হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ডঃ আলুওয়ালার অন্তর্ধান
অনেক চেষ্টাচরিত্র করে পাকিস্তানগামী সাংবাদিকদের দলে ঠাই পেলুম। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে যখন পৌঁছেছি, তখনও কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই। বিমান ছাড়তে আর পনেরো মিনিট দেরি। উদ্বিগ্ন হয়ে ঘোরাঘুরি করছি, সেই সময় পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের দলটি এসে পৌঁছলেন। পনেরো জন পণ্ডিত এক জায়গায় জুটলে যা হয়। প্রত্যেকের মুখ গম্ভীর হাবভাব দেখে ভয় করে আমার। দু-তিনজন বাদে সবার চুল পাকা। জ্ঞানের তাপেই হয়তো টাক পড়েছে অনেকের মাথায়। কিন্তু কোথায় আমার সেই সুপরিচিত টাক? শুধু টাক থাকলেই চলবে না, দাড়িও চাই।
রাশভারি দলটির মধ্যে দাড়িওয়ালা আছেন, টাকওলাও আছেন। কিন্তু একসঙ্গে দাড়ি ও টাক আছে, এমন কাকেও দেখতে পাচ্ছি না।
তা হলে কর্নেল কি দলে ভিড়তে পারেন নি? ভাবনায় পড়ে গেলুম। আমি খামোকা একা গিয়ে করবোটা কী? তা ছাড়া ওইসব গোরস্থান বা ভূতপেরেতের জায়গায় যাওয়া আমার একেবারে পছন্দসই নয়। নেহাত বুড়ো ঘুঘুমশায়ের টানে এত কাণ্ড করে এখানে হাজির হয়েছি।
মাইকে বিমানযাত্রীদের ডাকাডাকি শুরু হল। সেই সময় ঠাহর করে দেখি, ডঃ আলুওয়ালা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন। আমার চোখে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে এলেন হাসিমুখে,–আরে! জয়ন্তবাবু না? আপনিও কি যাচ্ছেন নাকি ডেলিগেশনের সঙ্গে?
–যাচ্ছি। আপনিও আছেন, তা লিস্টে দেখলুম।… বলে আমি খুব অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করলুম।
ডঃ আলুওয়ালা মুখে খুশির ভাব ফুটিয়ে বললেন,–যাকগে মশাই। বাঁচা গেল। আমি গোলমাল ভিড় একদম পছন্দ করি নে। তাতে বুঝতেই পারছেন, আজকাল আমি অনেক জ্ঞানীগুণী লোকেরই ঈর্ষার কারণ হয়েছি। তাই একদম ইচ্ছে করছিল না যেতে। সরকারও ছাড়লেন না, আর শেষ অব্দি দেখলুম, যে বিষয়ে সারাজীবন গবেষণা করছি–সেই বিষয়েই তো এই ডেলিগেশন। তবে তার চাইতে বড় কথা বাল্যস্মৃতি। লারকানা এলাকায় আমার ছেলেবেলা কেটেছে। কাজেই মনের টানও বাজল।
আমি মন দিয়ে ওঁর কথা শুনছিলাম না। কারণ কর্নেল বুড়ো এখনও এসে পৌঁছলেন না। বিমানযাত্রীদের আবার ডাকা হচ্ছিল। ডঃ আলুওয়ালা আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন। সিকিউরিটি পুলিশ ও শুল্ক দপ্তরের লোকেরা পরীক্ষা করছেন। প্রত্যেক যাত্রীকে লাইনে দাঁড়াতে হবে।
পাসপোর্ট ভিসা এবং অন্যান্য আইন কানুনের ব্যাপার সামলে যখন পাকিস্তান এয়ারলাইনসের বিশাল বোয়িং বিমানের সিঁড়ির কাছে পৌঁছলুম, তখনও কর্নেলের পাত্তা নেই।
কোনো গণ্ডগোলে পড়েননি তো? ডেলিগেশনের লিস্টে নাম আছে দেখেছি। অথচ এখনও আসছেন না কেন?
দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ডঃ আলুওয়ালা ঠেলতে ঠেলতে বিমানে চড়িয়ে ছাড়লেন। সিট নম্বর মেলাতে গিয়ে দেখি আমার পাশে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী বলে এক পণ্ডিতের সিট পড়েছে। দুচ্ছাই! বরং কোনো সাংবাদিক পাশে থাকলে জমতো ভালো। মিঃ যোশী গাব্দাগোব্দা প্রকাণ্ড মানুষ। বেঁটে। দাড়িগোঁফ আছে মুখে। অবশ্য টাক নেই। কাঁচাপাকা কোঁচকানো একরাশ চুলে মাথাটা ভর্তি। আমার সঙ্গে তখুনি আলাপ করে নিলেন। ভারি অমায়িক লোক মনে হল। একটু পরেই বিমান ছাড়ার সময় হয়ে গেল। আমি তখন কর্নেলের আশা ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি।
বিমান ফ্লাই অন রানওয়ে দিয়ে চলতে চলতে ক্রমশ গতি বাড়াল। তারপর মাটি-ছাড়া হল। আজ আবহাওয়া ভারি চমৎকার। সকালের রোদ ঝলমল করছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখি আকাশের এতদূরে পৌঁছেছি যে নীচে সব সমতল দেখাচ্ছে–যেন একখানা চমৎকার কার্পেট পাতা রয়েছে। যা গে! কর্নেল যখন এলেন না, তখন ফলকরহস্য তোলা রইল। অন্য সাংবাদিকরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, আমিও যখন সাংবাদিক তখন সেই উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সফর করে আসি। উপায় কী আর?
লারকানা বিমানবন্দর তিন ঘণ্টার যাত্রা। একটু পরে বিমানে পরিচারিকা স্ন্যাকস্ ও কফি দিতে এলেন। স্ন্যাকসের প্যাকেটের সঙ্গে দেখি একটা চিরকুট। তাতে লেখা আছে : ডার্লিং! ইওর ওল্ড ডাভ ইজ হিয়ার।
ওল্ড ডাভ! বুড়ো ঘুঘু। আমি চঞ্চল চোখে তাকাতেই পরিচারিকা একটু হেসে পিছনে ইশারা করলেন। ঘুরেই ইচ্ছে হল চেঁচিয়ে উঠি–হ্যালো ওল্ড ডাভ।
কিন্তু চেঁচামেচি করা গেল না। দুজনে পরস্পরের দিকে হাসলুম শুধু। ধড়ে প্রাণ এল আমার।
ডঃ যোশী আমার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন। কথায় কথায় জানলুম, ইনি পুণা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। ছাত্রজীবনে কলকাতায় ছিলেন। বাঙালিদের প্রতি প্রচুর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। এক ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলুম, আচ্ছা, স্যার, সিন্ধুসভ্যতার যুগে কি ঘোড়া ছিল না?
ডঃ যোশী যেন চমকে উঠলেন। বললেন,–ঘোড়া? হঠাৎ ঘোড়ার কথা কেন? তারপর হাসতে থাকলেন। সাংবাদিকের পক্ষে ঘোড়া রোগ খুব সুবিধের নয়।
মনে মনে একটু রাগ হল। কিন্তু মুখে হাসি ফুটিয়ে ফুটিয়ে বললুম,–প্রশ্নটা কি অন্যায়, স্যার?
ডঃ যোশী আমার কাঁধে হাত রেখে সকৌতুক বললেন,–মোটেই না। তবে ইদানীং দেখছি কারুর-কারুর মাথায় সিন্ধুসভ্যতার কাল্পনিক ঘোড়া দৌড়াদৌড়ি করছে।
–তা হলে সিন্ধুঘোটক বলুন!
ডঃ যোশী আরও জোরে হেসে উঠলেন।যা বলেছেন। অবশ্য সিন্ধুঘোটক থাকে অন্য সিন্ধুতে। অর্থাৎ সমুদ্রে। এ সিন্ধু প্রদেশটা নেহাত মাটি দিয়ে তৈরি। তাই মাটির ঘোড়া দু-একটা থাকলেও থাকতে পারত সিন্ধুসভ্যতার যুগে।
–যেমন আমাদের বাঁকুড়ার ঘোড়া। কুটিরশিল্পের খাসা দৃষ্টান্ত।
ডঃ যোশী আমার পাল্টা রসিকতায় খুশি হলেন। বললেন,–রসকষ আছে বলেই আমি সাংবাদিকদের পছন্দ করি।
-স্যার, একটু আগে বললেন, ইদানীং নাকি কারুর কারুর মাথায় … বাধা দিয়ে ডঃ যোশী বললেন,–হা জয়ন্তবাবু। যেমন ধরুন আপনাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্বের অধ্যাপক ডঃ আলুওয়ালার মাথায় ঘোড়া ঢুকেছে। এর আগে উনি মাথায় বলদ ঢুকিয়েছিলেন। এখন বলছেন, বলদটা আসলে ঘোড়াই হবে। বিশুদ্ধ সংস্কৃতে যাকে বলে কিনা হয়।
–শুনেছি হেহয় থেকে নাকি ‘হয়’।
–অ্যাঁ বলে ডঃ যোশী আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললেন,–কোথায় শুনলেন একথা?
বললুম,–এক ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিতের কাছে।
–কে তিনি? নাম কী? থাকেন কোথায়? এতক্ষণে মনে হল, ভুল করেছি। মুখ ফসকে গোপন একটা তথ্য বের করে দিয়েছি। অথচ কর্নেল পই পই করে বারণ করেছিলেন। অগত্যা বানিয়ে বললুম,–কলকাতায় ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ ভবার্ণব ভট্টাচার্যর কাছে।
–ডঃ ভবার্ণব ভট্টাচার্যর নাম তো শুনিনি!
আমার ভাগ্য ভালো এইসময় পরিচারিকা দ্বিতীয় দফা খাদ্য পরিবেশন করতে এলেন। এটা ব্রেকফাস্ট। ডঃ যোশীকে পেটুক মনে হল। তখুনি স্যান্ডউইচের প্যাকেট খুলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আড়চোখে লক্ষ করলুম, উনি খেতে খেতে মাঝে মাঝে সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে আমাকে দেখে নিচ্ছেন। ব্যাপারটা কেমন যেন লাগল …
কিন্তু আমার পক্ষে স্বস্তির কথা, ডঃ যোশী আর এ প্রসঙ্গে গেলেন না। দেশের রাজনীতি নিয়ে পড়লেন। দেখতে-দেখতে কখন সময় কেটে গেল। আমাদের বিমান লারকানা বিমান, বন্দরের ওপর চক্কর দিতে শুরু করল। নীচে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছিল। লারকানার পূর্বে সামান্য দূরে সিন্ধুনদ বয়ে চলেছে।
বিমান যখন মাটিতে নামল, তখন সকাল সাড়ে দশটা। পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি এবং সেখানকার পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিত ভারতীয় প্রতিনিধিদের স্বাগত জানতে অপেক্ষা করছিলেন। পরিচয় ও কোলাকুলি পর্ব সেরে গাড়ি করে শহরের দক্ষিণপ্রান্তে নিরিবিলি এলাকায় একটা স্টার হোটেলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। দশতলা এই রাজকীয় হোটেলে বিদেশি পর্যটকদের বেশ ভিড় দেখলুম। শীতের শেষ বলে নাকি এখন ভিড়টা কমেছে। মোহেনজোদাড়ো এখান থেকে কিছু দূরে দক্ষিণে সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরে রয়েছে। তাই এত পর্যটকদের ভিড়।
এলাকার ভূপ্রকৃতি কেমন যেন রুক্ষ। অবশ্য গাছপালা রয়েছে প্রচুর। তাদের রং কেমন ধূসর। ছোট ছোট পাহাড় আছে অসংখ্য। পাকিস্তান সরকার সিন্ধুনদের জল সেচের কাজে লাগিয়েছেন। ফলে ফসলের ক্ষেত ও গাছপালা অনেকটা শ্ৰী ফুটিয়ে তুলেছে।
কর্নেলের মুখোমুখি হয়েছিলুম হোটেলের লাউঞ্জে। তারপর আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, তাঁর ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ উনিই তদ্বির করে এ ব্যবস্থাটা করে ফেলেছেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।
ঘরটা দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, সাততলায়। কর্নেল দক্ষিণের জানালায় দাঁড়িয়ে ওঁর প্রখ্যাত বাইনোকুলারটি–যা বিরল জাতের পাখির খোঁজে ব্যবহার করেন, চোখে চোখ রেখে বললেন,–হুম! মোহেনজোদাড়ো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
বললুম,–আপনার মাথা খারাপ! এখান থেকে অনেক মাইল দূরে!
-–ঠিকই! তবে আমরা একটা টিলার মাথায় দশতলা হোটেলের সাততলায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে বরাবর ফঁকা। তুমিও দেখতে পার। তা ছাড়া এই দূরবিনটা খুব শক্তিশালী।
–কাছে গিয়েই দেখব’খন। বিকেল তিনটেয় যাওয়ার প্রোগ্রাম না?
–হুঁ। … বলে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে আবার যেন মোহেনজোদাড়ো দেখতে থাকলেন। কী বিদঘুঁটে স্বভাব!
বললুম,–এবার আমার প্রশ্নের জবাব দিন।
–বলো ডার্লিং!
–এয়ারপোর্ট পৌঁছতে আপনার দেরি হল কেন?
–পাকিস্তানের দূতাবাসে গিয়েছিলুম এক বন্ধুকে নিয়ে।
–কেন?
–মোহেনজোদাড়োর সরকারি অতিথিশালায় একটা ডাবল বেড ঘর জোগাড় করতে।
–সে কী! ডেলিগেশনের ব্যাপার। এঁদের সঙ্গেই তো থাকা উচিত।
–থাকব না। আমি আগাম ব্যবস্থা সেরে এসেছি।
–আমাদের প্রতিনিধিদের নেতা আপত্তি করবেন না তো?
–ডঃ তিড়কে? মোটেই না। কথা বলে নিয়েছি ওঁর সঙ্গে।
–ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে নিশ্চয় চোখাচোখি হয়েছে আপনার?
–হয়েছে। ভদ্রলোক খাপ্পা হয়ে গেছেন। বিশেষ কথাবার্তাই বললেন না।
–স্কেচ চুরির অভিযোগ করলেন না?
–নাঃ। তো জয়ন্ত, তোমার সঙ্গে ডঃ যোশীর খুব ভাব দেখলুম।
–ভাব জমাতে আমি ওস্তাদ।
–তোমাকে একটা ব্যাপারে সতর্ক করে দিই। ডঃ যোশীর সঙ্গে আর ভাব জমাতে যেও না। বিপদে পড়বে। আমাকেও বিপদে ফেলবে।
–কেন? কেন?
–আপাতত আর কিছু বলব না, ডার্লিং!
জানি, আর হাজার প্রশ্ন করলেও জবাব পাব না, তাই চুপ করে গেলুম। যতক্ষণ কথা বললেন, কর্নেলের চোখে বাইনোকুলার রয়ে গেল। কী দেখছেন অমন করে? আমার অস্বস্তি জাগল। তাই না বলে পারলুম না–এত কী দেখছেন বলুন তো?
কর্নেল বাইনোকুলার আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন,–এবার তুমি দেখ। আমার দেখা শেষ। হয়েছে আপাতত।
–দেখবটা কী? মোহেনজোদাড়ো তো?
–না। এই হোটেলের নীচের রাস্তার যে টিলাটা আছে, সেখানে দেখবে একটা পার্ক। পার্কে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই ভদ্রলোক।
তখনি বাইনোকুলারে চোখ রাখলুম। তারপর চমকে উঠলুম। দুই ভদ্রলোকের একজন হচ্ছেন ডঃ আলুওয়ালা। অন্যজনের গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। পেল্লায় গোঁফ আছে মুখে। এই গুঁফো লোকটিকে আমাদের দলে দেখেছি, এতে কোনো ভুল নেই।
কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা হোটেলে পৌঁছেই বেরিয়ে গেছেন এবং ওই লোকটির সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কী কথা বলছেন? ভারি সন্দেহজনক ব্যাপার।
একটু দেখেই আমার ক্লান্তি লাগল। সরে এলুম। কর্নেল পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হয়েছেন। আমি পোশাক বদলে নিলুম। দিল্লিতে ভোরবেলা স্নান করে নিয়েছি। এখানে দেখছি মার্চ মাসেও শীতটা কড়া। বাথরুম থেকে এসে দেখি, চা এসে গেছে। তার সঙ্গে প্রচুর ফল এবং মিষ্টান্নও। আমরা সরকারি অতিথি বলেই এত আদর নিশ্চয়।
কিন্তু কর্নেলের মুখটা গম্ভীর কেন? কাছে যেতেই একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন,–ওদের টনক নড়েছে। এই দেখো।
–কাদের?
-–খুলে চিঠিটা পড়ে নাও আগে।
খামের মধ্যে ভাজ করা একটা চিঠি আছে। খামের ওপরে ইংরেজিতে লেখা : ৬৩২ নম্বর স্যুটের অধিবাসীদ্বয়কে।
চিঠি নয়–চিরকুট বলাই উচিত। তাতে ডটপেনে লেখা আছে :’ঘোড়াটা মোগা। ওই নিয়ে রেস লড়তে যেও না। সর্বস্বান্ত হবে।
ইতি–রেসুড়েদের রাজা।‘
আমার হাত কাঁপছিল। কর্নেল চাপা হেসে বললেন, জয়ন্ত কি এতেই ভয় পেয়ে গেলে?
শুকনো হেসে বললুম,মোটেও না। আপনার কথা মতো আমি সঙ্গে আমার রিভলভারটা এনেছি। গুলিও এনেছি প্রচুর। না না–আইন ভেঙে আনিনি। সিকিউরিটির হাতে ধরা পড়তুম। ওদের মেটাল ডিটেক্টর যন্ত্রে ঠিক টের পেয়ে যেত। দিল্লির পাকিস্তানি দূতাবাসে আপনার যেমন বন্ধু আছেন, আমারও কি থাকতে নেই? তবে আমার প্রত্যক্ষ বন্ধু নয়। বন্ধুর বন্ধু আর কী! আর আপনি তো জানেন, সাংবাদিকরা কিছু বিশেষ সুবিধা সব দেশের সরকারের কাছেই পেয়ে থাকেন। অতএব কোনো ঝামেলা হয়নি অনুমতি পেতে।
কর্নেল বললেন,–আমিও সশস্ত্র, জয়ন্ত। আমারও অনুমতি পেতে ঝামেলা হয়নি। বরং আরও অস্ত্র সাহায্য চাইলে পেয়ে যাব।
-বলেন কী!
-এখনই সব বুঝতে পারবে। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের সিন্ধুসভ্যতা সংক্রান্ত শাখার প্রধান অধ্যাপক ডঃ আবদুল করিমের আসবার সময় হল। তার সঙ্গে আসছেন সরকারি গোয়েন্দা দফতরের স্থানীয় অধিকর্তা কর্নেল কামাল খাঁ। আমি সব আয়োজন করেই এসেছি।
সব দুর্ভাবনা মুহূর্তে চলে গেল। চা খেতে-খেতে এবার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার বাক্যলাপ প্রসঙ্গটি তুললুম। কর্নেল বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি এখনও বড় ছেলেমানুষ জয়ন্ত! কোন আক্কেলে ‘হেহয়’ কথাটা বললে ওঁকে?
–মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ডঃ যোশী আসলে কে?
–এই প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারছি, তোমার বুদ্ধি খুলেছে। জয়ন্ত, ওই একই প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরছে। কারণ পুণা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পত্রিকায় ডঃ যোশীর যে ছবি দেখেছিলুম, তাতে মুখে দাড়ি নেই।
–কী মুশকিল। এখন দাড়ি রেখেছেন উনি?
–সেই ছবির মুখে দাড়ি কল্পনা করেছি, কিন্তু মিলছে না।
–তা হলে কি ইনি জাল ডঃ যোশী?
এই সময় ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিলেন এবং চাপা গলায় কী বললেন। তারপর ফোন রেখে হাসিমুখে ঘুরলেন,–জয়ন্ত, ডঃ করিম এবং কামাল খাঁ এসে গেছেন।
তিন মিনিট অপেক্ষার পর ঘণ্টা বাজল। দরজা খুলে দেখি একজন বেঁটে, অন্যজন দৈত্যের মতো বিশাল লোক ঘরে ঢুকে সম্ভাষণ জানালেন। কর্নেলের সঙ্গে কোলাকুলি শেষ হতেই চায় না। তারপর আমার দিকে দুজনে এগোতেই ভয় পেয়ে গেলুম। এই বেঁটে ও লম্বা পর্বতের সামনে আমি একেবারে নেংটি ইঁদুর যে!
কর্নেল বেঁটে ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, আমার একসময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি জীবনে দুজনেই আফ্রিকা রণাঙ্গনে ছিলুম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
মনে হল ওঁরা ব্যস্ত। ঝটপট কাজের কথা শুরু করলেন। কর্নেল কামাল খাঁ ব্রিফকেস্ থেকে একটা ভাঁজ করা ম্যাপ বের করে বিছানায় খুলে ধরলেন। তিনজনে ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। তারপর যা সব কথাবার্তা হল, আমি স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারলুম না। শুধু টের পেলুম, এতদিনে মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া রহস্যের একটা কিনারা হতে চলেছে।
. ওঁরা বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর আমরা লাঞ্চ খেতে গেলুম। এই ফ্লোরেও ডাইনিং হল আছে। সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভোজ দিচ্ছেন। বক্তৃতাও হল। তারপর অতিথিদের খানাপিনা শেষ হতে পাক্কা একঘণ্টা লেগে গেল।
ঘরে ফিরে কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, ভোজসভায় একটা বিশেষ ব্যাপার কি তোমার চোখে পড়ছে?
–বিশেষ ব্যাপার? না তো।
–ডঃ আলুওয়ালা কিন্তু ভোজসভায় অনুপস্থিত!
–তাই নাকি? লক্ষ করিনি।
–তুমি না সাংবাদিক! সব কিছুতে লক্ষ রাখা তোমার উচিত ডার্লিং!
–তাই বলে আলুওয়ালা পটলওয়ালাদের নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, কিন্তু প্রতিনিধিদলের নেতা ডঃ তিড়কের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। ডঃ আলুওয়ালা ছিলেন ডঃ যোশীর ঘরে। ডঃ যোশী বলেছেন, তাঁর সঙ্গে নাকি কী একটা ব্যাপারে তর্কাতর্কি হয়েছিল। ডঃ আলুওয়ালা রেগেমেগে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। ডঃ তিড়কে এতে যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি খাপ্পা। ভারতীয় পণ্ডিতের এহেন আচরণ বিদেশে বাঞ্ছুনীয় নয়। যাই হোক, নীচে রিসেপশনের কেউ লক্ষ করেনি কখন উনি বেরিয়ে গেছেন। শুধু লিফটম্যান বলেছে, এক বেঁটে মোটা ভদ্রলোক ব্যাগেজ নিয়ে নেমেছেন। যাক গে, এবার নাটক জমে উঠল মনে হচ্ছে।
ক্লান্তি তো বটেই, বাদশাহী ধরনের একটা অসাধারণ খাওয়ার পর আমার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। শুয়ে পড়লুম। সেই সময় লক্ষ করলুম, কর্নেল একটা ম্যাপ খুলে বসেছেন এবং কী সব চিহ্ন দিচ্ছেন ম্যাপে।
ঘুম ভাঙল কর্নেলেরই ডাকে। ওঠ জয়ন্ত! তিনটে বেজে গেল। আমরা এবার রওনা দেব। ডঃ তিড়কের কাছে বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে। আর দেরি করা ঠিক নয়। এখনই কামাল সায়েবের জিপ এসে পড়বে।
দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলুম। কিছুক্ষণ পরে ফোনে রিসেপশান থেকে জানাল–জিপ এসে গেছে। আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ব্যাগেজ হোটেলের লোকেরা এসে নিয়ে গেল। করিডোরে লিফটের দিকে এগোচ্ছি, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক মিঃ রঘুনন্দনের সঙ্গে দেখা। বললেন,–এ কী চৌধুরী! কোথায় যাচ্ছ তুমি?
–এত বাদশাহী আরামে থাকা পোষাবে না ভাই! এক চেনা ভদ্রলোকের ওখানে উঠব।
–সে কী!
মিঃ রঘুনন্দন হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি দৌড়ে গিয়ে লিফটে ঢুলুম। কর্নেল বললেন,–কী বললে ওঁকে?
বললুম,–এক চেনা ভদ্রলোকের বাসায় যাচ্ছি …
নীচে নেমে গিয়ে জিপে উঠলুম। পাঠান ড্রাইভার জিপে স্টার্ট দিল। রাস্তায় যেতে-যেতে একটা অদ্ভুত বৈষম্য চোখে পড়ছিল। বিশাল চওড়া হাইওয়েতে অজস্র বিলিতি গাড়ি যাতায়াত করছে বটে, উট আর ঘোড়াগাড়ির সংখ্যাও কম নয়। মাথায় পাগড়ি ও পা অব্দি রঙবেরঙের আলখাল্লা পরা মানুষের ভিড়ে বিলিতি পোশাকের মানুষও রয়েছে। সেইসঙ্গে ভেড়ার পাল নিয়েও যাচ্ছে যারা–তারা কসাই না রাখাল বুঝতে পারলুম না।
অদ্ভুত এখানকার ভূপ্রকৃতিও। কখনও চড়াই, কখনও উত্রাই। এই রাস্তার দুধারে মাঝে-মাঝে টানা সবুজ শস্যের মাঠ, কখনও ধু ধু বালিয়াড়ি আদিগন্ত। ন্যাড়া টিলা, আবার কখনও রুক্ষ বাঁজা জমির ওপর বড় বড় পাথর পড়ে রয়েছে। তারপর রাস্তা ক্রমশ নীচের দিকে নেমে গেছে। গাছপালা খুবই কম। তারপর একটানা বাজার। বাজার পেরিয়ে গিয়ে একটা টিলার গায়ে সরকারি গেস্ট হাউস।
গেস্ট হাউসের পুবের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন,–ওই হের বৎস! সিন্ধুনদ ও তার তীরবর্তী হাজার-হাজার বছরের পুরোনো ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শন সেই মোহেনজোদাড়ো।
কে জানে কেন, অস্বস্তিতে আমার বুক কেঁপে উঠল এতক্ষণে।…
