হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রাজা হেহয়ের শিলালিপি
যখন জ্ঞান হল, কয়েক মুহূর্ত কিছু বুঝতে পারলুম না কোথায় আছি এবং কী ঘটেছে। তারপর সব মনে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলুম। সর্বাঙ্গে ব্যথা করছে।
সামনে একটা পিদিম জ্বলছে। সেই আলোয় যা দেখা গেল, বুঝলুম আমি একটা গুহার মধ্যে আছি। পিদিম জ্বলছে একটা পাথরের বেদির ওপর। মাটির পিদিম আর বেদির পাশে এক বুড়ো জটাজুটধারী লম্বাচওড়া দাড়িওয়ালা ফকির চোখ বুজে সম্ভবত ধ্যান করছেন। তার গলায় কয়েকটা রঙিন পাথরের মালা।
তখন মুহূর্তেই আতঙ্ক ঘুচে গেল। ডাকলুম,–ফকিরসায়েব!
ফকিরসায়েব! ফকির চোখ খুললেন এবং ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললুম,–আমাকে এখানে কে আনল ফকিরসায়েব?
ফকির ইশারায় কাছে ডাকলেন। গুহার ছাদটা নিচু। দাঁড়ালে মাথা ঠেকে যাবে। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেলুম। তখন ফকির আমাকে অবাক করে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন, তুমি কে বাবা?
–এ কী! আপনি বাঙালি?
–হ্যাঁ বাবা, আমি বাঙালি। কিন্তু তুমি কি কোনো পর্যটক? মোহেনজোদাড়ো দেখতে এসেছিলে?
–হ্যাঁ ফকিরসায়েব। কিন্তু আপনি …।
ফকির একটু হেসে বললেন,–দেখতেই তো পাচ্ছ আমি সংসারত্যাগী ফকির। এই গুহায় সাধনভজন করি। এটাই আমার আস্তানা। কিন্তু তুমি কেমন করে ওই নচ্ছারটার পাল্লায় পড়লে? ভাগ্যিস, ওই সময় একবার বেরিয়েছিলুম। আমার সামনে পড়তেই ব্যাটা তোমাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল। আমি তখন নিয়ে এলুম তোমাকে।
–কে ও? ভূত, না মানুষ?
ফকির আবার হেসে ফেললেন। –ও ব্যাটাকে ভূতও বলতে পার মানুষও বলতে পার। ও একটা ভূত-মানুষ।
–তার মানে কী ফকিরসায়েব?
–মানে? মানে কী আমিও জানি ছাই? এই গুহায় জুটেছি আজ প্রায় দুবছর। প্রথম প্রথম অমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। তারপর আমিই ওকে ভয় পাইয়ে দিলুম। আমার এই ফকিরি চিমটে ঝনঝন করে বাজালেই ব্যাটা পড়ি-কী-মরি করে পালিয়ে যায়। তবে একথা ঠিক, ওকে দিনে একবারও দেখিনি! তা হলে ও আসলে কে, ঠিকই বুঝতে পারতুম। ব্যাটা সন্ধ্যার পর বেরিয়ে পড়ে। এই খাদেই ওর গতিবিধি। তবে একবার ফুটফুটে চাঁদের আলোয় সামনা-সামনি দেখেছিলুম। ও মানুষের মতো দু-পায়েও হাঁটে। অসম্ভব জোরে দৌড়াতে পারে। আর ওর একটা বিদঘুঁটে অভ্যাস। মাঝে মাঝে ঘোড়ার মতো চিহি করে ওঠে। মনে হবে, ওটা ওর হাসি। কিন্তু মোটেও তা নয়। ব্যাটা নিজেকে হয়তো ঘোড়া ভাবে।
ফকিরের এসব কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। বললুম,–এবার আপনার কথা বলুন।
–আমার কথা কী বলব বাবা? বললুমই তো, আমি সংসারত্যাগী মানুষ।
–কিন্তু আপনি বাঙালি বলেই আমার সব কিছু জানতে ইচ্ছে করছে।
–জেনে কী হবে? তার চেয়ে এখন তোমার বিশ্রাম জরুরি। এ গরিবের আখড়ায় তোমার খুব কষ্ট হবে, জানি। কিন্তু উপায় কী? অল্প কিছু ফল আছে। খেয়ে নাও। কুঁজোয় জল আছে। খেয়েদের শুয়ে পড়ো। কম্বলও পাবে।
–জায়গাটা কোথায় বলুন! আমি বরং ট্যুরিস্ট লজে ফিরে যাব তা হলে।
–সর্বনাশ! সর্বনাশ। খবর্দার বাবা, এখন গুহা থেকে বেরুলেই বিপদে পড়বে।
–কেন বলুন তো?
ফকির গম্ভীর হয়ে বললেন, সম্প্রতি কিছুকাল থেকে গুণ্ডাপ্রকৃতির কিছু লোক ওপরের দিকে একটা গুহায় আস্তানা গেড়েছে। তাদের কাছে প্রচুর গুলিবারুদ অস্ত্রশস্ত্রও আছে। মাঝে-মাঝে দেখি, তারা এখানে-ওখানে মাটি খোঁড়াখুড়ি করছে। পাথরের আড়াল থেকে ওদের গতিবিধি লক্ষ করেছি। আমার ধারণা, ওরা গুপ্তধন খুঁজছে। যদি বৈদাৎ ওদের পাল্লায় পড়ে যাও, খুন হয়ে যাবে। কারণ ওদের খরব কেউ জানুক, এটা ওরা চায় না। একদিন আমি তো গুলিতে মরতে-মরতে বেঁচে গেছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার এই আস্তানার খবর ওরা জানে না।
আজ সন্ধ্যায় যা ঘটেছে, ফকিরকে বলব ভাবলুম। পরে মনে হল, কী দরকার? ফকির হয়তো আরও ভয় পেয়ে যাবেন এবং আমাকে পাল্টা আরেকটা গুপ্তধন সন্ধানী দলের লোক ভেবে বসবেন।
বললুম,–অন্তত একটা কথার জবাব দিন। এই গুহাটা ট্যুরিস্ট লজ থেকে কত দূরে?
–তা মাইল পাঁচেকের বেশি তো হবেই। তবে গুহাটা খাদের ধারেই। একবার বেরিয়ে গেলে কিন্তু আর খুঁজে এখানে ঢোকা মুশকিল। এটাই এ গুহার মজা!
–কেন?
–সে স্বচক্ষে সকালে দেখবে’খন। এটা একটা গোলকধাঁধার মতো। খাদের পাশে দেওয়ালের মতো এবড়োখেবড়ো পাথরে অজস্র ফাটল আছে। কোন ফাটল দিয়ে ঢুকলে এ গুহায় পৌঁছানো যাবে, বোঝা মুশকিল। আমারও মাঝে-মাঝে গণ্ডগোল হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা। ভুল ফাটলের মধ্যে ঢুকে হয়রান হই। প্রত্যেকটা ফাটলই তলায়-তলায় সুড়ঙ্গের মতো গলিখুঁজি ঘরে গিয়ে শেষ হয়েছে। শুধু একটা ফাটলের পথ এ গুহায় পৌঁছেছে। সেই ফাটলে অবশ্য একটা চিহ্ন দিয়ে রেখেছি। অন্যের চোখে পড়া মুশকিল। ওটা শুধু আমিই চিনতে পারি।… বলে ফকির বেদির ওপর রাখা একটা ঝোলা থেকে দুটো আপেল বের করলেন। তারপর বললেন,–নাও। খেয়ে ফেলল। অনেক রাত হয়েছে। আমার এখন ধ্যানে বসার সময়। দয়া করে আর আমাকে ডাকাডাকি কোরো না। আর এই কম্বলটা রইল। গুহার মধ্যে শীত তত টের পাবে না। শুয়ে পড়বে চুপচাপ।
কী আর করি, একটা আপেলে কামড় বসালুম। খিদেয় পেট চোর্চো করছে। মাটির কুঁজো থেকে জলও খেলুম। তারপর নগ্ন পাথরের মেঝেয় শুয়ে পড়লুম। কম্বলটা দরকার হল না। ওই একটা মোটা কম্বল। ফকিরের কম্বলে আর ভাগ বসাই কেন? ফকির আবার চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়েছেন ততক্ষণে।
যাক গে, রাতের আশ্রয় পেয়েছি এবং মামদো ভূতের–উঁহু, ঘোড়াভূতের হাত থেকে বেঁচে গেছি, এই পরম সৌভাগ্য।
হঠাৎ মনে পড়ল, কর্নেল বলেছিলেন মোহেনজোদাড়োর ঘোড়াভূতের কথা। তা হলে তো এই সেই ঘোড়াভূত! ওর বিকট হাসির মতো হি হি করে ওঠাটা এখনও কানে ভাসছে।
কিন্তু কে ও? বেঁচেবর্তে ট্যুরিস্ট লজে ফিরতে পারলে কর্নেলকে সব জানাতে হবে। তারপর এই রহস্যের কিনারা করতেই হবে।
এইসব ভাবতে-ভাবতে আর ঘুমই এল না। তার ওপর সারা শরীরে ব্যথা। কেটে ছড়ে গেছে অনেক জায়গায়। জ্বরজ্বালা না এলে বাঁচি। একটু পরে পাশ ফিরে দেখলুম ফকির একইভাবে ধ্যানস্থ। পাশ দিয়ে বেদিটা দেখা যাচ্ছে।
বেদিটার কিছু অংশে আলো পড়েছে। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলুম বেদির গায়ে অজস্র খোদাই করা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। অবিকল সিন্ধুলিপির মতো।
মতোই বা বলছি কেন? এখানে সিন্ধুলিপিই তো স্বাভাবিক। তা হলে এই বেদিটা নিশ্চয় সিন্ধুসভ্যতার সমকালীন।
চঞ্চল হয়ে উঠলুম। তা হলে তো আমি এযাবৎ অনাবিষ্কৃত একটা প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করে ফেলেছি?
কিন্তু ওই বেদিটা কীসের? নিছক পুজো-আচ্চার বেদি-নাকি ওটা একটা কবর? সিন্ধুসভ্যতার কবরও পাওয়া গেছে অনেকগুলো। তখন যেমন মড়া পোড়ানো হত, তেমনি কবরও দেওয়া হত। হরপ্পাতে কয়েকটা কঙ্কালও পাওয়া গেছে। মাটির জালায় সেগুলো ঠেসে ভরা ছিল। কর্নেলের কাছেই তো শুনেছি এসব কথা।
সাবধানে মুখটা একটু বাড়িয়ে লিপিগুলো ভালো করে দেখার চেষ্টা করলুম। তারপর আবার চমকে উঠলুম।
এ কী দেখছি? ডঃ আলুওয়ালার যে ফলকের স্কেচ কর্নেল হাতিয়ে ছিলেন এবং ডঃ ভট্টাচার্য যে ফলকের পাঠোদ্ধার করেছিলেন, তার সঙ্গে বেদির গায়ের খোদাই করা লিপিগুলোর হুবহু মিল রয়েছে।
সেই ফলকের চিত্রলিপিগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম। না। অবিকল সেই বলদ অথবা হনুমান অথবা ঘোড়া এবং মানুষটাও রয়েছে যে!
তা হলে কি এই বেদির তলায় …
আর ভাবতে পারলুম না। আনন্দে উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠলুম। যেভাবেই হোক, এই গুহায় ঢোকার পথটা সকালে যাবার সময় ফকিরের অজান্তে চিহ্নিত করে রাখব।
তারপর আর সময় কাটতেই চায় না। ফকির ধ্যানমগ্ন। নিস্তব্ধ গুহা ছমছম করছে।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
ফকিরের ডাকে ঘুম ভাঙলে তাকিয়ে দেখি মাথার ওপর একটা ফাটল দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে গুহায় ঢুকেছে। গুহার ভেতর অন্ধকার নেই।
উঠতে গিয়ে টের পেলুম, এবার হেঁটে অতখানি পথ যাওয়া ভারি কষ্টকর হবে। কিন্তু উপায় নেই।
ফকির সস্নেহে জিজ্ঞেস করলেন,–শরীর কেমন বাবা? হেঁটে যেতে পারবে তো?
একটু হেসে বললুম,–দেখা যাক।
–যদি না পার, থেকে যাও। তোমার সেবাযত্নের ত্রুটি হবে না।
–না ফকিরসায়েব, আমাকে যেতেই হবে।
–তা হলে এসো।
ফকিরের সাহায্যে আস্তে-আস্তে উঠে বসলুম। নিচু খাদ। ফকির আগে, আমি পেছনে সাবধানে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকলুম।
সত্যি এ একটা গোলকধাঁধা। ঘুরে-ঘুরে পথটা অন্ধকারে এগিয়েছে। আমি বাঁকগুলো গুনতে থাকলুম। নটা বাঁকের পর অন্ধকার ঘুচল। কিন্তু টের পেয়ে গেছি, এই সুড়ঙ্গ পথের আরও অনেক শাখাপথ আছে। তবে সেই পথগুলো আরও ঘুপটি। কাজেই ভুল হবার চান্স নেই।
আবছা আলোর মধ্যে চলার সময় হাত বাড়িয়ে ফকিরের অজান্তে একটুকরো পাথর কুড়িয়ে নিলুম। কিছুক্ষণ পরে ফাটলের মুখে পৌঁছনো গেল। ফকির বেরিয়ে গিয়ে ডাকলেন–এসো বাবা!
সেই সময় দ্রুত পাথরের টুকরোটা দিয়ে ফাটলের নীচে একটা বর্গমূল নির্ণয়ের চিহ্নের মতো চিহ্ন দিলুম।
ফাটলটা মোটে ফুট দেড়েক চওড়া, কিন্তু অনেকখানি লম্বা। অতিকষ্টে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, সেই খাদে পৌঁছেছি। খাদটা বালি আর পাথরে ভর্তি। দুধারে খাড়া পাথরের দেওয়াল। ফকির ফের জিজ্ঞেস করলেন,–কষ্ট হচ্ছে কি হাঁটতে?
বললুম,–না।
–আমি কিন্তু বেশি দূর যেতে পারব না। তোমাকে মোহেনজোদাড়ের প্রটেক্টেড এরিয়ার কাছে পোঁছে দিয়ে আসব।
ফকিরের মুখে ইংরেজি শব্দটা শুনে চমকে উঠলাম। উচ্চারণও নিখুঁত। তা হলে কে এই ফকির? বললুম,–আপনি নিজের কোনো পরিচয়ই দিলেন না ফকিরসায়েব।
ফকির একটু হেসে বললেন,–কী হবে পরিচয় জেনে? পরিচয় বলতে আজ আর কি আছে আমার? ঈশ্বরের ধ্যানে কাটাচ্ছি। যেকটা দিন বাঁচব ঈশ্বরের ধ্যানেই কাটাব। বাবা, আমার মতো পাপী আর কে আছে? এ সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত!
–পাপী কেন বলছেন আপনি?
–হ্যাঁ বাবা, আমি মহাপাপী। একদিন আমিও মোহেনজোদাড়োর গুপ্তধনের লোভে পাগল হয়ে উঠেছিলুম। গুপ্তধনের লোভ বড় সাংঘাতিক বাবা! এই লোভেই আমার এক প্রাণের বন্ধুকে খুন করেছিলুম!
বলে ফকির দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আমি হতবাক।
পরক্ষণেই উনি সংযত হয়ে চোখ মুছলেন জোব্বায়। তারপর বললেন,–চলো বাবা! এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।
বাকি পথ আমরা দুজনেই চুপচাপ এলুম। মাইলখানেক চলার পর দেখা গেল, একখানে খাদের দুধারেই ঝোঁপঝাঁপ গাছপালা দেখা যাচ্ছে। পাথরও বিশেষ নেই। দুধারে পাড় অনেক ঢালু। ফকির বললেন,–বাঁ পাড়ে উঠে গেলেই আশা করি চিনতে পারবে।
আমি কৃতজ্ঞতায় ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে এগিয়ে গেলুম। এক সময় পাড়ে উঠে পিছু ফিরে দেখি ফকির দ্রুত চলেছেন খাদের পথে। একবারও ওঁকে পিছু ফিরতে দেখলুম। না। কিন্তু কে এই ফকির? …
