কালিকাপুরের ভূত রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
সেবার ডিসেম্বরেও কলকাতায় তত শীত পড়েনি। এক রবিবারে অভ্যাসমতো কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আড্ডা দিতে এসেছিলুম। দেখলুম কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে যথারীতি চুরুট টানছেন, আর সোফার কোণের দিকে বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ আমাদের প্রিয় হালদারমশাই ডানহাতে খবরের কাগজ আর বাঁ-হাতে এক টিপ নস্যি নিয়ে বসে আছেন। আর কর্নেলের কাছাকাছি যে প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি কাচুমাচু মুখে বসে আছেন, তাকে দেখেই বোঝা গেল তিনি মফস্বলের মানুষ। কলকাতার লোকজনের চেহারা আর হাবভাবে বেশ খানিকটা চেকনাই থাকে। এই ভদ্রলোক মুখ তুলে আমাকে দেখে আর-একটু আড়ষ্টভাবে সরে বসলেন। কর্নেলের জাদুঘর সদৃশ ড্রইংরুমে ঢুকেই আমি সম্ভাষণ করেছিলুম,–মর্নিং কর্নেল।
কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে গলার ভেতরে মর্নিং’ আউড়ে আবার চোখ বুজলেন।
ভদ্রলোকের সামনে দিয়ে এগিয়ে আমি সোফার শেষপ্রান্তে বসলুম। এতক্ষণে হালদারমশাই নস্যি নাকে গুঁজে কাগজ নামিয়ে রেখে মৃদুস্বরে বললেন,–আয়েন জয়ন্তবাবু, বয়েন। আপনাগোর সত্যসেবক পত্রিকায় আইজ তেমন কিসু নাই।
আমি চোখের ইশারায় প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললুম,–আছে। সবকিছু কি কাগজে ছাপা হয়!
আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–হ, ঠিক কইসেন।
ইতিমধ্যে ষষ্ঠি আমার জন্যে এক পেয়ালা কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,–এবার ডিসেম্বরেও কলকাতায় শীতের দেখা নেই। ফ্যান চালাতে হচ্ছে।
আমার কথা শুনে সেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আপনাদের কলকাতা শহরে এসে আমাকে সোয়েটার খুলতে হয়েছে। সোয়েটারের ওপর ওই দেখছেন একখানা শাল, তাও জড়ানো ছিল। আমাদের কালিকাপুরে গেলে কিন্তু শীতের কামড়ে আপনার হাড় নড়িয়ে দেবে।
কর্নেল তো তুম্বা মুখে চোখ বুজে কী ধ্যান করছেন, কে জানে।
কালিকাপুরের ভদ্রলোক কথা বলায় গুমোট ভাবটা কেটে গেল। জিগ্যেস করলুম,–আপনি কালিকাপুর থেকে আসছেন? সেটা কোথায়?
ভদ্রলোক বললেন, আজ্ঞে বেশি দূরে নয়, মোটে ঘণ্টাচারেকের ট্রেন জার্নি। স্টেশন থেকে নেমে এক্তাগাড়ি, সাইকেলরিকশা, বাস–সবই পাওয়া যায়। গঙ্গার ধারে আমাদের গ্রামটা এখন আর গ্রাম নেই। ইলেকট্রিসিটি এসেছে, টেলিফোন এসেছে, নিউ টাউনশিপ হয়েছে।
ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ কর্নেল চোখ খুলে বললেন, আপনার বাড়িতে আপনার বাবা আর কাকা ছাড়া আর কে-কে থাকেন?
ভদ্রলোক বললেন, আমার এক বিধবা পিসি থাকেন। আমার মা তো অনেক বছর আগে মারা গিয়েছেন। কাকা বিয়ে করেননি। সাধুসন্ন্যাসীর মতো ওঁর চালচলন। আমরা ভাবি কবে হয়তো কাকা সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাবেন। অথচ আপনাকে বলেছি আমার বাবা রুগ্ণ মানুষ, বাড়ি থেকে বেরোতেই পারেন না। কিন্তু কাকার শরীর-স্বাস্থ্য খুব ভালো। নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন কিনা।
কর্নেল বললেন, বাড়িতে কাজের লোক নিশ্চয়ই আছে?
ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ, তা আছে। মানদা নামে একটি মেয়ে প্রতিদিন ভোরবেলায় আসে, সারাদিন থেকে সন্ধের পর নিজের খাবারটা বেঁধে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। আপনাকে তো বলেছি, ব্যাপারটা প্রথম তারই চোখে পড়ে। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন কর্নেলসাহেব।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। আপনি বলেছিলেন বটে। কিন্তু মানদা তখনই ফিরে এসে কথাটা আপনাদের বলেনি কেন? আপনি বলেছিলেন পরদিন সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফেরার সময়েই সে কথাটা আপনার পিসিমাকে বলেছিল–তাই না?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলুম। আসলে এমন একটা গোলমেলে ব্যাপার যে ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছি না। আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তাতেই ইলেকট্রিক আলো আছে। গত বছর কালিকাপুরে মিউনিসিপ্যালিটি হয়েছে কিনা! বুঝে দেখুন স্যার, শীতের রাতে এখন ওখানে বড় কুয়াশা হয়। তা হলেও মানদা স্পষ্ট চিনতে পেরেছিল লোকটাকে।
হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে তাকিয়ে কথা শুনছিলেন। এবার বলে উঠলেন,–তা হইলে ক্যামনে বুসলেন ওই লোকটাই সেই মরে যাওয়া লোক?
ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে বললেন, আমাদের মানদা স্যার খুব চালাক-চতুর মেয়ে। অন্ধকারেও দেখতে পায়। তা ছাড়া যে লোকটাকে দেখেছিল, সে সম্পর্কে আমারই এক দাদা। মাসতুতো দাদা। পাঁচ বছর আগে তাকে আমরা শ্মশানে চিতায় দাহ করে এসেছি। বাবা-কাকা সবাই ছিলেন শ্মশানে।
কর্নেল বললেন, আপনার ওই মাসতুতো দাদার নাম বিনোদ মুখুজ্যে তাই না?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। ওরা মুখুজ্যে, আমরা চাটুজ্যে। কথাটা বিশ্বাস করতুম না, কিন্তু আমাদের পাড়ার বামাপদ গোঁসাই হঠাৎ কাল কথায়-কথায় বললেন, হারে শচীন, তোদের বাড়ির কাছে কাল সন্ধেবেলা একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছিলুম। মাত্র হাত দশেক দূরে। দ্যাখা মাত্রই চমকে উঠেছিলাম। এ তো সেই পাগলা বিনোদ!
এবার আমি জিগ্যেস করলুম,–পাগলা বিনোদ মানে?
শচীনবাবু বললেন, কর্নেলসাহেবকে সবই বলেছি। আমার ওই মাসতুতো দাদার কোনও চালচুলো ছিল না। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াত, মাঝে-মাঝে একটু-আধটু পাগলামি করত। তারপর বেশ কিছুদিন খুব শান্ত আর গম্ভীর হয়ে থাকত। তাই লোকে ওকে বলত বিনোদ পাগলা, বা পাগলা বিনোদ।
কথাটা বলে শচীনবাবু সার্জের পাঞ্জাবির হাত সরিয়ে ঘড়ি দেখলেন। তারপর করজোড়ে বললেন,–কর্নেলসাহেব, কালিকাপুরের জমিদারবাড়ির চণ্ডীবাবু আপনার কাছে পাঠিয়েছেন-সেকথা তো আগেই বলেছি। আমাদের রাতের ঘুম একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যখন-তখন ওই উৎপাত।
কর্নেল বললেন, ঠিক আছে, চণ্ডীবাবুকে গিয়ে বলবেন আমরা যে-কোনও দিন কালিকাপুরে গিয়ে হাজির হব। সেখানে কোথায় উঠব তা আগে থেকে বলতে পারছি না। তবে আপনারা নিশ্চয়ই খবর পাবেন।
কালিকাপুরের শচীনবাবু তার ব্যাগের ভেতর শালটাও যেন খুলে ভরে নিলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–এখনই শিয়ালদায় একটা ট্রেন আছে। ট্যাক্সি করে চলে যাব।
বলে তিনি প্রথমে কর্নেলকে, তারপর আমাদের দুজনকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন। সেই সময় লক্ষ করলুম, তিনি যেন একটু লেংচে হাঁটছেন।
তিনি চলে যাওয়ার পর বললুম,–ভদ্রলোকের বাঁ-পায়ে গণ্ডগোল আছে। তা একটা ছড়ি হাতে নিয়ে হাঁটেন না কেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ছড়িটা উনি দরজার বাইরে ঠেকা দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ছড়ি বলা যায় না, আস্ত বাঁশ বললে ভুল হয় না। কিন্তু বেশ পালিশ করা বাঁশের লাঠি। ভদ্রতা-বশে বা যে-কোনও কারণেই হোক ওটা নিয়ে ঘরে ঢোকেননি।
জিগ্যেস করলুম,–ওঁর সেই মাসতুতো দাদা বিনোদ পাগলার ভূত কি প্রতি রাতে উৎপাত করছে?
কর্নেল কিন্তু হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বললেন,–প্রতি রাতে নয়, কিন্তু উৎপাত করছে তা বলা যায়। ওঁদের একতলা বাড়ির ছাদে ধুপ-ধাপ করে শব্দ হয়। আবার কখনও উঠোনে অনেকগুলো ঢিল পড়ে। টিলগুলো–এটাই আশ্চর্য, দেখতে পাহাড়ি নদীতে পড়ে থাকা নুড়ির মতো।
বলে কর্নেল তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে গোটা চারেক নুড়ি বের করলেন। সেগুলো একেবারে নিটোল, কতকটা ডিমের মতো।
হালদারমশাই উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে বললেন,–মাসতুতো দাদারে দাহ করছিল ওগো শ্মশানে। গঙ্গার ধারে শ্মশান, আর তার ভূত পাহাড় অঞ্চলে যাইয়া এগুলান কুড়াইয়া আনসিল ক্যান? কর্নেলস্যার আপনি আমারে যেন সাথে লইবেন।
কর্নেল ঈষৎ কৌতুকে বললেন,–আমার মতো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবেন আপনি? আপনি তো প্রফেশনাল প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
হালদারমশাই বললেন,–তাড়াই কর্নেলস্যার। হাতে কোনও ক্যাস নাই। তাই মনটা ভালো নাই। চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করসি। রিটায়ার কইর্যা যা পাইসি তাই যথেষ্ট। এদিকে পেনশেনও পাইত্যাসি আপনার মতন।
কর্নেল চুরুটে শেষ টান দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, তাহলে আপনাকে যাওয়ার সময় ডেকে নেব।
ষষ্ঠি আর এক দফা কফি নিয়ে এল। আমি আপত্তি করছিলুম, কিন্তু কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, কেসটা তো শুনলে। পাঁচবছর আগে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া মানুষ একেবারে জলজ্যান্ত দেহে ফিরে এসেছে, এবং যারা তার সৎকার করেছিল, তাদের ওপর উৎপাত চালাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে হলে নার্ভ আরও চাঙ্গা করা দরকার।
কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে বললুম,–আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে ওখানে শচীনবাবুদের কোনও শত্রুপক্ষ কোনও কারণে তাদের পেছনে লেগেছে। ওসব ভূতপ্রেতের গল্প বোগাস।
হালদারমশাই সায় দিয়ে বললেন,–হ! ঠিক কইসেন জয়ন্তবাবু। ওনাদের শত্রুপক্ষই উৎপাত করত্যাসে।
কর্নেল বললেন,–শচীন চাটুজ্যে আমাকে বেশ বড় গলায় বলেছেন, ওঁদের কোনও শত্রু নেই। শচীনবাবু স্কুল-টিচার ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। ওঁর বাবা অহীনবাবু রুণ, শয্যাশায়ী। তিনিও শিক্ষকতা করতেন। ওঁদের কাকা মহীনবাবু সংসারের কোনও সাতে-পাঁচে থাকেননি। তা ছা, ওঁদের বিষয় সম্পত্তিও কিছু নেই। শুধু ওই ভিটে আর তার সংলগ্ন একটা ঠাকুরবাড়ি।
কর্নেল আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন,–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…চণ্ডীপ্রসাদবাবু? কী ব্যাপার? এইমাত্র আপনার চিঠি নিয়ে এসেছিলেন শচীন চাটুজ্যে। তিনি চলে গেছেন। আমি তাকে কথা দিয়েছি, কারণ আপনার সঙ্গে এই সুযোগে আবার দেখা হবে…আঁ? বলেন কী? কখন?…ও মাই গড! ব্যাপারটা তাহলে দেখছি ছেলেখেলা নয়!…ঠিক আছে। আমরা মানে আমি আর আমার তরুণ সাংবাদিক-বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী–যার কথা আপনাকে একবার বলেছিলুম। আর একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার, যিনি এখন পেশাদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তিনজনেই সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা হব। সম্ভব হলে আপনি..বাঃ! ঠিক আছে।…আচ্ছা, রাখছি।
কর্নেল রিসিভার রেখে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে মাথার প্রশস্ত টাকে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন।
লক্ষ করলুম গোয়েন্দাপ্রবরের হাতে কফির পেয়ালা। এবং তিনি গুলিগুলি চোখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অভ্যাসমতো দুই চোয়াল তিরতির করে কাঁপছে।
আমি জিগ্যেস করলুম,–কর্নেল, কালিকাপুরে নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে-প্লিজ, কথাটা খুলে বলুন।
কর্নেল এবার সোজা হয়ে বসে কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন,–একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে। শচীনবাবুদের ঠাকুরবাড়ির সামনে অনেকটা জায়গায় রক্ত পড়ে আছে। ওখানে একটা হাড়িকাঠ আছে। চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবমন্দিরের সামনে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়।
জিগ্যেস করলুম,–কিন্তু কাকে বলি দেওয়া হয়েছে?
শচীনবাবু ভোর ছ’টায় স্টেশনে গিয়েছিলেন। তাঁর বিধবা পিসি কাজের মেয়ে মানদাকে নিয়ে পুকুরঘাটে যাচ্ছিলেন। মন্দিরের সামনেই একটা পুকুর। খিড়কির দরজা দিয়ে বেরুনোমাত্র হাড়িকাঠের পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে চবচবে রক্ত দেখা যায়। মানদা চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, পড়শিরা দৌড়ে আসে। কিন্তু কাকে বলি দেওয়া হয়েছে, তার লাশ পাওয়া যায়নি। পরে সবার খেয়াল হয় শচীনবাবুর কাকা মহীনবাবুর কোনও পাত্তা নেই।
হালদারমশাই বলে উঠলেন,–ওনার সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছা ছিল, শচীনবাবু কইত্যাসিলেন।
কর্নেল বললেন,–এতে স্বভাবতই লোকের সন্দেহ হয়েছে মহীনবাবুকেই কেউ বা কারা কোনও কারণে বলি দিয়ে তার লাশ গুম করে ফেলেছে। পুলিশ এসে তদন্ত করার পর চলে গেছে। জেলে নৌকাগুলোকে নাকি পুলিশ বলেছে গঙ্গায় কোনও লাশ দেখতে পেলে তার যেন পুলিশকে খবর দেয়।
বললুম,–শচীনবাবুর কাকা মহীনবাবুকেই যে বলি দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্য আজ সারাদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে। এমন হতেই পারে, তিনি সাধু-সন্ন্যাসী টাইপের মানুষ, বাড়িতে না বলে কোথাও গঙ্গার ধারে কোনও সন্ন্যাসীকে দেখে তার কাছে বসে আছেন।
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–মহীনবাবু ঘরের বারান্দায় একটা খাঁটিয়ায় শুয়ে থাকতেন। চণ্ডীপ্রসাদবাবু বললেন, ওটা ওঁর কৃচ্ছ্বসাধনের চেষ্টা। মশারি নিতেন না। একটা হালকা তুলোর কম্বল জোর করে তাকে দেওয়া হত। কিন্তু আজ তার খাঁটিয়ার বিছানা এলোমলো হয়ে পড়েছিল। তুলোর কম্বলটা পড়েছিল বারান্দার নীচে। শচীনবাবু ট্রেন ধরবার জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান। তাই ওটা লক্ষ করেননি। এদিকে তার পিসি সেটা লক্ষ করলেও ভেবেছিলেন, মহীনবাবু রাগ করে তুলোর কম্বল ফেলে দিয়েছে। মাঝে-মাঝে তিনি এই শীতেও ঠান্ডা মেঝেয় শুয়ে থাকতেন।
হালদারমশাই বললেন,–হেভি মিস্ত্রি।
কর্নেল চুপচাপ চা খাওয়ার পর চুরুট-কেস থেকে একটা চুরুট বের করে লাইটার দিয়ে ধরালেন, তারপর ধ্যানস্থ হলেন।
এই সময় আবার টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল দ্রুত সোজা হয়ে বসে হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে নিয়ে সাড়া দিলেন।-বলুন চণ্ডীবাবু…পুকুরপাড়ে রক্ত পাওয়া গেছে? আপনি পুলিশকে চাপ দিলে পুলিশ কলকাতার ডগ স্কোয়াড থেকে শিক্ষিত কুকুর নিয়ে যেতে পারে। ওখানে যে স্যান্ডেলটা পাওয়া গেছে, তা যখন মহীনবাবুর না, তখন খুনেদেরই হতে পারে…ঠিক আছে, আপনি বলুন। যদি পুলিশ ইতস্তত করলে আমাকে জানাবেন। আমি লালবাজারে আমার জানা অফিসারদের সাহায্যে একটা ব্যবস্থা করতে পারব।…আমরা রাতের ট্রেনে যাচ্ছি।
