দম্পতি (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাঁচ
বাগানের বাড়ীটার সামনেই পুকুর। পুকুরের ওপারে কলমের আমগাছ অনেকগুলি–ওদিকের অংশটা তারের জাল দিয়া ঘেরা। কারণ এখন আমের বউলের গুটির সময় আসিতেছে–ইজারাদার ঘিরিবার ব্যবস্থা করিয়াছে। কলমবাগান ও পুকুরের মাঝখানে এখনও বেশ ভালো ভালো গোলাপ হয়। এখানে বাঁধানো চবুতারায় একটা দল ভিড় করিয়া বসিয়া গল্পগুজব ও হল্লা করিতেছে।
শচীন বলিল–অঘোরবাবুকে তাহ’লে ডাকি। আজ দোল পূর্ণিমা, শুভ দিন–একটা ব্যবস্থা করে ফেল। যেমন কথা আছে।
–অঘোরবাবু এসেচেন?
-এই তো মোটরের শব্দ হলো,–এলেন বোধহয়। স্টুডিওর মোটর আনতে গিয়েছিল কিনা।
–বেশ, করে ফেল সব ব্যবস্থা।
প্রায় পঞ্চাশ বছরের এক শৌখীন প্রৌঢ় লোক–রঙ শ্যামবর্ণ, বেঁটে, একহারা চেহারা–মাথার চুলে এই বয়সেও ব্রিলেন্টাইন মাখানো, মুখে সিগারেট–আসিয়া ঘাটের সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াইয়া বলিলেন–এই যে, সব এখানে!
শচীন ও গদাধর দুজনে ব্যস্ত হইয়া বলিলেন–আসুন, আসুন অঘোরবাবু, আপনার কথা হচ্ছিল।
রেখার দিকে চাহিয়া অঘোরবাবু বলিলেন–তাই তো, আমাদের একটা কথা ছিল। না হয় চলুন ওদিকে।
রেখা অভিমানের সুরে বলিল–বললেই হয় যে, উঠে যাও, অমন করে ভণিতা করবার কি অধিকার আপনার আছে মশাই?
হাসিয়া অঘোরবাবু বলিলেন–না রেখা বিবি, অধিকার কিছু নেই, জানি! এখন লক্ষ্মীটি হয়ে দু’পা একটু কষ্ট করে এগিয়ে গিয়ে, ওই চাতালে বসে যারা স্ফুর্তি করছে, ওখানে যাও না। আমরা একটু পাতলা হয়ে বসি।
রেখা রাগ করিয়া বলিল–অমন রেখা-বিবি, রেখা-বিবি বলবেন না বলচি ও কেমন কথা। না, আমি অমন সব ধরণের কথা ভালবাসি নে।
রেখা উঠিয়া ফড়ফড় করিয়া চলিয়া গেল।
অঘোরবাবু বলিলেন–তারপর, আপনি তো এই আছেন দেখচি। একটা ব্যবস্থা তাহলে হয়ে যাক। আজ শুভদিন–দোলযাত্রা পূর্ণিমা তিথি।
শচীন বলিল–আর এদিকে পূর্ণিমার চাঁদের ভিড়ও লেগে গিয়েচে ঘোষেদের বাগানবাড়ীতে–আমার মত যদি নাও তবে…
অঘোরবাবু ধমক দিয়া বলিলেন–অহো, তোমার সবতাতে ঠাট্টা আর ইয়ার্কি ভালো লাগে না। শোন না, কি কথা হচ্চে।
গদাধর বলিলেন–আপনি হিসেবটা করেচেন মোটামুটি?
–হ্যাঁ, এখন এগার হাজার আন্দাজ বার করতে হবে আপনাকে। সব হিসেব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আজ চেক-বই এনেচেন? পাঁচ হাজার আজই দরকার। বাগানটার লিজ রেজিষ্ট্রি হবে সোমবারে–সেলামীর টাকা আর এক বছরের ভাড়া আজ জমা দিতেই হবে। অনেকখানি জমি আছে–স্টুডিওর উপযুক্ত জায়গা বটে। আর একটা কাজ করতে হবে আজ–সব মেয়েদের আজ কিছু কিছু বায়না দিয়ে হাতে রাখা চাই। এই ধরুন রেখা আছে, খুব ভাল নাচ অর্গানাইজ করে। ওকে রাখতে হবে। তারপর ধরুন সুষমাও বেঙ্গল ন্যাশনাল ফিল্ম স্টুডিওতে এখনও কাজ করে, ওকে আগে আটকাতে হবে। একবার ওদের সব ডাকিয়ে এনে যার যার নাচ-গান দেখে-শুনে নেবেন নাকি?
শচীন বলিল–না, না, সেটা ভালো হয় না। ওরা সবাই নামজাদা আর্টিস্ট ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কাজ করছে, কেউ বা করেচে– ওদের নাম কে না জানে? এই ধরুন, সুষমা…
অঘোরবাবু আঙুলে টাকা বাজাইবার ভঙ্গি করিয়া বলিলেন– আরে রেখে দাও আর্টিস্ট–সবাই আর্টিস্ট! আমিই কি কম আর্টিস্ট টাকা খরচ করতে হবে যেখানে, সব বাজিয়ে নেবো–এই রকম করে বাজিয়ে নেবো। আমি বুঝি, কাজ। এই অঘোরনাথ হালদার। সাতটা ফিল্ম কোম্পানি এই হাতে গড়েচে, আবার এই হাতে ভেঙেচে। ও কাজ আর আমায় তুমি শিখিও না।
গদাধর বলিলেন–যাক্, ওসব বাজে কথায় কান দেবেন না। আপনি যা ভালো বুঝবেন, করুন। কত টাকা চাই এখন বলুন?
-তাহলে ওদের সব ডাকি। পৃথক পৃথক কন্ট্রাক্ট হোক– সোমবার সব রেজিস্ট্রি হবে–লিজের সেলামী দু’হাজার, আর ভাড়া পাঁচশো–এ টাকাটি আলাদা করে রেখে বাকি ওদের দিয়ে দেবো।
–ওদের টাকা এখন দিতে হবে কেন? কান্ট্রাক্ট রেজিস্ট্রি হবার সময় টাকা দিলেই চলবে।
–না, না, এ তো বায়না। অঘোর হালদার অত কাঁচা কাজ করে না স্যর।
–বেশ।
রেখার ডাক পড়িল পুকুরঘাটে। অঘোরবাবু বলিলেন–রেখা বিবি, লেখাপড়া জানো তো? ফর্ম সই করতে হবে এখুনি।
–আবার রেখা বিবি?
–বেশ, কি বলে ডাকতে হবে, শিখিয়ে দাও না হয়!
–কেন, রেখা দেবী…পোস্টারে লেখা থাকে দেখেন নি কখনো? রেখা বিবি বললে আমি জবাব দিই নে।
বলিয়া রেখা নাক উঁচু করিয়া গর্বিতভাবে মুখ ঘুরাইয়া লইয়া চমৎকারভাবে সপ্রমাণ করিল যে, সে একজন সুনিপুণ অভিনেত্রী যদিও ভঙ্গিটা বিলিতি ছবির অভিনেত্রীদের হুবহু নকল।
অঘোরবাবু বলিলেন–এখানে সই করো, বেশ পষ্ট করে লেখো
রেখা নিজের ব্লাইজের বুকের দিকটা হইতে ছোট একটা ফাউন্টেন পেন বাহির করিতেই অঘোরবাবু বলিয়া উঠিলেন– আরে, বলো কি। তোমার আবার ফাউন্টেন পেন বেরুলো কোথা থেকে..য়্যাঁ! তুমি দেখচি কলেজের মেয়ে কি ইস্কুলের মাস্টারনী বনে গেলে! বলি, কালিকলমের সঙ্গে তোমার কিসের সম্পর্ক, জিজ্ঞেস করি? টাকাটা লেখো, টাকা!
–কত টাকা? যথেষ্ট অপমান তো করলেন।
–মাছের মায়ের পুত্র-শোক! অপমান কিসের মধ্যে দেখলে? সত্তর টাকার মধ্যে বায়না আজ পাঁচ টাকা।
রেখা রাগ করিয়া কলম বন্ধ করিয়া বলিল–পাঁচ টাকা? চাই, দিতে হবে না। পাঁচ টাকা এ্যাডভান্স নিয়ে যারা কাজ করে, তারা একস্ট্রা ভিড়ের সিনে প্লে করে–আর্টিস্ট নয়। আমাদের অপমান করবেন না।
–কত চাও রেখা দেবী, শুনি?
–অর্ধেক–পঁয়ত্রিশ টাকা–থার্টি-ফাইভ রুপি।
থাক থাক, আর ইংরিজি বলতে হবে না। দিচ্চি আমি, তাই দিচ্চি। আমাদের একটু নাচ দেখাবে তো? লেখো টাকাটা।
–পরে হবে-এখন।
–এখনই হবে, ক্যাপিটালিস্ট দেখতে চাচ্ছেন–ওঁর ইচ্ছে এখানে সকলের বড়।
রেখা দ্বিরুক্তি না করিয়াই পেশাদার নর্তকীর সহজ ও বহুবার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে পুকুরঘাটের চওড়া চাতালের উপর আধুনিক প্রাচ্য নৃত্য শুরু করিল। রেখা কৃশাঙ্গী মেয়ে। নাচের উপযুক্ত দেহের গড়ন বটে–জ্যোৎস্নারাত্রে নৃত্যরতা তরুণীর বিভিন্ন লাস্যভঙ্গি দেখিয়া গদাধর ভাবিলেন–টাকা সার্থক হয় এই ব্যবসায়! খরচ করেও সুখ, লাভ যদি পাই তাতেও সুখ! যে বয়েসের যা—আমার বয়েস তো চলে যায় নি এ-সবের!
অল্প একটু বিশ্রাম করিয়া রেখা বলিল–কথাকলি দেখবেন? সেবার এম্পায়ারে এসেছিলেন সত্যভামা দেবী–মাদ্রাজী মেয়ে, অমন কথাকলি আর কখনো…কি পোজ এক-একখানা। আমরা স্টুডিও সুদ্ধু নাচিয়ের দল এম্পায়ারে দেখতে গিয়েছিলুম কোম্পানির খরচে। দেখবেন?
-তুমি একবার দেখেই অমনি শিখে নিলে?
–কেন নেবো না–আমরা আর্টিস্ট লোক!
–আচ্ছা, থাক এখন কথাকলি। সুষমা দেবী কই? তাঁকে ডেকে ফর্মটা সই করে নেওয়া দরকার।
ডাক দিতে সুষমা আসিল। দেখিতে ভালো নয়, দোহারা চেহারা–গলার স্বর বেশ মিষ্ট। বেশি কথা বলে না, তবে সে আসিয়া সমস্ত জিনিসটা একটা তামাশার ভাবে গ্রহণ করিল। অঘোরবাবু বলিলেন–টাকাটা লিখুন আগে–চল্লিশ টাকা।
সুষমা কোনো কথা না বলিয়া নাম সই করিয়া চেক লইয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে অঘোরবাবু বলিলেন–উঁহু, গান গাইতে হবে একটা
সুষমা হাসিয়া বলিল–সে কি? এখন কখনো গান হতে পারে?
-ক্যাপিটালিস্ট বলছেন,–ওঁর কথা রাখতে হবে। গান করুন একটা।
গদাধর মোলায়েম ভাবে বলিলেন–না, না, থাক। উনি নামকরা গায়িকা–সবাই জানে। ওঁকে আর গান গাইতে হবে না। ও নিয়ম সকলের জন্যে নয়।
রেখা কাছেই ছিল, সে ঘাড় বাঁকাইয়া বলিল–নিয়মটা তবে কি আমার মত বাজে লোকদের জন্যে তৈরী? এ তো রীতিমত অপমানের কথা। না, এ কখনো…
ইহাদের কি করিয়া চালাইতে হয়, অঘোরবাবু জানেন। তিনি রেখার কাছে ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া তাহার মুখের কাছে হাত ঘুরাইয়া বলিলেন–রেখা বি–মানে দেবী, চটো কেন? গান আমরা সর্বদা গ্রামোফোনে শুনচি, রেডিওতে শুনুচি। কলকাতায় তো গান শোনবার অভাব নেই–কিন্তু নাচ আমরা সর্বদা দেখি নে–তোমার মত আর্টিস্টের নাচ দেখার একটা লোভও তো আছে–বুঝলে না?
গদাধরের বেশ লাগিতেছিল। বাড়ীতে থাকিলে এতক্ষণ তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন–নয়তো বসিয়া গদির হিসাবপত্র দেখিতেছেন। এ তবু পাঁচজনের মুখ দেখিয়া আনন্দে আছেন– বিশেষ করিয়া এমন সঙ্গ, এমন একটা রাত! একবার তাঁহার মনে হইল, অনঙ্গ আজ একটু সকাল-সকাল ফিরিতে বলিয়াছিল, বাড়ীতে যেন কি পূজা হইবে। তা তিনি গিয়া কি করিবেন? ভড় মশায় আছে, নিতাই আছে–দু’জন চাকর আছে–তাহারাই সব দেখাশুনা করিতে পারিবে এখন। তাঁহার অত গরজ নাই।
একে একে অনেকগুলি মেয়ের কন্ট্রাক্ট-ফর্ম সই করা হইয়া গেল। তাহারা পুকুরের সামনের পাড়ে–যেখানে সাবেক কালের গোলাপবাগ, সেদিক হইতে আসে–আসিয়া সই করিয়া আবার গোলাপবাগে ফিরিয়া যায়–যেন একগাছি ফুলের মালা ঢল হইয়া গিয়াছে–একএকটি করিয়া ফুল সরিয়া সরিয়া সূতার এদিক হইতে ওদিকে নাচের ভঙ্গিতে চলিতেছে..
গদাধর কি একটা ইঙ্গিত করিলেন একজন চাকরকে।
অঘোরবাবু বলিলেন–এখন আর না স্যর, যদি আমায় মাপ করেন। কাজের সময় ইয়ে ওটা বেশি না খাওয়াই ভালো। হ্যাঁ, আর-একটা কথা স্যর–যদি বেয়াদবি হয়, মাপ করবেন। আপনি ক্যাপিটালিস্ট, মালিক–একটু রাশভারি হয়ে চলবেন ওদের সামনে। ওরা কি জানেন, ‘নাই’ যদি দিয়েচেন, তবে একেবারে মাথায় উঠেচে! ধমকে রাখুন, ঠিক থাকবে। ‘নাই’ ওদের কখনো দিতে নেই। ওই রেখা…আপনার সামনে অত সব কথা বলতে সাহস করবে কেন? আমি এর আগে ছিলাম বেঙ্গল ন্যাশনাল ফিল্ম-এ-ক্যাপিটালিস্ট ছিল দেবীচাঁদ গোঠে, ভাটিয়া মার্চেন্ট। ক্রোড়পতি। গোঠে যখন স্টুডিওতে ঢুকতো–তার গাড়ীর আওয়াজ পেলে সব থরহরি লেগে যেতো। ওই শোভা মিত্তিরের মত–নাম শুনেছেন তো? অমন দরের বড় আর্টিস্টও গোঠেজির সামনে ভালো করে চোখ তুলে কথা বলতে সাহস করতো না। শোভারাণী মিত্তিরের কাছে রেখা টেখা এরা সব কি? শোভা এখন এদের এই কোম্পানিতে কাজ করে শুনচি।
গদাধর চুপ করিয়া শুনিলেন।
চাকর আসিয়া এই সময় জানাইল, খাবার জায়গা হইয়াছে।
অঘোরবাবু বলিলেন–সব ডেকে নিয়ে যা। আমি আর ইনি এখন না–পরে হবে। চাকর বলিল–জী আচ্ছা।
অঘোরবাবু বলিলেন–এখন খেতে বসলে, ওদের সকলের সঙ্গে একসঙ্গে বসতে হবে–সেটা ঠিক হবে না মশাই। নিজের চাল বজায় রেখে, নিজেকে তফাৎ রেখে চলতে হবে, তবে ওরা মানবে, ভয় করবে।
গোলাপবাগের মধ্যে যে দলটি ছিল, তাহারা হল্লা করিতে করিতে খাইতে গেল। রাত দেড়টার কম নয়। একটু ঠাণ্ডা পড়িয়াছে, চাঁদের আলোয় বাগানের পুরানো চাতাল, হাতভাঙা পরীর মূর্তি, হাতলখসা লোহার বেঞ্চি, শুকনো ফোয়ারা ইত্যাদি এক অদ্ভুত ছন্নছাড়া শ্রী ধারণ করিয়াছে। এ এমন একটা জগৎ, সেখানে যে কোনো অসম্ভব ঘটনা যেন যে-কোন মুহূর্তে ঘটিতে পারে! এখন হঠাৎ যদি চোগা-চাপকান-পরা শামলা মাথায় আনন্দনারায়ণ ঘোষ মহাশয় একতাড়া কাগজ হাতে, তাঁহার উনবিংশ শতাব্দীর গাম্ভীর্য ও মর্যাদা বজায় রাখিয়া ওই হাতভাঙা পরীর মূর্তিটার আড়াল হইতে ধীর পদক্ষেপে বাহির হইয়া আসেন–তবে যেন কেহই বিস্মিত হইবে না।
গদাধর বলিলেন–আর কত টাকা লাগবে?
–আরও দু’হাজার তো কালই চাই-মজুত রাখবেন স্যর; তাহলে আপনার হলো এগারো হাজার।
–আমার সঙ্গে দেখা হবে কোথায়?
–আপনার গদিতে।
–না। আমার গদিতে এখন যাবার দরকার নেই। এ ব্যাপারটা একটু প্রাভেট রাখতে চাই।
-তাহলে ওই দু’হাজারের চেকটা!…
-কাল আমায় ফোন করবেন–বলে দেবো, কোথায় গিয়ে নিতে হবে।
–যে আজ্ঞে, স্যর। আপনি যেমন আদেশ দেবেন, সেইভাবে কাজ হবে। আমার কাছে কোনো গোলমাল পাবেন না কাজের, আপনি টাকা ফেলবেন, আমি গ’ড়ে তুলবো। এই আমার কাজ এজন্যে আপনি আমায় মাইনে দেবেন, শেয়ার দেবেন–আপনি কাজ দেখে নেবেন। আমায় তো এমনি খাটাচ্চেন না আপনি?
চাকর আসিয়া বলিল–আসেন বাবুজী, আপনাদের চৌকা লাগানো হয়েচে।
অঘোরবাবু বলিলেন–কোথায় রে?
–হলঘরের পাশের কামরামে।
–চলুন তবে স্যর, রাত অনেক হলো, খেয়ে আসা যাক। তবে একটা কথা বলি। আপনি এদের অনেককে ভাঙিয়ে নিচ্চেন, এদের স্টুডিওর লোকেরা যেন না জানতে পারে। আজ তো ওদেরই পার্টি–-শচীনবাবুকে বলবেন কথাটা গোপন রাখতে।
–না, কে জানবে? শচীন খেতে গিয়েচে…এলেই বলে দেবো।
রাত প্রায় শেষ হইয়া আসিল, গদাধর দেখিলেন, এখন আর বাড়ী যাওয়া চলে না। গদিতে গিয়া অবশ্য শুইতে পারিতেন, সেও এখন সম্ভব নয়। ভড়মশায় গদিতে রাত্রে থাকে…সে কি মনে করিবে?
সুতরাং বাকি রাতটুকু অঘোরবাবুর সঙ্গে গল্প করিয়া কাটাইয়া দিতে হইবে।
অঘোরবাবুও দেখা গেল গল্প পাইলে আর কিছুই চান না… কিংবা হয়তো তাঁহারও বাড়ী ফিরিবার উপায় নাই এখন।
সকাল হইয়া গেল।
গদাধর বাগানের পুকুরে স্নান সারিয়া চা-পান করিয়া একটু সুস্থ হইলেন। স্টুডিওর অভিনেতা-অভিনেত্রীর দল শেষরাত্রের দিকে সব চলিয়া গিয়াছে।
অঘোরবাবু বলিলেন–তবে আমি যাই স্যর, বাড়ী গিয়ে একটু ঘুমোবো।
–চলুন, আমিও যাবো। শচীনকে দেখচি নে, সে বোধহয় রাত্রে চলে গিয়েচে।
গদাধর বাগানবাড়ী হইতে বাহির হইলেন, কিন্তু নিজের বাড়ী বা গদিতে না ফিরিয়া, শোভারাণীর বাড়ী গিয়া হাজির হইলেন। শোভা সবে স্নান সরিয়া চা-পানের উদ্যোগ করিতেছে, গদাধরকে দেখিয়া একটু আশ্চর্য হইয়া বলিল–আপনি কি মনে করে? এত সকালে?
গদাধর আগের মত লাজুক ও নিরীহ পল্লীগ্রামের গৃহস্থটি আর এখন নাই। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছেন। তিনি প্রথমেই শোভার কথার কোনো উত্তর না দিয়া একখানি চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন। একবার এদিক-ওদিক চাহিয়া দেখিলেন। কোনোদিকে কেহ নাই। তখন সুর নীচু করিয়া তিনি বললেন–আমায় দেখে রাগ করেচো, না খুশী হয়েচো শোভা?
মুখ ঘুরাইয়া শোভা বলিল–ওসব ধ্যানের কথা এখন থাক। আমার নষ্ট করবার মত সময় নেই হাতে…কোনো কাজ আছে?
গদাধর হাসি-হাসি মুখে বলিলেন…না, কোনো কাজ নয়, তোমায় দেখতে এলাম।
–হয়েচে, থাক্।
-রাগ কিসের?
–রাগের কথা তো বলিনি–সোজা কথাই বলচি।
এইসময় ভৃত্য শুধু শোভার জন্য চা ও খাবার আনিয়া, টি-পয় আগাইয়া শোভার ঈজিচেয়ারের পাশে বসাইয়া দিল। শোভা ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া বলিল–বাবুর কই?
–আপনি তো বললেন না, মাইজি।
–যত সব উল্লুক হয়েচো! বলতে হবে কি? দেখতে পাচ্চো না?
গদাধর ব্যস্ত হইয়া বলিতে গেলেন–আহা, থাক্, থাক্, আমার না হয়–আমি আর এখন চা খাবো না শোভা।
শোভা নিস্পৃহ কণ্ঠে বলিল–তবে থাক্। সত্যিই খাবেন না?
–না, না–আমি–এখন থাক।
শোভা আর দ্বিরুক্তি না করিয়া নিজেই চা-পান শুরু করিয়া দিল।
গদাধর গলা ঝাড়িয়া বলিলেন–কাল সব কন্ট্রাক্ট হয়ে গেল শোভা। আমার অনুরোধ, তোমায় আমার কোম্পানিতে আসতে। হবে–কাল রেখা আর সুষমা কন্ট্রাক্ট করলে।
শোভা চায়ে চুমুক দিতে যাইয়া, চায়ের পেয়ালা অর্ধপথে ধরিয়া, গদাধরের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল–কোথায় হলো?
কাল রাত্রে, ঘোষেদের বাগানবাড়ীতে।
–অঘোরবাবু ছিল?
–হ্যাঁ, সেই তো সব যোগাড় করচে।
শোভা আর কোনো কথা না বলিয়া নিঃশব্দে চা খাইয়া চলিল– উদাসীন, নিস্পৃহভাবে। কোনো বিষয়ে অযথা কৌতূহল দেখানো যেন তাহার স্বভাব নয়। চা শেষ করিয়া সে পাশের ঘরে কোথায় অল্পক্ষণের জন্য উঠিয়া গেল, যাইবার সময় গদাধরকে কিছু বলিয়াও গেল না। পুনরায় যখন ফিরিল, তখন হাতে দু’খানা গ্রামোফোনের রেকর্ড। একখানা গদাধরের হাতে দিতে দিতে বলিল–এই দেখুন, আমার গান বেরিয়েছে, এইচ. এম. ভি–কাল এনেচি।
গদাধর পড়িয়া দেখিয়া বলিলেন–তাই তো! বেশ ভালো গান?
–শুনবেন নাকি?
–হ্যাঁ হ্যাঁ, তা মন্দ কি! বাজাও না।
শোভা রেকর্ডখানা গদাধরের হাত হইতে লইয়া পাশের ঘরে বড় ক্যাবিনেট গ্রামোফোনে চড়াইয়া দিয়া আসিল। গদাধর গানের বিশেষ কিছু বোঝেন না, ভদ্রতার খাতিরে একমনে শুনিবার ভান করিয়া বসিয়া রহিলেন। রেকর্ড শেষ হইলে মুখে কৃত্রিম উৎসাহের ভাব আনিয়া বলিলেন–বেশ, বেশ, ভারি চমৎকার। ওখানাও দাও, শুনি।
শোভা কিন্তু নিজে একবারও জিজ্ঞাসা করিল না, গান কি রকম হইয়াছে। বোধহয় গদাধরের নিন্দা বা সুখ্যাতির উপর সে কোনো আস্থা রাখে না। রেকর্ড বাজানো শেষ হইয়া গেল। শোভা একবার ঘড়ির দিকে চাহিল। গদাধর ইঙ্গিত বুঝিতে পারিলেন। এইবার বোধহয় শোভা উঠিবার জন্য ব্যস্ত হইয়াছে, দশটা প্রায় বাজে। অনিচ্ছার সহিত তাঁহাকে বলিতে হইল–আচ্ছা, আমি তাহ’লে আসি।
–আসুন।
–আমার কথার কোনো উত্তর দিলে না তো?
–কি কথা, বুঝলাম না!
–আমার ফিল্ম কোম্পানিতে কন্ট্রাক্ট করার।
শোভা গম্ভীর মুখে বলিল–আপনি আমার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করুন, এ-কথা আমি আপনাকে বলচি নে। তবুও কন্ট্রাক্ট করার আগে আমায় বললে পারতেন। আপনার টাকা গেল, তাতে আমার কিছুই নয়। আপনার টাকা আপনি খরচ করবেন, তাতে আমার কি বলার থাকতে পারে! কিন্তু আপনি যে-কাজ জানেন না, সে-কাজে না নামাই আপনার উচিত ছিল। অবিশ্যি আমি এমনি বললাম। আপনাকে বাধাও দিচ্ছি নে বা বারণও করচি নে। আপনার বিবেচনা আপনি করবেন।
–তোমার কি মনে হয়, এ-ব্যবসা লাভের হবে না?
–আমার কিছুই মনে হয় না। আমায় জড়াচ্ছেন কেন এ-কথায়?
–না, বললে কিনা কথাটা, তাই বলচি।
–আমার যা মনে হয়, তা আপনাকে আমি বললাম। ফিল্ম কোম্পানি খুলে সকলে যে লাভবান হয়, লক্ষপতি হয়, তা নয় বলেই ধারণা। অঘোরবাবু অবিশ্যি দু-তিনটে ফিল্ম কোম্পানিতে ছিলেন, কাজ বোঝেন–তবে অনেস্ট কিনা জানি না। আপনি করেন অন্য ব্যবসা, এর মধ্যে আপনি না নামলেই ভালো করতেন।
তুমি বড় নিরুৎসাহ করে দাও কেন লোককে! নামচি একটা শুভ কাজে–তুমি আসবে কিনা বলো!
–দোহাই আপনার গদাধরবাবু, আমি কিছু নিরুৎসাহ করি। নি। আপনি দমবেন না। তবে আমার কথা যদি বলেন, আমার আসা হবে না।
–এই উত্তর শোনবার জন্যে আজ সকালে তোমার এখানে এসেছিলাম আমি? মনে বড় কষ্ট দিলে শোভা। আমার বড় আশা ছিল, তোমাকে আমি পাবোই।
শোভা রাগের সুরে বলিল–আপনি পাটের ব্যবসা করে এসেচেন, অন্য ব্যবসার কথা আপনি কি বোঝেন যে যা-তা বলতে আসেন? প্রথম আমি তো ইচ্ছে করলেই যেতে পারি নে– এদের স্টুডিওতে আমার এখনও এক-বছরের কন্ট্রাক্ট রয়েচে। তাছাড়া আমি একটা নিশ্চিত জিনিস ছেড়ে অনিশ্চিতের পেছনে ছুটবো, এত বোকা আমায় ঠাউরেছেন?
–আমার কোম্পানি অনিশ্চিত?
–তা না তো কি? আপনি ও-কাজ বোঝেন না। পরের হাতে খেলতে হবে আপনাকে। এক ব্যবসায় টাকা রোজগার করে অন্য এক ব্যবসাতে ঢালচেন–কারো সঙ্গে পরামর্শ করেন নি। ওতে আমার সাহস হয় না–এক কথায় বললাম।
–আচ্ছা, আমি যদি তোমার সঙ্গে পরামর্শ করতাম, কি পরামর্শ দিতে?
–সে-কথায় দরকার নেই। কারো কথার মধ্যে আমি কখনো থাকি নে গদাধরবাবু, আমায় মাপ করবেন। বিশেষ করে এর মধ্যে রেখা, সুষমা রয়েচে–ওরা সকলেই আমার বন্ধুলোক, এক স্টুডিওতে কাজ করেচি অনেক দিন। অঘোরবাবুকে আমি কাকাবাবু বলে ডাকি। উনিও আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। অতএব আমি এ কথার মধ্যে থাকবো না।
-তা হচ্চে না, আমার কথার উত্তর দাও–তুমি কি পরামর্শ দিতে?
শোভা ধমকের সুরে বলিল–ফের আবার ওই কথা! ওর উত্তর আমার কাছে নেই। আচ্ছা, আমাকে কেন আপনি এর মধ্যে জড়াতে চান, বলতে পারেন? আমি কারো কথায় কখনো থাকি নে। তবুও আমি কখনও আপনাকে এ পরামর্শ দিতাম না।
–দিতে না?
–না। ব্যস, আপনি এখন আসুন। আমি এক্ষুনি উঠবো, অনেক কাজ আছে আমার।
গদাধর কিঞ্চিৎ অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিদায় লইতে বাধ্য হইলেন।
