দম্পতি (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
ছয়
ইহার দুইদিন পরে ভড়মশায় গদিতে বসিয়া কাজ করিতেছেন, গদাধর বলিলেন–তেরো তারিখে একটা চেক ডিউ আছে ভড়মশায়, ছ’হাজার টাকা জমা দিতে হবে ব্যাঙ্কে।
ভড়মশায় মনিবের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন– ছ’হাজার টাকা এই ক’দিনের মধ্যে? টাকা তো মোকামে আটকে আছে–এখন এত টাকা এই ক’দিনের মধ্যে কোথায় পাওয়া যাবে বাবু?
-তা হবে না। চেষ্টা দেখুন, পথ হাতড়ান।
–এত টাকার চেক্ কাকে দিলেন বাবু?
অন্য কর্মচারী হইলে মনিবকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিত না হয়তো–কিন্তু ভড়মশায় পুরাতন বিশ্বস্ত কর্মচারী, ঘরের লোকের মত–তাঁহার পক্ষে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র অধিকার। কথাটা এড়াইবার ভঙ্গিতে গদাধর বলিলেন–ও আছে একটা– ইয়ে–তাহলে কি করবেন বলুন তো?
ভড়মশায় চিন্তিত মুখে বলিলেন–দেখি, কি করতে পারি! বুঝতে পারচি নে!
কিন্তু কয়দিন নানাপ্রকার চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থমনোরথ হইয়া ভড়মশায় বারো তারিখে মনিবকে কথাটা জানাইলেন। মোকামে টাকা আবদ্ধ আছে, এ-কদিনের মধ্যে কাঁচামাল বেচিয়া টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। তিনটি মিলের পাটের মোটা অর্ডার কন্ট্রাক্ট করা আছে, তিন মোকাম হইতে সেই অর্ডার-মাফিক পাট ক্রয় চলিতেছে–সে টাকা অন্যক্ষেত্রে ঘুরাইয়া আনিতে গেলে, মিলে সময়মত পাট দেওয়া যায় না।
গদাধর মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। চেক ব্যাঙ্ক হইতে ফিরিয়া গেলে লজ্জার সীমা থাকিবে না। অবশ্য অন্য কোনো গদি হইতে টাকাটা ধার করা চলিত–কিন্তু তাহাতে মান থাকে না। সাত-পাঁচ ভাবিয়া গদাধর সেদিন রাত ন’টার পরে শোভার বাড়ী গেলেন। এদিকে ভড়মশায় চিন্তাকুল মুখে আছেন দেখিয়া খাইবার সময় অনঙ্গ জিজ্ঞাসা করিল–কি হয়েচে ভড়মশায়? মুখ ভার-ভার কেন?
–না, কিছু না।
–বলুন না কি হয়েচে-বাড়ীর সব ভালো তো?
–না, সে-সব কিছু না। একটা ব্যাপার ঘটেছে—আপনাকে না ব’লে থাকাও ঠিক না। বাবু কোথায় আগাম চেক্ দিয়েচেন মোটা টাকার। ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে নয়, তাহলে আমার অজানা থাকতো না। তাহলে উনি কোথায় এ-টাকা খরচ করচেন? কথাটা আপনাকে জানানো আমার দরকার। তবে আমি বলেছি, এ-কথা যেন বলবেন না বাবুকে।
অনঙ্গ চিন্তিত-মুখে বলিল–তাই তো ভড়মশায়, আমি কিছু ভাবগতিক তো বুঝচি নে–মেয়ে-মানুষ কি করবো বলুন? কিন্তু ওঁর ভাব যে কত বদলেচে সে আপনাকে কি বলি! বড় ভাবনায় পড়েচি ভড়মশায়। আপনাকে বলব একদিন পরে। উনি আজকাল রাতে প্রায়ই বাড়ি আসেন না। দোল-পুন্নিমের দিন দেখলেনই তো!
–হ্যাঁ, সে-কথা বাবুকে জিগ্যেস করেচিলেন?
করেচিলাম। বললেন, ব্যবসার কাজ ছিল। আজকাল আমার ওপর রাগ-রাগ ভাব–সব-সময় কথা বলতে সাহস পাই নে। উনি কেমন যেন বদলে গিয়েচেন–কখনো তো উনি এরকম ছিলেন না! এখন ভাবচি, আমাদের কলকাতায় না এলেই ভালো ছিল। বেশ ছিলাম দেশে। কালীঘাটের মা-কালীর কাছে মানত করেচি, জোড়া পাঁটা দিয়ে পুজো দেবো–ওঁর মতিগতি যেন ভালো হয়ে ওঠে। বড় ভাবনায় আছি। আর কার কাছে কি বলবো বলুন, এখানে আমার কে আছে এক আপনি ছাড়া।
অনঙ্গ আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিল।
ভড়মশায় চিন্তিত-মুখে বলিলেন–তাই তো, আমাকে বললেন মা–ভালো হলো। এত কথা তো আমি কিছুই জানতাম না। এখন বুঝতে পারচি নে কি করা যায়। আমারও তো যাবার সময় হলো।
অনঙ্গ বলিল–আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না ভড়মশায়। কলকাতায় আপনার যত অসুবিধাই হোক, ওঁকে এ-অবস্থায় ফেলে আপনি যেতে পারবেন না। আমার আর কেউ নেই ভড়মশায়–কে ওঁকে দেখে! এখানে ওই শচীন ঠাকুরপো হয়েচে ওঁর শনি। আর ওই নির্মল–ওদের সঙ্গে মিশেই এ-রকম হয়েচেন–আমাকে এ-আথান্তরে ফেলে আপনি চলে যাবেন না।
–আচ্ছা বৌ-ঠাকরুণ, এ-সব কথা আর কারো কাছে আপনি বলবেন না। আমি না হয় এখন দেশে না যাবো–আপনি কাঁদবেন। না। চোখের জল মুছে ফেলুন–সতীলক্ষ্মী আপনি, হাতে করে বিয়ে দিয়ে ঘরে এনেচি–মেয়ের মত দেখি। আপনাদের ফেলে গেলে ধর্মে সইবে না। দেখি কি হয়–অত ভাববেন না।
ভড়মশায় বিদায় লইলেন।
গদাধর শোভার বাড়ী গিয়া শুনিলেন, সে এইমাত্র স্টুডিও হইতে ফিরিয়া খাইতে বসিয়াছে। সুতরাং তিনি বাহিরের ঘরে বসিয়া রহিলেন। একটু পরে শোভা ঢুকিয়া একটা প্লেটে গোটাকয়েক সাজা পান গদাধরের সামনে টিপয়ে রাখিয়া, তাহা হইতে একটা পান তুলিয়া মুখে দিল। কোনো কথা বলিল না।
গদাধর বলিলেন–বোসো শোভা, তোমার কাছে একটা কাজে এসেছিলাম।
শোভা নিজের ঈজিচেয়ারটাতে বসিয়া বলিল–কাজ কি, তা তো বুঝতে পেরেছি, তার উত্তরও দিয়েচি সেদিন।
–সে কাজ নয় শোভা। বড় বিপদে পড়ে এসেছি তোমার কাছে। একজনকে চেক দিয়েচি ছ’হাজার টাকার–কাল ব্যাঙ্কে চেক দাখিল করে ভাঙাবার তারিখ–অথচ টাকা নেই ব্যাঙ্কে। কালই ছ’হাজার টাকা বেলা দশটার সময় জমা দিতে হবে– অথচ আমার হাতে নেই টাকা! সব টাকা মোকামে আবদ্ধ। এখন কি করি–কাল মান যায়, তাই তোমার কাছে এসেচি!
শোভা বিস্ময়ের সুরে বলিল–আমি কি করবো?
–টাকাটা এক মাসের জন্য ধার দাও–আমি হ্যাণ্ডনোট দিচ্চি– মোকাম থেকে টাকা এলে শোধ করে দেবো। এই উপকারটা কর আমার। বড় বিপদে পড়ে তোমার কাছে এসেচি!
শোভা বলিল–আমি তো হ্যাণ্ডনোটের ব্যবসা করি নে– মহাজনী কারবারও নেই আমার। আমার কাছে এসেচেন টাকা ধার নিতে, বেশ মজার লোক তো আপনি! আপনার কলকাতায় বাড়ী আছে, মর্টগেজ রাখলে যে-কোন জায়গা থেকে ধার পাবেন। ব্যাঙ্ক থেকেই তো ওভারড্রাফট নিতে পারেন!
গদাধর দুঃখিতভাবে বলিলেন–সে-সব করা তো চলে, কিন্তু তাতে বাজারে ক্রেডিট থাকে না ব্যবসাদারের। ব্যাঙ্কে ওভারড্রাফট নেওয়া চলবে না–বাড়ী বন্ধক দেওয়াও নয়। আছে অনঙ্গর গহনা, তা কি এখন বিক্রি করতে যাবো?
শোভা নিস্পৃহ ভাবে বলিল–কিন্তু আমি সেজন্যে দায়ী নই। আমার কাছে কেন এসেচেন? আপনার বোঝা উচিত ছিল আমার কাছে আসবার আগে যে, আমি পোদ্দার নই, টাকা ধারের ব্যবসাও করি নে।
-তা হোক, তুমি দাও, ও-টাকাটা তোমার আছে খুবই আমার বড় উপকার করা হবে।
প্রায় ঘন্টাখানেক ধরিয়া উভয়ের কথাবার্তা চলিল। শোভা কিছুতেই টাকা দিবে না, গদাধরও নাছোড়বান্দা। অবশেষে বহু অনুনয়-বিনয়ের পরে শোভা চার হাজার টাকা দিতে নিমরাজিগোছের হইল–বাকি টাকা দিতে সে পারিবে না, স্পষ্ট বলিল–গদাধর অন্য যেখান হইতে পারেন, সে টাকা যোগাড় করুন–
গদাধর বলিলেন–তবে চেকখানা লিখে ফেল–আমি হ্যাণ্ডনোট লিখি–সুদ কত লিখবো?
সাড়ে বারো পার্সেন্ট।
–ওটা সাড়ে-নয় করে নাও। তুমি তো আর সুদখোর মহাজন নও? উপকার করবার জন্যে তো দিচ্চো–সুদের লোভে দিচ্চো না তো!
–টাকা ধার দিচ্চি যখন, তখন ন্যায্য সুদ নেবো না তো কি! উপকার করচি, কে আপনাকে বলেচে? কারো উপকার করার গরজ নেই আমার। সাড়ে-বারো পার্সেন্টের কমে পারবো না। ওর চেয়েও বেশি সুদ অপরে নেয়।
গদাধর অগত্যা সেই হিসাবেই হ্যাণ্ডনোট লিখিয়া, চেক লইয়া গেলেন।
সেদিন রাত্রে অনঙ্গ স্বামীকে বলিল,–হ্যাগা, একটা কথা বলবো, শুনবে?
–কি?
–তোমার টাকার দরকার হয়েচে বলচেন ভড়মশায়, কত টাকার দরকার?
–কেন?
-বলো না, কত টাকার?
–দু’হাজার টাকার–দেবে?
–আমার গহনা বাঁধা দাও-নয় তো বিক্রি করো। নয় তো আর টাকা কোথা থেকে পাবে? কিন্তু এত টাকা তোমার দরকার হলো কিসের?
–সে-কথা এখন বলবো না। তবে জেনে রেখো যে, ব্যবসার জন্যেই দরকার। ভড়মশায় জানেন না সে-কথা।
–দেখ আমি মেয়েমানুষ–কিই-বা বুঝি? কিন্তু আমার মনে হয়, ভড়মশায়কে না জানিয়ে তুমি কোনো ব্যবসাতে নেমো না– অন্ততঃ পরামর্শ কোরো তাঁর সঙ্গে। পাকা লোক–আর আমাদের বড় হিতৈষী–আমায় না হয় নাই বললে, কিন্তু ওঁকে জানিও।
–এ নতুন ব্যবসা। ভড়মশায় সেকেলে লোক–উনি এর কিছুই বোঝেন না। থাক, এখন কোনো পরামর্শ করবার সময় নেই কারো সঙ্গে–যথাসময়ে জানতে পারবে। তুমি এখন খেতে দেবে, না বকবক করবে?
ধমক খাইয়া অনঙ্গ আর কোনো কথা না বলিয়া স্বামীর ভাত বাড়ীতে গেল। স্বামীর চোখে ভালবাসার দৃষ্টি সে আর বহুদিন হইতেই দেখে না–আগে আগে রাগের কথা বলিলেও স্বামীর চোখে থাকিত প্রেম ও স্নেহের দৃষ্টি–এখন ভালো কথা বলিবার সময়েও সে দৃষ্টির হদিস পাওয়া যায় না। অনঙ্গ যেন স্বামীর মন হইতে ক্রমশঃ দূরে সরিয়া যাইতেছে। কেন এমন হইল, কিছুতেই সে ভাবিয়া পায় না।
পরের মাসে অবস্থা যেন আরও খারাপ হইয়া আসিল। গদাধর প্রায় শেষরাত্রের দিকে বাড়ী ফেরেন, অনঙ্গ সন্দেহ করিতে লাগিল। গদাধর মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ অবস্থায় ফেরেন না! আসিয়াই বিছানায় শুইয়া পড়েন, কারো সঙ্গে কথা বলেন। না–বিছানা হইতে উঠিতে দশটা বাজিয়া যায়। গদির কাজও নিয়মমত দেখাশুনা করেন না। ভড়মশায় ইহা লইয়া দু-একবার বলিয়াও বিশেষ কোনো ফল লাভ করিলেন না।
শ্রাবণ মাসের দিকে হঠাৎ একদিন গদাধর ব্যস্তসমস্ত ভাবে বাড়ী আসিয়া বলিলেন–আমি একবার বাইরে যাচ্ছি, হয়তো কিছু দেরি হতে পারে ফিরতে–খরচাপত্র গদি থেকে আনিয়ে নিও ভড়মশায়কে বোলো, যদি কখনো দরকার হয়।
অনঙ্গ উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিল–কোথায় যাবে? ক’দিনের জন্যে–এমন হঠাৎ?
–আছে, আছে, দরকার আছে। দরকার না থাকলে কি বলচি!
–তা তো বুঝলাম–কিন্তু বলতে দোষ কি, বলেই যাও না। তুমি আজকাল আমার কাছে কথা লুকোও–এতে আমার বড় কষ্ট হয়। আমি তোমাকে কখনো বারণ করিনি বা বাধা দিইনি, তবে আমায় বলতে দোষ কি?
–হবে, সে পরে হবে। মেয়েমানুষের কানে সব কথা তুলতে নেই।
অনঙ্গ স্বামীর মেজাজ বুঝিত। বেশি রাগারাগি করিলে তিনি রাগ করিয়া না খাইয়া বাড়ীর বাহির হইয়া যাইবেন। আজকালই যে এমন হইয়াছে তাহা নয়–চিরকাল অনঙ্গ এইরকম দেখিয়া আসিতেছে। তবে পূর্বে অনঙ্গ ইহাতে তত ভয় পাইত না–এখন ভরসাহারা হইয়া পড়িয়াছে–স্বামীর উপর সে-জোর যেন সে ক্রমশঃ হারাইতেছে।
গদাধর একমাসের মধ্যে বাড়ী আসিলেন না, ভড়মশায়কে ব্যবসাসংক্রান্ত চিঠি দিতেন–তাহা হইতে জানা গেল, জয়ন্তী পাহাড়ে ভোটান ঘাট নামক স্থানে তিনি আছেন। অনঙ্গ চিঠি দিল খুব শীঘ্র ফিরিবার জন্য অনুরোধ করিয়া। গদাধর লিখিলেন, এখন তিনি কাজে ব্যস্ত, শেষ না করিয়া যাইতে পারিবেন না। অনঙ্গ কাঁদিয়া-কাটিয়া আকুল হইল।
একদিন পথে হঠাৎ শচীনের সঙ্গে ভড়মশায়ের দেখা। ভড়মশায় শচীনকে গদাধরের ব্যাপার সব বলিলেন।
শচীন বলিল–তা আপনারা এত ভাবছেন কেন? সে কোথায় গিয়েচে আমি জানি!
–কোথায় বলুন–বলতেই হবে। আপনার বৌদিদি ভেবে আকুল হয়েচেন-জানেন তো বলুন।
–আমার কাছে শুনেছেন, তা বলবেন না। সে তার কোম্পানির সঙ্গে শুটিং-এ গিয়েচে জয়ন্তী পাহাড়ে। পাহাড় ও বনের দৃশ্য তুলতে হবে–ভোটান ঘাটে শুটিং হচ্চে।
–সে কি, বুঝলাম না তো! শুটিং কি ব্যাপার?
–আরে, ফিল্ম তৈরী হচ্চে মশাই–ফিল্ম তৈরী হচ্চে! গদাধর ফিল্ম কোম্পানি খুলেচে-অনেক টাকা ঢেলেচে–নিজের আছে, আর একজন অংশীদার আছে। তাই ওরা গিয়েচে ওখানে–কিছু ভাববেন না। আমার কাছে শুনেচেন বলবেন না কিন্তু।
ভড়মশায় শুনিয়া মাথায় হাত দিয়া পড়িলেন। মনিব পাটের গদির ক্যাশ ভাঙিয়া ছবি তৈরির ব্যবসায় লাগিয়াছেন, এ ভালো লক্ষণ নয়। সে নাকি যত নটী লইয়া কারবার, তাহাতে মানুষের চরিত্র ভালো থাকে না, থাকিতে পারে না কখনও। বৌ-ঠাকরুণ সতীলক্ষ্মী, এখন দেখা যাইতেছে, তাঁহার আশঙ্কা তবে নিতান্ত অমূলক নয়।
অনঙ্গকে তিনি একথা কিছু জানাইলেন না।
আরও দুই মাস আড়াই মাস কাটিয়া গেল, গদাধর ফিরিলেন না, এদিকে একদিন গদির ঠিকানায় গদাধরের নামে এক পত্র আসিল। মনিবের নামের পত্র ভড়মশায় খুলিতেন–খুলিয়া দেখিলেন, শোভারাণী মিত্র বলিয়া কে একটি মেয়ে তাহার পাওনা চার হাজার টাকার জন্য কড়া তাগাদা দিয়াছে! ভড়মশায় বড়ই বিপদে পড়িলেন–কে এ মেয়েটি–মনিব তাহার নিকট এত টাকা ধার করিতেই বা গেলেন কেন–এ-সব কথার কোনো মীমাংসাই ভড়মশায় করিতে পারিলেন না। সাত-পাঁচ ভাবিয়া ঠিক করিলেন, মেয়েটির সঙ্গে নিজেই একবার দেখা করিবেন।
চিঠিতে ঠিকানা লেখা ছিল, ভড়মশায় একদিন ভয়ে-ভয়ে গিয়া দরজার কড়া নাড়িলেন। চাকর আসিয়া দরজা খুলিয়াই বলিল–ও তুমি আড়তের লোক?
ভড়মশায় বলিলেন–হ্যাঁ।
–মাইজি ওপরে আছেন, এসো।
ভড়মশায় কিছু বুঝিতে পারিলেন না–এ চাকরটি কি করিয়া জানিল, তিনি আড়তের লোক?
উপরে যে ঘরে চাকরটি তাহাকে লইয়া গেল, সে ঘরে একটি সুন্দরী মেয়ে চেয়ারে হেলান দিয়া বসিয়া অন্য একটি মেয়ের সহিত গল্প করিতেছিল–দেখিয়া ভড়মশায় একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন। তিনি দরজা হইতে সরিয়া যাইতেছিলেন, মেয়েটি বলিল–কে?
ভড়মশায় বিনয়ে ও সঙ্কোচে গলিয়া বলিলেন–এই–আমি—
চাকর পিছন হইতে বলিল–আড়তের লোক।
মেয়েটি বলিল–ও, আড়তের লোক! তা তোমাকে ডেকেছিলাম কেন জানো–এবার ওরকম চাল দিয়েছো কেন? ও চাল তুমি ফেরত নিয়ে যাও এবার–আর এক মণ কাটারি ভোগ পাঠিয়ে দিও–এখনি–বুঝলে?
ভড়মশাই ভয়ে ভয়ে বলিলেন, তিনি চালের আড়ত হইতে আসেন নাই, গদাধর বসুর গদি হইতে আসিয়াছেন।
— মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁহার দিকে চাহিয়া হাসিয়া ফেলিল, বলিল– তাই নাকি! ও, বড্ড ভুল হয়ে গিয়েচে। কিছু মনে করবেন না, বসুন আপনি। গদাধরবাবু এখন কোথায়?
–আজ্ঞে, তিনি ভোটান ঘাট…
–ও, শুটিং হচ্চে শুনেচিলাম বটে! এখনও ফেরেন নি?
–আজ্ঞে না।
–আচ্ছা, ঠিকানাটা দিয়ে যান আপনি। একটু চা খাবেন?
–আজ্ঞে না, মাপ করবেন মা-লক্ষ্মী, আমি চা খাই নে।
–শুনুন, আপনি আমার চিঠিখানা পড়েচেন তাহ’লে? নইলে আমার ঠিকানা কোথায় পেলেন? আমার পাওনা টাকাটার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকদিন হলো–এক মাসের জন্যে নিয়ে আজ তিন মাস…
–আজ্ঞে, বাবু এলেই তিনি দিয়ে দেবেন। আপনি আর কিছুদিন সময় দিন দয়া করে।
–আচ্ছা, আপনি ভাববেন না। এলে যেন একবার উনি আসেন এখানে, বলবেন তাঁকে।
ভড়মশায় অনেক কিছু ভাবিতে ভাবিতে গদিতে ফিরিলেন। কে এ মেয়েটি? হয়তো ভালো শ্ৰেণীর মেয়ে নয়, কিন্তু বেশ ভদ্র। যাহাই হউক, ইহার নিকট কর্তা টাকা ধার করিতে গেলেন। কেন, বৃদ্ধ তাহাও কিছু ভাবিয়া পাইলেন না। একবার ভাবিলেন, বৌ-ঠাকরুণকে সব খুলিয়া বলিবেন–শেষে ঠিক করিলেন, বৌ ঠাকরুণকে এখন কোনো কথা না বলাই ভালো হইবে। কি জানি, মনিব যদি শুনিয়া চটিয়া যান?
ইহার মাসখানেক পরে শোভারাণী একদিন হঠাৎ গদাধরকে সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিতে দেখিয়া বিস্মিত হইল।
সকালবেলা। শোভারাণীর প্রাতঃস্নান এখনও সম্পন্ন হয় নাই। আলুথালু চুল, ফিকে নীল রংয়ের সিল্কের শাড়ী পরনে, হাতে ভোরের খবরের কাগজ। শোভা কিছু বলিবার পূর্বেই গদাধর বলিলেন–এই যে, ভালো আছো শোভা? এই ট্রেন থেকে নেমেই তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলুম, এখনও বাড়ী যাই নি।
–আমার চিঠি পেয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। উত্তর দিতুম, কিন্তু চলে আসবো কলকাতায়, ভাবলুম আর চিঠি দিয়ে কি হবে, দেখাই তো করবো।
–আমার টাকার কি ব্যবস্থা করলেন?
–টাকার ব্যবস্থা হয়েই রয়েচে। ছবি তোলা হয়ে গেল—এখন চালু হলেই টাকা হাতে আসবে।
তার আগে নয়?
–তার আগে কোথা থেকে হবে বলো? সবই তো বোঝো। কলকাতার বাড়ীও মর্টগেজ দিতে হয়েচে বাকী বারো হাজার টাকা তুলতে। এখন সব সার্থক হয়, যদি ছবি ভালো বিক্রি হয়!
–ওসব আমি কি জানি? বেশ লোক দেখছি আপনি! কবে আমার টাকা দেবেন, ঠিক বলে যান!
–আর দুটো মাস অপেক্ষা করো। তোমার এখন তাড়াতাড়ি টাকার দরকার কি? সুদ আসচে আসুক না। এও তো ব্যবসা।
শোভা ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিল–বেশ মজার কথা বললেন যে! আমার সুদের ব্যবসাতে দরকার নেই। টাকা কবে দেবেন বলুন? তখনতো বলেন নি এত কথা–টাকা নেবার সময় বলেছিলেন এক মাসের জন্যে!
গদাধর মিনতির সুরে বলিলেন–কিছু মনে কোরো না শোভা। এসময় যে কি সময় আমার, বুঝে দ্যাখো। ক্যাশে টাকা নেই গদিতে। মিলের নতুন অর্ডার আর নিই নি–এখন পুঁজি যা কিছু সব এতে ফেলেছি।
–কত দিনের মধ্যে দেবেন? দু’মাস দেরি করতে পারবো না।
–আচ্ছা, একটা মাস! এই কথা রইলো। এখন তবে আসি। এই কথাটা বলতেই আসা।
–বেশ, আসুন।
দুই মাস ছাড়িয়া তিন মাস হইয়া গেল।
গদাধর বড় বিপদে পড়িয়া গেলেন। ডিস্ট্রিবিউটার ছবি তৈরি করিতে অগ্রিম অনেকগুলি টাকা দিয়াছে ছবি বিক্রির প্রথম দিকের টাকাটা তাহারাই লইতে লাগিল। ছবি ভাড়া দেওয়া বা বিক্রয় করার ভার তাদের হাতে, টাকা আসিলে আগে তাহারা নিজেদের প্রাপ্য কাটিয়া লয়-গদাধরের হাতে এক পয়সাও আসিল না এই তিন মাসের মধ্যে। অথচ পাওনাদাররা দুবেলা তাগাদা শুরু করিল। যে পরিমাণে তাহাদের উৎসাহ ও অধ্যবসায় তাহারা প্রদর্শন করিতে লাগিল টাকার তাগিদ দিতে, তাহার অর্ধেক পরিমাণ উৎসাহ ও অধ্যবসায় দেখাইয়া মারকোনি বেতার-বার্তা পাঠাইবার কৌশল আবিষ্কার করিয়াছিলেন, বা প্রখ্যাতনামা বাণার্ড পেলিসি এনামেল করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করিয়াছিলেন।
কিন্তু এরূপ অমানুষিক অধ্যবসায় দেখাইয়াও কোনো ফল হইল না–গদাধর কাহাকেও টাকা দিতে পারিলেন না!
ছবি বাজারে চলিল না, কাগজে নানা বিরুদ্ধ সমালোচনা হইতে লাগিল–তবুও গোলাদর্শকরা মাস-দুই ধরিয়া বিভিন্ন মফঃস্বলের শহরে ছবিখানা দেখিল। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটারের অগ্রিম দেওয়া টাকা শোধ করিতেই সে টাকা ব্যয় হইল–গদাধরের হাতে যা পড়িল–তাহার অনেক বেশি তিনি ঘর হইতে বাহির করিয়াছেন। প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করিয়া গদাধর পাইলেন সাত হাজার টাকা! তেইশ হাজার টাকা লোকসান।
ইতিমধ্যে আরও মুশকিল হইল।
পুনরায় একখানা ছবি তোলা হইবে বলিয়া আর্টিস্টদের সঙ্গে, যে বাগানবাড়ী ভাড়া লইয়া স্টুডিও খোলা হইয়াছিল–তাহাদের সঙ্গে এবং মেসিন-বিক্রেতাদের সঙ্গে এক বৎসরের কন্ট্রাক্ট করা হইয়াছিল–ছবি তুলিবার দেরি হইতেছে দেখিয়া তাহারা চুক্তিমত টাকার তাগাদ শুরু করিল। কেহ কেহ অন্যথায় নালিশ করিবার ভয়ও দেখাইল।
গদাধর যে সাত হাজার টাকা পাইয়াছিলেন–তাহার অনেক টাকাই গেল এই দলের মধ্যে কিছু কিছু করিয়া দিয়া তাহাদিগকে আপাততঃ শান্ত করিতে। শোভার টাকা শোধ দেওয়ার কোনো পন্থাই হইল না। বাজারেও এখন প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা দেনা।
অঘোরবাবু উপদেশ দিলেন, ইহার একমাত্র প্রতিকার নতুন একখানা ছবি তৈরি করা। আরও টাকা চাই-গদাধর ডিস্ট্রিবিউটারদের সঙ্গে কথা চালাইলেন। তাহারা এ ছবিতে বিশেষ লোকসান খায় নাই, নিজেদের টাকা প্রায় সব উঠাইয়া লইয়াছিল–তাহারা বাকি ত্রিশ হাজার টাকা দিতে রাজী হইল– কিন্তু গদাধরকে ত্রিশ হাজার বাহির করিতেই হইবে। ষাট হাজার টাকার কমে ছবি হইবে না। অঘোরবাবু উৎসাহ দিলেন, ছবি করিতেই হইবে। দু’একখানা ছবি অমন হইয়া থাকে।
