ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ

খুব ভোরে এক কাপ চা খেয়েই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। দারুণ ঠান্ডা। যদিও তেইশে জানুয়ারি ধারে কাছে নেই। নদীর জল থেকে ফ্রিজের দরজা খুললে যেমন ঠান্ডা ধোঁয়া বেরোয় তেমনই ধোঁয়া বেরোচ্ছে, যদিও জল খুবই কম গভীর।

নদীর বালির দিকে তাকাতে তাকাতে আমরা হেঁটে যাচ্ছি। যার চোখে যে জানোয়রের পদচিহ্ন পড়ছে, কথা না বলে অন্যদের তা আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে সে।

একটা মস্ত ভালুকের পায়ের দাগ দেখা গেল। যা আগের দিন দেখা যায়নি। তার আধ মাইলটাক যাবার পরে সেই কিম্ভুত জানোয়ারের পায়ের দাগও দেখা গেল। বেশ টাটকা দাগ। হয় রাতে গেছে, নয় কিছুক্ষণ আগে।

ঋজুদাকে তিতির আঙুল দিয়ে দেখাল দাগটা। ঋজুদা মনোযোগ সহকারে দেখল। তারপর সেই দাগ অনুসরণ করে এগিয়ে চলল। দাগটা গিয়ে নদীর উলটোদিকে একটা মস্ত বড় পিপ্পল গাছের নীচে থেমেছে। সেখানে জানোয়ারটা ঘুরেছে-ফিরেছে, অনেকক্ষণ ছিল হয়তো ওই একই জায়গাতে। এবং সেখানেই, যাকে আমরা হাতির পুরীষ বলে ভেবেছিলাম, তেমন পুরীষও পড়ে আছে। বেশ টাটকাই।

ঋজুদা সেই গাছতলাতে ঘুরে-ফিরে আমাকে বলল, জুতোজোড়া খুলে ফ্যাল তো!

এই ঠান্ডায় খালি-পা হব? কী করব?

জুতো খুলে এই গাছটাতে ওঠ। যা বলছি, তাই কর। উপরে উঠে দ্যাখ তো ফাগুয়ারা ভিলার পেছনের দোতলার খোলা বারান্দাটা দেখা যায় কি না! যদি দেখা যায়, তবে ভীষ্ম নারায়ণ যে জায়গাতে চেয়ারে বসে বই পড়ছিলেন বলে আমাদের বলা হয়েছে বারান্দার সেই জায়গাটা দেখা যায় কি না?

ঋজুদার কথামতো জুতো খুলে ফেললাম আমি। মোজাজোড়াও খুললাম। খালি পায়ে গাছে চড়তে সুবিধা হবে। তারপর আস্তে আস্তে পিপ্পলগাছটার ওপরে উঠতে লাগলাম। প্রায় পঁচিশ ফিট উঠেছি এমন সময়ে আমার চোখ পড়ল একটা মাচা। তার উপরে গাঢ় সবুজ-রঙা একটা শতরঞ্জি পাতা। দুটো শুকনো কমলালেবু রাখা আছে শতরঞ্জির উপরে আর কিছু শুকনো মেওয়া।

অবাক হয়ে সাবধানে আমি মাচার উপরে উঠে বসলাম। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি, মাচার সামনেটার ডালপালা কিছুটা পরিষ্কার করে হাঁটা। মাচাতে বসে ফাগুয়ারা ভিলার পেছনের বারান্দাটা দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। As a crow flies–হয়তো একশো গজও হবে না। মনে হল। আসলে, বারান্দাটা সেখান থেকে শ’ দুয়েক গজ দূরে হবে।

আমি উত্তেজনাতে হাঁফাচ্ছিলাম। নীচে কেউ কোনও কথা বলছিল না। আমাকে নীচ থেকে দেখাও যাচ্ছিল না।

মাচার উপরে ওই পিপ্পলগাছেরই ডাল কেটে বানানো একটা tripod দেখলাম। যেটার উপরে রাইফেলের ব্যারেল রেখে নির্ভুল নিশানা নিয়ে রাইফেল ছোঁড়া যায়। তার মানে, এইখানে বসেই ভীষ্মনারায়ণকে পরপর তিনটি গুলি ছুঁড়ে, খুন করেছে আততায়ী। মাচার ডানদিকে একটা ফোকর ছিল দুটি ডালের মাঝে। সেখানে কী একটা চকচকে জিনিস চোখে পড়ল। তুলে দেখি, রাইফেলের একটি খালি কার্তুজ। সেটিকে পকেটে চালান করে দিলাম। তারপরে তাড়াতাড়ি নেমে এলাম গাছ থেকে। আমার বুক ধুকপুক করছিল। যদি সেই আততায়ী ফিরে আসে এক্ষুনি–তখন কী হবে? আমরা তো প্রায় নিরস্ত্রই।

কোমর থেকে পিস্তলটা খুলে হাতে নিলাম মাটিতে নেমেই।

ঋজুদা যেন জানেই আমি কী দেখেছি উপরে এমন ভাবে বলল, কী দেখলি?

তুমি যা ভেবেছিলে।

তাই?

বলেই ঋজুদা একটু ভাবিত মুখে উপরে তাকাল। বললাম, মক্কেল ফিরে আসবে আবার। একজোড়া কমলালেবু, মুঠিভর শুকনো মেওয়া, এসব রাখা আছে। মাচার উপরে শতরঞ্জিতে।

তার মানে, আরও কারওকে মারবে।

তিতির বলল।

তুই কী করে বুঝলি?

ঋজুদা বলল।

তাই তো মনে হচ্ছে। এটা আমাদের ধোঁকা দেওয়ার জন্যেও করা হয়ে থাকতে পারে। দেখাবার জন্যে যে সে মাচাতে বসে জানোয়ার শিকার করতেই এসেছিল। কমলালেবু আর মেওয়াটা সেটা প্রমাণ করার জন্যেই রাখা ছিল। ভীষ্মনারায়ণ তো আর দু-একদিন আগে খুন হননি!

ঋজুদা বলল।

তিতির বলল, ঠিক।

তারপর বলল, চল এবার চটপট কেটে পড়ি এখান থেকে। জুতোজোড়া পরে নে রুদ্র। যেই আসুক, সে গাছের নীচে বালির উপরে আমাদের এত জনের জুতোর ছাপ অবশ্যই দেখতে পাবে। এবং আমরা যে তার হাইড-আউট ইনসপেক্ট করতেই এসেছিলাম তাও বুঝতে পারবে।

তিতির বলল, হু।

তারপর, ফিসফিস করে বলল, লেটস ক্লিয়ার দ্য এরিয়া।

আমরা যেদিক দিয়ে এসেছিলাম তার উলটোদিকে এবং নদীর অন্য পাড় দিয়ে। ফেরার পথ ধরলাম সিংগল ফরমেশানে।

তিতির বলল, সব তো বোঝা গেল কিন্তু ওই জানোয়ারটা কী?

কোন জানোয়ারটা?

ঋজুদা বলল।

ওই যে! মিস্টার কিম্ভত, যার পুরীষ দেখলাম, পায়ের দাগ।

ভটকাই বলল।

ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, ইয়েতি।

তিতির রেগে গিয়ে বলল, বলো না ঋজুকাকা?

আমরাও একটু অবাক হলাম।

ঋজুদা বলল, ঘোড়া, যার নাম অশ্ব। তবে রেসের ঘোড়া নয়, বড় ঘোড়া নয়। টাটু ঘোড়া। প্রায় অশ্বেতরের কাছাকাছি। বিভিন্ন প্রদেশের গাঁয়ের হাটে দেখিসনি? দিশি ঘোড়া। কত দেখেছিস আর তার পায়ের দাগ চিনতে পারলি না?

আমরা কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম জংলি জানোয়ারের পায়ের দাগের মধ্যে ও দাগ দেখে।

তার মানে, যে আগন্তুক এই পিপ্পলগাছে বসে ভীষ্মনারায়ণ সিংকে গুলি মারে সে তো ঘোড়া করেই যাতায়াত করে।

ভটকাই বলল।

বুদ্ধি খুলেছে তাহলে।

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, তাই তো করবে। হেঁটে গেলে সময় নষ্ট হয় আবার জিপ বা মোটর সাইকেলে এলে আওয়াজ শোনা যায় এই নির্জন জায়গাতে দূর থেকে। তা ছাড়া, জিপ বা মোটর সাইকেল সব জায়গাতে যায় না কিন্তু ঘোড়া স্বচ্ছন্দেই যায়। খুনির বুদ্ধি আছে।

ভটকাই বলল, বোঝাই যখন গেছে তখন আর দেরি কেন? চলো মুনতাজারকে অ্যারেস্ট করে থানাতে দিয়ে আসি।

কেন? মুনতাজার কেন? সাক্ষী প্রমাণ কিছু আছে? এখানে ঘোড়সওয়ার কারা আছে তা বের করতে হবে। থানাতে নিয়ে যাওয়া অত সহজ নয়। তা ছাড়া কোন থানা?

বললাম, চৌপারন?

তিতির বলল, হান্টারগঞ্জ?

ভটকাই বলল, ঘাংড়ি?

ঋজুদা বলল, না, কোনওটাই নয়। এমনকি চাতরাও নয়। থানা বলতে হাজারিবাগ। একেবারে কোতেয়ালি বড় রাস্তাতেওচওকের কাছে।

বলেই বলল, কিন্তু থানায় গেলে কিছুই হবে না। তিতির ঠিক বলেছে। সাক্ষ্য প্রমাণ কী আছে আমাদের? শুধুই surmise! তা ছাড়া মুনতাজারই যে গুলি করেছে তারই বা কী প্রমাণ আছে আমাদের কাছে?

আমরা যখন এই সব কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি হঠাৎ চমকে উঠে দেখি, উলটোদিক থেকে তিনি আসছেন। তাঁর আগমন তো নয়, যেন আবির্ভাব।

সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে যেদিকে পারি উল্কার টুকরোর মতো ছিটকে গেলাম। তিনি এলেন এবং চলেও গেলেন। আমরা যে যার প্রাণ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বিরাট এক মদ্দা ভালুক। কুচকুচে কালো, বুকে সাদা ‘V’ চিহ্ন–যেন V for vic tory৷ রাইফেল বন্দুক কিছুই নেই সঙ্গে পিস্তল দিয়ে একে কবজা করা যেত না। তা ছাড়া, কবজা করবই বা কেন?

কেষ্টর এমন কেলে-কিস্টি মিষ্টি জীব। ঝগড়া তো আমাদের তার সঙ্গে নয়। তার রাজত্বে আমরাই বরং অবাচ্ছিত আগন্তুক। ঝগড়া সে করতেই পারত আমাদের সঙ্গে। কিন্তু করে তো নি।

নমঃ ভালুক নমঃ, ভালুক নমঃ, ভালুক নমঃ করতে করতে আমরা ফাগুয়ারা ভিলার দিকে ফিরে চললাম।

ভটকাই বলল, কোনও অ্যাডভেঞ্চারই হল না অথচ কীরকম খিদে পেয়ে গেছে, দেখেছিস?

আমি বললাম, হুঁ।

ঋজুদা বলল, মিশিরজি এবং শর্মাজিকে বলে দিস ভাল করে, ওঁদের মালিকেরা কেউই যেন কিছুদিন দোতলার খোলা বারান্দাটা ব্যবহার না করেন। রোদ পোয়াতে কি গল্প করতে হয়, তো সামনের বারান্দা এবং দেড়তলার ঢাকা বারান্দাই যেন ব্যবহার করেন। তবে ফার্নিচারের অ্যারেঞ্জমেন্ট যেমন আছে। তেমনই থাকবে যাতে মনে হয় এখুনি কেউ এসে বসবেন ও বারান্দাতে। ফার্নিচার কিছুমাত্র নড়বে না জায়গা থেকে। তারপরই বলল, আমরা পিপ্পলগাছে কী দেখেছি দেখেছি তা বলার দরকার নেই কারওকেই। না বলার কোনও কারণও নেই যদিও, তবু। ভটকাই বলল, বুঝেছি। কী বুঝেছে তা ভটকাই-ই জানে। আমি কিছুই বুঝলাম না। ঋজুদার মাথাতে কখন যে কী আসে তা ঋজুদা নিজেও কি বোঝে? ভটকাই বুঝবে কোত্থেকে।

ফাগুয়ারা ভিলা থেকে কোডারমা স্টেশনে আসার সময়ে ওদের ড্রাইভারের সামনে কোনও আলোচনাই করা হবে না যে একথা ঋজুদা বলেই দিয়েছিল। কে কার চর তা কে জানে!

ট্রেনে উঠে ঋজুদা বলল, পুরো ব্যাপারটা জট পাকিয়ে গেল।

তিতির বলল, কেন? মুনতাজারই তো মেরেছে মনে হচ্ছে ভীষ্মনারায়ণ সিংকে।

অত সহজেই বুঝলি। মুনতাজারই যে মেরেছে অন্য কেউ মারেনি সে সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হলি কী করে। দ্বিতীয়ত, ওর উদ্দেশ্য কী? জঙ্গুলে জায়গা। ও মারতে চাইলে তো পথে-ঘাটে যেখানে হয় মারতে পারত। অত কষ্ট করে পিপ্পলগাছে শিকারিদের মতো মাচা বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে এসে মারার হরক করতে যাবে কেন?

ভীষ্মনারায়ণ তো ইনট্রোভার্ট। উনি তো বাড়ি থেকে বেরোতেনই না, শুধুই পড়াশুনো করতেন। ওঁকে বাইরে পেলে তো মারবে!

ভটকাই বলল।

সেটা ঠিক। কিন্তু তাও যদি না হয়, তবে মাচাটা এখনও বাঁধা রয়েছে কেন? শতরঞ্জি বিছানো, কমলালেবু, মেওয়া, কেন? অন্য আর কাকে মারতে চায় সেই আততায়ী?

হয়তো ছোট রাজকুমার বা দিয়ারানিকে।

তারা তো এখানে নেই, আবার কবে আসবেন তারও ঠিক নেই।

এখানে তার আসার কথা আছে কি শিগগিরি? জিজ্ঞেস করেছিলি মিশিরজিকে।

ঋজুদা বলল, আমাকে।

হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বা ওঁরা আসছেন না তবে কন্দর্পনারায়ণের আসার কথা পরশু। উনি তো জানেন আমরা এখনও আছি ফাগুয়ারা ভিলাতেই।

তা উনি যা খুশি ভাবতে পারেন। লেট হিম ফাইন্ড ফর হিমসেলফ। আমি হাত ধুয়ে ফেলব। গাজোয়ারি করে কেস চাপানো ঘাড়ে! অত্যন্তই বিরক্ত হয়েছি। কন্দর্পনারায়ণের উপরে। লোকটা নিজেকে ভাবেটা কী? সেই অ্যালবিনো’ রহস্যর মুলিমালোয়ার রাজবাড়ির বিষেনদেও সিংদের মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল আর তারপর থেকে একটু একটু করে ঘাড়ে চড়েছে। একেবারে নাছোড়বান্দা। অমন গায়েপড়া, জোর করে সম্পর্ক করা মানুষদের আমি একেবারেই পছন্দ করি না। সত্যিই আমি বিরক্ত।

আমরা চুপ করে রইলাম।

কোডারমা থেকে যদি আমরা উলটোদিকে যেতাম তবে পরপর অনেকগুলো টানেল পড়ত পথে। টানেলের মধ্যে দিয়ে যখন ট্রেনটা যেত তখন কিছুক্ষণের জন্যে অন্ধকার হয়ে যেত রেলের কামরা দিনমানেও। তা তো নয়। আমরা যাচ্ছি ধানবাদের দিকে। এর আগে হাজারিবাগ রোড স্টেশনে, মানে, সারিয়া পেরিয়ে এলাম।

ঋজুদা বলল, মনে হচ্ছে, এই প্রথম হার হবে আমাদের। এ রহস্যর সমাধান আমাদের দ্বারা হবে না।

ভটকাই বলল, বললেই হল। তুমি মাঝপথে কেস ছেড়ে দিলে আমাদের বে-ইজ্জত হয়ে যাবে। আমরা হারিনি কখনও, হারব না। হারতে ভাল লাগে না।

তবে আর কী? যাকে খুশি তাকে আসামি বলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিবেকের কাছে ছুটি নিয়ে নে, পুলিশেরা যা করে।

তিতির রবীন্দ্রনাথের শ্যামা থেকে একটি কলি গেয়ে উঠল: চোর চাই। চোর চাই। যে করেই হোক। চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে।

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, যা বলেছিস।

তারপরেই ঋজুদাকে বললাম, তোমার বর্তমান মানসিক অবস্থাতে একটু আশার আলো দেখাতে পারি।

কীরকম?

অন্যমনস্ক ঋজুদা বলল।

আমি পকেট থেকে মাচার পাশের ফোকরের মধ্যে পাওয়া রাইফেলের কার্তুজের খালি খোলটা ঋজুদাকে দিলাম বের করে।

ঋজুদার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বলল, কোথায় পেলি।

বললাম। তারপর বললাম, একটা রাইফেল থেকে ইজেক্টেড হয়ে ফোকরের। মধ্যে গিয়ে পড়েছিল। একটা ফাঁকা খোলের হিসেব মিলছিল না বলেই বোধহয় খুনি মাচাতে আবার এসেছিল ওটারই খোঁজে। অথচ খুঁজে পায়নি।

ঋজুদা খোলটাকে নেড়ে-চেড়ে বলল, কী বোর-এর রাইফেলের এম্পটি কাট্রিজ হতে পারে এটা? রুদ্র?

আমি তো আগেই নেড়েচেড়ে দেখেছিলাম।

বললাম, থার্টি ও সিক্স? বুঝতে পারছি না।

উঃ হুঃ।

ঋজুদা বলল।

তারপর বলল, আমার মনে হয়, থ্রি ফিফটিন-এর। ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স কোম্পানি যে রাইফেল তৈরি করে–এবং গুলিও।

এখন বের করতে হবে মুনতাজারের কাছে থ্রি ফিফটিন রাইফেল ছিল কি?

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, ফাগুয়ারা ভিলাতে তো স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসসন-এর দোনলা বন্দুক আছে তোরা বললি। আর কী কী ওয়েপন আছে জানতে হবে। বলেই, মোবাইল ফোনটা অন করে বোতাম টিপল। কাকে করছ?

কন্দর্পনারায়ণকে।

ও।

লাইন লাগলে ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। একটা ইনফরমেশানের জন্যে ফোন করলাম।

-হ্যাঁ। অফ করে রেখেছিলাম। ফোন একটা বিরক্তিকর জিনিস।

হ্যাঁ। আমরা বেরিয়ে পড়েছি। কে বলল? মিশিরজি?

–হ্যাঁ। এ কেস আমার দ্বারা মীমাংসা হবে না। এসবের জন্যে মানসিক প্রস্তুতি, চিন্তাভাবনা লাগে। হুট করে বললেই তো হত্যা রহস্যর জট খোলা যায় না।

–হ্যাঁ। যা বলছিলাম। ফাগুয়ারা ভিলাতে কী কী ওয়েপনস আছে? সেগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা? কীসের জন্যে?

এবং তারপর ঋজুদা বেশ কিছুক্ষণ শুনল কন্দর্পনারায়ণবাবুর কথা। ওপাশ থেকে উনি কী বলেছিলেন তা তো আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম না।

আপনি তাহলে পরশু আসছেন এখানে। আমি ভেবেছিলাম আমরা ফিরে যাচ্ছি শুনে আপনি আর আসবেন না।

তারপরই মোবাইলটা অফ করে দিল ঋজুদা।

আমরা চুপ করে তিনজনই ঋজুদার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম।

ঋজুদা বলল, একটি ডাবল ব্যারেল বন্দুক, তোরা যেটা দেখেছিলি, একটা পয়েন্ট টু-টু, চেকোশ্লোভাকিয়ান রাইফেল আর একটি ফোর সেভেন্টি ডাবল ব্যারেল জেফরি রাইফেলবাঘ বা হাতির মোকাবিলার জন্যে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে থ্রি ফিফটিন নেই ফাগুয়ারা ভিলাতে।

ভটকাই বলল।

তিতির বলল, ফাগুয়ারা ভিলাতে খুনির রাইফেল থাকবেই বা কেন? মানে, থাকতে হবেই কেন?

ঋজুদা তিতিরের মুখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। মুখে কিছুই বলল না।

তারপর বলল, ফাগুয়ারা ভিলার ফোন নাম্বার তাদের কারও কাছে আছে?

আমার কাছে আছে। মিস্টার শর্মা কলকাতাতে আসবেন শিগগিরি। তাকে একটু খাতির করতে হবে। আমাদের এত খাতির যত্ন করলেন।

ভটকাই বলল।

ঋজুদা ভটকাইকে থামিয়ে বলল, লাইনটা লাগা। মিশিরজির সঙ্গে কথা বলব।

মিস্টার শর্মাই ফোনটা ধরলেন। ধরে ভটকাই-এর প্রশ্ন শুনে বললেন, মিশিরজি নেই। নেই, মানে পুজো করছেন।

ঋজুদা হাতঘড়ির দিকে চাইল একবার।

হাত দিয়ে ফোনটা আড়াল করে বললাম, আর কিছু বলব?

না ছেড়ে দে।

ঋজুদা বলল।

তারপর আমাকে বলল, ট্রেন থেকে নামবার আগে আবার ফোন করবি রুদ্র। মিশিরজিকে পেলে জিজ্ঞেস করবি ওঁর পুজো হয়ে গেছে? উনি কখন পুজো করেন সেই সময়টা জেনে নিবি। উনি এখন সত্যিই পুজো করছেন কী না আমাদের জানা দরকার।

কেন জানি না, এই শর্মা লোকটাকে আমার পছন্দ হয়নি।

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, তুই তো শর্মাকে বিয়ে করছিস না। পছন্দ হবার দরকারই বা কী?

আমরা হেসে উঠলাম। তিতির অপ্রতিভ হল।

ভটকাই বলল, মি. শর্মা চমৎকার মানুষ। অনেক বিষয়ে পড়াশুনো আছে।

কিচেন ম্যানেজার হলে কী হবে। ওয়াইডলি ট্রাভেলডও। আগামী মে মাসেই তো বাইরে যাচ্ছেন।

ঋজুদা একটু অবাক হয়ে বলল, শর্মা? বাইরে? কী করতে?

বেড়াতে।

তাই? বাঃ।

মিশিরজিকে মনে করে ফোনটা করিস রুদ্র। উনি থাকলে আমাকে দিবি।

তারপরে বলল, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।

যা বলেছ।

তিতির বলল।

গল্পে গল্পে এক সময়ে হাওড়াতে পৌঁছানো গেল। দশ মিনিটের মধ্যে ট্রেন ঢুকে যাবে প্ল্যাটফর্মে। হঠাৎ ফোন করার কথা মনে পড়ল। লাইনটা লাগাতেই মিশিরজিই ধরলেন। আমি ঋজুদাকে দিয়ে দিলাম ফোনটা।

ঋজুদা বলল, পুজো হয়ে গেল?

–ও। তাই।

বন্দুক রাইফেলের গুলি কলকাতার কোন দোকান থেকে কেনেন? আমার ভারী অসুবিধে হচ্ছে। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বারশিপের কোটাতে তুলতাম–একটা গোলমালে ঝামেলা হচ্ছে।

কী বললেন? ইস্ট ইন্ডিয়া আর্মস কোম্পানি? ১ নং চৌরঙ্গি? হ্যাঁ। হ্যাঁ। এ. বি. বাবু। চিনি তো। ওঁর সঙ্গে কি আজকের আলাপ?

–ও। কন্দর্পনারায়ণবাবুর লোকই গুলি তুলে পাঠিয়ে দেয়? ঠিক আছে।

–আপনাদের খুব জ্বালিয়ে এলাম।

–হ্যাঁ। হ্যাঁ। আসব আবার কখনও। নমস্তে নমস্তে…

ঋজুদা বলল, রুদ্র তুই সকালেই ইস্ট ইন্ডিয়া আর্মস-এ যাবি। এ. বি. বাবু একটু দেরি করে আসেন আজকাল। উনি না থাকলে ওঁর ছেলে চাদুর সঙ্গে দেখা করে বলবি যে আমার কাছ থেকে আসছিস–এই নে একটা কার্ড রাখ।

আমাকে তো চেনেন ওঁরা।

ও। তাই?

কী বলব?

জিজ্ঞেস করবি, কন্দর্পবাবুর লোক বছরে শটগান এবং দুটি রাইফেলের জন্যে কত গুলি তোলে? ভাল করে রেকর্ড দেখে আসবি? লাইসেন্স কার নামে আছে বন্দুক রাইফেলগুলোর? কন্দর্পনারায়ণের কি অন্য ওয়েপনও আছে? যদি থাকে, তাহলে সেগুলি কী কী?

নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে এবং অন্য কারণেও অনেকেই বন্দুক রাইফেল বন্দুকের দোকানেই রেখে দেন, প্রয়োজনের সময়ে তুলে নেন প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার দোকানে জিম্মা দিয়ে দেন। সমস্ত ইনফরমেশন কারেক্টলি টুকে আনবি। সন্ধেবেলাতে আমার বাড়িতে আসবি। ভুনি খিচুড়ি করতে বলব গদাধরকে। বহুদিন আমার ওখানে জমায়েত হয়নি। ছাতুর লিট্টি খেয়ে পেটের অবস্থা একেবারে শোচনীয়। ভটকাই কি আসবি?

নেমন্তন্ন না করলে যাই কী করে।

বাবা। খুব যে পায়াভারী হয়েছে দেখছি। আগে তো খিচুড়ির গন্ধ পেলেই দৌড়ে যেতিস।

আমি বললাম।

আগের ভটকাই তো আর নেই আমি। থিঙ্গস হ্যাভ চেঞ্জড।

আই সি।

ঋজুদা বলল, তিতিরও আসিস কিন্তু। কাল সন্ধেবেলা। ভুলে যাস না।

আসব।

তিতির বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *