আট
আজ সন্ধ্যা থেকেই হিমেল হাওয়ার উপদ্রব ছিল। সন্ধ্যায় আর বাইরে বেরোয়নি হনিমুনাররা। রাত নটায় লাউঞ্জে কাল রাতের মতো ককটেল পার্টির আয়োজন করেছিল অনির্বাণ রুদ্র। সেই সঙ্গে তার খরচে ডিনার। ক্যাসেট প্লেয়ারে পপ মিউজিক বাজছিল। অনির্বাণ আগেই ঘোষণা করেছিল, বিকাশ সেনকে পুলিস গ্রেপ্তার করেছে। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ দুবে টেলিফোনে তাকে এই সুখবর দিয়েছেন। তবে দুঃখের বিষয়, তার বন্ধু রমেশ পাণ্ডের। আসার কথা ছিল। আসতে পারছেন না। কারণ তার এক বিশ্বস্ত ড্রাইভার রাম সিং আন্ত্রিকে মারা গেছে। কিন্তু কী আর করা যাবে তার জন্য, এক মিনিটের নীরবতা পালন ছাড়া? বিকাশ সেন এক জঘন্য খুনী। সে ধরা পড়েছে, এটাই এসব ছোট দুঃখকে চাপা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! পাণ্ডেজি হনিমুনারদের জন্য প্রচুর ড্রিঙ্ক উপহার পাঠিয়েছেন। সো লেট আস সেলিব্রেট দ্যা অকেশন!
রাত সাড়ে নটায় ম্যানেজার রঘুবীর রায় বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কর্নেলসাবের পাত্তা নেই। তার কোনও বিপদ হয়নি তো? রমেশ পাণ্ডে সাংঘাতিক লোক।
গেটের দিকে নিচে থেকে আলোর ছটা এসে পড়ল। একটু পরে একটা অটোরিকশ এসে দাঁড়াল। রঘুবীর আশ্বস্ত হয়ে দেখলেন কর্নেলসাব নামছেন। অটোরিকশ চলে গেল। তখন রঘুবীর লনে এগিয়ে গেলেন।
কর্নেল বললেন, কী রঘুবীর? এনিথিং রং এগেন?
না স্যার! আমি আপনার জন্য চিন্তা করছিলাম।
কর্নেল হাসলেন। হ্যাঁ। তোমার চিন্তার কারণ ছিল। কিন্তু রাম সিং মরে গিয়ে রমেশ পাণ্ডেকে বিচলিত করে ফেলেছে। হাসপাতালে আলাপ হল লোকটার সঙ্গে। ডাক্তারের মতে, কারও পরামর্শে রাম সিং আমাশার রোগে কড়া ডোজের জোলাপের ট্যাবলেট খেয়েছিল। রমেশ পাণ্ডে বললেন, রাম সিং ভোরে তাকে বলেছিল আমাশা হয়েছে। কিন্তু হাতের কাছে তাকে পেয়ে জোর করে জিপ নিয়ে পাঠিয়েছিলেন। পাণ্ডেজীর ধারণা, হনিমুনারদের কেউ ওকে জোলাপের ট্যাবলেট দিয়েছিল। তো ডাক্তারের মতে, অনেক সময় একটু জোলাপ নিলে আমাশা সেরে যায়। কিন্তু ডোজটা ছিল খুব কড়া। হিতে বিপরীত হয়ে গেছে।
রঘুবীর আস্তে বললেন, পাণ্ডেজি তার বন্ধুর জন্য প্রচুর হুইস্কি, বিয়ার এবং সফ্ট ড্রিঙ্ক পাঠিয়েছেন। আজও ককটেল পার্টি হচ্ছে–উইথ ডিনার।
হওয়ারই কথা। খুনী ধরা পড়েছে। হনিমুনাররা নিজেদের নিরাপদ ভাবছে এবার।
রুদ্রসাব অ্যানাউন্স করছিলেন। কিন্তু কোথায় সে ধরা পড়ল সার?
সে নিজেই থানায় গিয়ে সারেন্ডার করেছে। তার আসল নাম বিকাশ সেন। ফিল্ম প্রোডিউসার।
ও মাই গড! কিন্তু কেন সে ঋতুপর্ণা রায়কে খুন করেছে?
কর্নেল খুব আস্তে বললেন, যথাসময়ে জানতে পারবে রঘুবীর! চলো! বড্ড ঠাণ্ডা এখানে।
লাউঞ্জে ঢুকে কর্নেল দেখলেন, পার্টি খুব জমে উঠেছে। যে-যার বউয়ের সঙ্গে নাচছে। শুধু চমনলাল দম্পতি এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন। তবে দেখার মতো দৃশ্য, সুভদ্রা ঠাকুর একা আপন মনে উদ্দাম নাচছেন। মুখে পাগলাটে হাসি।
কর্নেলকে দেখামাত্র সুভদ্রা ছুটে এলেন। ম্যান! ড্যান্স উইথ মি!
কর্নেল অগত্যা তার সঙ্গে নাচতে শুরু করলেন। চমনলাল দম্পতি হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। পায়েল নাচ থামিয়ে বলল, হাই ওল্ড ম্যান! আই মাস্ট অফার ইউ এ ড্রিঙ্ক।
থ্যাঙ্কস্ ম্যাডাম!
অনির্বাণ হাসতে হাসতে বলল, আপনি মশাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আপনাকে ঝালে-ঝোলে-অম্বলে সবতাতে থাকতে হয়। এনজয় করতে হলে ভালোভাবে করুন! পায়েল, ওঁকে একটু স্কচ দাও। জনি ওয়াকার হুইস্কি মশাই! এ জিনিস খুব দুর্লভ এখানে!
পায়েল একটা টেবিলে সাজানো বোতল থেকে হুইস্কি আর সোডা ওয়াটার ঢালল। একটুকরো আইস কিউব ফেলে দিল গ্লাসে। তারপর কর্নেলের হাতে ধরিয়ে দিল। কর্নেল কাচুমাচু মুখে বললেন, ফর ইওর অনার মিস ব্যানার্জি! জাস্ট এক চুমুক খাব।
সুভদ্রা কর্নেলের হাত থেকে গ্লাসটা ছিনিয়ে নিয়ে কার্পেটে ফেলে দিলেন। তারপর ধপাস করে একটা কুশনে বসলেন। সবাই হেসে উঠল।
পায়েল গ্লাসটা কুড়িয়ে নিয়ে একজন কিচেনবয়কে ইশারায় ডাকল। গ্লাসটা তাকে ধুতে দিয়ে সে আরেকটা গ্লাসে হুইস্কি ঢালল। তারপর কর্নেলের দিকে এগিয়ে আসতেই সুভদ্রা ঝাঁপিয়ে এলেন। চিৎকার করে বললেন, নো! টেক্ অফ্ ইওর ডার্টি হ্যান্ড ফ্রম দিস সিম্বল অব হেভেনলি বিইং।
অনির্বাণ বলল, লিভ ইট পায়েল! লেটস্ ড্যান্স!
সুভদ্রা কর্নেলের হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসালেন। কানের কাছে মুখ এনে বললেন, আপনাকে আমার কিছু বলার আছে। আমি খুনীকে স্বচক্ষে দেখেছিলাম; কিন্তু জঙ্গলের আড়ালে থাকার জন্য চিনতে পারিনি। সে হতভাগিনী মেয়েটিকে ঠেলে নদীতে ফেলে দিচ্ছিল।
কর্নেল হাসলেন। খুনী তো ধরা পড়েছে।
পুলিসকে আমি বিশ্বাস করি না। তারা সব সময় ভুল লোককে ধরে। আমার স্বামী জিতেন্দ্রকে–বলেই সুভদ্রা নিজের মুখে হাত রাখলেন। থাক। আমি সে সব কথা বলব না। জিতেন্দ্রর আত্মা আমাকে বলেছে, চুপ করে থাকো! কর্নেল সরকার! মেয়েটিকে আমি বাগানে একা বসে থাকতে দেখে সঙ্গে যেতে বলেছিলাম। ও যায়নি। গেলে মারা পড়ত না।
কর্নেল ঘড়ি দেখলেন। রাত নটা পঞ্চাশ বাজে। সুভদ্রা ঠাকুর তাঁর কানের কাছে মুখ এনে আরও কী সব বলছেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। ভদ্রমহিলা · ক্রমশ যেন উত্তেজিত হয়ে উঠছেন এবং তার পাগলামি বেড়ে যাচ্ছে। কর্নেল হনিমুনারদের দেখতে থাকলেন। সোমক ও শ্রুতি, দীপক ও কুমকুম, অনির্বাণ ও পায়েল এবার নাচের জুটি বদলাল। সোমক ও পায়েল, দীপক ও শ্রুতি, অনির্বাণ ও কুমকুম জুটি হল।
রাত দশটায় কর্নেল লক্ষ্য করলেন, ম্যানেজার রঘুবীর রায় রিসেপশন কাউন্টার থেকে বেরিয়ে দরজায় কাছে গেলেন। তারপর ঘুরে কর্নেলের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি তাকালেন।
কর্নেল উঠে গেলেন তাঁর কাছে। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ দুবে দলবলসহ লনে এগিয়ে আসছিলেন। রঘুবীরের চোখে-মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠেছিল। আস্তে বললেন, আবার পুলিস কেন কর্নেলসাব?
কর্নেল বললেন, তোমার চিন্তার কারণ নেই রঘুবীর।
মিঃ দুবে এবং তাঁর পুলিস সঙ্গীরা লাউঞ্জে ঢুকতেই নাচ থেমে গেল। দুবে একটু চড়া গলায় বললেন, প্লিজ স্টপ দ্যা মিউজিক!
সোমক এগিয়ে গিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করল। অনির্বাণ সহাস্যে বলল, ওয়েলকাম! ওয়েলকাম!
পুলিসের দলটি লাউঞ্জে ঢুকে চারদিক ঘিরে দাঁড়াতেই পায়েল ভুরু কুঁচকে বলে উঠল, হোয়াট দ্যা হেল্ ইউ আর ডুইং?
মিঃ দুবে বললেন, আপনারা দয়া করে বসে পড়ুন।
অনির্বাণ হাসল। ঠিক আছে। পায়েল, আমার মনে হচ্ছে পুলিস আমাদের কাছে আরও কিছু জানতে চায়। আমরা পুলিসকে সহযোগিতা করব।
মিঃ দুবে কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, আপনার কিছু বক্তব্য আছে বলছিলেন কর্নেল সরকার! আপনি এবার তা বলুন!
সবাই চুপচাপ বসে পড়েছে। সবগুলি মুখে বিস্ময় এবং গাম্ভীর্য। কর্নেল বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললেন, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টমেন! বিকাশ সেন ধরা পড়েছে। সে-কথা আপনারা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছেন। তবু কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে। প্রথমেই আমি প্রশ্ন করছি সোমবাবুকে। সোমবাবু! কুমকুম সিনহা আজ মর্নিংয়ে যখন আপনাদের ধারিয়া ফলসে যাওয়ার জন্য ডাকতে যান, তখন কুমকুম আপনাকে বলেছিলেন, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফিরে আসব।
সোমক আস্তে বলল, হ্যাঁ। সে তো আপনাকে বলেছি। আবার এ প্রশ্ন কেন?
তার মানে, তখনও ধারিয়া ফলসে গিয়ে ব্রেকফাস্টের প্ল্যান ছিল না। তাই না মিসেস সিনহা?
কুমকুম বলল, হ্যাঁ। কিন্তু ফলসের ওখানে পৌঁছে ঠিক হয়েছিল এখানে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। কারণ গুহাচিত্র দেখে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মনে আছে?
পায়েল বলে উঠল, একজনের সিদ্ধান্ত নয়। আমরা সবাই মিলে
কর্নেল বললেন, মিসেস সিনহা এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন। আমি চাই, যাকে প্রশ্ন করা হবে, তিনিই কথা বলবেন। প্লিজ অন্য কেউ ডিসটার্ব করবেন না। মিসেস সিনহা!
কুমকুম বিব্রতভাবে বলল, পায়েলদি হয়তো ঠিক বলেছেন।
কিন্তু কোনও প্রসঙ্গ উঠলে একজনই প্রথমে কথাটা তোলেন। তাই না। মিসেস সিনহা।
হ্যাঁ। কিন্তু কে তুলেছিলেন কথাটা, মনে পড়ছে না।
ঠিক আছে। তো আপনি আজ বিকেলে আমাকে বলেছেন অনির্বাণবাবু জিপ নিয়ে ব্রেকফাস্টের খাবার আনতে গিয়েছিলেন। মিঃ রুদ্র! আপনি কোথায় খাবার আনতে গিয়েছিলেন?
অনির্বাণ বাঁকা হাঁসল। সেটা কি অন্যায় কিছু? এই এরিয়া আমার চেনা। ধারানগরে আমার কোম্পানির ব্রাঞ্চ আছে।
মিঃ রুদ্র! আপনার কোম্পানির নাম কী?
চয়নিকা ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্মল সেভিংস। অসংখ্য জায়গায় আমাদের ব্রাঞ্চ আছে।
তার মানে, আপনার কোম্পানি জনসাধারণের কাছে আমানত নেয় এবং সেই টাকা লগ্নি করে। এসব সংস্থার খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোয়। আজকাল এ ধরনের প্রচুর সংস্থা সর্বত্র গড়ে উঠেছে। ন্যূনতম আমানত মাথা পিছু কত মিঃ রুদ্র?
এটা কি প্রাসঙ্গিক কর্নেল সরকার?
উত্তর দিন প্লিজ।
মিনিমাম পাঁচ টাকা। সুদসহ তিনবছরে তিনগুণ টাকা আমরা ফেরত দিই।
আসানসোলের একটা ব্যাঙ্কে আপনার নিজের নামে কত টাকা রেখেছেন মিঃ রুদ্র?
অনির্বাণ রুষ্ট মুখে বলল, অ্যাবসার্ড! এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
মিঃ দুবে বললেন, আমরা জানতে পেরেছি আপনার ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণ প্রায় এক কোটি তিরিশ লক্ষ টাকা।
তাতে কী? ওটা কোম্পানির একটা প্রজেক্টের জন্য আলাদা জমা রাখা হয়েছে।
কর্নেল বললেন, পিয়ালি রায় সেই ব্যাঙ্কের এজেন্ট ছিল। তাই না মিঃ রুদ্র?
হ্যাঁ। কিন্তু শয়তান বিকাশ সেন পিয়ালিকে–
জাস্ট এ মিনিট। মিস ব্যানার্জি! আপনি আমাকে বলছিলেন পিয়ালি এখানে ঋতুপর্ণা নাম নিয়ে মিঃ রুদ্রকে ব্ল্যাকমেইল করতে এসেছিল। তাই না?
পায়েল বলল, অনির্বাণ আমাকে কথাটা বলেছিল। এর বেশি কিছু জানি না।
সোমকবাবু! এবার আপনাকে প্রশ্ন করছি। নদীর ধারে বসে থাকার সময় পিয়ালি ওরফে ঋতুপর্ণা হঠাৎ রাস্তার দিকে চলে গিয়েছিল। আপনি বলেছেন–আমাকে।
সোমক আস্তে বলল, হ্যাঁ।
শ্রুতি ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বরে বলল, কী দেখেছিলে বলছ না কেন?
সোমক একটু ইতস্তত করে বলল, ঋতুপর্ণা–আই মিন পিয়ালি, ওভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ার খুব অবাক হয়েছিল। অপমানিত বোধ করছিলাম। তো রাস্তায় কাকেও দেখে সে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিল। লোকটাকে অবশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না! ভেবেছিলাম ওর স্বামীকে দেখতে পেয়ে ও চলে গেল। কিন্তু লোকটা সম্ভবত অন্য কেউ।
কর্নেল বললেন, আমি লক্ষ্য করছিলাম হনিমুন লজের গেটের দিকে যেতে যেতে আপনি পিছু ফিরে কিছু দেখছিলেন!
সোমক কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করল। কিন্তু বলল না।
প্রাইভেট রোড থেকে হাইওয়ে এবং ব্রিজের একটা অংশ চোখে পড়ে সোমবাবু!
হ্যাঁ। হাইওয়েতে অনেক গাড়ি যাতায়াত করছিল। কিন্তু আসলে আমি ঋতুপর্ণাকে আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই তাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম।
আপনার স্ত্রীকে প্রশ্ন করছি! ড্রাইভার রাম সিংহের আমাশা হওয়ার কথা কোথায় প্রথম শুনেছিলে শ্রুতি?
ফলসে যাওয়ার সময়। সে রাস্তায় জিপ থামিয়ে নদীর ধারে গিয়েছিল।
তারপর? কতক্ষণ পরে সে ফিরেছিল?
মিনিট পাঁচেকের বেশি নয়।
কেউ কি তাকে আমাশার ওষুধ দিতে চেয়েছিল তখন?
শ্রুতি তাকাল। একটু পরে বলল, না তো!
কর্নেল চমনলালের দিকে তাকালেন। চমনলালজি! আপনি এঁটো পেপারকাপগুলো কুড়িয়ে আবর্জনার পাত্রে ফেলেছিলেন। আপনি আমাকে বলেছেন, আপনি দায়িত্বশীল নাগরিক। অন্যদের শিক্ষা দেবার জন্য
চমনলাল দ্রুত বললেন, আমি এসব কাজ করে থাকি।
কর্নেল মিঃ দুবেকে ইশারা করলেন। দুবের হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ ছিল। ব্যাগ খুলে রুমালে মোড়া অস্ত্রটা তিনি কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল অস্ত্রটা বের করতেই লাউঞ্জে সকলের মধ্যে চমক খেলে গেল। কর্নেল বললেন, এটাই পিয়ালিকে হত্যার অস্ত্র। চমনলালজি! আপনি এটা প্রপাতের কাছে আবর্জনার পাত্রে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। তাই না?
হ্যাঁ। আমি চমকে উঠেছিলাম ওটা দেখে। তবে আমি দায়িত্বশীল নাগরিক।
আপনি দায়িত্বশীল নাগরিক, তা ঠিক। তাই আপনার কাছে আবার প্রশ্ন তুলছি, আপনি কি কাকেও এটা ফেলতে লক্ষ্য করেছিলেন? কিংবা কেউ কিছু গোপনে আবর্জনার পাত্রে ফেলে দিল বলে আপনার কি সন্দেহ হয়েছিল?
রজনী দেবী বলে উঠলেন, আপনার এ প্রশ্নের জবাব দিতে লাল বাধ্য নয়। আমাদের এখানে আসতে ভালো লাগে। যতদিন বাঁচব, ততদিন আসতে হবে। আমরা কোনও ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে চাই না। আমি লালকে খুব বকাবকি করেছি। সবকিছুতে ওর নাক গলানো অভ্যাস আছে। এটা মোটেও ভালো নয়।
চমনলালজি! আপনার কী বক্তব্য?
রজনী ঠিক বলেছে।
তার মানে, আপনি কাকেও এটা ফেলতে দেখেছিলেন।
বৃদ্ধ ঐতিহাসিক মুখ নামিয়ে বললেন, সৎ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে যে কর্তব্যটুকু পালন করা উচিত, তা করেছি কর্নেল সরকার। এর বাইরে এক পা বাড়ানো আমার উচিত হবে না।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ধন্যবাদ! এবার আমি আপনাদের একটা। জিনিস দেখাতে চাই। মিঃ দুবে!
মিঃ দুবে নিঃশব্দে হেসে একপাটি লেডিজ স্লিপার বের করে দিলেন কর্নেলকে। বললেন, কর্নেল সরকার! ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের জুতো দেখানোর জন্য আগে ক্ষমা চেয়ে নিন!
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তবে জুতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা পিয়ালি রায়ের জুতো। আপনারা বুঝতেই পারছেন, জুতোটা হত্যাস্থলেই পাওয়ার কথা এবং সেখানেই পাওয়া গেছে।
সোমক গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল, কোথায় খুন করা হয়েছিল ওকে?
নদীর ওপারে। প্রপাতের নীচে যে জলাশয় আছে, তার একটা দিক একটু বেঁকে কোণ সৃষ্টি করেছে। সেখানেই জলের ধারে পাথরের ফাঁকে এটা পড়ে ছিল। হত্যাকারী পিয়ালিকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে তার ডেডবডি জলে ফেলে দিয়েছিল। একপাটি জুতো খসে পড়াটা লক্ষ্য করেনি।
সুভদ্রা ঠাকুর কর্কশ কণ্ঠস্বরে বললেন, আমি ডেডবড়ি ফেলে দেওয়া দেখতে পেয়েছিলাম এপার থেকে। কিন্তু যে ফেলে দিচ্ছিল, তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। সে ছিল জঙ্গলের আড়ালে। জঙ্গলে প্রচুর লাল ফুল ফুটে ছিল। জিতেন্দ্রর আত্মা আমাকে তক্ষুনি বলল, একটা কিছু করো! তো সেই সময় কর্নেল সায়েবকে হেঁটে আসতে দেখলাম। তাই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ফাদার পিয়ার্সনের পার্কে যে বেদিতে মেয়েটি এই ছেলেটির সঙ্গে বসে ছিল– নাহ্! আর কিছু বলব না। জিতেন্দ্রর আত্মা আমাকে নিষেধ করেছে। কারণ এখানে আমাকে–
কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এ একটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড! পিয়ালি রায় অনির্বাণবাবুকে ব্ল্যাকমেইল করত। তার কারণ একটু আগে আমি জানিয়েছি। অনির্বাণবাবুর কাজটা বেআইনি। জনসাধারণের আমানতের টাকা নিজের নামে মফঃস্বল শহরের একটা ব্যাঙ্কে জমা রাখার কথা জানাজানি হলে হইচই পড়ে যেত।
অনির্বাণ দ্রুত বলল, তেমন কিছু ঘটলে টাকাটা আমি আমার সংস্থার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিতাম।
কর্নেল বললেন, এনিওয়ে! পিয়ালি এখানে একা আসতে সাহস পায়নি। তাই তার ফিয়াসে বিকাশ সেনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু পিয়ালি বোকার মতো ফাঁদে পা দিল!
পায়েল বলল, ফাঁদ? বিকাশ বখরার লোভে তাকে মেরে ব্যাঙ্কের ডকুমেন্ট আত্মসাৎ করেছে!
না মিস ব্যানার্জি! সেই সুযোগ বিকাশ সেন পাননি। ডকুমেন্টের জেরক্স কপি পিয়ালির স্যুটকেসে পাওয়া গেছে। এনি ওয়ে! এবার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আসা যাক। আমরা কুমকুম সিনহার কাছে জেনেছি অনির্বাণবাবু ধারিয়া ফলসে সবাইকে রেখে জিপ নিয়ে খাবার আনতে গিয়েছিলেন। তাই না?
অনির্বাণ বলল, হ্যাঁ। বলেছি তো সে কথা।
কিন্তু ড্রাইভার রাম সিংয়ের আমাশা। তাই আপনি একা জিপ ড্রাইভ করে গিয়েছিলেন।
কিছু অন্যায় করিনি!
দীপকবাবু! আপনি একজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। তাই না?
দীপক বলল, তাতে কী?
আপনার সঙ্গে নানারকম ওষুধ সবসময় রাখা অভ্যাস। বিশেষ করে বাইরে গেলে
দীপক কর্নেলের কথার ওপর বলল, অনির্বাণদা ড্রাইভারের আমাশার ওষুধ আছে কি না জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি বললাম, আছে। কিন্তু–
কিন্তু অনির্বাণবাবু জোলাপের ওষুধই চেয়ে নিয়েছিলেন। তাই না?
দীপক চমকে উঠল। বলল, হ্যাঁ।
এবার আসছি অন্য প্রসঙ্গে। পিয়ালির স্যুটকেসে কয়েকটা চিঠি পাওয়া। গেছে। সাম্প্রতিক একটা ইনল্যান্ড লেটারে কেউ তাকে ধারানগর এরিয়ায় হনিমুন লজে ডেকেছিল। চিঠির তলায় যে সইটা আছে, তা অস্পষ্ট। চিঠিতে এক লাখ টাকা নগদ দেওয়ার প্রস্তাব আছে। এটাই ফঁদ! পিয়ালি ওই বাগানে অপেক্ষা করছিল। তারপর সে দেখেছিল, যে তাকে টাকা দেবে সে আসছে না। এদিকে তার সঙ্গী বিকাশ সেন খুব ভোরে উঠে লনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তাকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। জগদীশ এটা লক্ষ্য করেছিল। হুমকির পর বিকাশ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে নিপাত্তা হয়ে যান। তিনি এমন সাংঘাতিক কিছু আশা করেননি। তিনি তা পুলিসকে বলেছেন। তিনি আড়াল থেকে লক্ষ্য রেখে বেড়াচ্ছিলেন। পিয়ালিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাছাড়া তিনি আমার পরিচয় জানতেন। আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন তার সঙ্গিনী খুন হয়েছে।
অনির্বাণ উঠে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, কী বলতে চান আপনি?
কর্নেল হাসলেন। বলতে চাই, ধারিয়া ফলসে গিয়ে সেখানেই ব্রেকফাস্ট করার কথা তুলে এবং রাম সিংকে বেশি ডোজের জোলাপের ওষুধ খাইয়ে আপনি একা জিপ নিয়ে পিয়ালির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে এসেছিলেন। আপনি জিপ দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন হাইওয়ের মোড়ে। তারপর প্রাইভেট রোডে হেঁটে আসার সময় পিয়ালিকে সোমকবাবুর সঙ্গে দেখতে পান। নিশ্চয় তাকে ইশারায় ডেকেছিলেন আপনি। তারপর তাকে কথায় ভুলিয়ে জিপে তুলে ফলসের দিকে ফিরে যান এবং আগে থেকেই বেছে রাখা জায়গায় জিপ ডাইনের ঘাস জমিতে নামিয়ে পিয়ালির সঙ্গে বোঝাপড়ার ছলে লেকের কাছে নিয়ে যান। আচমকা তাকে গুলি করে জলে ফেলে দেন। তারপর ফের জিপ ঘুরিয়ে নিয়ে ধারানগরে খাবার আনতে যান। ফিরে গিয়ে একসময় অস্ত্রটা আবর্জনার পাত্রে ফেলে দেন। চমনলালজি! আপনি আর চুপ করে থাকবেন না। আপনি সৎ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক!
চমনলাল বিব্রতভাবে বললেন, হ্যাঁ। আমার সন্দেহ হয়েছিল, ওভাবে লুকিয়ে মিঃ রুদ্র কী জিনিস আবর্জনার পাত্রে ফেললেন?
সুভদ্রা ঠাকুর চেঁচিয়ে উঠলেন, ওর গায়ে লাল শার্ট ছিল! ওই লোকটার গায়ে!
অনির্বাণ দাঁড়িয়েই ছিল। দুজন পুলিস অফিসার দুদিক থেকে তার দুটো হাত ধরে পেছনে টেনে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। লাউঞ্জে ভয়াবহ স্তব্ধতা। তারপর পায়েল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সোমক গর্জন করে বলল, শাট আপ!
বিশ্বাস করো সোমক! আমি এত সব জানতাম না। কল্পনাও করিনি। অনির্বাণ আমাকে যা বলেছিল, তা শুনে আমার সিম্প্যাথি জেগেছিল ওর ওপর। দ্যাটস অল!
শ্রুতি পায়েলের হাত ধরে টানল। পায়েলদি! প্লিজ ফরগেট ইট। অনির্বাণদাকে আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি। আমার দাদার সঙ্গে একসময় বন্ধুতা ছিল ওর। হি ইজ এ ন্যাস্টি অ্যান্ড ফেরোশাস ম্যান!
মিঃ দুবে সদলবলে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল সহাস্যে বললেন, চিয়ার আপ হনিমুনারস! নারমেশ পাণ্ডের জন্য কারও ভয়ের কারণ নেই। তার ড্রাইভারকে যে অতিরিক্ত জোলাপ খাইয়ে মেরে ফেলেছে, তার প্রতি উনি ভীষণ ক্রুদ্ধ। এবার তাকে আমি কথাটা জানানোর দায়িত্ব নিলাম। আপনারা নির্ভয়ে হনিমুন, পালন করুন। আর মিস ব্যানার্জি!
পায়েল কান্না চেপে বলল, আমি কলকাতা ফিরে যাব।
সুভদ্রা ঠাকুর উঠে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। তুমি আমার সঙ্গে থাকবে। আমি তোমায় ডাকিনীবিদ্যা শেখাব। এই বিদ্যার জোরে বদমাস পুরুষগুলোকে তুমি জব্দ করে রাখবে।
ম্যানেজার রঘুবীর সবিনয়ে বলল, আপনারা যদি দয়া করে ডিনার খেয়ে নেন, ভালো হয়।
কর্নেল দেখলেন, পায়েল সুভদ্রার টানে উঠে গেল। দুজনে ডাইনিংয়ে ঢুকে মুখোমুখি বসল। পায়েল ব্যানার্জি ধাক্কাটা সামলে নিয়েছে।
এবার আর অন্য কিছু নয়। নীলসারস দম্পতিকে ক্যামেরাবন্দী করার জন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ঠাণ্ডা মাথায় প্ল্যান করবেন। তিনি চমনলাল দম্পতির সামনে গিয়ে বললেন, বসতে পারি এখানে?
দুজনে একগলায় বললেন, বসুন!
