পাঁচ
পৌষ মাসের শেষে আমাদের বাড়ি সরগরম হয়ে উঠল–শুনলাম ওঁদের গুরুদেব আসবেন বলে চিঠি লিখেছেন।
এই গুরুদেবের কথা আমি এঁদের বাড়িতে এর আগে অনেক শুনেচি–জ্যাঠামশায়ের ঘরে তাঁর একটা বড় বাঁধানো ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম–গুরুদেব চেয়ারে বসে আছেন, জ্যাঠামশায় ও জ্যাঠাইমা দুজন দু-দিকে মাটিতে বসে তাঁর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছেন। অনেক দিন থেকে ছবিখানা দেখে গুরুদেব সম্বন্ধে আমার মনে একটা কৌতূহল হয়েছিল–কিরকম লোক একবার দেখবার বড় ইচ্ছে হত।
স্টেশনে তাঁকে আনতে লোক গিয়েছিল–একটু বেলা হ’লে দেখি দাদা এক ভারী মোট বয়ে আগে আগে আসচে-পেছনে ব্যাগ-হাতে জ্যাঠামশায়দের কৃষাণ নিমু গোয়ালা। গুরুদেব হেঁটে আসচেন, রং কালো, মাথার সামনের দিকে টাক–-গায়ে চাদর, পায়ে চটি। আমার জাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা দরজার কাছে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল–পায়ের ধুলো নেওয়ার জন্যে তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। আমি এগিয়েও গেলাম না, পায়ের ধুলোও নিলাম না। জ্যাঠাইমা গুরুদেবের পা নিজের হাতে ধুইয়ে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলেন, খুড়ীমারা বাতাস করতে লাগলেন–ছেলে-মেয়েরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, তিনি সেজ-খুড়ীমাকে জিজ্ঞেস করলেন–বৌমা, ছেলের তোতলামিটা সেরেচে? মেজখুড়ীমাকে বললেন–গোষ্ঠ মেজকাকার নাম আজকাল কি বাদার কাছারী থেকে গরমের সময় একদম আসে না?..কতদিন আগে এসেছিল বললে?
বাড়ির ছেলেমেয়েদের একে ওকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন, দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন–কিন্তু দাদা যে অত বড় ভারী মোট বয়ে আনলে স্টেশন থেকে, সে-ও সেইখানে দাঁড়িয়ে–তাকে একটা মিষ্টি কথাও বললেন না। আমার রাগ হ’ল, তিনি কি ভেবেচেন দাদা বাড়ির চাকর? তাও ভাবা অসম্ভব এইজন্যে যে, ওখানে যতগুলো ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে ভিড় করে আছে, তাদের মধ্যে দাদার রূপ সকলের আগে চোখকে আকৃষ্ট করে-এ গায়ে দাদার মত রূপবান বালক নেই, শুধু এ বাড়ি তো দূরের কথা। আশা করে দাঁড়িয়ে আছে, একটা ভাল কথাও তো বলতে হয় তার সঙ্গে?
গুরুদেবের জন্যে বিকেলে বাড়িতে কত কি খাবার তৈরি হ’ল–মেজখুড়ীমা, সদুর-মা, জ্যাঠাইমা–সবাই মিলে ক্ষীরের, নারিকেলের, ছানার কি সব গড়লেন। মাকে এ-সব কাজে ডাক পড়ে না, কিন্তু দেখে একটু অবাক হলাম সদুর মাকে ওঁরা এতে ডেকেচেন। মা আর সদুর মা’র ওপর যত উঞ্ছ কাজের ভার এ বাড়ির। সদুর মা’র অদৃষ্ট ভাল হয়েচে দেখচি।
গুরুদেব সন্ধ্যা-আহ্নিক সেরে বাইরে এলে তাঁকে যখন খাবার দেওয়া হ’ল, তখন সেখানে বাড়ির ছেলেমেয়ে সবাই ছিল–আমরাও ছিলাম। কিন্তু হিরণদিদি ও সেজকাকীমা সকলকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। গুরুদেব বললেন–কেন ওদের যেতে বলচ বৌমা, থাক না, ছেলেপিলেরা গোলমাল করেই থাকে–
গুরুদেব তিন-চারদিন রইলেন। তাঁর জন্যে সকালে বিকালে নিত্যনূতন কি খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাই যে হ’ল! পিঠে, পায়েস, সন্দেশ, ছানার পায়েস, ক্ষীরের ছাঁচ, চন্দ্রপুলি, লুচি–তিনি তো খেতে পারতেন না–আমরা বাদে বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা তাঁর পাতের প্রসাদ পেত। তিনি জলখাবার খেয়ে উঠলে তাঁর রেকাবিতে বা থালায় যা পড়ে থাকত, কাকীমারা ডেকে ছেলেমেয়েদের দিতেন–আমরা সেখানে থাকতাম না–কারণ প্রথম দিকে ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকলে কাকীমা বকতেন–তার পর গুরুদেবের খাওয়া হয়ে গেলে যখন তাদের ডাক পড়ত, তখন বাড়ির ছেলেরা কাছেকাছেই থাকতো ব’লে তারাই যেত–আমি কারুর পাতের জিনিস খেতে পারিনে, এই জন্যে আমি যেতাম না। ওঁরা ডেকেও কোনো খাবার জিনিস আমাদের কোনো দিন দিলেন না–কিন্তু মনে মনে আমি হতাশ হলাম–আমি একেবারে যে আশা করিনি তা নয়, ভেবেছিলাম গুরুদেব এলে আমরা সবাই ভাল খাওয়ার ভাগ পাব কিছু কিছু।
সন্ধ্যাবেলা। বেশ শীত পড়েছে। গুরুদেব আমলকীতলায় কাঠের জলচৌকিতে কম্বল পেতে বসে আছেন। গায়ে সবুজ পাড়-বসানো বালাপোশ-ছেলেমেয়েরা সব ঘিরে আছে, যেমন সর্বদাই থাকে একটু পরে জ্যাঠাইমা, মেজকাকীমা, সদুর মা, হিরণদিদি এলেন।
গুরুদেবের খুব কাছে আমি কোনো দিন যাইনি–আমি গোয়ালঘরের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, ছেলেমেয়েরা গল্প শুনচে গুরুদেবের কাছে, আমার কিন্তু গল্পের দিকে মন নেই, আমার জানবার জন্যে ভয়ানক কৌতূহল যে গুরুদেব কি ধরনের লোক, তাঁর অত খাতির, যত্ন, আদর এরা কেন করে, তাঁর পায়ে জ্যাঠাইমা ও জ্যাঠামশায় পুস্পাঞ্জলি দেনই বা কেন, তাঁর ফটো বাঁধিয়েই বা ঘরে রাখা আছে কেন? এসবের দরুন গুরুদেব সম্বন্ধে আমার মনে এমন একটা অদ্ভুত আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মে গিয়েছে যে, তিনি যেখানেই থাকুন, আমি কাছে কাছে আছি সর্বদাই–অথচ খুব নিকটে যাইনে!
গুরুদেব মুখে মুখে ধর্মের কথা বলতে লাগলেন। আমি আর একটু এগিয়ে গেলাম ভাল করে শোনবার জন্য। এ-সব কথা শুনতে আমার বড় ভাল লাগে।
একবার কি একটা যোগ উপস্থিত–গঙ্গাস্নানে মহাপুণ্য, সকল পাপ ক্ষয় হয়ে যাবে, স্নান করলেই মুক্তি। পার্বতী শিবকে বললেন–আচ্ছা প্রভু, আজ এই যে লক্ষ লক্ষ লোক কাশীতে স্নান করবে, সকলেই মুক্তি পাবে? শিব বললেন, তা নয় পার্বতী। চলো তোমায় দেখাব।
দুজনে কাশীতে এলেন মণিকর্ণিকার ঘাটে। শিব বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের শব সেজে ঘাটের ধারে পড়ে রইলেন। পার্বতী তাঁর স্ত্রী সেজে পাশে বসে কাঁদতে লাগলেন। যারা এল, তাদের বললেন আমার বৃদ্ধ স্বামী মারা গিয়েছেন, এর সৎকার করার ব্যবস্থা আপনারা করুন। কিন্তু একটা মুশকিল আছে, শব যিনি স্পর্শ করবেন, তাঁর সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হওয়া চাই, নইলে শব-স্পর্শেই মৃত্যু ঘটবে।
এ-কথা শুনে সাহস করে কেউ এগোয় না। সবাই ভাবে পাপ তো কতই করেচি। প্রাণ দিতে যাবে কে? সারাদিন কাটলো। সন্ধ্যা নামে-নামে। একজন চণ্ডাল ঘাটের ধারে অশ্রুমুখী ব্রাহ্মণপত্নীকে দেখে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে। পার্বতী সকলকে যা বলে এসেছেন তাকেও তাই বললেন। চণ্ডাল শুনে ভেবে বললে–তার জন্য ভাবনা কি মা? আজ গঙ্গাস্নান করলে তো নিষ্পাপ হবোই, এত বড় যোগ যখন, এ জন্ম তো দূরের কথা শত জন্মের পাপ ক্ষয় হয়ে যাবে পাঁজিতে লিখেচে। তা দাঁড়ান, আমি ডুবটা দিয়ে আসি এবং একটু পরেই ডুব দিয়ে উঠে এসে বললে–মা ধরুন ওদিক, আমি পায়ের দিকটা ধরচি–চলুন নিয়ে যাই।
শিব নিজমূর্তি ধারণ করে চণ্ডালকে বর দিলেন। পার্বতীকে বললেন–পার্বতী দেখলে? এই লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে এই লোকটি মাত্র আজকের যোগের ফল লাভ করবে। মুক্তি যদি কেউ পায় এই চণ্ডালই পাবে।
গল্পটা আমার ভারি ভাল লাগল। সে-দিনকার চৈতন্যচরিতামৃতে পড়া সেই কথাটা মনে পড়ল–জ্যাঠাইমাকে বলেছিলাম, জ্যাঠাইমা বিশ্বাস করেন নি। ওঁদের শাস্ত্রের কথাতেই ওঁর বিশ্বাস নেই। অথচ মুখে হিন্দুয়ানি তো খুব দেখান! আর আমাকে, মাকে, সীতাকে, দাদাকে বলেন খিরিস্টান।
আজযের গুরুদেবের এই গল্পটা কি জ্যাঠাইমা কাকীমারা বুঝতে পারলেন? চণ্ডালের ওপর আমার ভক্তি হ’ল। আমি যেন মনে মনে কাশী চলে গিয়েচি, আমি যেন মণিকর্ণিকার ঘাটে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণবেশী শিব ও ক্রন্দনরতা পার্বতীকে প্রত্যক্ষ করেছি।
ও-বছর বড়দিনের সময় মিশনারী মেয়েরা আমাদের রঙীন কার্ড দিয়েছিল, ছোট একখানা ছবিওয়ালা বই দিয়েছিল। তাতে একটি কথা সোনার জলে বড় বড় করে লেখা আছে মনে পড়ল–তাহারা ধন্য যাহারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। কারণ তাহারা জীবনমুকুট প্রাপ্ত হইবে।
তার পরদিন সন্ধ্যাবেলাতেও গুরুদেব আমলকীতলায় আসন পেতে বসে গল্প বলছিলেন ছেলেমেয়েদের। একবার উঠে আহ্নিক করতে গেলেন, আবার এসে বসলেন। মেয়েরাও এলেন।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার দিকে আঙুল দিয়ে বললেন–ও ছেলেটি কে? রোজ দেখি দাঁড়িয়ে থাকে। এস এস বাবা, এদিকে এস।
প্রথমটা আমার বড় লজ্জা হ’ল কিন্তু কেমন একটা আনন্দও হ’ল। একটু এগিয়ে গেলাম। জ্যাঠাইমা বললে–ও আমার এক খুড়তুতো দেওরের ছেলে। ওরা এখানে থাকতো না, চা-বাগানে ওর বাবা কাজ করতো। এখানে এসে অসুখ হয়ে মারা গেল আর তো কেউ নেই, ওরা এ বাড়িতে থাকে।
গুরুদেব বললেন–এস দেখি বাবা, হাতটা দেখি, সরে এস। তারপর জ্যাঠাইমাদের দিকে চেয়ে বললেন–খুব লক্ষণযুক্ত ছেলে। এর বয়স কত?
আমায় লক্ষণযুক্ত বলাতে–বিশেষত অত ছেলের মাঝ থেকে-জ্যাঠাইমা কাকীমারা নিশ্চয়ই খুব খুশি হননি। জ্যাঠাইমা প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন আমার বয়স নাকি পনেরো বছর–আমি ওঁর ছেলে হাবুর চেয়েও দেড় বছরের বড়। আসলে আমার বয়স তেরো–জ্যাঠাইমার বড় ছেলে হাবুকে আমরা হাবুদা বলে ডাকি, সে আমাদের সবার চেয়ে দু-বছরের বড়। স্কুলে তার যা বয়েস লেখানো আছে, তাই ধরে বলচি।
তারপর গুরুদেব আমায় জিজ্ঞেস করলেন–কি পড় বাবা?
আমি কোন ক্লাসে পড়ি বললাম।
ধাতুরূপ কতদূর পড়েচ? লুঙ লিট বোঝ? এই শোনো একটি শ্লোক-
সোধ্যৈষ্ট বেদাংস্ত্রিদশানষ্ট
পিতৃতার্প্সীৎ সমমংস্তে বন্ধুন
ব্যজৈষ্ঠ ষড়বর্গমরংস্ত নীতৌ
সমূলঘাতংন্যবধীদরীংশ্চ।
হেসে বললেন—কত রকম ধাতুর ব্যবহার দেখেছ? এ হ’ল ভট্টিকাব্যের শ্লোক।
আমার বেশ ভালো লাগলো, গুরুদেবকেও এবং তাঁর শ্লোককেও। আমি এর আগে সংস্কৃত শ্লোক বেশি শুনিনি। চা-বাগানে কেউ বলতো না। শ্লোকটা আমি মুখস্থ করে নিলাম।
একদিন তিনি বাড়ির পাশের মাঠে শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বেলেচেন। আমায় দেখে বললেন–এসো জিতু–
আমি বললাম–কি করবেন আগুন জ্বেলে?…
—তামাক পোড়াবো!
— আমি বললাম, আমি পুড়িয়ে দিচ্চি।
গুরুদেব অনেক সংস্কৃত শ্লোক আমাকে শোনালেন। কুবেরের শাপে এক যক্ষ গৃহ থেকে বহুদূরে কোন পর্বতে নির্বাসিত হয়েছিল, বাড়ির জন্যে ভেবে ভেবে তার হাতের সোনার বালা ঢল হয়ে গিয়েছিল, তারপর আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে সেই পাহাড়ের মাথায় বর্ষার নতুন কালো মেঘ নামল–এই রকম একটা, শ্লোকের মানে। আমি তো সংস্কৃত পড়ি মোটে ঋজুপাঠ, কিন্তু আমাকেই তিনি আগ্রহের সঙ্গে এমনি ভাল ভাল অনেক শ্লোক শোনাতে লাগলেন–যেন আমি কত বুঝি!
এবার মনে হল আমার নিজের কথা যা কাউকে কখনও বলিনি এ পর্যন্ত–তাঁর কাছে খুলে বলি, আমার মনের সন্দেহ, আমার ঐসব অদ্ভুত জিনিস দেখার ব্যাপার, জ্যাঠাইমাদের সঙ্গে আচার-ব্যবহার নিয়ে আমার মত না মেলা,–সকলের ওপর ঠাকুরদেবতা সম্বন্ধে আমার অবিশ্বাস–এসব খুলে বলে তিনি কি বলেন শুনি। তাঁর ওপর এমন একটা শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হয়ে গেল আমার! যেন মনে হ’ল এঁর কাছে বললে ইনি সব বুঝিয়ে দিতে পারবেন আমাকে। এত বড় লোক ইনি, এত পণ্ডিত, কত কথা জানেন!
কিন্তু সুবিধে হ’ল না। বলি-বলি করেও বলতে আমার কেমন লজ্জা হ’ল। তিন দিন এমনি কেটে গেল, তারপর তিনি চলে গেলেন।
আমার কিন্তু বলতে পারলেই ভাল হত। একজন ভাল লোককে আমার সব কথা বলা দরকার। অথচ এখানে তেমন কোন লোককে আমি বিশ্বাস করিনে–কারুর ওপর আমার ভক্তি হয় না।
আমি আজকাল নির্জনে বসলেই অদ্ভুত জিনিস সব দেখি। যখন তখন, তার সময় নেই অসময় নেই, রাত নেই দিন নেই। এই তো সেদিন বসে আছি জ্যাঠাইমাদের পুকুরধারের বাগানে একলাটি–হঠাৎ দেখি পুকুরপাড়ের আমগাছগুলোর ওপরকার নীল আকাশে একটা মন্দিরের চুড়ো–প্রকাণ্ড মন্দির, রোদ লেগে ঝকমক করচে-সোনা না কি দিয়ে বাঁধানো যেন। মন্দিরের চারিপাশে বাগান, চমৎকার গাছপালা, ফুল ফুটে আছে, অপূর্ব দেখতে–ঠিক যেন আমাদের সোনাদা চা-বাগানের ধারে বনের গাছের ডালে ডালে ফোঁটা নীল অর্কিডের ফুল! আর একদিন দেখেছিলাম ঠিক ওই জায়গায় বসেই আকাশ বেয়ে সন্ধ্যার সময় তিনটি সুন্দরী মেয়ে, পরনে যেন শ্বেতচমরীর লোমে বোনা সাদা চকচকে লুটিয়ে-পড়া কাপড়–তারা উড়ে যাচ্চে এক সারিতে, বোধ হয় পুরো পাঁচ মিনিট ধরে তাদের দেখেচি। তারপর রোদ চকচক করতে লাগল, আর তাদের স্পষ্ট দেখা গেল না–ওপরের দিকে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল। এরকম নতুন নয়, কতবার দেখেছি, প্রায়ই দেখি, দু-পাঁচদিন অন্তর দেখি, দেখে দেখে আমার সয়ে গিয়েছে, আগের মত ভয় হয় না। কিন্তু এক-একবার ভাবি, এ আমার এক রকম রোগ–না, চোখ খারাপ হয়ে গিয়েছে, নাকি?
আমার কারুর সঙ্গে মিশতে সাহস হয় না এইজন্যে যে, হয়ত কোন সময় আবার অন্য ভাব এসে যাবে, আর কে সঙ্গে থাকবে সে আমায় ভাববে পাগল। হয়ত হাসবে, হয়ত লোককে বলে দেবে। এমনিও এ-বাড়িতে জ্যাঠাইমা, কাকীমা, কাকা, এঁরা আমায় পাগলই ভাবেন। কি করবো। আমি যা দেখি, ওঁরা তা দেখতে পান না, এই আমার অপরাধ। একটা উদাহরণ দিই–
ফাল্গুন মাসে ছোটকাকার মেয়ে পানী অসুখে পড়ল। একদিন দু’দিন গেল, অসুখ আর সারে না। জ্বর লেগেই আছে। সাতদিন কেটে গেল–জ্বর একই ভাব। দশ দিনের দিন। অসুখ এমনি বাড়ল, নৈহাটি থেকে বড় ডাক্তার আনবার কথা হ’ল।
পানীকে আমার এ-বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাল লাগে। তার বয়স বছর সাত আট, ঝাঁকড়া চুল মাথায়, চোখ কটা, সাহেবদের ছেলেমেয়েদের মত। এ-বাড়ির ছেলেমেয়েদের মুখে যেমন খারাপ কথা আর গালাগালি লেগেই আছে–পানীর কিন্তু তা নয়। তার একটা কারণ, সে এতদিন মামার বাড়িতে তার দিদিমার কাছে ছিল, গঙ্গার ওপারে ভদ্রেশ্বরে। সে বেশ মেয়ে, বেশ গান করতে পারে, প্রাণে তার দয়ামায়া আছে। পানীর অসুখ হয়ে পর্যন্ত আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল–আমার ইচ্ছে হয়েছিল ওর কাছে গিয়ে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে দিই–কিন্তু কাকীমা তো আমায় বিছানা ছুঁতে দেবে না, সেই ভয়ে পারতাম না।
পানীর তখন সতেরো দিন জ্বর চলচে–বুড়ো গোবিন্দ ডাক্তার ঘোড়ার গাড়ি করে স্টেশন থেকে এল––দালানে বসে মশলার কৌটো বার করে মশলা খেলে, ভাজা মশলার গন্ধে দালান ভুর ভুর করতে লাগল–চা ক’রে দেওয়া হ’ল, চা খেলে, তার পর ওষুধ লিখে দিয়ে ভিজিটের টাকা মেজকাকার হাত থেকে নিয়ে না-দেখেই পকেটে পুরলে–তার পর রোগীকে বার বার গরম জল খাওয়ানোর কথা বলে গাড়ি করে চলে গেল।
একটু একটু অন্ধকার হয়েছে কিন্তু এখনও বাড়িতে সন্ধ্যার শাঁখ বাজেনি, কি আলো জ্বালা হয়নি–হয়ত ডাক্তার আসবার জন্যে সকলে ব্যস্ত ছিল বলেই। আমি রোগীর ঘরে দোরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, কিন্তু পানীর বিছানায়–পানীর শিয়রে যে বসে আছে তাকে চিনতে পারলাম না। লালপাড় শাড়ী পরনে আধঘোমটা দেওয়া কে একজন, জ্যাঠাইমার মত দেখতে বটে কিন্তু জ্যাঠাইমা তো নয়! ঘরের মধ্যে আর কেউ নেই–এইমাত্র কাকীমা বাইরে গেছেন ডাক্তারে কি বলে গেল তাই জানতে ছোটকাকার কাছে। আমি ভাবচি লোকটা কে, এমন সময় তিনি মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে বললেন–জিতু, নির্মলাকে বোলো পানীকে আমি নিয়ে যাব, আমি ওকে ফেলে থাকতে পারবো না–ও আমার কাছ ভাল থাকবে, নির্মলা যেন দুঃখ না করে। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম–কে নির্মলা আমি চিনি নে, যিনি বলছেন তিনিই বা কে, কোথা থেকে এসেছেন, কই এ বাড়িতে তো কোনদিন দেখিনি তাঁকে, পানীকে তিনি এই অসুস্থ শরীরে কোথায় নিয়ে যাবেন, এসব কথা ভাববার আগেই ছোটকাকীমা ঘরে ঢুকলেন–কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে বিছানার পাশে যিনি বসে আছেন, ছোট কাকীমা যে তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন, এমন কোনো ভাব দেখলুম না।
বিছানায় যিনি বসে ছিলেন তিনি আমায় বললেন–জিতু, নির্মলাকে বল এইবার– আমি চলে যাচ্ছি।
আমি কিছু না ভেবে কলের পুতুলের মত চেয়ে বললাম–নির্মলা কে? ছোট কাকীমা আমার দিকে কট করে চেয়ে বললে,–কেন, সে খোঁজে কি দরকার? তিনি ভাবলেন আমি বুঝি তাঁকেই জিজ্ঞেস করচি। অন্য মহিলাটি বিছানা থেকে নেমে ওদিকের দরজা দিয়ে বার হয়ে চলে গেলেন, যাবার সময় আমাকে বললেন–এই তো নির্মলা ঘরে এসেচে।
আমি বললাম–আপনি কেন বলুন না নিজে?
ততক্ষণ তিনি বার হয়ে চলে গিয়েছেন।
ছোটকাকীমা আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন। বললেন–কি বকচিস পাগলের মত? ওদিকে চেয়ে কার সঙ্গে কথা বলচিস? নির্মলা কে সে খোঁজে তোমার কি দরকার শুনি?
জ্যাঠাইমা ঘরে ঢুকলেন সেই সময়ই। তিনি বললেন–কি হয়েছে? কি বলছে ও?
ছোটকাকীমা বললেন–আপন মনে কি বকচে দ্যাখো না দিদি–ও এ ঘর থেকে চলে যাক। আমার ভয় করে, ও ছেলের মাথার ঠিক নেই–আমার নাম করে কি বলচে।
জ্যাঠাইমা বললেন–কি বলছিলি কাকীমার নাম করে?
আমার বিস্ময় তখনো কাটেনি–আমি তখন কেমন হয়ে গিয়েচি। ছোটকাকীমার নাম যে নির্মলা আমি তা কখনও শুনিনি–ঐ মেয়েটি যে চলে গেল, আমার সঙ্গে কথা বলে গেল–ছোটকাকীমা তাঁকে দেখতে পেলেন না, তাঁর কথাও শুনতে পেলেন না এই বা কেমন! জ্যাঠাইমার কথার কোনো জবাব আমার মুখ দিয়ে বেরুলো না, আমার মাথা ঘুরে উঠল। তারপর কি যে ঘটল আমি তা জানি না।
জ্ঞান হলে দেখি মা আমার মাথা কোলে নিয়ে বসে কাঁদছেন। আমি দালানেই শুয়ে আছি। চারিপাশে বাড়ির অনেক মেয়ে জড় হয়েছে, সবাই বললে আমার মৃগীরোগ আছে। ভাবলাম হয়ত হবে, একেই বোধ হয় মৃগীরোগ বলে। আমার বড় ভয় হ’ল, বাবা মারা গিয়েচেন পাগল হয়ে, এ-বাড়ির অনেকের মুখে শুনেচি আমরাও পাগল হ’তে পারি। তার মধ্যে আমার নাকি পাগলের লক্ষণ আছে অনেক।
সে-সন্ধ্যার কথা কখনও ভুলব না। জীবনে এত ভয় আমার কোনদিন হয়নি–এই ভেবে ভয় হ’ল যে আমার সত্যিই কোনো কঠিন রোগ হয়েছে। কিন্তু কাউকে বলবার উপায় নেই রোগটা কি। মৃগীরোগই হয়ত হয়েছে, নয়তো বাবার মত পাগলই হয়ে যাব হয়ত–না, কি হবে!
যে রাত্রে বাবা পাগল হয়ে গিয়ে বালিশের তুলো ছিঁড়ে ঘরময় ছড়িয়ে দিলেন, কেরোসিনের টেমির মিটমিটে অস্পষ্ট আলোয় রাতদুপুরে তাঁর সেই অদ্ভুত সারা গায়ে, মুখে, মাথায় তুলোমাখা মূর্তি বার বার মনে আসতে লাগল–আমার মনে সে-রাত্রি, সে মূর্তি চিরদিনের জন্য আঁকা হয়ে আছে। ঐ রকম কি আমারও হবে!
মাকে আঁকড়ে ধরে শুয়ে রইলাম সারারাত। মনে মনে কতবার আকুল আগ্রহে প্রার্থনা করলাম–প্রভু যীশু, তুমি দেবতা, তুমি আমার এ রোগ সারিয়ে দাও, আমায় পাগল হ’তে দিও না। আমায় বাঁচাও।
সকালে একটু বেলায় রোদ উঠলে পানী মারা গেল।
জ্যাঠাইমা সকালে উঠে বৌদের কুটনো কুটবার উপদেশ দেবেন, কি কি রান্না হবে তা ঠিক করে দেবেন–এ বাড়িতে ভাগ্নে-বৌ ছাড়া কেউ গাই দুইতে পারে না–এদিকের কাজ সেরে জ্যাঠাইমা তাকে সঙ্গে নিয়ে গোয়ালে নিজের চোখের সামনে দুধ দোয়াবেন– সীতা বলে, পাছে ভাগ্নে-বৌ নিজের ছেলেমেয়েদের জন্যে কিছু সরিয়ে রাখে বোধ হয় এই ভয়ে। তারপর তিনি স্নান করে গরদের কাপড় পরে ঠাকুরঘরে ঢুকবেন–সেখানে আহ্নিক চলবে বেলা এগারোটা পর্যন্ত, সে-সময়ে ঠাকুরঘরের দোরে কারুর গিয়ে উঁকি দেবার পর্যন্ত হুকুম নেই। সবাই বলে জ্যাঠাইমা বড় পুণ্যবতী। পুণ্যবতীই তো! একদিন যে-ছবি দেখেছিলাম, ভুলিনি কোনদিন। জ্যাঠাইমা ঠাকুরঘর থেকে বার হয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েচেন, পরনে গরদের শাড়ী, কপালে সিঁদুর, চন্দনের টিপ, টকটকে চেহারা–এমন সময় আমার মা একরাশ বাসি কাপড় নিয়ে গোবরছড়ার বালতি হাতে পুকুরের ঘাটে যাচ্চেন, পরনের ময়লা কাপড়ের জায়গায় কাদা গোবরের ছাপ, রুক্ষ চুল। বেলা বারোটার কম নয় সকাল থেকে মা’র মুখে এক ফোঁটা জল পড়েনি–
জ্যাঠাইমা ডেকে বললেন–বৌ, রান্নাঘরের ছোট জালার জল কি কাল তুমি তুলেছিলে? আমি না কতবার তোমায় বারণ করেচি ছোট জালায় তুমি জল ঢালবে না? বড় জালায় বেশী না পার তো তিন কলসী করে ঢেলেও তো বেগার শোধ দিলে পার?
ছোট জালার জল জ্যাঠামশায়, জ্যাঠাইমা বা কাকারা খান। জ্যাঠাইমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, মা গুরুমন্ত্র নেননি, মায়ের হাতের জল অতএব শুদ্ধ নয়, সে জল ওঁরা খাবেন কি করে?
সত্যিই তো জ্যাঠাইমা পুণ্যবতী। নইলে তিনি ঠাকুরঘরে পবিত্র দেহে পবিত্র মনে এতক্ষণ জপ-আহ্নিক করছিলেন, আর মা মরছিলেন বেলা বারোটা পর্যন্ত গোয়াল আঁস্তাকুড় ঘেঁটে– মা নাস্তিক মাতাল কেরানীর স্ত্রী, তার ওপর আবার মেমের কাছে লেখাপড়া শিখে জাত খুইয়েচেন, কেন ওঁরা জল খেতে যাবেন মা’র হাতের?
আমার মনে হ’ল ঠাকুরও শুধু বড়মানুষের, পুণ্যিও বড়মানুষের জন্যে–নইলে মায়ের, ভাগ্নেবৌয়ের, ভুবনের মায়ের সময় কোথায় তারা নিশ্চিন্ত মনে, শুচি হয়ে, গরদ পরে তাঁর পায়ে ফুলতুলসী দেবে?
বোধ হয় এই সব নানা কারণে জ্যাঠাইমাদের বাড়ির গৃহদেবতার প্রতি আমি অনেকটা চেষ্টা করেও কোনো ভক্তি আনতে পারতাম না। এক-একবার ভেবেচি হয়ত সেটা আমারই দোষ, আমার শিক্ষা হয়েছে অন্যভাবে, অন্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের মধ্যে, তাদের কাছে যে দয়া-মমতা পেয়েছি, আর কোথাও তা পাইনি বলেই। ছেলেবেলা থেকে যীশুখৃষ্টের কথা পড়ে আসছি, তাঁর করুণার কথা শুনেচি, তাঁর কত ছবি দেখেচি। আমার কাছে একখানা ছবি আছে খৃস্টের, মেমেরা বড়দিনের সময় আমায় দিয়েছিল–বকের পালকের মত ধপধপে সাদা দীর্ঘ ঢিলে আলখাল্লা-পরা যীশু হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে– চারিধারে তাঁর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় করেছে, একটি ক্ষুদ্র শিশু তাঁর পা ধরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, আর তিনি তাকে ধরে তুলতে যাচ্ছেন নিচু হয়ে মুখে কি অপূর্ব জ্যোতি, কি সুন্দর চাউনি–আমি এ ছবিখানা বইয়ের ভেতরে রেখে দিই, রোজ একবার দেখি–এত ভালো লাগে!
কিন্তু যীশুখৃস্টের সম্বন্ধে কোনো ভাল বই পাইনে–আমার আরও জানবার ইচ্ছে হয় তাঁর কথা–মাকে যে মেমেরা পড়াত চা-বাগানে, তারা একখানা মথি-লিখিত সুসমাচার ও খানকতক ছাপানো কাগজ বিলি করেছিল, সেইগুলো কতবার পড়া হয়ে গিয়েছে, তা ছাড়া আর কোনো বই নেই। এখানে এসে পর্যন্ত আর কোনো নতুন বই আমার চোখে পড়েনি।
আমাদের স্কুলে একটা ছেলে নতুন এসে ভর্তি হয়েছে আমাদেরই ক্লাসে। তার নাম বনমালী, জাতে সদগোপ, রঙ খুব কালো, কিন্তু মুখের চেহারা বেশ, বয়সে আমার চেয়ে কিছু বড়। সে অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, এখানে একটা ঘর ভাড়া করে থাকে, বামুনে রাঁধে। অনেক দূরের পাড়াগাঁয়ে তার বাড়ি, সেখানে লেখাপড়া শেখার কোনো সুবিধে নেই, তাই ওকে ওর বাপ-মা এই গাঁয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু লেখাপড়ার দিকে বনমালীর মন নেই, সে বাসার উঠোনে এক তুলসীচারা পুঁতে বাঁধিয়েচে, দিনরাত জপ করে, একবেলা খায়, মাছমাংস ছোঁয় না, শ্রীকৃষ্ণ নাম তার সামনে উচ্চারণ করবার জো নেই, তা হলেই তার চোখ দিয়ে জল পড়বে। রাত্রে জপের ব্যাঘাত হয় বলে বিকেলবেলা স্কুল থেকে গিয়ে খেয়েদেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বামুন ঠাকুরকে ছুটি দেয়–তার পর ব’সে ব’সে অনেক রাত পর্যন্ত জপ করে, হরিনাম করে। সে সময় কেউ কাছে গেলে সে ভারি চটে। অদ্ভুত ধরনের ছেলে বলে তাকে সকলে ভারি খেপায়–স্কুলের ছেলেরা তার সামনে কিষ্ট কিষ্ট বলে চেঁচায় তার চোখে জল বেরোয় কি না দেখবার জন্যে, ওই নিয়ে মাস্টারেরা পর্যন্ত খিঁচুনি দিতে বাকী রাখে না। সেদিন তো এ্যালজেব্রার আঁক না পারার দরুন আমাদের সামনে সেকেন্ড মাস্টার ওকে বললে–তুমি তো শুনিচি কেষ্ট নাম শুনলে কেঁদে ফেল–তা যাও, পয়সা আছে বাপের, মঠ বানাও, মচ্ছব দেও, লেখাপড়া করবার শখ কেন? এ-সব তোমার হবে না বাপু।
আমি একদিন বনমালীর কাছে সন্ধ্যার সময় গিয়েছি। ও তখন একটা টুলের ওপর ব’সে একমনে দেওয়ালের দিকে চেয়ে বোধ হয় জপ করচে–আমায় দেখে উঠে দোর খুলে দিল, হেসে বসতে বললে। ওকে অদ্ভুত মনে হয়, সেজন্যেই দেখা করতে গিয়েছিলাম যে তা নয়–আমার মনে হয়েছিল ও যে-রকম ছেলে, ও বোধ হয় আমার নিজের ব্যাপারগুলোর একটা মীমাংসা করে দিতে পারবে। তা ছাড়া ওকে আমার ভাল লাগে খুব, ওকে ভাল মানুষ পেয়ে সবাই খেপায়, অথচ ও প্রতিবাদ করে না, অনেক সময় বোঝে না যে তারা খেপাচ্ছে, এতে আমার বড় মায়া হয় ওর ওপর।
বনমালীকে জিজ্ঞেস করলাম সে কিছু দেখে কিনা। সে আমার কথা বুঝতে পারলে না, বললে–কি দেখবো?
তাকে বুঝিয়ে বললাম। না,–সে কিছু দেখে না।
তারপর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ঘরে একখানা ছবি ছিল, আমি সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম–ওখানা কি তোমার ঠাকুরের ছবি?
বনমালীর গলার সুর বদলে গেল, চোখের চাউনি অন্য রকম হয়ে গেল। সে বললে– ঠিক বলেচ ভাই, আমার ঠাকুরের ছবি, চমৎকার কথা বলেচ ভাই–ওই তো আমার সব, আমার ঠাকুর শুধু কেন, তোমার ঠাকুর সবারই ঠাকুর—
বলতে বলতে দর দর করে তার চোখে জল পড়তে লাগল।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু একটু পরে বনমালীর কান্নার বেগ থামলে গর্বের সুরে বললাম–খুব গোপনীয় কথা বললাম ওকে–কারও কাছে এ পর্যন্ত মুখ ফুটে কথাটা বলিনি। বললাম–আমার ঠাকুর অন্য কেউ নয়, আমার ঠাকুর যীশুখ্রীস্ট–আমার কাছেও ছবি আছে–
বনমালী হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে রইল–তারপর অপ্রতিভভাবে বললে–ও, তোমরা খৃস্টান?
আমি চুপ করে রইলাম।
বনমালী ভেবে বললে–তাঁর কাছে সব সমান—
আমি বললাম–কার কাছে?
–শ্রীহরির কাছে ভাই, আবার কার কাছে? তাঁর কাছে কি আর হিন্দু, মোছলমান, খৃস্টান আছে? তিনি যে পতিতপাবন–অধমের ঠাকুর–
আমার মনে ব্যথা লাগল এই ভেবে, বনমালী আমাকে অধম মনে করছে। যীশুখৃস্টকে ও ছোট করতে চায়। আমি বললাম–যীশুর কাছেও সব সমান। পাপীদের জন্যে তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন–জান? মথিলিখিত সুসমাচারে লিখেছে, যে তাহাতে বিশ্বাস করে সে অনন্ত জীবন–
মথি-লিখিত সুসমাচারের বাইরে আমার আর কিছু জানা নেই। বনমালী কিন্তু সংস্কৃতে শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান আবৃত্তি করে আমায় শ্রীকৃষ্ণের রূপ বুঝিয়ে দিলে–আরও অনেক কথা বললে। আমি দু-তিন দিন তার কাছে গেলাম, তার ঠাকুর সম্বন্ধে শুনবার জন্যে।
জ্যাঠাইমাদের বাড়ির সকলের চেয়ে ও বেশী জানে ওদের ধর্ম সম্বন্ধে–এ আমার মনে হ’ল। কিন্তু বনমালী আমার খ্রীস্টভক্তি ভাল চোখে দেখলে না, বললে–হিন্দু হয়ে ভাই এ তোমার ভারি অদ্ভুত কাণ্ড যে তুমি অপরের দেবতাকে ভক্তি করো। গীতায় বলেছে, স্বধর্মে নিধনং শেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ—-অর্থাৎ নিজের ধর্মে–
আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, হিন্দু আমি কখনই না। আমরা যেখানে যে-অবস্থায় মানুষ হয়েচি সেখানে হিন্দুধর্মের কথা কিছু শুনিনি কোনো দিন কেউ বলত না। যা বলত, তাই শুনেচি, তাই বিশ্বাস করেছি–তা মনে লেগেছে। এতে আমার কি কোনো দোষ হয়েছে ভাই?
সেদিন সন্ধ্যার সময় আমাদের দালানে আমি বসে পড়চি, এমন সময় কার পায়ের শব্দ শুনে চেয়ে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম–ছোটকাকীমা দাঁড়িয়ে! ছোটকাকীমা বড় মানুষের মেয়ে, তিনি তো কস্মিনকালে আমাদের ভাঙা দালানে পা দেননি–বিশেষ করে আমাদের দু-চোখে তিনি দেখতে পারেন না কোনো কালে–বরং মেজকাকীমা সময়ে অসময়ে নরম হন, ছোট কাকীমার মুখে মিষ্টি কথা কোনো দিন শুনিওনি। আমাদের ঘরে আর কেউ নেই–দাদা এখনও ফেরেনি–সীতা ও মা জ্যাঠাইমাদের অন্দরে। আমি দাঁড়িয়ে উঠে থতমত খেয়ে বললাম–কি কাকীমা?
ছোটকাকীমা এদিক-ওদিক চেয়ে নীচু সুরে বললেন–তোর সঙ্গে কথা আছে জিতু।
আমি বললাম–কি বলুন?
কাকীমা বললেন–পানী যে-রাতে মারা যায়, সেদিন তুই আমায় কি বলেছিলি মনে আছে?
আমার ভয় হ’ল, বললাম–না কাকীমা।
ছোটকাকীমা হঠাৎ আমার হাত দুটো তাঁর দু’হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন–বল বাবা জিতু, সেদিন তোর কথা সবাই উড়িয়ে দিয়েছিল, আমি কিন্তু তারপর সব বুঝেছিলাম, কাউকে বলিনি। পানী ছেড়ে গিয়ে আমায় পাগল করে রেখে গিয়েচে–তুই বল জিতু। আমার মাকে তুই দেখেছিলি সে-রাত্রে, তিনি পানীকে ভালবাসতেন, তাই নিতে এসেছিলেন-মরে গিয়েও তাঁর পানীর কথা—
আমি জানতাম না যে পানীর দিদিমা মারা গিয়েছেন। আমি বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞেস করলাম–আপনার মা বেঁচে নেই?
–না, পানী তাঁর কাছ থেকে ফাল্গুন মাসে এল, তিনি আষাঢ় মাসে তো মারা গেলেন। তুই পানীকে দেখতে পাস জিতু? তোকে সেদিন সবাই পাগল বললে, কিন্তু আমি তারপর ভেবে দেখলাম তোর কথার একটুও পাগলামি নয়–সব সত্যি। তুই আমার মাকে দেখতে পেয়েছিলি–সত্যি বল না জিতু বাবা পানীকে দেখিস?
আমার চোখেও জল এল। ছোট কাকীমাকে এত কাতর দেখিনি কখনও–তাছাড়া পানীকে আমিও বড় ভালবাসতাম এ বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে। বললাম–না কাকীমা, পানীকে আমি কোনো দিন দেখিনি–আপনার পা ছুঁয়ে বলতে পারি–
ছোটকাকীমা আরও কি বলতে যাচ্ছিলেন, মেজকাকার গলার স্বর শুনে তিনি পালিয়ে পেলেন। ছোটকাকীমার কথা শুনে আমি কিন্তু আকাশ-পাতাল ভাবতে বসলাম। আমি সেদিন সত্যিসত্যি কাউকে দেখেছিলাম? তবে? সে যেই হোক, পানীর দিদিমাই হোক, মরাই হোক বা জীবন্তই হোক! এটা তা হলে আমার রোগ নয়? আর কেউ তবে দেখে না কেন?
কিংবা হয়ত ছোটকাকীমা মেয়ের শোকে বুদ্ধি হারিয়েছেন, কি বলচেন না-বলচেন, উনিই জানেন না। ওঁর কথার উপর বিশ্বাস কি?
