হনিমুন লজ (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

সাত

 

হনিমুন লজের গেটের কাছে ম্যানেজার রঘুবীর রায় দাঁড়িয়েছিলেন। কর্নেলকে দেখে উদ্বিগ্ন মুখে বললে পুলিস আমাকেই গ্রেটন করে গেল। এবার থেকে আমি যেন কোনও বিশিষ্ট লোকের রেফারেন্স ছাড়া হনিমুনারদের থাকতে না দিই! এ কী অদ্ভুত নির্দেশ দেখুন কর্নেল সাব!

 

কর্নেল মোপেড ঠেলে লনে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ইন্সপেক্টর মিঃ দুবে কি জেরা শেষ করে চলে গেছেন রঘুবীর?

 

এইমাত্র গেলেন। আপনি থাকলে ভালো হত। কোথায় বেরিয়েছিলেন?

 

নীলসারস দম্পতির খোঁজে। তুমি জানো, বিকেলের পর ওদিকের রাস্তায় জঙ্গিদের উপদ্রব হয়। তাই সিদ্ধেশের এই গাড়িটা নিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারি।

 

রঘুবীর চাপা গলায় বললেন, মিঃ দুবে বলে গেলেন, এবার থেকে লজে, কোনও দম্পতি এলেই যেন তাদের নামধাম এবং রেফারেন্স জানিয়ে দিই!

 

মিঃ দুবে কি তোমার বোর্ডারদের সম্পর্কে কোনও নির্দেশ দিয়ে গেলেন?

 

নাহ্! মিঃ রুদ্রের সঙ্গে রমেশ পাণ্ডের বন্ধুত্ব আছে। সিদ্ধেশ বলল, রুদ্রসাব পাণ্ডেজিকে ফোন করেছিলেন। পাণ্ডেজি পুলিসকে সম্ভবত কিছু বলেছেন। তাই বোর্ডারদের একে একে আমার অফিসঘরে ডেকে শুধু জেরা করে চলে গেল। মিঃ দুবের হাবভাবে বুঝলাম, পুলিস শোভন রায়কেই হত্যাকারী সাব্যস্ত করেছে। তাঁকেই খোঁজা শুরু হবে এবার–আমার ধারণা। আর একটা কথা আপনাকে বলা উচিত।

 

বলো রঘুবীর।

 

শোভন রায়ের স্যুইটের জিনিসপত্র আবার সার্চ করা হল। আমি উপস্থিত ছিলাম তখন। মিঃ দুবে ঋতুপর্ণার সুটকেশ থেকে কিছু কাগজপত্র নিয়ে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্য কর্নেল সাব। ওঁদের স্যুইটে শোভন রায়ের কোনও জিনিসই নেই। না কোনও সুটকেশ, না পোশাক। কিছু না।

 

হুঁ! ব্যাপারটা অদ্ভুত! তবে আমি এর ব্যাখ্যা করতে পারি। শোভনবাবু খুব ভোরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ঋতুপর্ণার সঙ্গে ওঁর ঝগড়াঝাটি হয়েছিল।

 

আপনি শুনেছিলেন?

 

না। চমনলালজির স্ত্রী রজনী দেবী আমাকে বলেছেন। তা ছাড়া সোমক চ্যাটার্জিও বলেছে। বলে কর্নেল বারান্দার কাছে গিয়ে ডাকলেন, সিদ্ধেশ! তোমার গাড়িটা ফেরত নাও।

 

সিদ্ধেশ বেরিয়ে এসে তার মোপেডটা গ্যারাজের দিকে নিয়ে গেল।

 

কর্নেল লক্ষ্য করলেন, দক্ষিণের বাগানে সোমক ও শ্রুতি একটা বেঞ্চে বসে কথা বলছে। কর্নেল বললেন, রঘুবীর! আমি কফি খাব।

 

রঘুবীর ভেতরে ঢুকলেন। কর্নেল বারান্দায় বসে ঘড়ি দেখলেন। চারটে বেজে গেছে। ইচ্ছে করেই দেরি করে ফিরেছেন। নদীর ব্রিজের ওধারে মোপেড দাঁড় করিয়ে রেখে চুপচাপ বসে ছিলেন।

 

সিদ্ধেশ গ্যারাজ থেকে এসে তার কাছে দাঁড়াল। কর্নেল বললেন, তোমাদের হনিমুনাররা কে কোথায় সিদ্ধেশ?

 

সিদ্ধেশ হাসল। যে যার ঘরে রেস্ট নিচ্ছেন। শুধু চ্যাটার্জিসাবরা বাগানে বসে আছেন।

 

দেখলাম। তো মিসেস ঠাকুর?

 

ওঁর যা বাতিক! ধারিয়া ফলসে স্বামীর আত্মার সঙ্গে গল্প করতে গেলেন। আমাকে ডাকছিলেন সার! আমি তো ওঁর মতো পাগল নই। তবে সার, মিঃ দুবে ওঁকে যা ধাঁতানি দিয়েছেন, ওঁর পাগলামি অনেকটা সেরে যাবে দেখবেন। বলে সিদ্ধেশ হাসতে হাসতে চলে গেল ভেতরে।

 

জগদীশ কফি রেখে গেল। কর্নেল চুপচাপ কফি খেতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে রঘুবীর এসে বললেন, কর্নেলসাব! আপনার টেলিফোন। মিঃ দুবে কথা বলতে চান আপনার সঙ্গে।

 

রিসেপশনে গিয়ে কর্নেল সাড়া দিলেন। তারপরই বললেন, আমি দুঃখিত মিঃ দুবে। নীলসারস দম্পতির হনিমুনের দিকেই আমার বেশি আকর্ষণ। তাই

 

কর্নেল সরকার! ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টার দুবের হাসির শব্দ ভেসে এল। আপনার হবির কথা আমি জানি। যাই হোক, আপনাকে জানানো উচিত মনে করছি। ঋতুপর্ণার আসল নাম পিয়ালি রায়।

 

তাই বুঝি?

 

হ্যাঁ। ওর স্যুটকেসে কয়েকটা চিঠি পেয়েছি। বিপজ্জনক মেয়ে ছিল পিয়ালি।

 

বলেন কি মিঃ দুবে?

 

সে একজন সঙ্গী জুটিয়ে এনেছিল। হনিমুন লজে এমন একজন এসেছে, যাকে ব্ল্যাকমেল করত সে। এখানেও সে তাকে ব্ল্যাকমেল করতে এসেছিল। আমার ধারণা, বখরা নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার পর সঙ্গী লোকটা তাকে খুন করেছে।

 

কে সেই হনিমুনার তা কি জানতে পেরেছেন?

 

নাহ কর্নেল সরকার! তবে আমি সোমক চ্যাটার্জিকেই সন্দেহ করছি।

 

হুঁ। কিন্তু ব্ল্যাকমেলের ভিত্তিটা কী, তা টের পেয়েছেন কি?

 

পিয়ালি তার অতীত জীবন সম্পর্কে কিছু জানত। কোনও ডকুমেন্ট তার কাছে নিশ্চয় ছিল।

 

কিন্তু সেটা তো খুঁজে পাননি! নাকি পেয়েছেন?

 

স্বীকার করছি, পাইনি। তবে হনিমুন লজেই কোথাও লুকোনো থাকতে পারে। অথবা পিয়ালির সঙ্গী তথাকথিত শোভন রায় সেটা হাতিয়ে নিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। আমরা লোকটাকে খুঁজে বের করবই। সে এখনও এলাকা ছেড়ে যেতে পারেনি। কর্নেল সরকার! আমার দ্বিতীয় ধারণাটার ওপর জোর দিচ্ছি। পিয়ালির সঙ্গীর কাছেই ব্ল্যাকমেলিং-এর ডকুমেন্ট থাকা সম্ভব। এবার অনুরোধ কর্নেল সরকার! আপনি একটু নজর রাখুন।

 

আচ্ছা মিঃ দুবে, ড্রাইভার রাম সিংয়ের কোনও স্টেটমেন্ট কি নিয়েছেন? সে-ই কিন্তু প্রথমে ডেডবডিটা দেখতে পেয়েছিল।

 

দুবের হাসি ভেসে এল। আমাকে অত বোকা ভাববেন না কর্নেল সরকার! রাম সিংয়ের স্টেটমেন্ট নিয়েই তো ফের হনিমুন লজে গিয়েছিলাম। বেচারার সম্ভবত আন্ত্রিক হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছেন পাণ্ডেজি!

 

আন্ত্রিক?

 

এটা কি গুরুত্বপূর্ণ কর্নেল সরকার? আপনি এমন সুরে প্রশ্নটা করলেন যেন

 

নাহ্। ছেড়ে দিন।

 

ঠিক আছে কর্নেল সরকার! রাখছি। পরে দরকার হলে যোগাযোগ করব।..

 

কর্নেল চুরুট টানছিলেন। রোদের রঙ এখন লালচে হয়ে গেছে। দূরের পাহাড় ঘন নীল এবং গাছপালায় কুয়াশা ঘনাচ্ছে। বাতাসে হিমের আমেজ। কর্নেল জ্যাকেটের চেন টেনে দিলেন। টেবিলে রাখা টুপিটা তুলে মাথায় আঁটো করে বসিয়ে দিলেন।

 

এই সময় চমনলাল দম্পতি বেরিয়ে আসছিলেন। কর্নেল বললেন, নমস্তে!

 

নমস্তে কর্নেলসাব!

 

বেড়াতে বেরুচ্ছেন নাকি?

 

বৃদ্ধ ঐতিহাসিক ম্লান হাসলেন। নাহ্! একটু হাঁটাচলার অভ্যাস আছে। দুবেলা। কিন্তু বাইরে যাচ্ছি না। লনে বা বাগানে ঘুরব।

 

রজনী দেবীকে বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছিল। দুজনে লনে নেমে গেলেন। গেট পর্যন্ত গিয়ে তারা বাগানে ঢুকলেন। একটু পরে দীপক ও কুমকুম বেরিয়ে এল। তারা কর্নেলের দিকে একবার তাকিয়েই লনে নামল। তারপর গেট পেরিয়ে গেল।

 

কর্নেল দেখলেন শ্রুতি বাগান থেকে হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গ নিল। মিনিট দশেক পরে পায়েল একা বেরিয়ে এসে কর্নেলকে বারান্দায় দেখে মার্কিন রীতিতে বলল, হাই!

 

হাই মিসেস রুদ্র!

 

পায়েল একটু হাসল। কর্নেল সায়েব! অনির্বাণ আমার স্বামী হলেও আমি নিজের পদবি বদলাইনি। আমি পায়েল ব্যানার্জি।

 

ইজ ইট ফর সেব অব ইওর প্রোফেশন?

 

ইয়া।

 

আপনার হ্যাজব্যান্ড বিশ্রাম নিচ্ছেন সম্ভবত?

 

হি ইজ ড্যাম টায়ার্ড। বলে পায়েল বারান্দায় গেল। বসতে পারি কর্নেল সায়েব?

 

কর্নেল হাসলেন। কেন নয়? এই বেতের চেয়াগুলো সবার বসার জন্য।

 

পায়েল কর্নেলের কাছাকাছি চেয়ারে বসে আস্তে বলল, অনির্বাণের সন্দেহ হয়েছে আপনি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ।

 

সরি মিসেস

 

মিস ব্যানার্জি বলুন!

 

কিন্তু আপনি মিঃ রুদ্রের স্ত্রী!

 

আপনার হাবভাবে মনে হয়েছে আপনি একজন মডার্ন ম্যান। কাজেই আপনাকে সত্যি কথাটা বলা উচিত। উই লিভ টুগেদার। উই আর নট এ ম্যারেড কাপল্ ইউ নো!

 

আই সি!

 

কর্নেল সায়েব! আমি সবসময় স্পষ্ট কথা বলি। আমারও সন্দেহ হয়েছে, কেউ আপনাকে আমাদের পেছনে লাগিয়েছে।

 

লাগানোর কি বিশেষ কোনও কারণ আছে মিস ব্যানার্জি?

 

আছে। অনির্বাণ একটা ফিল্ম করতে চায়। বিগ বাজেটের ফিচার ফিল্ম। আসলে সে আমাকে নিয়ে তাই লোকেশন দেখতে এসেছে। ধারানগরে তার কোম্পানির ব্রাঞ্চ আছে। বন্ধুবান্ধবও আছে।

 

রমেশ পাণ্ডে?

 

আপনি তাও জানেন দেখছি!

 

জেনেছি। কারণ পাণ্ডে তার জিপ আপনাদের ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন! কর্নেল হাসলেন। বাই এনি চান্স, ফিল্মটা কি ডাইনোসর নিয়ে? স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্ক ছবিটা নাকি এ দেশে হিড়িক ফেলে দিয়েছে। এবং আপনারা ধারিয়া ফলস এরিয়ায় গুহাচিত্র দেখতে গিয়েছিলেন। কোন গুহায় নাকি ডাইনোসরের ছবি আছে।

 

পায়েল তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাঁকে দেখছিল। আস্তে শ্বাস ফেলে বলল, দ্যাটস রাইট। তা অনির্বাণ যা বলছিল, তা মিলে যাচ্ছে। সে যে একটা ফিল্ম করতে চায়, তা তার প্রতিদ্বন্দ্বী জানে। কিন্তু ফিল্মটা কী নিয়ে হবে, তা জানত না। এখন দেখছি আপনি তা জেনে গেছেন। এবং আপনার ক্লায়েন্টকে জানিয়ে দেবেন। এই তো?

 

কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি ভুল করছেন মিস ব্যানার্জি! প্রথমত আমি ডিটেকটিভ নই এবং কথাটা ভীষণ অপছন্দ করি। দ্বিতীয়ত এই তুচ্ছ। ব্যাপারের জন্য কেউ ডিটেকটিভ পেছনে লাগাবে বলে মনে হয় না। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। আমি নেচারিস্ট। বিদেশি সায়েন্স ম্যাগাজিনে নানা বিষয়ে সচিত্র প্রবন্ধ লিখি। এটাই আমার হবি।

 

বাট ইউ আর ভেরি মাচ ইন্টারেস্টেড অ্যাবাউট দা মার্ডার অব পিয়ালি।

 

কর্নেল তাকালেন। পিয়ালি? কে সে?

 

যে ঋতুপর্ণা নামে এখানে এসেছিল।

 

আপনি তাকে চিনতেন?

 

হুঁ। অনির্বাণও চিনত।

 

কিন্তু পিয়ালির মার্ডারের সঙ্গে আপনাদের ফিল্মের সম্পর্ক কী?

 

পায়েল বাঁকা হাসল। আপনি তা জানেন। কারণ আপনার ক্লায়েন্ট তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল।

 

ডু ইউ মিন শোভন রায়?

 

ইয়া। পায়েল বিকৃতমুখে ফের বলল, হি ইজ এ ন্যাস্টি ম্যান। তার আসল নাম বিকাশ সেন। সে একজন ফিল্ম প্রোডিউসার। অ্যান্ড ইউ নো দ্যাট ওয়েল।

 

কর্নেল হাসলেন। কিন্তু পুলিস তাকে খুঁজছে। সে-ই নাকি পিয়ালিকে খুন করে নদীতে ফেলে দিয়েছে।

 

ইয়া।

 

আমি কিছু বুঝতে পারছি না মিস ব্যানার্জি।

 

পায়েল রুক্ষ কণ্ঠস্বরে বলল, কর্নেল সায়েব! বিকাশ আপনাকে কথাটা না বলতেও পারে। সে আপনাকে হায়ার করে অনির্বাণের ফিল্মের সাবজেক্ট সম্পর্কে সিওর হতে চেয়েছিল। তার পিয়ালিকে দিয়ে অনির্বাণকে ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছিল, যাতে অনির্বাণ তার প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ায়।

 

এ তো দেখছি একটা জটিল–আর ফানি ব্যাপার! কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, এনিওয়ে! ব্ল্যাকমেইলের প্রশ্ন উঠলে বলব এর একটা ভিত্তি থাকা অনিবার্য। হোয়াটস্ দ্যাট মিস্। ব্যানার্জি?

 

অনির্বাণ তার কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর। তার একটা বোকামি হয়ে গেছে। সে ডাইনোসর নিয়ে ফিল্ম করার জন্য একটা প্রজেক্টের মোটা টাকা বেনামে সরিয়ে রেখেছে। এটা তত কিছু বেআইনি অবশ্য নয়। কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে রটে গেলে একটু গণ্ডগোল হতে পারে। সে হোয়াট? অনির্বাণ তখন না হয় ফিল্ম করবে না। আবার দেখুন ফিল্মটা হিট করলে কোম্পানিই শেষ পর্যন্ত প্রফিট করবে এবং শেয়ার হোল্ডাররা ভাল ডিভিডেন্ড পাবে। তাই না? পায়েল দম নিয়ে ফের বলল, মোট কথা বিকাশ নিজে সম্ভবত ডাইনোসর নিয়ে ছবি করতে চায়। এক ঢিলে দুই পাখি বধ। অনির্বাণ সরে দাঁড়াবে এবং তার আগে বিকাশের সঙ্গিনী পিয়ালি বোকা অনির্বাণকে ব্ল্যাকমেইল। করে মোটা হাতিয়ে নেবে। মে বি বিকাশ পিয়ালিকে হিরোইনের রোল দিতে লোভ দেখিয়েছিল।

 

কিন্তু পিয়ালির কাছে এমন কী ডকুমেন্টস ছিল যে–

 

কর্নেল সায়েব! পিয়ালি ব্যাঙ্কে চাকরি করত। অনির্বাণের কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ডিল করত সে। নাও ডু ইউ অন্ডারস্ট্যান্ড দ্য ব্যাকগ্রাউন্ড? আপনার নিশ্চয় জানা। তবু না জানার ভান করছেন। পিয়ালি ব্যাঙ্কের আসানসোল বার্নপুর ব্রাঞ্চের এজেন্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যামবিশাস অ্যান্ড ফেরোশাস পার্সন!

 

বুঝলাম। বাট হোয়াই বিকাশ সেন কিল্ড পিয়ালি?

 

বখরা নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়ে থাকবে। কিংবা এমনও হতে পারে, পিয়ালির কাছে ব্যাঙ্ক ডকুমেন্টের যে কপি ছিল, তা বিকাশ হাতিয়ে নিয়ে চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছে।

 

মিস ব্যানার্জি! আপনি কাল অনেক রাতে লনে বসে ছিলেন। কারও জন্য অপেক্ষা করছিলেন?

 

পিয়ালি তাকাল। আপনি ওত পেতে ছিলেন দেখছি!

 

ধরুন, তা-ই।

 

আমি বিকাশের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে কথামতো আসেনি। এনিওয়ে! আপনার ক্লায়েন্ট একজন মার্ডারার। আশা করি, তাকে বাঁচানোর চেষ্টাই আপনার এখন প্রধান কাজ হবে।

 

কর্নেল হাসলেন। পসিবলি! হোয়াই নট?

 

পায়েল উঠে দাঁড়াল। দেন আই ওয়ার্ন ইউ কর্নেল সায়েব, দ্যাট উইল বি এ ডেঞ্জারাস গেম। ইউ নো রমেশ পাণ্ডে ওয়েল!

 

বলে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর লাউঞ্জে ঢুকে গেল। কর্নেল দেখলেন, লাউঞ্জে ঢোকার সময় পায়েল ব্যানার্জি একবার ঘুরে তার দিকে তাকিয়ে গেল। বুঝলেন, অনির্বাণ রুদ্র তাঁকে হুমকি দিতে পাঠিয়েছি। মেয়েটির দেহে উজ্জ্বল রূপলাবণ্য আছে। সোমকের মডেলিংয়ের জুটি ছিল নাকি। অনির্বাণের মতো বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে লিভ টুগেদার-এর উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে। ফিল্মের হিরোইন হতে চায়। সোমক অবশ্য সে আভাস দিয়েছে। তবে এ যুগে কে-ই বা কেরিয়ারিস্ট এবং অ্যামবিশাস নয়?

 

কর্নেল লনে নামলেন। সময়মতো ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ দুবেকে জানাতে হবে পিয়ালি সত্যি আসানসোলবার্নপুরে কোনও ব্যাঙ্কের এজেন্ট ছিল কি না। একটা র‍্যাকেটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে যেন। বিকাশ-পিয়ালি-অনির্বাণ। পায়েল ব্যানার্জি সম্পর্কে সোমক যেটুকু জানিয়েছে, তা সত্য হলে এই র‍্যাকেটে পায়েলের ভূমিকা গৌণ।

 

কর্নেল গেট পেরিয়ে গিয়ে দেখলেন, ঢালের নীচে নদীর ধারে দীপক ও কুমকুম দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হনিমুনে আসা দম্পতির প্রেমালাপ বলে মনে হয় না। কারণ দুজনেই গম্ভীর।

 

কর্নেল প্রথমে গেলেন নদীর ধারে সেই গাছটার কাছে, যেখানে পাথরের মসৃণ বেদি আছে। বেদিটা সত্যিই সুভদ্রা ঠাকুর যথেচ্ছ রাঙিয়ে রেখেছেন। তবে এখন লাল রঙগুলো তত উজ্জ্বল নয়। সুভদ্রা কিছু লক্ষ্য করেছিলেন, তাতে ভুল নেই। সোমক চলে যাওয়ার পরই সেখানে লাল ফুলের একটু রঙ ছড়িয়ে রেখেছিলেন। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। তার পাগলামির মধ্যে কিছুটা অভিনয় আছে যেন। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি কি নদীর এধারে শর্টকাট রাস্তায় ধারিয়া ফলসে যাওয়ার সময় পিয়ালিকে হত্যার দৃশ্য দৈবাৎ দেখে ফেলেছিলেন?

 

গাছটার কাছ থেকে সরে অন্যত্র যাওয়ার ভঙ্গিতে কর্নেল দীপক ও কুমকুমের সামনাসামনি গেলেন। একটু হেসে বললেন, এক্সকিউজ মি! আপনাদের ডিসটার্ব করলাম না তো?

 

দীপক বলল, করলেন বৈকি! আমি আমার স্ত্রীকে এখানে মেরে ফেলতে এনেছিলাম। আপনি এসে পড়ায় তা হল না!

 

কুমকুম চটে গেল। কী অসভ্যতা করছ ভদ্রলোকের সঙ্গে।

 

দীপক নির্বিকার মুখে বলল, পায়েলদি বলছিলেন উনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ।

 

কর্নেল তার অট্টহাসিটি হাসলেন। তারপর বললেন, ওটা আমাকে গাল দেওয়া হল দীপকবাবু! তবে হ্যাঁ–আমি কোথাও রহস্যময় ঘটনা ঘটতে দেখলে একটু নাক গলাই।

 

এখানে আর কোনও রহস্যময় ঘটনা ঘটবার চান্স নেই কর্নেল সায়েব!

 

কুমকুম বলে উঠল, দীপক ওঁকে সেই কথাটা বলো। তুমি আর শ্রুতিদি ফলসের ওপরে

 

কর্নেল দ্রুত বললেন, শুনেছি। শোভনবাবুকে দেখতে পেয়েছিলেন!

 

দীপক বলল, অনির্বাণ-দাও দেখেছিলেন। ওঁর সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তাড়া ছিল বলে তত লক্ষ্য করেননি।

 

কুমকুম বলল, অনির্বাণদা কিন্তু ফলসের ওপরে ওকে দেখেননি দীপক! জানেন কর্নেল সায়েব? অনির্বাণদা যখন আমাদের ব্রেকফাস্টের জন্য জিপ নিয়ে খাবার আনতে যাচ্ছিলেন, তখন লোকটাকে দেখতে পেয়েছিলেন।

 

কর্নেল বললেন, খাবার আনতে যাচ্ছিলেন অনির্বাণবাবু? একটু ডিটেলস্ বলুন তো!..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *