হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
অগ্নিদেবী পিলির ভক্তবৃন্দ
চারদিক খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পেরেছি আমার অবস্থা হয়েছে রবিনসন ক্রুশোর মতো। যেখানে বসে আছি, তার নীচে হ্রদ। হ্রদের একটা দিক সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত। বাকি তিনদিকে পাহাড়। খাড়া দেওয়ালের মতো পাহাড়। হ্রদের জলে হাজার-হাজার পাখি ভেসে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের সঙ্গে একটা চওড়া নালা দিয়ে হ্রদের যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে জলটা প্রচণ্ড ফুঁসছে। কিন্তু হ্রদের ভেতর তত ঢেউ নেই। মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে। জলে বসছে। আবার তুমুল চেঁচামেচি করতে করতে উড়ে যাচ্ছে।
পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট্ট চাতালে বসে থাকতে থাকতে আমার ভিজে পোশাক শুকিয়ে গেছে। এখন বেলা প্রায় বারোটা বাজে। হ্রদের ওপর দিয়ে একটু আগে একটি হেলিকপ্টার উড়ে গেছে। আমি চিৎকার করেছিলাম কিন্তু ওরা লক্ষ করেনি। খুব দমে গেছি। আমার ওপর দিকে পাহাড় এত খাড়া, ওদিক দিয়ে ওঠা অসম্ভব। অথচ একটা কিছু করতেই হবে।
বসে থাকতে থাকতে চোখে পড়ল, চাতালটার নীচে যে ফাটল দিয়ে আমি উঠেছি, তার ভেতর একস্থানে একটা প্রকাণ্ড গর্ত রয়েছে। গর্তটা কালো দেখাচ্ছে। ওর ভেতর ঢুকলে আবার সুড়ঙ্গ নদীতে পড়ব কিনা কে জানে! তবু চেষ্টা করা যেতে পারে।
সাবধানে নেমে গর্তটার কাছে গেলাম। পা রাখার জায়গা গর্তের বাইরে কোথাও নেই। তাই পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ধরে গর্তের ভেতর ঢুকে পড়লাম। এতক্ষণে মনে পড়ল আমার পকেটে একটা গ্যাস লাইটার আছে। গর্তটা প্রায় একগজ চওড়া, গজ দুই উঁচু। দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে। লাইটার জ্বেলে যেটুকু দেখতে পেলাম তাতে প্রমাণ পাওয়া গেল একসময় এখানে মানুষ এসেছিল। কারণ এক কুচি কাগজ আর কয়েকটা পোড়া সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। (আশায় নেচে উঠলাম। মানুষ এখানে যদি এসে থাকতে পারে, যাওয়ার পথও নিশ্চয় আছে)।
লাইটার নিভিয়ে যা থাকে বরাতে ভেবে সাবধানে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা যাওয়ার পর ফের লাইটার জ্বালি আর দেখে নিই। আবার কিছুটা এগিয়ে যাই। এমনি করে অনেকটা গিয়ে টের পেলাম এটাও একটা গুহা। ক্রমশ ভেতরটা হলঘরের মতো চওড়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু ওয়েইকাপালির মতো কোনো দুর্গন্ধ টের পাচ্ছি না। বরং কী একটা মিঠে গন্ধ মাঝে মাঝে আবছাভাবে নাকে ভেসে আসছে। গন্ধটা কীসের হতে পারে? এমন মিঠে গন্ধ আমার অচেনা।
তাহলে কি এটাই হায়েনার তিননম্বর গুহা মানিনিহোলা’? এই গুহাটার কথা জনখুড়োর কাছে শুনেছিলাম। এটার নাম শুকনো গুহা। কারণ কী? তলায় সুড়ঙ্গ নদী নেই বলে? জনখুড়ো বলতে পারেনি। শুধু বলেছিলেন, পলিনেশীয় ভাষায় একে বলা হয় শুকনো গুহা।
যে জন্যেই শুকনো গুহা বলা হোক, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর মেজাজ নেই। আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে, এটাই আসল কথা। নইলে রবিনসন ক্রুশোর মতো জীবন কাটাতে হবে।
লাইটারের গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। তাই অন্ধকারে দেয়াল ছুঁয়ে হাঁটছিলাম। একখানে দেয়ালটা বাঁদিকে বেঁকে গেছে। সেখানে বাধ্য হয়ে লাইটার জ্বালালাম। চোখে পড়ল, ওয়েইকাপালির মতো এখানেও উঁচু বেদির ওপর একটা মূর্তি রয়েছে। বেদির ওপর মূর্তির পায়ের কাছে একগাদা শুকনো ফুল। আবার লাইটার জ্বেলে মূর্তিটা দেখতে গিয়ে অবাক হলাম। এটা কন-টিকির মতো কালো নয়, হলুদ রঙের পাথরে তৈরি। তা ছাড়া এটা দেবীমূর্তি। কিন্তু কী হিংস্র চেহারা! লাইটারের গ্যাস হঠাৎ এসময়ে পুড়ে শেষ হয়ে গেল।
আবার দেয়ালের দিকে পা বাড়িয়েছি, অমনি অন্ধকারে ঠাণ্ডা কিছু আমার কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং মুখ চেপে ধরল। ঠাণ্ডা হিম দুটো ছোট্ট হাত। চেঁচিয়ে ওঠারও সুযোগ পেলাম না।
কিন্তু তখুনি টের পেলাম, মিনিহুনের খপ্পরে পড়েছি। ওয়েইকাপালিতে জ্যোৎস্নাও তা হলে ঠিক এইভাবে ব্যাটাচ্ছেলের পাল্লায় পড়েছিল।
একটা দুটো নয়, মনে হচ্ছিল একপাল মিনিহুন আমার ওপর নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং আমাকে তারা চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল অন্ধকারে। আমার কাঁধের মিনিহুন মুখটা শক্ত করে ধরে রইল। মনে হল, বাধা দিলে ও আবার হাড় গুঁড়ো করে ফেলবে।
কিন্তু আশ্চর্য, নাকটা খোলা থাকায় সেই মিঠে গন্ধটা ক্রমশ তীব্র হয়ে ভেসে আসছিল। এত তীব্র যে গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকল। তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ….
যখন জ্ঞান হল, তখন দেখলাম একটা চারকোণা ঘরের মেঝের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি। আমার হাতপা বাঁধা হয়নি। কিন্তু গায়ে এতটুকু জোর নেই যে উঠে দাঁড়াই। ঘরের দেয়ালে অসংখ্য দেবীমূর্তির চুলগুলো সাপের মতো ফণাতোলা এবং দুচোখে রাগ ঠিকরে পড়ছে। সামনে একটা সোনালি রঙের সিংহাসন। সিংহাসনে কেউ নেই। সিংহাসনের মাথার ওপর রাজছত্র থেকে হলদু রঙের আলো ছড়াচ্ছে। ঘরের ভেতর একেবারে ফঁকা। বিদঘুঁটে প্রাণীগুলো গেল কোথায়?
অতিকষ্টে দেওয়ালে ভর করে উঠে দাঁড়ালাম। মেঝেয় কোন কালের পুরোনো কার্পেট পাতা রয়েছে। ছাদেও সেই রকম দেবীমূর্তি আঁকা। চারদিক থেকে হিংস্রদৃষ্টিতে মূর্তিটা আমাকে যেন গিলে ফেলতে চাইছে।
সিংহাসনের ওপর রাজছত্রের আলোটা স্থির। কাছে গিয়ে মনে হল, ওটা সাধারণ কোনো আলো নয়। সম্ভবত কোনোরকম রত্নপাথর। তা থেকে আলো ছড়াচ্ছে।
ঘরের দেয়াল একেবারে নিরেট। কোথাও দরজার চিহ্নটি নেই। ভারি অদ্ভুত তো!
চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখে নিচ্ছি, হঠাৎ সিংহাসনের পেছনের দেয়ালের একটা অংশ ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর আঁতকে উঠে দেখলাম, দুটো কালো কদর্য বাঁদরজাতীয় খুদে মানুষ–হ্যাঁ সেই মিনিহুন ওরা–ঘরে ঢুকল। তাদের দুজনের হাতে দুর্কাদি কলা।
আমি পিছিয়ে এসে দেওয়ালে পিঠ রেখে দাঁড়িয়েছি। ওরা কলার কঁটি দুটো আমার সামনে রেখে একসঙ্গে কালোমুখের সাদা দাঁত বের করে বলল–হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ উঁয়া উঁয়া।
অবিকল এইসব শব্দ। নিশ্চয় এটাই ওদের ভাষা। আমাকে কি অতগুলো কলা খেতে বলছে ব্যাটাচ্ছেলেরা? ওই কলা একটা খেলেই আমার পেট পিপের মতো ফুলে উঠবে যে।
ভয়ে ভয়ে হকুম মেনে একটা কলা ভেঙে নিলাম। খিদেও প্রচণ্ডরকম। কলাটা খুব সুস্বাদু, স্বীকার না করলে পাপ হবে। দুই মিনিহুন গম্ভীর মুখে আমার খাওয়া দেখলে কিছুক্ষণ। তারপর সেইরকম বিদঘুঁটে হুঁ হুঁ করে চলে গেল। দরজাটা আবার দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেল।
তাহলে এদের যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, ততটা মোটেও নয়। বরং ভদ্র বলেই মনে হচ্ছে। আমি ক্ষুধার্ত টের পেয়ে খাদ্য দিয়ে গেল যখন।
কিন্তু জলতেষ্টা পেয়েছে যে। এবার যদি এককাদি ডাব দিয়ে যেত, কী সুখের না হত। এসব দ্বীপে নারকোল গাছের জঙ্গল হয়ে আছে। লোকের বাগান থেকে এ ব্যাটারা নিশ্চয় কলাগুলো চুরি করে আনে। ডাব পেড়ে আনে না কেন?
কী কাণ্ড! ওরা কি মনের কথা টের পায়? দরজাটা খুলে গেল। তারপর সত্যি সত্যি দুটো মিনিহুন। (এরা নিশ্চয় আগের দুজনই) এক কাঁদি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ডাব এনে বলল,–হুঁ হুঁ হুঁ, হিঁ হিঁ হিঁ উঁয়া উঁয়া।
মুখে মিঠে হাসি রেখে বললাম,–খেতে তো বলছ। কিন্তু ডাব কাটার অস্তর চাই যে। ছুরিটুরি নেই তোমাদের।
ইশারায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলাম। ওরা মুখ তাকাতাকি করল। তারপর দুজনে একটা করে ডাব পটাপট ছেড়ে আর বোঁটার দিকটা হ্যাঁচকা দিকটা হ্যাঁচকা টানে ওপড়ায়। জল ছলকে পড়ে। কী দারুণ জোর ওদের গায়ে!
প্রাণভরে ডাবের জল খেলাম–পর পর তিনটে। পেট ফুলে ঢোল হল। হাত নেড়ে বললাম,–থাক্ থাক্। এই যথেষ্ট হয়েছে বন্ধুরা।
ওরা এবার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভূতুড়ে হেসে উঠল, হিঁ হিঁ হিঁ। পিলে চমকানো হাসিরে বাবা। বললাম,–থা। থাক্। আর হাসে না।
ওরা পিটপিটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
বললাম,–হ্যাঁ–অসংখ্য ধন্যবাদ আমার খুদে বন্ধুরা। এবার দয়া করে আমাকে বাইরে পৌঁছে দাও দিকি।
কে জানে কেন, ওরা আমাকে জিভ ভ্যাংচাতে শুরু করল। দেখে তো বেজায় ভড়কে গেলাম। কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম,–আচ্ছা আচ্ছা। আর বেরুবার নাম করব না। দোহাই বাবা, আর অমন বিচ্ছিরি ভেংচি কাটে না।
ওরা এবার আমাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে শুরু করল। আমেরিকায় বুড়ো আঙুল দেখানোর খুব আনন্দের এবং বন্ধুতার ব্যাপার। আমি ওদের বুড়ো আঙুল দেখাতে থাকলাম। তখন ওরা সাদা দাঁত বের করে ফের হেসে উঠল, হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ।
এক সময় দরজা খুলে গেল এবং তুম্বো চেহারার এক মিনিহুন ঢুকে হুঁ হুঁ করে কিছু বলল। তখন আমার খুদে বন্ধুদ্বয় আমার দুহাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল।
করিডোরে সুন্দর একফালি পথ। সেইরকম আলো জ্বলছে। তলায় তেমনি কার্পেট বিছানো রয়েছে। কিছুদূর চলার পর সামনের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখি প্রকাণ্ড হলঘরের মধ্যে প্রায় শ’খানেক মিনিহুন গম্ভীরমুখে বসে রয়েছে। উঁচু বেদির ওপর যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে দেখে চমকে উঠলাম।
অবিকল সেই দেবীমূর্তির মতো চেহারাও। গায়ের রঙ উজ্জ্বল সোনালি। কোঁকড়ানো লাল একরাশ চুল মাথায়। পরনে ঝলমলে হলুদ রঙের আলখাল্লার মতো পোশাক।
আমাকে বেদির সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে মিনিহুনদ্বয় সরে গিয়ে ভিতে বসে পড়ল। বেদির মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই বুঝতে পারলাম স্বর্গের কোনো দেবী টেবী নন মোটেও মেমসাহেব না হয়ে যান না।
আমার অনুমান সত্যি হল তখনি। মহিলাটি আমেরিকান উচ্চারণের ইংরাজিতে বলে উঠলেন,–আই অ্যাম দা ফায়ার-গডেস পিলি। আমি অগ্নিদেবী পিলি। সারা প্রশান্ত মহাসাগরের পলিনেশীয় দ্বীপগুলোতে এক সময় আমার স্বামী সূর্যদেব কনটিকি এবং আমার পুজো হত। বর্বর ইউরোপীয় জাতির লোক আমাদের পুজো বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ওদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। আমার হিংস্র হায়েনার দল ওদের সামনে পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলে। ওয়েইকাপালির দরজায় খুলি এবং হাড়ের পাহাড় গড়ে তুলেছি। দেখে যেন ওদের শিক্ষা হয়।
আঁতকে উঠে বলে ফেললাম, মাননীয় মহোদয়া! আমি মোটেও ইউরোপীয় নই। আমি একজন ভারতীয়। আমার চেহারা আর গায়ের রঙ দেখুন।
কথাগুলো ‘অগ্নিদেবী’ কানে নিলেন বলে মনে হল না। হেসে উঠলেন। বড় হিংস্র হাসি। আর তার কালো কুচকুচে খুদে ভক্তবৃন্দও একসঙ্গে বিকট ভূতুড়ে হাসি হাসতে লাগল- হিঁ হঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ …
