হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

মামদো ভূতের কবলে

 

গেস্ট হাউসটার পরিবেশ এই রুক্ষ মরুসদৃশ জায়গায় একেবারে বিপরীত। সবুজ গাছ ও ফুলে সাজানো। মোহেনজোদাড়ো রয়েছে পূর্বে অনেক নীচে। তার ওধারে সিন্ধুনদের চরগুলো দেখা যাচ্ছে। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে চা খেতে খেতে কর্নেল হঠাৎ বললেন,–ওই দেখো জয়ন্ত, ভারতীয় পণ্ডিত এবং সাংবাদিকদের বাস দুটো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওঁরা মোহেনজোদাড়ো শহরের রাজপথে হেঁটে যাচ্ছেন।

 

দেখে নিয়ে বললুম,–আমরা কখন বেরুব?

 

–সন্ধ্যার একটু আগে। ওঁরা বিদায় নিক, তারপর।

 

–ওরে বাবা! শুনেছি ভূতের ভয়ে নাকি সন্ধ্যার দিকে ওখানে কেউ ঘেঁষে না।

 

–তা সত্যি। তবে সরকারি লোকেরাও পাঁচটার পর ওখানে কাউকে যেতে দেয় না।

 

–আমরা কীভাবে যাব তা হলে?

 

–আমরা আপাতত অন্য এলাকায় যাব।

 

এরপর কর্নেল মোহেনজোদাভোর কথা শুরু করলেন। বুঝলুম, বুড়ো ইতিমধ্যে প্রচুর কেতাব পড়ে ফেলেছেন। সিন্ধু সভ্যতার বৈশিষ্ট্য, ইরাকের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে সুমেরু সভ্যতার সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে শুরু করে আর্যদের ভারতে আগমন এবং দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে সংঘর্ষ–সে এক পেল্লায় ইতিহাস শুনিয়ে ছাড়লেন। আমার কান ও মাথা ভো ভো করছিল। সেই সময় ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁ এসে গেলেন। বাঁচা গেল এবার।

 

আরেকবার চা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। কিন্তু যথেষ্ট রোদ আছে। কারণ এটা পশ্চিম ভারতের-থুড়ি, পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অঞ্চল। কলকাতার সঙ্গে সময়ের তফাত আছে। কলকাতার সূর্যাস্ত যখন, তখনও এখানে সূর্য দিগন্তের অনেকটা উঁচুতে।

 

আমরা জিপে চেপে চলেছি। বুঝলুম, গন্তব্যস্থান আপাতত ওই ভূতের শহর নয়, সিন্ধুনদের সেই মজে-যাওয়া ত্রিকোণ জায়গা। বুকের মধ্যে কাঁপন শুরু হয়ে গেল।

 

দক্ষিণে মাইল দুই এগিয়ে ন্যাড়া এবং পাথরভর্তি জমি এবং টিলাগুলোর মধ্যে একস্থানে জিপ দাঁড়াল। সবাই নামলুম। আগে আগে চললেন ডঃ করিম। উনি পথপ্রদর্শক।

 

এবার আমরা পুবের দিকে চলেছি। রাস্তাঘাট নেই কোথাও। কাঁটাঝোঁপ আর পাথুরে জমি। কিছুটা এগিয়ে দুরে আবার সিন্ধুনদ চোখে পড়ল। আমরা যেখানে দাঁড়ালুম, তার নীচে গভীর এবং চওড়া খাদ উত্তর থেকে এসে বাঁক নিয়ে পুবে এগিয়ে গেছে। কর্নেল বলে উঠলেন,–এটাই কি সেই প্রাচীন সিন্ধুনদের গতিপথ?

 

ডঃ করিম বললেন,–হ্যাঁ। আমাদের এই খাদ পেরিয়ে ওপারে উঠতে হবে।

 

পাথরে পা রেখে সাবধানে চারজনে নামতে শুরু করলুম। তিনশ ফুট নীচে খাদে অন্ধকার জমে গেছে ইতিমধ্যে।

 

খাদ থেকে ওপারে ওঠাটা ভারি কষ্টকর। কিন্তু তিনজন বয়স্ক মানুষ–বিশেষ করে একজন তো পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ো, অর্থাৎ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার–ওঁরা যখন পারছেন, জোয়ান হয়ে আমার না পারার কারণ নেই।

 

ওপরে উঠে ঢালু সমতল ত্রিকোণ জমিটায় যখন পৌঁছলুম, তখন প্রচণ্ড হাঁফাচ্ছি।

 

ডঃ করিম বললেন,–আসুন, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা যাক। এখনও কিছুটা দেরি আছে।

 

সবাই শুকনো ঘাসে বসে পড়লুম। জানতে চাইলুম কীসের দেরি।

 

–চাঁদ ওঠার। জবাবটা কর্নেল দিলেন। জয়ন্ত, প্রথম চাঁদ কিন্তু! প্রতিপদে চাঁদ দেখা যায় না। আজ দ্বিতীয়া।

 

–তা চাঁদের সঙ্গে কী সম্পর্ক?

 

–ফলকের সংকেতের কথা কি ভুলে গেছ জয়ন্ত?

 

-–তাই বলুন। কিন্তু চাঁদ উঠলে হবেটা কী শুনি?

 

ডঃ করিম হাসতে হাসতে বললেন,–জয়ন্তবাবু সাংবাদিক মানুষ। কাজেই এত কৌতূহলী। তবে অপেক্ষা করুন। কিছুক্ষণ পরেই সব বুঝতে পারবেন।

 

দিনের আলো ক্রমশ কমে আসছিল। ওঁরা চাপা গলায় কীসব আলোচনা করছিলেন! কান দিলুম না। আমি একটু কল্পনাপ্রবণ হয়ে পড়েছিলুম। আজ থেকে অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে শস্যক্ষেত্র ছিল। ব্রহ্মাবর্তরাজ হেহয় রাজ্যচ্যুত হয়ে এদেশে সেদেশে ঘুরতে ঘুরতে ঘোড়ার পিঠে চেপে যখন এখানে পৌঁছলেন, তখন সবে চাঁদ উঠেছে। একফালি ক্ষীণ চাঁদ। ধনরত্ন লুকিয়ে রাখতে এসেছেন এই নির্জন শস্যক্ষেত্রে। কারণ কখন ওই ধনের লোভে তাকে দস্যুরা মেরে ফেলবে বলা যায় না।

 

কল্পনার চোখে দেখতে থাকলুম দৃশ্যটা। নির্জন নিঝুম, অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠা এই মাঠে ওই যেন একটা ঘোড়ার লাগাম ধরে এগিয়ে আসছে একটা মানুষ! তারপর …

 

আচমকা আমার কল্পনা ছত্রখান হয়ে গেল। কোত্থেকে কে বা কারা গুলিবৃষ্টি শুরু করল মুহুর্মুহু। সঙ্গে-সঙ্গে আমরা উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম। কর্নেল কামাল খাঁর চিৎকার শুনলুম।লুকিয়ে পড়ুন, লুকিয়ে পড়ুন! পাথরের আড়ালে চলে যান সবাই!

 

এখানে ওখানে পাথরের মস্ত চাই রয়েছে। তখন অন্ধকার কিছুটা ঘন হয়েছে। ঝোঁপঝাড় ও শুকনো ঘাসে প্রায় সাপের মতো বুকে হেঁটে যে-যেখানে পারলুম। আত্মরক্ষা করতে ব্যস্ত হলুম। একটা উঁচু পাথরের আড়ালে পৌঁছে মাথা তুললুম। আবার এক ঝাঁক গুলি এসে পড়ল। মুখ গুঁজে মড়ার মতো পড়ে রইলুম।

 

তারপর সব চুপচাপ।

 

তারপর জোরালো টর্চের আলো ছড়িয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আমাদের দলের কেউ আলো লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লেন। আলো নিভে গেল।

 

এতক্ষণে আমার মনে পড়ল, আসার সময় রিভলভারটা নিতে ভুলে গেছি! নিজেকে অসহায় মনে হল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমাদের দলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে কে কোথায় ছিটকে পড়েছি বোঝা যাচ্ছে না। পাথরটা উঁচু এবং প্রকাণ্ড। এপাশ-ওপাশ সাবধানে ঘুরে আবছা অন্ধকারে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছি।

 

একটু পরে সম্ভবত পিছনে খাদের দিক থেকে কর্নেল কামাল খাঁর ডাক শোনা গেল–জয়ন্তবাবু! জয়ন্তবাবু!

 

সাড়া দিয়ে বললুম,–আমি এখানে!

 

সঙ্গে সঙ্গে আমার সামনের পাথরে এক ঝাঁক গুলি এসে পড়ল। স্পিনটারের ফুলকি আর পাথরের টুকরো ছিটকে পড়তে থাকল। আবার ঘাড় গুঁজে মড়ার মতো পড়ে রইলুম।

 

গুলি ছোঁড়া বন্ধ করল ওরা। কতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মুখ তুলে দেখি, অন্ধকার ঘন হয়েছে। কারুর কোনো সাড়া নেই। চেঁচিয়ে কর্নেলকে ডাকব ভাবলুম। কিন্তু আবার যদি ওরা গুলি ছোঁড়ে, সেই ভয়ে চুপ করে গেলুম।

 

কিন্তু ওরা কারা? যারাই হোক, অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি এখানে আমাদের এসে পড়াটা ওদের পছন্দ হয়নি।

 

ঘাড় ঘুরিয়ে এ সময় চোখে পড়ল, পিছনে দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশের দিগন্তে একফালি ক্ষীণ চাঁদ জেগে আছে। এখনই ওই চাঁদ অস্ত যাবে। পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে ঠিক এই সময়ে যে নাটক শুরু হয়েছিল, আজ এতকাল পরে কি তারই শেষ দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে?

 

কিন্তু আর এভাবে থাকা যায় না। আস্তে আস্তে গিরগিটির মতো লম্বা হয়ে পিছিয়ে গেলুম। যে ভাবেই হোক, খাদে গিয়ে নামতে হবে। সম্ভবত দুই কর্নেল এবং ডঃ করিম খাদেই নেমে গেছেন এবং আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। একবার নীচে থেকে আবছা ডাকও যেন শুনলুম।

 

কতক্ষণ ওইভাবে পিছু হটে এগিয়েছি হিসাব নেই। এক সময় দেখি, উঁচু উঁচু পাথরের মধ্যে এসে পৌঁছেছি। মনে পড়ল, খাদের কিনারায় এমনি উঁচু পাথরের সারি ছিল বটে। এবার হামাগুড়ি দিয়ে সোজা এগোলুম। কিন্তু হঠাৎ পা পিছলে গেল এবং গড়াতে গড়াতে নীচের দিকে পড়তে থাকলুম।

 

ক্রমাগত পাথরে ধাক্কা খেতে-খেতে হাড়গোড় ভেঙে যাবার দাখিল। আঁকড়ে ধরার মতো কিছু পাচ্ছি না। শুধু মসৃণ পাথর। তারপর গিয়ে পড়লুম বালির গাদায়। আঘাতটা জোর হল না। বুঝলুম, খাদের তলায় বালির চড়ায় এসে পড়েছি।

 

চিত হয়ে কতক্ষণ আচ্ছন্নভাবে পড়ে থালুম।

 

হঠাৎ কী একটা খসখস শব্দ হল। তারপর বিশ্রী দুর্গন্ধ টের পেলুম। নিশ্চয় কোনো হিংস্র জন্তু-বাঘ কিংবা নেকড়ে। শুনেছি এদেশের পাহাড়ি এলাকায় নেকড়েরা দলে-দলে ঘুরে বেড়ায়। আতঙ্কে আবার কাঁপুনি শুরু হল।

 

একটু পরে মনে হল যে খসখস শব্দটা শুনেছিলুম, সেটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। দুর্গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে। নাকে রুমাল চাপা দেব ভেবে যেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে গেছি, অমনি কী একটা প্রাণী আমার হাত ধরে ফেলল।

 

হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে বুঝলুম, প্রাণীটার গায়ে অসম্ভব শক্তি। সে এক হ্যাঁচকা টানে আমাকে বালির ওপর টানতে শুরু করল।

 

এবার টের পেলুম, প্রাণীটার মানুষের মতো হাত আছে। সেই হাত আমার কব্জি সাঁড়াশির মতো ধরেছে। পরক্ষণে সে আচমকা পিলে চমকানো হাসি হেসে উঠল–হিঁ-হিঁ হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ!

 

ওরে বাবা! এ যে ভূতুড়ে হাসি! তা হলে এ কার পাল্লায় আমি পড়েছি? চেঁচিয়ে ওঁদের ডাকব ভাবলুম, কিন্তু গলা দিয়ে শুধু গোঁ গোঁ আওয়াজ হল। তারপর দেখি, সেই ভূতুড়ে প্রাণীটা দুহাতে আমাকে শূন্যে তুলে নিয়েছে এবং দৌড়তে শুরু করেছে। বিকট গন্ধে নাড়িভুড়ি উগরে আসছে।

 

তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললুম।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *