জুজুমারার বাঘ (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

জিপে করে গিয়ে কুচুয়া গ্রামে পৌঁছে আমার ছোট ব্যাগটা নামিয়ে নিয়ে আতুপাতুকে বললাম জিপ নিয়ে অঙ্গুলে চলে যেতে। বিমলবাবু আর মহাদেব্বাবুকে দুটি চিঠি লিখে দিলাম। তখন ইনটারনেটের কথা ছেড়েই দে, ফ্যাক্স বা এস টি ডি-ও ছিল না। ফোন করতে হলে চারমল-এর পোস্ট অফিসে গিয়ে ট্রাঙ্ককল বুক করে বসে হাঁসফাঁস করতে হত। জুজুমারাতেও ফোন ছিল না। তখন সিঙ্গল লাইনের ট্রেনও ছিল না সম্বলপুর-অঙ্গুলের মধ্যে, ট্রেন তো এই সেদিন হল, বছর দুই। সুতরাং জিপই পাঠাতে হল। বাসেও পাঠাতে পারতাম ওকে কিন্তু জিপ নিয়ে গেলে জিপেই রাতে শুয়ে থাকতে পারবে এবং কাল দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসতে পারবে ওদের উত্তরের চিঠি সঙ্গে নিয়ে। এই ভেবেই জিপ দিয়ে পাঠালাম।

কুচুয়া গ্রামটা ছোট। তবে বাসিন্দাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব জায়গা-জমি আছে। ভাগ-চাষি কেউ নেই তাই এই গ্রামের অবস্থা অন্য গ্রামের তুলনাতে বেশ ভালই। প্রায় সকলের বাড়িতেই হাঁস, ছাগল, গোরু আছে। চেঁকিও আছে একটি। গ্রামের সকলের ব্যবহারের জন্য। কীর্তন ও রামায়ণ পাঠের জন্যে একচালা আছে একটা। কখনও কখনও নাকি দোলে-দুর্গোৎসবে বা রজৌৎসবে অষ্টপ্রহর থেকে চব্বিশ ঘণ্টাও কীর্তন বা পালাগান বা রামায়ণ পাঠ হয়।

ওরা আমাকে গ্রামের সবচেয়ে অবস্থাপন্ন মানুষের বাড়ির বাইরের দিকের একটি ঘর ছেড়ে দিল। মাটিরই ঘর, মাটির মেঝে, মাটির দাওয়া, তবে সাপ-খোপের ভয়ের কারণে জমি থেকে বেশ উঁচু। প্রায়, কোমর সমান। একটা দরজা। তিনদিকে তিনটি জানলা। বাঁশের বাখারি দিয়ে বানানো খাট। তোশকের অভাবে খড়গাদা থেকে অনেকখানি খড় এনে পেতে দিল। তার উপরে একটি খয়েরি কালো কাজকরা সম্বলপুরী চাদর বিছিয়ে দিয়ে চারদিক দিয়ে গুঁজে দিল এমনই করে যে, সেটাই তুলোর বদলে খড়ের তৈরি তোশক হয়ে গেল।

-খড় দিয়েও তোশক হয় বুঝি?

তিতির বলল।

–হবে না কেন? এখন তো পশ্চিমের সব দেশেই হিটিং সিস্টেম হয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে ঠাণ্ডা তেমন বোঝাই যায় না। কিন্তু আগেকার দিনে অনেক দেশেই দেখেছি পাখির পালকের তোশক এবং লেপ, এমনকী বালিশ পর্যন্ত। কী নরম আর গরম কী বলব।

-তারপর? আগে বাড়ো।

ভটকাই অর্ডার করল ঋজুদাকে।

–ঘরের পাশেই একটা মস্ত শিমুল গাছ। তার ফুলফোঁটা তখনও শেষ হয়নি। তার অন্য পাশেই একটি ছোট পুকুর। পুকুরে হাঁসেরা প্যাঁক-প্যাঁক করে স্বগতোক্তি করতে করতে চরে বেড়াচ্ছে। তার ধারে ভেরা গাছের সারি। জারুল, পারুল, একটা মস্ত বড় কনকচাঁপার গাছ। মাদার। মে মাসের শেষে এখনও জারুলের ফিকে বেগুনিরঙা ফুল, পারুলের লাল ফুল আর মাদারের সিঁদুরে ফুলে বৃষ্টিস্নাত সবুজ বনের শাড়িতে যেন পাড় বসিয়েছে। একটা পাগলা কোকিল কোনও দলিল-দস্তাবেজহীন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে এই পৃথিবীতে বসন্তকে বারমাস্যা করে দেবার আর্জি নিয়ে তারস্বরে ডেকে চলেছে আর উঁচু রেঙ্গানিকানি পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশের গহন জঙ্গল থেকে তার এক পাগলা দোসরও সাড়া দিয়ে চলেছে ক্রমাগত। ভাবখানা এমনই, যেন বলছে, লড়ে যাও। আমিও আছি সঙ্গে। করতে হবে। করতে হবে।

দুপুরের খাওয়ার তখনও অনেকই দেরি আছে। মনে হচ্ছে, আমার জন্য কুচুয়া গ্রামের মানুষেরা বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করছে। নানা রকম ফিসফিস গিসগিস শুনতে পাচ্ছি। আমি ওদের বাড়িতে আছি বলে ওরা এমন ভাব করছে যেন চিতা বাঘের যম তো নয়, ওদের আপদ চিতা বাঘটাকেই ওরা ঘরের মধ্যে এনে তুলেছে। এ তো ভারি অস্বস্তির ব্যাপার হল! ভাবছিলাম।

–তারপর?

আমি বললাম।

ঋজুদা বলল, তারপর আমি চির-মারা গোরুর ‘মড়িটা দেখিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম হাড়িবন্ধুকে। হাড়িবন্ধুর বড় সম্বন্ধী, যার গোরু মেরেছে চিতাটা সে নিজেই চলল আমার সঙ্গে।

শক্তসমর্থ মানুষটার মাথাভর্তি কাঁচা-পাকা চুল, মুখভর্তি গুণ্ডি-পান। বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে সে একটা কুড়ুল কাঁধে ফেলে নিল। জঙ্গলের মানুষদের এই স্বভাব। যাদের হাতিবাইসন থেকে বাঘ-ভাল্লুক-সাপ-খোপ সকলের সঙ্গেই বারো মাস ঘর করতে হয় তারা কিছু কিছু অলিখিত নিয়ম মেনে চলেই। যেমন নিতান্ত নিরুপায় না হলে খালি হাতে এবং একা জঙ্গলে যায় না, আলো ছাড়া রাতে কখনওই বেরোয় না, সে গ্রামের মধ্যে হলেও। জন্তু-জানোয়ার ছাড়াও ভূত-প্রেতের ভয়ও তো কম নয়। এই ভারতবর্ষের কথা তো আলো-ঝলমল কলকাতা শহরের বুকেই যারা সারা জীবন থাকেন, তাঁরা জানেন না।

গোরুটাকে মেরেছে সন্ধের আগে আগে। গ্রামের বাইরের ঘাসবনে যেখানে পাহাড়ের পা এসে পৌঁছেছে, সেখানে। মেরে, সেখান থেকে টানতে টানতে নিয়ে পাহাড়ে চড়ে গেছে। রক্তের দাগ প্রায় ধুয়ে গেছে আজ সকালের বৃষ্টিতে। তবে এত বড় গোরুটাকে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন অবশ্যই ছিল।

কিছুটা যেতেই একটা মিটকুনিয়া গাছের নীচের আগাছাহীন জমিতেই পায়ের দাগ পরিষ্কার দেখা গেল। উবু হয়ে বসে ভাল করে দেখেই বুঝলাম এ চিতা নয়, মস্ত বাঘ। মনে মনে বললাম, চমৎকার। এ তো গোদের ওপর বিষফোঁড়া।

যে জন্তু তার সাধের দুধেল গোরুটিকে ধরেছে সে যে চিতা অথবা দেবী সমলেশ্বরীর চিতা নয়, পেল্লায় এক বাঘ সে খবর গোরুর মালিক জানে না। যেহেতু চিতাটাই এই অঞ্চলে অত্যাচার করছে, গোরুটি বিকেলে বাড়ি না ফেরাতে তারা তাকে খুঁজতেও যায়নি, ধরেই নিয়েছে যে এ কাজ ওই চিতারই।

গোরুটিকে নাকি রেঢ়াখখালের হাট থেকে গত গ্রীষ্মে হাড়িবন্ধুর বড় সম্বন্ধী কিনেছিল। তারপরই গোরুটা গাভিন হয়। এত দুধ, তার আর কোনও গোরুই দেয়নি নাকি আগে। বাড়িসুষ্ঠু লোক এবং কুকুর-বেড়ালও সাধ মিটিয়ে দুধ খাবার পর জুজুমারার চায়ের দোকানে বিক্রিও করত নাকি রোজ দু’ কেজি করে।

একটি বাচ্চা ছেলে এই জঙ্গলময় এলাকাতে রোজ দু’ মাইল হেঁটে যায় জুজুমারাতে সেই দুধ নিয়ে এবং হেঁটেই ফিরে আসে জুজুমারা থেকে। বিকেলের দুধটাই নিয়ে যায়। ছেলেটির ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়।

আমি বা তোরা যে কাজকে ‘দুঃসাহসিক’ বলে মনে করি তাই এখানকার জঙ্গল-পাহাড় ঘেরা গ্রামের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে পড়ে। এই বিপজ্জনক কাজের মধ্যে এরা বিন্দুমাত্র বাহাদুরিই দেখে না।

হাড়িবন্ধুর বড় সম্বন্ধীর নাম রাম। পায়ের দাগ যে বাঘের, তা না বলে, আমি রামকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কেউ কি চিতাটাকে দেখেছ?

–আমি দেখিনি। প্রথম যখন গোরু মারতে আরম্ভ করে মাস ছয়েক আগে, তখন ফাটা-রহমান দেখেছিল।

–ফাটা রহমান কে?

–সে খুব ভাল শিকারি। সে থাকে হাতিগির্জা পাহাড়ের কাছে। এখানে এসেছিল এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। সেই মড়ি’ দেখে বলেছিল যে মস্ত চিতা।

–কোন হাতিগির্জা পাহাড়? বাঘঘমুণ্ডার কাছের?

–না বাবু! এ হাতিগির্জা রাজাবসার কাছে। ভারী পাহাড় বাবু। হাতিদের ডিপো।

–তা সে মারল না কেন?

–তাকে আমরা ধরে পড়েছিলাম। তবে তার হাতে সময় ছিল না তাই তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল মড়িটা দেখেই।

তারপর আমি রামকে জিজ্ঞেস করলাম, এবারে একটা কথা বলো। যেসব শিকারিরা ওই বাঘ মারতে এসেছে তারাও কেউ কি দেখেছে যে জানোয়ার গোর মারছে তাকে?

–তা বলতে পারব না। চার-পাঁচবার মাচায় বসেছিল দু-তিনজন শিকারি। কিন্তু সেই জানোয়ার একবারও আসেনি। তবে গ্রামের একটা বাচ্চা ছেলে গোরু চরাতে গিয়েছিল। তার গোরুকে ধরে চিতাতে। সেই কেবল দৌড়ে পালিয়ে এসে গ্রামের সকলকে বলে যে, একটা বড় বাঘ তার গোরুকে নিয়ে গেল। ও ছেলেমানুষ, তার আগে বাঘ কি চিতা কিছুই দেখেনি। তাই তার কথায় কেউ আমল দেয়নি।

–ছেলেটার বয়স কত?

–তা সাত-আট হবে।

যদি কেউ দেখেই না থাকে জানোয়ারটাকে, সেই বাচ্চা ছেলেটি ছাড়া, তাহলে গুলি লাগছে না, বাঘটা যে চিতাবাঘই, গুলি লাগলেও চিতার কিছুই হচ্ছে না, এসব কথা রটল কী করে!

–গুলি তো করেইছে অনেকে। গুলিতে কিছু হয় না ওর।

–যেসব শিকারি গুলি করেছে তারাই তো বলেছে সেকথা। অন্য সাক্ষী কেউ কি আছে?

ঋজুদা বলল, আমি আবারও বললাম রামকে, বাঘটা যে চিতাবাঘই তা কি কেউ নিজচোখে দেখেছে?

–তা আমি বলতে পারব না।

রাম বলল।

এদিকে এত বড় চিতা আছে নাকি? আমার তো পায়ের থাবার দাগ দেখে মনে হল ওটা চিতা নয়, বড় বাঘ।

না, না বাবু ওটা চিতাই। এদিকের রেঙ্গানিকানি, দেওঝরন, যাদুলুসিন পর্বতে এত বড় বড় চিতাবাঘ আছে যে, তারা বাঘের চেয়েও বড়।

-তুমি কী বললে?

আমি জিজ্ঞাসা করলাম ঋজুদাকে।

ঋজুদা বলল, আমি কী বলব। চুপ করেই রইলাম। ওরা জঙ্গলেরই মানুষ। ওদের অভিজ্ঞতা সারা জীবনের অভিজ্ঞতা। আমার মতো শহুরে শিকারি ওদের তুলনাতে কতটুকুইবা জানি। রাম যা বলছে তাই নিশ্চয়ই ঠিক।

–কিন্তু চিতা যত বড়ই হোক, চিতাবাঘের পায়ের থাবার দাগে আর বড় বাঘের পায়ের থাবার দাগের মধ্যে তফাত থাকে।

তিতির বলল।

–তা তো থাকেই। শিকারি মাত্রই তা জানেন। হাড়িবন্ধুর বড় সম্বন্ধী রাম তা জানতে পারে কিন্তু ওই অঞ্চলের শিকারি যারা এবং হাতিগির্জার সেই বিখ্যাত শিকারি ফাটা-রহমানও একথা বুঝতে পারল না থাবার দাগ দেখার পরও, তা হতে পারে না।

ঋজুদা বলল, ব্যাপারটা রহস্যময় ঠেকল কিন্তু রহস্যটা কীসের তা বুঝতে পারলাম না।

আর কিছুদূর যাবার পরই মড়িটা পাওয়া গেল। বড় বাঘ যেমন করে খায় তেমনই গোরুটার পেছন দিক থেকে খেয়েছে আগে। তারপর তলপেটে দুধের ওলান দুটো বাঁট-টাট সুষ্ঠু খেয়েছে। ডান উরু আর পেছনের সংযোগস্থল থেকেও খেয়েছে কিছুটা। এখানেও দাগ যতটুকু আছে, তাতে আমার মনে হল এ। গোরুখেকো চিতা নয়, বড় বাঘই।

চারদিকে নজর করে দেখলাম যে তেঁতরা, মিটকুনিয়া, রসসি, আম, বাঁশঝাড় এবং সেগুনের জঙ্গলই বেশি। জংলি তেঁতুল ও জামও আছে। আম এতই বেশি যে পাথর-টাথরের উপরে বাঘের প্রতীক্ষাতে রাতে বসাটা ভাল্লুকের কারণে অত্যন্তই বিপজ্জনক। কোনও নিষ্ঠাবতী বিধবা ভালুকী আমের ফলার করতে যদি চলে আসে তবে আমি তাতে বাদ সাধলে সে পেছন থেকে অতর্কিতে ফালাফালা করে দিতে পারে আমাকে। আমাদের দেশের বনে ভাল্লুকের মতো বদমেজাজি এবং আনপ্রেডিকটেবল বন্যপ্রাণী আর দুটি নেই। সম্পূর্ণ বিনা প্রয়োজনে সে যে-কোনও মানুষের নাক, কান, চোখ, ঠোঁট খুবলে নিতে পারলে বেজায় খুশি হয়। মানুষের নাক, কান, চোখ, ঠোঁট তার খাদ্যও নয় যে জম্পেশ করে খাবে। তবু শুধু ছেঁড়ার আনন্দেই সে ঘেঁড়ে। আর ভাল্লুকে যদি ছেড়ে, তবে কোনও প্লাস্টিক সার্জনের সাধ্য নেই যে সেই মানুষের বীভৎস মূর্তিকে তিনি মেরামত করেন।

তারপরে বল। তুমি আজকাল বড় ডিরেইলড হয়ে যাও গল্প বলতে বলতে ঋজুদা। হচ্ছিল চিতার গল্প, তার মধ্যে এসে পড়ল বাঘ এবং এখন আবার ভাল্লুক। তার উপরে প্লাস্টিক-সার্জন।

ঋজুদা হেসে বলল, বনের গল্প এরকমই হয়। এখানে সব কিছুই বিশ্বাসযোগ্য এবং কিছুই বিন্যস্ত নয়। এখানে আগে থেকে কিছুই ঠিক করে রাখা যায় না এবং ভবিষ্যৎও দেখা যায় না। প্রতি মুহূর্তেই বর্তমান এখানে অতীত হয়ে যায় যেমন, তেমন বর্তমান আবার ভবিষ্যতেও গড়িয়ে যায়।

– তাই তো দেখছি।

বিজ্ঞ ভটকাই বলল।

ঋজুদা পাইপটার ছাই ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে বলল, দাঁড়া। দাঁড়া। পাইপটা ভাল করে ভরে নিয়ে ভাল করে স্মৃতি হাতড়াই। যেসব কথা তোমাদের বলছি সে কী আজকের কথা।

ইতিমধ্যে রেঢ়াখোলের দিক থেকে একটা মান্ধাতার আমলের জরাজীর্ণ মোটর সাইকেলে দু’জন লোক আসছে দেখা গেল, বৃষ্টিভেজা পথ দিয়ে, দু’ পাশের বৃষ্টিভেজা জঙ্গলে মোটর সাইকেলের ভটভটানি শব্দর জোর অনুরণন তুলে। মোটর সাইকেলটা ক্রমশ তার বেগ কমাতে কমাতে আসছিল। কাছে আসতেই, আমরা উৎসুক হয়ে তাকালাম। যে চালাচ্ছে, সে একজন হৃষ্টপুষ্ট মানুষ, আর তার পিছনে, চুলে কদমছাট লাগানো রোগাপটকা একজন মাঝবয়সি মানুষ বসে আছে। তার কাঁধে একটা থার্মোফ্লাস্ক ঝুলছে।

মোটর সাইকেলটা থামতেই ঋজুদা স্বগতোক্তি করল, হাড়িবন্ধু! তু কেমিতি জানিলু যে আম্মমানে এটি আসি।

আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি হেসে হাড়িবন্ধু নামের ব্যক্তিটি বলল, মু আউ কেমিতি জানিবি? রেঢ়াখোল যাইথিলি। সেটি আপনাংকু ড্রাইভার ত্রুষ্ণকু ভেটিল। তাই বাস থেকে নেমে মোড়ের দোকান থেকে আপনাদের জন্য একটু পান্তুয়া, কুচো, নিমকি আর চা নিয়ে এলাম। একটু আগেই বাসে করে আপনাদের সামনে দিয়ে গেছি। আপনাদের দেখে গেছি। ত্রুষ্ণ বলল যে, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে ফিরে আসবে আর্মেচার নিয়ে।

ভটকাই বলল, ফাসকেলাস কাম্ব করিলা ভাই হাড়িবন্ধু।

তিতির বলল, হাউ থটফুল অ্যান্ড নাইস অফ হিম।

আমি বললাম, কী কো-ইনসিডেন্স! হাড়িবন্ধু কী করে জানল যে এখানে একজন পান্তুয়া-খাঁই আছে!

তারপর আমাদের চা আর নিমকি খাইয়ে, ঋজুদার কুশল নাকি সে আগেই মহানদী কোলফিল্ডস-এর গাড়ির ড্রাইভার ষ্ণ দাসের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল, তাই কুচুয়া গ্রামের সকলের কুশল জানিয়ে হাড়িবন্ধু আবার মোটর সাইকেলের পিছনে বসে ফিরে গেল। যাবার আগে জিজ্ঞেস করে গেল আমাদের আর কিছু সেবা করতে পারে কি না।

ঋজুদা বলল, আর কিছুই লাগবে না। চা আর নিমকি সত্যিই খুব ভাল খেলাম।

–বল, পান্তুয়াও।

ভটকাই বলল।

তারপর মোটর সাইকেল আরোহীকে দেখিয়ে ঋজুদা বলল, এই ভদ্রলোক কে? তোমার কেউ হয়?

না বাবু। ওঁর বাড়ি চারমল-এ। রেঢ়াখখালের মোড়ের চায়ের দোকানে বাবু চা খাচ্ছিলেন। আপনার কথা বলতেই উনি আমাকে নিয়ে এলেন এবং জুজুমারাতে নামিয়েও দেবেন বললেন। আপনার কথা এই অঞ্চলের সব মানুষই মনে রেখেছে, যদিও বহুদিন হয়ে গেছে। তখন আমি সবে বিয়ে করেছি ছেলেমেয়েও হয়নি আর এখন আমার ছেলে এবং মেয়ের ঘরেও নাতি-নাতনি হয়ে গেছে।

তারপরই চালকের পিছনের সিট-এ বসে দু হাত দু’দিকে তুলে দার্শনিকের মতো হাড়িবন্ধু বলল, সময় কী করে যায়। সত্যি! আমাদের এই জীবনটা বড়ই ছোট বাবু।

ঋজুদা মাথা নাড়ল।

তারপর মোটর সাইকেলটা আবার ভটভট করতে করতে চলে গেল।

হাড়িবন্ধুর উচ্চারিত কথাগুলি পথের দু পাশের ঝাঁটি জঙ্গলে আর ভিতরের গভীর বনে হাওয়ার সঙ্গে হুটোপাটি করতে লাগল। কিছু কিছু কথা, কিছু কিছু মুহূর্ত ঘরের বাইরে, বনের মধ্যে, মনের মধ্যে-ভিতরে এমন করে আলোড়ন তোলে যে তা বলার নয়। আমরা সকলেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাড়িবন্ধুর হঠাৎ ছুঁড়ে দেওয়া কথা কটির গভীরতাতে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। এমনকী ভটকাই-এর মতো বাঁচালও চুপ করে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিতির বলল, এবারে ক্যাটল লিফটারটার গল্পটা শেষ কর ঋজুদা। গৌরচন্দ্রিকাটা বড্ডই লম্বা আর কমপ্লিকেটেড হয়ে যাচ্ছে।

ভটকাই বলল, ঠিক তাই। এবারে কাম টু দ্য পয়েন্ট, প্লিজ।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল। তারপর একটা আম গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শুরু করল আবার।

–রাম-এর কথা শুনে এবং ওই চিতা নামক বাঘের সম্বন্ধে যা-কিছু আগে শোনা গেছিল তাতে ওই জনশ্রুতির মধ্যে যে এক রহস্য আছে তা আমার মনে হচ্ছিল। সে রহস্য পরে উদঘাটিত হয়েছিল কিন্তু তোরা তো রহস্যগল্প শুনতে চাসনি আমার কাছে, চেয়েছিস শিকারের গল্পই শুনতে।

–হ্যাঁ। তাই তো!

–তাহলে শোন বলি। গোরুর মড়ি দেখে এবং তার আগে বাঘের থাবার দাগ দেখে আমার কোনও সন্দেহই ছিল না যে সেটা বাঘই, চিতা নয়। এবং তাই যদি হয় তাহলে মারা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। মানুষখেকো তো নয়, গোরু-খেকো। তা ছাড়া বাঘ wide hearted gentelman তাকে wide hearted মানুষেরই মতো মারা ভারি সহজ। এবং সহজ বলেই পশু-পাখির রাজা বাঘ এখন অবলুপ্তির পথে। চিতাগুলো ছিঁচকে। মিচকে শয়তান। মানুষের বসতির আশেপাশেই তাদের বাস বলে মানুষের অভ্যেসও তাদের জানা। তাই তাদের মারা অনেকই কঠিন। তা ছাড়া তারা মানুষই মারুক কি পশু, মারে রাতের বেলা। বাঘ বেপরোয়া। সে দিনের বেলাতেই বেশি মারে বলেই তাকে সহজে কাবু করতে পারে শিকারিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *