হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

বিদায় সম্বর্ধনায় তুলকালাম

 

লারকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটি বিশাল সভাকক্ষে ভারতীয় পণ্ডিতদের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল পরদিন সকাল দশটায়। একের পর এক দু-দেশের পণ্ডিতরা বক্তৃতা দিয়ে উঠে মোহেনজোদাড়োতে নতুন এবং বিস্ময়কর প্রত্ন-আবিষ্কারের কথা বলছেন। প্রত্যেকেই কর্নেল বুড়ো এবং এই অধম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর প্রশংসা করছেন। ডঃ আলুওয়ালার জন্য দুঃখ প্রকাশও করছেন।

 

শুনে-শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। উসখুস করছি দেখে কর্নেল বললেন,–তোমাকেও বক্তৃতা দিতে হবে ডার্লিং। তৈরি হয়ে নাও।

 

–পাগল, না মাথাখারাপ! আমি ওতে নেই। এক্ষুনি কেটে পড়ছি।

 

উঠতে যাচ্ছি, ডঃ করিম ঘোষণা করলেন,–এবার ভারতীয় সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর মুখে এই রোমহর্ষক আবিষ্কারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনবেন আপনারা। মিঃ চৌধুরী কলকাতার প্রখ্যাত পত্রিকা দৈনিক সত্যসেবকের স্পেশাল রিপোর্টার।

 

কী আর করি, অগত্যা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দায়সারা কাহিনি শোনালুম। তারপর আসনের উদ্দেশে এগোলুম। মুহুর্মুহু করতালি চারদিকে। আমি তো একেবারে ঘাবড়ে গেছি।

 

গিয়ে দেখি, কর্নেলের আসন শূন্য। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁকে খুঁজলুম। তারপর দেখি, দরজার পাশে উঁকি মেরে চোখের ইশারায় আমাকে ডাকছেন।

 

কাছে যেতে-যেতে শুনি, সভাপতি ডঃ করিম ঘোষণা করছেন–এবার আমি প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে অনুরোধ করছি …

 

বাইরে গিয়ে কর্নেল বললেন,–এসো, কেটে পড়া যাক।

 

বললুম,–আপনি অদ্ভুত মানুষ তো! এটা অভদ্রতা হচ্ছে না? আপনাকে তারা বক্তৃতা দিতে ডাকছেন আর আপনি কেটে পড়ছেন?

 

কর্নেল জবাব না দিয়ে হনহন করে লন পেরিয়ে চললেন। আমার খুব রাগ হল। মাঝে-মাঝে বুড়োর মাথায় যেন ভূত চাপে। এমন একটা জ্ঞানীগুণীর সমাবেশ ছেড়ে এবং রীতিমতো অভদ্রতা দেখিয়ে চলে গেলেন! এতে ভারতেরই মাথা কি হেট হচ্ছে না? কারণ উনি একজন ভারতীয় প্রতিনিধি!

 

দেশের সম্মান বাঁচাতে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। এখনই সভামঞ্চে গিয়ে জানিয়ে দেব, কর্নেল সরকার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি ভাষণ দিতে পারছেন না।

 

কিন্তু হলে ঢুকেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

 

মঞ্চে অবিকল কর্নেল মতোই দাড়ি ও টাকওয়ালা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক সবে মাইকের সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং সবিনয়ে ঘোষণা করছেন,–অধমের নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার …

 

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আসল কর্নেল থাকতে নকল কর্নেল কেন রে বাবা?

 

ডঃ করিম এবং আরও অনেকে তো আসল কর্নেলকে চেনেন। এমনকি এই দু-তিনদিন ধরে ওঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেন। অথচ একজন উটকো লোক উঠে গিয়ে কর্নেল সেজে মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছে।

 

আমি হতভম্ব হয়ে সামনের দিকে সাংবাদিকদের জায়গায় আমার নির্দিষ্ট আসনে বসতে গেছি, সেই সময় আচম্বিতে একটা তুলকালাম শুরু হয়ে গেল।

 

প্রথমে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল। তারপর দেখলুম নকল কর্নেল মাইকের সামনে উঁচু ডেস্কটার তলায় ঢুকে পড়লেন।

 

তারপর চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি তাণ্ডব চলতে থাকল। মিলিটারি সেপাইদের মঞ্চ ঘিরে ফেলতে দেখলুম। ওরে বাবা! পাকিস্তানে কি আবার মিলিটারি বিপ্লব হচ্ছে তাহলে?

 

মঞ্চে কর্নেল কামাল খাঁকে দেখলুম। দুহাতে দুটো রিভলভার নিয়ে হেঁড়ে গলায় গর্জন করলেন,–যে-যেখানে আছেন, চুপচাপ বসে পড়ুন! আমরা আততায়ীকে পাকড়াও করেছি।

 

এই সময় আমার বাঁদিকের দরজার কাছে দেখতে পেলুম, সেপাইরা একটা লোককে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে আমার চেনা মনে হল। ওঃ হো! একেই তো সেদিন পার্কে ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলুম। সভা এবার অনেকটা শান্ত হয়েছে। যারা হুড়মুড় করে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেকে ফিরে এসে আসনে বসছে। বুঝলুম, এ দেশে এমন কাণ্ড যেন লোকের গা সওয়া।

 

কিন্তু ততক্ষণে আমি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি।

 

গোয়েন্দা দফতর আগেভাগে টের পেয়েছিল, কর্নেল মঞ্চে উঠলেই গুপ্তঘাতকের পাল্লায় পড়বেন। তাই নকল কর্নেল সাজিয়ে গোপনসূত্রে পাওয়া খবরের সত্যতা যাচাই করতে চেয়েছিল। বলাই বাহুল্য, সত্যিকার কর্নেলকে মঞ্চে হাজির করে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু বলিহারি সাহস ওই নকল কর্নেল ভদ্রলোকের! যদি গুলিটা লাগত!

 

আমি আর বসে থাকতে পারলুম না। তখুনি ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। বাইরে কোথাও কর্নেলকে দেখতে পেলুম না।

 

তখন একটা ট্যাক্সি ডেকে সটান হোটেলে চলে গেলুম। ইন্টারলকিং সিস্টেমের দরজা লক করা আছে। চাবি দিয়ে খুললুম। হ্যাঁ, বুড়ো ঘরেই আছেন। তবে চুপচাপ বসে নেই। টেবিলে সেই গুহার সিন্দুকে পাওয়া চাকতিটা ঘষামাজা করছেন। দুটো ছোট শিশিতে সাদা ও রঙিন তরল পদার্থ রয়েছে। একটা ছোট্ট ব্রাশ দিয়ে ব্রোঞ্জের চাকতিটা পরিষ্কার করছেন কর্নেল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *