হায়েনার গুহা (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

মিহিহুনের রসিকতা

 

আমেরিকানদের টেলিফোন ব্যবস্থা খাসা। কাউয়াই দ্বীপেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পনেরো মিনিটের মধ্যে কলকাতার লাইনে পেয়ে গেলাম। তারপর সুপরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কান জুড়িয়ে গেল।

 

সেই আগস্টমাসে আমেরিকা এসেছি। তারপর বারতিনেক ট্রাংকলে বুড়ো ঘুঘুমশাইয়ের খবর নিয়েছি। উনি পাখি-প্রজাপতি-পোকামাকড় ক্যাকটাস নিয়ে মেতে আছেন আগের মতো। ইদানীং খুনখারাপি বা রহস্যে টান নেই। ওঁর মতে, পৃথিবী দিনেদিনে রহস্যহীন হয়ে পড়েছে। আজকাল খুনিরা সবার সামনে খুনখারাপি করে। আগের দিনে খুনিরা ছিল ভীষণ ভীতু। কত সাবধানে খুন করত। তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হত। আজকালকার খুনি ড্যামকেয়ার। কাজেই রহস্য-টহস্য নেই এসব জিনিসে। এদিকে অ্যাডভেঞ্চারও বিজ্ঞানের দৌলতে সস্তা হয়ে গেছে। দুর্গম বলে কোনো জায়গা নেই। আর গুপ্তধন? কর্নেলের ধারণা, সব গুপ্তধন মানুষ হাতিয়ে নিয়েছে দিনে-দিনে। গুপ্তধন বলতে এখন করাকি দিয়ে জমানো কালো টাকা। এসব কাজ আয়কর দফতরের লোকেরাই করে। কাজেই ওসব ছেড়ে কর্নেল প্রকৃতির রহস্যভেদে মন দিয়েছেন।

 

কর্নেল ফোনে মিঠে গলায় বললেন,–সুখবর আছে ডার্লিং! তোমার পাঠানো আরিজোনা অঞ্চলের মরু ক্যাকটাসে কুঁড়ি গজিয়েছে। তুমি ফিনিক্সে ফের গেলে আরও একটা ক্যাকটাস পাঠাবে।

 

বললাম,–তিনমিনিট পরে লাইন কেটে দেবে। ঝটপট লিখে নিন, যা বলছি। কাগজ কলম নিন। নিয়েছেন? লিখুন : ‘টিহো বিশ্বাসী। টিহো রাজবংশীয় …’।

 

পুরোটা বললাম। তারপর কর্নেল আমাকে অবাক করে বললেন,–প্রশান্ত মহাসাগরের জলকল্লোল কানে আসছে, ডার্লিং। তুমি কি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে?

 

হ্যাঁ হাওয়াই দ্বীপে। ম্যাপে দেখে নিন। হায়েনা উপনগরীর কোকোপাম হোটেলে আছি।

 

জানতো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হায়েনায় আমি একসপ্তাহ ছিলাম। জাপানি বোমার আহত হয়ে …

 

আপনি সর্বচর। শুনুন, যা লিখে নিয়েছেন, তাতে সাংঘাতিক রহস্য আছে। ফোনে সব জানানো সম্ভব নয়। আপনি …

 

ডার্লিং, হায়েনাতে যখন আছ, তখন আশা করি মেনেহিউন বা মিনিহুন দেখতে ভুলো না। তিনফুট উঁচু, বানরাকৃতি মানুষ। কুচকুচে কালো। অথচ ওদের নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতি আছে। জয়ন্ত! শুনতে পাচ্ছ তো?

 

আমি বিছানায় বসে ফোন করছিলাম। হঠাৎ কেউ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাতে আমার প্যান্টসুদ্ধ ডান পা চেপে ধরল। দেখি কালো ছোট্ট একটা হাত–অতি কদর্য সেই হাত। শিরা ফুলে আছে। এমন ঠাণ্ডা যে প্যান্ট ও গরম মোজাও বরফ করে ফেলেছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আরে! একি!

 

ফোন তখনও কানে। কর্নেল বললেন,–কী হল ডার্লিং? মিনিহুন নাকি?

 

আর কথা বলার ফুরসত পেলাম না। আমার ঠ্যাং ধরেক হ্যাঁচকা টান মারল কালো খুদে হাতটা। ফোন পড়ে গেল বিছানায়। আমি গড়িয়ে মেঝের কার্পেটে পড়লাম। তারপর চেঁচিয়ে উঠলাম,–বব! বব!

 

ঘরে টেবিলবাতির আলো শুধু। মেঝেতে পড়ে থাকতে থাকতে দেখলাম, কী একটা কালো, বাঁদরজাতীয় প্রাণী দুপায়ে দৌড়ে গিয়ে বাথরুমের দরজা খুলল–অবিকল মানুষ যেমন খোলে। তারপর ভেতরে ঢুকে গেল।

 

সঙ্গে-সঙ্গে উঠে গিয়ে বাথরুমের দরজার হাতল ঘুরিয়ে লক করে দিলাম। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনখুড়োকে ধাক্কা দিলাম।

 

খুড়ো-ভাইপো আমার ধাক্কার চোটে একসঙ্গে মুণ্ডু বের করে বললেন, কী হয়েছে, কী? হয়েছে?

 

দম আটকানো গলায় বললাম,–মিনিহুন কিংবা মেনেহিউন। আমার ঘরে।

 

বব হিহি করে হেসে উঠল। জনখুড়ো বেরিয়ে বললেন, তুমি নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছিলে জয়ন্ত!

 

বব বলল,–দুঃস্বপ্ন।

 

ব্যস্তভাবে বললাম,–শিগগির আমার সঙ্গে আসুন! বিদঘুঁটে জীবটাকে বাথরুমে বন্দী করে ফেলেছি।

 

ওরা দুজনে তখুনি আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। বাথরুমের দরজার সামনে দুধারে খুড়ো-ভাইপো আস্তিন গুটিয়ে জীবটাকে পাকড়াও করার জন্য হুমড়ি খেয়ে বসলেন। আমি, যা থাকে বরাতে বলে দরজার লকটা ঘুরিয়ে খুলে ফেললাম। তারপর দরজার পাশের সুইচ টিপে দিলাম।

 

বাথরুম উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেল। কিন্তু হতচ্ছাড়াটা গেল কোথায়? বাথরুমের মেঝেতে পুরু কার্পেট। সামনে প্রকাণ্ড বেসিন ও আয়না। একধারে কোমোড়, অন্যধারে ঝকমকে বাথটাব। বাথটাবের পর্দাটা যথারীতি গোটানো রয়েছে। মিনিহুন হোক আর যেই হোক, একটা আরশোলারও লুকোবার জায়গা নেই বাথরুমে। তা হলে ব্যাপারটা কী হল?

 

খুড়ো-ভাইপো এবার খ্যাখ্যা করে বেজায় হাসতে লাগল। লজ্জায় পড়ে গেলাম।

 

জন বললেন,–মাই গুডনেস! বুঝতে পেরেছি তুমি কেন গোয়েন্দা গল্প আর অ্যাডভেঞ্চার লেখো! জয়ন্ত, তুমি সত্যি বড় কল্পনাপ্রবণ।

 

বব আমাকে একহাত জিভ দেখালো অর্থাৎ ভেংচি কাটল। হতভম্ব হয়ে বললাম, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি কলকাতায় ট্রাংকল করছিলাম, জন্তুটা ঠাণ্ডা হাতে আমার পা খামচে ধরে হ্যাঁচকা টান মেরেছিল। দেখতে পাচ্ছেন না ফোনটা এখনও বিছানায় উল্টে পড়ে রয়েছে?

 

জন ভুরু কুঁচকে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বব আগের মতো গম্ভীর মুখে বলল, দুঃস্বপ্ন।

 

হঠাৎ জন কান খাড়া করলেন। তারপর ঘুরে দেয়ালের ওপর দিকে তাকালেন। তারপর একটু হেসে বললেন,–হুম! জয়ন্ত কি বাথরুমে ঢুকে সমুদ্র গর্জন শুনতে ভালোবাসে?

 

আমি চমকে উঠলাম। সত্যি তো, পেছনের খাড়ি থেকে গভীর সমুদ্রগর্জন শোনা যাচ্ছে। হাজার ফুট নীচে পাথরের দেয়ালে ধাক্কা মেরে প্রশান্ত মহাসাগর মুহুর্মুহু গর্জন করছে।

 

ওপরে তাকিয়ে দেখি, দেয়াল ও ছাদের মাঝমাঝি জায়গায় তিনফুট লম্বা দুফুট চওড়া কাঁচের লিন্টেল খোলা রয়েছে। জনখুড়ো বললেন,–প্রাণীটা ওই পথেই পালিয়েছে, যদি তোমার স্বপ্ন না হয়।

 

বললাম,–কিন্তু আমি তো ওটা খুলিনি!

 

বব ফিক করে হেসে শিস দিতে দিতে তাদের ঘরে ফিরে গেল। জনখুড়ো বললেন,–ওটা আটকে লক করে দাও। খোলা থাকলে তোমার ঘরের হিটিং সিস্টেম কাজ করবে না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে যাবে।

 

বাথরুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে কানে রাখলাম। লাইন কখন কেটে গেছে। ফোনটা যথাস্থানে রেখে বললাম,–তা হলে কি সত্যি আমার ঘরে মিনিহুন হানা দিয়েছিল? কিন্তু এ কী ধরনের রসিকতা ব্যাটাচ্ছেলের বলুন তো খুডোমশাই? আর বেছে বেছে আমার ঘরেই ঢুকল শেষে?

 

জন গম্ভীর মুখে বললেন,–নিয়তি জয়ন্ত। এ নাম নিয়তি। নিয়তির টানেই তোমাকে ছুটে আসতে হয়েছে হায়েনায়। কারণ তোমার কাছে আছে রাজা হোলায়ার প্রতীকচিহ্ন আঁকা সিগারেটকেস।

 

কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা এবং হন্তদন্ত ববের প্রবেশ।

 

বব বলল,–শিগগির আসুন খুড়ো! ঘরে চোর ঢুকেছিল। আমাকে ঘুষি মেরে প্রায় দুমিনিট অজ্ঞান করে ফেলেছিল! জ্ঞান হতেই দেখি চোর ব্যাটা হাওয়া হয়ে গেছে।

 

জনখুড়ো তাঁর ঘরের দিকে ছুটলেন। আমি এবার আমার ঘরের দরজা বাইরে থেকে লক করে ওদের ঘরে গেলাম।

 

ঢুকে দেখি, জনখুডোর মাথায় হাত। বললেন,–জয়ন্ত! সর্বনাশ হয়ে গেছে। তোমার সিগারেটকেসটা টেবিলে রেখে আরও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিলাম। সেটা নেই।

 

আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। বব ফিক করে হেসে বলে উঠল,–ওঃ হো! এতক্ষণে বোঝা গেল, এঘরে চোর ঢুকবে বলেই জায়েন্টোর ঘরে মিনিহুন পাঠিয়েছিল! ধন্য ধন্য হে চোর চূড়ামণি! তোমার খুরে খুরে দণ্ডবৎ হই। ধন্য তোমার বুদ্ধিকৌশল। আঃ! কী ব্যথা কী ব্যথা!

 

বলে সে তার কালো ছোপ পড়া চোয়ালে হাত রেখে বাথরুমে ঢুকল। …

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *