ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
সাত
হাজারিবাগের পুলিশ সাহেবের বাড়ি ক্যানারি হিল রোড আর সার্কিট হাউসের রাস্তার মোড়ে।
ঋজুদা বলল, পুরনো বাড়িটার অনেক রদবদল হয়েছে। পঞ্চাশ বছরেরও আগে আমার বন্ধু সুব্রত চ্যাটার্জির বাবা এই বাড়িতে থাকতেন। হাজারিবাগের এস. পি. ছিলেন। তখন হাজারিবাগ মস্ত জেলা ছিল–গিরিডি, কোডারমা, চাতরা সবই হাজারিবাগের মধ্যে ছিল।
আমরা যেতেই পুলিশ সাহেব মি. রাওয়াল বেরিয়ে এলেন। লন-এ সামিয়ানার মতো তাঁবু খাটানো।
আমাদের ছেলেবেলাতেও এসবই দেখেছি। বুঝলি।
ঋজুদা বলল।
উনি চা-বিস্কিট খাইয়ে বলেছিলেন, কোতোয়ালিতে যখন দরকার পড়বে তখনই আসবেন। এখন সময় নষ্ট করে যাওয়ার দরকার নেই। আমার মোবাইলেই ফোন করবেন। যদি সুইচ-অফ করা থাকে তবে বড় দারোগার মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। তাকে করবেন। তাঁকে সব বলা আছে। কোনও অসুবিধে হবে না।
ঋজুদা বলল, একটা উপকার করতে হবে। এখন ডি. এফ. ও. কাজমি সাহেবের কাছে আমি গেলেই উনি আটকে দেবেন। বিরিয়ানি না খাইয়েই ছাড়বেন না। আপনি বাঁচান। ওঁকে খবর দিয়ে দিতে হবে যে আমি এসে গেছি–পিতিজ বাংলোতে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। ওঁর সঙ্গে কাল কথা বলব মোবাইলে।
ঠিক আছে। বলে দেব। বাই অল মিনস। বললেন, রাওয়াল সাহেব।
আমরা ওঁর বাংলো ছেড়ে পিতিজ-এর দিকে এগোলাম।
.
গরম জলে চান করে জামাকাপড় বদলে বাইরের বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে আছি। মুগের ডালের খিচুড়ি ফিনফিনে করে কাটা আলু আর মুরগি ভাজা হচ্ছে বাবুর্চিখানাতে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ভটকাইটা থাকলে আমরা সকলেই নিশ্চিন্ত থাকি। ওকে মিস করছি। আমি গরম কফির কাপ নিয়ে বসে হাত গরম করছি আর ঋজুদার হাতে কনিয়াকের গ্লাস। ভি. এস. ও. পি.। তবে ব্রান্ডি গ্লাস-টাস এখানে নেই। চা কফির গ্লাসেই ঢেলে নিয়েছে ঋজুদা।
আগে ঋজুদা এসব খেত না। গত বছর দু-তিন হল দেখছি একটু খায়। বলে বুঝলি রুদ্র, বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। ঠেকনার দরকার হয়।
আমি জানি, এসব বাজে কথা। বুড়ো কখনওই হবে না ঋজুদা। ইচ্ছে হচ্ছে খাচ্ছে, তার আবার এত বাহানা কেন? যখন ইচ্ছে হবে না, খাবে না।
ভাল ঠান্ডা বাইরে। তা ছাড়া, নদীর একেবারে উপরেই বাংলোটা। ঠান্ডাটা বেশি লাগে সে জন্যে। বাইরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। আকাশ ভর্তি তারা। বারান্দার লণ্ঠনটা ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েছে ঋজুদা। নদীর এপার থেকে একটি নাইটজার ডাকছে আর ওপার থেকে সাড়া দিচ্ছে তার দোসর। নদীর বুকের উপর দিয়ে একজোড়া ডিড উ্য ডু ইট পাখি চমকে চমকে ডাকতে ডাকতে বাঁ থেকে ডাইনে উড়ে যাচ্ছে কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে আসছে। অন্ধকারে তাদের ঝুলন্ত পা দুটিকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু তাদের ডাকে নদীর জলও যেন চমকে উঠে চলকে যাচ্ছে।
ঋজুদা বলল, রান্না হলে তাড়াতাড়ি খেয়ে কম্বলের তলায় যাব। বুঝলি। কাল সকাল সকাল বেরোব। ফাগুয়ারা ভিলার আশেপাশে একটু ঘোরাঘুরি করে ব্রেকফাস্ট-এর সময়ে ফাগুয়ারা ভিলাতে ঢুকে কন্দর্পনারায়ণকে চমকে দেব। তারপর জমিয়ে ব্রেকফাস্ট করব।
তারপর বলল, খাওয়ার কথা উঠলেই ভটকাইয়ের কথা মনে আসে।
কী ব্রেকফাস্ট করবে?
গরম গরম পরোটা, আলুর চোকা, আওলার আচার, বেগুন ভাজা-ঘি চপ চপ। আর রাবড়ি। ইচ্ছে আছে। দেখা যাক কপালে কী জোটে!
.
ঘুম ভাঙল এক জোড়া র্যাকেট-টেইলড় ড্রঙ্গোর ধাতব আওয়াজে। ভারী। ঝগড়া করে পাখিগুলো।
মুখ হাত ধুয়ে দু কাপ করে গরম চা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। চা-এর ব্যাপারে ঋজুদা আর তিতির খুবই খুঁতখুঁতে। ঋজুদা যেখানেই যায় নিজের দার্জিলিং অরেঞ্জ পিকো চা সঙ্গে নিয়ে যেতে ভোলে না। তিতিরও ওই চায়ের ভক্ত। আমি আর ভটকাইও ওঁদের সঙ্গগুণেই কন্যোসার হয়ে গেছি।
গাড়িটা করেই বেরোলাম। আমাদের রাইফেল এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সব গাড়িতেই তুলে নিলাম। আমাদের উপরে হয়তো এক বা একাধিক মানুষে লক্ষ রাখবেন। থানা থেকেই যে আমাদের আসার খবরটা রিবাউন্ড করে আমরা এখানে পৌঁছবার আগেই এসে পৌঁছয়নি তাও বলা যায় না। আজকাল ডি. জি. পি., আই. জি., এস. পি. কারওকে জানাটাই যথেষ্ট নয়। শুধু পুলিশই নয়, সব সরকারি দপ্তরেই ঘুন ধরে গেছে। তাই গাড়ির মধ্যেই সব কিছু রইল। দুজনের পিস্তল আছে কোমরে। সব সময়ের সঙ্গী।
গত রাতে ঋজুদা চৌকিদারের সঙ্গে অনেক গল্প করছিল। নেহাত গল্প করার জন্যেই নয়, খবর জোগাড় করার জন্যেও। স্থানীয় প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকেই নানা খবর পাওয়া যেতে পারে। সেগুলোকে ঝাড়াই বাছাই করে নিতে হয়। চৌকিদারের চেলা রান্না করছিল আর চৌকিদার আমাদের কম্পানি দিচ্ছিল। ঋজুদার প্রশ্নর উত্তরে সে বলল, এখানে, মানে এই অঞ্চলে দুটি টাটু ঘোড়া আছে। একটা মুনতাজার আলির অন্যটা ফাগুয়ারা ভিলার।
ফাগুয়ারা ভিলাতে টাট্টু ঘোড়া আছে? কোথায় থাকে?
অবাক হয়ে বললাম আমি।
ভিলার পেছন দিকে আস্তাবল আছে। আগে বড় বড় দুটো উইলার ঘোড়া ছিল। রাজাবাবুর আমলে।
‘উইলার’ মানে ‘ওয়েলার’ বুঝলাম। নামী ইংলিশ ঘোড়া।
চৌকিদার বলল, হাজারিবাগের মস্ত বড়লোক টুটু ইমাম তাদের নিয়ে নিলেন। টুটু ইমাম সাহেবের অনেক রেসের ঘোড়া ছিল এক সময়ে। ফাগুয়ারা ভিলাতে এখন ঘোড়া নেই ওই টাটুটা আছে। ফাগুয়ারা ভিলাতে মেহমানদের বাচ্চাটাচ্চারা এলে চড়ানো হয় তাদের। ভিলার কেউ চড়ে কিনা বলতে পারব না।
মুনতাজার চড়ে?
হ্যাঁ। সেই তো এখানকার মাস্তান। সে কীসে না চড়ে! মোটর সাইকেল আছে, সাইকেল আছে, ঘোড়াভি আছে। তবে সে নিজের টাটুতে চড়ে, ফাগুয়ারা ভিলার টাট্ট নয়।
ছেলেটা কেমন?
খতরনাক। আরও বেশি বাড় বেড়েছে বড় রাজকুমারের জন্যে। খুব আহ্লাদ দেন তিনি। আজ নয়, বচপন থেকে। নিজের তো ছেলেমেয়ে নেই। যত পেয়ার দুলহার সব এই অপোগণ্ডর উপরে।
চৌকিদারের নাম, রজব আলি। সে গলা নামিয়ে বলল, মুনতাজারের কথা আর বেশি আলোচনা না করাই ভাল। ওর চর আছে চতুর্দিকে। কিছুদিন হল ও এমন এমন সব মানুষের সঙ্গে মিশছে যে ওকে ভয় করি আমরা।
তারা কারা?
স্থানীয় লোক নয়। আনজান জায়গা থেকে আসে। জিপে করে, মোটর সাইকেলে করে। মুনতাজারকে আমরা তাই এড়িয়ে চলি। বম্বে সিনেমার ভিলেইনের মতো ও যা-খুশি তাই করে। এর মেয়ে ওর বউ উঠিয়ে নিয়ে যায়, এর মোরগা তার বকরি।
এখানে হিন্দি সিনেমা তোমরা কোথায় দেখো?
পাঞ্চায়েতে কালার টিভি আছে। সেখানেই দেখি। মাসে মাসে হাজারিবাগ শহরে গেলে শহরের হলেভি দেখে আসি।
হুঁ।
ঋজুদা স্বগতোক্তি করল, এই টিভি আর বলিউড-এর সিনেমাই ভারতবর্ষের যা কিছু শাশ্বত ও ভালত্ব ছিল, যা কিছু ভারতীয়ত্ব তার প্রায় সবইনষ্ট করে দিল। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, রাহাজানি এত বেড়ে গেছে চারদিকে এই জন্যে। তা ছাড়া লোভ? লোভ ঢুকে গেছে অরণ্যে পর্বতে। মানুষ, কোনও মানুষই আর অল্পে সন্তুষ্ট নয়। সকলেরই সব চাই। এই সব’-এ তার সত্যিই প্রয়োজন আছে কি নেই, এসব কেউ ভাবে না।
তারপরে বলল, বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা কথা আজকাল প্রায়ই মনে পড়ে, বুঝলি।
কী কথা?
উই ডু নট স্ট্রাগল ফর এগজিস্টেন্স, উই স্ট্রাগল টু আউটশাইন আওয়ার নেবার্স৷’ এই কথার সত্য শহরের বাসিন্দাদের দেখে রোজই মনে হয়। এই সব জঙ্গলে-গ্রামে ওই দৌড় অতখানি তীব্র হয়ে ওঠেনি এখনও। তবে ভবিষ্যতে হয়তো হবে। হয়তো কেন, অবশ্যই হবে। এখন এদের চোখও লোভে চকচক করে।
ঋজুদা বলল, চল আগেই যাই ফাগুয়ারা ভিলাতে। তারপরে ওখানের খবর-টবর জেনে চারধারে ঘুরে নেওয়া যাবে। নদীর পারের সেই পিপ্পলগাছের হাইড-আউটে তো এই ভারী গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। হেঁটেই যেতে হবে।
যাবে কি না একবার পরখ করে দেখাই যাক। Scorpion-এর এঞ্জিন যা ক্ষমতাসম্পন্ন তা জাহান্নমে গিয়ে জন্নত-এও ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবে আমাদের।
তাহলে চল। তাই যাওয়া যাবে।
ফাগুয়ারা ভিলার গেটে গিয়ে হর্ন বাজাতে একটু পরে নেপালি দারোয়ান ছোট গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আগন্তুকদের পরিচয় জানতে এসেই আমাদের চিনে ফেলে স্যালুট করল।
ঋজুদা বলল, কন্দর্পনারায়ণবাবু হ্যায় ক্যা?
দারোয়ান জবাব দিতে দিতে উনি নিজেই চলে এলেন গেটের কাছে। জগিং স্যুট পরে জগিং শু পরে হাঁটছিলেন ভিলার হাতার মধ্যে। আমাদের দেখে ওঁর মুখ কালো হয়ে গেল মনে হল।
বললেন, কী ব্যাপার? সারা রাত গাড়ি চালিয়ে আসছেন না কি কলকাতা থেকে?
মনে করুন তাই। ঢুকতে দেবেন তো? খিদে পেয়েছে খুব। নাস্তা করব।
ততক্ষণে কন্দর্পনারায়ণ নিজেকে সামলে নিয়েছেন। বললেন, বাহাদুর গেট খোলো। বলেই আমাদের পাইলট করে নিয়ে চললেন। ভিলার সামনে যেখানে ভোরের রোদ এসে লুটিয়ে পড়েছে সেখানে সাদারঙা বেতের চেয়ার ও গোল টেবিল পাতা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। কন্দর্পনারায়ণ একজন খিতমদগারকে বললেন, চায়ে লাও, আর নাস্তা বানানে বোলো পাঁড়েজিকো।
গাড়ি পার্ক করে আমরা এসে চেয়ারে বসলাম। উনিও বসলেন। তারপর বললেন, এই গেলেন আবার না বলেকয়ে ফিরে এলেন, ব্যাপারটা কী? অ্যাই কওন হ্যায়? গাড়িসে সব সামান উতারো।
ঋজুদা বলল, না না, আমরা নাস্তা করেই চলে যাব। থাকব না। হাজারিবাগ শহর হয়ে রাঁচি যাব বাঘড়া মোড় হয়ে।
কেন? রামগড় হয়ে না কেন?
যা ট্রাফিক থাকে ওই রাস্তাতে। ঘোরা পথ হলেও সময় কম লাগবে।
কন্দর্পনারায়ণ এবারে যেন একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। বললেন, বাত ক্যেয়া হ্যায় ঋজুবাবু? মার্ডারার কি পতা মিলা কি?
কাছাকাছি এসেছি কন্দর্পবাবু। আপনি এত করে অনুরোধ করলেন, আর এত গোয়েন্দা থাকতে করলেন আমাকেই! আমাকেই যে কেন করলেন তা নিয়েও ভেবেছি।
ভেবে কী বের করলেন?
এখনও পারিনি।
বলেই বলল, মি. শর্মাকে একবার ডাকবেন? আর মুনতাজার কি আছে এখন বস্তিতে? থাকলে, তাকেও একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতাম।
মুনতাজার ছিল কিন্তু গতকালই বম্বে মেইল ভায়া ইলাহাবাদ ধরে মুম্বাই চলে গেছে।
কোন স্টেশান থেকে ধরল ট্রেন?
কেন? কোডারমা।
তারপরে বললেন, আপনার সন্দেহ আছে নাকি?
না। আমার ইনফরমেশান, ও গয়া থেকে ট্রেন ধরেছে।
তাই? সে কি? কে আপনাকে বলল?
গোয়েন্দারা কি ইনফরমারের আইডেনটিটিটা ডিসক্লোজ করে? কে বলেছে, তা বলব না।
তাজ্জব কি বাত।
অবাক হয়ে বললেন কন্দর্পনারায়ণ। তারপর বললেন, মি. শর্মার সঙ্গে কী কাজ পড়ল?
তিনি এলেই জানবেন। আপনার আড়ালে বলার মতো কোনও কথা নেই।
কন্দর্পনারায়ণ ভিতরে খবর পাঠালেন মি. শর্মাকে ডাকতে।
ঋজুদা বলল, ভদ্রলোক কি খুব ওয়েল-অফ? কিন্তু এতই যদি ভাল অবস্থা হবে তাহলে এই জঙ্গলে কিচেন ম্যানেজারি করছেন কেন?
ভাল অবস্থা নয় তবে জঙ্গল খুব ভালবাসে। কে কী করে, কেন করে তা কি এত স্বল্প পরিচয়ে জানা যায় ঋজুবাবু।
ভাল অবস্থা না হলে বিদেশে কেউ বেড়াতে যেতে পারেন?
ও। আপনি তাও জানেন দেখছি।
ওঁর টিকিট কি আপনিই কেটে দিয়েছেন?
ওই! ইকনমি ক্লাস-এর টিকিট। স্টেটসে আমার এক বন্ধুর কাছে উঠবে তারপর সে-ই একটু ঘুরিয়ে দেবে এদিক-ওদিক। গ্ৰেহাউন্ড-এ করেও যেতে পারে। তা ছাড়া বিজনেস অ্যাসোসিয়েটসও তো আছে কিছু আমার।
তা তো থাকবেই।
ধুতির ওপরে সবুজ-রঙা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর তার উপরে হলুদ-রঙা একটি আলোয়ান গায়ে দিয়ে পায়ে বাথরুম স্লিপার গলিয়ে মি. শর্মা এলেন। ওঁর স্যুট পরা চেহারাটাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম আমরা। তাই এই পোশাকে দেখে একটু অবাক হলাম।
শর্মাসাহেব বললেন, নমস্তেজি!
ঋজুদা বলল, নমস্তে নমস্তে। আসুন বসুন।
উনি বসতে চাইছিলেন না কিন্তু কন্দর্পনারায়ণের চোখের ইঙ্গিতে বসলেন।
ঋজুদা বললেন, রিসেন্ট কার্ড আছে আপনার কাছে?
কীসের কার্ড?
চমকে উঠে বললেন, মি. শর্মা।
শর্মাসাহেব যেমন অবাক হলেন প্রশ্নটা শুনে আমরা সকলেও কম অবাক হলাম না।
ঋজুদা বলল, টার্গেট কার্ড।
শর্মাসাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনি জানলেন কী করে।
আমাদের অনেক কিছু জানতে হয়।
তারপর বলল, এই জঙ্গল ছাড়াও, গুমিয়ার ইন্ডিয়ান এক্সপ্লোসিভস কোম্পানির শুটিং রেঞ্জেও কি প্র্যাকটিস করেন?
প্র্যাকটিস আর কী? ওঁদের ইয়ারলি চ্যাম্পিয়ানশিপের আগে একটু হাতটা ঠিক করে নিই। ওই।
তারপরে বললেন, গুমিয়ার রাইফেল ক্লাবের কথা জানলেন কী করে আপনি?
ওই ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ওই রেঞ্জে পিস্তলও ছুঁড়েছি বহুবার যদিও প্রতিযোগিতাতে অংশগ্রহণ করিনি। আপনাদের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট সুব্রত চ্যাটার্জি ছিলেন না?
তা বলতে পারব না। তখন আমি মুম্বাইতে কেটারিং পড়তে গিয়েছিলাম।
ও৷ তাহলে দেখান না শেষ কার্ড দুএকটা।
শর্মাসাহেব উঠে গেলেন মুখ গোঁজ করে।
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, তাজ্জব কি বাত।
ঋজুদা বলল, তাজ্জবের কী আছে? রাইফেলে মি. শর্মার হাত যে ভাল কি আপনি জানেন না? না জানলে, প্র্যাকটিসের জন্যে অত কাট্রিজ আপনি প্রতি বছর কলকাতার দোকান থেকে ওঠাতেন?
অন্য গুলির সঙ্গে ওঠাতাম। আমি অত জানব কী করে। শিকারও করি না শিকারের মাংসও খাই না। এরা যেমন যেমন চায় তেমন তেমন পাঠিয়েছি। তা ছাড়া পয়েন্ট টু-টু রাইফেলের গুলির দাম তো সবচেয়ে সস্তাও।
তা ঠিক।
শর্মাসাহেব দুটি কার্ড নিয়ে এলেন। ঋজুদা হাতে নিয়েই একটু উপরে তুলে বলল, চমৎকার। তারপর আমাকে দিয়ে বলল, দ্যাখ।
দেখলাম, বুলস আই-এর টাকার মতো কালো জায়গাটা একেবারে ফুটো হয়ে গেছে।
ঋজুদা বলল, আপনার তো ন্যাশনালে যাওয়া উচিত। এত ভাল পাঞ্চ করেছেন কার্ড। তাও স্পোর্টিং রাইফেল দিয়ে, ম্যাচ রাইফেল দিয়ে নয়।
না। ম্যাচ রাইফেল কোথায় পাব।
চমৎকার। কনগ্রাচুলেশানস মি. শর্মা।
তারপরই বলল, কন্দর্পনারায়ণের দিকে ফিরে, আমরা একটু রোদে পিকনিক করব। আপনাদের এখানে শতরঞ্জি হবে একটা? রাতেই ফেরত দিয়ে যাব। অথবা বিকেলেই। নিজেরা না আসতে পারলে পাঠিয়ে দেব কাউকে দিয়ে।
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, শতরঞ্জি কি হবে? কী শর্মা হবে কি?
শর্মাজি বললেন, একটিই আছে।
আনতে বলুন তাহলে।
জি হ্যাঁ।
শর্মা সাহেব চলে গেলে ঋজুদা বলল, কার্ড কখনও পাঞ্চ করেছিস?
না তো! আমি বললাম।
এই দ্যাখ, মধ্যের এটাকে বলে বুলস আই। তা তো জানিসই বোধহয়, লেম্যানরাও জানে। তারপরে যে সার্কেলটা, সেটার নাম ‘ইনার। তারও পরে যে বৃত্ত সেটার নাম ম্যাগপাই’ আর সবচেয়ে বাইরে যে বৃত্ত তার নাম আউটার। বুলস আই-তেই যে শর্মা সাহেবের গুলিগুলো লেগেছিল শুধু তাই-ইনয়, কোনও কোনও গুলি একটার ঘাড়ে আরেকটা পড়েছে, মানে, ফুটো দিয়ে গলে গেছে।
আমি দেখে সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম।
এই জঙ্গলে বসে কিচেন ম্যানেজারি করে রাইফেলের হাত এইরকম রাখা মস্ত বাহাদুরি বলতে হবে।
তিত্বর বটের বগারি মারেন হয়তো সালভর, যখন যা পাওয়া যায়–এমনি করেই হাত ঠিক রেখেছেন।
বললাম, গুমিয়ার সুব্রত চ্যাটার্জি মানে তোমার বন্ধু? সেই গোপালদা-সুব্রতদা-নাজিম সাহেব?
ইয়েস। সুব্রত ও গোপাল দুজনেই চলে গেছে। নাজিম সাহেব তো কবেই গেছেন।
শর্মাসাহেব ফিরে এলেন একজন খিতমদগারের হাতে শতরঞ্জি দিয়ে। দেখলাম সবুজ-রঙা একটি শতরঞ্জি, সেই পিপ্পলগাছের উপরের মাচার উপরে যেটা ছিল। ঋজুদার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল।
ঋজুদা বলল, বাঃ ফারস্ট ক্লাস। এখান থেকে যাওয়ার সময়ে গাড়িতে তুলে নিস রুদ্র।
কন্দর্পনারায়ণের মুখ ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠেছিল।
উনি শর্মাসাহেবকে বললেন, আপনি গিয়ে নাস্তা লাগানোর বন্দোবস্ত করুন তাড়াতাড়ি। উনি চাইছিলেন না যে শর্মাসাহেব আর বেশিক্ষণ আমাদের সামনে থাকুন।
ঋজুদা কন্দর্পনারায়ণকে বললেন, রহস্যটা সমাধান প্রায় করেই ফেলেছি। আপনার মেজভাই ভীষ্মনারায়ণকে আততায়ী রাইফেল দিয়ে গুলি করে মেরেছে। কিন্তু যে রাইফেল দিয়ে মেরেছে সেটা পয়েন্ট থ্রি ফিফটিন–ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স এর।
আমি অবাক হয়ে ঋজুদার মুখে চেয়ে রইলাম।
তারপরই বলল, আপনার কি কারওকে সন্দেহ হয়?
চমকে উঠে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, আমার?
তারপরই সামলে নিয়ে বললেন থ্রি ফিফটিন রাইফেল দিয়ে কেউ গুলি করে থাকলে একজনকেই সন্দেহ হতে পারে।
কে সে?
মুনতাজার আলি। তাকে আমি থ্রি ফিফটিন রাইফেল কিনে দিই একটা। সেই রাইফেল দিয়ে সে যে আমার ভায়েরই রক্তপাত ঘটাবে তা জানব কী করে। আপনি রাইফেলের বোরের কথা না বললে তো আমি বুঝতেই পারতাম না। বড় বিচিত্র এ সংসার। মুনতাজারকে এ বাড়ির কেউই দেখতে পারে না। আমিই শিশুকাল থেকে প্রশ্রয় দিয়ে এই দৈত্য বানিয়েছি। নানারকম মাস্তানির জন্যে মানুষে আমাকে দোষ দেয় এখন যদি তাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে ভীষ্মনারায়ণের মার্ডারের চার্জে, লোকে এবং আমার পরিবারের মানুষেরাই বা কী ভাববে?
কী আর ভাববে। ভাববে আপনিই তাকে ভীষ্মনারায়ণকে মারতে প্ররোচিত করেছেন।
ভাববে কি না বলুন!
মুখে উনি এ কথা বললেন বটে ওঁকে একটুক্ষণ আগের তুলনাতে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। হাঁক ছাড়লেন হঠাৎ জোরে, আরে নাস্তাকা ক্যা হুয়ারে। আরে-রে রামখিলাওন।
ভিতর থেকে পড়েজি চিৎকার করে বলল, বন গ্যয়া হুজৌর। ঔর স্রিফ পাঁচ মিনট।
পড়েজির নামই কি রামখিলাওন পড়ে? বোঝা গেল না ঠিক। তবে গলার স্বরটা অবশ্য তেমনই মনে হল।
ভাল করে নাস্তা করার পরে কন্দর্পনারায়ণের কাছে বিদায় দিয়ে আমরা বেরোলাম। ঋজুদা বলল, শতরঞ্জিটা নিয়ে চল। আমি শতরঞ্জিটাকে Scorpion এর পেছনে তুলে নিলাম।
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, কলকাতাতে কবে দেখা করব আপনার সঙ্গে?
আপনি কবে ফিরবেন? যেদিন ফিরবেন সেদিনই বিকেলে ফোন করবেন একটা। কবে ফিরবেন?
কথা তো আছে পরশু।
ঠিক আছে। আপনার সময়মতো আসুন। ততদিনে বোধহয় ফ্যায়সালা একটা হবে। মুনতাজারের বিরুদ্ধে কেসটা তৈরি করতে মানে চার্জ ফ্রেম করতে আপনার অনেক সাহায্যর দরকার হবে।
ঠিক আছে।
ফাগুয়ারা ভিলার বাইরে বেরিয়ে আমি বললাম, সেই পিপ্পলগাছের কাছে যাব কি?
আমিই চালাচ্ছিলাম গাড়ি।
না তার দরকার নেই। শতরঞ্জিটাতেই আমাদের কাজ চলে যাবে। পুলিশের স্নিফার ডগকে শতরঞ্জির গন্ধ ভাল করে শুকিয়ে দিলে তারাই শর্মাকে ধরবে ফাগুয়ারা ভিলাতে তাদের নিয়ে এলে। বাকিটা ফরেনসিক এক্সপার্টরা করবেন।
এবারে কোন দিকে যাব?
পিতিজ বাংলোতে। একবার চেক করে নে কিছু ফেলে গেলাম কিনা। তোয়ালে দুটো টগর গাছের উপরে মেলে দেওয়া আছে সে দুটোকে তুলে নিতে হবে।
তারপর?
তারপর কোতোয়ালিতে গিয়ে শতরঞ্জিটা জিম্মা দিতে হবে এবং এস. পি-র সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তারপর?
তারপর টুটিলাওয়া সীমারিয়া বাঘড়া মোড় হয়ে চান্দোয়া টোরি হয়ে কুরু হয়ে বিজুপাড়া হয়ে রাঁচি। কোতোয়ালি থেকে বেরিয়ে বীরুকে একটা ফোন করতে হবে।
আমি পিতিজ বাংলোতে গিয়ে তোয়ালে দুটো গাড়ির পেছনে তুলে নিলাম। শুকিয়ে গেছিল ততক্ষণে। চৌকিদার ও তার চেলাকে বকশিস দিয়ে গাড়িতে উঠলাম।
ঋজুদা বলল, দুজনকেই দিয়েছিস তো?
হ্যাঁ।
বড় পাত্তি।
হ্যাঁ।
কোন বড় পাত্তি?
পাঁচের।
ঠিক হ্যাঁ।
এই বকশিসের ব্যাপারে ঋজুদার মতো উদার-হস্ত খুব কম মানুষকেই জানি। ঋজুদা বলে, গরিব দেশ আমাদের-স্যোশালিস্ট হবার এমন সহজ পথ আর নেই। Always from the Haves to the Have nots! আমাদের দেশের সাধারণ মানুষেরা এত ভাল যে, সোনা দিয়ে এদের ওজন করলেও তুল্যমূল্য হয় না।
চৌকিদারদের সেলাম আর থামে না। এ জীবনে এক রাত থাকা বাবু অন্য কেউ পাঁচশো টাকার পদ্মফুলের রঙের নোট আর কখনও দিয়েছেন বা দেবেন এমন আশা ওরা কখনওই করেনি।
গাড়িটা হাজারিবাগমুখো করে বললাম, ঋজুদা এবার summing-up করো। আর প্রতীক্ষা সহ্য হয় না। আমিই তোমার সবচেয়ে পুরনো সাগরেদ–তাই সিনিয়রিটি বিচার করলেও আমাকেই সবচেয়ে আগে কনফিডেন্সে নেওয়া উচিত।
ঋজুদা বলল, দাঁড়া! পাইপটা ভাল করে ধরিয়ে নি।
তা ধরাও কিন্তু জানালা খুলো না। বড় ঠান্ডা হাওয়াটা।
তুই প্যাসিভ স্মোকিং করবি?
তা না হয় একটু করলামই। তোমার গোল্ডব্লক টোব্যাকোর গন্ধটা আমার ভারী ভাল লাগে।
পাইপটা ধরিয়ে ভাল করে এক টান লাগিয়ে ঋজুদা বলল, কী জানতে চাস বল?
মাচাতে থ্রি-ফিফটিন রাইফেলের গুলি পাওয়া যাওয়া সত্ত্বেও শর্মাসাহেবই পয়েন্ট টু-টু দিয়ে ভীষ্মনারায়ণকে মেরেছেন এমন তুমি ভাবলে কেন?
কন্দর্পনারায়ণের চাল ওটা। উনি এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু করতে গিয়ে ওভার কনফিডেন্ট হয়ে গেছিলেন যে জন্যে এই বিভ্রাট। উনি নিশ্চয়ই মুনতাজারের কাছ থেকে থ্রি ফিফটিন-এর এম্পটি কাট্রিজ চেয়ে নিয়েছিলেন একটি বা একাধিক। শর্মাও চাইতে পারে কন্দর্পনারায়ণের নির্দেশে।
কী বলে চাইলেন?
–সে কত কিছু বলে চাওয়া যায়। বাচ্চারা খেলবে বা তাবিজ বা মাদুলি বানাবেন। তা ছাড়া, যিনি রাইফেলটাই প্রেজেন্ট করেছেন এবং গুলিও সাপ্লাই করেন তিনি চাইলে না দেওয়ার কী আছে?
কিন্তু আমিই ভেবে দেখলাম অত দূর থেকে থ্রি ফিফটিন রাইফেল দিয়ে অমন স্নাইপিং করা প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া টেলিফোটো লেন্স তো ছিল না।
ছিল না যে তা তুমি জানলে কী করে?
বলতে পারিস, আন্দাজেই কিছু হ্যাঁজার্ডাস গেসস তো করতে হয়ই। পরে অবশ্য ভটচার্যি সাহেব পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক টেস্টের রিপোর্ট-এ পয়েন্ট টু-টু রাইফেলের ব্যাপারটা কনফার্ম করলেন। বুলেট দেখেই ওরা জানতে পেরেছিলেন।
বলেই বলল, কন্দর্প, এই ডাইভার্সনটা মানে, ফোকরে শর্মাকে দিয়ে থ্রি ফিফটিনের এম্পটি শেল নিয়ে রাখাটা মারাত্মক চাল চেলেছিল। যে কোনও গোয়েন্দা এই গাড্ডায় পড়লে আর উঠতে পারত না। তুই যেমন পড়েছিলি! ভটকাইও। তিতির কিন্তু পড়েনি। মেয়েটা প্রচণ্ড ইন্টেলিজেন্ট যে এ কথা তোকে স্বীকার করতেই হবে।
সে কথা কি কখনও অস্বীকার করেছি? সব দিক দিয়েই ও আমাদের মধ্যে বেস্ট।
আমার বন্ধু জনসন সাহেব একটা কথা বলতেন।
কী কথা?
একটা কম্যুনিটি যখন ডুবে যেতে বসে তখন দেখা যায় মেয়েরা সব দিকে ভাল হয়ে উঠে আসছে আর ছেলেরা তলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাঙালি সমাজেও এখন তেমনই ঘটছে। আজকে বাঙালি মেয়েরা ছেলেদের দশ গোল দিয়ে যাচ্ছে জীবনের সমস্ত পরীক্ষাতে।
আমি চুপ করে রইলাম। মিনমিন করে বললাম, তা ঠিক।
শুধু ঠিকই নয়, বল, বিলকুল ঠিক।
বিলকুল ঠিক।
তারপর বললাম, কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ তো জানতেনই যে থ্রি ফিফটিন রাইফেলের গুলি পেলে মুনতাজারকেই ফাসাবে পুলিশ।
জানতেনই তো। শুধু তাই-ই নয়, পুলিশ তো ওই কর্মটাই করত যদি না তুই এম্পটি শেলটা পকেটস্থ করতিস। কোতোয়ালিতে মোটা মোটা খামও দিয়ে রেখেছিল কন্দর্প ঘটনা ঘটার আগেই, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। সে ভেবেছিল, আমার কানেকশানস সে তার অ্যাডভান্টেজেই লাগাবে কিন্তু তা যে তার বিপক্ষে চলে যাবে তা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। আমরা কলকাতা থেকে ট্রেনে চড়বার দুদিন আগেই মার্ডারটা হয়েছিল এবং ফাগুয়ারা ভিলাতে এসে পুলিশ সুপারফিশ্যাল এনকোয়ারি করে চলেও গিয়েছিল। কিন্তু মেজভাই-এর মৃত্যুতে বড়র নির্বিকার থাকাটা ভাল দেখায় না বলেই কন্দর্পনারায়ণ লোক দেখানোর জন্যে গোয়েন্দা লাগানোর কথা ভেবেছিল।
শার্দুলনারায়ণকে জেরা করে জেরবার করেছিল নিশ্চয়ই। বেচারা মিশিরজিকেও রেয়াত করেনি।
কে?
পুলিশ।
তা তো হবেই। জেরবার তো চিরদিন নিরপরাধীরাই হয়।
মুনতাজারকে ফাঁসিয়ে লাভ কী হত কন্দর্পনারায়ণ-এর।
আমি বললাম।
মুনতাজার দৈত্যকে আর বোতলে ফেরাতে পারছিল না কন্দর্পনারায়ণ। মুনতাজার এবং রোজি মিলে কন্দর্পনারায়ণকে রীতিমতো নিংড়ে নিচ্ছিল। কন্দর্পনারায়ণ কলকাতাতে একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনে সেখানে টিভি সিরিয়ালের এক নায়িকাকে রেখেছে বছর দুই হল। মুনতাজার তা জানতে পেরে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করছিল কন্দর্পনারায়ণকে। এমনকী সেই মেয়েটিকেও টেররাইজ করছিল।
তুমি জানলে কী করে।
এসব তথ্য রায়পুরে কন্দর্পনারায়ণের পরিবারের নানা মানুষ ও পরিচিতদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা। তথ্যে ভুল নেই কোনও।
এই না তুমি বললে, মেয়েরা উঠে আসছে আর ছেলেরা তলিয়ে যাচ্ছে। টিভি সিরিয়ালের মেয়েটির বেলাতে কী হল?
ঠিকই বলেছি। যারাই উঠে আসে তারাই জানে উঠে আসার কত রকম হ্যাঁপা। একটি মেয়েকে দেখে তুই বিচার করতে পারিস না। একসেপশান প্রভস দ্য রুল। এক-এক পেশার এক এক রকম। দোষ দেওয়া উচিত নয়।
তারপর।
তাই শর্মাকে দিয়ে ভীষ্মনারায়ণকে মারিয়ে সেই হত্যার দায় মুনতাজারের উপরে চাপিয়ে দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল। এবং সেই চেষ্টাতে প্রায় সফল হয়েও এসেছিল।
কিন্তু কন্দর্পকে পুলিশ ছোঁবে কী করে? তার তো এই হত্যাতে কোনও ইনভলভমেন্ট নেই।
নেই কী রে! অ্যাবেটমেন্টের দায়ে পড়বে না। শর্মাকে স্পেইনে বেরিয়ে আসার খরচ সে দেবে কেন? যৌথ মালিকানার পারিবারিক অবসর বিনোদনের ফাগুয়ারা ভিলা-র কিচেন ম্যানেজার তার এত প্রিয় হবে কেন?
স্টেটস নয়?
না স্টেটস নয়, স্পেইন।
আচ্ছা, মি. শর্মা কেন এমন কাজ করতে গেলেন?
অলিম্পিক দেখতে যাবে বলে–তাও ওর যাতে ইন্টারেস্ট–তাই দেখতে।
দেখতেই যাচ্ছে শুধু, রাইফেল, পিস্তল ও স্কিট আর ট্রাপ গান-শুটিং। এবারে অলিম্পিক কোথায় হচ্ছে?
স্পেইনের বার্সিলোনাতে। বার্সিলোনাতে সে যাচ্ছে, তার টিকিটও কাটা হয়ে গেছে। স্টেটসে যাচ্ছে এ খবর ভুল। মিথ্যে করে বানানো। রাইফেল শুটিং শর্মার নেশা। নেশার জন্যে মানুষ কত অন্যায় কাজই না করে। অলিম্পিক দেখার সুযোগ ছাড়াও থোক ক্যাশ টাকাও নিশ্চয়ই পেয়েছে অথবা পাবে। শর্মা ব্যাচেলর। এই তার নেশা। নেশা তো নয়, নাশা।
শর্মা যে অলিম্পিক দেখতে যাচ্ছে তা জানলে কী করে তুমি!
ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে ক্রস ভেরিফাই করিয়েছি কলকাতার সি. বি. আই.-কে দিয়ে। ফোন করেছিলাম ইস্টার্ন জোনের ডিরেক্টরকে। কন্দর্পনারায়ণ কয়েকটা মস্ত ট্যাকটিকাল ভুল করেছিল। তার মধ্যে একটি তার নিজের কোম্পানির ট্রাভেল এজেন্টকে দিয়ে মি. শর্মার ট্রাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট করানো। টিকিট, প্যাসেজ মানি, ক্যাশও দেওয়া হয়েছে। হোটেলের রিজার্ভেশানও করেছে তারই এজেন্ট। তারপর ফেরার পথে ব্যাংককও হয়ে আসবে শর্মা তিনদিনের জন্যে। এসব ভেরিফাই করে তারপরই আজ শর্মার সামনে এসেছি। তা ছাড়া সীতা ট্রাভেল এজেন্সির মিসেস হানসা প্যাটেলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলাম। তার স্বামী নিরঞ্জনকে আমি বহুদিন হল চিনি।
বাবাঃ। এত তুমি করলে কখন?
মোবাইল ফোনের যুগে শুভ কর্ম বা অপকর্ম কিছু করতেই সময় লাগে না। যেমন কন্দর্পনারায়ণ যদি মোবাইলে তার চেলাদের বা মুনতাজারকেও বলে দেয় যে আমাদের হাজারিবাগের পথেই ওয়েলেইড করতে–মোটর সাইকেলে করে দুটো ছোঁড়া অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে পথেই আমাদের মেরে রেখে যেতে পারে।
তা অবশ্য ঠিক। এখন এ. কে. ফর্টিসেভেন নেই কার কাছে! আমরা তো আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি।
আমার গাড়ির কাচ অবশ্য বুলেট প্রুফ। মর্টার ছাড়া রাইফেলে সুবিধা কিছু করতে পারবে না।
সত্যি! এই ইনফরমেশন টেকনোলজির রমরমাতে ভাল যেমন হয়েছে খারাপও কম হয়নি। কী বলে?
আমি বললাম, ঋজুদাকে।
খারাপটাই বেশি হয়েছে ও হবে। যত দিন যাবে, ততই বোঝা যাবে।
এবারে বলল, ভীষ্মনারায়ণকে খুন করবার পেছনে কন্দর্পনারায়ণের মোটিভ কী?
আমি বললাম ঋজুদাকে। এটা আমার মাথাতেই আসছে না।
এক কথাতে বলব?
বলো।
ঈর্ষা।
বলো কি? গুণী মানী ছোটভায়ের উপরে দাদার ঈর্ষা এরকম চেহারাও নিতে পারে।
দেখলিই তো যে নিয়েছে। এত টাকার মালিক হয়েও মেজভাইয়ের পৃথিবীব্যাপী যশ ও সম্মান, আত্মীয়স্বজনের কাছে সমাদর, টিভি এবং নানা মিডিয়াতে লাগাতার এক্সপোজার এসবে পাগলা কুকুরের মতো ক্ষিপ্ত অবস্থা হয়েছিল কন্দর্পনারায়ণের। সংসারে আজকাল টাকা থাকলেই মান পাওয়া যায়। কিন্তু সেই মানের একটা সীমা আছে–একটা বিশেষ উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছানো যায় টাকা নিয়ে। কিন্তু তারপর টাকার কোনও দামই থাকে না।
ভীষ্মনারায়ণ কিন্তু এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। দাদাকে বিশেষ শ্রদ্ধা-ভক্তিও করতেন, দাদা বলেই, তার দোষগুণ বিচার না করেই পায়ে হাত দিয়ে হোলি ও দিওয়ালিতে প্রণাম করতেন। তিনি যে বিশেষ মানী মানুষ এ সম্বন্ধে তিনি সচেতন ছিলেন না আদৌ এবং এ কারণে তার আত্মীয়স্বজন চেনাপরিচিতিরা তাকে আরও শ্রদ্ধা করতেন। আর এসবই অসহ্য লাগত কন্দর্পনারায়ণের। তিনি বড়ভাই হওয়া সত্ত্বেও আত্মীয়রা, এমনকি নিজের অন্য ভায়েরাও ভীষ্মনারায়ণের কাছেই উপদেশ আদেশের জন্যে আসতেন।
আমি বললাম, ভাবা যায় না। ঈর্ষা মানুষকে এত নীচে নামাতে পারে?
পারে বইকী। ঈর্ষা তো ছয় রিপুর এক রিপু।
তাই?
নয়? মাৎসর্য। মাৎসর্য তো ঈর্ষারই এক নাম। মাৎসর্য হচ্ছে পরগুণদ্বেষ।
মাইকেলের ভাষায় ‘বিষদশন’।
আচ্ছা ঋজুদা, তুমি যে এই অ্যাডভেঞ্চার বা গোয়েন্দাগিরি করো এবং আমাদেরও তোমার সাগরেদ করো এতে কি তুমি আনন্দ পাও?
কেন? তোরা পাস না?
আমরা পাই, কিন্তু মনে হয়, মানে না বুঝে পাই। মানে, তাৎপর্য না বুঝে।
ঋজুদা হেসে ফেলল আমার কথা শুনে।
তারপর বলল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই যে আমাদের সামান্য প্রচেষ্টা–এর দামও তো বড় কম নয়। জোসেফ ম্যাটসিনির সেই কথা আছে না? যখন তুমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করবে, তখনই তুমি কর্তব্যভ্রষ্ট হবে। উপনিষদের ঋষি বলেছেন, মমুরসি মন্যং ময়ি ধেহি।
তারপর বলল, অত দূরে যাবার দরকার কী আমাদের, হাতের কাছে রবীন্দ্রনাথ থাকতে?
..ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা
তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গসম
তোমার ইঙ্গিতে। যেন রাখি তব মান
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজ স্থান।
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে।
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। —‘নৈবেদ্য’-র কবিতা।
তারপর বলল, রবীন্দ্রনাথ পড় ভাল করে রুদ্র তোরা রবীন্দ্রনাথ পড়।
অনেকেই যে আজকাল বলছে শুনি, রবীন্দ্রনাথ ফালতু, রবীন্দ্রসংগীত অশ্রাব্য।
বলছে বুঝি? তা বলুক। এরা সব ‘আবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চড়ে। জীবনানন্দের লাইন মনে পড়ে গেল।
তারপরে একটু চুপ করে থেকে বলল, বুঝলি রুদ্র, জ্ঞানের সীমা চিরদিনই ছিল কিন্তু অজ্ঞতার সীমা কোনওদিনই ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ছায়ায় থাক, জীবনে তরে যাবি।
