তেরো
শ্রাবণ মাসের প্রথমে আমার পাঠশালা গেল উঠে। আর আমার এখানে শুধু-হাতে থাকা অসম্ভব। মালতীকে একদিন বললাম—শোনো, আমি চলে যাচ্ছি মালতী–
সে অবাক হয়ে বললে–কেন চলে যাবেন?
—কতদিন এসেছি ভাবো তো এখানে? প্রায় দশ মাস হ’ল—
মালতী চুপ করে থেকে বললে ঘুরে আবার আসবেন কবে?
—ভগবান জানেন। না-ও আসতে পারি।
মালতীর মুখের স্বাভাবিক হাসি হাসি ভাবটা যেন হঠাৎ নিবে গেল। বললে–কেন আসবেন না? আখড়ার কত কাজ বাকি আছে মনে নেই?
ওর মুখ দেখে আমার আবার মনে হ’ল,–ওর কেউ নেই, এখানে ও একেবারে একা। ওকে বুঝবার মানুষ এই গ্রাম্য অশিক্ষিত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের মধ্যে কে আছে? আমার কাছেই ওর যা-কিছু অভিমান আবদার খাটে–এর মধ্যে যে লীলাময়ী কিশোরী আছে, সে তার নারীত্বের দর্প, গর্ব ও অভিমান প্রকাশ করে সুখ পায় একমাত্র আমার কাছে–আমি তা জানি। তা ছাড়া, ও এখনও বালিকা, ওর ওপর আমার মনে কি যে একটা অনুকম্পা জাগে…ওকে সকল দুঃখ, বিপদ থেকে আড়াল করে রাখি ইচ্ছা হয়। শ্রাবণ মাসে নীল মেঘের রাশি দ্বারবাসিনীর চারিধারের দিগন্তবিস্তৃত তালীবন-শোভা মাঠের ওপর দিয়ে উঠে যায় রোজ…আমি দীঘির ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, দেখে দেখে মনে কত কি অনির্দিষ্ট অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা জাগে। মনে হয় ছোট্ট কোন কলস্বনা গ্রাম্য নদীতীরে খড়ের ঘরে মালতীকে নিয়ে ছোট্ট সংসার পাতবো…আমরা দুজনে এমনি সব বর্ষা-মেদুর শ্রাবণ-দিনে ব’সে ব’সে কত কথা বলব, কত আলোচনা করব। ওকে রাঁধতে দেব না, কাজ করতে দেব না, আমার কাছ থেকে উঠতে দেব না–কত বিশ্বাসের কথা, ভক্তির কথা, জ্ঞানের কথা, সাধু-মোহন্তের কথা, আকাশের তারাদের কথা–ও আমায় বোঝাবে, আমি ওকে বোঝাবো।…কিন্তু তা হবার নয়। মালতী ওর বাপের আখড়া ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না–আমি অনেকবার ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে ওর মনের এ ইচ্ছা বুঝেছি। আমি ওকে চাই একান্ত আমার নিজস্ব-ভাবে–এখানে থাকলে ও দিনে রাতে কাজে এত ব্যস্ত থাকে যে ওকে সেভাবে পাওয়া অসম্ভব। এই আখড়াই হয়েছে ওর আর আমার মধ্যে ব্যবধান। আমি এখান থেকে ওকে নিয়ে যেতে চাই। আমিও এখানে থাকতে পারব না চিরকাল। মালতীকে ভালবাসি, কিন্তু ওকে বিবাহ করে এই রাঢ়-অঞ্চলের এক গ্রাম্য আখড়ায় চিরকাল কি করে কাটাবো বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী সেজে? আমি ওকে নিয়ে যাব এখান থেকে।
এক দিনের ব্যাপারে মালতীকে আরও ভাল করে চিনলুম। দ্বারবাসিনী গ্রামের বৃদ্ধ শম্ভু বাঁড়ুয্যে চার-পাঁচ দিনের জ্বরে মারা গেল। তিনি এখানকার সমাজের কাছে একঘরে ছিলেন–এটা আমি আগেই জানতাম। তাঁর একমাত্র বিধবা কন্যাকে নিয়ে কি-সব কথা নাকি উঠেছিল–তাই থেকে গ্রামে শম্ভু বাঁড়ুয্যে একঘরে হন। শম্ভু বাঁড়ুয্যে কোথাও যেতেন না, কারও সঙ্গে মিশতেন না, তাঁর হাতেও দু-পয়সা ছিল–সবাই বলত টাকার গুমর।
বেলা পাঁচটার সময় মালতী এসে বললে–শুনেছেন ব্যাপার? শম্ভু বাঁড়ুয্যেকে এখনও বের করা হয় নি–আমি এতক্ষণ ছিলাম সেখানে। সেই দুপুর থেকে একজন লোকও ওদের বাড়ির উঠোন মাড়ায় নি। মড়াকোলে মেয়েটা দুপুর থেকে বসে আছে–ওর মা তো বাতে পঙ্গু, উঠতে পারে না। আপনি আসুন, দু-জনে মড়া তো দোতলা থেকে নামাই–তার পর উদ্ধব-জ্যাঠাকে বলেছি আখড়ার লোকজন নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবে– ব্রাহ্মণের মড়া অপর জাতে ছুঁলে ওদের কষ্ট হবে–তাই চলুন আপনি আর আমি আগে নামাই–তার পর আমাদেরই নিয়ে যেতে হবে অজয়ের ধারে–পারবেন তো?
তিনজনে ধরাধরি করে সেই ঘোরানো ও সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে মড়া নামানো–ওঃ সে এক কাণ্ড আর কি! মালতী আর শম্ভু বাঁড়ুয্যের মেয়ে নীরদা এক দিকে–আমি অন্য দিকে। নীরদা দেখলুম খুব শক্ত মেয়ে–বয়সে মালতীর চেয়ে বড়–বছর বাইশ হবে ওর বয়েস, মালতীর মত মেয়েলী গড়নের মেয়ে নয়, শক্ত, জোরালো হাত-পা, একটু পুরুষ ধরনের মালতী খুব ছুটোছুটি করতে পারে বটে, কিন্তু ওর গায়ে তেমনি শক্তি নেই। নীরদার সাহায্য না পেলে সেদিন শুধু মালতীকে দিয়ে মড়া নামানো সম্ভব হত বলে মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত গাঁয়ের লোক এল এবং তারাই মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে গেল। আমিও সঙ্গে গেলুম, মেয়েদের যেতে হ’ল না, মালতী রইল নীরদার কাছে। নীরদা আমায় বললে–দাদা, শ্রাদ্ধের সময় কিন্তু আপনাকে সব ভার নিতে হবে। আর কারও হাতে দিয়ে আমার বিশ্বাস হবে না। রুণি তো আছেই, আপনাকে অন্য কিছু খাটাবো না, ভাঁড়ারের ভার আপনাকে হাতে নিতে হবে, নইলে এ-সব পাড়াগাঁয়ের ব্যাপার আপনি জানেন না।
বেশ ঘটা করেই শ্রাদ্ধ হ’ল। মালতী বুক দিয়ে পড়ে কি খাটুনিটাই খাটলে! মালতী, তুমি আমার চোখ খুলে দিলে। ঘুম নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, বসা নেই–কিসে কাজ সর্বাঙ্গসুন্দর হবে, কেউ নিন্দে করবে না ওদের, কোন জিনিস অপচয় না হয় ওদের, সে-ই একমাত্র লক্ষ্য। পরের কাজে এমনি করে নিজেকে ঢেলে দিতে তুমি পার তোমার বাবার রক্ত তোমার গায়ে বইছে বলে।
নীরদাকেও চিনলুম সেদিন।
রাত দশটা। রান্নাঘরের দরদার কাছে শূন্য ডালের গামলা, লুচির ধামা, ডালনার বালতির মধ্যে নীরদা দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন কি খাটুনিই খেটেছে সে! চরকির পাক ঘুরেছে মালতীর সঙ্গে সমানে সেই সকাল থেকে–এর মধ্যে আবার পীড়িতা মায়ের দেখাশুনা করেছে ওপরে গিয়ে। ঘামে ও শ্রমে মুখ রাঙা নীরদার রং বেশ ফর্সা, চুল আলুথালু হয়ে মুখের পাশে কপালে পড়েছে।
আমি বাইরের ক-জন লোককে খাওয়াব ব’লে কি আছে না-আছে দেখতে রান্নাঘরে ঢুকেছি। নীরদা বললে–দাদা, কিছু নেই আর ক-জন লোক? আচ্ছা দাঁড়ান, ময়দা মাখছি, দিচ্ছি ভেজে।
আমি বললুম–আর তুমি আগুনের তাতে যেও না নীরদা। তোমার চেহারা যা হয়েছে! আচ্ছা দাঁড়াও–মালতীকে বলি একটু মিছরির শরবৎ তোমায় বরং দিতে–
নীরদা বললে–দাঁড়ান, দাঁড়ান দাদা। রুণি কতবার খাওয়াতে এসেছিল–সে কি চুপ করে থাকবার মেয়ে?
তারপর হেসে বললে–আজ যে একাদশী, দাদা।
আমার চোখে জল এল। আর কিছু বললাম না। মেয়েমানুষের মত সহ্য করতে পারে কোন জাত? অনেক শিখলাম এদের কাছে এই ক-মাসে।
মাকে দেখেছি, বৌদিদিকে দেখেছি, সীতাকে দেখেছি, শৈলদিকে দেখেছি, এদেরও দেখলাম। অথচ এই নীরদাকে ভেবেছিলুম অশিক্ষিতা গ্রাম্য মেয়ে, ওর কথাবার্তায় রাঢ় দেশের টান বড় বেশী ব’লে।
মালতী আখড়ায় ফিরে এসে আমায় বললে–অনেকগুলো সন্দেশ এনেছি, খান– নীরদাদিদি জোর করে দিলে। ভাল সন্দেশ, দ্বারবাসিনীতে এ-রকম করতে পারে না, সিউড়ি থেকে আনানো।
তার পর কেমন এক ধরনের ভঙ্গি করে হাসতে হাসতে বললে–বসুন, ঠাঁই করে দিই আপনাকে। ও-বেলার লুচি আছে, দই আছে,–নীরদাদিদি একরাশ খাবার দিয়েছে বেঁধে–
ওকে এত ছেলেমানুষ মনে হয় এই-সব সময়ে!
ঘরে কেউ নেই, নিঃসঙ্কোচে আমার কাছে বসে ও আমায় খাওয়ালে–খেতে খেতে একবার ওর মুখের দিকে চাইলাম। কি অপূর্ব স্নেহ-মমতামাখা দৃষ্টি ওর চোখে! মালতীর কাছে এত ঘনিষ্ঠ যত্ন এই কিন্তু প্রথম। বললে–আমি কি আর দেখি নি যে আজ সারাদিন আপনি শুধু খেটেছেন আর পরিবেশন করেছেন, খাওয়া যা হয়েছিল ও-বেলায় আপনার, তার আমি সন্ধান রাখি নি ভেবেছেন? খান,–না–ও লুচি ক-খানা খেতেই হবে।
খাবো কি, লুচি গলায় আটকে যেতে লাগল–সে কি অপূর্ব উল্লাস, আমার সারাদেহে কিসের যেন শিহরণ। আজ সারদিনের ভূতগত খাটুনির মধ্যেও মালতী দৃষ্টি রেখেছিল আমি কি খেয়েছি না-খেয়েছি তার ওপর।
ঘন বর্ষা নামল। সারা মাঠ আঁধার ক’রে মেঘ ঝুপসি হয়ে উপুড় হয়ে আছে। এই সব দিনে মালতীকে সর্বদা কাছে পেতে ইচ্ছে করে–ইচ্ছে করে ঘরের কোণে বসে ওর সঙ্গে সারা দিনমান বাজে বকি। কিন্তু ও আসে না, এমনই সব বর্ষার দিনে আখড়ার যত সব খুচরো কাজে ও ব্যস্ত থাকে।
দু-একবার যখন দেখা হয় তখন বলি–মালতী, আস না কেন?
মালতী বলে সে আসবে। তার পর এক ঘণ্টা, দু ঘণ্টা কেটে যায়, ও আসে না। আমার রাগ হয়, অভিমান হয়। ও যদি আমার জন্যে একটুও ভাবত, তাহলে কি আর না এসে পারত? ওর কাছে কাজই বড়, আমি কেউ নই। কিন্তু হয়ত অপ্রত্যাশিত ভাবে হঠাৎ মালতী এসে পড়ে। প্রায়ই বিকেলের দিকে, এমন কি সন্ধ্যার সময়। চুলটি টান-টান করে বেঁধে পান খেয়ে ফুল্ল ওষ্ঠাধর রাঙা ক’রে হাসিমুখে আমার দাওয়ার সামনে এসে বলে–কি করছেন?
–এস মালতী, সারাদিন দেখি নি যে?
–আপনার কেবল–সারাদিন দেখি নি, আর, এই তখন ডাকলুম এলে না কেন, আর, কেন আস না–এই-সব বাজে কথা। আসি কখন? দেখছেন তো। খেয়ে উঠেছি এই তো ঘণ্টাখানেক আগে। কাজ ছিল।
–কি কাজ ছিল আমি আর জানিনে মালতী? উদ্ধব-বাবাজীর কোণের ঘরে মেঝের চাটাই পেতে বসে তোমার সেই কবিতার বই লিখছিলে–আমি দেখি নি বুঝি?
–বেশ, দেখেছেন তো দেখেছেন। আসুন বিষ্ণুমন্দিরে সন্ধে দেখিয়ে আসি–একা ভয় করে।
বাস্তবিকই আমি ওকে একমনে বই লিখতে দেখেছিলাম। প্রায়ই দেখি। মালতী ঠিক পাগল, আচ্ছা, পাষণ্ডদলনের অনুকরণে লেখা ওর বই কে পড়বে যে রাত নেই দিন নেই বই লিখছে! ওর মুখ দেখলে আমার কষ্ট হয়। ওই এক খেয়াল ওর। মালতীর সঙ্গে বিষ্ণুমন্দিরে গেলাম। মালতীর এই এক গুণ, ও যখন মেশে তখন মেশে নিঃসঙ্কোচে, উদার ভাবে। সে-সম্বন্ধে কোনো বাধা বা সংস্কার ও মানে না। কেন এই সন্ধ্যাতে আমার সঙ্গে একা যাবে পুকুরপাড়ের বিষ্ণুমন্দিরে–এ-সব নিয়ে সঙ্কোচ নেই ওর। মন্দিরের পথে যেতে যেতে মনে হ’ল মালতীকে পেয়ে আমার এই বর্ষাসন্ধ্যাটি সার্থক হ’ল। ওকে ছেড়ে আর কিছু চাই নে। কাঞ্চনফুলতলায় গিয়ে বললাম–সেই গানটা গাও না, সেদিন গাইছিলে গুনগুন করে!
মালতী ছেলেমানুষের মত ভঙ্গিতে বললে–উদ্ধব-জ্যাঠা যে শুনতে পাবেন?
—তা পাবেন, পাবেন।
—তা পাবেন, পাবেন।
—তবে আসুন পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসি।
মালতীর মুখে গানটা বেশ লাগে–দু-তিনবার শুনলাম।
আমার নয়নে কৃষ্ণ নয়নতারা হৃদয়ে মোর রাধা-প্যারী
আমার বুকের কোমল ছায়ায় লুকিয়ে খেলে বনবিহারী।
গান শেষ হ’লে বললাম–শোন কথাটা কথা বলি মালতী, তুমি আস না কেন? তোমাকে না দেখলে আমার বড় কষ্ট হয়। আজ সারাদিন বসেছিলুম ঘরের দাওয়াতে, এমন বর্ষা গেল–তুমি চৌষট্টিবার আমার ঘরের সামনে দিয়ে যাও, একবার তো এলে পারতে? তোমার সে-সব নেই। শুধু কাজ আর কাজ। এই যে তোমাকে পেয়েছি, আর আমার যেন সব ভুল হয়ে গিয়েছে–সত্যি বলছি মালতী।
মালতী মুখ নীচু করে হাসি-হাসি মুখে চুপ করে রইল।
আমি বললাম–হাসলে চলবে না মালতী। কথার উত্তর দাও। তুমি কি ভাবো আমি তোমাদের এখানে পড়ে আছি খেতে পাইনে বলে তাই? তা নয়।
–কে বলেছে আপনাকে যে না খেতে পেয়ে এখানে আছেন? আমি আপনাকে বলেছি নাকি?
–যাক ওসব বাজে কথা। আমার কথার উত্তর দাও।
মালতী আবার ছেলেমানুষি আরম্ভ করলে। মুখ নীচু করে হাঁটুর কাছে ঠেকিয়ে মৃদু মৃদু হাসিমুখে হাত দিয়ে শানের ওপর কি আঁকজোক কাটতে লাগল, কখনই ওর কাছে আমার কথার সোজা জবাব পেলাম না।
এক দিন বেড়াতে গিয়ে বাঁধের ওপর বসে আমার অবস্থাটা ভেবে দেখলুম। আমি এমন জড়িয়ে পড়েছি যে নড়বার সাধ্য নেই এতটুকু। ও আমার সব কিছু ভুলিয়ে দিয়েছে–যে উদ্দেশ্যে এই দু-বছর পথে পথে ঘুরেছি সে উদ্দেশ্য এখন হয়ে পড়েছে গৌণ। এখন মালতীই সব, মালতীই আমার বিশ্বের কেন্দ্র, ও যখন আসে তখন জীবনে আর কিছু চাইবার থাকে না, ও যেদিন আসে, যেদিন হেসে কথা বলে–আমার মত সুখী লোক সেদিন জগতে আর কেউ থাকে না,– মাঠের ওপর সূর্যাস্ত সেদিন নতুন রঙে রঙীন হয়, বিচালি-বোঝাই গাড়িগুলোর দ্বারবাসিনীর হাটের দিকে যায়, তাদের চাকার শব্দও ভাল লাগে, আখড়ার বাবাজীরা নিমগাছে উঠে নিমপাতা পাড়ে–সে-ই যেন এক নতুন দৃশ্য। মালতী যেদিন আসে না, কি ভাল করে কথা বলে না, সারাদিন আমার মনে শান্তি থাকে না, ওরই কথা ভাবি সারাক্ষণ–কতক্ষণে দেখা হবে, কতক্ষণে কথা বলবো। মালতী আমায় এমন জালেও জড়িয়ে ফেলেছে!
হয়ত আমি এখান থেকে যেতাম না–হয়ত শেষ পর্যন্ত থেকেই যেতে হত–কিন্তু যেদিন মালতী আমার কাছে বসে পুকুরঘাটে গান গাইলে তার পরদিনই দুপুরের পরে উদ্ধব-বাবাজী আমায় ডেকে বললে–একটা কথা বলি আপনাকে–কিছু মনে করবেন না। আপনার এখানে অনেক দিন হয়ে গেল, আমাদের আখড়ার নিয়ম অনুসারে তিন দিন মাত্র এখানে অতিথ-বোষ্টমের থাকবার কথা। আপনার প্রায় এগারো মাস হল–
আমি চুপ করে রইলাম, কারণ ওর মুখ দেখেই আমার মনে হ’ল এটা কথার ভূমিকা–আসল কথাটা এখনও বলে নি। ঘটলও তাই। একটু ইতস্তত করে উদ্ধব বললে–তাতেও কিছু না–কি জানেন, আপনার রুণির সঙ্গে এই মেলামেশাটা ভাল দেখাচ্ছে না। আপনার কাছে বসে পুকুরঘাটে বিকেলে ও গান গেয়েছিল–একথা নিয়ে সবাই–বুঝলেন না, মেয়েমানুষের নামে দুর্নাম রটতে দেরি লাগে না। আমি ওর অভিভাবক–এসব যাতে না হয় আমার দেখা উচিত বলেই আপনাকে জানাচ্ছি এ-কথা। রুণি-মা সেরকম মেয়ে নয়। আমি সেটা খুবই জানি, কিন্তু লোকে তো–রাগ করবেন না, ভেবে দেখুন। লোকে যদি ওর নাম পাঁচটা কথা ওঠায় বা বলে–সেটা আমার উচিত হতে না দেওয়া–নয় কি?
আমি বললাম–সেটা আমার অন্যায় হয়েছে স্বীকার করি। কিন্তু আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। আপনি তো বলেছিলেন, মালতীর যদি ইচ্ছে হয়–ওর বাবার ওর ওপর আদেশ আছে।–
–কিন্তু ওর বাবা কণ্ঠীধারী বৈষ্ণব ছিলেন–আপনি ব্রাহ্মণ বটে, বৈষ্ণব নন, তার ওপর আপনি খৃস্টানী মতের লোক, আপনার সঙ্গে কি ক’রে ওর বিয়ে হতে পারে?..ও বৈষ্ণবের মেয়ে, বৈষ্ণবের সঙ্গেই ওর বিয়ে হবে। তবে মালতীর এতে কি ইচ্ছে জানুন, সে যদি বলে, আমার আপত্তি নেই–ওর বাবা ওরই ওপর সে ভার দিয়েছিলেন।
সেদিনই সন্ধ্যার সময় ওকে নির্জনে পেলাম। ওকে বললাম–একটা কথা বলব মালতী? তুমি অভয় দেবে?
মালতী কৌতুকের সুরে বললে–উঃ মাগো–যাত্রার দলের মত কথা শুনে আর বাঁচিনে। কি বলবেন বলুন না?
তুমি কি চিরকাল এই ভাবে জীবন কাটাবে? না, হাসিখুশী না—দরকারী কথা। সবতাতেই হাস কেন–ভেবে দেখ আমি কি বলছি–
–কেন এ জায়গা কি খারাপ? এমন চমৎকার মাঠ, দীঘি–আপনি সেদিন কি কবিতাটা বলছিলেন।
মালতী কথা শেষ না করেই ছেলেমানুষি হাসি শুরু করলে। আমি বললাম–না মালতী, লক্ষ্মীটি ওভাবে কথা উড়িয়ে দিও না। আমি তোমায় চাই। তোমায় বিয়ে করে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাই। কি বল তুমি?
মালতীর মুখের হাসি হঠাৎ বন্ধ হয়ে এল–সে কেমন বিস্ময়বিহ্বল-দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলে–তার পরেই তার মুখেচোখে ঘনিয়ে এল লজ্জা। ওর এ ধরনের লজ্জা আমি কখনও দেখি নি।
বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল। মালতীর মুখে উত্তর নেই। বললাম–ভেবে উত্তর দিও। এখুনি চাইনে তোমার উত্তর। তাড়াতাড়ি কিছু না বলাই ভাল।
মালতী এতক্ষণ মুখ নীচু ক’রে ছিল–এইবার মুখ তুলে কিন্তু অন্যদিকে চেয়ে বললে–কিন্তু এ জায়গা ছেড়ে যেতে হবে কেন?
–ছেড়ে যেতে হবে এই জন্য মালতী যে, আমি তো তোমাকে এখানে আখড়ায় থাকতে দিতে পারব না। আমিও এখানে চিরদিন কাটাতে পারি নে।
মালতীর মুখের ভাবে আমার মনে হল আমার মুখে এ-কথা যেন ওর পক্ষে অপ্রত্যাশিত। ও কি ভেবেছে আমিও চিরকাল এই আখড়াতেই থেকে যাব? ওর মুখ দেখে মনে হল আমার এ কথায় ও মনে বেদনা পেয়েছে। আমি কথাটা যতদূর সম্ভব নরম করতে পারা যায় করে বললাম–তুমি এখনও ছেলেমানুষ! নিজের সম্বন্ধে বিচার করে দেখতে পাবার ক্ষমতা এখনও হয় নি। তুমি একা এখানে কি করবে বল? উদ্ধব বাবাজীও চিরকাল থাকবেন না। এই মাঠের মধ্যে আখড়ায় চিরজীবন কাটাবে একা একা?
মালতী মুখ নীচু করেই আস্তে আস্তে নরম সুরে বললে–বাবা মরণকালে এর ভার সঁপে দিয়েছিলেন উদ্ধব-জ্যাঠার ওপর নয়, আমারই ওপর। বাবার বিষ্ণুমন্দির আমায় শেষ করে তুলতে হবে। উদ্ধব-বাবাজী চিরদিন থাকবেন না বলেই তো আমার এখানে আরও থাকা দরকার। বাবার ধানের জমি পাঁচজনে লুটেপুটে খাবে অথচ আখড়ার দোর থেকে অতিথ-বোষ্টম গরীব লোকে ফিরে যাবে খেতে না পেয়ে, এ আমি বেঁচে থেকে দেখতে পারব না। তাতে কোথায় গিয়ে আমার শান্তি হবে?
মালতীর মুখে এ ধরনের গম্ভীর কথা–বিশেষ করে ওর নিজের জীবন নিয়ে–এই প্রথম শুনলাম। সব জিনিস নিয়ে ও হালকা হাসি-ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেয়, এই ওর স্বভাব। ও এ ধরনের কথা বলতে পারে তা আমি ভাবি নি। বললাম–মালতী, এটা কি তোমার মনের কথা? জীবনটা এই করে কাটাবে? এতেই শান্তি পাবে? আমি যে প্রস্তাব করেছি, তাতে তুমি রাজী নও? কারণ আমি এখানে থাকতে পারব না চিরকাল এটা নিশ্চয়।
শেষ কথাটা বলতে আমার বুক বেদনায় টনটন করে উঠল, তবুও বলতে হল।
মালতী অনেকক্ষণ বিমুখী হয়ে বসে রইল। কাপড়ের একটা আঁচল পাকিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে ছেলেমানুষের মত সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে অনেকক্ষণ। আমার মনে হল ও হয়ত কাঁদছে, নয়ত কান্না চেপে রাখবার চেষ্টা করছে।
তার পরে আমার দিকে একবার চেয়েই আবার মুখ ফিরিয়ে বললে–কি করব বলুন, আমার অদৃষ্টে ভগবান এই লিখেছেন, এই আমায় করতে হবে।
আমার কেমন একটা অভিমান হ’ল, বললাম–এই তাহলে তোমার শেষ কথা? বেশ মালতী।
মালতী সে কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল মাথা নীচু করে। আবার আমার মনে হ’ল ও কাঁদছে, কিম্বা কান্না চেপে রাখবার চেষ্টা করছে–একবার মনে হ’ল ওর ডাগর চোখ দুটি জলে ভ’রে এসেছে–কিন্তু অভিমানের আবেগে আমি সেদিকে ফিরেও চাইলাম না।
রাত্রে বাইরে বসে ভাবলুম। সারারাত্রিই ভাবলুম।
মালতীকে ছেড়েই যেতে হ’ল শেষ পর্যন্ত?
ও না এক দিন আমায় বলেছিল..আখড়ার কত কাজ বাকী আছে মনে নেই?
আমার ওপর কিসের দাবিতে এ কথা বলেছিল ও?
সে দাবি অগ্রাহ্য করে নিষ্ঠুর ভাবে যাব চলে?
যদি না যাই–তবে এখানে আখড়ার মোহন্ত সেজে চিরকাল থাকতে হবে। এই গ্রাম্য বৈষ্ণবদের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী ও আচার-সংস্কারের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে হবে।
নিস্তব্ধ তারাভরা রাত্রি। দীঘির পার থেকে হু-হু হাওয়া বইছে।
নীল আকাশের দেবতা, যাঁর ছবি এই বিশাল মাঠের মধ্যে সন্ধ্যার মেঘে, কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়ায়, এই রকম তারাভরা অন্ধকার আকাশের তলে কতবার আমার মনে এসেছে, তাঁকে পাওয়া আমার হঠাৎ ফুরিয়ে না যায়…যে দেবতা সকল ধর্মের অতীত, দেশকালের অতীত..যার বেদী যেমন এই পৃথিবীতে মানুষের বুকে, তেমনি ওই শাশ্বত নীলাকাশে অনন্ত নক্ষত্রদলের মধ্যে…মর্ত্যে ও অমর্তে তাঁর বীণার দুই তার…আমার মনে হোমের আগুন তিনি প্রজ্জ্বলিত রাখুন সুদীর্ঘ যুগসমূহের মধ্যে…শাশ্বত সময় ব্যেপে। আমার যা-কিছু মনের শক্তি, যা-কিছু বড়, তাই দিয়ে তাঁকে বুঝতে চাই। গণ্ডীর মধ্যে তিনি থাকেন না।
পরদিন খুব ভোরে–আখড়ার কেউ তখনও বিছানা থেকে ওঠে নি–কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি দ্বারবাসিনীর আখড়া থেকে বেরিয়ে পড়লুম। কিসের সন্ধানে বেরিয়েছি তা আমি জানি নে–আমার সে সন্ধানের আশা আলেয়ার মত হয়ত আমাকে পথভ্রান্ত করে। পথ থেকে বিপথে নিয়ে গিয়ে ফেলবে–শুধু আমি এইটুকু বুঝি যে, যে কোন গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকলে আমার চোখের অস্বচ্ছ দৃষ্টির সামনে তার প্রবুদ্ধমান রূপ ক্ষীণ হয়ে আসবে–আমার কাছে সেই সন্ধানই সত্য—-আর সব মিথ্যে, সব ছায়া।
লোচনদাসের আখড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোন দিকে যাব তার কিছুই ঠিক নেই। বর্ষাকাল কেটে গিয়েছে, আকাশ নির্মল, শরতের সাদা লঘু মেঘখণ্ড নীল আকাশ বেয়ে উড়ে চলেছে, মণিহারী ঘাটের কাছে গঙ্গা পার হবার সময় দেখলুম গঙ্গার চরের কাশ-বনে কি অজস্র কাশফুলের মেলা! খানিকটা রেলে খানিকটা পায়ে হেঁটে এলাম কহলগাঁয়ে। গঙ্গার ধারে নির্জর স্থানটি বড় ভাল লাগল। স্টেশনের কাছেই পাহাড়, সামনে যে পাহাড়টা, তার ওপরে ডাকবাংলো–এখানে একটা রাত কাটালাম। ডাক-বাংলোর কাছে কি চমৎকার এক প্রকার বন্যফুল ফুটেছে, জ্যোৎস্নারাত্রে তার সুগন্ধে ডাক-বাংলোর বারান্দা আমোদ করে রেখেছে।
এক দিন কহলগাঁয়ের খেয়াঘাটে শুনলাম ক্রোশখানেক দূরে গঙ্গার ধারে বটেশ্বরনাথ পাহাড়ে একজন সাধু থাকেন। একখানা নৌকা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম। বটেশ্বরনাথ পাহাড় দূর থেকে দেখেই আমার মনে হ’ল এমন সুন্দর জায়গা আমি কমই দেখেছি, এখানে শান্তি ও আনন্দ পাব। গঙ্গার ধারে অনুচ্চ ছোট পাহাড়, পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল, নানা ধরনের বুনো গাছ, এক ধরনের হলদে-পাপড়ি বড় বড় ফুল ফুটেছে পেয়ারাগাছের মত গাছে, নাম জানিনে। একটা বড় গুহা আছে পাহাড়ের দক্ষিণ দিকের ঢালুতে জঙ্গলের মধ্যে। গুহার মুখের কাছে প্রাচীন একটা বটগাছ, বড় বড় ঝুরি নেমেছে, ঘন ছায়া, পাকা বটফল তলায় পড়ে আছে রাশি রাশি। সাধুটির সঙ্গে আলাপ হ’ল, বাড়ি ছিল তাঁর মাদ্রাজে, কিছু কথাবার্তায় চেহারায় হিন্দুস্থানী। সাধুটি খুব ভাল লোক, লম্বাচওড়া কথা নেই মুখে, বাঙালি বাবু দেখে খুব খাতির করলেন। নিজে কাঠ কুড়িয়ে এনে চা করে খাওয়ালেন, আমার সম্বন্ধে দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন। বললেন– আপনি এখানে যতদিন ইচ্ছে থাকুন, এখানে খরচ খুব কম। আমি এর আগে মুঙ্গেরে কষ্টহারিণীর ঘাটে ছিলাম, শহর বাজার জায়গা, এত খরচ পড়ত যে টিকতে পারলাম না। তাও বটে, আর দেখুন বাবুজী, সাধুরা চিড়িয়ার জাত, আজ এখানে, কাল ওখানে–এক জায়গায় কি ভাল লাগে বেশী দিন?
লোকজন বিশেষ নেই, স্থানটি অতিশয় নির্জন, কথা বলবার লোক নেই, তার প্রয়োজনও বোধ করি নেই বর্তমানে–সারাদিনের মধ্যে সন্ধ্যার সময় সাধুজীর সঙ্গে বসে একটু আলাপ করি। এতদিন কোথাও যে-শান্তি পাই নি, এখানে তার দেখা মিলেছে। একদিন পাহাড়ের ওপরে বেড়াতে বেড়াতে জঙ্গলের মধ্যে একটা সুঁড়ি-পথ পেলাম। পাহাড়ের গা কেটে পথটা বার করা হয়েছে, ডাইনে উঁচু পাহাড়ের দেওয়ালটা, বাঁয়ে অনেক নীচে গঙ্গা, ঢালটাতে চামেলির বন, একটা প্রাচীন পুষ্পিত বকাইন গাছ পথের ধারে। কিছু দূর গিয়ে দেখি, পাহাড়ের গায়ে খোদাই-করা কতকগুলো বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি–গভর্নমেন্টের নোটিশ টাঙানো আছে এই মূর্তিগুলো কেউ নষ্ট করতে পারবে না ইত্যাদি। আমি জানতাম না এদের অস্তিত্ব। জায়গাটা অতি চমৎকার, সূর্যাস্তের সময় সেদিন পীরপৈঁতির অনুচ্চ শৈলমালার ওপরের আকাশটা লাল হয়ে উঠল, গঙ্গার বুকে আকাশজোড়া রঙীন মেঘমালার ছায়া, খোদাই-করা দেবদেবীর মূর্তি গোধূলির চাপা। আলোয় কেমন একটা অনির্দেশ্য শ্রী ধারণ করেছে–সে শ্রী বড় অদ্ভুত, কোন মূর্তির নাক ভাঙা, কোনটার নাক নেই, বেশীর ভাগ মূর্তিরই মুখ খসে গিয়েছে–কিন্তু গোধূলির রক্ত পিঙ্গল আকাশের ছায়ায় যক্ষিণী যেন জীবন্ত হয়ে উঠল পাথরে কাটা পীন স্তনযুগল যেন রক্তমাংসের বলে মনে হ’ল, লুম্বিনী উদ্যানের ছায়াতরুমূলে শায়িতা আসন্নপ্রসবা মায়াদেবীর চোখের পলক যেন পড়ে পড়ে, তারপর চামলীর বন কালো হয়ে গেল, গঙ্গার বুকে নোঙর-করা বড় বড় কিস্তির মাঝিরা হনুমানজীর ভজন গাইতে শুরু করে দিলে, পাহাড়ের পূর্ব দিকে ছোট কেওলিন খনিটাতে মজুরদের ছুটির ঘণ্টা পড়ল–আমি তখনও অবাক হয়ে দাঁড়িয়েই আছি।…রাঢ় দেশের মাঠে সেই খালের ধারের তালবনে সেদিন যে অদ্ভুত ধরনের শান্তি ও আনন্দ পেয়েছিলুম, সেটা আবার পাবার আশায় কতক্ষণ অপেক্ষা করলুম–কিন্তু পেলাম কই? তার বদলে একটা ছবি মনে এল।
আমি জানি এ-সব কথা বলে কি কিছু বোঝানো যায়? যার না হয়েছে, সে কি পরের লেখা পড়ে কিছু বুঝতে পারবে, আমিই বোঝাতে পারব? মনে হ’ল কোথায় যেন একজন পথিক আছেন, ঐ নীল আকাশ, ঐ রঙিন মেঘমালা, এই কলরবপূর্ণ জীবনধারার পেছনে তিনি চলেছেন… চলেছেন… কোথায় চলেছেন নিজেই হয়ত জানেন না। তাঁর কোন সঙ্গী নেই, তাঁকে কেউ বোঝে না, তাঁকে কেউ ভালবাসে না। অনাদি অনন্তকাল ধরে তিনি একা একা পথ চলেছেন। এই দৃশ্যমান বিশ্ব, এদের সমস্ত সৌন্দর্য–তিনি আছেন বলেই আছে।
আমি তাঁকে ছোট করে দেখতে চাইনে। তাঁকে নিয়ে পুতুলখেলার বিরুদ্ধে ছোটবেলা থেকে আমি বিদ্রোহ করে আসছি। তিনি বিরাট, মানুষে দশ হাজার বছরে তাঁকে যত বুঝে এসেছে আগামী দশ হাজার বছরে তাঁকে আরও ভাল করে বুঝবে। এক-আধ জন মানুষে কি করবে? সমগ্র মানব জাতি যুগে যুগে তাঁকে উপলব্ধির পথে চলেছে। আমি তাঁকে হঠাৎ বুঝে শেষ করতে চাইনে–কোটী যোজন দূরের তারার আলো যেমন লক্ষ বৎসর পৃথিবীতে আসছে… আসছে… তেমনি তাঁর আলোও আমার প্রাণে আসছে…হয়ত সিকি পথও এখনও এসে পৌঁছয় নি–কত যুগ, কত শতাব্দী, এখনও দেরি আছে পৌঁছবার। এই তো আমার মনের আসল য়্যাডভেনচার (adventure), এ যেন আমার হঠাৎ ফুরিয়ে না যায়। আমি খুঁজে বেড়াবো…এই খোঁজাই আমার প্রাণ, বুদ্ধি, হৃদয়কে সঞ্জীবিত রাখবে, আমার দৃষ্টিকে চিরনবীন রাখবে।
আমি হয়ত এজন্মে তাঁকে বুঝবো না, হয়ত বহু জন্মেও বুঝবো না–এতেই আনন্দ পাব আমি, যদি তিনি আমার মনের বেদীতে হোমের আগুন কখনও নিবে যেতে না দেন, শাশ্বত যুগসমূহের মধ্যে, সুদীর্ঘ অনাগত কাল ব্যেপে। আমি চাই ও নীল আকাশ, ওই সবুজ চর, কলনাদিনী গঙ্গা, দূরের নীহারিকাপুঞ্জ, মানুষের মনোরাজ্য, ওই হলদে-ডানা প্রজাপতি, এই শোভা, এই আনন্দের মধ্যে দিয়ে তাঁকে পেতে।
লোচনদাসের আখড়াতেই সবাই বললে, আমি নাস্তিক, কারণ আমি বলতাম নাম-জপ করা কেন? ঈশ্বরের নাম দিতে পেরেছে কে? শেষ পর্যন্ত উদ্ধব-বাবাজী আমাকে আখড়া ছাড়িয়ে দিল এই জন্যে বোধ হয়।
একদিন বৈকালে গঙ্গায় নাইতে নেমেছি–কাটারিয়ার ওপারের বহুদূর দিকচক্রবালের প্রান্ত থেকে কালো মেঘ ক’রে ঝড় এল, গঙ্গার বুকে বড় বড় ঢেউ উঠল, আমার মুখে কপালে মাথায় বুকে ঢেউ ভেঙে পড়ছে, ওপারের চরের উপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, জলের সুঘ্রাণ পাচ্ছি–এরকম কত ঝটিকাময় অপরা ও কত নীরন্ধ্র অন্ধকারময়ী রাত্রির কথা মনে এল–আমারই জীবনের কত সুখদুঃখময় মুহূর্তের কথা মনে এল–
মনে কেমন একটা অপূর্ব ভাবের উদয় হ’ল, তাকে আনন্দও বলতে পারি, প্রেমও বলতে পারি, ভক্তিও বলতে পারি। তার মধ্যে ও তিনটেই আছে। বটেশ্বরনাথের পাহাড়টার ঠিক ধূসর স্তূপের দিকে চেয়ে, দূর, বহুদূর দিগন্তের দিকে চেয়ে যেখানে বাংলা দেশ, যেখানে মালতী আছে, যেখানে এমন কত সুন্দর বর্ষার সন্ধ্যা মধুর আনন্দে কাটিয়েছি, কত জ্যোৎস্নারাত্রে শুকনো মকাইঝোলানো চালাঘরের দাওয়ার তলায় বসে দুজনে কত গল্প করেছি, তার মুখে জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়েছে..কতবার অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে সে এসেছে–আবার কতবার ডাকলেও আসেনি, কতবার চোখাচোখি হলেই হেসে ফেলেছে–এ কথা মনে হয়ে আমার মনে কেমন একটা উন্মাদনা, আনন্দ, প্রেম, ভক্তি আরও কত কি ভাবের উদয় হ’ল একটা বড় ভাবের মধ্যে দিয়ে। ওই একটার মধ্যেই সবটা ছিল। তাদের আলাদা আলাদা করা যায় না–কিন্তু তারই প্রেরণায় আমার আঙুল আপনা-আপনি বেঁকে গেল, গঙ্গার জলে মা, বাবা, হীরু-জ্যাঠার নামে তর্পণ করলুম, ভগবানের নামে সমস্ত দেহ-মন নুয়ে এল, জলের ওপরই মাথা নত করে তাঁর উদ্দেশে প্রণাম করলুম। সীতার জন্যে করুণ সহানুভূতিতে চোখে জল এল। হঠাৎ ঘোর বৈষয়িকতার জন্যে জ্যাঠামশায়ের প্রতি অনুকম্পা হ’ল–আবার সেই সৃষ্টিছাড়া অপরূপ মুহূর্তেই দেখলুম মালতীকে কি ভালই বাসি, মালতীর সহায়হীন, সম্পদহীন, ছন্নছাড়া মূর্তি মনে করে একটা মধুর স্নেহে তাকে সংসারের দুঃখকষ্ট থেকে বাঁচানোর আগ্রহে, তাকে রক্ষা করবার, আশ্রয় দেবার, ভালবাসার, ভাল করবার, তার মনে আনন্দ দেবার, তার সঙ্গে কথা বলবার আকুল আগ্রহে সমস্ত মন ভরে উঠল–কি জানি সে মুহূর্ত কি করে এল, সেই মেঘান্ধকার বর্ষণমুখর সন্ধ্যাটিতে সমস্ত বিশ্বপ্রকৃতি যেন সেই মহামুহূর্তে আমার মধ্যে দিয়ে তার সমস্ত পুলকের, গৌরবের, অনুভূতির সঞ্চয়হীন বিপুল আত্মপ্রকাশ করলে। সেদিন দেখলুম ঈশ্বরের প্রতি সত্যিকার ভক্তির প্রকৃতি মালতীর প্রতি আমার ভালবাসার চেয়ে পৃথক নয়। ও একই ধরনের, একই জাতীয়। যেখানে হৃদয়ের সহানুভূতি নেই, ভালবাসা নেই, সেখানে ঈশ্বরও নেই। ভগবানের প্রতি সেদিন যে-ভক্তি আমার এল–তা এল একটা অপূর্ব আনন্দের রূপে–সত্যিকার ভক্তি একটা joy of mind..আত্মা, দেহ, মন সেখানে আনন্দে মাধুর্যে আপ্লুত হয়ে যায়।
ঠিক মালতী আমাকে ভালবেসেছে বা আমি মালতীকে ভালবেসেছি। এই ভেবে যেমন হয় তেমনি। কোন পার্থক্য নেই। একই অনুভূতি–দুটো আলাদা আলাদা নামমাত্র। এতেও মন অবশ হয়ে যায় আনন্দে–ওতেও।
উপলব্ধি ক’রে বুঝলুম যদি কেউ আমাকে আগে এ-সব কথা বলত, আমার কখনই বিশ্বাস হত না। হওয়া সম্ভবও নয়।
সাধুজী সন্ধ্যাবেলা রোজ ধর্মকথা পড়েন। আমি মনে মনে বলি–সাধুজী আপনি জীবন দেখেন নি। ভালবেসেছেন কখনও জীবনে? প্রাণ ঢেলে ভালবেসেছেন? যে কখনও নরুন হাতে নিতে সাহস করে নি, সে যাবে তলোয়ার খেলতে। শুকনো বেদান্তের কথার মধ্যে ঈশ্বর নেই–যেখানে ভাব নেই, ভালবাসা নেই, হৃদয়ের দেওয়া-নেওয়া নেই, আপনাকে হারিয়ে ফেলা, বিলিয়ে দেওয়া নেই–সেখানে ভগবান নেই, নেই, নেই। হৃদয়ের খেলা যে আস্বাদ করেছে, ও-রস কি জিনিস যে বোঝে–ভগবানকে ভালবাসার প্রথম সোপানে সে উঠেছে।
আমি মালতীর কথা এত ভাবি কেন? সে আমাকে এত অভিভূত করে রেখেছে কেন দিন, রাত, সকাল, সন্ধ্যা?…এই বিক্রমশিলা বিহারের পাহাড়মালা, বন-শ্ৰেণী পাদমূলে প্রবাহিতা পুণ্যস্রোতা নদী, সন্ধ্যার পটে রাঙা সূর্যাস্ত, বনচামেলীর উগ্র উদাস গন্ধ–এ সবের মধ্যে সে আছে, তার হাসি নিয়ে, তার মুখভঙ্গি নিয়ে, তার গলার সুর নিয়ে, তার শতসহস্র টুকরো কথা নিয়ে, তার ছেলেমানুষি ভঙ্গি নিয়ে। কেন তাকে ভুলি নি, কেন। তার জন্য আমার মন সর্বদাই উদাস, উন্মুখ, ব্যাকুল, বেদনায় ভরা, স্মৃতির মাধুর্যে আপ্লুত, নিরাশায় যন্ত্রণাময়-হঠাৎ তাকে এত ভালবাসলুম কেন? তার কথা মনে যখন আসে, তখন কেওলিন খনির উপরকার পাহাড়চূড়াটায় একটা বকাইন গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে সারাদিন তার কথা ভাবি–খাওয়া-দাওয়ার কথা মনে থাকে না, ভালও লাগে না–তার মুখের হাসির স্মৃতিতেই যেন আমার শান্তিময় নিভৃত গৃহকোণ, তার কথার সুর দূরের ব্যবধান ঘুচিয়ে, মাঠ নদী বন পাহাড় পার হয়ে ভেসে এসে আমার প্রদীপ-জ্বালানো শান্ত আঙিনার ছোট্ট খড়ের রান্নাঘরের একপাশে উপবিষ্ট নিরীহ গৃহস্থ সাজায়–জীবনে তাই যেন চেয়ে এসেছি, সব দুরাশা, সব-কিছু ভুলিয়ে দেয়, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়..এদিকে রোদ চড়ে ওঠে কিংবা সূর্য ঢলে পড়ে, বটেশ্বরনাথের পাহাড় রঙে রঙে রাঙা হয়, পাখীর গান হঠাৎ যায় থেমে–সাধুজীর চেলা বর্মানারায়ণ আমাকে খুঁজতে আসে চা খাবার জন্যে…তখন অনিচ্ছা সত্বেও উঠতে হয়…গাঁজার ধোঁয়ায় অন্ধকার সাধু-বাবাজীর গুহার সামনে বসে দুধবিহীন কড়া চা খেতে খেতে হনুমানচরিত শুনতে হয়।
সাধুজী আমাকে ভালবাসেন। এই জন্যেই ওঁর এখানে আছি। এখানে পয়সার খরচ নেই বললেই হয়। বারোটা টাকা এনেছিলুম, সাধুজীর হাতে তুলে দিয়েছি–নিতে চান নি–আমি পীড়াপীড়ি করে দিয়েছি। একবেলা খাই মকাইয়ের ছাতু, একবেলা রুটি আর ঢেড়সের তরকারি। অন্য কিছু এখানে মেলে না। কেওলিন খনির ম্যানেজার মাঝে মাঝে কলগাঁও থেকে মাছ আনায়, সেদিন ওর বাংলোতে আমায় খেতে বলে–কারণ সাধুর এখানে ওসব কারবার হবার জো নেই।
মালতীর সঙ্গে আবার দেখা হবে না? কিন্তু কী করে হবে তা তো বুঝি নে। আমি আবার সেখানে কোন ছুতোয় যাবো? উদ্ধবদাস-বাবাজী আমায় ভাল চোখে দেখতো না। দু-একবার অসন্তোষ প্রকাশও করেছিল, মালতীর সঙ্গে যখন বড় মিশছি–তখন দু একবার আমায় এমন আভাসও দিয়েছিল যে এখানে বেশী দিন আর থাকলে ভাল হবে না। ও-সবে আমি ভয় করি নে। সপ্তসিন্ধু পাড়ের দেশ থেকে মালতীকে আমি ছিনিয়ে আনতে পারি, যদি আমি জানতাম যে মালতীও আমায় চায়। কিন্তু তাতে আমার সন্দেহ আছে। সেই সন্দেহের জন্যেই যত বেদনা, যা-কিছু যন্ত্রণা! কি জানি, বুঝতে পারি নে সবখানি। রহস্যময়ী মালতীর মনের খবর পুরো এক বছরেও পাই নি।
এক-একবার কিন্তু আমার মনের গভীর গোপন তল থেকে কে বলে, অত সন্দেহ কেন তোমার মনে? তোমার চোখ ছিল কোথায়? মালতীকে বোঝ নি এক বছরেও?
মালতী–কি মাধুর্যের রূপ ধরেই সে মনে আসে! তার কথা যখনই ভাবি, অস্ত আকাশের অপরূপ শোভায় পাহাড়ের ধূসর ছায়ায় গঙ্গার কলতানের মধ্যে ওপারের খাসমহলের চরে কলাইওয়ালী মাথায় কলায়ের বোঝা নিয়ে ঘরে যখন ফেরে, যখন সাদা পাল তুলে বড় বড় কিস্তি কহলগাঁয়ের ঘাট থেকে বাংলা দেশের দিকে যায়…কিংবা যখন গঙ্গার জলে রঙীন মেঘের ছায়া পড়ে, খেয়ার মাঝিরা নিজেদের নৌকোতে বসে বিকট চিৎকার করে ঠেট হিন্দীতে ভজন গায়–সমস্ত পৃথিবী, আকাশ, পাহাড় একটা নতুন রঙে রঙীন হয়ে ওঠে আমার মনে–ওই দূর বাংলা দেশের এক নিভৃত গ্রামের কোণে মালতী আছে, যখন আবার বর্ষা নামে, খুব ঝড় ওঠে, কিংবা পুকুরের ঘাটে একা গা ধুতে যায়, কি বিষ্ণুমন্দিরে প্রদীপ দেখায় সন্ধ্যায়–আমার কথা তার মনে পড়ে না? আমার তো পড়ে–সব সময়ই পড়ে, তার কি মনে পড়ে না?
মালতীকে নিয়ে মনে কত ভাঙা-গড়া করি, কত অবস্থায় দুজনকে ফেলি মনে মনে, কত বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করি, আমার অসুখ হয়, সে আমার পাশে বসে না ঘুমিয়ে সারারাত কাটায়–কত অর্থকষ্টের মধ্যে দিয়ে দু-জনে সংসার করি–সে বলে–ভেবোনা না লক্ষ্মীটি, মদনমোহন আবার সব ঠিক করে দেবেন! তার ছোটখাটো সুখদুঃখ, আখড়ার বিগ্রহের ওপর গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস, তার সেবা–আমার ভাল লাগে। মনে হয় কত মেয়ে দেখেছি, সবারই খুঁত আছে, মালতীর খুঁত নেই। আবার মেয়েরা যেখানে বেশী রূপসী, সেখানে মনে হয়েছে এত রূপ কি ভাল? মালতীর স্নিগ্ধ শ্যামল সুকুমার মুখের তুলনায় এদের এত নিখুঁত রূপ কি উগ্র ঠেকে! মোটের ওপর যেদিক দিয়েই যাই–সেই মালতী।
এক-একবার মনকে বোঝাই মালতীর জন্যে অত ব্যস্ত হওয়া দুঃখ বাড়ানো ছাড়া আর কি? তাকে আর দেখতেই পাব না। তাদের আখড়াতে আর যাওয়া ঘটবে না। স্বপ্নকে আঁকড়ে থাকি কেন? কিন্তু মন যদি অত সহজে বুঝতো!
মালতী একটা মধুর স্বপ্নের মত, বেদনার মত, কত দিন কানে-শোনা গানের সুরের মত মনে উদয় হয়। তখন সবই সুন্দর হয়ে যায়, সবাইকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে, সাধুর বকুনি, পাণ্ডা-ঠাকুরের জ্ঞাতি-বিরোধের কাহিনী–অর্থাৎ কি ক’রে ওর জ্যাঠতুতো ভাই ওকে ঠকিয়ে এতদিন বটেশ্বর শিবের পাণ্ডাগিরি থেকে ওকে বঞ্চিত রেখেছিল তার সুদীর্ঘ ইতিহাস–সব ভাল লাগে। কিন্তু কোন কথা বলতে ইচ্ছে করে না তখন, ইচ্ছে হয় শুধু বসে ভাবি, ভাবি–সারা দীর্ঘ দিনমান ওরই কথা ভাবি।
বটেশ্বরনাথ পাহাড়ের দিনগুলো মনে আমার অক্ষয় হয়ে থাকবে। রূপে, বেদনায়, স্মৃতিতে, অনুভূতিতে কানায় কানায় ভরা কি সে-সব অপূর্ব দিন! অনেক দিন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রেমের অমর মধু-মুহূর্তগুলির ছায়াপাতে তাদের স্মৃতি আমার কাছে চিরশ্যামল। শরতের দুপুরে নিভৃত বননিবিড় অধিত্যকায় চুপ করে ঝরা-পাহাড়ী-কুরুচি-ফুলের শয্যায় ব’সে চারিদিকে রৌদ্রদীপ্ত পাহাড়শ্রেণীর রূপ ও শরতের আকাশের সাদা সাদা মেঘখণ্ডের দিকে চেয়ে চেয়ে মালতীর ভাবনাতে সারাদিন কাটিয়ে দিতাম। তিনটাঙার মাঠে বটগাছের সবুজ মগডালে সাদা সাদা বকের সারি বসে আছে, যেন সাদা সাদা অজস্র ফুল ফুটে আছে–কত কি রং, প্রথমে মাটির ধূসর রং, তার পর কালো সবুজ গাছপালা, তার ওপরের পর্দায় নীলকৃষ্ণ পাহাড়, তার ওপরে সুনীল ও সাদা মেঘস্তূপ, সকলের নীচে কূলে কূলে ভরা গৈরিক জলরাশি। কিসে যেন পড়েছিলুম ছেলেবেলায় মনে পড়ে–
অলসে বহে তটিনী নীর,
বুঝি দূরে–অতি দূরে সাগর,
তাই গতি মন্থর,
শ্রান্ত, শান্ত পদসঞ্চার ধীর!
আগে প্রেম কাকে বলে তা জানতাম না, জীবনে তা কি দিতে পারে, তা ভাবিও নি কোন দিন। এখন মনে হয় প্রেমই জীবনের সবটুকু। স্বর্গ কবির কল্পনা নয়–স্বর্গ এই পিয়ালতলায়, স্বর্গ তার স্মৃতিতে। নয়তো কি এত রূপ হয় এই শিলাস্তৃত অধিত্যকার, ওই উচ্চ মেঘপদবীর, ওই পুণ্যসলিলা নদীর, ওই বননীল দিগন্তরেখার!
দিনে রাতে মালতী আমায় ছাড়ে কখন? সব সময় সে আমার মনে আছে। এই দুপুর, এখন সে আখড়ার দাওয়ায় পরিবেশন করছে। এই বিকেল, এখন সে কাপড় সেলাই করছে, নয় তো মুগকলাই ঝাড়ছে। এই সন্ধ্যা, এখন সে টান-টান করে তার অভ্যস্ত ধরনে চুলটি বেঁধে, ফুল্লাধরে মৃদু হেসে বিষ্ণুমন্দিরে প্রদীপ দেখাতে চলেছে। আজ মঙ্গলবার, সারাদিন সে উপবাস করে আছে, আরতির পরে দুধ ও ফল খাবে। সেই নিঃসঙ্কোচে পুকুরের ঘাটে বসে বসে আমাকে গান-শোনানো, আমার সঙ্গে শিবের মন্দিরে যাওয়া–খাতা পড়ে শোনানো–সকলের ওপরে তার হাসি, তার মুখের সে অপূর্ব হাসি! কত কথাই মনে এসে নির্জনে যাপিত প্রতি প্রহরটি আনন্দবেদনায় অলস করে দিত।
দূরের গিরি-সানুর গায়ে ক্রীড়ারত শুভ্র মেঘরাজির মধ্যে এমন কি কোন দয়ালু মেঘ নেই যে এই কূটজ-কুসুমাস্তীর্ণ নিভৃত অধিত্যকার ওপর দিয়ে যেতে যেতে পিয়ালতলার এই নির্বাসিত যক্ষের বিরহবার্তাটি শুনে জেনে নিয়ে বাংলা দেশের প্রান্তরমধ্যবর্তী অলকাপুরীতে পৌঁছে দেয় তার কানে?
কতবার মনে অনুশোচনা হয়েছে এই ভেবে যে কেন চলে আসতে গিয়েছিলুম অমন চুপি চুপি? তখন কি বুঝেছিলুম মালতী আমায় এত ভাবাবে! কি বুঝে আখড়া ছেড়ে চলে এলাম পাগলের মত! এমনধারা খামখেয়ালী স্বভাব আমার কেন যে চিরকাল, তাই ভাবি। আমার মাথার ঠিক নেই সবাই বলে, সত্যিই বলে। এখন বুঝেছি কি ভুলই করেছি মালতীকে ছেড়ে এসে। ওকে বাদ দিয়ে জীবন কল্পনা করতে পারছি নে–এও যেমন ঠিক, আবার এও তেমনি ঠিক যে আর সেখানে আমার ফেরা হবে না।
না–মালতী, আর ফিরে যাব না। কাছে পেয়ে তুমি যদি অনাদর কর সইতে পারব না। তোমার খামখেয়ালী স্বভাবকে আমার ভয় হয়। তার চেয়ে এই-ই ভাল। আমার জীবনে তুমি পুকুরের ঘাটের কত জ্যোৎস্নারাত্রি অক্ষয় করে দিয়েছ, সেই সব জ্যোৎস্নারাত্রির স্মৃতি, তোমার বাবার বিষ্ণুমন্দিরের কত সন্ধ্যায় প্রদীপ দেওয়ার স্মৃতি–তোমার সে সব আদরের স্মৃতি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে থাক।
