গুগুনোগুম্বারের দেশে (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি ঋজুদা নিজেই ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেলেছে। কণ্ডেন্সড মিল্ক জলে গুলে, গরম করে নাইরোবি সর্দারকে আদর করে খেতে দিল। সঙ্গে ওয়াইল্ডবীস্টের রোস্ট।

 

সর্দার শুধুই দুধ খেল, কিন্তু মুখ দেখে মনে হল ঐ টিনের দুধ তার মোটেই ভাল ঠেকল না।

 

সর্দার বলল, আমরা কাঁচা দুধ খাই, আর রক্ত খাই টাটকা। তোমরা যখন যাচ্ছই আমাদের ওখানে, তখন তোমাদেরও খাওয়াব।

 

বলে কী রে? কাল থুতু মেখেছি মুখে-মাথায়, আজ আবার কাঁচা রক্ত খেতে হবে। ঋজুদার সঙ্গে আফ্রিকাতে না এলেই ভাল হত!

 

ভুষুণ্ডা, দেখলাম, একটু দূরে-দূরেই থাকছে। কথাবার্তা বিশেষ বলছে না। যদিও এই অঞ্চলের সব ভাষা ভালই জানে। ঋজুদা যে ওর সাহায্য ছাড়াই মাসাই-সর্দারের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে পারবে সে-কথা ও বোধহয় আগে বুঝতে পারেনি। সে কথা বুঝে খুব খুশি হয়েছে বলে মনে হল না ভুষুণ্ডা। ঋজুদাকে এখনও বলাই হয়নি যে, আমাকে ‘ফুলিশ বয়’ বলে, কাল ভুষুণ্ডাই গুলি করতে বলেছিল। নইলে আমি সর্দারের দিকে রাইফেল তুলতামই না।

 

টেডি খুব কাজ-কর্ম করছে। নাইরোবি সর্দার দয়া করে টেডিকে একটু নস্যি দিল। আমাদের কাছে একটু, কিন্তু টেডি আর সর্দারের নাক যত বড় তাদের নাকের ফুটোটাও তত বড়। একশো গ্রাম করে নস্যি দিব্যি ঢুকে গেল এক-এক নাকে। যেটুকু উড়ে এল হাওয়ায় তাতেই হাঁচতে লাগল ঋজুদা। আমিও।

 

খাওয়া-দাওয়া হতেই তাঁবু টাবু সব হাতে-হাতে উঠিয়ে ফেললাম আমরা। মালপত্র গুছিয়ে গাড়িতে তুলে দিলাম।

 

ঋজুদা বলল, চল, আমরা এখন নাইরোবি সর্দারের গ্রামে যাব। ওর সঙ্গে দেখা না-হলে আমরা জলের অভাবে নিশ্চয়ই মারা যেতাম। পথও খুঁজে পেতাম না। আমাদের যিনি গাইড, ভু-বাবু, তার ভূগোলের জ্ঞান মনে হচ্ছে তোরই মতো। কী করে গাইড হল কে জানে?

 

আমি বললাম, জানো তো, কাল রাতে ভুষুণ্ডাই আমাকে গুলি করে মেরে ফেলতে বলেছিল সর্দারকে।

 

ঋজুদা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কী ভাবল, তারপর বলল, হয়তো ভয় পেয়েছিল। ভুল করেছিল ভুষুণ্ডা।

 

তারপর বলল, এখন ও নিয়ে আর আলোচনা করিস না। ভুষুণ্ডা শুনতে পাবে।

 

আমি বললাম, শুনতে পেলেই বা কী? এখানে বাংলাই তো সকলের কাছে হিব্রু-ল্যাটিন। বাংলাতে আমরা যা খুশি তাই বলতে পারি।

 

ঋজুদা বলল, কারেক্ট।

 

তারপর বলল, তবে পুরোপুরিই বাংলা বলিস–আর্ধেক ইংরিজি, আর্ধেক বাংলার খিচুড়ি নয়। ইংরিজি বুঝে যাবে ও!

 

বললাম, আচ্ছা।

 

সবাই গাড়িতে উঠলাম। নাইরোবি সর্দার বনেটের উপরই বসল, দুহাত দিয়ে দু’দিক ধরে। সে এতই লম্বা-চওড়া যে, ভিতরে আঁটল না। সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ঋজুদা, উইন্ডস্ক্রীন ভরে আছে লাল পোশাকের, নস্যি-কালো, নাইরোবি সর্দার।

 

কী করে যে গাড়ি চালাবে ঋজুদা জানি না। অবশ্য এখানে পথ দেখার কিছু নেই। দেখলাম, ঋজুদা ডানদিকের জানালা দিয়ে মুখ বের করে গাড়ি স্টার্ট করল।

 

গাড়িতে আমরা সকলেই চুপচাপ। উইন্ডস্ক্রীনটা একটু উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল হাওয়া আসার জন্যে। বনেটের উপর সর্দার বসে থাকায় খুবই আস্তে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল–জোরে চালালে আমাদের গাড়ির তলাতেই পড়ে মারা যাবে সর্দার, তখন আর দেখতে হবে না–কাল রাতের মতো দ্রিদিম দ্রিদিম হুলা হুলা সব দৌড়ে আসবে।

 

আমি বললাম, আমরা যে রাস্তা ভুলে গেছি, আমাদের ঠিক রাস্তা বাতলে দেবে কে? সর্দার?

 

ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। তা নয়তো আর যাচ্ছি কেন? তাছাড়া, তেলের সঙ্গে জলও কমে এসেছে আমাদের। পাহাড়ের ঝর্না থেকে জল ভরে নেব। আবারও যে রাস্তা ভুল হবে না বা অন্য কোনো বিপদ হবে না তা কে বলতে পারে?

 

ঋজুদাকে শুধোলাম, নাইরোবি তো একটা শহরের নাম। কেনিয়াতে না শহরটা? শুনেছি, খুব সুন্দর শহর। তাই না? তবে সেই শহরের নামে এই সর্দারের নাম হল কী করে?

 

ঋজুদা বলল, মাসাই ভাষাতে, নাইরোবি কথাটার মানে হচ্ছে খুব ঠাণ্ডা। নাইরোবি শহরটা আমাদের দার্জিলিঙের মতো। খুব ঠাণ্ডা, পাহাড়ি শহর। একসময় ওখানে মাসাইরাই থাকত। জার্মান আর ইংরেজদের দেশের মতো আবহাওয়া বলে সেই সাদা চামড়ার বিদেশীরা ওদের ওখান থেকে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু নামটা এখনও নাইরোবিই রয়ে গেছে।

 

তা তো হল। কিন্তু সর্দারের নাম নাইরোবি কেন? আমি বললাম।

 

কী জানি? হয়তো মেজাজ খুব ঠাণ্ডা বলে। নইলে, তুই গুলি চালিয়ে দেওয়ার পরও আমাদের ক্ষমা করার কথা ছিল না।

 

ঋজুদা বলল।

 

তারপরই বলল, আচ্ছা, অত কাছ থেকে তুই মিস্ করলি কী করে? তোর হাত তো মোটামুটি ভালই। অবশ্য ভাগ্যিস মিস্ করেছিলি, নইলে আর কাউকে বেঁচে ফিরতে হত না।

 

আমি বললাম, সত্যিই মানুষটা সর্দার। ভয় কাকে বলে জানে না। মাথাও দারুণ ঠাণ্ডা। রাইফেল ওর বুকের দিকে এইম করে ধরেছিলাম, তবুও ডোন্টকেয়ার করে সোজা হেঁটে এল আমারই দিকে–যেন আমার রাইফেলটা খেলনা রাইফেল, তারপর রাইফেলের নলটাকে ধরে ঘুরিয়ে দিল। ঘাবড়ে গিয়েই আমি ট্রিগার টিপে ফেলেছিলাম।

 

ঋজুদা বলল, চমৎকার! দারুণ লোককেই পাহারাদার রেখেছিলাম আমি।

 

আমি বললাম, তোমার ভু-বাবু যে ক্রমাগত আমাকে বলে যাচ্ছিলেন, মারো, মারো, ওকে মেরে ফেলল। ওকে না মারলে আমরা সকলে মরব।

 

ঋজুদা চুপ করে থাকল। কোনো কথা বলল না।

 

এদিকে সর্দার আরেকবার নস্যি নিল বনেটে বসা অবস্থাতেই। আর উইন্ডস্ক্রীন যে তুলে রাখা হয়েছিল তার ফাঁক দিয়ে নস্যি উড়ে এল হাওয়ার সঙ্গে। কী বিকট গন্ধ আর কী কড়া নস্যি রে বাবা! হাঁচতে হাঁচতে আমার চোখে জল এসে গেল।

 

ঋজুদা আর টেডি হাসতে লাগল আমার অবস্থা দেখে।

 

দূর থেকে মাসাই গ্রামটা দেখা যাচ্ছিল মারিয়াবো পাহাড়ের নীচে। গোল-গোল বিরাট সব খড়ের ঘর। খড়ে ছাওয়া বিরাট গোয়াল। এখন ফাঁকা। মেয়েরাও দারুণ লম্বা। সকলেই নানারকম পাথর ও হাড়ের গয়না পরেছে। ওদের গায়ের রঙ গাঢ় বাদামি, পোশাক সকলেরই হাতে-বোনা লাল গরম কাপড়ের, প্রায় কম্বলের মতো। কাঠের তৈরি বালতি ও নানারকম পাত্র দিয়ে ওরা কাজ-কর্ম করছে। অল্প ক’জন পুরুষ আমাদের দেখে এগিয়ে এল।

 

ঋজুদা বলল, ঐ যে গোল ঘরগুলো দেখছিস, ওগুলোকে বলে বোমা।

 

বোমা! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

 

ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। আর ঐ গোয়ালঘরগুলোর নাম, ক্রাল।

 

ল্যাণ্ড-রোভার থামতেই জলের পাত্রগুলো নামিয়ে দেওয়া হল। টেডি গ্রামের মাসাইদের সঙ্গে চলে গেল ঝর্নার দিকে।

 

আমরা নামতেই আমাদের বিরাট-বিরাট পেঁপে আর কলা খেতে দিল ওরা। তারপর একটা কালো বাছুরকে ধরে নিয়ে এল। তার গলার শিরাতে দড়ি পরিয়ে দিয়ে একটুকরো কাঠ দিয়ে টার্নিকেট করে একটা শিরাকে একজন ফুলিয়ে দিল। তখন অন্যজন একটা ছোট তীর মারল কাছ থেকে–অমনি ফিনকি দিয়ে রক্ত উঠতে লাগল ফোয়ারার মতো। আরেকজন একটা কাঠের জামবাটিতে সেই রক্ত ধরতে লাগল। বাটিটা ভরে গেল, একজন গিয়ে মাটি থেকে একমুঠো ধুলো তুলে থুতু দিয়ে সেই ধুলো তীরের সূক্ষ্ম ফুটোতে ঘষে দিল। তারপর ঠেলে ঢুকিয়ে দিল শিরাটাকে ভিতরে। চামড়াতে ঢেকে গেল সঙ্গে সঙ্গে শিরাটা, রক্তও বন্ধ হয়ে গেল। বাছুরটা লাফাতে লাফাতে খোঁয়াড়ে চলে গেল। প্রাণে না মেরেও দারুণ কায়দায় ওর রক্ত বের করে নিল এরা।

 

কিন্তু আমি বোধহয় প্রাণে বাঁচলাম না। সেই কাঠের বাটিতে ফেনা-ওঠা তাজা রক্ত এনে একটা লোক সামনেই দাঁড়াল। আমি বয়সে সবচেয়ে ছোট বলে আদর করে আমাকেই সবচেয়ে আগে খেতে দিল। অন্য একজন লোক দুহাতের পাতায় থুতু ফেলে ভাল করে ঘষে সেই পাত্রটিকে সসম্মানে হাতে নিয়ে এসে ইঙ্গিতে চুমুক দিতে বলল।

 

আমি ইতস্তত করছিলাম। ভুষুণ্ডা বলল, না খেলে এরা অপমানিত হবে এবং দাওয়ের এক কোপে তোমার মুণ্ডু শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে।

 

ঋজুদাও ভুষুণ্ডার কথায় মাথা নাড়ল।

 

আর কথা না বাড়িয়ে আমি বাটিতে চুমুক দিলাম। ফেনা-ওঠা টাটকা বাছুরের রক্ত। এক চুমুকে খেয়ে দেখলাম যে, তখনও বেঁচে আছি। মনে হল আমিও যেন ওদেরই মতো লম্বা হয়ে গেলাম, গায়ে জোর বেড়ে গেল অনেক। কিন্তু, ভীষণ বমি পাচ্ছিল।

 

আমার পর ঋজুদা, আর ভুষুণ্ডাও খেল। টেডি জল নিয়ে আসেনি এখনও। সময় লাগবে। তাই ওকে খেতে হল না। বেঁচে গেল।

 

নাইরোবি সর্দার উবু হয়ে মাটিতে বসে মাটির উপরেই একটা তীর দিয়ে একে একে ঋজুদাকে রাস্তা বোঝাতে লাগল। ভুষুণ্ডা একটু দূরে দাঁড়িয়ে তার জিনের ট্রাউজারের দুপকেটে দুহাত ঢুকিয়ে মনোযোগের সঙ্গে দেখতে লাগল। ঋজুদা কম্পাস বের করে একটা সাদা কাগজে বলপয়েন্ট পেন দিয়ে কী-সব লিখতে লাগল।

 

যে লোকটি আমাকে রক্ত খাওয়াল তার সঙ্গে একটু ভাব করার ইচ্ছে হল। ভুষুণ্ডাকে বললাম, আমাকে সাহায্য করতে। ভুষুণ্ডা ভাঙা-ভাঙা মাসাইতে ওকে নাম জিজ্ঞেস করল।

 

লোকটা পিচিক করে থুতু ফেলে কয়েকটা শব্দ করল পরপর।

 

ভুষুণ্ডা হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটাও।

 

বললাম, হসির কী হল?

 

ভুষুণ্ডা বলল, ও এখন পুরনো নামটা বদলে ফেলেছে, কিন্তু নতুন নাম এখনও রাখেনি। কাল রাখবে। নতুন নাম কী হবে ঠিক করেনি। আজ ভেবে ঠিক করবে।

 

আমি বললাম, কী ঠাট্টা করছ ভুষুণ্ডা। নাম আবার নতুন-পুরনো হয় নাকি?

 

ভুষুণ্ডা বলল, ঠাট্টা? না, না, ঠাট্টা নয়। তুমি বানাকে জিজ্ঞেস করো, বানা জানে। বলে, ঋজুদাকে দেখাল।

 

তারপর বলল, মাসাইরা, ইচ্ছেমতো নিজেদের নাম বদলায়, জামাকাপড় পাল্টাবার মত। একটা নাম পুরনো হয়ে গেলেই সেটা বাতিল করে মনোমতো নতুন নামে ডাকে নিজেকে।

 

আমি বললাম, ওরা তো সাপের মতো। খোলস বদলায়।

 

ভুষুণ্ডা কোমর দুলিয়ে ওর হাঁটুর নীচে নেমে আসা দুটি লম্বা-লম্বা হাত দুলিয়ে কলার মতো চওড়া চোয়ালের ধবধবে সাদা বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হিকহিক করে হেসে উঠল। বলল, জব্বর বলেছ, জব্বর বলেছ!

 

মাসাইরা সাপের মতোই, খোলস বদলায়, নাম বদলায়।

 

আমাদের ক্লাসের এক বন্ধুর নাম নিয়ে বড় দুঃখ। ওর দাদু নাম দিয়েছিলেন ব্যোমশংকর। তা ওর একেবারেই পছন্দ নয়। ও মাসাই হলে কেমন সহজে নামটা পাল্টে ফেলতে পারত।

 

দূর থেকে টেডিকে আসতে দেখা গেল। ওরা চার-পাঁচজন জল বয়ে নিয়ে আসছে। ড্রামে এবং চামড়ার ছাগলে। পেছনে পেছনে একপাল ছেলেমেয়ে এবং কয়েকটা ছাগল।

 

ছাগল দেখে আমার কারিব্যুর কথা মনে হল। কারিব্যুকে একটু দুধ খাইয়ে নেওয়া যায়। টেডির সঙ্গে যারা এসেছিল তাদের একজনকে বলে ভুষুণ্ডা একটা ছাগলকে ধরে কারিব্যুকে তার দুধ খাওয়াতে গেল। কারিব্যুর আপত্তি তো ছিলই, তার উপরে সেই পাজি ছাগলিটা পাগলির মতো এক লাথি মেরে দিল কারিব্যুর গায়ে।

 

ঋজুদা বলল, তুই বাচ্চাটাকে মেরেই ফেলবি দেখছি। আমরা যেভাবে দিন কাটাচ্ছি তাতে ওকে বাঁচানো এমনিতেই মুশকিল হবে। তার চেয়ে তুই সর্দারকে প্রেজেন্ট করে যা, ওদের ক্রালে থাকবে। অন্যান্য গোরু বাছুরের সঙ্গে দিব্যি বড় হয়ে উঠবে কারিব্যু।

 

আমি বললাম, ছাগলের দুধ খাচ্ছে না যে ও!

 

ঋজুদা বলল, সকালে তুই পলতে করে অত কন্ডেন্সড মিল্ক খাওয়ালি, তাই পেট ভরা। খিদে পেলে খুবই খাবে।

 

আমি আর টেডি মুখ-চাওয়াচাওয়ি করলাম। তারপর নাইরোবি সর্দারের হাতে দিলাম কারিব্যুকে। ওর পিঠের ঘা-টা তখনও লাল হয়ে ছিল। ভাল হয়ে উঠলেও ওর পিঠে গভীর দাগ থেকে যাবে। থমসনস গ্যাজেলদের গায়ের রঙ ভারী সুন্দর হালকা বাদামি–তার উপর কালো ডোরা, তলপেটটা সাদা। ওর পিঠের ঐ দাগ বিচ্ছিরি দেখাবে ও বড় হলে।

 

নাইরোবি সর্দারের কথায় কোথা থেকে একজন দৌড়ে এসে কীসব পাতা-টাতা বেটে এনে কারিব্যুর ঘায়ে লাগিয়ে দিল। সর্দার বলল, কারিব্যু এখন থেকে আমাদের গোরু-বাছুরের সঙ্গেই চরে বেড়াবে।

 

ঋজুদা বলল, এবার আমরা উঠব।

 

সর্দার বলল, দাঁড়াও। বলে, ঋজুদার হাতে একটা গোল হলুদ পাথর দিল। বলল, কখনও প্রয়োজন হলে কোনো মাসাইকে এই পাথরটি দেখালে সে তোমাকে সবরকম সাহায্য করবে। এটাকে সাবধানে রেখো।

 

সর্দার এবং অন্যান্যরা সার বেঁধে দাঁড়াল। আমরা সকলে হাত তুলে ওদের ধন্যবাদ জানালাম। বাচ্চারা ভিড় করে গাড়িটা দেখছিল। মনে হল, ওরা কখনও গাড়ি দেখেনি আগে। রওয়ানা হবার আগে, দুহাতে আমার মুখটা আদর করে ধরে পিচিক করে আমার মাথায় থুতু দিল সর্দার।

 

আমি গদগদ ভাব দেখিয়ে হাসলাম।

 

ঋজুদা বিড় বিড় করে বলল, তোকে যা পছন্দ করেছে সর্দার, হয়তো জামাই-ই করবে। রাজি না হলেই মুণ্ডু কাটা যাবে কিন্তু।

 

ভয়ে আমি কুঁকড়ে গেলাম।

 

স্টীয়ারিং-এ আমিই বসলাম এবারে। ঋজুদা পাশে বসল ম্যাপটা হাঁটুতে ছড়িয়ে। ভুষুণ্ডা ঋজুদার পিছনে বসে ঋজুদার কাঁধের উপর দিয়ে ম্যাপটা দেখছিল। বুঝতে পেরে ঋজুদা বলল, ম্যাপটা ভাল করে বুঝে নাও ভুষুণ্ডা। এর পরেও রাস্তা ভুল হলে কিন্তু তোমার নামে সেরোনারাতে আমি রিপোর্ট করতে বাধ্য হব। বলে, ম্যাপটাকে হাতে নিল।

 

ট্রেলারে জলের ড্রামের সঙ্গে পেট্রলের জেরিক্যানের ঠোকাঠুকি লেগে টংটং শব্দ হচ্ছিল। ঋজুদা গাড়ি থামাতে বলে নিজে নামল। নেমে টেডিকে বকল। ওরকম করে রেখেছে বলে। তারপর আমিও নেমে ঋজুদা ও টেডির সঙ্গে হাত লাগিয়ে, সব ঠিকঠাক করে রেখে আবার বেঁধে-ছেঁদে নিলাম। ভুষুণ্ডা ম্যাপ দেখছিল। নামল না।

 

ঋজুদার কথামতো কম্পাসের কাঁটা দেখে চালিয়ে মাইল দশেক আসার পর যেন একটা পায়ে-চলা পথের মতো দেখা গেল ঘাসের মধ্যে মধ্যে। সবসময় যে ব্যবহার করা হয় এমন নয়। তবে ঘাসের চেহারা, রঙ আর আশেপাশের চিহ্ন দেখে মনে হয় এইখান দিয়ে মাঝে-মাঝে মানুষ পায়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করে।

 

ঋজুদা বলল, ঐ পথের চিহ্নকে দুচাকার মধ্যে রেখে গাড়ি চালাতে।

 

সেই মতোই চালাতে লাগলাম।

 

একটু আগে একদল বুনো কুকুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তারা প্রথমে গাড়ির দিকে দৌড়ে এসেছিল। পরে, কী ভেবে আবার ফিরে গেল। আফ্রিকার জঙ্গলে এমন হিংস্র জানোয়ার আর নেই। আমাদের দেশেও নেই।

 

আজ অন্য কোনো জানোয়ারই দেখলাম না মারিয়াবো থেকে রওনা হবার পর। বুনো কুকুর যে অঞ্চলে থাকে সেখান থেকে অন্য সব জানোয়ার পালিয়ে যায় শুনেছিলাম। মনে হল, সেই কারণেই বোধহয় কোনো জানোয়ারের টিকি দেখা যাচ্ছে না।

 

হঠাৎ বুঁউউউ আওয়াজ করে একটা সেৎসী মাছি উড়ে এল জানালার ফাঁক দিয়ে। ভুষুণ্ডা সেৎসীকে দারুণ ভয় পায়। ভয় টেডিও পায় তবে ভুষুণ্ডার মতো নয়।

 

ওরা দুজনেই দাঁড়িয়ে উঠে মাছিটাকে যার যার টুপি দিয়ে ধরার এবং মারার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু পারল না। মাছিটা ঠক করে এসে উইন্ডস্ক্রীনে পড়ে, ডানা দুটো নাড়তে লাগল। সেৎসী মাছি যে কী জোরে ডানা নাড়ে এবং একটা ডানার উপর দিয়ে অন্য ডানাটা কীভাবে ঘুরোয় তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না।

 

ঋজুদা গোর্খা টুপি দিয়ে এক বাড়ি মারতেই মাছিটা নীচে পড়ল।

 

আমি বললাম, এবারে তোমরা শান্ত হয়ে বোসো। সেৎসী মরেছে।

 

মরেছে? সেৎসী, অত সহজে?

 

বলেই, টেডি হেসে উঠল। বলল, সেৎসী মাছির দশটা জীবন। একটা নয়। বলেই, আমার আর ঋজুদার মধ্য দিয়ে ঝুঁকে আমাদের পায়ের কাছে পড়ে থাকা মাছিটাকে তুলে নিয়ে তার ধড় থেকে মুণ্ডুটা আলাদা করল টেনে। তারপর বলল, এইবার বলা চলে যে, বাবু মরেছেন। এর এক সেকেন্ড আগেও বলা যেত না যে মরেছেন। এঁরা সহজ জিনিস নন।

 

ঋজুদা আর আমি হাসলাম। মুণ্ড-ছেঁড়া সেৎসী-হাতে টেডির বক্তৃতা শুনে।

 

ঋজুদা বলল, আজ রাত থেকে কিন্তু আমরা খুবই বিপজ্জনক এলাকাতে থাকব। এখানে ওয়াণ্ডারাবো শিকারীরা থাকে। সামনে একটা ছোট্ট লেক আছে। ম্যাপে এই লেকের হদিস নেই। খুব ছোট্ট সোডা লেক। তার চারপাশে লেরাই জঙ্গল। ওয়াণ্ডারাবো শিকারীরা ঐ জঙ্গলের গভীরে লুকিয়ে থাকে এবং শিকার করে। প্রতি শীতে ওরা হাতি গণ্ডার এবং অন্যান্য জানোয়ার মারতে আসে। নাইরোবি সর্দার ওদের কথা বলেছে আমাকে।

 

আমি বললাম, ওয়াণ্ডারাবো কী দিয়ে হাতি মারে? হেভি রাইফেল্স ওরা পায় কোথায়?

 

ঋজুদা বলল, রাইফেল দিয়ে তো মারে না, মারে ছোট্ট-ছোট্ট বিষ-মাখানো তীর দিয়ে।

 

ঐ বিষ কোথায় পায় ওরা?

 

ঋজুদা বলল, তুই কখনও জলপাই গাছ দেখেছিস?

 

আমি বললাম, হ্যাঁ আমার মামা বাড়ির বাগানেই তো ছিল।

 

জঙ্গলের মধ্যে জলপাইয়ের মতো একরকমের গাছ হয়। এই জাতের সব গাছই যে বিষাক্ত হয় এমন নয়। কিছু কিছু গাছের এই বিষ থাকে। গাছগুলোকে দেখতে শুকিয়ে-যাওয়া জলপাই গাছের মতো। এদের বটানিকাল নাম অ্যাপোকানথেরা ফ্রিস্টিওরাম। জংলি ওয়াণ্ডারাবোরা ঐ গাছের নীচে পিঁপড়ে, কি ইঁদুর না কাঠবেড়ালিকে মরে পড়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারে যে, বিষ আছে। তারপর সেই গাছের ডাল আর শেকড়গুলো সেদ্ধ করে ক্বাথ বানিয়ে, ঘন করে তাই বিক্রি করে দেয় ওরা চোরাশিকারীদের কাছে। এই গাছে লাল গোল-গোল ফল হয়। তা দিয়ে খুব ভাল জ্যামও তৈরি হয়। জানিস? জ্যাম তো তোর প্রিয়।

 

হঠাৎ ঋজুদা চেঁচিয়ে উঠল, সাবধান, সাবধান।

 

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, একটা বিরাট দুখড়্গ গণ্ডার জোরে ছুটে আসছে, ডান দিক থেকে আমাদের গাড়ি লক্ষ করে। গাড়ির পেছনে ট্রেলার থাকায় খুব একটা জোরে গাড়ি চালানো যায় না। গণ্ডারের হাত থেকে বাঁচার মতো জোরে তো নয়ই। গণ্ডারটার কী হল, কে জানে। কোথা থেকে যে হঠাৎ উদয় হল তাও আশ্চর্য! ঘাসের মধ্যে কি শুয়ে ছিল?

 

ঋজুদাকে রীতিমত চিন্তিত দেখাল। আবার বলল, সাবধান রুদ্র, খুব সাবধান।

 

গণ্ডারটার তখনও পাঁচশো গজ দূরে ছিল।

 

ঋজুদ তাড়াতাড়ি নেমে রাইফেলটা তুলে, ভয় দেখাবার জন্যেই চার-পা-তুলে-ছুটে আসা গণ্ডারটার পায়ের সামনে মাটিতে একটা গুলি করল। ধুলোঘাস সব ছিটকে উঠল, কিন্তু গণ্ডার ভয় পেল না।

 

ঋজুদা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বলল, গাড়ির মুখটা ওর দিকে ঘোরা তো। শিগগির।

 

আমি স্টীয়ারিং ঘুরিয়ে, খুব জোরে এঞ্জিনকে রেস্ করালাম আর যত জোরে পারি ডাবল-হর্ন একসঙ্গে বাজিয়ে দিয়ে ওর দিকেই এগিয়ে চললাম। এত দিনের মধ্যে এই প্রথম হর্ন বাজালাম গাড়ির। গণ্ডারটা তো জোরে দৌড়ে আসছিলই, আমিও ঐ দিকে জোরে গাড়ি চালিয়ে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা আর গণ্ডারটা একেবারে মুখোমুখি এসে গেল। উইন্ডস্ক্রীন তুলে, তার ফাঁক দিয়ে রাইফেল বের করে ঋজুদা তৈরি হয়ে ছিল। নিজেদের বাঁচাতে হলেই একান্ত গুলি করবে, নইলে নয়।

 

আমিও যেমন ধুলো উড়িয়ে হঠাৎ ব্রেক করে গাড়িটাকে দাঁড় করালাম, গণ্ডারটাও তার গাদাগোব্দা খুরের পায়ের ব্রেক কষিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কান দুটো খাড়া, নাকের উপর পর-পর দুটো খড়্গ, গায়ের চামড়া দেখে মনে হয় যেন কোনো স্থপতি কালচে-লালচে পাথর খোদাই করে থাকে-থাকে তৈরি করেছেন তাকে। তার চোখ দুটো তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে। আগে হর্ন বাজিয়েছিলাম, এঞ্জিন রেস করেছিলাম, এখন শুধু অ্যাকসিলারেটরে পা ছুঁইয়ে এঞ্জিন স্টার্টে রাখলাম।

 

ঋজুদা রাইফেলের ফ্রন্টসাইটের মধ্যে চোখ লাগিয়ে রাইফেলটা ধরে আছে গণ্ডারটার কপাল তাক করে। সকলে চুপ, স্তব্ধ; কী হয় কী হয় ভাব।

 

ঠিক সেই সময় টেডি হঠাৎ বলে উঠল, একটু নস্যি দিয়ে দেব ওর নাকে? নস্যি নাকে গেলেই সঙ্গে-সঙ্গে পালাবে ব্যাটা। বলেই বাঁ হাতের তেলোতে তার চ্যাপ্টা কৌটো থেকে নস্যি ঢেলে, আমার আর ঋজুদার মধ্যের ফাঁক দিয়ে গলে উইণ্ডস্ক্রীনের মধ্যে দিয়ে, শরীরের অর্ধেকটা সড়াত করে বের করে গণ্ডারের নাক লক্ষ করে হাতের তেলোতে ফুঁ দিতে গেল।

 

কিন্তু ওর কোমরের বেল্ট ধরে, এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে ঋজুদা বলল, টেডি!

 

টেডি টানের চোটে পিছিয়ে এল।

 

ঋজুদা গম্ভীর গলায় বলল, ঐ দ্যাখো।

 

বলতেই, গণ্ডারটা আস্তে-আস্তে ঘুরে আমাদের দিকে পিছন ফিরল। পিছন ফিরতেই দেখি লেজটা তুলে আছে গণ্ডারটা, আর তার ঠিক লেজের নীচে একটা এক-ফুটের মতো লম্বা তীর গাঁথা।

 

গণ্ডারটা আমাদের সকলের চোখের সামনে কয়েক পা হেঁটে গেল উল্টোদিকে। তারপর কয়েক পা হেঁটে গিয়েই ধপ করে পড়ে গেল মুখ থুবড়ে।

 

আমরা গাড়ি ছেড়ে সকলেই নামলাম। টেডি নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল, ওয়াণ্ডারাবো। ওয়াণ্ডারাবো।

 

অতবড় একটা জানোয়ার, কত তার গায়ে জোর, তাকে ওয়াণ্ডারাবো শিকারী তার শরীরের সবচেয়ে নরম জায়গাতে বিষতীর মেরে ঘায়েল করেছে।

 

টেডি গিয়ে গণ্ডারটার সামনে দাঁড়াতেই, সে একবার ওঠবার শেষ চেষ্টা করল। কিন্তু তারপরই শেষবারের মতো শুয়ে পড়ল ধুলো উড়িয়ে।

 

গণ্ডারটার ওজন আমাদের ল্যাণ্ড-রোভারটার চেয়েও বেশি হবে। তার খড়্গ কেটে বিক্রি করলে, সেই খড়্গ গুঁড়ো করে কারা কোন্ ওষুধ বানাবে–তাই তাকে মরতে হল এক-আকাশ রোদ আর হাওয়ার মধ্যে।

 

তারপর অনেকক্ষণ আমরা সকলে চুপ করে থাকলাম। হয়তো না-জেনেই, মরে-যাওয়া গণ্ডারটাকে সম্মান জানাবার জন্যে।

 

টেডি বলল, ওয়াণ্ডারাবোরা কাছেই আছে। এই তীর বেশিক্ষণ আগে ছোঁড়েনি। বলেই, উঠে গিয়ে গণ্ডারটার চারপাশে ঘুরে ভাল করে বুঝে নিয়ে বাঁ হাতে গণ্ডারের লেজটা তুলে, ডান হাত দিয়ে একটানে তীরটা বের করে নিয়ে এল।

 

ঋজুদা সেটাকে ভাল করে পরীক্ষা করে একটা টেস্ট-টিউবে তীরের গায়ে লাগা বিষমাখা রক্ত রেখে, টিউবটাকে তুলোয় জড়িয়ে একটা বাক্সে রাখল সেটাকে।

 

গণ্ডারটা ওখানেই পড়ে রইল। ওয়াণ্ডারাবো শিকারীরা ওকে খুঁজে পাবে হয়তো। না-পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া, খুঁজে পেলেও তারা গাড়ির চাকার দাগ দেখে ভয় পেয়ে এদিকে হয়তো না-ও আসতে পারে। ওরা না এলে, শকুনরা আসবে। প্রথমে চোখ দুটো ঠুকরে খাবে। তারপর রোদে, হাওয়ায় গণ্ডারের ঐ শক্ত চামড়াও গলে যাবে একদিন। দিনে রাতে শকুনের, শেয়ালের আর হায়নার ভোজ হবে এখানে।

 

আমাদের সকলেরই মন খারাপ হয়ে গেল ভীষণ। ভুষুণ্ডা বলল, এখানেই কাছাকাছি আমরা আজ ক্যাম্প করে থাকলে ওয়াণ্ডারাবোদের সঙ্গে দেখা হতে পারে। গণ্ডার যখন মেরেইছে, তখন তার খড়্গ না-কেটে তারা ফিরে যাবে না নিশ্চয়ই। তারা পায়ের দাগ দেখে-দেখে এখানে এসে পৌঁছবেই।

 

ঋজুদা কী একটু ভাবল। তারপর বলল, নাঃ থাক। আমরা এগিয়ে যাব।

 

টেডি এক-নাক নস্যি নিল গণ্ডারটার পিঠের উপর থেবড়ে বসে।

 

ঋজুদা পাইপ ধরিয়ে বলল, রুদ্র, ওই রাইফেলটা গণ্ডারের গায়ে শুইয়ে রেখে পোজ দিয়ে দাঁড়া, আমি একটা ছবি তুলি তোর। ছবির নীচে লিখে দেব : মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার। কী বলিস?

 

আমি বললাম, মোটেই না।

 

ঋজুদা বলল, এখনও ভেবে দ্যাখ, একটা দারুণ চান্স ছিল কিন্তু কলকাতায় ফিরে বন্ধুদের গুল মারবার। ছবি থাকলে তো আর তাদের বিশ্বাস না-করে উপায় নেই?

 

আমি বললাম, ছবি তুলে দাও, তবে খালি হাতে। এই বেচারি গণ্ডারটার একটা ছবি থাকুক আমার কাছে।

 

ভুষুণ্ডা সিগারেটে টান লাগিয়ে ঋজুদাকে বলল, এইখানেই ক্যাম্প করার কথাটা আরেকবার ভেবে দেখলে পারতেন।

 

ঋজুদা বলল, দেখেছি ভেবে। চলো, এগিয়েই যাই।

 

ভুষুণ্ডা গররাজি গলায় বলল, আপনি যা বলবেন।

 

গণ্ডারটাকে ওখানে ফেলে রেখেই আবার রওনা হলাম।

 

গাড়ি চালাতে চালাতে আমি ভেবেছিলাম, অজানা কোনো কারণে আর ভুষুণ্ডার মধ্যে কেমন যেন বনিবনার অভাব হচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই ভাল লাগছে না আমার।

 

ঘন্টা-দেড়েক গাড়ি চালাবার পর দূরে লেরাই জঙ্গলের আভাস ফুটে উঠল। এদিকে সেৎসী মাছি বেশি। কিন্তু লেরাই জঙ্গল দেখতে খুব ভাল। এই অ্যাকাসিয়া গাছগুলোর গা আর ডালপালা একটা মিষ্টি হলদে-সবুজ রঙের হয়। মনে হয়, শ্যাওলা পড়েছে। কিন্তু তা নয়, গাছের রঙই ও-রকম। সোয়াহিলিতে বড় বড় হাত-ছড়ানো অ্যাকাসিয়া গাছগুলোকে বলে মিগুংগা। আর হলুদ মিগুংগা হলে বলে লেরাই। লেরাই-জঙ্গল জলের কাছাকাছি হয়। তাই যেখানেই লেরাই-জঙ্গল থাকে, তার আশেপাশে অন্যান্য নানারকম জঙ্গলও থাকে। জন্তু-জানোয়ারের ভিড়ও থাকে। অ্যাকাসিয়া অনেক রকমের হয়। ঋজুদা বলছিল। ছাতার মতো অ্যাকাসিয়াগুলোকে বলে আমব্রেলা অ্যাকাসিয়া। তাছাড়া আছে অ্যাকাসিয়া টরটিলিস। গাম্মিফ্লোরা। অ্যাকাসিয়া আবিসিনিকা। অ্যালবিজিয়া বলে একরকমের গাছ আছে, পাঁচদিন আগে দেখেছিলাম, সেগুলোর পাতাগুলোই কাঁটার মতো। ওয়েট-আ-বিট থর্ন নামেও একরকমের কাঁটাগাছ হয় এখানে।

 

দুপুরের খাওয়ার জন্যে কোথাও থামিনি আমরা।

 

বিকেল চারটে নাগাদ লেরাই-জঙ্গলের কোলে পৌঁছে গেলাম। ঋজুদা গাছ-গাছালির ফাঁকে ফাঁকে দূরের লেকটাকে দেখল। অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম সেদিকে। এ-রকম কোনো কিছুই দেখিনি এর আগে। লেকটার আশপাশের ডাঙা অদ্ভুত নীলচে ও ছাই-রঙা। জল নেই বেশি, কিন্তু জল যেখানে আছে সেইদিকেও তাকানো যায় না, জলের ঠিক কাছাকাছি এমন উজ্জ্বল চকচকে কাচের মতো কোনো জিনিসের আস্তরণ পড়ে রয়েছে যে চোখ চাওয়া যায় না। চোখে ধাঁধা লাগে। মনে হয়, বরফ পড়েছে বুঝি।

 

তাঁবু খাঁটিয়ে টেডি রান্নার বন্দোবস্ত করতে লাগল। আমি আর ঋজুদা জায়গাটা ভাল করে দেখার জন্যে বেরোলাম।

 

ঋজুদা বলল, রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে নে।

 

ভুষুণ্ডা বলল, আমি কি সঙ্গে যাব?

 

ঋজুদা বলল, না! তুমি তার চেয়ে বরং টেডির কাছেই থাকো। বন্দুক রেখো হাতের কাছে।

 

তাঁবু থেকে এখন আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।

 

হঠাৎ সামনে পথের বাঁকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে চমৎকার কারুকাজ করা শিংওয়ালা খয়েরি-রঙা একদল হরিণ দেখলাম। এই হরিণ কখনও দেখিনি আফ্রিকাতে আসার পর। দিনের শেষ রোদ পশ্চিম থেকে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে এসে পড়েছে হরিণগুলোর গায়ে। কী চমৎকার যে দেখাচ্ছে!

 

আমাদের দেখতে পেয়েই হরিণগুলোর চমক ভাঙল। ছত্রভঙ্গ হয়ে ওরা লাফাতে-লাফাতে চলে গেল পুবের অন্ধকারে। ওরা যখন তাড়াতাড়ি দৌড়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল, ওরা যেন উড়ে যাচ্ছে।

 

ঋজুদা বলল, এদের নাম ইম্পালা।

 

এই ইম্পালা! কত পড়েছি এদের কথা!

 

গতকাল রাতে যে ছোট জানোয়ারটা উড়ে-লাফিয়ে চলছিল, যার চোখ জ্বলেনি সামনে থেকে, কিন্তু পাশ থেকে একটা চোখ টর্চের আলোয় জ্বলেছিল, সেই জানোয়ারটা কী জানোয়ার তা ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করলাম।

 

ভাল করে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ঋজুদা তার বিবরণ জানল আমার কাছ থেকে। তারপর হেসে বলল, বুঝেছি, বুঝেছি। ওগুলো হচ্ছে লাফানো-খরগোশ। আসলে কিন্তু ওড়ে না, এমন করে লাফায়, যেমন এই ইম্পালারাও লাফায়, যেন মনে হয় উড়েই যাচ্ছে। আমাদের দেশে ফ্লাইং-স্কুইরেল আছে, কিন্তু সে-কাঠবিড়ালি সত্যিই ওড়ে। লাফানি-খরগোশ শুধু লাফায়ই। আর ঐ আরেকটা মজা। ওদের চোখে এমন কোনো ব্যাপার আছে যে, সামনে থেকে অন্ধকারে আলো ফেললে একটা চোখও জ্বলে না। অথচ পাশ থেকে ফেলে সেই পাশের চোখটা জ্বলে ওঠে। এইরকম খরগোশ শুধু এখানেই দেখা যায়।

 

আমরা যখন হাঁটছিলাম, তখন এদিক-ওদিকে মাটিতে, ভাল করে নজর করে যাচ্ছিলাম। শুধু জংলি জানোয়ার নয়, তাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি হিংস্র ওয়াণ্ডারাবো শিকারীরা এ জঙ্গলে আছে। আড়াল থেকে একটি বিষ-মাখানো তীর ছুঁড়ে দেবে, ব্যস্-স টলে পড়ে যেতে হবে। গণ্ডারটার প্রচণ্ড প্রাণশক্তি, তাই বেঁচে ছিল অনেকক্ষণ। মানুষদের মারলে সঙ্গে সঙ্গেই শেষ।

 

একটা ঝাঁকড়া ওয়েট-আ-বিট থর্ন গাছের নীচে ছোট্ট একটি বাদামি হরিণছানা দাঁড়িয়ে ছিল। ঋজুদা দেখতে পায়নি। আমি ঋজুদার হাতে হাত দিয়ে ঐদিকে দেখালাম। ফিসফিস করে বললাম, দ্যাখো দ্যাখো, কী সুন্দর হরিণছানাটা।

 

ঋজুদা ভাল করে দেখে বলল, এটা হরিণছানা নয় রে, এ এক জাতের হরিণ। ওরা বড় হয়েও ঐটুকুই থাকে। ওড়িশা জঙ্গলে কতবার তো মাউস-ডিয়ার দেখেছিস। এগুলো ঐরকমই। এদের নাম ডিক-ডিক্। এই জাতের হরিণ কেবল আফ্রিকাতেই পাওয়া যায়।

 

মনে-মনে উচ্চারণ করলাম দুবার। ডিক-ডিক। কী সুন্দর নামটা।

 

আলো পড়ে আসছিল। ঋজুদা বলল, এখন আর দেরি না করাই ভাল। তাঁবু থেকে মাইলখানেক চলে এসেছি। চল, এখন ফিরে যাই। কাল আমরা চান করব লেকে এসে, কী বল?

 

আমি বললাম, দারুণ হবে। শেষ চান করেছিলাম সেরোনারাতে। কত্ত দিন আগে।

 

আমরা ফেরবার সময় অন্য রাস্তায় এলাম। এ-রাস্তাটাও লোকের পাশ দিয়েই গেছে, তবে আমরা আরো গভীরে গভীরে। সামনেই একটা বাঁক। বাঁকের মুখটাতে আসতেই আমার মনে হল একটা লোক যেন পথ থেকে জঙ্গলে সরে গেল। ঋজুদা পশ্চিমে তাকিয়ে দারুণ আফ্রিকান সূর্যাস্ত দেখছিল, অ্যাকাসিয়া গাছের পটভূমিতে লাল হওয়া আকাশে।

 

হঠাৎ ঋজুদা মুখ ঘুরিয়ে বলল, কোনো মানুষ জঙ্গলের মধ্যে দৌড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। তুই শব্দ পাচ্ছিস?

 

আমি কান খাড়া করে শুনবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না।

 

ঋজুদা রাইফেলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।

 

যেখান থেকে লোকটাকে সরে যেতে দেখেছিলাম, সেইখানে এসে পৌঁছতেই নরম মাটিতে তার পায়ের দাগ দেখা গেল। প্রকাণ্ড দুটি পায়ের ছাপ। ছাপের গভীরতা দেখে মনে হচ্ছে লোকটা অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পথের বাঁ দিকে কোনো জিনিসকে লক্ষ করছিল।

 

বাঁ দিকে মুখ তুলতে যাচ্ছিলাম। ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, লোকটা যেদিকে গেছে সেইদিকে তুই রাইফেল তুলে রেডি হয়ে খুব সাবধানে দ্যাখ। কিছু দেখতে পেলেই আমাকে বলিস।

 

আমি ঐদিকটা দেখছি।

 

একটু পর ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, দ্যাখ রুদ্র, এদিকে দ্যাখ।

 

ঋজুদার কথামতো ঐদিকে তাকিয়ে দেখলাম, পথ থেকে হাতদশেক উপরে একটা মিগুংগা গাছের দুটো ডালের মাঝখানে রক্তাক্ত ইম্পালা হরিণের আধখানা শরীর ঝুলছে। আর সেই গাছের উপরেই, অন্য দুটি ডাল যেখানে মিলেছে সেইখানে পথের দিকে পিছন ফিরে বসে একটি প্রকাণ্ড চিতাবাঘ, তার মুখে সেই হরিণের মাংস। চিতাটার পিঠে একটা তীর গেঁথে আছে।

 

আমরা আর-একটু এগিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখলাম। চিতাটা ততক্ষণে মরে গেছে। কিন্তু মরে গেলেও গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে না। এমনভাবে দুটি ডালের মাঝখানে তার শরীর আটকে আছে যে, পড়ে যাবেও না।

 

আমি বললাম, লোকটা যদি আমাদের দেখে থাকে?

 

ঋজুদা বলল, তুই তো দেখেছিস এক ঝলক। কেমন দেখতে বল তো?

 

আমি বললাম, দারুণ লম্বা, সবুজ আর লাল ছোপছোপ কাঙ্গার মতো লুঙ্গি পরা, গায়ে সবুজ চাদর, হাতে তীর-ধনুক।

 

ঋজুদা উত্তেজিত হয়ে গেছিল, বলল, তোকে দেখেছিল?

 

বললাম, মনে হয় না। ও বোধহয় এমনিতেই দৌড়ে চলে যাচ্ছিল।

 

ঋজুদা বলল, ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আয়। আর কথাবার্তা বলিস না।

 

আমরা যখন তাঁবুর কাছে এলাম তখন অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে। তার সঙ্গে শীতটাও। টেডি খুব বড় করে আগুন জ্বেলেছে। এখানে শুকনো কাঠকুটোর অভাব নেই কোনো। আগুনের আভায় চারদিক লাল হয়ে উঠেছে।

 

আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখন টেডির কফি তৈরি। বিস্কুট আর কফি দিল ও আমাদের। রান্নাও চড়িয়ে দিয়েছে। আজও উগালি।

 

ভুষুণ্ডাকে কিন্তু দেখা গেল না কোথাও। ঋজুদা জিজ্ঞেস করাতে টেডি বলল, সে তো আপনাদের পিছনে-পিছনে গেল। কেন, দেখা হয়নি?

 

কিছুক্ষণ পর একটা গুলির আওয়াজ শোনা গেল। এবং তারও কিছুক্ষণ পর দুটি বড় বড় ফেজেন্ট হাতে ঝুলিয়ে এল ভুষুণ্ডা। এসে বলল, ওয়াইল্ডবীস্ট আর গ্রান্টস গ্যাজেল খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেছিল। তাই আনলাম। এক্ষুনি ছাড়িয়ে দিচ্ছি, রোস্ট করবে টেডি।

 

ঋজুদা বলল, ভুষুণ্ডা, তুমি ভালভাবেই জানো যে, এখানে চোরা শিকারীরা আছে, তবুও তুমি গুলি করলে কেন আমাকে জিজ্ঞেস না করে? এটা কি শিকার করার সময়, না জায়গা? গুলির শব্দ শুনলেই তো ওরা সব সরে যাবে, সাবধান হয়ে যাবে। তাতে তো আমাদেরই বিপদ। একথা কি তোমাকে শেখাতে হবে? তুমি এসব জানো না তা তো নয়।

 

ভুষুণ্ডা লজ্জিত হয়ে বলল, সরি। আমি অতটা ভাবিনি। আপনাদের খাওয়ার যাতে কষ্ট না হয় সেই ভেবেই মেরেছিলাম।

 

ঋজুদা বলল, আফ্রিকার বন-বাদাড়ে এত কষ্ট করে আমরা খাওয়ার সুখ করতে আসিনি। আমাদের দেশে আমরা ভাল-মন্দ খেতে পাই। সেরোনারাতে, গোরোংগোরোতে অথবা ডার-এস-সালাম বা আরুশাতে গেলেও খেতে পাব। ভবিষ্যতে তুমি এসব কোরো না। তাছাড়া তুমি আমাদের সঙ্গে এসেছ বিশেষ কারণে। আমাদের খাওয়ার কষ্ট নিয়ে তোমার চিন্তা না করলেও চলবে।

 

তারপরই কথা ঘুরিয়ে ঋজুদা বলল, এসো তো দেখি, এই জঙ্গলের আর লেকের একটা ম্যাপ বানিয়ে ফেলি দুজনে আগুনের পাশে বসে।

 

ভুষুণ্ডা ছুরি হাতে করে উবু হয়ে বসে ফেজেন্ট দুটোর পালক ছাড়াতে-ছাড়াতে বলল, কী হবে ম্যাপ দিয়ে? এই জঙ্গল আমার মুখস্থ। কাল আমি চোরাশিকারীদের ডেরায় নিয়ে যাব আপনাদের। একেবারে হাতে-নাতে ধরিয়ে দেব। তাহলেই তো হল। তবে খুব সাবধানে যাবেন। তীর মারতে ওদের সময় লাগে না।

 

ঋজুদা একাই ম্যাপ বানাতে বসে গেল, কফি খেতে খেতে।

 

তারপর ভুষুণ্ডার দিকে চেয়ে বলল, ওয়াণ্ডারাবোদের ভয় আমাকে দেখিও না। কোনো-কিছুর ভয়ই দেখিও না।

 

ভুষুণ্ডা যেন একটু অবাক হল। তারপর ঋজুদাকে বলল, আপনার সাহস সম্বন্ধে আমার সন্দেহ নেই কোনো। আপনার মতো সাহসী লোক কমই আছে।

 

ঋজুদা চুপ করে গেল।

 

ভুষুণ্ডার কথাটাতে, মনে হল, একটু ঠাট্টা মেশানো ছিল।

 

কফিটা শেষ করেই ঋজুদা বলল, কাল পায়ে হেঁটে জঙ্গলে ঢুকব।

 

ভুষুণ্ডা মুখ না-ঘুরিয়েই বলল, তাইই হবে। কাল ওয়াণ্ডারাবোদের সঙ্গে মোলাকাত হবে আপনার।

 

ঋজুদা বলল, ক্যাম্পে থাকবে টেডি। লাঞ্চ বানিয়ে রাখবে সকলের জন্যে।

 

টেডি বলল, সে কী? আমিও সঙ্গে যাব। আমিও যাব।

 

ঋজুদা মুখ নিচু করে কম্পাস আর কাগজ-পেনসিল নিয়ে কাজ করতে করতে বলল, আমি যেমন বলেছি, তেমনই করবে। আমার কথা অমান্য করবে না কেউ। বুঝেছ?

 

টেডি মুখ নিচু করে বলল, বুঝেছি।

 

ভুষুণ্ডা টেডির দিকে মুখটা একটু ফেরাল। আগুনের আভায় মনে হল, ভুষুণ্ডার মুখে এক অদ্ভুত হাসি লেগে আছে।

 

আমার, কেন জানি না, বড়ই অস্বস্তি লাগছে। কিছু একটা ঘটবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *