হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

শ্মশানগুহার বিভীষিকা

 

ফকিরসাহেব ওরফে ডঃ আমেদের কাছে জানা গেল : কাল বিকেলে কর্নেল খাঁ ওঁকে মুক্তি দিয়েছিলেন। উনি তাঁর গুহার আড্ডায় ফেরার পথে কিষাণচাঁদের হাতে বন্দি হন। বুদ্ধিমানের মতো তিনি ওদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন। নইলে প্রচণ্ড নির্যাতন করে ওরা তাকে মেরে ফেলত। এখানে ওই খাড়িমতো জায়গায় উঁচু তিনশো ফুট যে পাথরের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে, তার গায়ে দুশো ফুট উঁচুতে একটা গর্ত আছে। এই গর্তটা একটা গুহার পথ। কিন্তু নীচে সিন্ধুনদের জল ওখানে সমুদরের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে। তাই ওখানে কোনো নৌকা নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। গেলেও খাড়া পাথরের দেওয়াল বেয়ে উঠে গর্তে পৌঁছানো দুঃসাধ্য। তাই কিষাণচাঁদকে উনি পরামর্শ দিলেন, যদি দেওয়ালটার ওপর থেকে দড়ি ঝুলিয়ে সেই দড়ি বেয়ে কেউ নামতে পারে তাহলে একশো ফুট নীচে গর্তটায় পৌঁছতে পারবে। এ কাজ দক্ষ পর্বতারোহীর। ওদের দলে তেমন কেউ নেই। তাই সেই দুপুর থেকে গর্ত খুঁড়ে ডিনামাইট ভরে দিয়েছিল কিষাণাদ। কিছুক্ষণ আগে আমরা সেই ডিনামাইটের বিস্ফোরণ টের পেয়েছি। দেওয়ালটা উড়ে গেছে। গুহার ছাদে ফাটল ধরেছে। সেই ফাটল দিয়ে কিষাণচাঁদ নেমে গেছে একা। সঙ্গীদের বলে গেছে, এক ঘণ্টার মধ্যে আমি না ফিরলে এই ফকিরকে জবাই করবে।

 

এখনও কিষাণচাঁদ ফেরেনি। এদিকে চাতালে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎ ফকিরসাহেবের চোখে পড়েছিল, একদল মিলিটারি সেপাই পাথরের আড়ালে বসে আছে। তখন তিনি শয়তানগুলোকে কথায় কথায় ভুলিয়ে রাখেন এবং ওই কেরামতি দেখান। সেই সঙ্গে সেপাইদের এগিয়ে আসতেও ইশারা করেন।

 

কর্নেল কামাল খাঁ বন্দিদের ট্রাকে তুলে চালান করে ফিরে এলেন। এখন আলো আর নেই। ধূসরতা ঘনিয়ে উঠেছে। উনি এসেই বললেন,–কিষাণচাঁদ তো নেই ওদের দলে!

 

ফকিরসাহেব বললেন,–চলুন, আপনাদের কিষাণাদের কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু তার আগে বলুন, আপনারা এভাবে এখানে হঠাৎ এসে পড়লেন কোন্ সূত্রে?

 

জবাব দিলেন ডঃ তিড়কে। সে ভারি অদ্ভুত যোগাযোগ বলতে পারেন। রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে যে ব্রোঞ্জের চাকতি ছিল, সেটা নিশ্চয় আপনি পাথরের সিন্দুকে দেখেছিলেন?

 

–হুঁ, দেখেছিলুম। কিন্তু আমি ও-নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইনি। ঈশ্বরের দিকে যে মন ফিরিয়েছে, তার কাছে আর ওসব জিনিসের কতটুকু মূল্য ডঃ তিড়কে?

 

–তা ঠিক। এবার ব্যাপারটা শুনুন তা হলে। ওই চাকতিটা একটা হিটাইট সীলমোহর। হিটাইট লিপি আছে ওতে।

 

–বলেন কী! ব্রহ্মবৰ্তরাজের ঘোড়ার সাজে হিটাইট লিপি।

 

–হ্যাঁ। যাই হোক, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গিয়েছিল, একটা হিটাইট ফলকে সিন্ধুনদ অঞ্চলের সূর্যপূজারী সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। তারা মৃতদেহের কবর দেয় এবং প্রতিটি কবরে পাথর পুঁতে খাড়া করে রাখে। তারা ঘোড়া আমদানি করে হিটাইট দেশ হাট্টি (বর্তমান সিরিয়া) থেকে। মোহেনজোদাড়োবাসীরা অবশ্য ঘোড়া তাদের কাছে দেখে থাকবে। কিন্তু ঘোড়া তারা যে কারণেই হোক, পছন্দ করেনি। হয়তো ঘোড়ার পিঠে চাপা পাপ ভাবত। লাঙল বা গাড়ি টানতে তো বলদই যথেষ্ট। আমি তাই ডঃ করিমকে জিজ্ঞেস করলুম সিন্ধুনদের তীরে তেমন কোনো গোরস্থান আছে নাকি। উনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। তখন ঠিক হল, আমরা সেখানে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করব। সেই সময় কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন, কিষাণদের দল দুহালায় রওনা হয়ে গেছে। ওর দলে সরকারি গোয়েন্দা আছে। সেই খবর দিয়েছে। তখন আমরা বুঝলুম, আমাদের অনুমান সঠিক। কিষাণচাঁদ কীভাবে এসব জানতে পেরেছিল, কে জানে।

 

কর্নেল কামাল খাঁ বললেন,–লারকানা জাদুঘরের সহকারি ডিরেক্টর আরশাদ হুসেন কিষাণচাঁদের পরামর্শদাতা। ফিরে গিয়েই ওকে আমি গ্রেফতার করব। এবার চলুন ফকিরসাহেব।

 

অন্ধকার হয়ে এল যে!

 

ফকিরসাহেব পা বাড়িয়ে বললেন,–চলুন। কিন্তু সাবধান। আলো জ্বালাবেন না। আমি গোপনে একটা পথে আপনাদের ওই গুহায় নিয়ে যাব। শুধু মনে রাখবেন কিষাণচাঁদ খুব ধূর্ত এবং ভীষণ হিংস্র।

 

ফকিরসাহেব আগে, তাঁর পিছনে কর্নেল কামাল খাঁ, তার পিছনে ডঃ করিম, তারপর একে-একে ডঃ তিড়কে, কর্নেল সরকার এবং আমি। আমি সবার পিছনে। অন্ধকার খুব একটা ঘন হয়নি। তাছাড়া আজ চতুর্থী, চাঁদের জ্যোৎস্না ফুটেছে। অসুবিধে হচ্ছিল না।

 

ওপরে উঠে সমতল একটা জায়গা পাওয়া গেল। ততক্ষণে চাঁদের আলো বেশ পরিষ্কার হয়েছে। এক ফাঁকে ফিসফিস করে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলুম,–ব্রোঞ্জের চাকতিতে কি সত্যি গুপ্তধনের খোঁজ আছে?

 

কর্নেল ফিসফিস করে বললেন,–ভাগ চাই নাকি তোমার? পাবে, কথা দিচ্ছি।

 

রাগে মুখ দিয়ে কথা বেরুল না। আমি কি গুপ্তধনের লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছি এঁদের সঙ্গে? অদ্ভুত বললেন তো!

 

কাটাঝোঁপগুলো এড়িয়ে সাবধানে অনেকখানি যাওয়ার পর ফকিরসাহেব দাঁড়ালেন। সামনে আবার একটা প্রাগৈতিহাসিক কবরখানা মনে হল। সার সার চ্যাপ্টা উঁচু পাথরের চাঁই পোঁতা আছে! ফিকে জ্যোৎস্নায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো। আগে না দেখা থাকলে ভয়ে ভিরমি খেতুম।

 

ফকিরসাহেব ইশারায় সেই কবরখানায় ঢুকতে বলে এগিয়ে গেলেন। মাঝামাঝি গিয়ে একখানে একটা পাথরের সামনে দাঁড়ালেন। ফিসফিস করে বললেন, এখানেই। তারপর পাথরের চাঁইটা অক্লেশে দুহাতে উপড়ে ফেললেন। এ যে দৈত্যদানবের কীর্তি! আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে গেছি। কেউ কেউ অস্ফুটস্বরে বিস্ময়সূচক শব্দও করেছেন। তাই ফকিরসাহেব বললেন,–এই পাথরগুলো কাঠের তক্তার মতো হাল্কা। এক বিশেষ ধরনের পাথর! অথচ ভারি মজবুত। দুহালা এলাকার লোকেরা বলে চাঁদের পাথর। সূর্যদের পুজোয় খুশি হয়ে নাকি ওদের পূর্বপুরুষদের এইসব পাথর চাঁদ থেকে পাঠিয়ে দিতেন। পরীরা বয়ে আনত। অবশ্য কেউ মারা গেলে, তবেই। যাকগে, নীচের এই বেদিটার তলায় সুড়ঙ্গপথ আছে।

 

বলে উনি বেদির মতো চারকোণা একটা হাল্কাপাথর একইভাবে তুলে পাশে রাখলেন। বেদির মধ্যে পাথরের চাঁই বসানোর গর্ত রয়েছে।

 

ফকিরসাহেব বললেন,–সাবধান, আলো জ্বালবেন না কেউ। ভেতরে কিষাণচাঁদ কোথায় আছে আমরা জানি না। সিঁড়ি বেয়ে নামবেন একে-একে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের পিঠে হাত রাখবেন।

 

গর্তটা কোনোমতে একজন ঢোকার মতো। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, “জয়ন্ত, ইচ্ছে না করলে তুমি অপেক্ষা করতে পার এখানে।

 

বললুম,–পাগল! একা এই ভূতের রাজ্যে বসে থাকার চেয়ে পাতালে আপনাদের সঙ্গে গিয়ে মরা ঢের ভালো।

 

একে-একে সবাই অদৃশ্য হলেন। তারপর কর্নেলের পিছনে আমিও নেমে গেলুম। কেমন একটা বাসি ধূপ-ধুনোর গন্ধ যেন। কুয়োর মতো সুড়ঙ্গের সিঁড়ি বেয়ে নামছি তো নামছি। ঠাসা অন্ধকার। সংকীর্ণ জায়গা। দম আটকে যাচ্ছিল।

 

কতক্ষণ পরে টের পেলুম, মেঝের মতো মসৃণ চওড়া একটা জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

 

হঠাৎ সামনে দূরে কোথাও একঝলক আলো জ্বলেই নিভে গেল। ফকিরসাহেব ফিসফিস করে বললেন,–আবার সবাই সবাইকে ছুঁয়ে পা বাড়ান। আমি আগে থাকছি।

 

এবার মেঝের মতো সমতল জায়গায় হেঁটে চলেছি পরস্পরকে ছুঁয়ে। কখনও ডাইনে, কখনও বাঁয়ে ঘুরে-ঘুরে অনেকখানি যাওয়ার পর সবাই দাঁড়ালাম। কোথায় খসখস শব্দ হচ্ছে। শব্দটা বাড়তে থাকল। তারপর উপর্যুপরি বন্দুকের আওয়াজে গুহার স্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল।

 

তারপর একটা অমানুষিক আর্তনাদ অথবা গর্জন শোনা গেল। আঁআঁ–আঁআঁ! ওটা যে মানুষের গলার নয়, তা ঠিকই। কিন্তু অমন কানে তালাধরানো ভয়ঙ্কর চিৎকার কোন প্রাণীর?

 

অমনি ফকিরসাহেব চাপা গলায় বলে উঠলেন–সর্বনাশ! শ্মশান-গুহার দানবটা জেগে গেছে। পালিয়ে আসুন পালিয়ে আসুন। যেপথে এসেছি, সেই পথে।

 

একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। বেঁকের মাথায় কর্নেল কামাল খাঁ টর্চ জ্বাললেন। ফকিরসাহেব বললেন,–আলো নয়। আলো নয়! আমার পিছু পিছু সেইভাবে চলে আসুন সবাই।

 

আমি সবার পিছনে। হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলুম। তারপর গড়াতে গড়াতে আবার মেঝেয়। কর্নেল কি টের পেলেন না? পায়ের শব্দ ওপরের দিকে মিলিয়ে গেল দ্রুত। সেদিনকার চোটখাওয়া জায়গাতেই আবার চোট পেয়েছি। গোড়ালি দুমড়ে গেছে। উঠতে দেরি হল।

 

তারপর আর কিছুতেই সিঁড়িটা খুঁজে পেলুম না। যেদিকে যাই দেয়ালে বাধা পাই। শেষে একজায়গায় ফাঁক পেয়ে পা বাড়ালুম, কিন্তু সেখানে সিঁড়ি নেই। এদিকে পিছনে আবার বন্দুকের প্রচণ্ড আওয়াজ আর সেই অমানুষিক গর্জন বা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে–আঁ-আঁ-আঁ-আঁ।

 

পাগলের মতো খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চললুম। কিছুটা যাওয়ার পর মনে হল ধূলোবালির মধ্যে হাঁটছি। গলা শুকিয়ে গেছে। আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছি। শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে রিভলভার বের করলুম। এবং দেশলাই বের করে জ্বালাতেই দেখি, আমি কালো ছাই গাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছি!

 

তা হলে এই সেই মামদো-ভূতের আড্ডা শ্মশানগুহা! এখান থেকে বেরুতে পারলে আমাকেও সবাই মামদোভূত ভেবে বসবে, তাতে কোনো ভুল নেই।

 

অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো আছি। এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে আবার কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়ব ভেবে পা বাড়াতে সাহস হচ্ছে না।

 

ওদিকে গুলির শব্দ ও গর্জন বা আর্তনাদটা আবার থেমেছে। মনে হচ্ছে, কিষাণচাঁদ কিংবা সেই অজ্ঞাত দানবের লড়াই শেষ হয়েছে এতক্ষণে। কে জিতেছে কে জানে! আমি মনে জোর আনার চেষ্টা করতে থাকলুম।

 

কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলুম জানি না, হঠাৎ পিছন থেকে আমার গায়ে টর্চের আলো পড়ল। ঘুরেই রিভলভার বাগিয়ে গর্জে বললুম,–কে তুমি?

 

আলোর পিছন থেকে চাপা অট্টহাসি হাসল কেউ।–কী? বুড়ো ঘুঘুর বাচ্চা! তুমি কেমন করে শ্মশান-গুহার ছাইগাদায় এসে জুটলে হে? তোমার বুড়ো ঘুঘুটি কোথায়? তার সাঙ্গপাঙ্গ টিয়া-বুলবুলি আর সেই হুতুম প্যাচাটাই কোথায়?

 

–আর একটা কথা বললে গুলি ছুঁড়ব।

 

–তার আগে তোমার মুণ্ডু উড়ে যাবে। দেখতে পাচ্ছ না, এটা একটা স্টেনগান?

 

এবার লক্ষ করলুম, আলোর সামনে কালো একটা নল আমার দিকে তাক করে আছে। বললুম, –তুমি কি কিষাণচাঁদ?

 

–রিভলভার ফেলে দাও আগে। তারপর কথাবার্তা হবে।

 

–যদি না ফেলি।

 

–মুণ্ডটি হারাবে। রেডি–ওয়ান … টু … থ্রি ..

 

রিভলভার ফেলে দিলুম। ছাইগাদায় ডুবে গেল। কিষাণচাঁদ এসে পায়ে ছাই সরিয়ে সেটা তুলে নিল। দেখলুম, ওর জামাপ্যান্টে রক্ত লেগে আছে। রক্তগুলো ওর নিশ্চয় নয়। কারণ ওকে আহত বলে মনে হচ্ছে না।

 

সে আমার জামার কলার খামচে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। পায়ের ব্যথার কথা ভুলে গেলুম। নির্ঘাত শয়তানটা আমাকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে।

 

নিচু ছাদওয়ালা একটা করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে একটা প্রশস্ত ঘরে পৌঁছলুম। সেখানে দেখি, অনেক মাটির জালা রয়েছে। গুপ্তধন নাকি?

 

পরক্ষণে বুঝলুম, সব ছাইভর্তি অস্থিভস্ম। কত হাজার-হাজার লোকের অস্থিভস্ম কে জানে! মনে হল, একটু আগে যে ঘরে ঢুকে পড়েছিলুম-সে ঘরের জালাগুলো কেউ ভেঙে ফেলেছে। বলে ছাই ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে।

 

কিষাণচাঁদ এবার পকেট থেকে একটা মোম জ্বালল। একটা জালার মুখে রেখে টর্চ নেভাল। তারপর বাঁকা হেসে বলল,–এবার খবর বলো হে ক্ষুদে ঘুঘু!

 

বললুম,–খবর সাংঘাতিক। তোমার দলবলকে মিলিটারিরা গ্রেফতার করে চালান দিয়েছে। এবার তোমার সেই দশা হবে। চারদিক মিলিটারিরা ঘিরে রেখেছে।

 

কিষাণচাঁদ একটু ভড়কে গেল যেন। ভুরু কুঁচকে বলল,–তাই নাকি?

 

-হ্যাঁ। আর তোমার পরামর্শদাতা মুরুব্বি লারকানা জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরকেও এতক্ষণ গ্রেফতার করা হয়েছে।

 

কিষাণচাঁদ কী যেন ভাবল! তারপর বলল,–সেদিন প্লেনে আসতে-আসতে তোমার প্রতি আমার স্নেহ জন্মে গিয়েছিল। নয়তো এতক্ষণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতুম না। তা ছাড়া তুমি সাংবাদিক। সাংবাদিক মারা আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা একই কথা। যাকগে, আমার এই ব্যবহারের বিনিময়ে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।

 

–আলবাত করছি। আমি কৃতজ্ঞ ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী! কিষাণচাঁদ বাঁকা হেসে বলল,–ডঃ অনিরুদ্ধ যোশীকে তোমার মনে ধরেছিল দেখছি। হুঁ, আমাকে কিন্তু অদ্ভুত মানিয়েছিল।

 

–দারুণ! আমি তো একটুও ধরতে পারিনি।

 

–কিষাণচাঁদ লাখে একটাই জন্মায় হে ছোকরা! যাকগে, এবার তোমাকে নিয়ে কী করব একটু ভাবা যাক। … বলে সে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। ভাবতে থাকল।

 

বললুম,–আমি আপনাকে ডঃ যোশী বললে কি রাগ হবে কিষাণভাই?

 

–তুমি আমাকে ভাই বলছ?

 

–কেন বলব না? আমাকে এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি কি অকৃতজ্ঞ?

 

–হুঁ, তুমি এবার পথে এসেছ দেখছি। তা আমাকে ডঃ যোশী বললে আপত্তি করব না। পুনার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক জানো? আমরা দুজনে স্কুল-কলেজে সহপাঠী ছিলুম। সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের দুজনের চেহারাতেও দারুণ মিল! যাকগে সেকথা। শোনো, তোমাকে আমি … হা মুক্তিই দেব। একটা শর্তে।

 

–বেশ, বলুন।

 

–হেহয়রাজার ঘোড়ার সেই ব্রোঞ্জের চাকতিটা আমার চাই।

 

–কিন্তু আমি কোথায় পাব? আমার কাছে তো ওটা নেই।

 

–তুমি এই কাগজে নিজের হাতে লেখ : ‘আমি বন্দি আছি। আমার মুক্তিপণ হিটাইট ব্রোঞ্জচাকতি। পত্রবাহকের হাতে না দিলে আগামীকাল ভোর ছটায় এরা আমাকে মেরে ফেলবে। নীচে নাম সই করে তারিখ দাও। আমার লোক এটা আজ রাতে তোমার কর্নেল সাহেবের কাছে পৌঁছে দেবে। চাকতি কোথায় কীভাবে পৌঁছে দিতে হবে সেসব আলাদা চিরকুটে লিখে দেব। বাকি যা করার, আমি করব। নাও, লেখ।

 

সে পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে কাগজ ছিঁড়ল এবং একটা ডটপেন দিল। আমি কথাগুলো লিখে সই করে দিলুম, তারিখও দিলুম।

 

এবার কিষাণচাঁদ জালার ওপর রাখা একটা হ্যাঁভারস্যাক থেকে মোটা নাইলনের রশারশি বের করল। বুঝলুম, দেওয়াল বেয়ে এই গুহায় ঢোকার জন্য দরকার হবে বলে দড়ি এনেছিল সে।

 

দড়িতে আমার হাতদুটোকে পিঠমোড়া করে বাঁধল। তারপর বলল,–চলো, তোমাকে ভালো জায়গায় রেখে আসি। এখানে থাকলে তো তোমার স্যাঙাতরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে ফেলবে।

 

একহাতে টর্চ আর আমার রিভলভার অন্য হাতে স্টেনগানের নল আমার পিঠে ঠেকিয়ে সে আমাকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে চলল। আবার একটা নিচু ছাদওয়ালা সংকীর্ণ করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে গেলুম। এতক্ষণে মনে হল অজস্র ঘর ও করিডোেরওয়ালা গুহাটা প্রাকৃতিক গুহা নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষরা বানিয়েছিল। এখানেই তারা সম্মানিত লোকেদের অস্থিভস্ম এনে জালায় রেখে দিত।

 

এবার যে চওড়া ঘরে ঢুকলুম, সেই ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠতে হল। একটা অক্টোপাসের গড়নের মতো জানোয়ার রক্তাক্ত শরীরে পড়ে আছে। বললুম,–ওটা কী প্রাণী? ওটার সঙ্গেই কি আপনি লড়াই করছিলেন তখন?

 

কিষাণচাঁদ খুশি হয়ে বলল,–হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছ, ওটার কী দশা হয়েছে।

 

–প্রাণীটার নাম কী ডঃ যোশী।

 

কিষাণচাঁদ আরও খুশি হয়ে বলল,–ওটা অধুনালুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জীব হেক্টোপাস।…

 

 

 

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

 

হেক্টোপাস নামে এই প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটির রক্তাক্ত শরীর থেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ বেরুচ্ছিল। এই ঘরেই যদি আমাকে বন্দি করে রাখে, তা হলে বমি করতে করতে নির্ঘাত মারা পড়ব। কিন্তু কিষাণচাঁদ আমাকে সেই ঘর থেকে আরেকটা ঘরে নিয়ে গেল।

 

এ ঘরের ছাদের ফাটল দিয়ে আকাশ দেখা গেল। তখন বুঝলুম, এই ঘরেরই ওপরটা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে ফেলেছে কিষাণচাঁদ। ফাটলটা অনেকটা চওড়া। মেঝেভর্তি পাথরের চাঁই পড়ে আছে। ভয় হল, এখনই ফাটলধরা ছাদটা ধসে পড়বে না তো?

 

কিষাণচাঁদ বলল,–এবার আমার কিছু হুকুম তামিল করো লক্ষ্মী ছেলের মতো।

 

–বলুন কী করতে হবে?

 

–এই টর্চটা ধরে থেকে আমাকে আলো দেখাবে।

 

–আমার হাত যে বাঁধা।

 

তাতে কোনো অসুবিধা হবে না সোনা! তোমার কব্জি দুটো পিছন থেকে বাঁধা আছে এই তো? আমি তোমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিচ্ছি। তুমি এদিকে পিঠ রেখে দাঁড়াও। ব্যস! কিন্তু খুব সাবধান। আলো ওপরে ফেলার চেষ্টা করবে না। তা করলেই দেখতে পাচ্ছ, স্টেনগান রেডি আছে।

 

–কী করতে চান ডঃ যোশী?

 

কিষাণচাঁদ চোখ নাচিয়ে বলল,–বাহাদুর ছোকরা দেখছি হে! অ্যাঁ? ডঃ যোশী বলে আমাকে গলাবার চেষ্টা করছ যে! উঁহু, ও চালাকি বারবার খাটবে না। নাও, টর্চ ধরে থাক। সাবধান।

 

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। সে আমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিল। টর্চের মুখ দেওয়ালের দিকে। তারপর চোখের কোণা দিয়ে দেখলুম, সে একটা বড় পাথর ঠেলে এনে এক জায়গায় রাখল। সেই পাথরে তাকে উঠতে দেখে টের পেলুম সে কী করতে চায়।

 

আমাকে বেঁধে রাখা দড়ির ডগা সে নিজের কোমড়ে জড়িয়ে ভালোভাবে বাঁধল। তারপর ছাদের ফাটল আঁকড়ে ওপরে উঠে গেল। দড়িটা বেশি বড় নয়। টানটান হয়ে রইল। ওপর থেকে সে স্টেনগানের নল বের করে রাখতে ভুলল না। তারপর হুকুম দিল চাপা গলায়,আঙুল বাঁকা করে টর্চের স্যুইচ অফ করে দাও।

 

চেষ্টা করে বললুম,–পারছি না যে!

 

–পারতেই হবে। স্যুইচ তোমার তর্জনীর কাছেই রেখেছি টিপে নীচের দিকে ঠেলে দাও।

 

অনেক কষ্টে টর্চ নেভাতে পারলুম। তখন সে বলল,–সাবধান! তোমার সঙ্গে আমিও বাঁধা আছি। কাজেই অন্ধকারে পালাবার চেষ্টা কোরো না। এবার যা বলছি, করো। ওই পাথরে উঠে দাঁড়াও।

 

দু-হাত পেছনে বাঁধা আছে। কিছুতেই উঠতে পারছি না। কোনোভাবেই ওঠা সম্ভব নয়। অথচ সে বারবার ফিসফিস করে বলছে, কী হল? দেরি হচ্ছে কেন?

 

বললুম,–অসম্ভব। হাত বাঁধা মানুষ পাথরে চাপবে কী ভাবে?

 

–লাফ দাও না।

 

–অন্ধকারে লাভ দিয়ে হাড়গোড় ভাঙবে না? তা ছাড়া পাথরটা যে আড়াই ফুটের বেশি উঁচু মনে হচ্ছে।

 

–অপদার্থ! মুরগির যেটুকু জোর আছে তোমার নেই। আবার ঘুঘুগিরি করতে এসেছ! ঠিক আছে, তোমাকে ওঠাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা ভারি কষ্টদায়ক হবে তোমার কাছে।

 

অসহ্য লাগছিল। পা-মচকানো ব্যথা, তার ওপর বেঁধে রাখার ফলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে কব্জির ওখানটা ফুলে ঢোল হচ্ছে বুঝতে পারছি। খুব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। তার ওপরে সেই অবস্থায় টর্চ ধরে আছি। দাঁতে দাঁত চেপে বললুম,–যা হয়, করুন। আর পারছি না।

 

আমাকে ওপর থেকে হ্যাঁচকা টানে শূন্যে ঝোলাল। আর্তনাদ করে উঠলুম। দুই বাহু ভেঙে গেল মনে হল। কিন্তু সে চাপা গর্জে বলল,–চুপ!

 

দ্বিতীয়বার হ্যাঁচকা টানে আমাকে শয়তানটা ফাটলের কাছে তুলে ফেলল। ওর গায়ে দানবের শক্তি যেন।

 

কিন্তু আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলুম না! অজ্ঞান হয়ে গেলুম।

 

কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলুম জানি না, যখন জ্ঞান হল দেখি মুখের ওপর বিশাল নক্ষত্রভরা আকাশ ঝলমল করছে। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। তারপর টের পেলুম, আমি বালির ওপর শুয়ে আছি। আমার বাঁধনটা আর নেই। কিন্তু উঠে বসার ক্ষমতাও নেই। এদিকে প্রচণ্ড কনকনে ঠাণ্ডা। যন্ত্রণা ও ঠাণ্ডার চোটে কাতর হয়ে রইলুম।

 

আমার মাথা, কাঁধ, মুখ ও জামার ওপরটা ভিজে মনে হচ্ছিল। আমি অতিকষ্টে বললুম-কে আছ এখানে?

 

সঙ্গে সঙ্গে মাথার কাছ থেকে কিষাণাদের সাড়া এল–এই যে সোনা! ঘুম ভেঙেছে দেখছি। অনেক কষ্ট দিলে হে। কিষাণচাঁদ জীবনে যা করেনি, তাকে দিয়ে তাই করালে। তোমার মতো একটা ক্ষুদে বিচ্ছুর সেবাও করতে হল।

 

-–আমি কৃতজ্ঞ ডঃ যোশী।

 

–চুপ। বাঁদরামি করলে মুখ ভেঙে দেব।

 

বুঝলুম, কিষাণচাঁদ খামখেয়ালি প্রকৃতির লোক। এখন একরকম, তখন একরকম হয়ে ওঠে। ওর রাগ হয়, এমন কিছু করা উচিত হবে না। বললুম,–দাদা বললে কি আপত্তি করবেন কিষাণচাঁদজি?

 

–আমি কারুর দাদা নই।

 

–আমার সেবা করেছেন যে! দাদা ছাড়া ছোটভায়ের সেবা কেউ করে?

 

–করেছি নিজের স্বার্থে। চাকতিটা না পাওয়া পর্যন্ত যেভাবেই হোক তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

 

–তারপর বুঝি মেরে ফেলবেন?

 

–চাকতি পেলে দেখা যাবে।

 

–আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন, চাকতি পেলে আমাকে ছেড়ে দেবেন। কিষাণচাঁদ কোনো কথা বলল না। মনে মনে শিউরে উঠলুম। তা হলে কি সে আমাকে মেরে ফেলবে চাকতি পেলেও?

 

জানি না, আমার চিঠি পেয়ে কর্নেল কী করবেন। আমাকে তিনি কত স্নেহ করেন, তা জানি। কিন্তু ওই চাকতিটা তো তার ব্যক্তিগত জিনিস নয়। যখনই পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁকে ওটা দেখিয়েছেন তখনই ওটা সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেছে।

 

এই সময় কেউ এসে দাঁড়াল। কিষাণচাঁদ তাকে বলল,–দেখা হয়েছে?

 

-–হ্যাঁ, স্যার। এই নিন, উনি চিঠিও দিয়েছেন।

 

ডাকাত সর্দারকে স্যার বলা শুনে এখন হাসার অবস্থা নয়। নয়তো হো হো করে হেসে ফেলতুম। কিষাণচাঁদ মন দিয়ে চিঠি পড়ছে এখন। পড়া শেষ হলে সে টর্চ নিভিয়ে জিজ্ঞেস করল–আর কী বললেন?

 

–বললেন, খাঁটি জিনিসই বটে।

 

–কখন দেখা হবে ওঁর সঙ্গে?

 

–চিঠিতে তো সব লিখে দিয়েছেন?

 

–তোমার মুখেই শুনি।

 

–কাল দশটায় তিন নম্বর গেটে থাকবেন।

 

-–ঠিক আছে। চলো, রওনা হওয়া যাক।

 

–আপনার উট কী হল?

 

–পাঠিয়ে দিয়েছি। হারুনকে বলেছি, উট বেঁধে রেখে তাবারুর জিপ নিয়ে রুণ্ডিতে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। তুমি কোন পথে এলে?

 

–জুলং বাজার হয়ে।

 

–মিলিটারি আছে ওখানে?

 

–না। তবে শুনলুম, দুহালার দিকে একটা বড় কনভয় রাত বারোটায় রওনা দিয়েছে।

 

–ঠিক আছে। চলো রওনা হই।

 

–আসামির অবস্থা কী? কবর দিয়ে যেতে হবে নাকি?

 

কিষাণচাঁদ টর্চের আলো আমার মুখে ফেলল। ওর স্যাঙাত বলল,–তাজ্জব। এখনও তাজা হয়ে আছে যে স্যার!

 

কিষাণচাঁদ চাপা হেসে আমার উদ্দেশে বলল,–তা হলে ছোটঘুঘু। আসি আমরা। তুমি আরামে ঘুমোও। তোমাকে মুক্তি দেব বলেছিলুম, দিলুম। আমরা আসি।

 

ওঠার চেষ্টা করে বললুম,–আমি এখানে পড়ে থাকব? এ তো মরুভূমি!

 

-বাঙালি হয়ে জন্মেছ। মরুভূমি একবার দেখবে না কেমন বস্তু? রাগে দুঃখে বলে উঠলুম,–আপনি এত নিষ্ঠুর কিষাণচাঁদজি! আপনি জবাব দিয়েছিলেন, চাকতির বদলে কর্নেলের কাছে আমাকে পৌঁছে দেবেন।

 

–মোটেও না। তেমন কিছু বলি নি। যা বলেছি, তা করেছি। তোমার ঠিকানা আমার লোক তোমার বুড়ো ঘুঘুকে দিয়ে এসেছে। অতএব ভাবার কিছু নেই। ওরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।

 

বলে কিষাণচাঁদ উটের পিঠে বসল। ওর স্যাঙাত উটের দড়ি ধরে নিয়ে চলল। আস্তে আস্তে দূরে উটের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। অন্ধকার রাতের মরুভূমিতে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় আহত শরীরে পড়ে রইলুম। চোখ ফেটে জল এল এতক্ষণে।, একটু পরে হঠাৎ মাথায় এল, এই মরুভূমিতে কর্নেলরা আমাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে? ওঁরা খুঁজতে-খুঁজতে যদি বেলা হয়ে যায়, রোদ তীব্র হতে থাকে, তা হলে তো আমি তেষ্টাতেই মারা পড়ব। তারপর প্রচণ্ড উত্তাপ তো আছেই।

 

অতএব প্রাণপণ চেষ্টায় কোনোরকমে যদি রাত থাকতে এগোবার চেষ্টা করি, তা হলে বাঁচার সুযোগ পেতেও পারি।

 

কিষাণচাঁদ যে দিকে গেল, সেই দিকে তাকিয়ে আবছা দূরে যেন সিগারেটের আগুন দেখলুম। মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করলুম।

 

হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা চলার পর উঠে দাঁড়ালুম অতিকষ্টে। দুই কাঁধে ভীষণ যন্ত্রণা। আস্তে-আস্তে টলতে-টলতে পা বাড়ালুম। কখনও আছাড় খাচ্ছি, কখনও উঠে হামাগুড়ি দিচ্ছি। আবার কখনও কয়েক পা কুঁজো হয়ে হাঁটছি। এভাবে কিছুটা চলার পর মনে জোর এল।

 

যখনই দম আটকানোর মতো অবস্থা হল, তখনই থেমে চিত হয়ে শুয়ে পড়লুম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলুম। তারপর হাঁফাতে-হাঁফাতে এইভাবে এগিয়ে গেলুম।

 

একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র লক্ষ করে চলার ফলে কিষাণচাঁদরা পেথে গেছে, সেই পথেই যাচ্ছি মনে হল। সাদা বালির ওপর নক্ষত্রের আলো পড়ায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল উটের ও মানুষের পায়ের গভীর ছাপ।

 

একবার মনে হল কিষাণচাঁদের নাগাল পেয়ে গেছি। পরে দেখলুম, ভুল। বাতাসের শব্দ।

 

এইভাবে চলেছি তো চলেছি। কখনও হাঁটু ভর করে, কখনও বুকে হেঁটে। আবার কখনও উঠে দাঁড়িয়ে পা ফেলার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিচ্ছি।

 

কিছুক্ষণ পরে উটের পায়ের দাগ হারিয়ে ফেললুম। সামনে উঁচু বালির পাহাড় আছে মনে হল। সেখানে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ওটাতে উঠতে পারলুম না। প্রতিবার কিছুটা উঠে গড়িয়ে নীচে এসে পড়লুম।

 

বারবার চেষ্টার পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লুম। শেষবার গড়াতে গড়াতে এত জোরে নীচে পড়লুম যে ঝাঁকুনির চোটে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলুম।

 

যখন জ্ঞান হল, তখন দিনের আলো ফুটছে।

 

অনেক কষ্টে মুখ তুলে চারপাশটা দেখলুম। তারপর আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। যতদূর চোখ যায়, শুধু বালি আর বালি। দিগন্তে আকাশ নিচু হয়ে এসে মিলেছে। মরুভূমি কাকে বলে, এতক্ষণে টের পেলুম।

 

একটু পরে সূর্য উঠবে। তারপর কী ঘটবে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি।

 

তবু মানুষের মনে কী যেন একটা শক্তি আছে। বেঁচে থাকার একটা সুতীব্র ইচ্ছা আছে। সেই শক্তি আর ইচ্ছা আমাকে সাহস জোগাল।

 

আবার ক্ষীণ একটা আশা জেগে উঠল, কর্নেলরা আমাকে খুঁজে বের করবেনই। বিশেষ করে কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি কনভয় নিয়ে নিশ্চয় বেরিয়ে পড়েছেন ওর সঙ্গে। আমি চারদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখে বসে রইলুম। এ আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। …

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *