হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ওয়েই কাপালির ভেতরে
ঝলমলে রোদ্দুরের দিন। তাই খাড়ির মাথায়, পার্কে, কিংবা খাড়ির নীচে যেখানে নেমে যাওয়ার পথ আছে এবং পাথরের চওড়া চাতালে সমুদ্রের জল লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, সেখানে নাচগানের আসর জমে উঠেছে। প্রতি আসরে ফুলের পোশাক পরা পলিনেশীয় মেয়েরা তো আছেই–পৃথিবীর নানা দেশের লোকেরাও রঙিন পলিনেশী পোশাক পরে নাচছে। আঁতকে উঠলাম দেখে, তোলপাড় করা জলেও লম্বাটে ছিপনৌকোর মতো ক্যানো ভাসিয়েছে দুঃসাহসীরা।
ববের মারকিন রক্ত লাফিয়ে উঠল সেই দৃশ্যে। বলল,–হাই জোনা। চলো আমরা নীচে নেমে যাই। তারপর একটি ক্যানো ভাড়া করে নাকানিচুবানি খেয়ে আসি।
জ্যোৎস্না বলল,–দারুণ জমবে। চলুন জয়ন্তদা।
আমি আঁতকেই ছিলাম। মিনমিনে গলায় বললাম,–দ্যাখো জ্যোৎস্না, আমি পশ্চিমবঙ্গের ঘটি। পাহাড়জঙ্গল যদিবা চষে বেড়াতে পটু, জল দেখলেই আমি বেড়ালের মতো ভয় পাই। তমি বাঙাল মেয়ে। জলের দেশের জলকন্যা। তোমার পক্ষে যা সম্ভব, আমার পক্ষে তা অসম্ভব।
বব খপ করে আমার হাত ধরে বলল,–এসো। তোমাকে আমরা সাঁতার শেখাবো।
জ্যোৎস্না খিলখিল করে হেসে উঠল। বব একটা প্রায় খাড়া ফাটল দিয়ে আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। মাধ্যাকর্ষণেরও টান আছে। তাই নীচের একটা চাতালে পৌঁছতে মিনিট দুইয়ের বেশি লাগল না। অথচ চাতালটা প্রায় হাজার ফুট নীচে।
চাতালের কিনারায় সমুদ্রের জল এসে ফণা তুলছে। ছড়িয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কেমন একটা আঁশটে গন্ধ জলের। অসংখ্য সমুদ্রপাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। ডাকাডাকি করছে। জলের গর্জন, পাখির ডাক, তার ওপর হাওয়াইয়ান নাচগান ও বাজনার চোটে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। খাড়িটা প্রায় সিকি কিলোমিটার চওড়া। সামনে তুলকালাম জলে চাপচাপ সাদা ফেনা দুলছে। তার তলায় পাথর আছে। নৌকোর তলা এক ধাক্কায় ফুটো হবার সম্ভাবনা; তার মধ্যে পলিনেশীয় মাঝির হাঁটু অব্দি নাগাদের মতো রঙিন লুঙি জাতীয় পোশাক এবং মাথায় হলুদ টুপি পরে বৈঠা চালাচ্ছে। ওদের নৌকো চালানোর দক্ষতা দেখে তাক লাগছিল।
জ্যোৎস্না এক ফুলওয়ালীর কাছে একগুচ্ছ ফুল কিনল। তারপর ফুলগুলো মাথায় এবং কোমরে চমৎকার গুঁজে নিল। তখন ওকে মনে হল বাঙাল মেয়েটা এবার পলিনেশীয় মেয়ে হয়ে উঠেছে। বব ক্যানো নৌকা ভাড়া করছিল। বাদরি করে ঘণ্টায় দশডলারে রফা হল। তার মানে প্রায় আশি টাকা। আমার ইচ্ছে করছিল এবার ভোঁ দৌড় করে পালিয়ে যাই। কিন্তু হাজার ফুট খাড়া চড়াই ভেঙে ওঠা সহজ কথা নয়।
ক্যানোটা জলের ধাক্কায় প্রচণ্ড দুলছে। দুজন পলিনেশীয় মাঝি সামনে পেছনে বসেছে। প্রথমে জ্যোৎস্না নামল। তারপর সে হাত বাড়াল আমার দিকে। বব আমাকে পেছন থেকে এমন ধাক্কা মারল যে আর একটু হলেই জলে পড়তাম। জ্যোৎস্না ধরে ফেলল। তখন টের পেলাম, বাঙাল মেয়েটার গায়ে তো অসম্ভব জোর। রোসো, আমিও খাঁটি ঘটি। তোমার প্রতাপ জলে, আমার ডাঙায়। সময় এলে বুঝিয়ে দেব, এই জয়ন্ত চৌধুরী কী জিনিস।
ক্যানো নৌকার ভেতর প্রাণ হাতে করে বসে রইলাম। উথাল-পাথাল জলে ক্যানো বেজায় টলমল করছিল। জল গর্জন করে ছুটে আসছে তীরের দিকে। তাই সোজাসুজি এগোনো কঠিন। মাঝিরা তীর বরাবর আশ্চর্য কৌশলে এগোল। তারপর এখানে জলের মধ্যে বড় বড় পাথর থাকায় ভেতরে জল অনেকটা মেজাজ বদলে ভালোমানুষ হয়েছে। সেখানে পৌঁছে জ্যোৎস্না পলিনেশীয় ভাষায় মাঝিদের কিছু বলল। তার মধে শুধু ‘ওয়েইকাপালি’ কথাটা বুঝতে পারলাম।
জলের ঝাঁপটায় ততক্ষণে আমরা সবাই ভিজে গেছি। ক্রমাগত ভিজছি। ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে। বললাম,–জ্যোৎস্না ওয়েইকাপালি গুহার কথা বললে নাকি ওদের?
জ্যোৎস্না হাসল। হা, জয়ন্তদা। ওই যে পুবের দেয়ালমতো জায়গা দেখছেন, ওখানেই ওয়েইকাপালির গুহা। বললাম ওদের রাজা হোলাহুয়ার পুজো দিতে যাচ্ছি। ওরা তাই খুব খুশি। তবে বাড়তি দু ডলার লাগবে।
বব বলল,–দেবো।
অনেক পাথরের গলিখুঁজির ভেতর দিয়ে এগিয়ে এক সময় মাঝিরা আমাদের আরেকটা ছোট্ট চাতালমতো জায়গার সামনে পৌঁছে দিল। একে-একে আমরা উঠে গেলাম। মাঝিরা ক্যানোতে অপেক্ষা করতে থাকল।
বললাম,–জ্যোৎস্না, তুমি কি আগে এ গুহায় এসেছে কখনও?
জ্যোৎস্না বলল,–আমাদের রেস্তোরাঁর পরিচারক জুহুর সঙ্গে একবার এসেছিলাম। জুহু এখানে মানত করতে এসেছিল। তবে ভেতরে বেশি দূরে ঢুকিনি। ভীষণ অন্ধকার। তাছাড়া একগাদা মড়ার খুলি আর হাড়গোড় পড়ে থাকতে দেখেছি।
বব মুচকি হেসে বলল,–তাহলে নিশ্চয় ভূত আছে ভেতরে।
আমার শার্টের পকেটে ভাগ্যিস জনখুড়োর সেই অনুবাদের কাগজটা রয়ে গেছে। বললাম,–জ্যোৎস্না। এসেই পড়লাম যখন, তখন দক্ষিণ সাত গজ পূর্ব দুফুট বাঁদিকে কবচ’ ব্যাপারটা তদন্ত করে দেখতে চাই। কাগজটা আমার সঙ্গেই আছে।
জ্যোৎস্না চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে চাপা গলায় বলল,–কিন্তু যদি মিনিহুনের পাল্লায় পড়ি।
বব আস্তিন গুটিয়ে বলল,–আমি ক্যারাটের পঁাচ জানি। ভেবো না।
প্রচণ্ড হাওয়ার ঝাঁপটানিতে এবং রোদ্দুরে আমাদের পোশাক একটুতেই শুকিয়ে গেছে। এখন হাওয়াটা তত ঠাণ্ডা না, এই রক্ষে। জ্যোৎস্না চাতাল থেকে পা বাড়িয়ে বলল,–সাবধানে আসুন।
অজস্র জোটবড় পাথর পড়ে আছে। কিছুটা ঢালু খাড়া দেওয়ালের মতো জায়গায়। পাথরগুলো কোন যুগে ওপর থেকে ভেঙে গড়য়ে এসে বাড়ির গায়ে আটকে রয়েছে। তার ভেতর সাবধানে প্রায় তিনশ ফুট ওঠার পর একটা ফাটল দেখতে পেলাম। ফাটলটা চওড়াতে একগজ, লম্বায় দুগজ। জ্যোৎস্না বলল,–এই হচ্ছে ওয়েইকাপালি গুহার মুখ। ভেতরে কিন্তু হলঘরের মতো চওড়া।
বব বলল,–আহা! বুদ্ধি করে একটা টর্চ আনলে কত ভালো হত।
জ্যোৎস্না পকেট থেকে একটা খুদে টর্চ বের করে বলল,–সে কি আনিনি? আমি আপনাদের নিয়ে এখানে আসব বলেই বেরিয়েছিলাম।
দুষ্টু মেয়ে। তোমার মতলবের কথাটা আগে বললে তৈরি হয়েই আসতাম।
আমার কথা শুনে বব বলল,–বেশি তৈরি হওয়া ঠিক না আমি বরাবর দেখেছি, তৈরি হয়ে কিছু করতে গেলে ফল হয় না। চলো, ঢুকে পড়া যাক্।
বললাম,–একমিনিট। জ্যোৎস্না, এটা ওয়েইকাপালি। কিন্তু ওয়েইকোনালোয়া গুহাটা কোথায়?
জ্যোৎস্না বলল,–সেটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। বাঁদিকে একটু ওপরে। সেখানে কেউ যায় না। যাওয়াও খুব কষ্টসাধ্য। তবে আমাদের পরিচারক জুহুর কাছ থেকে শুনেছি, দুটো গুহার মধ্যে যোগাযোগ আছে। কোথায় নাকি একটা সুড়ঙ্গ পথ আছে।
গুহার ফাটল দিয়ে আগে ঢুকল জ্যোৎস্না, কারণ সে আগে একবার এসেছে। তার পেছনে বব। শেষে আমি। ঢুকতেই একটা বিটকেল গন্ধে গা ঘুলিয়ে উঠল। নাকে রুমাল চাপা দিলাম তিনজনেই।
ভেতরটা সত্যি প্রকাণ্ড হলঘরের মতো। বাইরের আলোর ছটায় সামান্য কয়েক গজ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। তার ওধারে ঘন কালো আঁধার। জ্যোৎস্নার খুদে টর্চের আলো কিন্তু দারুণ জোরালো। ইলেকট্রনিক বাতি আসলে সেই আলোয় যা দেখলাম, ভীষণ চমকে উঠলাম।
দুধারে জড়ো করা আছে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি আর হাড়গোেড়। এই রহস্যময় গুহার ভেতর যেন রাক্ষস-খোক্কসের বাস। মানুষ ধরে খেয়েছে এখানে। গা ছমছম করতে থাকল। বব একটা খুলি তুলে নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে থাকল, হাই ম্যান! হাউ আর ইউ?
হঠাৎ জ্যোৎস্না বলল,–চুপ! কী একটা শব্দ পাচ্ছি যেন।
সে আলো নেবালো। অন্ধকারে দূরে কারা চাপা গলায় কথাবার্তা বলছে যেন। কারা ওরা?
বব ফিসফিস করে বলল,–জ্যোৎস্না টর্চ দাও। আমি একটু এগিয়ে দেখে আসি ব্যাপারটা কী?
জ্যোৎস্না টর্চ দিয়ে বলল,–বেশি দূরে যেও না। আর সাবধান, দরকার না হলে টর্চ জ্বেলো না।
বব অন্ধকারে এগিয়ে গেল। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। নাকে রুমাল চেপেই রেখেছি–সরালে দুর্গন্ধে নাড়িভুড়ি উগরে আসছে।
ববের ফেরার নাম নেই। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি ক্রমশ। সেই কথাবার্তার আওয়াজ কিন্তু সমানে শোনা যাচ্ছে।
কতক্ষণ পরে বব অন্ধকার থেকে ছিটকে এসে পড়ল। ব্যস্তভাবে বলল, কোকো পাম হোটেলের বেলক্যাপ্টন সেই টিহোব্যাটাকে দেখলাম মনে হল। তার সঙ্গে জনাতিনেক লোক আছে। গুহার ভেতরটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে, তাই ওদের আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তাছাড়া বাঁকের মুখে প্রকাণ্ড বেদীতে একটা মূর্তি আছে। ওরা মূর্তির পেছনে গজ-ফিতে দিয়ে মেঝেয় মাপছে। কিন্তু তার চেয়ে অবাক কাণ্ড, টিহোর কাঁধে সম্ভবত একটা মিনিহুন বসে আছে দেখলাম। কালো কুচকুচে বাঁদরের মতো। দেখবে এসো।
অন্ধকারে ববের পেছনে দেয়াল ধরে-ধরে আমরা এগোলাম। অনেকটা এগিয়ে বব ফিসফিস করে বলল,–এবার বাঁদিকে।
বাঁদিকে ঘুরতেই প্রথমে চোখে পড়ল দূরে আলোর ঝলক। একটা মার্কারি ল্যাম্প জ্বলছে। ছায়ার মতো কয়েকটা লোক কীসব করছে টরছে। সামনের বেদির ওপর একটা বিশাল মূর্তি। তার পাশ দিয়ে গেছে করিডোরের মতো গুহা-পথ। আমরা বেদির পেছনে গিয়ে উঁকি মেরে ওদের ব্যাপার-স্যাপার দেখতে থাকলাম।
