ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আট

এখন বোট-এর সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। চারটি কেবিন। একটিতে ঋজুদা, একটিতে ক্যাপ্টেন ভাদেরা, একটিতে তিতির আর অন্যটিতে আমি আর ভটকাই। তিতির বাথরুমের আলোটা জ্বালিয়ে রেখে বাথরুমের দরজাটা ভেজিয়ে রেখেছে।

শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছে ভটকাই। রাতের খাবারটা কিন্তু দারুণই হয়েছিল। কৃতিত্ব ভটকাই-এরই, যদিও বেচারি গালাগালি খেয়েছে সকলেরই।

খেতে খেতে ঋজুদা এখানের সামুদ্রিক মাছেদের কথা বলছিল। ক্যাপ্টেন ভাদেরাও জানেন। কারণ পোর্ট ব্লেয়ারেই নাকি আছেন গত দু’বছর। বিয়ের পরে কোচিন-এ পোস্টিং হবে নাকি।

মাছ তো সমুদ্রে হাজারো রকমের হয় কিন্তু সব মাছ তো খায় না মানুষে। যে সব মাছ খায় এ অঞ্চলের মানুষে তার মধ্যে সুরমেই, কোরাই, ম্যাকারেল, সিলভার বেলিজ, রুপোলি পেটের মাছ, অ্যাকোরিজ, সার্ডিনস, সিয়ার ইত্যাদি মাছ আছে। সার্ডিনের আবার দু’রকমের কথা জানেন ক্যাপ্টেন ভাদেরা, হয়তো আরও রকম আছে। আছে হারমেগুলা আর ডসুমেরিয়া অ্যাকুয়া। এ ছাড়াও আছে রেজ, বারাকুড়া, মুলেট। জেলি ফিশ। নানারকম অক্টোপাস। শামুক, জার্মানরা যাকে বলে মুশেলস। কাঁকড়া। চিংড়ি নানা মাপের, বেশিই গলদা। বাগদাও পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুরা নানা দ্বীপে মিষ্টি জলের পুকুর করে, সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, ল্যাটা, শিঙ্গি, মাগুর, কই ইত্যাদি মাছ ছেড়েছে। মাঝে মাঝে বাজারেও ওঠে সেসব মাছ। তবে এই সমুদ্র-মেখলা দ্বীপগুলিতে এখনও মানুষের প্রধান খাদ্য সামুদ্রিক মাছই। শুঁটকি মাছও খায় অনেকেই।

বড় মাছের মধ্যে টুনা আছে। ওদের একটা প্রজাতি পাঁচ মিটার অবধি লম্বা হয়। তাদের বলে ব্লু-ফিন টুনা। ঋজুদা নাকি ব্লু-ফিন টুনার জন্যেই পরশু সারাদিন নৌকো ভাসিয়ে পড়ে থাকবে গভীর জলে। কী টোপ দেবে কে জানে! বড় বড় টুনা মাছগুলোর পিঠটা নীলচে-কালো হয়। আর পেটটা সাদা। অত বড় টুনা মাছ তো ইচ্ছে করলে ওই ছোট্ট জলি-বোটকে ডুবিয়েও দিতে পারে নীল তিমি মবিডিক যেমন ডুবিয়ে দিয়েছিল তিমি-মাছ ধরতে-যাওয়া জাহাজকে। অত বড় মাছ হলেও টুনা মাছ অন্যান্য মাংসাশী মাছের মতো কিন্তু অন্য ছোট মাছ খেয়ে বাঁচে না। এরা নিরামিশাষী। নানারকম প্ল্যাংকটন খেয়েই বাঁচে তারা। মাছেদের মধ্যে ওরা অন্যরকম।

বড় বড় টাইগার শার্ক হাঙর ঝড়ের গতিতে এসে স্যামন আর সার্ডিনের ঝাঁকে এসে পড়ে কাঁচের পাতের মতো জলকে টুকরো টুকরো করে আলোকিত সমুদ্রতলে মাছেদের ছত্রখান করে দেয়, দলছুট হয়ে তারা যে যেদিকে পারে সাঁতরে যায় অপূর্ব সব তাৎক্ষণিক জলজ আলোছায়ার জ্যামিতিক নকশা এঁকে।

সমুদ্রে কত দেবদেবীও আছেন। মানুষের ভূমিকা যেখানে সামান্য, নগণ্য, যেখানে সে অসহায় প্রকৃতির কাছে সেখানে দেবদেবীদের মানতেই হয়। অশাণ্ডিমারু, জরুইন, আরও কত।

ঋজুদা বলছিল, ইগুয়ানাও খায় অনেকে, তারা উভচর জীব। স্যালামান্ডারদের থেকে বড়। ফল খাওয়া বাদুরের মাংসও নাকি খুব স্বাদু হয়। কম্যান্ডো-ট্রেনিং-এর সময়ে সর্বভূক হতে হয়েছিল ঋজুদাকে। খেয়ে ছিল সব কিছুই। ঋজুদার ভাষায়, কীরে-মাকড়ে’ পর্যন্ত। সামুদ্রিক সি-কিউকুম্বার, সি-আর্চিস এসবও খায় মানুষে।

কাল সকালেই আমরা নামব ডেভিলস আইল্যান্ডে। রাতে তাই উত্তেজনাতে ঘুম হচ্ছে না আমার। সত্যিই কী এখানেই পাকাঁপোক্তভাবে থাকবে ঋজুদা? নাকি আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, কে জানে!

হাওয়া বয়ে আসছে সমুদ্রের উপরে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। হাওয়ার বাড়া-কমার সঙ্গে বৃষ্টিও বাড়ছে কমছে। কে জানে এই হাওয়া কলকাতা থেকেই আসছে কী না। কলকাতা কত দূর? মাঝে শুধু জল, অথৈ জল। ভাবতেই রোমাঞ্চ লাগছে।

আন্দামানে চারটি দ্বীপপুঞ্জের জটলা। নিকোবরের সঙ্গে এর সম্বন্ধ নেই। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে নিকোবরের দ্বীপগুলি অনেক বেশি নির্জন, বিচ্ছিন্ন এবং রোমাঞ্চকর। এর পরে একবার আসব নিকোবরের দ্বীপগুলিতে, ঋজুদা যদি নিয়ে আসে। আন্দামানের চারটি ভাগ, উত্তর, মধ্য, দক্ষিণ এবং লিটল আন্দামান। আর এদের দু’পাশে কত যে দ্বীপ, আগ্নেয়গিরিও আছে, আর কত যে দ্বীপের খোঁজ এখনও হয়নি তা কে বলতে পারে। কত নামের সব দ্বীপ, প্যাসেজ আর বে। মানে ক্ষুদে উপসাগর। একটা প্যাসেজের নাম, ইন্টারভু প্যাসেজ। কত straits সেন্টিনেল আইল্যান্ড, রসস আইল্যান্ড, স্পাইক আইল্যান্ড, রাটল্যান্ড আইল্যান্ড, ব্রাদার আইল্যান্ড, সিস্টার আইল্যান্ড, সব নাম বলতে গেলে নামের জপমালা হয়ে যাবে। ব্যারেন আইল্যান্ডের আগ্নেয়গিরি থেকে সাম্প্রতিক অতীতেও অগ্ন্যুদগার হয়েছিল।

আন্দামান আর নিকোবরের মধ্যে অত্যন্তই গভীর সমুদ্র। মধ্যে দিয়ে দশ ডিগ্রি ল্যাটিচ্যুডের চ্যানেল গেছে। খুব বড় বড় ঢেউ ওঠে ওই মধ্যবর্তী সমুদ্রে। সত্যি কথা বলতে কী ওই ক’দিন পোর্ট ব্লেয়ারের আলো-ঝলমল হোটেলে আধুনিকতম সুযোগ সুবিধের মধ্যে থেকে সমুদ্রর যে মানুষের মনের উপর কেমন অভিঘাত তা ঠিক বুঝতে পারিনি। রাতে ওই নিঃসীম সমুদ্রের মধ্যে কাগজের নৌকোর মতো অলকা-পলকা বোটে শুয়ে ‘দ্য ডেভিলস আইল্যান্ডের নানা রাতচরা পাখির ডাক শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল আজ রাতে ঘুমোব না, সারারাত জেগেই থাকি। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সমুদ্রের মধ্যের এই ভয়াবহ নামের দ্বীপটির সান্নিধ্য উপভোগ করি।

হঠাৎই বিদঘুটে এবং প্রচণ্ড আওয়াজ করে কী একটা জন্তু ডেকে উঠল দ্বীপ থেকে। ওই ডাক কখনও শুনিনি। চমকে তো উঠলাম, ভয়ও পেলাম প্রকট। ভয় পেতে কেমন যে লাগে তা ভুলেই গেছি ঋজুদার কল্যাণে। তাড়াতাড়ি বালিশের তলা থেকে পাঁচ ব্যাটারির টর্চটা বের করে নিয়ে যথাসম্ভব কম শব্দ করে বোটের ডেকে উঠতে যেতেই ঋজুদা গলা নামিয়ে বলল, শুয়ে পড়। ও পাহাড়ের উপরে আছে। দেখতে পাবি না।

ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, কী ওটা ঋজুদা?

ঋজুদা মাঝরাতেও রসিকতা করল জুরুইন ভূত নয়, ও আন্দামানি পেঁচা। এত বড় পেঁচা ভারতের মূল ভূখণ্ডেও নেই। কালপেঁচার চেয়েও অনেক বড় হয়। বিরাট বিরাট লাল চোখ।. আমিও প্রথমবার ওর ডাক শুনে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। যা, শো গিয়ে।

ভাবছিলাম, অজ্ঞান তো তেমন তেমন শহুরে মানুষে গভীর জঙ্গলের গভীরে চরে বেড়ানো গোরুর ডাক শুনেও হয় কিন্তু, এ যে একেবারে আক্কেলগুড়ুম ডাক। দশ বছর বয়স থেকে ঋজুদার অ্যাসিসটেন্সগিরি করছি, কতরকম ভয়ের মধ্যে দিয়ে পার করে দিয়েছি দেশ-বিদেশের কত রাত-বিরেত কিন্তু এমন সাংঘাতিক ভয় আগে কখনওই পাইনি।

ফিরে এসে শুতে শুতে অনেকদিন আগে বলা ঋজুদার একটা কথা মনে পড়ে গেল। ঋজুদা বলেছিল, ভয়ের জনক হচ্ছে অজ্ঞতা। জিম করবেট-এর জাঙ্গল লোর’-এর সেই বনশি’-র কথা পড়িসনি? যেদিন হঠাৎ করে এক দারুণ ঝড়-ওঠা বিকেলে বনশি’র উৎস কিশোর জিম আবিষ্কার করলেন জঙ্গলের গভীরে, সেদিনই সেই হাড় হিমকরা বনশি-ভীতি মরে গেল।

বুঝলাম, যে ওই ডাক আগে কখনও শুনিনি বলেই, আমার অজ্ঞতার কারণেই, ভয় পেয়েছিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *