আট
মাস দুই হ’ল চাকুরি পেয়েছি কলকাতায়। এ চাকুরি পাওয়ার জন্যেও আমি শৈলদির কাছে কৃতজ্ঞ। শৈলদির স্বামীর এক বন্ধুর যোগাযোগে এটা ঘটেচে। যাদের বাড়ি চাকরি করি, এরা বেশ বড় লোক।
বাড়ির কর্তা নীলাম্বর রায় হাওড়া জেলার কি একটা গ্রামের জমিদার এবং সেখানকার তাঁদেরই পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত এক মঠের বর্তমান মালিক–এদের মঠের অধীনে একটা ধর্মসম্প্রদায় গড়ে উঠেচে গত ষাট-সত্তর বছরে এবং এঁরাই সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম এই তিন জেলাতে এই সম্প্রদায়ের লোক যত বেশী, অন্য জেলাতে তত নয়। ওঁদের কাগজপত্র ও দেশের নায়েবের সঙ্গে ওঁদের যে চিঠিপত্র লেখালেখি হয়েছে–তা থেকেই আমি এ-সব সংবাদ জানতে পারলাম অল্পদিনের মধ্যেই। এঁদের প্রধান আয় বৈশাখ মাসে মঠবাড়ির মহোৎসব থেকে—-নানা অঞ্চল থেকে শিষ্যসেবকের দল জড়ো হয়ে সেই সময় বার্ষিক প্রণামী, পূজা, মানত শোধ দেয়–তা ছাড়া বিবাহ ও অন্নপ্রাশনের সময়ও মঠের গদিতে প্রত্যেক শিষ্যের কিছু প্রণামী পাঠিয়ে দেওয়া নিয়ম।
নীলাম্বরবাবুর তিন ছেলেই ঘোর শৌখিন ও উগ্র ধরনের শহুরে বাবু। বড় ছেলে অজয়বাবু এঞ্জিনিয়ারীং পড়েছিলেন কিন্তু পাস করেন নি–মেজ ছেলে নবীনবাবু এম-এ পাস, ছোট ছেলে অমরনাথ এখনও ছাত্র–প্রেসিডেন্সি কলেজে থার্ড-ইয়ারে পড়ে। অজয়বাবুর বয়স পঞ্চাশের কম নয়, কিন্তু পোশাক-পরিচ্ছদে কুড়ি বছরের ছোকরাও হার মানে তাঁর সৌখিনতার কাছে–নবীনবাবুর বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ, লম্বা, ফর্সা, সুপুরুষ– পেছনের ঘাড় একদম ক্ষুর দিয়ে সাদা বার-করা, চোখে চশমা–প্রায়ই পরনে সাহেবী পোশাক থাকে। বাঙালী পোষাক পরলে পরেন হাত-গিলে-করা মিহি আদ্দির পাঞ্জাবি ও কোঁচানো কাঁচি ধুতি, পায়ে কালো এ্যালবার্ট জুতো।
কর্তা নীলাম্বর রায়কে আমি বেশী দিন দেখিনি। তিনি তাঁর তাকিয়া বালিশ, গড়্গড়া, পিকদানী নিয়ে দোতলাতে থাকেন। কালেভদ্রে তাঁর কাছে আমার যাওয়া দরকার হয়। বড় ছেলে অজয়বাবুই কাজকর্ম দেখাশুনো করেন–তাঁর সঙ্গেই আমার পরিচয় বেশী।
অজয়বাবু লোক মন্দ নয়–কিন্তু নবীনবাবু ও অমরনাথের মুখে প্রথম দিনেই একটা উগ্র দাম্ভিকতার ছাপ লক্ষ্য করলুম। আমি এ ধরনের লোকের সংস্পর্শে জীবনে এ পর্যন্ত আসি নি–কি জানি আমার কোন ব্যবহারে এরা কি দোষ ধরে ফেলে–সেই চিন্তা আমায় সর্বদা সন্ত্রস্ত করে তুললে।
ওদের বাড়ি হরি ঘোষের স্ট্রীটে বাড়িটার পূর্ব দিকে একটা ছোট গলি–কিন্তু সেই দিকেই বাড়ির সদর। হরি ঘোষের স্ট্রীটের দিকটা রেলিং-বসানো লম্বা বারান্দা–বারান্দায় উঠবার সিঁড়ি নেই সেদিকে। রাস্তার ওপরের ছোট ঘরটাতে আমার থাকবার জায়গা নির্দিষ্ট হ’ল। এই ঘরে আমি যে একলা থাকি তা নয়, পাশাপাশি নীচু চার-পাঁচটা তক্তাপোশের ওপর ঢালা ফরাস পাতা, তার ওপর রাত্রে যে কত লোক শোয় তার হিসেব রাখা শক্ত। এদের এদেশের কাছারীর নায়েব কুঞ্জ বসু প্রায়ই আসে কলকাতায়, সে আমার পাশেই বিছানা পাতে, তার সঙ্গে একজন মুহুরী আসে, সে নায়েবের পাশে শোয়। বাড়ির দুজন চাকর শোয় ওদিকটাতে। ওস্তাদজী বলে একজন গানের মাস্টার বাড়ির ছেলেমেয়েদের গান ও হারমোনিয়াম বাজাতে শেখায়–সে আর তার একজন ভাইপো শোয় চাকরদের ও আমাদের মধ্যে। এতগুলো অপরিচিত লোকের সঙ্গে একসঙ্গে শোয়া কখনো অভ্যেস নেই–প্রথম দিনেই এদের গল্পগুজব, হাসি-কাশি, তামাকের ধোঁয়া আমাকে অতিষ্ঠ করে তুললে। সীতার মুখ মনে করে সব অসুবিধাকে সহ্য করবার জন্যে প্রস্তুত হই।
একদিন আমি সেরেস্তা-ঘরে বসে কাজ করচি–হঠাৎ দেখি মেজবাবু ঘরে ঢুকেচেন। আমি মেজবাবুকে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। মেজবাবু চারদিকের দেওয়ালের দিকে চোখ তুলে বললেন–এ ঘরের এই ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্চে, তুমি নজর রাখো না?
মেজবাবুর সামনাসামনি হওয়া এই আমার প্রথম। আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে আমি মনে আঘাত পেলাম এবং আমার ভয়ও হ’ল। তা ছাড়া ছবি নষ্ট হওয়ার কৈফিয়ৎ আমি কি দেবো বুঝতে না পেরে চুপ করে আছি, এমন সময় মেজবাবু বাজখাঁই আওয়াজে ডাকলেন–দৈতারী–
দৈতারী সেরেস্তার কালির বোতল গুনে গুনে আলমারিতে তুলছিল পাশের ঘরে, সে ঘরের পাশে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বললে–হুজুর–
–এই উল্লুক, তুমি দেখতে পাও না ঘরের ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?
দৈতারী ঘরের দেওয়ালের দিকে বিপন্ন মুখে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মেজবাবু হঠাৎ আমার ডেস্ক থেকে রুলটা তুলে নিয়ে তাকে হাতে পিঠে ঘা-কতক বসিয়ে দিয়ে বললেন–স্টুপিড পাজি, বসে বসে শুধু মাইনে খাবে? এক ডজন চাকর বাড়িতে মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে শুধু ফাঁকি দেবার জন্য? পাড়ো ছবিগুলো এক-একখানা ক’রে–পাড়ো আমার সামনে–
দৈতারীর সে রুলের ঘা যেন আমার পিঠেই পড়ল। আমি ভয়ে ভয়ে দৈতারীকে ছবি পাড়তে সাহায্য করতে লাগলুম। আমি সামান্য মাইনের চাকুরি করি–মেজবাবু আমাকেও ঠেস দিয়ে কথাটা বললেন। তারপর আধঘণ্টা তিনি ঘরে দাঁড়িয়ে রইলেন–আমি ও দৈতারী তাঁর সামনে সমস্ত ছবিগুলো একে একে পেড়ে পরিষ্কার করলাম। সাহস করে যেন মাথা তুলে চাইতে পারলাম না, যেন আমি নিজেই ছবির তদারক না করে প্রকাণ্ড অপরাধ করে ফেলেছি।
সেইদিন প্রথম বুঝলাম আমার মত সামান্য মাইনের লোকের কি খাতির–আর কি মান এদের কাছে। সীতার বিয়ের একটা বন্দোবস্ত করতে পারি তবে আবার পড়বো। ছোট বৌঠাকরুনের কথা এই সময় মনে হ’ল–শৈলদির কথাও মনে পড়ল। কত ধরনের মানুষই আছে সংসারে! অমরনাথবাবুর বৈঠকখানা আমাদের ঘরের সামনে। খুব শৌখীন জিনিসপত্র সাজানো এবং প্রত্যেক দিনই কোন-না-কোন শৌখীন জিনিস কেনা লেগেই আছে। সে ঘরে রোজ সন্ধ্যার পর বন্ধুবান্ধবেরা এসে গানের আড্ডা বসায়–কেউ ডুগি-তবলা, কেউ হারমোনিয়াম বাজায়–গান-বাজনায় অমরবাবুর খুব ঝোঁক। সে-দিন আড়াইশো টাকার একটা গানের যন্ত্র রাখবার কাঁচের আলমারি কেনা হ’ল। তিনি কলেজের ছাত্র বটে, কিন্তু আমি পড়াশুনা করতে একদিনও দেখিনি তাঁকে। একদিন বেলা দশটার সময় অমরনাথবাবু ঘরে ঢুকে বললেন–ওহে, পাঁচটা টাকা দাও তো, আছে তোমার কাছে?
আমি প্রথমটা অবাক হয়ে গেলাম। আমার কাছে টাকা চাইতে এসেছেন ছোটবাবু! ব্যস্তভাবে আমার বাক্সটা খুলে টাকা বার করে সসম্ভ্রমে তাঁর হাতে দিলাম। দিনকতক কেটে গেল, আর একদিন তিনটে টাকা চাইলেন। মাইনের টাকা সব এখনও পাইনি– দশটা টাকা মোটে পেয়েছিলাম–তা থেকে দিয়ে দিলুম আট টাকা। দু-তিন মাসে ছোটবাবু আমার কাছে পঁচিশ টাকা নিলেন–বাড়ির ও আমার হাতখরচ বাদে যা-কিছু বাড়তি ছিল, সবই তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
একদিন দাদা চিঠি লিখলে–তার বিশেষ দরকার। পনেরটা টাকা যেন আমি পাঠিয়ে দিই। আমার হাতে তখন মোটেই টাকা নেই। ভাবলুম, ছোটবাবুর টাকাটা তো দেওয়ার কথা এতদিনে–দিচ্ছেন না কেন! বড়মানুষের ছেলে, সামান্য টাকা খুচরো কিছু কিছু করে নেওয়া, সে ওঁর মনেই নেই বোধ হয়। লজ্জায় চাইতেও পারলাম না। অগত্যা বারোটা টাকা আগাম পাওয়ার জন্যে একটা দরখাস্ত করলুম। সে-দিন আপিসে আবার বসেছেন মেজবাবু। দরখাস্ত পড়ে আমার দিকে চেয়ে বললেন–কি হবে তোমার আগাম টাকা?
মেজবাবুকে আমার বড় ভয় হয়। বললুম–দাদা চেয়ে পাঠিয়েচেন, হাতে আমার কিছু নেই তাই।
মেজবাবু বললেন–তুমি কতদিন সেরেস্তায় কাজ করচ? চার মাস মোটে? না, এত কমদিনের লোককে এ্যাডভান্স দেওয়া স্টেটের নিয়ম নেই–তা ছাড়া তুমি তো এখনও পাকা বহাল হওনি–এখনও প্রোবেশনে আছ।
কই, চাকুরিতে ঢোকবার সময় সে-কথা তো কেউ বলেনি যে আমি প্রোবেশনে বহাল হচ্চি বা কিছু। যাই হোক, দরখাস্ত ফিরিয়ে নিয়ে এলাম। দাদাকে টাকা পাঠানো হ’লই না, এদিকে ছোটবাবুও টাকা দিলেন না, ভুলেই গিয়েচেন দেখচি সে-কথা। প্রথমে আসবার সময় ভেবেছিলাম এঁরা কোন দেবস্থানের সেবায়েত, সাধু-মোহান্ত মানুষ হবেন–ধর্মের একটা দিক এঁদের কাছে জানা যাবে–কিন্তু এঁরা ঘোর বিলাসী ও বিষয়ী, এখন তা বুঝচি। মেজবাবু এই চার মাসের মধ্যে এটর্নির বাড়ি পাঠিয়েচেন আমায় যে কতদিন, কোথায় জমি নিয়ে ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের সঙ্গে প্রকাণ্ড মোকদ্দমা চলচে-এ বাদে কুঞ্জ নায়েব তো প্রায়ই দেশ থেকে আপীলের কেস আনচেন। মেজবাবু মামলা-মোকদ্দমা নাকি খুব ভাল বোঝেন, কুঞ্জ নায়েব সেদিন বলছিল।
অপরে কি করে ধর্মানুষ্ঠান করে, তারা কি মানে, কি বিশ্বাস করে, এসব দেখে বেড়াতে আমার বড় ভাল লাগে।
একদিন হাওড়া পুলের ওপারে হেঁটে অনেক দূর বেড়াতে গেলুম। এক জায়গায় একটা ছোট মন্দির, জায়গাটা পাড়াগাঁ-মত, অনেক মেয়েরা জড়ো হয়েছে, কি পুজো হচ্চে। আমি মন্দির দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম–দেবতার স্থানে পূজা-অর্চনা হতে দেখলে আমার বড় কৌতূহল হয় দেখবার ও জানবার জন্যে। একটা বড় বটগাছের তলায় ছোট্ট মন্দিরটা, বটের ঝুরি ও শেকড়ের দৃঢ় বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা–মন্দিরের মধ্যে সিঁদুর মাখানো গোল গোল পাথর, ছোট একটা পেতলের মূর্তিও আছে। শুনলাম ষষ্ঠীদেবীর মূর্তি। বাড়ি থেকে মেয়েরা নৈবিদ্যি সাজিয়ে এনেচে, পুরুত ঠাকুর পুজো করে সকলকে। ফুলবেলপাতা নির্মাল্য দিলেন–ছেলেমেয়েদের মাথায় শান্তিজল ছিটিয়ে দিলেন। সবাই সাধ্যানুসারে কিছু কিছু দক্ষিণা দিলে পুরুত ঠাকুরকে, তারপর নিজের নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, নৈবিদ্যির খালি থালা হাতে সবাই বাড়ি চলে গেল। কাছেই একটা পুকুর, পুরুত ঠাকুর আমার হাতেও দুখানা বাতাসা ও ফুলবেলপাতা দিয়েছিলেন–বাতাসা দুখানা খেয়ে পুকুরে জল খেলাম-ফুলবেলপাতা পকেটে রেখে দিলাম। ছোট্ট গ্রামখানা– দূরে রেলের লাইন, ভাঙা পুকুরের ঘাটটা নির্জন, চারিধারেই বড় বড় গাছে ঘেরা শান্ত, স্তব্ধ অপরা–অনেক দিন পরে এই পুজোর ব্যাপারটা, বিশেষ করে মেয়েদের মুখে একটা ভক্তির ভাব, পুজোর মধ্যে একটা অনাড়ম্বর সারল্য আমার ভাল লাগল।
হাওড়া-পুল পার হয়েচি, এক জায়গায় একজন ভিখারিণী আধ-অন্ধকারের মধ্যে। চেঁচিয়ে কার সঙ্গে ঝগড়া করছে আর কাঁদছে। কাছে গিয়ে দেখলাম ভিখারিণী অন্ধ, বেশ ফর্সা রং, হিন্দুস্থানী–বৃদ্ধা না হলেও প্রৌঢ়া বটে। তার সামনে একখানা ময়লা ন্যাকড়া পাতা–সেটাতে একটা পয়সাও নেই–গোটা-দুই টিনের কালো তোবড়া মগ, একটা ময়লা পুঁটুলি, একটা ভাঁড়–এই নিয়ে তার কারবার। সে একটা সাত-আট বছরের মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করচে–হিন্দীতে বলচে–তুই অমন ক’রে মারবি কেন? তোকে আমি ভিক্ষে করে খাইয়ে এত বড়টা করলাম আর তুই আমাকেই মার দিতে শুরু করলি–আমার কপাল পোড়া, নইলে নিজের পেটের সন্তান এমন বদ হবে কেন? দ্যাখ দেখি কি দিয়ে মারলি, কপালটা কেটে গেছে–
মেয়েটা হি-হি করে হাসচে এবং কৌতুকের সঙ্গে রাস্তা থেকে ধুলোবালি খোয়া কুড়িয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাকে মারছে।
আমি মেয়েটাকে একটা কড়া ধমক দিয়ে বললাম–ফের মাকে যদি অমন করবি, তবে পুলিসে ধরিয়ে দেবো। পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আনা সাতেক পয়সা আছে–সেগুলো সব তার ময়লা নেকড়াখানায় রেখে দিয়ে বললুম–তুমি কেঁদো না বাছা–আমি কাল এসে তোমায় আরও পয়সা দেবো। তোমার মেয়ে আর মারবে না। যদি মারে তো বলে দিও, কাল আমি দেখে নেবো–
এমন ছন্নছাড়া করুণ দুরবস্থার রূপ জীবনে কোনদিন দেখিনি। পরদিন হাওড়া-পুলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেদিন বা আর কোনদিন সেই অন্ধ ভিখারিণীর দেখা পাইনি। তাকে কত খুঁজেছি, ভগবান জানেন। প্রতিদিন শোবার আগে তার কথা আমার মনে হয়।
মনে মনে বলি, আটঘরার বটতলায় তোমায় প্রথম দেখেছিলুম ঠাকুর, তোমার মুখে অত করুণা মাখানো, মানুষকে এত কষ্ট দাও কেন? তা হবে না, তার ভাল করতেই হবে তোমায়, তোমার আশীর্বাদের পুণ্যধারায় তার সকল দুঃখ ধুয়ে ফেলতে হবে তোমাকে।
এর মধ্যে একদিন কালীঘাটের মন্দিরে গেলুম।
সেদিন বেজায় ভিড়–কি একটা তিথি উপলক্ষে মেলা যাত্রী এসেচে। মেয়েরা পিষে যাচ্ছে ভিড়ের মধ্যে অথচ কেউ ওদের সুবিধে-অসুবিধে দেখবার নেই। আমার সামনেই একটি তরুণী বধূ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল–আমি একজন প্রৌঢ়া বিধবাকে বললাম– গেল, গেল, ও মেয়েটির হাত ধরে তুলুন–। কাদামাখা কাপড়ে বধূটি দিশাহারা ভাবে উঠে দাঁড়াল, আমি তার সঙ্গের লোকদের খোঁজ নিয়ে ভিড়ের ভেতর থেকে অতিকষ্টে খুঁজে বার করলাম–ভিড়ের দ্বারা চালিত হয়ে তারা অনেকদূর গিয়ে পড়েছিল। এত করেও অনেকেরই দেবদর্শন ঘটল না, পাণ্ডারা সকলকে মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছে না শুনলুম, কেন তা জানিনে। মেয়েদের দুঃখ দেখে আমার নিজের ঠাকুর দেখার ইচ্ছে আর রইল না।
আষাঢ় মাসের শেষ দিন। বৈকালের দিকটা মেজবাবু মোটরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, বেলা পাঁচটার সময় ফিরে এসে আমায় হিসেবের খাতা দেখাতে ডেকে পাঠালেন। রোজ তিনি দুপুরের পরে আপিসে বসে খাতা সই করেন, আজ তিনি ছিলেন না। মেজবাবুকে খাতা দেখানো বড় মুশকিলের ব্যাপার, আবার মেজবাবুকে আমার একটু ভয় হয়, তার ওপরে তিনি প্রত্যেক খরচের খুঁটিনাটি কৈফিয়ৎ চাইবেন। খাতা দেখতে দেখতে মুখ না তুলেই বললেন–তামাকওয়ালার ভাউচার কোথায়?
আমি বললাম–তামাকওয়ালা ভাউচার দেয়নি। খুচরা দোকান–ওরা ভাউচার রাখে না–
মেজবাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন–কেন, নবীন মুহুরী তো ভাউচার আনতো?
তাঁর মুখ দেখে মনে হ’ল তিনি আমায় অবিশ্বাস করচেন। আমি জানি নবীন মুহুরী যেখানে ভাউচার মেলে না–মনিবকে বুঝিয়ে দেবার জন্যে সেখানে ভাউচার নিজেই বানাতো। আমি সে মিথ্যার আশ্রয় নিই না। বললাম–আপনি জেনে দেখবেন ওরা ভাউচার কখনো দেয় না। আমি এসে পর্যন্ত তো দেখচি—
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলচি, তার সামনেই বড় জানালা–তার ঠিক ওপরে– মেজবাবুর অফিসের সামনাসামনি একটা শানবাঁধানো চাতাল। অন্দরমহলের একটা দোর দিয়ে চাতালটায় আসা যায় বলে জানালায় প্রায়ই পরদা টাঙানো থাকে। আজ সেটা গোটানো ছিল।
আমি একবার মুখ তুলতেই জানালা দিয়ে নজর পড়ল অন্দরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাদের ছোট্ট একটি খোকা, নিতান্ত ছোট, বছর দুই বয়স হবে। বোধ হ’ল যেন দরজা খোলা না পেয়ে চুপ ক’রে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাবছি, বেশ খোকাটি তো, কাদের খোকা? এ বাড়িতে যতদূর জানি অত ছোট ছেলে কারুর তো নেই? এ ওখানে এল কার সঙ্গে?
মেজবাবু বললেন–এদিকে মন দাও, ওদিকে কি দেখচ?
আমি বললাম–কাদের খোকা দাঁড়িয়ে রয়েচে ওখানে–আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম–ওই যে দাঁড়িয়ে রয়েচে চাতালের দরজায়, বাড়িতে ঢুকতে পাচ্ছে না বোধ হয়।
মেজবাবু সেদিকে চেয়ে বললেন–কই? কোথায় কে?
ঠিক সেই সময় অন্দরের দরজা খুলে মেজবাবুর স্ত্রী তাঁকে অনেকবার মোটরে উঠতে নামতে দেখেচি বার হয়ে এলেন এবং খোকাকে কোলে তুলে নিলেন। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। মেজবাবু বললেন–কোথায় তোমার খোকা না কি?
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম–বা রে, ওই তো উনি খোকাকে কোলে নিলেন!
চোখ তুলে চাতালের দিকে চেয়ে মেজবাবুর স্ত্রীকে আর দেখতে পেলাম না, অন্দরের দরজাও বন্ধ, নিয়ে বোধ হয় বাড়ির মধ্যে চলে গিয়েচেন। মেজবাবু বললেন–কে নিয়ে গেলেন? উনি মানে কি? কি বকচ পাগলের মত!…
মেজবাবু আমার দিকে কেমন এক ধরনের চেয়ে রয়েচেন দেখলাম। আমি তাঁর সে দৃষ্টির সামনে থতমত খেয়ে গেলাম–আমার মনে হ’ল মেজবাবু সন্দেহ করচেন আমার মাথা খারাপ আছে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিত হলাম একথা ভেবে যে এই ওঁর স্ত্রী দরজা খুলে এলেন, খোকাকে কোলে তুলে নিলেন, এই তো দিনমানে আর এই ত্রিশ হাতের মধ্যে চাতাল, এ উনি দেখতে পেলেন না কেন? পরক্ষণেই চট করে আমার সন্দেহ হ’ল আমার সেই পুরানো রোগের ব্যাপার এর মধ্যে কিছু আছে নাকি? এত সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে যে অন্য কিছু আছে বা হতে পারে, এ এতক্ষণ আমার মনেই ওঠেনি। তা হলে কোনো কথা কি বলতাম? এক্ষুনি চাকুরি থেকে ছাড়িয়ে দিতে পারে। বলতেই পারে, এর মাথা খারাপ, একে দিয়ে চলবে না।
কিন্তু আমার বড় কৌতূহল হ’ল। সন্ধ্যার সময় মোহিনী ঝি আমার বারান্দার সামনে দিয়ে যাচ্চে, তাকে জিজ্ঞেস করলুম–শোন, আচ্ছা বাড়িতে দেড় বছর দু’বছরের খোকা কার আছে বল তো? ঝি বললে–এত ছোট খোকা তো কারুর নেই।
সেইদিন রাত বারোটায় খুব হৈ-চৈ। মেজবাবুর স্ত্রীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, লোক ছুটলো ডাক্তার আনতে। মেজবাবুর স্ত্রী যে অন্তঃসত্বা ছিলেন বা সন্ধ্যার পর থেকে পাস-করা ধাত্রী এসে বসে আছে, এ-সব কথা তখন আমি শুনলাম। কারণ সবাই বলাবলি করচে। শেষরাত্রে শুনলাম তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয়েছে।
মনে মনে বিস্মিত হ’লেও কারও কাছে এ নিয়ে আর কোন কথা বললাম না। নিজেই দেখি, অথচ নিজেই বুঝিনে এ-সবের মানে কি। চুপচাপ থাকাই আমার পক্ষে ভাল।
এই ঘটনার পরে আমার ভয় হ’ল আমার সেই রোগ আবার আরম্ভ হবে। ও যখন আসে তখন উপরি-উপরি অনেক বার হয়–তারপর দিনকতকের জন্যে আবার একেবারেই বন্ধ থাকে। এই বার বেশী করে শুরু হলে আমার চাকুরি ঘুচে যাবে– সীতার কোন কিনারাই করতে পারব না।
মেজবাবু হিসেবের খাতা লেখার কাজ দিলেন নবীন মুহুরীকে। তার ফলে আমার কাজ বেজায় বেড়ে গেল–ঘুরে ঘুরে এঁদের কাজে খিদিরপুর, বরানগর, কালীঘাট করতে হয়– আর দিনের মধ্যে সতের বার দোকানে বাজারে যেতে হয় চাকরকে সঙ্গে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নেই, দিনে রাতে শুধু ছুটোছুটির কাজ। এই দোকানের হিসেব নবীন মুহুরীকে বুঝিয়ে দেওয়া একটা ঝঞ্ঝাট–রোজ সে আমাকে অপমান করে ছুতোয় নাতায়, আমার কথা বিশ্বাস করে না, চাকরদের জিজ্ঞেস করে আড়ালে সত্যি সত্যি কি দরে জিনিসটি এনেচি। সীতার মুখ মনে করে সবই সহ্য করে থাকি।
কার্তিক মাসে ওদের দেশের সেই মহোৎসব হবে–আমাদের সকলকে দেশে পাঠানো হ’ল। আমি অনেক আগে থেকেই শুনে আসচি–অত্যন্ত কৌতূহল ছিল দেখবো ওদের সাম্প্রদায়িক ধর্মানুষ্ঠান কি রকম।
গ্রামে এঁদের প্রকাণ্ড বাড়ি, বাগান, দীঘি, এঁরাই গ্রামের জমিদার। তবে বছরে এই একবার ছাড়া আর কখনও দেশে আসেন না। কুঞ্জ নায়েব বাকী দশ মাস এখানকার মালিক।
একটা খুব বড় ফাঁকা মাঠে মেলা বসেছে–এখানকার দোকান-পসারই বেশী। অনেকগুলো খাবারের দোকান, মাটির খেলনার দোকান, মাদুরের দোকান।
একটা বড় বটগাছের তলাটা বাঁধানো, সেটাই নাকি পীঠস্থান। লোকে এসে সেইখানে পুজো দেয়–আর বটগাছটার ডালে ও ঝুরিতে ইঁট বাঁধা ও লাল নীল নেকড়া বাঁধা। লোকে মানত করার সময় ওই সব গাছের গায়ে বেঁধে রেখে যায়, মানত শোধ দেওয়ার সময় সে খুলে দিয়ে পুজো দেয়। বটতলায় সারি সারি লোক ধর্ণা দিয়ে শুয়ে আছে, মেয়েদের ও পুরুষদের ধর্ণা দেওয়ার জায়গা আলাদা আলাদা।
বড়বাবু ও মেজবাবুকে মোহন্তের গদিতে বসেন–কত্তা নীলাম্বর রায় আসেননি, তাঁর শরীর সুস্থ নয়। এঁদের বেদীর ওপরে আশপাশে তাকিয়া, ফুল দিয়ে সাজানো, সামনে ঝকঝকে প্রকাণ্ড রূপোর থালাতে দিন-রাত প্রণামী পড়চে। দুটো থালা আছে–একটাতে মোহন্তের নজর, আর একটাতে মানত ও পুজোর প্রণামী।
নবীন মুহুরী, বেচারাম ও আমার কাজ হচ্ছে এই সব টাকাকড়ির হিসেব রাখা। এর আবার নানা রকম রেট আছে, যেমন–পাঁচ সিকার মানত থাকলে গদীর নজর একটাকা, তিন টাকার মানতে দু-টাকা ইত্যাদি। কেউ কম না দেয় সেটা মুহুরীদের দেখে নিতে হবে, কারণ মোহন্তরা টাকাকড়ির সম্বন্ধে কথা বলবেন না।
কাজের ফাঁকে আমি বেড়িয়ে দেখতে লাগলাম চারিধার। সবারই সঙ্গে মিশে এদের ধর্মমতটা ভাল করে বুঝবার আগ্রহে যাদের ভাল লাগে তাদেরই নানা কথা জিজ্ঞেস করি, আলাপ করে তাদের জীবনটা বুঝবার চেষ্টা করি।
কি অদ্ভুত ধর্মবিশ্বাস মানুষের তাই ভেবে অবাক হয়ে যাই। কতদূর থেকে যে লোক এসেচে পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে, ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়েও এসেছে অনেকে। এখানে থাকবার জায়গা নেই, বড় একটা মাঠে লোকে এখানে-ওখানে এই কার্তিক মাসের হিমে চট, শতরঞ্জি, হোগলা, মাদুর যে যা সংগ্রহ করতে পেরেছে তাই দিয়ে থাকবার জায়গা তৈরি ক’রে তারই তলায় আছে–কেউ বা আছে শুধু গাছতলাতে। যে যেখানে পারে মাটি খুঁড়ে কি মাটির ঢেলা দিয়ে উনুন বানিয়ে রান্না করচে। একটা সজনে গাছতলায় এক বুড়ী রান্না করছিল–সে একাই এসেচে হুগলী জেলার কোন গাঁ থেকে। তার এক নাতি হুগলীর এক উকিলের বাসার চাকর, তার ছুটি নেই, বুড়ী প্রতি বছর একা আসে।
আমায় বললে–বড্ড জাগ্রত ঠাকুর গো বটতলার গোসাঁই। মোর মালসি গাছে কাঁটাল মোটে ধরতো নি, জালি পড়ে আর খসে খসে যায়। তাই বন্নু বাবার থানে কাঁটাল দিয়ে আসবো, হে ঠাকুর কাঁটাল যেন হয়। বললে না পেত্যয় যাবে, ছোটয়-বড়য় এ-বছর সতেরো গণ্ডা এঁচড় ধরেচে গোসাঁইয়ের কিরপায়।
আর এক জায়গায় খেজুরডালের কুঁড়েতে একটি বৌ বসে রাঁধচে। আর তার স্বামী কুঁড়ের বাইরে বসে খোল বাজিয়ে গান করচে। কাছে যেতেই বসতে বললে। তারা জাতে কৈবর্ত, বাড়ি খুলনা জেলায়, পুরুষটির বয়স বছর চল্লিশ হবে। তাদের ছোট্ট একটি ছেলে মায়ের কাছে বসে আছে, তারই মাথার চুল দিতে এসেচে।
পুরুষটির নাম নিমচাঁদ মণ্ডল। স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই বড় ভক্ত। নিমচাঁদ আমার হাতে একখানা বই দিয়ে বললে–পড়ে শোনাও তো বাবু, দু-আনা দিয়ে মেলা থেকে কাল কেনলাম একখানা। বইখানার নাম বটতলার কীর্তন। স্থানীয় ঠাকুরের মাহাত্ম্যসূচক তাতে অনেকগুলো ছড়া। বটতলার গোসাঁই ব্রহ্মার সঙ্গে পরামর্শ করে এখানে এসে আস্তানা বেঁধেচেন, কলিরাজ ভয়ে তাঁর সঙ্গে এই সন্ধি করলে যে বটতলার হাওয়া যত দূর যাবে ততদূর পর্যন্ত কলির অধিকার থাকবে না। বটতলার গোসাঁই পাপীর মুক্তিদাতা, সর্ব জীবের আশ্রয়, সাক্ষাৎ শ্রীহরির একাদশ অবতার।
কলিতে নতুন রূপ শুন মন দিয়া
বটতলে স্থিতি হৈল ভক্তদল নিয়া
খেদে কহে কলিরাজ,
এ বড় বিষম কাজমোর দশা কি হবে গোসাঁই?
ঠাকুর কহিলা হেসে,
মনে না করিহ ক্লেশে থান ত্যজি কোথাও না যাই।
শ্রীদাম সুবল সনে হেথায় আসিব
বট্মূলে বৃন্দাবন সৃষ্টি করি নিব।
নিমচাঁদ শুনতে শুনতে ভক্তিগদগদকণ্ঠে বললে–আহা! আহা! বাবার কত লীলাখেলা!
তার স্ত্রীও কুঁড়ের দোরগোড়ায় এসে বসে শুনচে। মানে বুঝলাম এরা নিজেরা পড়তে পারে না, বইপড়া শোনার আনন্দ এদের কাছে বড় নতুন, তা আবার যাঁর ওরা ভক্ত, সেই বটতলার গোসাঁই সম্বন্ধে বই।
নিমচাঁদ বললে–আচ্ছা, বটতলার হাওয়া কত দূর যায় দা-ঠাকুর?
–কেন বল তো?
—এই যে বলচে কলির অধিকার নেই ওর মধ্যি, তা কত দূর তাই শুধুচ্চি।
—কত দূর আর, ধর আধ ক্রোশ বড়জোর—
নিমচাঁদ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কি ভেবে বললে–কি করবো দা-ঠাকুর, দেশে লাঙল-গরু করে ফেলেচি, কুড়ো-দুই জমিতে এবার বাগুন রুইয়ে রেখে এসেচি–নয়ত এ বাবার থান ত বিন্দাবন, আপনি পড়লেন–এ স্বগগো ছেড়ে বিলির মোষের মত বিলি ফিরে যাই দা-ঠাকুর? কি বলিস রে তুই, সরে আয় না এদিকে, দা-ঠাকুরকে লজ্জা কি, উনি তো ছেলেমানুষ।
নিমচাঁদের স্ত্রী গলার সুরকে খুব সংযত ও মিষ্টি করে, অপরিচিত পুরুষমানুষের সামনে কথা বলতে গেলে মেয়েরা যেমন সুরে কথা বলে তেমনি ভাবে বললে–হ্যাঁ ঠিকই তো। বাবার চরণের তলা ছেড়ে কোথাও কি যেতে ইচ্ছে করে?
নিমচাঁদ বললে–দু-মণ কোষ্টা ছিল ঘরে, তা বলি বিক্রী করে চল বাবার থানে বাবার ছিচরণ দর্শন করে আসি আর অমনি গঙ্গাছেনটাও সারবো। টাকা বাবা যোগাবেন, সেজন্য ভাবিনে। ওরে শোন, কাল তুই তো ধন্না দিবি সকালে, আজ রাতে ভাতে জল দিয়ে রেখে দিস–
জিজ্ঞেস করে জানলাম ছেলের অসুখের জন্যে ধর্ণা দেবার ইচ্ছে আছে ওদের।
নিমচাঁদের বৌ বললে–বুঝলেন দাদাঠাকুর, খোকার মামা ওর মুখ দেখে তিনটে টাকা দিলে খোকার হাতে। তখন পয়সার বড় কষ্ট যাচ্চে, কোষ্টা তখন জলে, কাচলি তো পয়সা ঘরে আসবে? তো বলি, না, এ টাকা খরচ করা হবে না। এ রইল তোলা বাবার থানের জন্যি। মোহন্ত বাবার গদীতে দিয়ে আসব।
সেই দিন বিকেলে নিমচাঁদ ও তাঁর বৌ পুজো দিতে এল গদীতে। নবীন মুহুরী তাদের কাছে রেট-মত প্রণামী ও পুজোর খরচ আদায় করলে অবিশ্যি–তা ছাড়া নিমচাঁদের বৌ নিজের হাতে সেই তিনটে টাকা বড়বাবুর সামনের রূপোর থালায় রেখে দিয়ে বড়বাবুর পায়ের ধুলো নিয়ে কোলের খোকার মাথায় মুখে দিয়ে দিলে।
তার পর সে একবার চোখ তুলে মোহন্তদের দিকে চাইলে এবং এদের ঐশ্বর্যের ঘটাতেই সম্ভবত অবাক হয়ে গেল–বুদ্ধিহীন চোখে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে টাকা-পয়সাতে পরিপূর্ণ ঝকঝকে রূপোর থালাটার দিকে বার-কতক চাইলে, রঙীন শালু ও গাঁদাফুলের মালায় মোড়া থামগুলোর দিকে চাইলে–জীবনে এই প্রথম সে গোসাঁইয়ের থানে এসেছে, সব দেখেশুনে লোকের ভিড়ে, মোহন্ত মহারাজের আড়ম্বরে, অনবরত বর্ষণরত প্রণামীর ঝমঝমানি আওয়াজে সে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। কতক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল, বাইরে থেকে ক্রমাগত লোক ঢুকচে, তাকে ক্রমশ ঠেলে একধারে সরিয়ে দিচ্চে, তবুও সে দাঁড়িয়েই আছে।
ওকে কে একজন ঠেলা দিয়ে এগিয়ে আসতে গেল, আমি ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারিনি। ওর মুখচোখের মুগ্ধ ভক্তিস্তব্ধ দৃষ্টি আমায়ও মুগ্ধ করেছে–এ এক নতুন অভিজ্ঞতা আমার জীবনের, এই বাজে শালুর বাহার আর লোকের হৈচৈ আর মেজবাবু, বড়বাবুর চশমামণ্ডিত দাম্ভিক মুখ দেখে এত ভাব ও ভক্তি আসে!–যে ঠেলা দিয়ে এদিকে আসছিল, আমি তাকে ধমক দিলুম। তার পর ওর চমক ভাঙতে ফিরে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ওরা চলে গেলে একটি বৃদ্ধা এল, তার বয়স অনেক হয়েছে, বয়সে গলার সুর কেঁপে গিয়েচে, হাত কাঁপচে, সে তার আঁচল থেকে একটি আধুলি খুলে থালায় দিতে গেল। নবীন মুহুরী বললে–রও গো, রাখ––আধুলি কিসের?
বুড়ী বললে–এই-ই ঠাকুরের মা-ন-ত শো-ধে-র পে-র-ণা-মী–
নবীন মুহুরী বললে–পাঁচ সিকের কমে ভোগের পুজো নেই–পাঁচ সিকিতে এক টাকা গদীর নজর–
বুড়ী শুনতে পায় না, বললে–কত?
নবীন আঙুল দেখিয়ে চেঁচিয়ে বললে–এক টাকা—
বুড়ী বললে–আর নেই, মা-দু-র কি-নে-লা-ম ছ-আ-না-র, আ-র—
নবীন মুহুরী আধুলি ফেরত দিয়ে বললে–নিয়ে যাও, হবে না। আর আট আনা নিয়ে এস—
বড়বাবু একটা কথাও বললেন না। বুড়ী কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেল এবং ঘণ্টাখানেক পর সিকিতে, দু আনিতে, পয়সাতে একটা টাকা নিয়ে এসে প্রণামী থালায় রাখল।
ওরা চলে গেলে আমার মনে হ’ল এই সরল, পরম বিশ্বাসী পল্লীবধূ, এই বৃদ্ধা ওদের কষ্টার্জিত অর্থ কাকে দিয়ে গেল–মেজবাবুকে, বড়বাবুকে? এই এত লোক এখানে এসেছে, এরা সবাই চাষী গরীব গৃহস্থ, কি বিশ্বাসে এখানে এসেছে জানি নে–কিন্তু অম্লানবদনে খুশীর সঙ্গে এদের টাকা দিয়ে যাচ্চে কেন? এই টাকায় কলকাতায় ওঁদের স্ত্রীরা গহনা পরবেন, মোটরে চড়বেন, থিয়েটার দেখবেন, ওঁরা মামলা করবেন, বড়মানুষি সাহেবিয়ানা করবেন–ছোটবাবু বন্ধুবান্ধব নিয়ে গানবাজনার মজলিশে চপ-কাটলেট ওড়াবেন, সেই জন্যে?
পরদিন সকালে দেখলাম নিমচাঁদের স্ত্রী পুকুরে স্নান করে সারাপথ সাষ্টাঙ্গ নমস্কার করতে করতে ধুলোকাদা-মাখা গায়ে বটতলায় ধর্ণা দিতে চলেচে–আর নিমচাঁদ ছেলে কোলে নিয়ে ছলছল চোখে তার পাশে পাশে চলেচে।
সেই দিন রাত্রে শুনলাম মেলায় কলেরা দেখা দিয়েছে। পরদিন দুপুরবেলা দেখি বটতলার সামনের মাঠটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছে, অনেকেই পালিয়েছে। নিমচাঁদের কুঁড়েঘরের কাছে এসে দেখি নিমচাঁদের স্ত্রী বসে–আমায় দেখে কেঁদে উঠল। নিমচাঁদের কলেরা হয়েচে কাল রাত্রে–মেলার যারা তদারক করে, তারা ওকে কোথায় নাকি নিয়ে যেতে চেয়েচে, মাঠের ওদিকে কোথায়। আমি ঘরে ঢুকে দেখি নিমচাঁদ ছটফট করছে, খুব ঘামচে।
নিমচাঁদের স্ত্রী কেঁদে বললে–কি করি দাদাঠাকুর, হাতে শুধু যাবার ভাড়াটা আছে–কি করি কোথা থেকে–
মেজবাবুকে কথাটা বললাম গিয়ে, তিনি বললেন–লোক পাঠিয়ে দিচ্চি, ওকে সিগ্রিগেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাও–মেলার ডাক্তার আছে সে দেখবে–
নিমচাঁদের বৌ-এর কি কান্না ওকে নিয়ে যাবার সময়। আমরা বোঝালুম অনেক। ডাক্তার ইনজেকশন দিলে। মাঠের মধ্যে মাদুর দিয়ে সিগ্রিগেশন ক্যাম্প করা হয়েছে– অতি নোংরা বন্দোবস্ত। সেখানে সেবাশুশ্রষার কোন ব্যবস্থাই নেই। ভাবলুম চাকুরি যায় যাবে, ওকে বাঁচিয়ে তুলব, অন্তত বিনা তদারকে ওকে মরতে দেবো না। সারারাত জেগে রোগীকে দেখাশুনা করলুম একা। সিগ্রিগেশন ক্যাম্পে আরও চারটি রোগী এল–তিনটে সন্ধ্যার মধ্যেই মরে গেল। মেলার ডাক্তার অবিশ্যি নিয়ম-মত দেখলে। এদের পয়সা নিয়ে যারা বড়-মানুষ, তারা চোখে এসে দেখেও গেল না কাউকে। রাত্রিটা কোনরকমে কাটিয়ে বেলা উঠলে নিমচাঁদও মারা গেল। সে এক অতি করুণ ব্যাপার! ওদের দেশের লোক খুঁজে বার করে নিমচাঁদের সৎকারের ব্যবস্থা করা গেল। নিমচাঁদের স্ত্রীর দিকে আমি আর চাইতে পারি নে–বটতলায় ধর্ণা দেওয়ার দিন থেকে সেই যে সে উপবাস করে আছে, গোলমালে আর তার খাওয়াই হয়নি। রুক্ষ চুল একমাথা, সেই ধূলিধূসরিত কাপড়–খবর পেয়ে সে ধর্ণা ফেলে বটতলা থেকে উঠে এসেছে–চোখ কেঁদে কেঁদে লাল হয়েছে, যেন পাগলীর মত দৃষ্টি চোখে। এখন আর সে কাঁদছে না, শুধু কাঠের মত বসে আছে, কথাও বলে না, কোন দিকে চায় না।
মেজবাবুকে বলাতে তিনি ওকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার খরচ দু-টাকা মঞ্জুর করলেন। কিন্তু সে আমি যথেষ্ট বললাম ও অনুরোধ করলাম ব’লে। আরও কত যাত্রী এ-রকম মরে গেল বা তাদের কি ব্যবস্থা হ’ল এ-সব দেখবার দায়িত্ব এদেরই তো। ওরাই রইল নির্বিকার ভাবে বসে। আমার কাছে কিছু ছিল, যাবার সময় নিমচাঁদের স্ত্রীর হাতে দিলুম। চোখের জল রাখতে পারি নে, যখন সে চলে গেল।
দিন-দুই পরে রাত্রে বসে আমি ও নবীন মুহুরী হিসেব মেলাচ্চি মেলার দেনা-পাওনার। বেশ জ্যোৎস্না রাত, কার্তিকের সংক্রান্তিতে পরশু মেলা শেষ হয়ে গিয়েছে, বেশ শীত আজ রাত্রে।
এমন সময় হঠাৎ আমার কি হ’ল বলতে পারিনে–দেখতে দেখতে নবীন মুহুরী, মেলার আটচালা ঘর, সব যেন মিলিয়ে গেল। আমি যেন এক বিবাহ-সভায় উপস্থিত হয়েছি–অবাক হয়ে চেয়ে দেখি সীতার বিবাহ-সভা। জ্যাঠামশায় কন্যাসম্প্রদান করতে বসেছেন, খুব বেশী লোকজনের নিয়ন্ত্রণ হয়নি, বরপক্ষেও বরযাত্রী বেশী নেই। দাদাকেও দেখলুম–দাদা ব’সে ময়দা ঠাসচে ..আরও সব কি কি…ঘষা কাঁচের মধ্যে দিয়ে যেন সবটা দেখচি–খানিকটা স্পষ্ট, খানিকটা অস্পষ্ট।
চমক ভাঙলে দেখি নবীন মুহুরী আমার মাথায় জল দিচ্চে। বললে–কি হয়েছে। তোমার, মাঝে মাঝে ফিট হয় না-কি?
আমি চোখ মুছে বললুম–না। ও কিছু না–
আমার তখন কথা বলতে ভাল লাগছে না। সীতার বিবাহ নিশ্চয়ই হচ্চে, আজ এখুনি হচ্ছে। আমি ওকে বড় ভালবাসি–আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে জ্যাঠামশায় ওর বিবাহ দিতে পারবেন না। আমি সব দেখেচি।
নবীন মুহুরীকে বললাম–তুমি আমাকে ছুটি দাও আজ, শরীরটা ভাল নেই, একটু শোব।
পরদিন বড়বাবুর চাকর কলকাতা থেকে এল। মায়ের একখানা চিঠি কলকাতার ঠিকানায় এসে পড়ে ছিল, মায়ের জবানি জ্যাঠামশায়ের লেখা আসলে। ২রা অগ্রহায়ণ সীতার বিয়ে, সেই জ্যাঠামশায়ের ঠিক করা পাত্রের সঙ্গেই। তিনি কথা দিয়েছেন, কথা খোয়াতে পারেন না। বিশেষ, অত বড় মেয়ে ঘরে রেখে পাঁচজনের কথা সহ্য করতে প্রস্তুত নন। আমরা কোন কালে কি করব তার আশায় তিনি কতকাল বসে থাকেন– ইত্যাদি।
বেচারী সীতা! ওর সাবান মাখা, চুলবাঁধা, মিথ্যে শৌখীনতার অক্ষম চেষ্টা মনে পড়ল। কত করে ওর মুখের দিকে চেয়ে এত কাল কিছু গ্রাহ্য করিনি। বেশ দেখতে পেলাম ওর ঘন কালো চুলের সিঁতিপাটি ব্যর্থ হয়ে গেল––ওর শুভ্র, নিষ্পাপ জীবন নিয়ে সবাই ছিনিমিনি খেললে।
