ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

সাত

যখন আমরা ডেভিলস আইল্যান্ডে গিয়ে পৌঁছলাম তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। এই পুরো সামুদ্রিক অঞ্চলেই সন্ধে হয় প্রায় সাতটাতে। তা ছাড়া, সমুদ্রের উপরে আলোও থাকে অনেকক্ষণ। জল মাত্রই তো স্থলের চেয়ে অনেক বেশি আলো প্রতিফলিত করে। বিকেলের আলোতে ছোট্ট, বহুবর্ণ দ্বীপটিকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল। কত রকমের যে গাছ সেখানে। পাখি কিন্তু সেই তুলনায় মনে হল কমই ছিল। আমাদের বোটট্রা দ্বীপটিকে আধাআধি পরিক্রমা করে ওদিকে গিয়ে পৌঁছতেই চোখে পড়ল এক ফালি তটভূমি। তার বালিতে কয়েকটা সামুদ্রিক টার্ন নেচে বেড়াচ্ছিল। তটভূমির কাছে নোঙর করা যায় না। কারণ সেখানে জল কম। আমরা তটভূমির পাশে যেখানে দ্বীপ সোজা উঠেছে জল থেকে, সেখানে নোঙর করলাম। তাও নোঙর জলে ফেলে নয়। কারণ, এখানে জল খুবই গভীর। পারের একটা মোটা প্যাডক গাছের সঙ্গে মোটা দড়ি বেঁধে দেওয়া হল। দু’জন খালাসি লাফিয়ে নামল বোট থেকে পাড়ে সেই দড়ি ভাল করে বাঁধবার জন্যে।

ঋজুদা বলল, ওইখানে যে তটভুমি দেখছিস তা এই পাহাড়ের পাথর, স্যান্ডস্টোন, বহুযুগ ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে হয়েছে। নইলে আন্দামানের প্রায় সব দ্বীপই এক একটা পাহাড়, মানে, পাহাড়চুড়ো। জলের মধ্যে থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে। যেটুকু আমাদের দৃষ্টিগোচর সেটুকুই দ্বীপ। সেই জন্যেই জল সব দ্বীপের চারদিকেই এত গভীর এবং জলে সাঁতরে এলে পাড়ে একটু হাত পা রাখারও জায়গা থাকে না এখানের অধিকাংশ দ্বীপেই।

আমি বললাম, তাই? এতদিনে বুঝলাম যে ডাঙার পরই জল কেন এত গভীর প্রায় সব দিকেই।

দড়িটা ভাল করে বাঁধা হলে আমরা সবাই একে একে নামলাম দ্বীপে দড়ি ধরেই। ক্যাপ্টেন ভাদেরা ততক্ষণে জলি-বোটটাকে খুলে ফেলে জলে নামানোর বন্দোবস্ত করতে লাগলেন। জলি-বোটটা বড় বোটের গায়ে বাঁধা থাকলে আমাদের ওঠানামার যেমন সুবিধা হবে তেমন ঋজুদা ইচ্ছে করলে বোট খুলে নিয়ে সমুদ্রে মাছও ধরতে যেতে পারে। জলি-বোটের সঙ্গে একটি আউট-বোর্ড এঞ্জিন লাগানো আছে। সমুদ্রের স্রোতে হাতে দাঁড় বেয়ে নৌকো চালানো সহজ নয়। আগেকার মানুষেরা পারতেন।

ভটকাই চেঁচিয়ে বলল, চলে আয় রুদ্র। ডেভিলস আইল্যান্ডকে এক্সপ্লোর করি।

ঋজুদা বলল, আজ একদম নয়। কাল সকালে হবে। সকলেই যাব একসঙ্গে। সবতাতে ইয়ার্কি নয়।

ইতিমধ্যে তিতির চেঁচিয়ে বলল, দ্যাখো ঋজুকাকা কীরকম অন্ধকার করে আসছে। পূবের আকাশে কেমন মেঘ জমছে দেখেছ?

হুঁ।

আমি বললাম, সত্যি! কে বলবে ডিসেম্বর মাস।

এখানে সন্ধের দিকে ডিসেম্বরেও ঝড় বৃষ্টি হয়। ঝড় না হলেও বৃষ্টি হয়ই। প্রায় রোজই। ঋজুদা বলল।

বলেছিলাম না। এখানে বর্ষাকালে একবার আসতেই হবে। আহা। এখানে শ্রাবণের যা রূপ হবে না! কল্পনা করেই সুখে মরে যাচ্ছি।

ভটকাই বলল।

পোর্ট ব্লেয়ারে এসে হোটেলে থাকতে পারো। এইরকম বোটে করে বর্ষার সমুদ্রে যাওয়াআসা অসম্ভব বর্ষাতে।

তিতির বলল।

সেটা ঠিক।

ঋজুদা বলল।

তা ছাড়া, একা এলে তাকে বোট দিচ্ছেটাই বা কে?

সেটা অন্য কথা। আমার ক্যালি সম্বন্ধে তোদের ধারণাই নেই। কিন্তু না। তুমি সত্যিই একজন রিটায়ার্ড বোরিং বুড়ো হয়ে যাচ্ছ ঋজুদা। এবার থেকে সকাল বিকেলে তুমিও দেখছি কেডস পরে ছাতা বা লাঠি হাতে মর্নিং ওয়াক আর ইভনিং ওয়াক-এ যাবে আর পার্কের বা লেকের বেঞ্চে একদল বুড়োদের সঙ্গে বসে পরনিন্দা পরচর্চা করবে।

তা যাতে করতে না হয় সেই জন্যেই তো ডেভিলস আইল্যান্ডে এসে থিতু হব। তা ছাড়া, নিন্দা তো করে বুড়োরা ছেলে বউ-এর, আমার তো সেই বালাইই নেই।

আমরাই তো তোমার ছেলে মেয়ে। আমরা কি তোমার বালাই?

বলেই, ভটকাই আকাশে আঙুল তুলে কাঁপা কাঁপা ভয়ার্ত গলাতে বলল, ঋজুদা-আ-আ-ওই দ্যাখো, পুবাকাশে কুমুলো-নিম্বুলো মেঘ। কেলো হবে এবারে।

আমরা সকলেই সেদিকে চেয়ে আকাশের অবস্থা দেখে সত্যিই ঘাবড়ে গেলাম।

ঋজুদা বলল, বোটে উঠে আয় রুদ্র। যদি ঝড় আসে, তবে ঝড়ের দিক ও গতি বুঝে দ্বীপের অন্য দিকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হতে পারে আমাদের। ঝড়ের দাপট থেকে বাঁচতে। আমি অবাক হয়ে বললাম, এই সুন্দর রোদ ছিল হঠাৎ এরকম কালো হল কী করে।

আমার কথার কেউই উত্তর দিল না।

জলি-বোটটা কী তা হলে তুলে নেবে উপরে?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

না, তা কেন? জলি-বোট বাঘের পেছনে পেছনে যেমন ফেউ যায় তেমনই দড়ি বাঁধা অবস্থাতে পেছন পেছন যাবে। কান টানলেই মাথা আসবে।

আমরা বোটে উঠে আসতেই ইদ্রিস আলির অ্যাসিস্ট্যান্ট গোপালন ট্রেতে করে ধুয়ো ওঠা কফি আর খুব করে শুকনো লঙ্কা ঠাসা গরম গরম পেঁয়াজি নিয়ে এল।

এত শুকনো লঙ্কা দিতে কেউ কি বলেছিল?

তিতির জিজ্ঞেস করল, ঝালে মুখ বিকৃত করে।

গোপাল ভটকাইকে দেখিয়ে দিল তার ড্যাব ড্যাবা চোখ দিয়ে।

ঈস, অত ঝাল যে, মুখে দেওয়া যাচ্ছে না।

আমি বললাম। যদিও আমার খেতে আদৌ খারাপ লাগছিল না। তিতির আসলে ঝাল একেবারেই খেতে পারে না।

খাস না। ফেলে দে।

ভটকাই বলল।

ঋজুদা এক কামড় পেঁয়াজি খেয়ে বলল, কেন, ভালই তো হয়েছে খেতে, এমন কিছু ঝাল তো হয়নি। শুধু নিন্দার জন্যেই নিন্দা করিস না রুদ্র। তাতে নিজের অজানিতেই স্বভাব খারাপ হয়ে যায় মানুষের।

আমি চুপ করেই রইলাম। ঋজুদার জন্যেই বাঁদরটা এত বড় হনুমান হয়ে উঠল দিনে দিনে। কাকে আর বলব! খাল কেটে কুমির তো আমিই এনেছি।

ঋজুদা ভটকাইকে জিজ্ঞেস করল, পাইপে টোব্যাকো ভরতে ভরতে আকাশের দিকে তাকিয়ে, কী যেন বললি তুই একটা ভটকাই? কুমুলো-নিম্বুলো মেঘ, না কী যেন!

হ্যাঁ। ওইরকম কালোলা মেঘের নাম কুমুলোনিম্বুলো নয়?

ঋজুদা হেসে বলল, কিউমুলো নিম্বাস। কাছাকাছি গেছিস। কিন্তু…তারপর বলল, ওগুলোকে বলে Cumulo-nimbus. Nimbus এক ধরনের জলবাহী মেঘ আর সেই মেঘই যখন পুঞ্জীভূত হয় তখন তাদের বলে Cumulo-nimbus। উপরটা সাদা থাকে আর নীচে ঘন কালো মেঘপুঞ্জ।

তুমি এসব জানলে কী করে ঋজুকাকা?

তিতির মুগ্ধ গলাতে বলল।

আমার বন্ধু আছে না? ক্যাপ্টেন চৌধুরী রে, তোরা দেখেছিস আমার বাড়িতে, এয়ারবাস-এর ক্যাপ্টেন–ওর কাছ থেকে ধীরে ধীরে শিখেছি। যদি আমার কোনও ফ্লাইটে ও ক্যাপ্টেন থাকে তো ককপিটে ডেকে নেয় আমাকে টেক-অফ-এর পরেই। ওদের বাঁচা-মরা তো নির্ভর করে এই সব জ্ঞানের উপরেই আর ওদের সঙ্গে যাত্রীদের বাঁচা-মরাও–তাই ওদের বাধ্যতামূলক ভাবেই এসব শিখতে হয়, আমার তোর মতো শখের কারণে নয়।

বলো না আমাদের ঋজুদা, কত রকমের মেঘ হয়?

আমি বললাম।

তিতির বলল, কবি কালিদাসও সম্ভবত মেঘের এই নানারকমের কথা জানতেন নইলে তাঁর বার্তা কাকে দিয়ে পাঠাবেন তা ঠিক করতেন কী করে।

ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বলল, হয়তো জানতেন।

তারপর ভটকাইকে বলল, নীচে গিয়ে ক্যাপ্টেন ভাদেরাকে এপারে আসতে বল তো একবার। ভাদেরা আমার ভুল হলে শুধরে দেবে।

উনিও জানেন এসব?

ভটকাই অবাক হয়ে বলল।

নেভিতে যাঁরা আছেন, এয়ারফোর্সে যাঁরা আছেন তাঁরা জানবেন না, না কি আমি জানব! আকাশ আর মেঘ আর সমুদ্রের সঙ্গেই তো ওঁদের ঘর করা। ডাক, ওঁকে। ওঁর সঙ্গে অন্য কথাও আছে।

একটু পরেই ভাদেরা সাহেব এলেন। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স। ঝকঝকে যুবক। এখন নেভি অফিসারের পোশাকে নেই, মুফতিতে আছেন, এই কাজ তো তাঁর অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট নয়, যদিও ডিউটির মধ্যেই পড়বে।

গুড ইভনিং স্যার। অ্যাটেনশনে দাঁড়িয়ে ভাদেরা বললেন ঋজুদাকে।

ভেরি গুড ইভনিং স্যার।

ঋজুদা বলল।

মনে মনে বললাম, রাজা সবারে দেন মান। সে মান আপনি ফিরে পান।

দুটো শটগান আছে তো সঙ্গে?

ইয়েস স্যার।

গুলি? কী গুলি?

এল. জি. এস. জি. আর এক নম্বর শটস।

কী শটগান?

ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স-এর। টুয়েলভ বোর, ডাবল-ব্যারেলড।

ফাইন। আশা করি প্রয়োজন হবে না ব্যবহারের। তবে এই ডেভিলস আইল্যান্ডে সাপ তো আছে অনেকই, না কি?

থাকা তো স্বাভাবিক স্যার।

তিতির ক্যাপ্টেন ভাদেরার হাতে কফির কাপ তুলে দিল। কিন্তু উনি নিলেন না, বললেন, এখুনি খেয়ে এলাম। থ্যাঙ্ক ইউ।

ঋজুদা বলল, ক্যাপ্টেন আমি ওদের মেঘ চেনাব। আমার ভুল হলে আপনি একটু শুধরে দেবেন। আপনি যখন সঙ্গে আছেনই, আপনার সাহায্য না নেওয়াটা মূর্খামি হবে। আমি আর কতটুকু জানি!

ক্যাপ্টেন ভাদেরা বললেন, মাই প্লেজার স্যার।

ঋজুদা অ্যাটেনশানে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেনকে বসতে বলল। ভাদেরা আকাশের দিকে মুখ করে ডেক চেয়ারে বসলেন।

ইতিমধ্যে মেঘের রং ও অবস্থান বদলে গেছে অনেকই। হাওয়া দিয়েছে একটা। ডেভিলস আইল্যান্ডের হাজার হাজার সবুজ আর সাদা হাত হাতছানি দিচ্ছে আমাদের। হাওয়াতে পাতারা উলটে যাচ্ছে, পাতাদের সাদা বুক দেখা যাচ্ছে আবার পর মুহূর্তেই উলটে গিয়ে সবুজ বা লালচে বা খয়েরি হয়ে যাচ্ছে। নানা জলজ আর বনজ গন্ধে হাওয়াটা ভারী হয়ে গেছে। এই গন্ধবন্ধ আমাদের অচেনা। এতে জলের গন্ধ, মাছের গায়ের গন্ধ, মেঘের গায়ের গন্ধ, নানা অচেনা গাছের গায়ের গন্ধ মিশে আছে। সিঁদুরে লাল মাটির যতুটুক দেখা যাচ্ছে ডেভিলস আইল্যান্ডের সবুজের ফাঁকে ফাঁকে বৃষ্টিস্নাত, তা থেকেও সোঁদা গন্ধ উঠছে। যে গন্ধ একমাত্র মাটিরই।

সত্যি! প্রকৃতির কী লীলা খেলা! ভাবছিলাম, আমি।

ঋজুদা বলল, পাতলা পাতলা পেঁজাতুলোর মতো, ঊর্ধ্বমুখী সাদা মেঘকে বলে Cirrus। তারাই যখন আবার কেটে যাওয়া ছানার মতো ছাড়া ছাড়া হয়ে যায়, তখন তাদের বলে Cirro-cumulus. আবার Cirro যখন সমান্তরাল গড়নে দেখা যায় তখন তাদের নাম হয়ে যায় Cirro-stratus Strata থেকে Stratus বুঝলি তো?

এই অবধি বলে, ক্যাপ্টেন ভাদেরার দিকে ফিরে ঋজুদা বলল। ঠিক বলছি তো? আপনি তো বাংলা বোঝেন না–

তবে মেঘের নামগুলো নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?

বাংলাও বুঝি একটু একটু।

আমাদের অবাক করে দিয়ে ক্যাপ্টেন ভাদেরা বাংলাতেই বললেন। তারপর বললেন, আমার গার্ল ফ্রেন্ড, ন্যাভাল কমোডর সেনগুপ্তর মেয়ে। ওঁরা তো বাঙালিই। আমাদের এনগেজমেন্ট হবে সামনের মাসে। বিয়ে আগামী বছরের মার্চ মাসে।

ও তাই? কনগ্রাচুলেশানস। বাঃ বিয়ে করলে মার্চ মাস অবধিই করা ভাল ডিসেম্বর থেকে।

ভাদেরা অবাক হয়ে বললেন, কেন স্যার?

বাঙালি শ্বশুর তো, মার্চ অবধি লেপ-কম্বল দেবে।

ভাদেরা হেসে ফেললেন, আমরাও সকলেই হেসে উঠলাম বহুবার বিয়ে করা ঋজুদার এই কথা শুনে। তারপর আমরাও বললাম, কনগ্রাচুলেশানস।

আপনি কি কমোডর সেনগুপ্তকে চেনেন?

ভাদেরা জিজ্ঞেস করল।

ঋজুদা বলল, তেমন চিনি না, তবে গতবারে যখন এসেছিলাম তখন নারির একটা পার্টিতে দেখা হয়েছিল। কমোডর সেনগুপ্তর কথা মনে আছে। নাইস জেন্টেলম্যান। মিসেসকেও মিট করেছিলাম। প্রেটি লেডি। আই হোপ, মিস সেনগুপ্ত ইজ লাইক মাদার লাইক ডটার।

ক্যাপ্টেন ভাদেরা লজ্জাতে মেয়েদের মতো ব্লাশ করে বললেন, আই ডোন্নো।

তা হলে আবার শুরু করি? ঋজুদা বলল।

সার্টেনলি স্যার। ইউ নো অ্যাজ মাচ অ্যাজ উই ডু। মে বি, মোর।

ভাদেরা বললেন।

দেয়ার শুড বি আ লিমিট টু মডেস্টি ক্যাপ্টেন।

ঋজুদা বলল, Stratus যখন পুঞ্জীভূত হয়ে যায় তখন তা হয়ে যায় Stratus stratoccumulus। যখন ঘোর কালো দেখায় Stratus-দের তখন তাকে বলে Alto-stratus!

ভটকাই প্রশ্ন করল, এই সব মেঘই কি খুব উঁচুতে থাকে? মানে, যতখানি উঁচু দিয়ে প্লেন ওড়ে?

না, তা নয়। Stratus থাকে সবচেয়ে নীচে।

মানে? কত নীচে?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

এই ধর পনেরো-ষোলোশো ফিট উঁচু মাটি থেকে। তার উপরে প্রায় ছ হাজার ফিট অবধি দেখা যায় অন্যদের। হাজার থেকে কুড়ি হাজার ফিট অবধি দেখা যায় Alto-cumulos,Cumulo-nimbus, Alto-stratus এবং Cirro-stratus-দের। যদি আরও উপরে উঠিস, মানে, যে উচ্চতা দিয়ে প্যাসেঞ্জার জেট-প্লেন সাধারণত ওড়ে, চল্লিশ হাজার ফিট মতো, তখন দেখা যায় Cirrus আর Cirro cumulus-দের। আর চল্লিশ হাজার ফিটেরও উপরে, তুই হয়তো দেখে থাকবি রুদ্র স্যেশেলস-এ যাওয়া আসার সময়ে বা ঝিঙ্গাঝিরিয়া থেকে থুরি, বেনারস থেকে ফেরার সময়ে, দিনের বেলা প্লেনের জানালা দিয়ে, এক ধরনের বহুরঙা, রামধনুর মতো স্বপ্নময় সমান্তরাল মেঘপুঞ্জ। তাদেরই নাম Iridescent clouds..

বাবা! ভটকাই বলল, নিজেদের মনে হচ্ছে আমরাই যেন জেট-প্লেনের পাইলট।

যদিও মেঘ সেজেছিল পরতের পর পরত কিন্তু বৃষ্টিটা তখনকার মতো এল না।

ঝড়ও নয়। তবে মনে হল রাতে বৃষ্টি আসবে। তা আসুক, খাওয়া-দাওয়ার পর সমুদ্রের আর ডেভিলস আইল্যান্ডের ওপরে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ব আমরা। এও তো এক নতুন অভিজ্ঞতা। সমুদ্রের বুকের এত কাছে কান পেতে বৃষ্টির শব্দ শোনার অভিজ্ঞতা তো আগে হয়নি কখনও। ঢেউগুলো ছলাৎ ছলাৎ করবে। ছোট মাছের ঝাঁক গা ঘষে দিয়ে যাবে হয়তো বোটের স্টারবোর্ড সাইডে কিংবা কোনও মস্ত টুনা মাছই, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি-র’ বড় এবং বুড়ো মাছটার মতো।

আমার ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিয়ে ভটকাই বলল, বুঝলে ঋজুদা, রাতে আর বিশেষ ঝামেলা করতে মানা করলাম।

কীসের ঝামেলা?

ঋজুদাও যেন কী ভাবছিল, তার ভাবনার জাল ছেঁড়াতে সেও বিরক্ত হল।

মানে, ডিনারের মেনুর কথা বলছি।

ভটকাই বলল।

সত্যি! তুই একটা পেটুক দামু। অত খাওয়া-দাওয়া যদি করিস তা হলে তো বাড়িতে থাকলেই পারিস। তোকে আর নিয়ে আসব না কোথাওই।

আহা! রাগ করো কেন? একজনের তো ওদিকটা দেখতে হবে। খাবার বেলা তো রুদ্র আর তিতির চেটেপুটে খাবে আর বন্দোবস্তটা যে করছে সে খালি গালিই খাবে।

এবারে গুলি খাওয়াব তোকে।

আমি বললাম।

ভটকাই আমার কথাতে কান না দিয়ে, আমাকে পুরোপুরি ইগনোর করে ঋজুদাকেই বলল, মুগের ডালের খিচুড়ি। ভুনি খিচুড়িই করতে বলেছি। ডিরেকশান তো দিয়েছি, এখন কেমন করে দেখি! সঙ্গে বলেছি, মুচমুচ করকে আলু ভাজা আর সার্ডিন মাছ ভাজা। শুকনো লঙ্কা ভাজা আর আমের আচার। দেখলাম, অ্যাবারডিন বাজার থেকে কেনা বাঙালির দোকানের রসগোল্লাও আছে। এই বোটে ফ্রিজও আছে ঋজুদা, ব্যাটারিতে চলে। সোলার ব্যাটারি। হয়ে যাবে রাতের খাওয়াটা মোটামুটি আর কী! আরও কিছু কি করতে বলব? ঋজুদা তুমিই তো চিফ-গেস্ট।

থাম তো তুই এবারে।

ঋজুদা এবারে সত্যিই বিরক্ত হয়ে বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *