ছয়
জ্যাঠামশায়দের বাড়ি আরও বছর দুই কেটে গেল এই ভাবেই। যত বছর কেটে যায়, এদের এখানে থাকা আমার পক্ষে তত বেশি কঠিন হয়ে পড়তে লাগল। আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক জিনিস আমি বুঝতে পারি আজকাল, আগে আগে অত বুঝতাম না। এ বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল এইজন্যে যে, আমি চেষ্টা করেও জ্যাঠাইমাদের ধর্ম ও আচারের সঙ্গে নিজেকে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পেরে উঠলাম না।
এঁরা খুব ঘটা ক’রে যেটা ধর্ম বলে আচরণ করেন, আমার মনের সঙ্গে সেটা তো আদৌ মেলে না–আমি মনে যা বলি, বাইরে তা করি–কিন্তু ওঁরা তাতে চটেন। ওঁদের ধর্মের যেটা আমার ভাল লাগে–সেটাকে ওঁরা ধর্ম বলেন না।
কিন্তু একটা ব্যাপার হয়েছে এই, আগে ভাবতাম শুধু জ্যাঠাইমাদের বাড়িতেই বুঝি এই রকম, এখন বয়স বাড়বার সঙ্গে বুঝতে পেরেছি–এ গ্রামের অধিকাংশই এই রকম– জ্যাঠাইমায়েরা একটু বেশী মাত্র।
এতেই আমার সন্দেহ হ’ল বোধ হয় আমার মধ্যেই কোনো দোষ আছে, যার ফলে আমি এঁদের শিক্ষা নিতে পারচি নে। ভাবলাম আমার যে ভাল লাগে না, সে বোধ হয় আমি বুঝতে পারি না বলেই হয়ত চা-বাগানে থাকার দরুন ওদের ধর্ম আমরা শেখবার সুযোগ পাইনি, যে আবহাওয়ার মধ্যে ছেলেবেলা থেকে মানুষ হয়েছি, সেটাই এখন ভাল লাগে।
ম্যাট্রিক পাস করে শ্রীরামপুর কলেজে ভর্তি হলাম। জ্যাঠামশায়দের গ্রাম আটঘরার নবীন চৌধুরী–যার বড় ছেলে ননী ভাল ফুটবল খেলতে পারে এবং যে প্রায়শ্চিত্তের বাধাবিঘ্ন না মেনে বাবার সৎকারের সময়ে দলবল জুটিয়ে এনেছিল–তারই ভগ্নীপতির বাড়ি অর্থাৎ নবীন চৌধুরীর বড় মেয়ে শৈলবালার শ্বশুরবাড়ি শ্রীরামপুরে। ননীর যোগাড়যন্ত্রে তাদের শ্বশুরবাড়িতে আমার থাকবার ব্যবস্থা হ’ল।
এসে দেখি এদেরও বেশ বড় সংসার, অনেক লোক। শৈলদিদির স্বামীরা ছ’ভাই, তার মধ্যে চার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে, আর একটি আমার বয়েসী, ফার্স্ট ইয়ারেই ভর্তি হ’ল আমার সঙ্গে। সকলের ছোট ভাই স্কুলে পড়ে। শৈলদি বাড়ির বড়বৌ আমি তাঁর দেশের লোক, সবাই আমাকে খুব আদরযত্ন করলে। এখানে কিছুদিন থাকবার পরে বুঝলাম যে, সংসারে সবাই জ্যাঠামশায়দের বাড়ির ছাঁচে গড়া নয়। চা-বাগান থেকে এসে বাংলাদেশ সম্বন্ধে যে একটা হীন ধারণা আমার হয়েছিল, সেটা এখানে দু-চার মাস থাকতে থাকতে চলে গেল। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম যে এ বাড়ির মেয়েরা কেউ কারও বড় একটা অধীন নয়। কোনো একজনকে সকলের ভয় করে চলতে হয় না বা কোনো একজনের কথায় সকলকে উঠতে বসতে হয় না।
আমি থাকি বাইরের একটা ঘরে, কিন্তু অল্পদিনেই আমি বাড়ির ছেলে হয়ে পড়লাম। শৈলদিদি খুব ভাল, আমাকে ভাইয়ের মত দেখে। কিন্তু এতবড় সংসারের কাজকর্ম নিয়ে সে বড় ব্যস্ত থাকে–সব সময় দেখাশুনো করতে পারে না। শৈলদিদির বয়স আমার মেজকাকীমার চেয়ে কিছু ছোট হবে–তিন-চারটি ছেলেমেয়ের মা। আটঘরায় থাকতে খুব বেশী আলাপ ছিল না, দু-একবার জ্যাঠামশায়দের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে আলাপ করে এসেছিল, তারপর ননী কথাটা পাড়তেই তখনি রাজী হয়ে যায় আমার এখানে রাখবার সম্বন্ধে। শৈলদিদির স্বামী তার কোনো কথা ফেলতে পারে না।
বাড়ির সকলের সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গেল। বাড়ির মধ্যে সর্বত্র যাই–জ্যাঠামশায়দের বাড়ির মত এটা ছুঁয়ো না, ওটা ছুঁয়ো না–কেউ করে না। সব ঘরে যাই, সব বিছানাতেই বসি–সবাই আদরযত্ন করে, পছন্দ করে। এখন বয়স হয়েচে বুঝতে পেরেচি, আটঘরায় যতটা বাঁধাবাঁধি, এসব শহর-বাজারে অত নেই এদের। কষ্ট হয় মার জন্যে, সীতার জন্যে–তারা এখনও জ্যাঠাইমার কঠিন শাসনের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রীতদাসীর মত উদয়াস্ত খাটচে। দাদার জন্যেও কষ্ট হয়। সে লেখাপড়া শিখলে না–চাকুরি করবে, সংসারের দুঃখ ঘুচোবে বলে–কিন্তু চাকুরি পায় না, ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, আজ বারো টাকা মাইনের চাকুরি করে, কাল জবাব হয়ে যায়, আবার আর এক জায়গায় ষোল টাকা মাইনের চাকুরি জোটায়। এত সামান্য মাইনেতে বিদেশে খেয়ে পরে কোন মাসে পাঁচ টাকা, কোন মাসে তিন টাকার বেশী মাকে পাঠাতে পারে না, তাতে কি দুঃখ ঘুচবে?
অথচ না শিখলে লেখাপড়া, না করতে পারলে কিছু।
কলেজের ছুটির পরে গঙ্গার ধারে একখানা বেঞ্চির ওপর বসে এই সব কথাই ভাবছিলাম। মাঝে মাঝে ভয়ানক ইচ্ছে হয় আবার একবার চা-বাগানের দিকে যাই, আর একবার হিমালয় দেখি। কতকাল রডোডেনড্রন ফুল দেখিনি, পাইন-বন দেখিনি, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি–সে রকম শীত আর পাইনি কোনোদিন,–এদের সবাইকে দেখাতে ইচ্ছে হয় সে দেশ। স্কুলে যখন প্রবন্ধ লিখতে দিত, আমি হিমালয় নিয়ে লিখতাম– আমার লেখা সকলের চেয়ে ভাল হ’ত–কারণ বাল্যের স্বপ্ন-মাখানো সে ওক পাইন বন, ঝর্ণা, তুষারমণ্ডিত কাঞ্চনজঙ্ঘা, কুয়াশা, মেঘ আমার কাছে পুরনো হবে না কোনো দিন, তাদের কথা লিখতে গেলে নতুন ভাব ও ভাষা কোথা থেকে এসে জোটে, মনে হয় আরও লিখি, এখনও সব বলা হয়নি। লেখা অপরে ভাল বললেও আমার মন তৃপ্ত হ’ত না, মনে হ’ত যা দেখেছি তার অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও আঁকতে পারলাম না–অপরে ভাল বললে কি হবে, তারা তো আর দেখেনি?
ওপারে ব্যারাকপুরের সাদা বাড়িগুলো যেন সবুজের সমুদ্রে ডুবে আছে। ঠিক যেন চা ঝোপের আড়ালে ম্যানেজার সাহেবের কুঠী–লাল টালির ছাদ থাকলেই একেবারে চা বাগান। ওই দিকে চেয়েই তো রোজ বিকেলে আমার মনে হয় বাল্যের চা-বাগানের সেই দিনগুলো।
বাড়ি ফিরে গেলাম সন্ধ্যার পরে। চাকরকে ডেকে বললাম, লুলু আলো দিয়ে যা। এমন সময়ে ভবেশ এল। ভবেশ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, খুব বুদ্ধিমান ছেলে, স্কলারশিপ নিয়ে পাস করেচে–প্রথম দিনেই কলেজে এর সঙ্গে আলাপ হয়।
ভবেশের দৈনন্দিন কাজ–রোজ এসে আমার কাছে খৃস্টান ধর্মের নিন্দা করা। আমাকে ও খৃস্টান ধর্মের কবল থেকে উদ্ধার করে নাকি হিন্দু করবেই। আজও সে আরম্ভ করলে বাইবেলটা নিতান্ত বাজে, আজগুবী গল্প। খৃস্টান ইউরোপ এই সেদিনও রক্তে সারা দুনিয়া ভাসিয়ে দিলে গ্রেট ওয়ারে। কিসে তুমি ভুলেচ? রোজ যাও পিকারিং সাহেবের কাছে ধর্মের উপদেশ নিতে। ওরা তো তোমাকে খৃস্টান করতে পারলে বাঁচে। তা ছাড়া আজ হিন্দুদের বলবৃদ্ধি করা আমাদের সবার কর্তব্য–এটা কি তোমার মনে হয় না?
আমি বললাম–তুমি ভুল বুঝেচ ভবেশ, তোমাকে এক দিনও বোঝাতে পারলাম না যে আমি খৃস্টান নই খৃস্টান ধর্ম কি জিনিস আমি জানিনে–জানবার কৌতূহল হয় তাই পিকারিং সাহেবের কাছে জানতে চাই। আমি যীশুখৃষ্ট্রের ভক্ত, তাঁকে আমি মহাপুরুষ বলে মনে করি। তাঁর কথা আমার শুনতে ভাল লাগে। তাঁর জীবন আমাকে মুগ্ধ করে। এতে দোষ কিসের আমি তো বুঝি নে।
–ও বটে! বুদ্ধ, চৈতন্য, কৃষ্ণ, রামকৃষ্ণ, এঁরা সব ভেসে গেলেন–যীশুখৃস্ট হ’ল তোমার দেবতা! এঁরা কিসে ছোট তোমার যীশুর কাছে জিজ্ঞেস করি?
–কে বলেছে তাঁরা ছোট? ছোট কি বড় সে কথা তো উঠচে না এখানে? আমি তাঁদের কথা বেশী জানি নে। যতটুকু জানি তাতে তাঁদের শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এও তো হয়, কেউ একজনকে বেশি ভালবাসে আর একজনকে কম ভালবাসে?
–তুমি যতই বোঝাও জিতেন, আমার ও ভাল লাগে না। দেশের মাটির সঙ্গে যোগ নেই ওর। তোমার মত চমৎকার ছেলে যে কেন বিপথে পা দিলে ভেবে ঠিক করতে পারিনে। তোমার লজ্জা করে না একথা বলতে যে, রামকৃষ্ণ, বুদ্ধ, চৈতন্যের কথা কিছু জান না, তাঁদের কথা জানতে আগ্রহও দেখাও না, অথচ রোজ যাও যীশুখৃস্টের বিষয় শুনতে? একশোবার বলবো তুমি বিপথে পা দিয়ে দাঁড়িয়েচ। কই, একদিন গীতা পড়েচ? অথচ গসপেল পড়তে যাও পিকারিঙের কাছে–তোমাকে বন্ধু বলি তাই কষ্ট হয়, নইলে তুমি উচ্ছন্ন যাও না, আমি বলতে যাব কেন?
ভবেশ চলে গেলে অনেক রাত পর্যন্ত কথাটা ভাবলাম। খৃস্টকে আমি ভক্তি করি, খৃস্টের কথা বলতে ভাল লাগে, শুনতে ভাল লাগে। এতে দোষ আছে কিছু? মহাপুরুষের কি দেশ-বিদেশ আছে?
রাত্রে বাড়ির মধ্যে খেতে গিয়ে দেখি আর সকলের খাওয়া হয়ে গিয়েচে। ছোট বউ অর্থাৎ শৈলদিদি ছোট জায়ের রান্নার পালা ছিল এবেলা–তিনি হাঁড়িকুড়ি নিয়ে বসে আছেন। আমি খেতে বসলাম কিন্তু কেমন অস্বস্তি বোধ হ’তে লাগল–শৈলদিদির এই ছোট জাকে আমি কি জানি কেন পছন্দ করিনে। মেজবউ, সেজবউকে যেমন মেজদি, সেজদি বলে ডাকি–ছোটবউকে আমি এ পর্যন্ত কোন কিছু বলে ডাকিনি। অথচ তিনি আমার সামনে বেরোন বা আমার সঙ্গে কথা বলেন। ছোটবউয়ের বয়স আমার সমান হবে, এই সতেরো আঠারো–আমি যদিও ‘আপনি’ বলে কথা বলি। বাড়ির সব মেয়েরা ও বৌয়েরা জানে যে ছোটবউয়ের সঙ্গে আমার তেমন সদ্ভাব নেই। কেন আমি তাঁকে ছোটদিদি বলে ডাকিনে, শৈলদি আমায় এ নিয়ে কতবার বলেছে। কিন্তু আমার যা ভাল লাগে না, তা আমি কখনও করিনে।
সেদিন এক ব্যাপার হয়েছে। খেয়ে উঠে অভ্যাসমত পান চেয়েচি–কাউকে বিশেষ করে সম্বোধন করে নয়, যেন দেওয়ালকে বলচি এই ভাবে। ছোটবউ আধ-ঘোমটা দিয়ে এসে পান আমার হাতে দিতে গেলেন–আমার কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হ’ল কেন জানিনে, অন্য কারুর বেলা আমার তো এমনি অস্বস্তি বোধ হয় না? পান দেবার সময় তাঁর আঙুলটা আমার হাতে সামান্য ঠেকে গেল–আমি তাড়াতাড়ি হাত টেনে নিলাম। আমার সারা গা কেমন শিউরে উঠল, লজ্জা ও অস্বস্তিতে মনে হ’ল, পান আর কখনও এমনভাবে চাইব না। মেজদি কি শৈলদির কাছে গিয়ে চেয়ে নেবো।
সেইদিন থেকে ছোটবউকে আমি এড়িয়ে চলি।
মাস কয়েক কেটে গেল। শীত পড়ে গিয়েছে।
আমি দোতলার ছাদে একটা নিরিবিলি জায়গায় রোদে পিঠ দিয়ে বসে জ্যামিতির আঁক কষচি।
সেজদি হাসতে হাসতে ছাদে এসে বললেন–জিতু এস, তোমায় ওরা ডাকছে।
আমি বললুম–কে ডাকচে সেজদি?
সেজদির মুখ দেখে মনে হ’ল একটা কি মজা আছে। উৎসাহ ও কৌতূহলের সঙ্গে পেছনে পেছনে গেলাম। দোতলার ওদিকের বারান্দাতে সব মেয়েরা জড়ো হয়ে হাসাহাসি করছে। আমায় সবাই এসে ঘিরে দাঁড়াল, বললে–এস ঘরের মধ্যে।
তাদের পেছনে ঘরে ঢুকতেই সেজদি বিছানার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন–ওই লেপটা তোল তো দেখি কেমন বাহাদুরি।
বিছানাটার উপর আগাগোড়া লেপ-ঢাকা কে একজন শুয়ে আছে লেপমুড়ি দিয়ে। সবাই বললে–তোল তো লেপটা!
আমি হাসিমুখে বললাম–কি বলুন না সেজদি, কি হয়েচে কি?
ভাবলুম বোধ হয় শৈলদির ছোট দেওর অজয়কে এরা একটা কিছু সাজিয়েচে বা ঐ রকম কিছু। তাড়াতাড়ি লেপটা টেনে নিয়েই চমকে উঠলাম। লেপের তলায় ছোটবৌঠাকরুন, মুখে হাসি টিপে চোখ বুজে শুয়ে।
সবাই খিল খিল করে হেসে উঠল। আমি লজ্জায় লাল হয়ে তাড়াতাড়ি ঘরের বার হয়ে গেলাম। বারে, এ কি কাণ্ড ওদের? কেন আমায় নিয়ে এ রকম করা? তা ছাড়া– ছিঃ–না, ওকি কাণ্ড! ছোটবৌঠাকরুন স্বেচ্ছায় এ ষড়যন্ত্রের মধ্যে আছেন নিশ্চয়। আমার রাগ হ’ল তাঁর ওপরে।
এর দিন-দুই পরে আমি আমার নিজের ঘরে একা বসে আছি, এমন সময় হঠাৎ ছোট-বৌঠাকরুনকে দোরের কাছে দেখে অবাক হয়ে গেলাম–তিনি আমার ঘরে কখনও আসেননি এ পর্যন্ত। কিন্তু তিনি যেমনি এলেন, তেমনি চলে গেলেন, একটু দাঁড়ালেন না, যাবার আগে ঘরের মধ্যে কি একটা ফেলে দিয়ে গেলেন।
আমি বিস্মিত হয়ে তুলে দেখলাম একখানা ভাঁজ করা ছোট কাগজ–একখানা চিঠি! ছোট্ট চিঠি, দু-কথায়–
সেদিন যা করে ফেলেচি, সেজন্য আপনার কাছে মাপ চাই। আমি নিজের ইচ্ছেতে কিছু করিনি। দলে পড়ে করেচি, কদিন ধরে ভাবচি আপনার কাছে মাপ চাইব–কিন্তু লজ্জায় পারিনি! আমি জানি আপনার মন অনেক বড়, আপনি ক্ষমা করবেন।
পত্রে কোন নাম নেই। আমি সেখানা বার বার পড়লাম–তারপর টুকরো টুকরো ক’রে ছিঁড়ে ফেললাম–কিন্তু টুকরোগুলো ফেলে দিতে গিয়ে কি ভেবে আমার একটা ছোট মানিব্যাগ ছিল, তার মধ্যে রেখে দিলাম।
সেদিন থেকে আমার কি হ’ল, আমি একা থাকলেই ছোটবৌঠাকরুনের কথা ভাবি। কিছুতেই মন থেকে আমি তাঁর চিন্তা ছাড়তে পারিনে। দু-পাঁচদিন করে হপ্তাখানেক কেটে গেল। আমি বাড়ির মধ্যে তেমন আর যাইনে–অত্যন্ত ভয়, পাছে একা আছি এমন অবস্থায় ছোটবৌঠাকরুনের সঙ্গে দেখা হয়ে পড়ে। ছোটবৌয়ের রান্নার পালার দিন আমি সকাল সকাল খেয়ে নি, যখন অনেকলোক রান্নাঘরে থাকে। যা যখন দরকার হয়, শৈলদি কি সেজদির কাছে চাই–ওদের গলা না শুনতে পেলে বাড়ির মধ্যে যেতে সাহস হয় না।
সেজদি একদিন বললেন–জিতু, তুমি কলেজ থেকে এসে খাবার খাওয়া ছেড়ে দিলে নাকি? বিকেলে তো বাড়ির মধ্যে থাকই না, আসই না, কোথাও থেকে খেয়ে আস বুঝি?
আমি জানি বিকেলের চা-খাবার প্রায়ই ছোটবৌ তৈরি করেন–আর সে সময় বড় একটা কেউ সেখানে থাকে না। যে যার খেয়ে চলে যায়। ইচ্ছা করেই বিকেলে চা খেতে যাই নে। পয়সা যেদিন থাকে, স্টেশনের দোকান থেকে খেয়ে আসি।
শীত কেটে গেল, বসন্ত যায়-যায়। আমার ঘরে জানলার ধারে বসে পড়চি, হঠাৎ জানলার পাশের দরজা দিয়ে ছোটবৌঠাকরুন কোথা থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ি ঢুকচেন, সঙ্গে শৈলদির ছেলে কালো। তিনি আমায় দেখতে পাননি। আমি অপলকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। তাঁকে যেন নতুনরূপে দেখলাম–আরো কতবার দেখেছি, কিন্তু আজ দেখে মনে হ’ল এ-চোখে আর কখনও দেখিনি তাঁকে। তাঁর কপালের অমন সুন্দর গড়ন, পাশের দিক থেকে তাঁর মুখ যে অমন সুশ্রী দেখায়, ভুরুর ও চোখের অমন ভঙ্গি– এ-সব আগে তো লক্ষ্য করিনি। যখন কেউ দেখে না, তখন তাঁর মুখের কি অদ্ভুত ধরনের ভাব হয়! তিনি বাড়ির মধ্যে ঢুকে যেতেই আমার চমক ভাঙলো। বই খুলে রেখে দিলাম–পড়ায় আর মন বসল না, সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। কি একটা কষ্ট হ’তে লাগল বুকের মধ্যে–যেন নিশ্বাস-প্রশ্বাস আটকে আসচে। মনে হ’ল চুপ করে বসে থাকতে পারব না, এক্ষুনি ছুটে মুক্ত বাতাসে বেরুতে হবে।
সেই রাত্রে আমি তাঁকে চিঠি লিখতে বসলাম–চিঠি লিখে ছিঁড়ে ফেললাম। আবার লিখে আবার ছিড়লাম। সেদিন থেকে তাঁকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখা যেন আমার কলেজের টাস্কের সামিল হয়ে দাঁড়ালো–কিন্তু লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি।
দিন-পনের পরে ঠিক করলাম, আজ চিঠি দেবই। সেদিন বেলা দেড়টার মধ্যে কলেজ থেকে ফিরে এলাম–গ্রীষ্মের দুপুর, সবাই ঘুমুচ্চে। আমি বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম, সিঁড়ির পাশে দোতলায় তাঁর ঘর, তিনি ঘরে বসে সেলাই করছিলেন–আমি সাহস করে ঘরে ঢুকে চিঠি দিতে পারলাম না, চলে আসছিলাম, এমন সময় তিনি মুখ তুলেই আমায় দেখতে পেলেন, আমি লজ্জায় ও ভয়ে অভিভূত হয়ে সেখান থেকে সরে গেলাম, ছুটে নীচে এলাম–পত্র দেওয়া হ’ল না, সাহসই হ’ল না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথে পথে উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ালাম লক্ষ্যহীন ভাবে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে অনেক রাত্রে বাড়ি যখন ফিরি, রাত তখন বারোটা। বাড়িতে আবার সেদিন লক্ষ্মীপূজা ছিল। খেতে গিয়ে দেখি রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় আমার খাবার ঢাকা আছে, শৈলদি ঢুলচেন রান্নাঘরের চৌকাঠে বসে। মনে মনে অনুতাপ হ’ল, সারা বিকেল খাটুনির পরে শৈলদি বেচারী কোথায় একটু ঘুমুবে, আর আমি কি-না এভাবে বসিয়ে রেখেচি!
আমাকে দেখে শৈলদি বললে—-বেশ, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
কথার উত্তর দিতে গেলে মুশকিল, চুপচাপ খেতে বসলাম–শৈলদি বললে–না খেয়ে ঢন ঢন করে বেড়িয়ে বেড়িয়ে কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গিয়েচে। চা খেতেও আসিস নে বাড়ির মধ্যে, কালোকে দিয়ে বাইরের ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিলেও পাওয়া যায় না–থাকিস কোথায়?
খানিকক্ষণ পরে পাতের দিকে চেয়ে বললে–ও কি, ভাল করে ভাত মাখ। ঐ ক’টি খেয়ে মানুষ বাঁচে ভাই? তোরা এখন ছেলেমানুষ, খাবার বয়স। লুচি আছে ভোগের, দেবো? পায়েস তুই ভালবাসিস, এক বাটি পায়েস আলাদা করা আছে। কই মাছের মুড়ো ফেললি কেন, চুষে চুষে খা। আহা, কি ছিরি হচ্ছে চেহারার!
পরদিন কিসের ছুটি। আমি দোতলার ছাদে কালোকে ডাকতে গিয়েছি তার প্রাইভেট টিউটর নীচে পড়াতে এসেচে বলে। সন্ধ্যার অন্ধকার হয়েছে। ওপরে উঠেই আমি একেবারে ছোটবৌঠাকরুনের সামনে পড়ে গেলাম। তাঁর কোলে মেজদির দেড় বছরের খুকী মিন্টু–সে খুব ফুটফুটে ফর্সা বলে বাড়ির সকলের প্রিয়, সবাই তাকে কোলে পাবার জন্যে ব্যগ্র। ছোটবৌঠাকরুন হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন খুকীকে কোলে করে। আমি বিস্মিত হ’লাম, কপালে ঘাম দেখা দিল। খুকী আমায় চেনে, সে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে আসতে চায়। ছোটবৌঠাকরুন আমার আরও কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন– খুকীকে আমার কোলে দিলেন। তাঁর পায়ের আঙুল আমার পায়ের আঙুলে ঠেকল। আমি তখন লাল হয়ে উঠেচি, শরীর যেন ঝিম ঝিম করচে। কেউ কোন দিকে নেই।
ছোটবৌঠাকরুন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে সুর নিচু করে বললেন–আপনি আর বাড়ির মধ্যে আসেন না কেন আজকাল? আমার ওপর রাগ এখনও যায়নি?
আমি অতি কষ্টে বললাম–রাগ করব কেন?
—তবে সেদিন ও-ঘরে এলেন, আমার সঙ্গে কথা বললেন না তো! চলে গেলেন কেন?
মরীয়া হয়ে বললাম–আপনাকে সেদিন চিঠি দেবো বলে এসেছিলাম, কিন্তু পাছে কিছু মনে করেন, সেজন্যে দেওয়া হয়নি। পাছে কিছু মনে করেন ভেবেই বাড়ির মধ্যে আসিনে।
তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার পর মৃদুস্বরে বললেন–মাথা ঠাণ্ডা করে লেখাপড়া করুন। কেন ও-রকম করেন? আর বাড়ির মধ্যে আসেন না কেন? ওতে আমার মনে ভারি কষ্ট হয়। যেমন আসতেন তেমনি আসবেন বলুন? আমায় ভাবনার মধ্যে ফেলবেন না ও রকম।
আমার শরীরে যেন নতুন ধরনের অনুভূতির বিদুৎ খেলে গেল। সেখানে আর দাঁড়াতে পারলাম না–মুখে যা এল, একটা জবাব দিয়ে নীচে নেমে এলাম। সারারাত আর ঘুমুতে পারিনে। আমার জন্যে একজন ভাবে এ চিন্তার বাস্তবতা আমার জীবনে একেবারে নতুন। নতুন নেশার মত এ অনুভূতি আমার সারা দেহমন অভিভূত করে তুললে।
কি অপূর্ব ধরনের আনন্দ-বেদনায় মাখানো দিন, সপ্তাহ, পক্ষ, মাস! দিনরাতে সব সময়ই আমার ওই ওক চিন্তা। নির্জনে কাটাই, কিছু ভাল লাগে না, অথচ যাঁর চিন্তা শয়নে-স্বপনে সর্বদাই করি, পাছে তাঁর সামনে পড়ি এই ভয়ে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করি। লেখাপড়া, খাওয়া, ঘুম সব গেল।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি ছোটবৌঠাকরুনের হ’ল অসুখ। অসুখ ক্রমে বাড়াবাড়ি ধরনের হ’ল। ছাতরা থেকে যদু ডাক্তার দেখতে এল। তাঁর বাপের বাড়ি থেকে লোকজন এসে পড়ল–বাড়িসুদ্ধ লোকের মুখে উদ্বেগের চিহ্ন। আমি ডাক্তার ডাকা, ওষুধ আনা এ সব করি বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে, কিন্তু একদিনও রোগীর ঘরে যেতে পারলাম না– কিছুতেই না। একদিন ঘরের দোরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম–কিন্তু চৌকাঠের ওপারে যাইনি।
ক্রমে তিনি সেরে উঠলেন। একদিন আমার চয়নিকা-খানা তিনি চেয়ে পাঠালেন– দিন-দুই পরে কালো বই ফিরিয়ে দিয়ে গেল। চার-পাঁচ দিন পরে চয়নিকা-খানা কি জন্যে খুলতে গিয়েছি, তার মধ্যে একখানা চিঠি, ছোটবৌঠাকরুনের হাতে লেখা।
নাম নেই কারুর। লেখা আছে…
আমার অসুখের সময় সবাই এল, আপনি এলেন না কেন? আমি কত আশা করেছিলাম যে আপনি আসবেন, জানেন তো? আমার মরে যাওয়াই ভাল। কেন যে আবার সেরে উঠলাম! অসুখ থেকে উঠে মন ও শরীর ভেঙে গেছে। কালোর মুখে শুনেচি, আপনি ঘরে টাঙিয়ে রেখেছেন যীশুখৃস্টের ছবি, তিনি হিন্দুর দেবতা নন–কিন্তু আপনি যাকে ভক্তি করেন–আমি তাঁকে অবহেলা করতে পারিনে। আমার জন্যে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবেন। আর-একটা কথা–একটিবার দেখতে কি আসবেন না?
যীশুখৃস্টের ছবির দিকে চাইলাম। সম্প্রতি একখানা বুদ্ধের ছবি, আর একখানা চৈতন্যের ছবিও এনে টাঙিয়েছিলাম, রোগশীর্ণা পত্রলেখিকার করুণ আকূতি ওদের চরণে পৌঁছে দেবার ভার আমার ওপর পড়েছে। কিন্তু আমি কি পারব? অনুকম্পায় মমতায় আমার মন তখন ভরে উঠেচে। যে প্রার্থনা ওদের কাছে জানালাম, তা ভাষাহীন, বাক্যহীন। আমি এ-ছাড়া আর কিছু করতে পারিনে। সামনে হঠাৎ যেতে পারব না তাঁর। এ বাড়িতেও আর বেশিদিন থাকা হবে না আমার। চলে যাব এখান থেকে।
টেস্ট পরীক্ষা দিয়েই আটঘরায় পালাবো, ঠিক করলাম। সেখানে যাইনি অনেক দিন। মা চিঠি লিখেছেন, দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। আমার সেখানে যেতে ইচ্ছে হয় না শুধু জ্যাঠাইমাদের ব্যবহারের জন্য। গেলেই মায়ের দুঃখ দেখতে হবে। দাদা এক বাতাসার কারখানায় চাকরি পেয়েচে, মাসে কিছু টাকা অতিকষ্টে পাঠায়। সীতা বড় হয়ে উঠল– তারই বা কি করা যায়? দাদা একাই বা কি করবে!
পিকারিং সাহেব আমার হাতে গীতা দেখে একদিন বললেন–তুমি এ-সব পড় নাকি? বাইবেল কি তোমার সকল আধ্যাত্মিক অভাব পূর্ণ করে না?
আমি বললাম–পড়ে দেখতে কি দোষ আছে সাহেব? তা ছাড়া আমি তো খৃস্টান নই, আমি এখনও হিন্দু।
–দু-নৌকাতে পা দেওয়া যায় না, মাই বয়। তুমি খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত হও–নয়তো তুমি বাইবেল পড় কেন?
–সাহেব, যদি বলি ইংরেজী ভাষা ভাল করে শেখবার জন্যে?
পিকারিং সাহেব হো হো করে হেসে উঠল। বললে–তোমার আত্মার পরিত্রাণ তার চেয়েও বেশি দরকারী। যীশুতে বিশ্বাস না করলে আত্মার ত্রাণ নেই। তিনি আমাদের সকলের পাপের ভার নিজে নিয়ে ক্রুশের নিষ্ঠুর মৃত্যু বরণ করেছিলেন। যীশুর ধর্মে দীক্ষিত হও, তোমার পাপ তাঁর রক্তে ধুয়ে যাবে। এস, আমার সঙ্গে গান কর।
তার পর সাহেব নিজেই গান ধরল—
Nothing but the Blood of Jesus
Oh, precious is the flow.
That can make me white as snow,
No other fount I know
Nothing but the Blood of Jesus.
পিকারিং সাহেবকে আমার খুব ভাল লাগে। খুব সরল, ধর্মপ্রাণ লোক। স্ত্রী মারা গিয়েচে আজ দশ-বারো বছর, আর বিয়ে করেননি,–টেবিলের ওপর নিকেলের ফ্রেমে বাধানো স্ত্রীর ফটো সর্বদা থাকে। মাঝে মাঝে আমায় জিজ্ঞেস করে–আমার স্ত্রী দেখতে কেমন ছিল, ভাল না? ফটো দেখে মিসেস পিকারিংকে সুন্দরী মনে হয়নি আমার, তবু বলি খুব চমৎকার।
পিকারিং সাহেবের ধর্মমত আমার কাছে কিন্তু অনুদার ঠেকে–কিছুদিন এদের সঙ্গে থেকে আমার মনে হয় জ্যাঠাইমারা যেমন গোঁড়া হিন্দু–খৃস্টানদের মধ্যেও তেমন গোঁড়া খৃস্টান আছে। এরা নিজের ধর্মটি ছাড়া আর কারুর ধর্ম ভাল দেখে না। এদের সমাজে সংকীর্ণতা আছে–এদেরও আচার আছে–বিশেষত একটা নির্দিষ্ট ধরনের ঈশ্বরের উপাসনা করলে উপাসনা ব্যর্থ হ’ল এদের মতে। একখানা কি বইয়ে একবার অনন্ত নরকের গল্প পড়লাম। শেষবিচারের দিন পর্যন্ত পাপীরা সেই অনন্ত নরকের অনন্ত আগুনের মধ্যে জ্বলবে পুড়বে, খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হবার আগেই যদি কোন শিশু মারা যায়–তাদের আত্মাও যাবে অনন্ত নরকে। এসব কথা প্রথম যেদিন শুনেছিলাম, আমাকে ভয়ানক ভাবিয়ে তুলেছিল। তারপর মনে হল, কেন যীশু কি এতই নিষ্ঠুর? তিনি পরিত্রাণের দেবতা, তিনি সকল পাপীকেই কেন পরিত্রাণ করবেন না? যে তাঁকে জানে, যে তাঁকে না-জানে–সবাইকে সমান চোখে তিনি কেন না দেখবেন? তাঁর কাছে খৃস্টান ও অখৃস্টানে প্রভেদ থাকবে কেন? বরং যে অজ্ঞানান্ধ তার প্রতি তার অনুকম্পা বেশী হবে– আমার মনের সঙ্গে এই খৃস্টের ছবি খাপ খায়। তিনি প্রেমময় মুক্ত মহাপুরুষ, তাঁর কাছেও ধর্মের দলাদলি থাকে কখনো? যে দেশের, যে ধর্মের, যে জাতিরই হোক তিনি সবারই– যে তাঁকে জানে, তিনি তার, যে না জানে, তিনি তারও।
একদিন গঙ্গার ধারে বেঞ্চির ওপরে বসে জনকতক লোক গল্প করচে–শুনলাম বরানগরে কুঠির ঘাটের কাছে একটা বাগানবাড়িতে একজন বড় সাধু এসেচেন, সবাই দেখতে যাচ্চে। দু-এক দিনের মধ্যে একটা ছুটি পড়ল, বেলুড়ে নেমে গঙ্গা পার হয়ে কুঠিরঘাটের বাগান-বাড়ি খোঁজ করে বার করলাম। বাগানবাড়িতে লোকে লোকারণ্য, সকলেই সাধুজীর শিষ্য, মেয়েরাও আছে। ফটকের কাছে একজন দাড়িওয়ালা লোক দাঁড়িয়েছিল, আমি ফটকের কাছে গিয়ে আমার আসার উদ্দেশ্য বলতেই লোকটা দু-হাতে আমরা গলা জড়িয়ে ধরে বললে–ভাই, এস এস, তোমাকে নেওয়ার জন্যেই যে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি পছন্দ করিনে যে কেউ আমার গলা জড়িয়ে ধরে–আমি ভদ্রভাবে গলা ছাড়িয়ে নিলাম। লোকটা আমায় বাগানের মধ্যে নিয়ে গেল। আমি কৌতূহল ও আগ্রহের সঙ্গে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। বাঁ-দিকের রোয়াকে একদল মেয়ে ব’সে একরাশ তরকারি কুটছে–একটা বড় গামলায় প্রায় দশ সের ময়দা মাখা হচ্ছে,–যেদিকে চাই, খাওয়ার আয়োজন।
–সাধুর দেখা পাবো এখন?
–তিনি এখন ধ্যান করচেন। তাঁর প্রধান শিষ্য জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারী ও-ঘরে আছেন, চল ভাই তোমায় নিয়ে যাই।
কথা বলচি এমন সময় একজন ভদ্রলোক এলেন, সঙ্গে একটি মহিলা–ফটকের কাছে তাঁরা মোটর থেকে নামলেন। একজন বালক-শিষ্যকে ভদ্রলোকটি কি জিজ্ঞেস করলেন– সে তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে এল আমার সঙ্গের দাড়িওয়ালা লোকটির কাছে। ভদ্রলোকটি তাকে বললেন–স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তিনি কোথায়?
–কোথা থেকে আসছেন আপনারা?
—ভবানীপুর, এলগিন রোড থেকে। আমার নাম বিনয়ভূষণ মল্লিক।
দাড়িওয়ালা লোকটির শরীরের ইস্ক্রুপ কব্জা যেন সব ঢিলে হয়ে গেল হঠাৎ–সে তিন ভাগে ভেঙে হাত কচলে বললে–আজ্ঞে আসুন, আসুন, বুঝতে পেরেচি, আসুন। এই সিঁড়ি দিয়ে আসুন–আসুন মা-লক্ষ্মী।
আমি বিস্মিত হলাম। এই যে বললে সাধুজী ধ্যানে বসেচেন–তবে ওঁরা গেলেন যে! লোকটি ওঁদের ওপরে দিয়ে আবার নেমে এল। আমায় একটা হলঘরে নিয়ে গেল। সেখানে জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারীর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলে। জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারীর পরনে গেরুয়া আলখাল্লা, রং ফর্সা–আমার সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহার করলেন। তিনি আপিসের কাজে দেড়শো টাকা মাইনে পেতেন–ছেড়ে স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। স্বামীজী বলেছেন তিনি তিনটে মহাদেশ উদ্ধার করবেন, সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেই বেরিয়ে পড়বেন সে উদ্দেশ্যে। স্বামীজীর দেওয়া মন্ত্র জপ ক’রে তিনি অদ্ভুত ফল পেয়েছেন নিজে–এই সব গল্প সমবেত দর্শকের কাছে করছিলেন। আমি কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম–কি ফল পেয়েছেন মন্ত্রের? তিনি বললেন–মন্ত্র জপ করতে করতে মনে হয় যেন কোথায় পাহাড়ের উপরে বসে আছি। স্বামীজি বলেন–এ একটা উচ্চ অবস্থা। আমি আরও আগ্রহের সুরে বললাম–আর কিছু দেখেন? তিনি বললেন, জ্যোতিঃদর্শন হয় মাঝে মাঝে।
–সে কি রকম?
—দুই ভুরুর মাঝখানে একটা আগুনের শিখার মত দীপ্তি দেখতে পাই।
আমি হতাশ হলাম। আমি নিজে তো কত কি দেখি! এরা তো সে-সব কিছু দেখে বলে মনে হয় না। এরা আর কতটুকু দেখেচে তা হলে? পাহাড়ের ওপর বসে আছি এই দেখলেই বা কি হ’ল? ভুরুর মধ্যে আগুনের শিখা দেখলেই বা কি?
শুনলাম বেলা ছ’টার পরে স্বামীজীর দেখা পাওয়া যাবে। পাশের একটা ঘরে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। আরও একজন বৃদ্ধ সেখানে ছিলেন। কথায় কথায় তিনি বললেন– দেখ তো বাবা–এই তোমরাও তো ছেলে। আর আমার হতচ্ছাড়া ছেলেটা পালিয়ে এসে বাড়ি থেকে এই সন্নিসির দলে যোগ দিয়েছে। এখানে তো এই খাওয়া এই থাকা। যাত্রার দলের মত এক ঘরে একশো লোক শোয়। ছেলেটার হাড়ির হাল হয়েচে–আগে একবার ফিরিয়ে নিতে এসেছিলাম–তা যায়নি। এবার আমি আসছি শুনে কোথায় পালিয়েচে হতভাগা। আহা কোথায় খাচ্ছে কি হচ্চে–এদিকে বাড়িতে ওর মা অন্নজল ছেড়েছে। এই সন্নিসির দলই তাকে সরিয়ে রেখেচে কোথায়। আজ তিন দিন এখানে বসে আছি, তা ছোঁড়া এল না। এরা তলায় তলায় তাকে খবর দিচ্ছে। আবার আমার ওপর এদের রাগ কি? বলচে ছেলে তোমার মুক্তির পথে গিয়েছে, বিষয়ের কীট হয়ে আছ তুমি, আবার ছেলেটাকে কেন তার মধ্যে ঢোকাবে? শোন কথা। ওদের এখানে বিনি পয়সার চাকর হাতছাড়া হয়ে যায় তা হ’লে যে! আমায় এই মারে তো এই মারে। দু-বেলা অপমান করছে।
–কোথা থেকে আপনার ছেলে এদের দলে এল?
–এই সন্নিসির দল গেছল আমাদের মাদারিপুরে। খুব কীর্তন করে ভিক্ষে ক’রে শিষ্য-সেবক তৈরি করে বেড়াল ক’দিন। সেখান থেকে ছেলেটাকে ফুসলে নিয়ে এসেচে।
পয়সা হাতে থাকত আমার তো ব্যাটার খাতির করত। এখানে খেতে দেয় না ওই বাজারের হোটেল থেকে খেয়ে আসি। একটু এই দালানটাতে রাত্রে শুয়ে থাকি, তাও দু বেলা বলচে- বেরো এখান থেকে। ছোঁড়াটা ফিরে আসবে, সেই আশায় আছি।
স্বামীজীর সঙ্গে দেখা হ’ল না। দেখার ইচ্ছেও আর ছিল না।
সন্ধ্যার পরে স্টীমারে পার হয়ে বেলুড়ে এলাম মনে কত আসা নিয়ে গিয়েছিলাম ওবেলা। মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার যেখানে ভাল নয়, সেই জ্যাঠাইমাদের বাড়ির গোপীনাথ জিউ-এর পুজোর সময় যা দেখেচি, হীরুঠাকুরের প্রতি তাদের ব্যবহার যা দেখেচি–সেই সব একই যেন।
দিন দুই পরে ছোটবৌঠাকরুনের বাপের বাড়ি থেকে বড় ভাই তাকে নিতে এল। আমার সঙ্গে দশ-পনেরো দিন দেখা হয়নি, ভাবলুম যাবার সময় একবার দেখা করবই। দুপুরের পরে ঘোড়ার গাড়িতে জিনিসপত্র ওঠানো হচ্ছে, আমি নিজের ঘরের জানলা দিয়ে দেখছি আর ভাবচি ওঠবার সময় গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াব, না ওপরে গিয়ে দেখা করে আসব?
পায়ের শব্দে পেছনে চেয়ে দেখি ছোটবৌঠাকরুন দোরের কাছে দাঁড়িয়ে রোগশীর্ণ মুখে, হাতায় লাল পাড় বসানো ব্লাউজ গায়ে, পরনে লালপাড় শাড়ী। আমি থতমত খেয়ে বললাম–আপনি! আসুন, এই টুলটাতে–
তিনি মৃদু, সহজ সুরে বললেন–খুব তো এলেন দেখা করতে!
—আমি এখুনি যাচ্ছিলাম, আপনি এলেন, তাই নইলে
— ছোটবৌঠাকরুন ম্লান হেসে বললেন–না, নিজেই এলাম। আর আপনার সঙ্গে কি দেখা হবে? আপনি তো পরীক্ষা দিয়ে চলে যাবেন। বি.এ. পড়বেন না?
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম–ঠিক নেই, এখানে হয়ত আর আসব না।
তিনি বললেন–কেন আর এখানে আসবেন না?
আমি কোন কথা বললাম না। দুজনেই খানিকক্ষণ চুপচাপ।
তারপর তিনি আমার কাছে এগিয়ে এসে মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন–আপনার মত ছেলে যদি কখনও দেখেচি! আগে যদি জানতাম তবে সেবার আপনাকে নিয়ে যে ওরা ঠাট্টা করেছিল, আমি তার মধ্যে যাই? এখন সে-কথা মনে হলে লজ্জায় ইচ্ছে হয় গলায় বঁটি দিয়ে মরি।
তারপর গভীর স্নেহের সুরে বললেন-না, ও-সব পাগলামি করে না, আসবেন এখানে, কেন আসবেন না, ছিঃ–
দরজার কাছে গিয়ে বললেন–না এলে বুঝবো আমায় খুব ঘেন্না করেন, তাই এলেন না।
