান, তুমি কইরাই বইলেন। কমফর্টেবল লাগে। দুকান দূর, মানে, এই মাইল পাঁচেক হইব। বাজারে।

তা চলুন, আমিও যাই। বাজারটা দেখে আসব। পেটুক মানুষ তো। বাগবাজারের রসগোল্লার নাম শুনেছেন? আমি সেই বাগবাজারের ছেলে তো। মিষ্টির যম।

বলেই, গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

ড্রাইভার যোগেন কুণ্ডু বললেন, আপনে চমচম খাইছেন, কখনও স্যার? বরিশালের ব্যারনের’ ম্যাঙ্গো সিরাপ দেওয়া শরবৎ?

না তো।

লাইফে কিছু মিস করছেন। আমার ওয়াইফ তো…

ওরা গাড়ির দিকে চলে গেল।

তিতির বলল, বরিশালের লোকেরা স্ত্রীকে সবসময় ওয়াইফ কেন বলে জানো রুদ্র?

আমি বললাম, বরিশাল জায়গাটাই তো দ্বীপের মতো। আগে সবকিছুই ইমপোর্ট করতে হত। এক ডাব নারকেল, ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ এবং অন্য নানা মাছ ও কুমির ছাড়া। প্রথম বউ হয়তো, ইংল্যান্ড থেকে ইমপোর্ট করেছিল। তপনমামাকে জিজ্ঞেস করব।

তপনমামাটা কে?

আরে সোনাকাকুর শালা তো, তপন রায়চৌধুরী, অক্সফোর্ডের।

সোনাকাকুটা কে?

হিস্টরিয়ান ডঃ সুরেন সেনের বড় ছেলে, শৈলেন সেন। ইনকাম ট্যাক্সের চিফ কমিশনার ছিলেন। বরিশালের মানুষদের ওরিজিনালিটি সম্বন্ধে তপনমামার নানা লেখা আছে। পড়লে, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে।

এমন সময় ঋজুদা ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

বলল, ভটকাই কোথায়?

গাড়ি নিয়ে পান্তুয়া আর কী ওষুধ কিনতে গেল।

পান্তুয়া? ওষুধ? বলেই ঋজুদা বলল, হুমম।

কাছে এসে চেয়ারে বসল একবার, তারপর বলল, চল বাগানে ওই চেরি। গাছটার নীচের বেঞ্চে গিয়ে বসি।

ভটকাই কোথায় যেতে পারে বলো তো?

তিতির শুধোল।

কোনও মতলবে গেছে। এমনি এমনি যায়নি। যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে, ও তোদের মধ্যে সবচেয়ে আগে অ্যাকটিভ হয়েছে।

অ্যাকটিভ? কী ব্যাপারে?

যে ব্যাপারে এসেছি এখানে, সেই ব্যাপারে। ও ফিরলেই বোঝা যাবে।

বাগানে পৌঁছে চেরি গাছটার তলার বেঞ্চে বসে, ঋজুদা বলল, এবারে বল, তোরা কে কী ভেবেছিস।

আমি বললাম, আসলে তো মোরেতে যেতে হবে। তাছাড়া খুনের এতদিন পরে গিয়ে ক্ল বিশেষ কি আর পাওয়া যাবে? কিন্তু আমার মনে হয়, আচ্চাও সিং-এর সঙ্গে দেখা করাটা সবচেয়ে জরুরি।

ঠিক।

আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। মিস্টার তম্বি সিং খুনের কিনারা করতে তোমাকে নিয়ে এসে, তোমাকে কেন ফ্রি-হ্যান্ড দিচ্ছেন না?

তিতির বলল, মনে হচ্ছে আমারও যে দিচ্ছেন না। নইলে, তোমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা জিজ্ঞেস না করে, আমাদের শহর থেকে দূরে এখানে এনে তোলার মানে কী হল?

আমার মনে হচ্ছে, ইচ্ছে করেই আমাদের এই শুটিং-লজে এনে ওঠানো হয়েছে, যাতে আমাদের ইচ্ছে মতো ঘোরাফেরা করতে না পারিবাজার, দোকান, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, পাঁচ মাইল দূরে।

ওই সব সম্বন্ধে খোঁজ করতেই গেছে ভটকাই। পান্তুয়াটা উপলক্ষ মাত্র। তবে, ওষুধের মধ্যে অন্য রহস্য আছে। কী হয়েছে ওর? কিছু কি সত্যিই হয়েছে?

না তো। আমরা তো জানি না। ড্রাইভার যোগেন কুণ্ডুকে দেখেই ওর পান্তুয়া খাবার শখ যেমন উথলে উঠল, তেমনি ওষুধ খাওয়ারও।

যাকগে, আসুক ও। তারপরই জানা যাবে। এখন বল, তোরা দুজনে আর কী ভাবলি।

তম্বি সিং লোকটা হয়তো সত্যিই মিথ্যেবাদী। ভটকাই-এর ভাষাতে, জালি।

কেন?

সুইজারল্যান্ডের বন্ধুর কথা বলছিল না? যাঁরাই সুইজারল্যান্ডে বা ইউরোপের কোথাওই গেছেন, তাঁরাই জানেন যে, SWITZERLAND-এর উচ্চারণটা সুইটজারল্যান্ড–যদিও ‘ট’-এর উচ্চারণ খুব সংক্ষিপ্ত। কেউই বলে না, সুইজারল্যান্ড। কিন্তু উনি বারবার বলছিলেন।

তিতির বলল।

তা ছাড়া ভটকাই যখন জিজ্ঞেস করল তম্বি সিংকে যে, আপনার বন্ধু সুইস-ফ্রেঞ্চ না সুইস-জার্মান তখন তম্বি সিং ভ্যাবলারামের মতো ভটকাই-এর প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে বলল, সুইস-ফ্রেন্ড।

আমি বললাম।

ঋজুদা মনোযোগ সহকারে পাইপ ধরাচ্ছিল। তামাক ভরা সেরে বলল, এসব ছাড়াও অনেক মিথ্যে আছে। প্রথমত, তম্বি অক্সফোর্ডে পড়েনইনি। কারণ, যাঁরাই অক্সফোর্ডে পড়েছেন বা না পড়লেও অক্সফোর্ডে বেড়াতে গেছেন, তাঁরাই জানেন যে, অক্সফোর্ড, যাদবপুর বা কলকাতা কিংবা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোনও একটি ব্যাপার নয় যে, নিজস্ব বাড়ি, নিজস্ব ক্যাম্পাস, নিজস্ব হস্টেল নিয়েই তা ‘ স্বয়ংসম্পূর্ণ। অগণ্য কলেজ আছে, অক্সফোর্ডে। আলাদা আলাদা। সব মিলিয়েই, অক্সফোর্ড। মি. সিং অক্সফোর্ডে পড়েছেন অথচ কলেজের নাম না বলে শুধুই বারে বারে বলছেন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। তা ছাড়া ওঁর ইংরেজি উচ্চারণের সঙ্গে অক্সোনিয়ান অ্যাকসেন্টের বিন্দুবিসর্গও মিল নেই। যদিও এখন অক্সফোর্ডেও অ্যামেরিকান অ্যাকসেন্ট ঢুকে গেছে।

তিতির বলল, সানাহানবি কোথায় পড়েছে? স্টেটস-এর হার্ভার্ড-এ? তুমি তো ওর সঙ্গে এলে।

মুণ্ডু। অ্যামেরিকান কায়দা-কানুন তো স্টার টিভির বিজ্ঞাপন আর বোলড এন্ড দ্য বিউটিফুল সিরিয়াল দেখলেই যে কেউ শিখে নিতে পারে। আমার মনে হয়, ও পড়েছে শিলং-এর ভাল কোনও কনভেন্টে। তারপরে, শিলং-এরই কোনও কলেজে। ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করিনি, কারণ জলজ্যান্ত মিথ্যে শুনলে মাথায় রক্ত চড়ে যায়। বয়স তো হচ্ছে অথচ গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে মাথায় রক্ত চড়ানো আর আত্মহত্যা করা, একই কথা।

ঋজুদা বলল।

তোমার কী মনে হয় ওদের সম্বন্ধে? ঋজুদা?

মনে তো অনেক কিছুই হয়। তবে আচ্চাও সিংকে দেখা দরকার, কথা বলা দরকার, এক্ষুনি মোরে যাওয়া দরকার। কাঙ্গপোকপিতে গিয়েও সানাহানবির কুকুর ব্রিডিং-এর ধরন-ধারণ এবং তার মধ্যে মিথ্যে আছে কি না তাও জানা দরকার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গেও কথা বলা খুব জরুরি। এই খুন নিয়ে পুরো অঞ্চলেই শোরগোল পড়ে গেছে। আচ্চাও সিং-এর ওপরেও তো তম্বির সন্দেহ। সেই তো আমাদের প্রথম কুয়ারি। তবে, একটা জিনিস আমাকে খুব ধাক্কা দিচ্ছে, তা এদের স্বচ্ছলতা, অ্যাফ্লুয়েন্স। মণিপুরের মতো ছোট্ট একটি রাজ্যের এবং তাও রাজত্ব চলে যাবার পরও ইবোহাল সিং-এর এত স্বচ্ছলতা আসে কোথা থেকে? এমন স্বচ্ছলতা!

ঠিক। আমারও তাই মনে হচ্ছিল।

মিস্টার তম্বি হঠাৎ বড়লোক হয়েছে যে, তা তাঁর দিকে একনজরে তাকালেই বোঝা যায়। উনি আদতে হয়তো বড়লোক ননও। আপস্টার্ট। সব দিক দিয়েই।

কেন? আমি আর তিতির একসঙ্গে বললাম।

সেই রাতে যে পোশাকে আমার কাছে এসেছিলেন, সেই পোশাকে তিনটি খুঁত ছিল।

কী কী?

প্রথমত, তার জুতোটা কলকাতার চিনে দোকানের। এবং সদ্য কেনা। হয়তো সেদিনই সকালে। তার টুপিটা মাথা থেকে খোলার সময়ই আমি লক্ষ করেছিলাম লন্ডনের বিখ্যাত শপিং-সেন্টার অক্সফোর্ড স্ট্রিটের একটি টুপির দোকান থেকে কেনা এবং টুপিটাও ওর নিজের নয়। কমপক্ষে দু সাইজ বড়। এবং বহুব্যবহৃত। সম্ভবত মৃত ইবোহাল সিং-এর। তাঁর ট্রাউজার পর্যন্ত মৃত্যুর পরে বেহাত করেছেন কি না কে জানে। এ ছাড়াও, অনেক সাধারণ, গরিব পাহাড়ি মানুষদের মতো তম্বি সিং পাইপ খান। ডানহিল বা মিরশ্যাম বা পিটারসন বা অন্য কোনও ব্রান্ডের পাইপ নয়। স্থানীয় কাঠ থেকে বানানো, তামা বা পেতলের তাপ্পি মারা পাইপ, যা নানা জাতের দিশি তামাক এবং অনেক সময়ে তার মধ্যে আফিং বা অন্য কোনও মাদকের চূর্ণ মিশিয়ে এঁরা খান। ওঁর লাইটারটা উনি যেভাবে ধরে পলমল সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছিলেন, তা অনেক বছর পাইপ খাওয়া যাঁদের অভ্যেস, তাঁদের পক্ষেই মানানসই। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার, উনি যদি সিগারেট স্মোকারই হতেন এবং যত ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছিলেন তাতে ওর তর্জনী ও মধ্যমাতে একটু হলদেটে ছোপ লাগতই। তা ছিল না, ওঁর এই দুটি আঙ্গুলে। আরও একটা কথা, যারা ওঁর মতো চেইন-স্মোকার তাঁরা পলমল এর মতো দামি এবং বিদেশি রোস্টেড সিগারেট অমন ক্যাজুয়ালি আধখানা খেয়েই অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতেন না। এসবই ওঁর বড়লোকির শো। এগজিবিশনিজম্। আসলে উনি বড়লোক নন। আসল বড়লোক ছিলেন ইবোহাল সিং। অথচ, তাঁর বড়লোকিরও কোনও ব্যাখ্যা এখনও আমরা পাইনি। এই নির্জন বাংলো থেকে চলে যেতে না পারলে কাজ কিছুই এগোবে না। ইম্ফল আমার চেনা জায়গা। চেনাজানা মানুষও আছেন একাধিক। আমার যাতে অসুবিধে হয় কাজের, সেই জন্যই হয়তো সার্কিট হাউসে না রেখে এইখানে উঠিয়েছে আমাদের। যাকগে, টেলিফোনটা কোথায় আছে? তোরা কি দেখেছিস?

হ্যাঁ। ড্রয়িংরুমের বড় সোফার ডান পাশে আছে।

চল তবে। টেলিফোন ডিরেক্টরি কি আছে? দেখেছিস?

না, সেটা তা দেখলাম না।

বাংলোর দিকে যেতে যেতেই ঋজুদা বলল, ইচ্ছে করেই হয়তো সরিয়ে রেখেছে।

বারান্দাতে উঠতেই একজন বেয়ারা এসে সেলাম জানাল। তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, টেলিফোন ডিরেক্টরি নেই।

কোথায় গেল?

তিতির শুধোল।

গতকালই মিসিবাবা নিয়ে গেছেন বদলে নতুন ডিরেক্টরি আনবেন বলে।

ও। তা তোমার সাহেবের ফোন নাম্বার কত?

কোন সাহেবের?

তম্বি সিং-এর।

ও। তম্বি সিং-এর? লেখা আছে। কথা বলবেন স্যার? ফোন লাগিয়ে দিচ্ছি।

এখান থেকে তোমার পুরনো মনিব ইবোহাল সিং সাহেবের মোরের বাড়িতে কথা বলা যাবে?

পুরনো মনিব কেন স্যার? উনিই তো আসল মনিব, আমাদের। মিসিবাবাও আমাদের মনিব নন। উনি বলেছেন, নতুন মনিব যিনি হবেন, তাঁকে অনুরোধ করবেন আমাদের রাখতে। কিন্তু টাকা আসবে কোত্থেকে? সাহেবই তো চলে গেলেন। আমাদের মাইনে দেবার সামর্থ্য, নতুন মনিব যেই হোন না কেন, তাঁর থাকবে কি? সাহেবের মতো মনিবই বা পাব কোত্থেকে? নতুন মনিব কে হবেন, তা তো কেউই জানে না এখনও।

আমাদের সকলের মনেই উৎকণ্ঠা এখন। সাহেব কাকে যে তাঁর সম্পত্তি দিয়ে গেছেন তা যতদিন না জানা যাচ্ছে…

তাই?

হ্যাঁ স্যার।

এই যোগেন ড্রাইভারকে কি নতুন রাখা হয়েছে?

তা তো জানি না স্যার।

টাটা-সিয়েরা গাড়িটা কতদিনের?

ওটা তো আমাদের সাহেবের গাড়ি নয়?

তবে কার গাড়ি?

জানি না। ওই গাড়ি ও ড্রাইভারকে আজই প্রথম দেখলাম।

তাই না কি? ঋজুদা অবাক গলাতে বলল।

এখন তোমার সাহেবের মোরের বাংলোতে কে থাকে?

আমরা ঠিক জানি না। শুনেছি, সাহেবের বহু পুরনো খাস বেয়ারা আছে উ মঙ্গ। বার্মিজ। আর কারা থাকে, জানি না।

ঋজুদা সোফাটাতে বসে ডায়াল ঘুরিয়ে একটা নাম্বার চাইল। এখনও এখানে বোধহয় ম্যানুয়ালই আছে টেলিফোনে। অন্তত এনকোয়ারিতে, তাই আছে। ভাবলাম আমি।

ঋজুদার চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে গেল।

বলল, চিনতে পারছেন গলা?

তারপর বলল, ঋজু বোস।

তারপর খুব জোরে হেসে উঠল ঋজুদা। বলল, একটা কাজে এসেছি। উঠেছি নাগাল্যান্ডের রাস্তাতে দ্য রিট্রিট-এ।

ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন তিনি একসঙ্গে নিশ্চয়ই অনেক কথা বললেন।

ঋজুদা হেসে বলল, বিকেলে আপনার গাড়ি নিয়ে আসবেন, ঠিক চারটেতে। তারপর আপনার সঙ্গে বেরিয়ে কথা হবে। আপনার নিজের কোনও গাড়ি নিয়ে আসবেন না। আচ্ছা, একটা কাজ করবেন বরং। একটা ভাড়া করা গাড়ি পাঠাবেন। ড্রাইভার যেন আপনার বাড়ির পাড়াটা চেনে। বাড়ি চেনার দরকার নেই। হ্যাঁ। না। আপনার ওখানে গিয়েই বলল সব। ওকে। ওক্কে। সি য়ু। ও আর একটা কথা। ভাড়া গাড়ির ড্রাইভার যেন আপনার নামও না জানে। দেখবেন। আপনার কোনও লোককে দিয়ে ভাড়া করাবেন। ডিসক্রিট রাখবেন ব্যাপারটা।

কথাবার্তা সব ইংরেজিতেই হচ্ছিল এবং বেয়ারারা ধারে কাছে ছিল না।

ফোন শেষ হতে না হতেই শ্রীমান ভটকাই এসে হাজির, মস্ত এক হাঁড়ি নিয়ে।

ঘরে ঢুকেই বলল, ইংরেজিতে, দিস হাঁড়ি শ্যাল নট বি হ্যাঁন্ডেড ওভার টু এনি ওয়ান। ইট নিডস সাম ডক্টরিং।

ঋজুদার চোখে হাসি খেলে গেল। আমাদের দিকে চেয়ে যেন নীরবে বলল, কী রে? কী বলেছিলাম তোদের?

ভটকাইকে বলল, কী যেন নাম ড্রাইভারের?

যোগেন কুণ্ডু।

হ্যাঁ, ওকে গিয়ে বলে দে যে, তোরা ঠিক সাড়ে তিনটের সময়ে বেরোবি। রাজবাড়ি দেখবি। ইম্ফলের সব বাজার দেখবি।

তারপর বলল, এখন কেনার দরকার নেই। তবে, ফিরে যাবার আগের দিন, তোদের একটা করে লাইঝাম্পি কিনে দেব। কলকাতার শীতের পক্ষে আইডিয়াল। নরমও। কিন্তু, তোরা থংগল বাজারের দিকে যাবি না আজকে।

ড্রাইভারকে সাড়ে তিনটের সময় বেরোব, একথা বলব কেন?

ভটকাই বলল।

আরও আগে যেতে চাস তোরা?

হ্যাঁ। এখানে বসে থেকে কী করব?

তবে তাই যা। তবে খেয়ে দেয়ে বেরোবার সময় সকলকেই বলে যাবি যে, আমার শরীরটা খারাপ। আমি বিশ্রাম নেব।

কী হয়েছে যদি জিজ্ঞেস করে?

ভটকাই শুধোল।

ঋজুদা জবাব দিল না।

পৈটিক গোলমাল বলব তো!

নিজেই বলল, ভটকাই।

ঋজুদা হাসল।

তিতির বলল, আবার পোয়েটিক গোলমাল বোলো না।

খাবার লাগাতে বলল। কী রাঁধল কে জানে! কিছু তো জিজ্ঞেসও করল না। এ আচ্ছা রাজা-রাজকুমারীর পাল্লায় পড়লাম যা হোক!

বলেই বলল, তোরা যে যাবি গাড়ি নিয়ে, তা তম্বি সিং আসবেন কখন?

যাবার আগে ফোন করে দিবি, যে তোরা ডিনারের আগে ফিরবি। উনি যদি আসেন তো ওই সময়েই যেন আসেন। তার আগে আসার দরকার নেই। আমি যে আলাদা বেরোব, তাও বলার দরকার নেই।

কথা শেষ না হবার আগেই, ওঁরই ফোন এল।

ঋজুদা বলল, এই তো লাঞ্চ লাগাতে বলেছি। লাঞ্চের পরই ওদের নিয়ে শহরে বেরোব। কাল কখন ‘মোরে’ রওয়ানা হওয়া যেতে পারে? কী বলছেন? ব্রেকফাস্টের পরে? দেরি হয়ে যাবে না? কারণ, ওখানে গিয়ে তো…। ও হবে না বলেছেন? তা হলে তাই হবে। আপনি কি রাতে আসছেন? চেষ্টা করবেন? ঠিক আছে। না, না। ফার্স্ট ক্লাস বন্দোবস্ত। কোনওই অসুবিধে নেই।

এখানে মাছের একটু অসুবিধে। পুকুরের মাছ। তা ছাড়া এমনিতে বৈষ্ণব জায়গা। তবে নাগা, কুকি আরও বাইশটি উপজাতিরও বাস মণিপুরে। চারিদিকেই তো পাহাড়। মিজোরাম, নাগা হিলস, বার্মার পাহাড়, চীন, আগরতলা; মেঘালয় পাহাড়ই পাহাড়। মণিপুরও তো সবই প্রায় পাহাড়, মধ্যের এই উপত্যকা ছাড়া। অধিকাংশই খ্রিস্টান। তাঁরা তো সবই খান। সাপ, ব্যাঙ, কুকুর, বাঘও খান বলে শুনেছিলাম, কোহিমাতে যখন যাই। সত্যি মিথ্যে বলতে পারব না। তবে মিথ্যে বলার কোনও কারণ ছিল না, যিনি বলেছিলেন তাঁর।

মুরগি, সর্ষে দিয়ে রান্না; মাটন-বিরিয়ানি, কোর্মা, দারুণ অড়হরের ডাল, বেগুন ভাজা, কুড়মুড়ে করে আলু ভাজা, খাঁটি গাওয়া ঘি, মিহি চাল, বলল, এখানকার স্পেশ্যালিটি; পাহাড়ি নদীতে ধরা কুচো মাছের টক। সঙ্গে আনা কালাকাঁদ ছিল। তারপর ভটকাই-এর আনা পান্তুয়া তো অবশ্যই। জমিয়ে খাওয়া হলে, ভটকাই একজন বেয়ারাকে বলল, পান্তুয়ার হাঁড়িটা ফ্রিজ থেকে নিয়ে এসো তো বাবা। আমার আবার খাওয়ার আধঘন্টাটাক পরে গোটা চারেক মিষ্টি না খেলে হয় না। খাওয়ার পরে মিষ্টি খাওয়াটা উত্তর কলকাতার ট্র্যাডিশান। বাঙালরা এসবের খোঁজ রাখে না।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বলল, আমি একটু ঘরে গিয়ে ইজি-চেয়ারে গড়িয়ে নেব। বুদ্ধির গোড়াতে ধোঁয়া দেওয়া দরকার। তা হলে, তোরা সময়মতোই বেরোস।

যাওয়ার আগে দেখা করব, তোমার সঙ্গে।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, তুমি রেস্ট করো, তিতির। আমরা আধঘণ্টা পরে বেরোব।

তারপর আমার আর ভটকাই-এর জন্য যে ঘর বরাদ্দ ছিল সেই ঘরের দরজা বন্ধ করে ভটকাই পকেট থেকে ডালকোলাক্সের পাতা বের করল। দু পাতা।

কী করবি?

দ্যাখই না। বহরমপুরের হনুমানের দলকে ঘায়েল করেছিলাম এই দিয়ে, তার টিকটিকি, যোগেন কুণ্ডু। বঙ্গসন্তান। বজরঙ্গবলী কাত হয়ে গেল, আর এ তো ফিনফিনে বঙ্গজ-ফড়িং।

করবিটা কী?

গোটা কুড়ি বড়ি হবে পার্গেটিভ-এর। বেসিন থেকে ভাল করে হাত ধুয়ে এসে টুথপিক এর উল্টোদিক দিয়ে পান্তুয়াগুলো ফুটো করে তার মধ্যে দুটো করে ডালকোলাক্সের বড়ি ঠেলে ঠেলে ভরে দিতে লাগল। দশটা পান্তুয়া ডকটরড হয়ে গেলে সেগুলো প্লেটে রাখল। হাঁড়িটা এনে বলল, নে! তোরও চারটে খেতে হবে। আমি তো চারটে খাবই।

ভরা পেটে! আমি মরে যাব ভটকাই।

তুই এত সহজে মরবি? কাঙ্গপোকপির লেডি ডাই-এর সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত না করে কারোই মরা চলবে না। খা, খা! বলেই, অত বড় বড় পান্তুয়া একটা একটা করে আমার মুখে পুরে দিতে লাগল। যেন, দিদি শাশুড়ি এসেছেন আমার!

যাই হোক, আটটা দুজনে মিলে, ভটকাই-এর ভাষাতে সাঁটাবার পর, বাকি দশটা, অনেকখানি রসে ছেড়ে দেওয়া হল, হাঁড়িতে। হাঁড়িটা একটু নাড়িয়ে ভটকাই রসটা চারিয়ে দিল। পান্তুয়াগুলো খুশিতে জড়ামরি করে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

ভটকাই বলল, যোগেন কুণ্ডু মহাপেটুক আছে। মিষ্টির দোকানেই টেস্ট নিয়েছি। বাঙাল মাত্রই গুচ্ছের খায় তোর মতো। এই পান্তুয়া যদি গোটা দুয়েকও খায় তবেই আর কালকে ডিউটিতে আসতে পারবে না। গোটা চারেক খেলে তো দুদিন কাত। মানে, আটটা ট্যাবলেট।

করছিস কী? ওর বাড়িতে যদি বাচ্চা কাচ্চা থাকে?

নেই রে নেই। ভটকাইচন্দ্র কি শিশুবধ করে মহাপাতক হবে? সব খবর নিয়েছি।

একটু অসোয়াস্তিতে পড়বে এই আর কী।

অসোয়াস্তি কী? বল, অস্বস্তি।

থাম তো তুই। একে বলে সমীকরণ। আমাকে বেশি বাংলা শেখাস না। কৃষ্ণ থেকে কেষ্ট যেমন, বুয়েচিস।

তিতির সময়মতো তৈরি হয়ে এল। শাড়িটা ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পরেছে। আমরাও বেরোলাম। কোমরে আমার যন্ত্রটা নিয়ে নিলাম। গুলিভরা একটা ম্যাগাজিন। অন্যটা হিপপকেটে।

ঋজুদাকে বলে গেলাম, যাবার সময়ে।

ঋজুদা বলল, ড্রাইভারের কী যেন নাম? বলিস আমার পেটে ব্যথা।

ঠিক আছে। নাম যোগেন কুণ্ডু।

ভটকাই সেরিমনিয়াসলি পান্তুয়ার হাঁড়িটা যোগেন বাবুকে দিয়ে বলল, যোগেন দাদা। রাতে তুমি ও বৌদি এগুলো শেষ করে দিও। এগুলোও এই ব্যাটা রুদ্র সেঁটে দিচ্ছিল, অনেক কষ্টে বাঁচিয়েছি। সত্যি বলছি, পুরো ইন্ডিয়া ঘুরেছি আমি। কিন্তু এক মুসৌরি আর বাংলাদেশের বরিশাল ছাড়া এমন মিষ্টি আর খাইনি।

বরিশালে গেছেন না কি, আপনি? কন কী?

উত্তেজিত হয়ে যোগেন বলল।

কথা ঘুরিয়ে ভটকাই বলল, আমার বাবা টুরিজম-এর অফিসার ছিলেন তো। সব জায়গায় ফ্যামিলিয়ারাইজেশান ট্যুর করতে হত।

সেটা কী?

মানে, সড়গড় হবার জন্য। ফ্যামিলিয়ারিটি শব্দটার মানে বোঝেন তো? ইংরেজি শব্দ।

না বোঝনোর কী আছে? ফ্যামিলি আর ম্যালোরি। মধ্যপদলোপী শব্দ। আমিও বুঝি না, এমন জিনিসই নাই মশয়!

তিতির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পান্তুয়ার হাঁড়িটা সযত্নে গ্লাভস বক্স-এ ঢুকিয়ে শ্যাময় লেদার এর হলুদ কাঁচ মোছা কাপড়-টাপড় দিয়ে টাইট করে বসিয়ে, তিতিরকে দরজা খুলে বসালেন, যোগেনবাবু। তারপর আমাদের উঠতে বলে বললেন, কয়েন এইবার। যামু কই?

যা যা আছে দেখবার শহরে। সব জায়গাতেই যাব। তবে সাড়ে আটটার মধ্যেই ফিরতে হবে।

তবে প্রথমে চলেন, আই. এন. এ. মেমোরিয়ালে। ন্যাতাজি সুভাষ বোসের আই. এন. এ.র লগে ব্রিটিশদের যুদ্ধ হইছিল হেইখানে। গুলির দাগও এহনও আছে টিনের চালে। এই রাস্তায় সোজা একটু যাইয়াই বাঁদিকে ঘুরুম। মৈরাঙ্গেই আছে তা। সিখানেই তো থৈবী–খাম্বারও জায়গা। থৈবী আছিল রাজকুমারী, আমাগো সানাহানবি দেবীর মতো সুন্দরী। আর খাম্বা আছিল অর্ডিনারি। আমাগো মতো বদখত্ আর কী! কিন্তু মহা ফাইটার। অমিতাভ বচ্চনের থিক্যাও বড় ফাইটার। বীর। দুজনের পেরেম হইয়া গেল। তা রাজকুমারীর ইচ্ছা হইলে কি অইব? রাজা দিলে তো বিয়া?

তারপর?

ভটকাই শুধোল।

তারপর আর কী! যা হওনের তাই হইল।

কী?

আরে মশয়, ভাল লাভ স্টোরির এন্ডে কি বিয়া হয়, নাকি? না কোনদিন হইছে, তাই কয়েন? লায়লা-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, রাধাকৃষ্ণ? পেরেম যদি সাচ্চা হয়, বুঝলেন মশয়, তবে বিয়া অইতেই পারে না। বিয়া যেই অইব’–বিয়ার ফুল ফুটব, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের ফুল ফাইটব।

ফাটবে মানে?

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম।

ফাইটব মানে, ফাইট করনের কথা কই নাই; ফাইট্যা যাইব গিয়া। ফট্টাস কইর‍্যা ফাইট্যা যাইব। আমি নিজে বিয়া কইর‍্যা দেখছি না! অ্যারে কয় ভুক্তভুগী।

এবারে গাড়ি স্টার্ট করলে হয় না?

তিতির বলল।

হ্যাঁ। হ্যাঁ। সরি, আমি বড় বেশি কথা কই। এই অইল আমার পেধান দোষ। আমার ওয়াইফে হক্কল সময়ই কয় আমারে।

.

থাঙ্গজম সিং লংজুর সঙ্গে ঋজু বোসের আলাপ, আশির দশকের শেষেশেষি থেকে। থংগল বাজারের কমলা টাইওয়ালার শালা শ্যামানন্দ সাঙ্গেনারিয়ার একটা রহস্য সমাধান করে দিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীর বহু লক্ষ টাকার গয়না; হিরেই বেশি, চুরি যাওয়াতে ঋজু বোসকে এনেছিল ইম্ফলে। তখন ঋজু বোসের এত নামডাকও ছিল না। তখন এই থাঙ্গজম সিং লংজু এবং মিস্টার পুরকায়স্থ বলে এক ভদ্রলোকের সাহায্যে এবং মোরে এবং তামুর পুলিশদেরও সাহায্যে সেই গয়নার প্রায় ষাট অংশ উদ্ধার হয়েছিল। তখন থাঙ্গজম সিং-এর অবস্থা ছিল অতি সাধারণ। মোরেতে একটি কাঠচেরাই এর কল ছিল। সামান্য ঠিকাদারিও করতেন।

সেই থেকে ইম্ফলের মানুষদের খুব ভক্তি ঋজু বোসের ওপর এই কারণে যে, চুরি যাওয়া সম্পত্তির মূল্য যাই হোক না কেন, ঋজু বোস শুধু তার যা ‘ফি’ তাই চেয়েছিল। প্লাস খরচাখরচ। তার বেশি এক পয়সাও চায়ওনি, নেয়ওনি। থাঙ্গজম সিং লংজু ছিল ঋজু বোসের এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বন্ধু, অনীক সেনের মক্কেল। সেই সুবাদে কলকাতাতেই আলাপ হয়। তারপর যখন কমলার কাজে ইম্ফলে আসেন, তখন সেই আলাপ আরও গম্ভীর হয়।

ঋজু বোস পৌনে চারটেতে বেরিয়েছিলেন, বাংলো থেকে। গাড়িটা যতই এগোতে লাগল, ততই নানা কথা মনে হতে লাগল ঋজু বোসের। নানা চিন্তা। কারণ, তম্বি সিং-এর কথাবার্তা শুনে, তার মুখে ইবোহাল সিং-এর বৈভবের কথা শুনে, তার মৈরাঙ্গ রোডের দ্য রিট্রিট বাংলোতে থেকে এবং সানাহাবিকে দেখেও তাদের জীবনযাত্রার একটা ধারণা করে নিয়ে ঋজু বোস নিশ্চিত যে, মণিপুরের মতো ছোট্ট জায়গাতে এমন কিছু ব্যবসা বা শিল্প এদের থাকতেই পারে না যার দ্বারা এমন ভাবে, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কাদের মতোই স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারেন ওঁরা। রাজা লাইহারোবাও তো মারা গেছেন কবে। প্রিভি পাস পেলেও এবং আদৌ পেলে কতই বা পেতেন। তা থেকে… কোনওই সন্দেহই নেই যে, ইবোহাল সিংও ব্যক্তি হিসাবে ভাল হলেও, যা শুনেছেন তাঁর কর্মচারীদের কাছ থেকে; তাঁর রোজগারটা হয়তো ছিল মুখ্যত চোরাচালান থেকেই। কোনও কর্মচারীই, কর্মচারী কেন, স্ত্রীসুদ্ধ পরিবারের মানুষেরাও মালিক বা গৃহস্বামীর রোজগারের সূত্র নিয়ে মাথা ঘামান না। যে রোজগার করে আনে, সেই ভগবান। টাকার চেয়ে বড় মান-সম্মান-ভালবাসা-প্রতিপত্তির ধারক বাহক, আজ আর কিছুই নেই।

অমন সুন্দর বাংলো ও প্রাসাদোপম বাড়ি থাকতেও উনি মোরেতে গিয়ে পড়ে থাকতেন না, যদি-না মোরে বর্মার সীমান্তে হত। এই অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ-নেপালেরই মতো চোরাচালান এত জলভাত যে, এই সীমান্তের মানুষ ও পুলিশ অবহেলায় এপার ওপার হয়। চোরাচালানকারীদের স্বর্গরাজ্য এ। রাতের অন্ধকারে মালবাহকেরা, যাদের অধিকাংশই মেয়ে; ইলেকট্রনিক গুডস, মাদক দ্রব্য এবং অন্যান্য কম ভারী অথচ দামি জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যায়, চোরা পথে। আর ভারী জিনিস তো দু পক্ষেরই চেকপোস্ট পেরিয়ে দুপক্ষের যোগসাজশেই ট্রাকে করেই পারাপার হয়ে যায়। সরকার সবই জানেন। যখন আর. ডি. এক্স-এর বিস্ফোরণে অগণ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যায়, যখন মারাত্মক এ. কে. ফর্টি সেভেনের গুলিতে ঝাঁঝরা হয় মহিলা ও শিশুর শরীর; তখন সব সীমান্তের নেতারাই একটু নড়েচড়ে বসেন মাত্র।

থাঙ্গজম সিং লংজুর বাড়ির বেশ কিছুটা দূরেই গাড়িটা ছেড়ে দিলেন, ঋজু বোস। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, অপেক্ষা করবে কি না? ঋজু তাকে মানা করে, চলে যেতে বলে, জিজ্ঞেস করলেন, ভাড়া কত?

ভাড়া তো দিয়ে দিয়েছে।

কে দিল?

নাম তো জানি না।

ও, তাহলে রণবীর শর্মাই দিয়েছে। ইচ্ছে করেই একটা বানানো নাম, ড্রাইভারকে শুনিয়ে বললেন উনি। ইসস, এত করে মানা করলাম।

তা হবে। ড্রাইভার বলল।

তম্বি সিং-এর আমন্ত্রণ পাবার পর থেকেই এটা বুঝে ছিলেন ঋজু বোস যে, এই কেসটা সোজা কেস নয়। কেউ বা কারা কলকাতা থেকে বিখ্যাত গোয়েন্দা এনে তাঁদের চক্রান্তটা যে চক্রান্ত নয়, এটাই প্রমাণ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এবং এটা বুঝতে পারার পর থেকেই, চক্রান্তকারীদের মুখোশ খোলার জন্য জেদ চেপে গেছে ঋজু বোসের।

ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল কি না, তা দেখে নিয়ে ঋজু খুব আস্তে আস্তে হেঁটে থাঙ্গজ সিং-এর খুব উঁচু কম্পাউন্ডওয়ালা, বাগানওয়ালা বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়াতেই উর্দিপরা দারোয়ান গেট খুলল। থাঙ্গজম সিং-এর অবস্থার উন্নতি এই ক’বছরে এতখানি হয়েছে দেখে অবাক হলেন ঋজু বোস। খুবই আনন্দের কথা।

থাঙ্গজম সিং বাইরে এসে আপ্যায়ন করলেন। পাশে, একজন গুণ্ডামতো লোক। তাঁর পুত্রবধূও এলেন। পুত্র বাড়িতে ছিলেন না। মনে হয়, সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে।

ঋজু বললেন, আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল। একটু প্রাইভেসির দরকার।

চলুন। চলুন। ভিতরে চলুন। নাকি, ছাদে গিয়ে বসবেন?

তাই চলুন।

কী খাবেন?

কিছু না। এক কাপ চা, দুধ চিনি ছাড়া।

সেই লোকটাও পায়ে পায়ে ওপরে এসেছিল। আলাপ করিয়ে দিলেন থাঙ্গজম সিং। বললেন, এর নাম হাঞ্জো সিং।

হ্যান্ডশেক করে ঋজু বোস বললেন, ওঃ, আচ্ছা।

হ্যাঞ্জোকেই চায়ের কথা বলে, নীচে চলে যেতে বলে, মোটা কুশন লাগানো চেয়ারে বসিয়ে, তারপর নিজে বসে বললেন, বলুন কী করতে পারি আপনার জন্যে? ও, তার আগে বলি, আমার ওয়াঙ্গোইর এগ্রিকালচারাল ফার্ম থেকে আনারস এসেছে আজ। গোটা কয়েক দিয়ে দেব যাবার সময়ে। কলকাতা নিয়ে যাবেন। কালই কি চলে যাচ্ছেন? এই শেষ ক্রপ। এ বছরে আর হবে না।

কবে যাচ্ছি, তা আমি নিজেই জানি না। তবে, সঙ্গে আমার সৈন্যদল আছে যে। আপনার আনারসদের সসম্মানে এখানেই শেষ করবে তারা। কলকাতা অবধি পৌঁছবে বলে মনে হয় না।

বলেই বলল, আপনি ইবোহাল সিংকে চেনেন?

মণিপুরে ইবোহাল সিংকে কে না চেনে! দ্য মোস্ট প্রিন্সলি পার্সন উইদাউট বিয়িং আ রিয়্যাল প্রিন্স। হাসতে হাসতে বললেন, থাঙ্গজম সি।

রিয়্যাল প্রিন্স নন কেন?

রাজপরিবারের কেউই তো ওঁকে আত্মীয় বলে মানেন না। সেলফ-অ্যাক্লেইমড প্রিন্স। প্রিন্স লাইহারোবা নিজেই যে প্রিন্স ছিলেন, তারই কোনও প্রমাণ নেই।

বলেই বললেন, ও বুঝেছি। আপনি ইবোহাল সিং-এর মার্ডারের তদন্তেই এসেছেন। সত্যি! এই সোজা কথাটা আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। তা হলে তো এবারে খুনির আর নিস্তার নেই।

কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে ঋজু বোস বললেন, মানুষ কেমন ছিলেন? উনি?

কে? ইবোহাল সিং? চমৎকার। মানুষ খারাপ, ইবোহাল সম্বন্ধে কেউই বলবেন না এ কথা। কিন্তু যে পরিমাণ টাকা তিনি দুহাতে খরচ করতেন সে টাকাটা যে আসত কোত্থেকে, সেও একটা রহস্য।

আপনি তম্বি সিংকে চেনেন?

হঃ।

হাসলেন, থাঙ্গজম সিং। ইবোহালেরই মতন, তম্বিকে চেনে না এমন মানুষও ইম্ফলে একজনও নেই।

তিনি কেমন মানুষ?

ওটা একটা মানুষই নয়। ওটা একটা সাঙ্গাই। সারাজীবন ফুমডির ওপরে নেচে বেড়াল।

তাই? বলেই হেসে উঠলেন ঋজু বোস।

হ্যাঁ। ওটা একটা থার্ডরেট মোসাহেব, একটা বাফুন, ক্লাউন একটা।

করেন কী? জীবিকাটা কী?

মোসাহেবি, আবার কী? চিরদিন ওই জীবিকাই। একটা আত্মসম্মানজ্ঞানহীন জানোয়ার।

এই বাক্যটি উচ্চারিত হবার পরে থাঙ্গজম সিং এবং ঋজু বোস দুজনেই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ঋজু বোস বললেন, মোসাহেবি করে এত টাকা? কাঙ্গপোকপিতে তো শুনেছি তাঁর মেয়ে সানাহানবির ফার্ম আছে। সেখানে কুকুর ব্রিড করান উনি। সালুকি কুকুরও ব্রিড করেন। সালুকি কুকুর সম্বন্ধে কি কিছু জানেন আপনি, মিস্টার সিং।

জানি না বোস সাহেব, আর জানতে চাইও না। আমার একটি নাগা কুকুর আছে, মোককচুং থেকে নিয়ে এসেছিলাম। সে ওইসব সালুকি-ফালুকির গলার নলি ছিঁড়ে দেবে। সারাদিন অন্ধকার ঘর-এ বন্ধ করে রাখি, রাতে গেট বন্ধ করার পর ছেড়ে দিই। যমরাজেরও সাহস হবে না ঢুকতে, সন্ধের পরে। ইনফ্যাক্ট, আমার স্ত্রীকে তাই তো দুপুরবেলাতে নিয়ে গেল যমে।

ও। তাই! ভীষণ খারাপ লাগল শুনে। আই অ্যাম সরি। ভারী চমৎকার মহিলা ছিলেন। আমাকে ইরোম্বা খাইয়েছিলেন মনে আছে। কী হয়েছিল মিসেস সিং-এর?

এমন স্বামীর সঙ্গে পঁচিশ বছর ঘর করার পরও কিছু হবার দরকার আছে কি? এই এক অসুখই তো যথেষ্ট। মরল, সেই অশান্তিতেই।

সানাহানবিকে দেখেছেন আপনি? মিস্টার বোস?

হ্যাঁ। এয়ারপোর্টে এসেছিল তো।

লেডি ডায়ানার মতো দেখতে না অনেকটা?

হ্যাঁ। তাই তো আলোচনা করছিল ওরা সকলে।

সকলে মানে?

মানে, আমার সাকরেদরা। সৈন্যদল।

ইংরেজের মেয়ে হলে তো ইংরেজের মতো দেখতে হবেই।

সে কি সানাহানবি তম্বি সিং-এর মেয়ে নয়?

বাবার নামটা ধার নেওয়া। জন হাচিনসন বলে এখানে একজন ইংরেজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। সে ওই মোরের কাছেই মারা যায় জাপানিদের বোমাতে। তার ছেলে কেনেথ। ব্যাচেলার। লম্বা চওড়া হ্যান্ডসাম পুরুষ৷ নটিংহামশায়ারে দেশ ছিল। যায়নি কখনও। লেখাপড়া করেনি কিছুই। কিন্তু মানুষ ভাল ছিল। খুব ভাল শিকারিও ছিল। প্রথম জীবনে লেক লকটাক-এ মাছের ব্যবসা করত এবং একটা আনারসের ফার্মও নিয়ে ছিল। তবে ফার্মটা বিরাটই করেছিল। এখনও লোকে একনামে চেনে কেনেথ ফার্ম বললেই। তম্বি ছিল ওই কেনেথ হাচিনসনেরই আনারস ফার্মের একজন সুপারভাইজার। তম্বির স্ত্রী ছিল পরমাসুন্দরী নাগা মেয়ে। নাগারা লম্বা হয়। নাগাদের মধ্যে যে কী অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে-পুরুষ হয়, তা সমতলের লোকেরা জানে না।

তম্বি ছিল একটি অপদার্থ, সবদিক দিয়েই। সারাদিন নেশা করে পড়ে থাকত। বলতে গেলে, ওর স্ত্রীই ওর কাজটা সামলে দিত। তারপর…গল্প উপন্যাসে যেমন পড়া যায় আর কী! কেনেথের রূপ পেয়েছে মেয়েটা আর মায়ের রূপ এবং চরিত্র, দুটোই। তম্বির স্ত্রী লেইমাথেইমা ছিল পরমাসুন্দরী, কিন্তু অত্যন্ত বাজে চরিত্রের মেয়ে। তম্বির স্ত্রী মারা যাবার পরে কেনেথ আনারসের ফার্ম বন্ধ করে দিয়ে এসে কাঙ্গপোকপিতে কুকুরের ব্যবসা আরম্ভ করে।

তা তম্বি সিং তো ভাল ইংরিজি বলেন।

ভাল? আপনিও ভাল বলছেন, মিস্টার বোস? আশ্চর্য!

অক্সফোর্ডে নাকি পড়াশোনা করেছেন উনি?

হাঃ! সত্যি! আপনিও দেখি…। ওর মাথার গোলমাল আছে। তা বেড়েছে। এখন, বিশেষ করে ইবোহাল সিং-এর মৃত্যুর পরে। সানাহানবির সঙ্গে ইডিয়ট তম্বিই আলাপ করিয়ে দেয় ইবোহাল সিং-এর। এখন সে মেয়ে যদি ইবোহালের সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে পারে তবে বাবাকে লাথি মেরে তাড়াবে। অবশ্য, এমনিতেই তো মারে। তম্বি সিং এখন খাবে কী? এতদিন তো ইবোহালের মোসাহেবি করে দিব্যি চালিয়েছে। এখন? সেই চিন্তাতেই পাগলের মতো হয়ে গেছে। দোষ নেই বেচারির। এতদিন সাহেবের কাজ করেছে। কিছু ইংরেজি শিখবে বইকী। আমাদের চেয়ে অনেকই ভাল শিখেছে। সাহেবি আদব কায়দাও শিখে নিয়েছে অনেক। দোষ, চাল-চালিয়াতি। কিন্তু শুধু ইংরেজি বলতে পারলেই তো জানোয়ার মানুষ হয়ে যায় না।

ওঁর সম্বন্ধে আর কী জানেন? আপনি?

ঋজু বোস বললেন।

আর কী বলব। তবে বলব মানুষটা বোকা হতে পারে কিন্তু খারাপ নয়। ইবোহালকে ও খুন করেছে বা খুন করিয়েছে তা আমার অন্তত মনে হয় না। অত ষড়যন্ত্র ওর ওই মাথাতে আঁটবার মতো মাথা নিয়ে ও জন্মায়নি। নইলে আজীবন অপদস্থ হয়। তা ছাড়া, ওর মেয়ে সানাহানবির হাতে বেচারি রীতিমত অত্যাচারিত। স্ত্রীর হাতেও কম অত্যাচারিত হয়নি। লোকটা কুঁড়ে ছিল। যে কোনও মাতৃতান্ত্রিক রাজ্যেই দেখতে পাবেন যে গড়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই বেশি উদ্যমী। নানা অশান্তির জন্যেই তো ও ওর স্ত্রীর মৃত্যুর পরে ইবোহালের সঙ্গেই থাকত, চামচেগিরি করত। ওকে অনুকম্পাও করে সকলে, আমিও করি, আবার ওর বিরুদ্ধে তেমন ব্যক্তিগত অভিযোগ খুব কম মানুষেরই আছে।

এবারে বলুন তো আচ্চাও সিংকে চিনতেন?

আ-চ্চা-ও! চিনব না? হিরের টুকরো ছেলে।

ওকেই তো সব সম্পত্তি দিয়ে যেতেন ইবোহাল সিং। বেঁচে থাকলে।

মানে, আচ্চাও সিংকে? তাই না? ঋজু বোস বললেন।

হ্যাঁ, হয়তো বেঁচে থাকলে।

বেঁচে আর থাকলেন কই?

তবে আচ্চাও একেবারেই নির্লোভ ছেলে। ওর বাবা একজন রাজপুরোহিত ছিলেন। যদিও রাজাদের রমরমা তখন বিশেষ ছিল না। এরকম সৎ ও সর্বগুণসম্পন্ন ছেলে সারা মণিপুরে আছে কি না সন্দেহ। কাউকে বলবেন না আপনি। ভেবেছিলাম, আমারই মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে দেব। আলাপ পরিচয়ও আছে। আচ্চাওকে আমার মেয়েরও ভাল লাগে। ভাল লাগার মতোই ছেলে। ও ইবোহালের সম্পত্তি পেল কি পেল না তাতে কী গেল এল? আমার যা আছে, তাতে ওদের চলে যাবে। তা ছাড়া আচ্চাও তো শ্বশুরের পয়সাতে বসে খাবার ছেলে নয়, অত্যন্ত সম্মানজ্ঞান তার। পরিশ্রমীও। তা ছাড়া, শিক্ষিত বলে এতটুকু অহংকার নেই। কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেছিল ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে–আই এ. এস.-এ বসলে সহজেই শিডিউল্ড ট্রাইবের কোটাতে পেয়েও যেত। কিন্তু ও মণিপুরের ছেলেদের শিক্ষিত করে তুলবে বলেই, ওই পরীক্ষাতে বসেনি। তাছাড়া ওই সব চাকরিতে একবার বহাল হলে সারা ভারতেই ঘুরে বেড়াতে হয়। শুধুমাত্র মণিপুরের জন্যই অনেক কিছু করবে বলেই সে বড় শহরের লোভ আর কনস্যুমারিজ-এ না ভুলে পরীক্ষা পাশ করেই ফিরে এসেছিল। কিন্তু এসেই ইবোহালের খপ্পরে পড়েছিল। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। ভেবেছিলাম, ওকে আমি একটা ভাল স্কুল করে দেব। আমার মেয়েও ইংরেজিতে বি. এ. করেছে। গৌহাটির কটন কলেজ থেকে। ওদের মতামত, রুচি ইত্যাদিতেও অনেকই মিল।

আপনার মেয়ে কোথায়?

সে কোহিমাতে গেছে এক বন্ধুর বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে। আজ তো সোমবার এ সপ্তাহের শেষেই ফিরে আসবে। আজই সকালে গেছে নিজে গাড়ি চালিয়ে।

আপনার মেয়ের নাম কী?

থৈবী।

বাঃ! সুন্দর নাম তো।

তা সুন্দর! কিন্তু দেবী না হয়ে যদি অসুরী হয়। সেই ভয়।

আচ্চাও কোথায় আছে এখন?

আরে সেই হয়েছে মুশকিল। তাই যদি জানতাম তো গোল ছিল কী?

ওকে একবার ধরতে পারলেই তো জামিন দেবে না। আর সানাহানবির প্ল্যানটা বোধহয় সেরকমই। মিথ্যে সাক্ষী জোগাড় করে পুলিশকে ইনফ্লুয়েন্স করে নিরপরাধকে ফাঁসি দেওয়ানো বা সারাজীবন কারাদণ্ড দেওয়া শুধু এ দেশে কেন, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই কঠিন নয়। নন-বেইলেবল অফেন্স তো! বেচারা নিরপরাধ একেবারে। আমার মেয়ে থৈবী তো কেঁদে সারা। আমিই তাই জোর করে পাঠালাম, বিয়ে খেয়ে আসতে। তা ছাড়া ও কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে তা তো জানি না। কেউই জানে না, সে কোথায়। জানলে তো ওকে কলকাতাতে, নয় দিল্লি, বম্বেতে, কোথাও চালান করে লুকিয়ে রাখতাম।

আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো আমাকে, মিস্টার ইবোহাল সিং যে উইল করে যাননি, প্রমাণ কী? সকলেই কী করে ধরে নিল যে, হি ডায়েড ইন্টেস্টেট। ওঁর কোনও সলিসিটর ছিল না?

সলিসিটর ছিল না। উকিল ছিল, এক বুড়ো। উখরুল-এ বাড়ি। নাম ছাওবি সিং। নামটা ভুলও হতে পারে।

হুমম।

আই সি। উখরুল-এ কোথায় বাড়ি ছিল?

তা আমি জানি না। তা দিয়ে আপনিই বা কী করবেন?

শেলফ-ড্রিন কার ভাড়া পাওয়া যায়? কোনও কোম্পানি আছে? এখানে?

ঋজু বোস তারপর শুধোলেন, থাঙ্গজম সিংকে।

কেন? কী করবেন? আমার পাঁচখানা গাড়ি। ছেলে একখানা ব্যবহার করে। মারুতি ওয়ান থাউজ্যান্ড। মেয়ের সাদা মারুতি। আর তিনখানা আমার নিজের ডিসপোজাল-এ। একটা কনটেসা, একটা ফিয়াট এন. ই. ইলেভেন হান্ড্রেড, আর একটা মারুতি-জিপসি। যেটা দরকার, সেটা নিয়ে যান। সেন সাহেবের বন্ধু আপনি। আপনাকে খাতির করা মানে তাঁকেই খাতির করা।

সেন সাহেব কি এখনও আপনার কাজ দেখেন? অডিট, ট্যাক্স-ট্যাক্স?

আসলে, যাতায়াতেই অনেক সময় লেগে যায়। ওঁর ছেলেরাই এসে অডিট করত। তাদেরও যাতায়াত, হোটেল বিল মিলে অনেক হয়ে যেত। আর উনি এত ব্যস্ত লোক! দিল্লি বোম্বেতেই তো থাকেন মাসের পনেরো দিন। তাই গৌহাটিতেই ঢনঢনিয়া বলে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে দিয়েছি, সব কাজ। সেই ঠেকা দেয়। তবে বড় গাড্ডাতে পড়লে সেন সাহেবকে ডাকতে হয় বইকী।

তাই? কতদিন উনি আসেননি ইম্ফলে?

তা, বছর পাঁচেক।

উকিল, ডাক্তার আর গাইয়ে বাজিয়েদের না আসার কী আছে? বেশি ফিস দিলেই আসবেন।

ঋজু বোস বললেন, ইচ্ছে করে।

সব উকিল, ডাক্তার, গাইয়ে বাজিয়েকেই কি এক দলে ফেলা যায়, বোস সাহেব? সব প্রফেশানেই একসেপশন আছে। থাকে। হয়তো আপনাদের প্রফেশানেও আছে। সেন সাহেবকে টাকা বা অন্য কিছু দিয়ে কিনতে পারে না যে কেউ। তিনি ফিয়ার্সলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানুষ। ট্রলি প্রফেশনাল। মাটির মানুষ। তবে কেউ তার লেজে পা দিলে তখনি শুধু বুঝবেন উনি কী দিয়ে তৈরি। আগে নয়। আমার কাজ এখন উনি নিয়মিত করুন আর নাই করুন, আই স্টিল অ্যাম অ্যান অ্যাডমায়ারার অফ হিম। কলকাতায় যদি ন মাসে ছ’মাসেও যাই তবেও অবশ্যই ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আর তেমন গণ্ডগোল পাকালে ধরে পাকড়ে নিয়ে আসি। আসেনও। বেশি ফিসের জন্যে নয়। ফর ওল্ড টাইমস সেক।

থাঙ্গজম সিং-এর বউমা নিজে ট্রেতে করে চা আর পেঁয়াজি ভেজে নিয়ে এলেন।

ঋজু বোস বললেন, থ্যাঙ্ক য়ু।

সফিস্টিকেটেড মেয়ে ও। গৌহাটিতে পড়াশোনা করেছে কনভেন্টে। তবে বি. এ. পরীক্ষা শেষ করেনি। ব্যস, তারপরই বিয়ে। বি. এ পরীক্ষাটা দেওয়া আর হল না। তাতে কিছু এসে যায় না। যমুনা তো আর চাকরি করতে যাচ্ছে না।

সে তো ঠিকই। তোমার নাম যমুনা? বউমা মাথা হেলাল হেসে। হাসিটা বিষঃ এবং জোর-করা বলে মনে হল। ভুলও হতে পারে মনে হওয়াটা।

চা খেয়ে পাইপটা ধরিয়ে ঋজু বোস বললেন, এবার উঠব। শুধু একটা কথা। আচ্চাও কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে বলে আপনার ধারণা?

আমার ধারণা, ইম্ফলেই।

মোরে ছোট্ট জায়গা। ওখানে লুকিয়ে থাকা সহজ নয়।

পুলিশ কি ওকেই সন্দেহ করে খালাস? আর কাউকে সন্দেহ করেনি?

আর কাকে করবে? সন্দেহভাজন বলে তো আর কাউকে মনে হয় না।

কেন? সানাহানবি? বা তম্বি সিং?

ঋজু বোস বললেন।

ওদের কী ইন্টারেস্ট?

তা, আমি কী করে জানব?

আপনাদের মানে, স্থানীয় মানুষদের আর কাউকে সন্দেহ হয় খুনি বলে?

সন্দেহ তো অনেকেই হয়, কিন্তু সন্দেহ হলেই বা কি? খুন করাটা প্রমাণ তো করতে হবে। আর আসল তো হচ্ছে সেই রুবিটা। যেই খুন করুক, রুবিটা সমেত তাকে তো ধরতে হবে।

কেন?

ঋজু বোস অবাক হয়ে বললেন।

এ তো কমনসেন্স। সে খুন করেছে সে কি অত বোকা? আরে, সে রুবি কবে হয়তো বার্মাতে পাচার হয়ে গেছে। নদী পেরুলেই তামু। তামু মানেই বার্মা। বা, নাগাল্যান্ডে। নাগাল্যান্ড থেকে ডিমাপুর হয়ে ভারতের কোনও প্রান্তে; তার ঠিক আছে! বম্বের জহুরিদের মহল্লাতে বিক্রি হয়ে গিয়ে মিডল ইস্ট-এর কোনও শেখের গলার হারের লকেট হয়ে ঝুলছে এতদিনে সে রুবি, তা কে জানে!

রুবিটার দাম কত হবে?

হঃ। হঃ। দাম? সেইটাই তো কথা। কত মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলার তা কেউই জানে না। সবই তো শোনা কথা। আমরা কি আর দেখেছি? থংগল বাজারের শেঠ মগনলাল জহুরিকে নাকি একবার দেখিয়েছিল, ইবোহাল সিং। শুনেছি, বছর বিশেক আগে। মগনলালও তখন রেঙ্গুন থেকে রিফিউজি হয়ে এসেছিল। রেঙ্গুনে অনেক দামি দামি বার্মিজ রুবি দেখেছে সে। কিন্তু ও রুবির দামের কোনও অনুমান করা তাঁর পক্ষেও সম্ভব হয়নি।

আচ্ছা, আচ্চাও সিং ছাড়া আর বাইরের কেউ হতে পারে কি খুনি? কাউকেই সন্দেহ বা অ্যারেস্টও করেনি কি পুলিশ?ইবোহাল সিং-এর চাকর বাকরেরাও তো ছিল মোরেতে। তাদের ওপরে সন্দেহ হয়নি পুলিশের?

ইবোহাল সিং-এর খাস বেয়ারা ছাড়া সবাইকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। আচ্চাও গা ঢাকা দেওয়াতে পুলিশের সন্দেহ আচ্চাও এর উপরেই গিয়ে পড়েছে। শিক্ষিত মানুষ হয়েও ও যে এমন কেন গা-ঢাকা দিতে গেল, তা ওই জানে।

ইবোহাল সিং খুন হবার সঙ্গে সঙ্গেই আচ্চাও গা-ঢাকা দিয়েছিল কি?

প্রায় তাইই বলা যায়। যেদিন সকালে ইবোহাল সিং-এর মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়, সেদিন থেকেই সে নিখোঁজ।

পুলিশ আসার পর? নাকি সেই রাতেই?

তা জানি না। ওকে কেউই দেখেনি। ঠিক কখন যায়, তা কেউই জানে না।

আপনি এত জানলেন কী করে?

ঋজু বোস জিজ্ঞেস করলেন, সিংকে।

জানাই আমার কাজ, মিস্টার বোস। ব্যবসাদারদের সবকিছু জানতে হয়। তা ছাড়া আমার বিজনেস কনট্যাক্টস নেই, মোরেতে? তামুতেও আছে।

তা ঠিক।

ঋজু বোস বললেন।

আচ্ছা তরোয়ালটা কে খুঁজে পায়?

তরোয়াল?

হ্যাঁ। যে তরোয়ালে রুবিটা লাগানো ছিল?

কে যে এসব গাঁজাখুরি গল্প বলেছে আপনাকে, কে জানে?

তম্বি সিং। সাধারণের সন্দেহ না কি তাঁরই উপরে পড়েছে?

নিজেকে ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট মনে করে, বিশেষ করে তাঁরা; যাঁরা ইম্পর্ট্যান্ট নন। লোকে সন্দেহ আদৌ করছে না। তবে পুলিশে করতে পারে।

কেন?

ওকে চোর বানানো সোজা, তাই। ও তো মামলা লড়তে পারবে না। আর সেটা একটা স্টান্টও হবে। সাধারণ লোকে যা অভাবিত তা ঘটলে পরেই পুলকিত হয়। যা ভাবিত, তা ঘটলে চমকপ্রদ হয় না ব্যাপারটা। পুলিশেরা এসব মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার ভালই বোঝে। ওকে অ্যারেস্ট করে লটকে দেওয়া সবচেয়ে সোজা। ওর মেয়েও ওকে সাহায্য করতে আসবে না।

হুমম!

ঋজু বোস বললেন।

আপনি ঠিকই বলেছেন। তম্বি সিং-এর বিপদ আচ্চাওরই মতো। এরা যে মুরুব্বিহীন।

আপনি মুরুব্বি হন না, মিস্টার সিং? চোখের সামনে এমন অন্যায় ঘটবে, নিরপরাধ শাস্তি পাবে আর আপনার মতন এত রিসোর্সফুল মানুষ তা চোখ বন্ধ করে দেখবেন?

হঃ। হঃ। হঃ করে অনেকক্ষণ হাসলেন, থাঙ্গজম সিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *