গুগুনোগুম্বারের দেশে (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

তিন

কিছুতেই ঘুম আসছিল না।

 

তীর-খাওয়া গণ্ডারটা আর বড় চিতাবাঘটার কথা বারবার মনে পড়ছিল আমার। আমার গায়ে তীর লাগলে কী হবে তাই-ই ভাবছিলাম। মানুষদের তীর মারলে কোথায় মারে ওয়াণ্ডারাবোরা? যে-কোনো জায়গাতে মারলেই হল। রক্তের সঙ্গে তীরের ফলার যোগাযোগ ঘটলেই কাজ শেষ। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে হবে। ওদের তীরগুলো কিন্তু ছোট। ছ ইঞ্চি থেকে এক ফুট।

 

একবার মনে হল, কেন যে বাহাদুরি করতে এলাম এই আফ্রিকাতে! না এলেই ভাল হত!

 

টেডি আজ আগুনের পাশে বসে ফেজেন্টের রোস্ট বানাতে বানাতে পিগমিদের গল্প বলছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট মানুষ ওরা। গভীর জঙ্গলে পাতার কুঁড়েতে থাকে। আফ্রিকার কঙ্গো নদীর অববাহিকার জঙ্গলে পিগমিদের সঙ্গে টেডি ছিল অনেকদিন এক জার্মান সাহেবের সঙ্গে শিকারে গিয়ে। পিগমিদের সবচেয়ে বড় দেবতা খনভাম-এর কথা বলছিল ও।

 

তাঁবুর বাইরে লেকের দিক থেকে ও জঙ্গলের গভীর থেকে নানা অচেনা জন্তু-জানোয়ার এবং রাতচরা পাখিদের ডাক ভেসে আসছিল। তারা আমার অচেনা বলেই ভয় করছিল। আমাদের দেশে হলে এইরকম ভয় করত না। কাছেই লেক আছে বলে এখানে ঠাণ্ডাও অনেক বেশি। কম্বলটা ভাল করে গুঁজে নিলাম পিঠের নীচে।

 

টেডি বলছিল প্রতিদিন যখন সূর্য মরে যায়, তখন খনভাম একটা বিরাট থলের মধ্যে তারাদের টুকরো-টাকরাগুলো সব ভরে নেন, তারপর সেই তারাদের টুকরোগুলো নিভে যাওয়া সূর্যের মধ্যে ছুঁড়ে দেন, যাতে সূর্য পরদিন ভোরে আবার জ্বলে ওঠে তার নিজের সমস্ত স্বাভাবিক উত্তাপের সঙ্গে।

 

খনভাম আসলে একজন শিকারী। শিকারী পরিচয়টাই তাঁর আসল পরিচয়। বিরাট-দুটো সাপকে বেঁধে তাঁর ধনুক তৈরি করেছিলেন তিনি। বৃষ্টি-শেষে যখন আকাশে রামধনু দেখি আমরা আসলে সেটা রামধনু নয়, খনভামের ধনুক। পৃথিবীর মানুষদের কাছে খনভাম কোনো ছোট জানোয়ারের রূপ ধরে দেখা দেন, নয়তো হাতি হয়ে। আকাশে যে বাজের শব্দ শুনি আমরা, সেটাও বাজ নয়। খনভাম কথা বললে ঐরকম আওয়াজ হয়। খনভামের গলার স্বরই বাজপড়ার শব্দ।

 

দারুণ লাগছিল আমার। কিন্তু আগুনের পাশে বসে টেডির গল্প শুনতে-শুনতে আমার গা-ছমছমও করছিল। কঙ্গো উপত্যকার অন্ধকার গভীর জঙ্গল, যেখানে গোরিলারা থাকে, খনভামও থাকেন, সেখানেই যেন চলে গেছিলাম।

 

খনভামের চেলা আছেন অনেক। তাঁরা সব নানা দৈত্যদানো। সন্ধের পর পিগমিদের পাতার কুঁড়ের সামনে আগুন জ্বালিয়ে বসে আজকের রাতের মতোই এইসব দৈত্য-দানোর গল্প করত পিগমিদের সঙ্গে টেডি, তার সাহেবের জন্যে রান্না করতে করতে। এখন যেমন আমাদের জন্যে করছে।

 

একরকমের দানো আছেন, তাঁর নাম গুগুনোগুম্বার। তিনি কেবল আস্ত-আস্ত গিলে খান ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের। আরেকজন বামন-দানো আছেন, তাঁর নাম ওগরিগাওয়া বিবিকাওয়া। তিনি সাপের বা অন্য কোনো সরীসৃপের মূর্তি ধরে দেখা দেন।

 

তাঁবুর মধ্যে ক্যাম্পখাটে শুয়ে শুয়ে এইসব ভাবছি। বাইরে আগুনটা পুটপাট করে জ্বলছে। একরকমের পোকা উড়ছে অন্ধকারে আশ্চর্য একটানা মৃদু ঝরঝর শব্দ করে। মনে হচ্ছে, যেন দূরে ঝর্না বইছে কোনো। আকাশে একটু চাঁদ উঠেছে। ফিকে চাঁদের আলো তাঁবুর দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে এসে পড়েছে। দরজাটা দড়ি দিয়ে বাঁধা আছে। ঋজুদা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আমার চোখে ঘুম নেই। টেডি একা শুয়েছে অন্য তাঁবুতে। ভুষুণ্ডা গাড়ির কাচটাচ বন্ধ করে। যেমন রোজ শোয়।

 

হঠাৎ খুবই কাছ থেকে একটা সিংহ ডেকে উঠল দড়াম করে। তারপরই শুরু হল সাংঘাতিক কাণ্ড। চারদিক থেকে প্রায় গোটা আটেক সিংহ তাঁবু দুটোকে ঘিরে প্রচণ্ড হুমহাম শুরু করে দিল। ট্রেলারের উপরে ত্রিপল-ঢাকা গ্রান্টস গ্যাজেল আর ওয়াইল্ডবীস্ট-এর স্মোক করা মাংস ছিল। সেগুলোর গন্ধ পেয়ে ওরা ট্রেলারের উপর চড়ে বসল। ওদের থাবাতে চচ্চড় শব্দ করে ট্রেলারের উপরের ত্রিপল ছিঁড়ে গেল শুনতে পেলাম। চতুর্দিকে সিংহ ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রচণ্ড গর্জন করতে-করতে, আমাদের আর তাদের মধ্যে তাঁবুর পাতলা পর্দা শুধু। বেচারি টেডি কি বেঁচে আছে? না সিংহরা তাকে খেয়েই ফেলল? কিন্তু টেডির কাছে তো বন্দুক আছে, সে গুলি করছে না কেন? চেঁচামেচিতে ঋজুদার ঘুম চটে গেল। সত্যি। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোয় ঋজুদা।

 

আমি ভাবলাম, ঋজুদা উঠে আমাকেও উঠিয়ে নিয়ে সিংহ মারবে এবং তাড়াবে। এবং এই ফাঁকে কম্বলের তলায় শুয়ে শুয়ে আমার জীবনের প্রথম সিংহ-শিকার হয়ে যাবে। কিন্তু ঋজুদা উঠে বোতল থেকে একটু জল খেল, তারপর আবার কম্বলের মধ্যে ঢুকতে-ঢুকতে বলল, ব্যাটারা বড় জ্বালাচ্ছে তো। বলেই আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

 

আমি হাঁ করে একবার ঋজুদার দিকে তাকিয়ে তারপর ক্যাম্পকটে সোজা হয়ে উঠে বসে, আবার হাঁ করে তাঁবুর ফাঁককরা দরজা দিয়ে সজাগ চোখে চেয়ে রইলাম।

 

একটা প্রকাণ্ড সিংহের মাথা তাঁবুর ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম। এ কী? সে যে তাঁবুর ভিতরে কী আছে তা ঠাহর করে দেখছে ভিতরে উঁকি মেরে। মানুষের গন্ধ পেয়েছে নিশ্চয়ই। তাড়াতাড়ি রাইফেল বাগিয়ে ধরে আমি সেইদিকেই চেয়ে রইলাম। কিন্তু সিংহটা সরছেই না। থাবা গেড়ে গ্যাঁট হয়ে বসে হেঁড়ে মাথাটা তাঁবুর দরজায় লাগিয়ে রেখে দেখছে আমাকে।

 

সেই চাউনি আর সহ্য করতে না পেরে আমি পাঁচ ব্যাটারির বড় টর্চটা জ্বেলে তার মুখে ফেললাম। আগুনের ভাঁটার মতো চোখ দুটো জ্বলতে লাগল আলো পড়ে। আর ঠিক সেই সময় মর, হতভাগা বলে, ঋজুদা তার এক পাটি চটি মাটি থেকে তুলে নিয়ে সোজা সিংহটার নাক লক্ষ করে ছুঁড়ে দিল।

 

নাকের উপর সোজা গিয়ে লাগল চটিটা। আমার হৃৎপিণ্ডটা থেমে গেল। রাইফেল-ধরা হাত ঘেমে উঠল। কিন্তু সিংহরাজ ফোঁয়াও করে একটা ছোট্ট হঠাৎ-আওয়াজ করেই পরক্ষণেই ক্রমাগত হুঁয়াও হঁয়াও করে ডাকতে ডাকতে সরে গেল।

 

কতক্ষণ যে ওরা ছিল জানি না। শেষকালে সিংহের ডাকের মধ্যেই, মানে ডাক শুনতে শুনতেই, ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। আমার চারপাশে পাঁচ-দশ হাতের মধ্যে এক ডজন সিংহকে ঘুরে বেড়াতে দিয়ে আফ্রিকার নিবিড় জঙ্গলে যে কেউ তাঁবুর মধ্যে নির্বিকারে ঘুমোতে পারবে একথা আগে কল্পনাও করতে পারিনি। ধন্য ঋজুদা।

 

ঘুম ভাঙল শয়ে-শয়ে স্টার্লিং পাখিদের কিচিরমিচিরে। লেকের পশ্চিমদিক থেকে ফ্লেমিংগোদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। ফ্লেমিংগো ছাড়া লেকে আর কোন পাখি ছিল না। কাল বিকেলেই লক্ষ করেছিলাম।

 

এই স্টার্লিং পাখিগুলো ভারী সুন্দর দেখতে। উজ্জ্বল নীল, গাঢ় কমলা আর সাদায় মেশা ছোট-ছোট মুঠি-ভরা পাখি। ওরা যেখানেই থাকে, সেখানটাই সরগরম করে রাখে। আমাদের দেশের ময়নার মতো ওরাও খুব নকলবাজ। অন্য যে-কোনো পাখির এবং মানুষের গলার স্বর হুবহু নকল করে ওরা। তাই আফ্রিকাতে অনেকেই বাড়িতে পোষেন এই সুন্দর পাখি।

 

টেডি বলল, গুটেন মর্গেন।

 

এদিকে জার্মানদের দাপট বেশি ছিল বলে এরা সকলেই ভাঙা-ভাঙা ইংরিজির মতো জার্মানও জানে। গুটেন মনে হচ্ছে জার্মান গুড মর্নিং।

 

আমি বললাম, গুটেন মর্গেন, তুমি বেঁচে আছো?

 

টেডি হেসে বলল, প্রায় মরে যাবারই অবস্থা হয়েছিল কাল সিম্বাদের জন্যে। রাইফেলধারীরা তো দিব্যি ঘুমোলে। আমার কাছে একটা শটগান। তা দিয়ে কটা সিম্বা মারব? আমার পুরো নস্যির কৌটোটা কাল শেষই হয়ে গেছে। হাতের তেলোতে নস্যি রেখে তাঁবুর দরজা-জানলা দিয়ে ফুঁ দিয়ে ফুঁ দিয়ে সব নস্যিই শেষ। এখন কী যে করব জানি না।

 

ঋজুদা বলল, কোনো চিন্তা নেই। আমার পাইপের টোব্যাকো গুঁড়ো করে এই লেকের সোডা কৃস্টাল নিয়ে গুঁড়ো করে মিশিয়ে নাও, দারুণ নস্যি হয়ে যাবে। তুমি জানো তো, সবচেয়ে ভাল নস্যি বানাতে এইসব সোডা লেকের কদর কতখানি?

 

তারপরই আমাকে তাড়া দিয়ে বলল, পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা বেরোচ্ছি রুদ্র। এখন গল্প করার সময় নেই। ভুষুণ্ডা তৈরি হয়ে নাও।

 

ভুষুণ্ডা তার টুপির ব্যাণ্ডে কতগুলো নীলচে জংলি ফুল লাগাচ্ছিল। বলল, আমি তৈরিই আছি।

 

দেখতে-দেখতে টেডি আমাদের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দিল। ক্রীমক্র্যাকার বিস্কুটের উপর কালকের ভুষুণ্ডার মারা ফেজেন্টের লিভার সাজিয়ে সঙ্গে নাইরোবি-সর্দারের-দেওয়া মারিয়াবো-পাহাড়ের ইয়া-ইয়া মোটা কলা। তারপর কফি।

 

ঘড়িতে তখন ঠিক আটটা বাজে। আমরা সারাদিনের মতো তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ডাইরি, নোট-বই, ক্যামেরা, টেলিফোটো লেন্স, রাইফেল, জলের বোতল, দূরবিন–এইসব চাপাল ঋজুদা আমার ঘাড়ে। নিজের ঘাড়েও অবশ্য কম জিনিস উঠল না। হেভি ফোর-ফিফটি ফোর হান্ড্রেড রাইফেলটা টেডির হেপাজতে রেখে দিল ঋজুদা। লাইট থার্টি ও সিক্স ম্যানলিকার শুনার রাইফেলটা পিঠের স্লিং-এ ঝুলিয়ে নিয়েছে। আমার হাতে দিয়েছে শটগান। ভুষুণ্ডাকে দিয়েছে খাওয়ার হ্যাভারস্যাক আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস।

 

আমরা রওনা হলাম। সিংগল ফর্মেশানে। টেডি হাত নেড়ে টা-টা করল।

 

যেতে যেতে ঋজুদাকে ঠাট্টা করে বললাম, প্রেজেন্ট-ট্রেজেন্টস নিয়েছ তো? দেবে না ওদের?

 

ঋজুদা ঠাট্টা না করে বলল, ওদের সঙ্গে দেখা হলে নিশ্চয়ই দেব। প্রথম দেখা হবে, আর উপহার দেব না। এ কি একটা কথা হল?

 

আমি বললাম, তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু যাদের সঙ্গে প্রথম দেখা নয়, অনেক পুরনো দেখা, তাদের জন্যেও তো কিছু প্রেজেন্ট আনতে পারতে।

 

ঋজুদা বলল, তারা কারা?

 

বললাম, এই যেমন আমি!

 

ঋজুদা গম্ভীর মুখে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দারুণ একটা চকোলেট দিল আমাকে।

 

আমি বললাম, এটা কী? পেলে কোথায়? এরকম তো কলকাতায় কখনও দেখিনি।

 

ঋজুদা বলল, দেখবার তো কথা নয়। এটা সুইটজারল্যান্ডে তৈরি। তোরই জন্যে ডার-এস-সালামে কিনেছিলাম। ছেলেমানুষ!

 

ঋজুদা!

 

ঋজুদা বলল, আহা! রাগ করিস কেন? পুরোটা না-হয় না-ই খেলি। অর্ধেকটা আমায় দে।

 

আমি চকোলেটটাকে তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজে রেখে, আর দু’ভাগ ঋজুদা আর ভুষুণ্ডাকে দিলাম। ঋজুদা নিজের ভাগটা একেবারেই মুখে পুরে দিল। কিন্তু ভুষুণ্ডা বলল, ও খাবে না। ফেরত দিল আমাকে।

 

অসভ্য! আমার খুব রাগ হল। আমিও মাসাই হলে ওর ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দিতাম এতক্ষণে! বেঁচে গেল জোর।

 

আমরা তখনো একটু ফাঁকায়-ফাঁকায় চলেছি। ঋজুদাকে বললাম, তুমি তো উপহার নিয়ে যাচ্ছ ওদের জন্যে। নাইরোবি সর্দারকেও তো উপহার দিলে। ওয়াণ্ডারাবোরা যদি তোমাকে বিষের তীর উপহার দেয়?

 

ঋজুদা হাসল। বলল, আমরা গান্ধী-চৈতন্যের দেশের লোক। ওরা তীর মারলেও, আমরা ভালবাসবই।

 

আমি হেসে বললাম, তোমাকে কিছুই বিশ্বাস নেই। সারারাত ভয়ে আমার ঘুম হল না, চারদিকে সিংহরা হুড়ুম-দাড়ুম করে বেড়াল আর তারই মধ্যে তুমি কী করে যে বেমালুম ঘুমোলে তা তুমিই জানো। তার উপর অতবড় একটা সিংহকে কেউ যে রাবারের চটি ছুঁড়ে মারতে পারে তা কোনো লোকে বিশ্বাস করবে?

 

ঋজুদা বলল, রুদ্র, তুই বড্ড কথা বলছিস। একদম চুপচাপ। সারা রাস্তাতে আর একটাও কথা বললে বিপদ হবে। এত বকবক করিস কেন?

 

ভুষুণ্ডা, মনে হল, মুখ টিপে হাসল।

 

আমার রাগ হল। কিন্তু চুপ করে গেলাম। বাইরের লোকের সামনে ঋজুদা এমন করে প্রেস্টিজ পাংচার করে দেয় যখন-তখন যে, বলার নয়। ভীষণ খারাপ।

 

আমাকে কথা বলার জন্যে বকেই, নিজেই সঙ্গে সঙ্গে বলল, আঃ, সামনে চেয়ে দ্যাখ, কী সুন্দর দৃশ্য।

 

আমি দেখলাম। কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করলাম না। কথা বলব না আর।

 

ভুষুণ্ডা আগে-আগে চলেছে। লেকটাকে পাশে রেখে, কোনাকুনি তার পাড় বেয়ে পেরিয়ে এলাম আমরা। এই সব লেক পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম আর সোডিয়ামের জন্যে বিখ্যাত। ঋজুদা বলছিল, সোডার সোয়াহিল। নাম হচ্ছে মাগাডি। মাগাডি নামেই কেনিয়াতে খুব বড় একটা সোডা লেক আছে। সেরোনারার কাছে একটা ছোট লেক আছে এরকম। তার নাম লেক লাগাজা।

 

আমরা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। একদল বেবুন আমাদের দেখে দাঁতমুখ বের করে, বিশ্রী মুখভঙ্গি করে, চেঁচামেচি শুরু করে দিল। চারতলা বাড়ির সমান উঁচু একটা জিরাফ লেরাই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে মগডালের পাতা খাচ্ছিল, আমাদের দেখতে পেয়েই ছুট লাগাল ল্যাগব্যাগ করতে করতে। একটু পরেই একটা ডিকডিক দৌড়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। কালকের ডিকডিকটাও হতে পারে। ডিকডিক নাকি খুব বেশি দেখা যায় না। ঋজুদা কালকে বলছিল।

 

ভুষুণ্ডা বড়-বড় পা ফেলে মুখ নিচু করে আগে-আগে চলেছে। ভুষুণ্ডার পিছনে ঋজুদা। তার পিছনে আমি।

 

ঋজুদা অর্ডার দিয়েছে, মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছনটা ভাল করে দেখতে। কিন্তু ঘাড়ের উপর এত মালপত্র যে, ঘাড় ঘোরাতেই পারছি না। মনে হচ্ছে, স্পণ্ডিলাইটিস হয়েছে। একদিক দিয়ে অবশ্য ভালই হয়েছে। আমার পুরো পিছন দিকটাই মালপত্র ঢাকা। পায়ে অ্যাঙ্কল বুট। হাঁটুর ঠিক পিছনে না মারলে তীর কোথাওই আমার লাগবে না। ঋজুদা জেনেশুনেই আমাকে এই বর্ম পরিয়ে পিছনে দিয়েছে কি-না, কে জানে?

 

একটা ঢালু জায়গা পেরোতেই আমরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়লাম। এবারে সত্যিই ভয় করছে। আধ ঘন্টাখানেক চলেছি আমরা, এমন সময় সামনের জঙ্গলের মধ্যে থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখলাম।

 

ঋজুদা আমার দিকে তাকাল। আমি ঋজুদার দিকে।

 

তারপর বন্দুকে গুলি ভরে নিলাম। ঋজুদা রাইফেলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।

 

ভুষুণ্ডা ধোঁয়া দেখে কিছু বলবে, ভেবেছিল ঋজুদা। কিন্তু ভুষুণ্ডা কিছুই না বলে সেই ধোঁয়ার দিকেই এগিয়ে চলল এঁকেবেঁকে। ভুষুণ্ডার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ওর সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। একেই বলে সাহস! হাতে বন্দুক রাইফেল থাকলে তো অনেক বীরত্বই দেখানো যায়।

 

ভুষুণ্ডা সত্যিই যে কত ভাল গাইড তা এবারে বোঝা যাচ্ছে! কী সহজে ও চলেছে। দোমড়ানো ঘাস, ভাঙা গাছের ডাল, ছেঁড়া পাতা–এই সবের চিহ্ন দেখে ও লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে এঁকে-বেঁকে। মাঝে-মাঝে পিছিয়ে এসে ডাইনে-বাঁয়ে গিয়ে নতুন পথ ধরছে। আমরা ওকে অন্ধের মতো অনুসরণ করছি। এবারে জঙ্গল আরও গভীর। বড়-বড় লতা। ফুল ধরেছে তাতে।

 

হঠাৎ ভুষুণ্ডা দুহাত দুদিকে কাঁধের সমান্তরালে ছড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, পোলে, পোলে।

 

ঋজুদা বাঁ হাতটা উপরে তুলে পিছনে-আসা আমার উদ্দেশে বলল, পোলে, পোলে।

 

আমি চলার গতি আস্তে করলাম।

 

এই পরিবেশে ঋজুদাও যেন ইংরেজি বাংলা সব ভুলে গেছে। নইলে ভুষুণ্ডার মতো নিজেও পোলে, পোলে বলত না।

 

ভুষুণ্ডা আর ঋজুদা আমার থেকে হাত-দশেক সামনে ছিল। ওরা দুজন ফিসফিস করে কী বলাবলি করল। তারপর ইশারাতে আমাকে ডাকল।

 

এগিয়ে যেতেই ভুষুণ্ডা আবার এগিয়ে গিয়েই একটা উৎরাইতে নামতে লাগল। একটু নামতেই নাকে পচাগন্ধ এল আর সেই গন্ধ আসার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলাম সামনেই ধোঁয়া উড়ছে গাছপালার আড়ালে।

 

তারপরই যা দেখলাম, তার জন্যে একেবারেই তৈরি ছিলাম না। সেরকম কিছু যেন কখনও কাউকে দেখতে না হয়।

 

কতকগুলো পাশাপাশি কুঁড়েঘর, খড়ের। তার সামনে একটা বড় আগুন তখনও জ্বলছে। তিরতির করে একটা নদী বয়ে চলেছে সেই ঘরগুলোর পাশ দিয়ে। ঘরগুলোর সামনে বড় বড় কাঠের খোঁটার সঙ্গে বাঁধা দড়িতে প্রায় একশো জানোয়ারের রক্তমাংস লেগে-থাকা চামড়া ঝুলছে। তার মধ্যে জেব্রা, ওয়াইল্ডবীস্ট, ইম্পালা, গ্রান্টস ও থমসনস গ্যাজেল, এলান্ড, টোপি, বুশবাক, ওয়াটার বাক, বুনো মোষ-সবকিছুর চামড়াই আছে। সমস্ত জায়গাটা রক্তে-মাংসে বমি-ওঠা দুর্গন্ধে যেন নরক হয়ে আছে একেবারে।

 

আমরা অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলাম গাছ-গাছালির আড়াল থেকে। আগুনটা নিশ্চয়ই কাল রাতের। এখন নিভে এসেছে। একজনকেও দেখা গেল না ওখানে। ওরা সারারাত কাজ করে এখন বোধহয় ঘুমোচ্ছে।

 

রাইফেলটা তাক করে ঋজুদা এবারে আগে গেল। তারপর ভুষুণ্ডা। ভুষুণ্ডার পেছনে আমি।

 

ঋজুদা আমাকে ডেকে বলল, তুই বন্দুক তৈরি রেখে বাঁ দিকে যা, আমি ডান দিকে যাচ্ছি। আমরা জায়গামত গিয়ে দাঁড়ালে ভুষুণ্ডা তুমি এইখান থেকে জোরে-জোরে কথা বলবে।

 

ওয়াণ্ডারাবোদের ডেরায় এসে খালি হাতে দাঁড়িয়ে কথা বলা আর আত্মহত্যা করা একই ব্যাপার। কিন্তু ভুষুণ্ডা একটুও ভয় পেল না। আমার মনে হল ঋজুদা যেন চাইছে ভুষুণ্ডার বিপদ ঘটুক।

 

আমরা সরে দাঁড়াতেই ভুষুণ্ডা অজানা ভাষায় জোরে জোরে কথা বলতে লাগল। আমার মনে হল মেশিনগান থেকে গুলি ছুটছে ট্যা-র‍্যা র‍্যা-র‍্যা-রা-ট্যা-র‍্যা করে। কী অদ্ভুত ভাষা রে বাবা!

 

কিন্তু তবুও ঐ কুঁড়েঘর থেকে কেউই বেরোল না। যখন একজনও বেরোল না, তখন ঋজুদা হাত দিয়ে ইশারা করল আমাকে। আমরা দুজনে রাইফেল ও বন্দুক তৈরি রেখে আস্তে আস্তে কুঁড়েঘরগুলোর দিকে দুদিক থেকে এগিয়ে গেলাম। ভুষুণ্ডা আমাদের আগে-আগে ডোন্ট কেয়ারভাবে খালি হাতে এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধের মালপত্র সব আগুনের পাশে নামিয়ে রেখে নিভু নিভু আগুনের মধ্যে একটা কাঠি ঢুকিয়ে আগুন জ্বেলে সিগারেট ধরাল। তারপর আগুনের পাশেই ফেলে রাখা একটা বিরাট তালগাছের গুঁড়িতে বসে আরামে সিগারেট টানতে টানতে কুঁড়েঘরগুলোর দিকে পিছন ফিরে আমাদের দেখতে লাগল।

 

তখনও যখন কাউকে দেখা গেল না, তখন আমরা সাবধানে সামনের কুঁড়ের মধ্যে ঢুকলাম। কুঁড়ের মধ্যে বস্তা বস্তা নুন, ফিটকিরি, নানারকম ছুরি ও বড় বড় অনেক লোহার তারের গোলা দেখতে পেলাম।

 

ঋজুদা বলল, লাইন। এগুলোকে স্নেয়ার বলে। তারের ফাঁদ। এই তার বেঁধে রাখে জানোয়ারদের যাতায়াতের পথে জালের মতো। একসঙ্গে অনেক জানোয়ারকে ধরতে পারে এবং মারতে পারে এরা এমন করে।

 

আমি ফিসফিস করে বললাম, তা তো বুঝলাম, কিন্তু ওরা সব গেল কোথায়?

 

সব পালিয়েছে। কাল রাতে ভু-বাবুর বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনেই বোধহয় ওরা বুঝেছিল।

 

আমি বললাম, পালিয়ে যাবে কোথায়? চলো, আমরা ফিরে গিয়ে গাড়ি নিয়ে ওদের ধাওয়া করি। এই জঙ্গল পেরিয়ে তো ওদের ফাঁকা জায়গা দিয়ে অনেকটাই যেতে হবে। তারপরে না-হয় আবার জঙ্গল পাবে।

 

ঋজুদা বলল, তা ঠিক। কিন্তু আমরা তো ওদের সঙ্গে লড়াই করতে আসিনি। ওদের ধরতেও আসিনি। এসেছি ওদের সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে। এই কুঁড়েঘরগুলো ভাল করে খুঁজলে ওদের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যাবে। কয়েকদিন ভুষুণ্ডা না হয় গাড়ির কাছেই তাঁবুতে থাকবে। টেডিকে এখানে ডেকে আনাব। তারপর দিন-কয়েক এখানে ওদের থাকার রকম-সকম দেখব। তাতে ওরা কোন পথ দিয়ে আসে যায়, কী কী জানোয়ার বেশি মারে, কেমন করে মারে, কেমন করে চামড়া শুকোয়, কী খায় ওরা, কেমন ভাবে থাকে, কীভাবে টন-টন স্মোকড-করা মাংস পাচারই বা করে বিক্রির জন্যে–এসব জানতে পারব।

 

ভুষুণ্ডা সিগারেট খেতে খেতে বলল, পাখিরা উড়ে গেছে

 

ঋজুদা বলল, তাই তো দেখছি।

 

বাঁদিকের কোনায় একটা বড় ঘর ছিল। তার মধ্যে ঢুকে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। দেখি, বিরাট-বিরাট হাতির দাঁত শোয়ানো আছে মাটিতে। হাতির লেজের চুল কেটে গোছ করে রাখা হয়েছে। অনেকগুলো হাতির পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে মাংস কুরে বের করে তার মধ্যে ঘাস পুরে রেখেছে।

 

আমি বললাম, ঈসস।

 

ঋজুদা বলল, হাতির লেজের চুল দিয়ে সুন্দর বালা তৈরি হয়। আর পা দিয়ে হয় মোড়া বা টেবিল। দাঁত দিয়ে তো অনেক কিছুই হয়। বল তো ঐ দাঁতটার দাম কত হবে আন্দাজ?

 

আমি বললাম, দশ হাজার টাকা?

 

ঋজুদা বলল, কম করে দু’লাখ টাকা।

 

দুলাখ! বলো কী?।

 

হ্যাঁ। কম করে। তারপরেই বলল, কী বুঝলি? বুঝলি কিছু?

 

আমি বললাম, হ্যাঁ। দু’লাখ।

 

ঋজুদা বলল, তা নয়। এতগুলো দাঁত ওরা এভাবে ছেড়ে যাবে না। ওরা আসলে চলে যায়নি। আশেপাশেই আছে হয়তো। আমাদের দেখছে আড়াল থেকে। এখানে কম করে দশ-বারো লাখ টাকার হাতির দাঁতই আছে শুধু। অন্য চামড়া-টামড়ার কথা ছেড়ে দে। ওরা নিশ্চয়ই যায়নি। খুব হুঁশিয়ার রুদ্র। এক মিনিটও অসাবধান হবি না। তাছাড়া, এই ভুষুণ্ডাকে আমার কেমন যেন লাগছে। প্রথম দিন থেকেই। কী যে ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না।

 

আমি আর ঋজুদা ঐ বড় কুঁড়েটা থেকে মাথা নিচু করে বেরোব, ঠিক সেই সময় খট করে কী একটা জিনিস এসে লাগল ঘরের খুঁটিতে।

 

তাকিয়ে দেখি, একটা লম্বা তীর। আর তার পিছনের পালকের কাছে এক টুকরো শুকনো সাদাটে তালপাতা বাঁধা। ঋজুদা তাড়াতাড়ি তালপাতাটা একটানে খুলে নিয়ে পড়ল। পড়েই, আমার হাতে দিয়েই, আমার হাত ধরে ঘরটার ভিতর দিকে সরে এল।

 

দেখলাম, তালপাতার টুকরোটার উপরে কোনো গাছের ডাল বা আঙুল রক্তে ভিজিয়ে কেউ বিচ্ছিরি হাতের লেখাতে এবড়ো-খেবড়ো করে ইংরেজিতে লিখেছে : SURRENDER OR DIE।

 

আমি বললাম, বেরোব এখান থেকে?

 

ঋজুদা বলল, একদম নয়।

 

আমার বুকের মধ্যে ঢিবঢিব করছিল। বললাম, দু’হাত উপরে তুলে বেরোব? সারেণ্ডার করবে?

 

ঋজুদা পাইপের ছাই ঝেড়ে নিল একটু, তারপর বলল, তোর লজ্জা করল না ওকথা বলতে?

 

তারপরই বলল, ভুষুণ্ডাকে দেখতে পাচ্ছিস? নিচু হয়ে দ্যাখ তো।

 

নিচু হয়ে দেখলাম। ভুষুণ্ডা যেখানে বসে ছিল, সেখানে নেই তো। বললাম, না। দেখতে তো পাচ্ছি না। ।

 

হুমম্! ঋজুদা বলল।

 

ঘরটার মুখের ডান দিক থেকে–যাতে আমাদের রাইফেল বন্দুকের সামনে না পড়তে হয়, এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন লোক জোরে-জোরে চারটে উদ্ভট শব্দ উচ্চারণ করল।

 

ঋজুদা তার উত্তরে ঐরকমই উদ্ভট উচ্চারণ করেই যেদিক থেকে শব্দটা এসেছিল, সেইদিকে রাইফেলের ব্যারেল ঘুরিয়ে খড়ের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে গুলি চালিয়ে দিল। দিয়েই আমাকে বলল, তুই ডাইনে, বাঁয়ে ও পিছনেও গুলি কর থেমে-থেমে খড়ের দেওয়ালের এপাশ থেকে।

 

বলেই, পাইপের আগুনটা ঢেলে দিল খড়ের দেওয়ালের উপর। দেখতে-দেখতে ঘরটাতে আগুন ধরে গেল।

 

আমি বললাম, ঋজুদা, কী করছ? আমরা পুড়ে মরব?

 

ঋজুদা বলল, দারুণ ধোঁয়াতে ঢেকে গেলেই আমরা বাঁচতে পারব ওদের বিষের তীরের হাত থেকে। নইলে আর বেঁচে ফিরতে হবে না। এইটুকু বলেই, ঋজুদাও ঘরের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে রাইফেল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে লাগল বাইরের দিক লক্ষ করে। গুলির তোড়ে খোলা দরজার সামনে এসে যে কেউ আমাদের তীর মারবে সে-উপায় ছিল না ওদের।

 

এদিকে এমনই ধোঁয়া হয়ে গেছে ভিতরে যে, নিশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। চালেও আগুন লাগো-লাগো। চালে আগুন লাগলে আগুন চাপা পড়েই মরতে হবে। আর উপায় নেই।

 

আমি ভেবেছিলাম, ঋজুদা পেছন দিয়ে খড়ের দেওয়াল ফাঁক করে পালাবে। কিন্তু তা না করে এই ঘরের লাগোয়া যে ঘর আছে সেই দিকের দেওয়ালের খড়ে রাইফেলের ব্যারেল দিয়ে ফুটো করল। আমিও টেনে-টেনে খড় সরালাম। আগুনে চড়চড় করে খড় পোড়ার শব্দ হু হু হাওয়ায় শোনা যাচ্ছিল। সামনে থেকে কারা যেন খুব চেঁচিয়ে কথা বলছে। চারদিকে এত তাপ আর ধোঁয়া যে আমরাই কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বাইরের লোকেরাও নিশ্চয়ই পাচ্ছে না।

 

দেওয়ালটা ফুটো হতেই ঋজুদা ফুটো দিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে পড়ল। আমিও পিছন পিছন। ঐ ঘরেও তখন আগুন লেগে গেছিল। ঋজুদা দৌড়ে গিয়ে আবার সেই ঘরের দেওয়াল অমনি করে ফুটো করতে-করতে আমাকে লাইটারটা ছুঁড়ে দিয়ে বলল, এই ঘরের চারদিকের দেওয়ালে আগুন লাগিয়ে দে। আমরা যখন সেই ঘর পেরিয়ে তার পাশের ঘরে ঢুকলাম তখন দু’নম্বর ঘরটাও দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল। এমনি করে সমস্ত জায়গাটা জতুগৃহের মতো জ্বলছে। আগুনে-পোড়া নানা মাংস ও চামড়ার উৎকট গন্ধে মনে হচ্ছে যেন একটা বিরাট শ্মশানে এসে পড়েছি।

 

বাইরে বেরিয়ে ঐ শেষ ঘরের আড়ালে দাঁড়িয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল ঋজুদা। ধোঁয়াতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছিল আমাদের। কাশিও পাচ্ছিল ভীষণ। ভয়ে কাশতে পারছিলাম না। কোন দিকে যাব আমরা ভাবছি, ঠিক সেই সময় দুটো লোক তীরধনুক হাতে নিয়ে আমাদের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল প্রথম কুঁড়েটার দিকে, যেখানে হাতির দাঁত ছিল। তারপর কী মনে করে ওরা আবার দৌড়ে ফিরে এল, বোধহয় ভেবেছিল, আমরা ঐ প্রথম কুঁড়েটার পিছন দিকেই বেরোব। অথবা আগুনে ঝলসে গেছি। এবারও লোকগুলো আমাদের দেখতে পায়নি–আমরা দেওয়ালের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে ছিলাম–তাছাড়া ওখানে যে থাকতে পারি আমরা তা ওদের ধারণারও বাইরে ছিল। কিন্তু দুটো লোকের মধ্যে পিছনের লোকটা পাশ দিয়ে চলে যেতে যেতেও থমকে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে, বাঁ দিকে তাকাল আমাদের মুখে। কুচকুচে কালো, মোটা-মোটা ঠোঁটে, গুঁড়িগুড়ি চুলে লোকটাকে ভয়াবহ দেখাচ্ছিল।

 

মুহূর্তের মধ্যে ও ধনুকটা আমাদের দিকে ঘোরাল, আর সঙ্গে-সঙ্গে আমার বন্দুক থেকে, যেন আমার অজান্তেই গুলি বেরিয়ে গেল। বোধহয় এল-জি ভরা ছিল। গুলি আর দেখাদেখির সময় ছিল না। যে গুলি পাচ্ছিলাম তাই-ই ভরছিলাম অনেকক্ষণ থেকে। চার হাত দূর থেকে বুকে অ্যালফাম্যাক্স-এর এল-জি খেয়ে লোকটা পড়ে গেল। হাতের ধনুক-তীর হাতেই রইল।

 

আমি গুলি করতে-না-করতেই ঋজুদা বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়ে অন্য লোকটাকে গুলি করল রাইফেল দিয়ে। সে ততক্ষণে ফিরে দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তীরটা গিয়ে লাগল ঋজুদার গায়ে নয়, আমার গুলি-খেয়ে-পড়ে-যাওয়া লোকটারই গায়ে।

 

আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। লোকটার বুক রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল; ঠোঁটটা নড়ল, কপালে ঘাম ভরে এল। আমি খুনী! মানুষ মারলাম আমি! এক্ষুনি একজন মানুষকে মেরে ফেললাম।

 

ঋজুদা আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়েই বলল, দৌড়ো। ওরা গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছে হয়তো।

 

দৌড়তে-দৌড়তে ভাবছিলাম যে, হয়তো শুনতে পায়নি ওরা–আগুনের জন্যে যা শব্দ হচ্ছে চতুর্দিকে, আর ধোঁয়া। ওরা নিশ্চয়ই কিছু দেখতেও পায়নি।

 

আমরা দৌড়তে-দৌড়তে এসে লেকের পাশে পৌঁছলাম, কিন্তু ফাঁকা জায়গায় না। বেরিয়ে লেরাই জঙ্গলের নীচে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে বসে রইলাম। লেকটা পেরিয়ে একটু গিয়েই আমাদের তাঁবু। টেডি নিশ্চয়ই আমাদের জন্যে উৎকণ্ঠার সঙ্গে একা একা অপেক্ষা করছে সেখানে খাওয়ার বন্দোবস্ত করে। আজও উগালি? দুসস।

 

আমি ফিসফিস করে ঋজুদাকে বললাম, ভুষুণ্ডাকে খালি হাতে আনা আমাদের উচিত হয়নি। ওরা বোধহয় ভুষুণ্ডাকে মেরে ফেলেছে এতক্ষণে।

 

ঋজুদা বলল, বোধহয় না। দেখাই যাক। তারপর আমার পিঠে হাত দিয়ে বলল, খুব সময়মতো গুলিটা করেছিলি তুই। লোকটা ধনুকের ছিলাতে টান দিয়েছিল, আর এক সেকেন্ড দেরি হলে… ওয়েল-ডান।

 

আমি বললাম, ঈসস, মানুষ মারলাম!

 

ঋজুদা বলল, শখ করে তো আর মারিসনি। তাছাড়া ওরা জঘন্য অপরাধ করছে। আমাদের মেরেও তো ফেলত একটু হলে। না মারলে, আমরা নিজেরাই মরতাম! করার তো কিছু ছিল না।

 

ওখানে বসে-বসেই দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের পিছনে বহুদূরে জঙ্গলের মাথা ছাড়িয়ে কালো ধোয়ার কুণ্ডলী আর ভস্মীভূত রেড-ওট ঘাস উড়ছে আকাশে। ফ্লেমিংগোগুলো তাদের শরীরের গোলাপি ছায়া ফেলে জলে, অদ্ভুত উদাস স্বরে ডাকছে। জলের উপরে তাদের গলার স্বর ভেসে যাচ্ছে অনেক দূর অবধি।

 

আমি বললাম, ওরা যেই জানবে যে আমরা ওদের দুজনকে মেরে পালিয়ে গেছি তখন প্রতিশোধ নিতে তাঁবুতে যাবে না তো! আমাদের মেরে নিশ্চিত হবে হয়তো ওরা।

 

ঋজুদা বলল, অত সাহস হবে না। এ যাত্রা ওরা হয়তো পালিয়েই যাবে। যারা নিজেরা অন্যায় করে এবং জানে যে তারা অন্যায় করছে, তাদের মেরুদণ্ডে জোর থাকে না। সাহসের অভাব হয় ওদের। যে কারণে বড়-বড় যুদ্ধেও দেখা যায় যে, অনেক বেশি বলশালী হয়েও যে-দেশ অন্যায় করে তারা হেরে যায় যাদের উপর অন্যায় করা হয়েছে সেই দেশের সৈন্যদের মনের জোরের কাছে। অন্যায় যারা করে, তারা একটা জায়গায়, একটা সময়ে পৌঁছে ভীরু হয়ে যায়ই। মানুষ অন্য সকলকেই ঠকাতে পারে, পারে না কেবল নিজের বিবেককে। যদি সে মানুষ হয়!

 

আমরা ওখানে প্রায় দুঘন্টা চুপ করে বসে রইলাম। লেকের অন্য পাশে যে পথটা তাঁবুর দিকে গেছে তা দিয়ে একদল এলাণ্ড আর টোপি এন্টেলোপ চলে গেল। এই টোপিগুলো বেশ বড় হয়। আমাদের দেশের শম্বরের মতো, তবে শিং বড় হয় না। শরীরের সঙ্গে যেখানে পা মিলেছে সেখানটা কেমন নীল রঙের হয়–আর শরীরটা খয়েরি। এলাণ্ড-ও বেশ বড় হয়।

 

তারা চলে যাবার পর একটা মস্তবড় বেবুন-পরিবার চলে গেল কিরখির করে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে। কিন্তু কোনো মানুষকেই দেখা গেল না। এদিকে বেলা অনেক হয়েছে। কী করে যে এত সময় কেটে গেল বোঝাই গেল না। এতক্ষণ ঋজুদাও পাইপ খায়নি, পাছে ওয়াণ্ডারাবোরা ধোঁয়া দেখতে পায়।

 

আমরা এবার উঠে সাবধানে এগোলাম। আস্তে-আস্তে সমস্ত পথটা পেরোলাম। লেকটা পেরিয়ে এলাম, আবার লেরাই জঙ্গল, তারপর দূর থেকে তাঁবুটা দেখা গেল। এবারে পুরো তাঁবুটাই দেখা যাচ্ছে। তাঁবুর বাইরে আগুনের উপর বাসন ছড়ানো আছে। কিন্তু আগুন নিভে গেছে। টেডি বোধহয় খাবার গরম করবে আমরা ফিরলে।

 

হঠাৎ ঋজুদা বলল, ল্যাণ্ড-রোভার?

 

আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম! কোথায় গেল? আমাদের ট্রেলারসুদ্ধ ল্যাণ্ড-রোভার?

 

ঋজুদার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, যা ভেবেছিলাম! তারপরই বলল, চাবিটা তুই নিজের কাছে রাখিসনি? কাল তো তুই-ই গাড়ি চালিয়ে এসেছিলি?

 

আমি বললাম, আমাদের কাছেই তো ছিল। কাল সন্ধেবেলায় ভুষুণ্ডা চেয়ে নিয়েছিল। ড্রাইভিং সীট-এর দরজা বাইরে থেকে লক্ করে শোবে বলে–যাতে সিংহটিংহ এলে ভয় না থাকে। সিংহ ত’ এসেওছিল রাতে।

 

ঋজুদা এবারে দৌড়তে লাগল তাঁবুর দিকে। আমিও পিছনে পিছনে।

 

আমি ডাকলাম, টেডি, টেডি!

 

টেডিও কি ভুষুণ্ডার মতো বিশ্বাসঘাতকতা করল আমাদের সঙ্গে? কত ভাল টেডি! কত সুন্দর গল্প বলবে বলেছিল আমাকে ও আজ রাতে।

 

টেডি বাইরে কোথাওই নেই। তাঁবুর ভিতরেও নেই; আমাদের তাঁবুর ভিতরে ঢুকে দেখলাম, কারা যেন সব লণ্ডভণ্ড করেছে। ঋজুদার কাগজপত্র, অন্যান্য জিনিস, আমাদের বন্দুক-রাইফেলের গুলি যা তাঁবুতে ছিল সবই নিয়ে গেছে তারা। ঋজুদার ফোর-ফিফটি ফোর হান্ড্রেড রাইফেলটা পর্যন্ত। আমাদের খাবার-দাবার, বন্দুক, রাইফেলের গুলির বাক্স, পেট্রল, আরও সমস্ত জিনিসপত্র যা ট্রেলারের ভিতরে রাখা ছিল সবই গেছে ট্রেলারের সঙ্গে।

 

ঋজুদা বলল, রাইফেল নিয়েছে বটে, কিন্তু লকটা আমার কাছে। ও দিয়ে গুলি ছুঁড়তে পারবে না।

 

কিন্তু টেডি? টেডি কোথায় গেল? টেডিও কি আমাদের শত্রুপক্ষ? ঋজুদা এত বোকা! যখন ওদের ইন্টারভ্যু করে আরুশাতে এসে তিন মাস আগে সিলেক্ট করে তখন ওদের সম্বন্ধে ভাল করে খোঁজখবরও নেয়নি?

 

আমাদের তাঁবু থেকে বেরিয়ে তাঁবুর পিছনে যেতেই, আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এল। টেডি হাত-পা ছড়িয়ে আছে। যেন তার কিছুই হয়নি। যেন ও ঘুমোচ্ছে। শুধু একটা ছোট্ট তীর গেঁথে রয়েছে ওর গলাতে।

 

ঋজুদা এসে আমার পাশে দাঁড়াল। বলল, ভুষুণ্ডা!

 

বলেই, তাঁবুর সামনে এসে নিচু হয়ে ধুলোর মধ্যে কী যেন খুঁজতে লাগল। নিজের মনেই বলল, ঠিক।

 

আমি বললাম, কী?

 

ঋজুদা বলল, ভুষুণ্ডা টেডিকে মেরে ফেলার পর ওয়াণ্ডারাবোরা ওর সংকেতে এখানে আসে। তারপর ল্যাণ্ড-রোভার ও ট্রেলারে চড়ে ভুষুণ্ডার সঙ্গে পালিয়ে যায়। কয়েকজনকে রেখে যায় হয়তো আমাদের শেষ করে মালপত্র নিয়ে হাঁটা-পথে যাওয়ার জন্যে।

 

কী সাংঘাতিক! এখন আমার কী করব ঋজুদা? আমি একেবারে ভেঙে পড়ে বললাম।

 

ঋজুদা বলল, দাঁড়া! দাঁড়া। ভয় পাস না। কিন্তু আগে টেডিকে কবর দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। নইলে রাতে হায়না আর শেয়ালে বেচারাকে ছিঁড়ে খাবে। কিন্তু এখানের মাটি যে খুব শক্ত।

 

আমি আর ঋজুদা টেডিকে বয়ে নিয়ে গেলাম লেকের কাছে। তাঁবুর খোঁটা গাড়বার শাবল দিয়ে আমরা দুজনে মিলে কয়েক ঘন্টা ধরে একটা বড় গর্ত করলাম। তারপর টেডিকে তার মধ্যে শুইয়ে, জঙ্গল থেকে অনেক ফুল তুলে এনে উপরে ছড়িয়ে দিলাম। আমরা যখন টেডিকে কবর দিচ্ছিলাম তখন ওয়াণ্ডারাবোদের আর কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না।

 

পশ্চিমাকাশে একটা দারুণ গোলাপি রঙ ছড়িয়ে গেছিল। রঙটা কাল খুব খুশির মনে হয়েছিল। আজ মনে হল বড় দুঃখের।

 

একটা সাদা কাগজে বড় বড় করে ঋজুদা লিখল, টেডি মহম্মদ, আমাদের বিশ্বস্ত, আমুদে, সাহসী বন্ধু, এইখানে শুয়ে আছে। তার নীচে লিখল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি অপারেশন : ওয়াণ্ডারাবো ওয়ান। তারও নীচে তারিখ দিয়ে লিখে দিল, ঋজু বোস অ্যাণ্ড রুদ্র রায়চৌধুরী।

 

আমি ভাবছিলাম, আমাদের বন্ধু টেডি এখানেই শুয়ে থাকবে। শীতের শিশির পড়বে ওর কবরের উপর। স্টার্লিং পাখিরা কিচিরমিচির করে গান গাইবে কানের কাছে। নরম পায়ে ডিকডিক হরিণ হেঁটে যাবে। বর্ষাকালে ফিসফিস করে বৃষ্টি আলতো করে হাত ছোঁয়াবে ওর গায়ে। রামধনু-হাতে খনভাম্ এসে দেখে যাবেন টেডিকে। বাজ পড়ার শব্দ হয়ে কথা বলবেন টেডির সঙ্গে। হয়তো কোনো গাঢ় অন্ধকার রাতে গুগুনোগুম্বার অথবা ওগরিগাওয়া বিবিকাওয়া চুপিসারে কোনো কুচকুচে কালো লোমশ জানোয়ারের মূর্তি ধরে এসে টেডির কবরের কাছে থাবা গেড়ে বসে ওকে পাহারা দেবেন।

 

পশ্চিমে অল্প ক’টি অ্যাকাসিয়া গাছের পাহারায়, ধু-ধু দিগন্তের উপরে সূর্য হারিয়ে গেল আজ। টেডিও হারিয়ে গেল। চিরদিনের মতো।

 

আমার চোখ জলে ভরে এল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *