ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ

দারুণ জায়গা এই চিড়িয়াটাপ্প। সত্যিই দারুণ। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে এখানে আসার পথটি ধরে এগোতে এগোতেই তা বুঝতে পারলাম। পথই যদি এত সুন্দর হয় তবে গন্তব্য না জানি আরও কত সুন্দর হবে।

পুরো পোর্ট ব্লেয়ারটিই একটি মস্ত দ্বীপ। পাহাড়, নদী এবং সৈকতে ভরা। উঁচু নিচু পথ দিয়ে চমৎকার নিসর্গর মধ্যে দিয়ে গিয়ে আমরা পৌঁছব এই গভীর। আদিম বনের মধ্যের ছায়াচ্ছন্ন চিড়িয়াটাপ্পুতে।

ঋজুদা বলছিল, এখানেও একটি সৈকত আছে শুনেছি কিন্তু তেমন সুন্দর নয়। রুক্ষ। স্নান করারও অযোগ্য। বেলাভূমি বলতে পুরী বা দিঘা বা গোয়া বা কোভালম যা বোঝায় তা ওখানে নেই কিন্তু আন্দামান, আন্দামানই। এই সব পাহাড়, নিবিড় বন এবং সমুদ্রর মধ্যে এক আদিমতার গন্ধ আছে। প্রাক-ইতিহাস এখানে নীরবে কথা বলে।

পোর্ট ব্লেয়ারের বে-আইল্যান্ড হোটেল থেকে সকালে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে ন’টা নাগাদ সঙ্গে প্যাক-লাঞ্চ নিয়ে আমরা চিড়িয়াটাপ্পর দিকে বেরিয়েছিলাম। ঋজুদা বসেছিল টাটা সুমোর সামনের সিটে। তার পাইপের গোল্ড ব্লক তামাকের সুগন্ধ আর আমাদের তিনজনের নানা সওয়ালের লাগাতার জবাবে টাটা সুমোর ভিতরটা ভরে উঠছিল। আমরা যেভাবে প্রশ্ন করছি তিনজন ঋজুদাকে সকালে এবং ঋজুদাও বিনা প্রতিবাদে জবাব দিয়ে যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ঋজুদা যেন কোনও ট্যুর-অপারেটরের গাইড। পথের দুপাশের সব কিছু দেখাতে দেখাতে, চেনাতে চেনাতে চলেছে। কারণ ওটাই তার কর্তব্যকর্ম।

ছাব্বিশ কিমি পথ। কিন্তু কী সুন্দর। উপরে ঘন নীল আকাশ। পথের এক পাশে নীল সমুদ্রর দাপাদাপি ও উচ্ছ্বাস কখনও দেখা যায় কখনও আবার উঁচু নিচু জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি পথের আড়ালে সে মুখ লুকোয়। গাছেদের মধ্যে দেখলাম একমাত্র নারকোল গাছই চিনি এখানের আর সব গাছই প্রায় অচেনা। গাছপালা কিছু চিনি বলে মনের মধ্যে অজানিতে যে গর্বের বেলুন ফুলেছিল তা এখানে আসার পরই নিঃশব্দে ফেটে গেছে।

ঋজুদা শান্তিনিকেতনী কায়দায় গলা তুলে বলল, লাগল কেমন?

আমরাও সমস্বরে শান্তিনিকেতনী কায়দায় জোর গলাতে বললাম ভা–লো।

ঋজুদা বলল, আমরা যেখানে গিয়ে থামব চিড়িয়াটাপ্পর শেষ প্রান্তে সেই জায়গাটার নাম কারবাইনস কোভ। দক্ষিণ আন্দামানের শেষ প্রান্ত হচ্ছে। চিড়িয়াটাপ্পর এই কারবাইনস কোভ। সেখানে সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ জঙ্গল আছে। সমুদ্রের মধ্যের পনেরোটা দ্বীপ নিয়ে প্রায় তিনশো বর্গমাইল জুড়ে একটি ন্যাশানাল পার্কও নাকি গড়ে উঠেছে ওই দক্ষিণ সমুদ্রে।

তারপরে বলল, আমরা কারবাইনস কোভ-এর ছায়া সুনিবিড় বনের কোনও বড় গাছের ছায়াতে বসে কফি খাব। কী রে তিতির? খাব তো?ফ্লাস্কে করে এনেছিস তো কফি? নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?

তুমি কিচ্ছু ভেবো না। প্লাস্টিকের গ্লাস, দু’ ফ্লাস্ক ভর্তি কফি, বালির উপরে বিছিয়ে বসার জন্যে তোয়ালে, এমনকী রাক্ষস দু’জনের জন্যে বিস্ক-ফার্মের চকোলেট বিস্কিটস পর্যন্ত।

সে কী রে! এই তো জম্পেশ করে ব্রেকফাস্ট খেলি কর্নফ্লেকস, দুধ, বেকন ও হ্যাম, কষে সরষে দিয়ে। গোটা দুয়েক করে টোস্টও তো খেলি দেখলাম সঙ্গে। আর এরই মধ্যে…

শুধুই টোস্ট ঋজুকাকা! তুমি জ্যাম আর মাখনের পুলটিসগুলো লক্ষ করনি টোস্টগুলোর উপরে? এক একটা এক এক ইঞ্চি। সত্যিই এরা রাক্ষস।

তিতির বলল।

তুমি ফিগার করো। সুন্দর ফিগার না হলে তো মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না আজকাল, আমাদের ডায়েটিং করার কী দরকার।

আমাদের খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেওয়াতে রেগে গিয়ে বলল ভটকাই তিতিরকে।

আজকালকার মেয়েদের বিয়ে হয় না মিস্টার ভটকাই।

চুল ঝাঁকিয়ে বলল তিতির।

তবে কী হয়?

আজকালকার মেয়েরা বিয়ে করে। বিয়ে হওয়া আর বিয়ে করার মধ্যে বিস্তর তফাত মিস্টার ভটকাই।

বিয়ে কোনও ভদ্রলোক করে? যাদের জীবনে কিছুই করার নেই তারাই করার মধ্যে একটা বিয়ে করে ফেলে। ভাবা যায় না!

ভটকাই বলল, আক্রমণের সুরে।

আমি বললাম, তোমরা বড় দূরে চলে যাচ্ছ প্রসঙ্গ থেকে। হচ্ছিল ফিগারের কথা। আমি বলব, খাও, তারপর একসারসাইজ করে বার্ন-আউট করো। সেটাই সবচেয়ে ভাল।

ঋজুদা বলল, রাইট।

তারপরই বলল, ওই দ্যাখ, ওই গাছটা প্যাডক। এখানের বিশেষ গাছ। খুব বড় হয় গাছগুলো। এর কাঠেরও খুবই কদর।

বাবাঃ কী বড় গাছ রে বাবা! প্রাগৈতিহাসিক গাছ নাকি?

ভটকাই বলল।

এই প্যাডক আন্দামানের endemic। আসলে এখানের সব গাছই যে endem ic তা তো নয়, যদিও সে দিন তাই বলেছিলাম। ভুল বলেছিলাম, অন্যমনস্কতায়। উদ্ভিদও আছে এখানে প্রায় দুহাজার রকম। তার মধ্যে শুনেছি প্রায় আড়াইশো রকম endemic

আর পাখি?

তিতির বলল।

প্রায় আড়াইশো রকম পাখি আছে তার মধ্যে প্রায় আশিটা endemic। প্রায় আশি রকম সরীসৃপও আছে। এই জঙ্গলে মাংসাশী জানোয়ার তো নেই তবে বিষধর সাপ আছে নানারকম। জলে এবং জঙ্গলে। হরিণ ছিল অগণ্য। এক সময়ে কেউ হরিণ শিকার করে হরিণের দুটি কান বনবিভাগে নিয়ে গিয়ে দেখালে তাকে শটগানের একটি গুলি, এল জি বা এস জি, আর দুটি করে টাকা দেওয়া হত। হরিণের জন্য আন্দামানে চাষবাস করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

আর এখন?

ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

এখন সব জায়গারই মতো কমে এসেছে হরিণের সংখ্যা। কমবেই। মানুষ যেখানেই বসতি করবে সেখানেই প্রকৃতির উপরে চাপ আসবে–পশু, পাখি, প্রজাপতি সবই কমে আসবে ক্রমশ। এমন সর্বভূক, সর্বগ্রাসী জানোয়ার বিধাতা তো আর দুটো তৈরি করেননি।

মেগাপড পাখির কথা সেদিন বলতে গিয়ে থেমে গেলে। বলল না ঋজুকাকা। মেগাপড কি একটাও দেখা যাবে না?

আছে হয়তো, আমার ঠিক জানা নেই, তবে সংখ্যাতে নিশ্চয়ই কমে গেছে, যদি থেকেও থাকে।

এখানে মেগাপড নামের একটি দ্বীপ আছে শুনেছি মেজোমামার কাছে।

তিতির বলল।

আছেই তো! একটি রেস্তোরাঁও আছে। এই সব দেখেই মনে হয় যে মেগাপড বোধহয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তাই এখন দ্বীপের নাম আর রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডেই বেঁচে আছে। মেগাপড পাখি যে ডিম পাড়ে তা থেকে বাচ্চা ফুটে যখন বেরোয়, তখন তারা পুরোপুরিই স্বাবলম্বী। অনেকটা হাঁসের বাচ্চাদেরই মতো।

ভারী ওস্তাদ তো তারা। উড়তে পারে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই? হাঁসের বাচ্চারা যেমন সাঁতার কাটতে পারে।

ভটকাই জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।

দূর। মেগাপড যে উড়তেই পারে না! আর উড়তে পারে না বলেই তো ওদের বংশ অত সহজে নাশ করতে পারল মানুষে। এই পৃথিবীর উপর তার একারই যে একমাত্র দাবি নেই, অগণ্য পশু-পাখি প্রজাপতি সরীসৃপের এমনকী পোকা-মাকড়েরও আছে, এই সহজ ও স্বাভাবিক সত্যটা মানুষে কখনওই যে। মেনে নিতে পারল না।

ঋজুদা বলল।

এখন মানছে।

তিতির বলল।

না মেনে উপায় নেই বলেই মানছে। একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি।

ভটকাই যথারীতি ফুট কাটল।

ছাব্বিশ মাইল পথ, আমরা যেন আকাশ আর সমুদ্র, আদিম রেইন ফরেস্টস আর মানুষের লাগানো নারকোল বীথির মধ্যে উঁচু নিচু পথের নাগরদোলায় চেপে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এসে পৌঁছে গেলাম চিড়িয়াটাপ্লুতে। পথটা ক্রমশ বনবীথিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। দু’পাশ থেকে জঙ্গল চেপে ধরছিল, যেন চেপেই মারবে। জায়গায় জায়গায় আকাশও দ্যাখা যাচ্ছিল না। আর তার বদলে বনের চন্দ্রাতপ বিছিয়ে দিয়েছিল কোনও অদৃশ্য নিপুণ হাত যেন।

ঋজুদা বলল, আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।

কারবাইনস কোভ-এ গাড়ি থেকে নেমেই ভটকাই বলল, যাই বল আর তাই বল ঋজুদা, আন্দামানকে তেমন করে উপভোগ করতে হলে বর্ষাকালে একবার আসতে হবে। বর্ষাকালে ওই দ্বীপপুঞ্জের চেহারাটা ঠিক কেমন হয়, সামুদ্রিক ঝড় আর বৃষ্টি কেমন করে ওয়াশিং-মেশিনের মতো একে বোয়া-পাকলা করে তা নিজের চোখে একবার দেখবই।

ধোয়াটা তো জানি, পাকলাটা কী ব্যাপার?

তিতির জিজ্ঞেস করল ভটকাইকে।

ভটকাই হেসে বলল, ফরিদপুরিয়া শব্দ, এখন বাংলাদ্যাশি। আমার বড় ঠাকুমা ফরিদপুরের মেয়ে। তাঁর মুখেই শুনেছি এই ধোয়া-পাকলা শব্দবন্ধ। কচলে কচলে বোয়াকে বোধহয় পাকলানো বলে।

আমি বললাম, ভটকাইকে চটকালে যেমন হয় আর কী!

সকলেই হেসে উঠল আমার সেই কথায়, মায় ভটকাইও।

সমুদ্র থেকে মৃদুমন্দ হাওয়া আসছে। কিছু দূরেই একটা দ্বীপ। সেদিকে ম্যানগ্রোভ বেশি। এদিকের বনের মধ্যেটাও যেন নিচ্ছিদ্র। প্রায় এই ডিসেম্বরের উজ্জ্বল সকালেও ঘোরান্ধকার। ছোট ছোট ঢেউ এসে কারওর আদরের মৃদু চাপড়ের মতো সমুদ্রবেলাতে চাপড়াচ্ছে আর অস্ফুট এবং নিরবচ্ছিন্ন শব্দ উঠছে একটা। আর সেই শব্দটাকে, গুলি লাগা জল-পাখির মতো মুখে করে কোনও অদৃশ্য গোল্ডেন-রিট্রিভার কুকুরের মতো হাওয়াটা নিমেষে নিয়ে আসছে আমাদের দিকে তারপর বনের গভীরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলছে শব্দটাকে।

ছটফট করাটা ভটকাই-এর স্বভাব। তিতির যখন শুকনো বালিতে, একটি মস্ত নাম-না-জানা গাছের তলাতে তোয়ালে পেতে কফির ফ্লাস্ক ও বিস্কিটের হ্যাঁম্পার বের করে চিরকালীন মেয়েলি দক্ষতাতে সাজিয়ে গুছিয়ে বসেছে ঠিক সেই সময়ই ভটকাইচন্দ্র বলল, চল রুদ্র, জঙ্গলের ভিতরটা একবার ইনসপেক্ট করে আসি। তুই তো দেখছি বুড়ো মেরে গেলি।

ভেবেছিলাম, আন্দামান সম্বন্ধে তিতিরের মুখ থেকে কিছু শুনব, তা না সব ভেস্তে দিল ভটকাই। আমার মনে এ কথা আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ং ঋজুদাই ‘ভেটো প্রয়োগ করল। ভটকাইকে বলল, কোথায় যাবি মিছিমিছি সাপ-কোপের কামড় খেয়ে মরতে। কাল সকালেই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে, একেবারে ভোরেই, এক কাপ করে চা খেয়ে দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড’-এর উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছে যত ইচ্ছে অ্যাডভেঞ্চার করিস তখন। তোর জন্যে রহস্যর মৌচাক ঝুলবে সেখানে গাছে গাছে তার উপর বিপদও থাকবে হয়তো নানারকম। আর চাং ওয়ানের বা উ থান্টের দয়া হলে তো কথাই নেই।

যে ভটকাই উত্তেজনার গন্ধ পেয়েই ফক্স-টেরিয়ার কুকুরের মতো উত্তেজিত হয়ে উঠে বাধ্য ছেলের মতো বসে পড়ল বিছানো-তোয়ালের উপরে।

তিতির বলল, উ থান্টকে আবার কোথা থেকে আমদানি করলে?

আমি বললাম, ঋজুদার প্যান্ডোরাজ বক্স-এ যে কত কিছুই থাকে। উ থান্ট তো কিছুই নয়।

ঋজুদা বলল, সব ঔৎসুক্যর নিরসন এক সঙ্গে হয়ে যাওয়াটা মনের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। সময়েই সব জানবে। এখন তিতির তোমাদের আন্দামান সম্বন্ধে কিছু জানাবে। আমি তো ওকে বলিনি হোমওয়ার্ক করে আসতে অথচ ও নিজের থেকেই করে এসেছে মাত্র দশদিনের নোটিসে। শিক্ষিত মানুষের দেশভ্রমণ আর অশিক্ষিতর দেশভ্রমণে তফাত থাকেই। তোরা তিতিরকে দেখেও কিছু শিখলি না যে এত দিনেও এটা ভেবেই দুঃখ হয়।

তিতির বলল, লজ্জা দিয়ো না ঋজুকাকা। যাই শেখার তার সবই তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি। রুদ্রও শিখেছে। রুদ্রও কি পড়েশুনে আসেনি? নিশ্চয়ই এসেছে। কিন্তু ও হল ছুপা-রুস্তম। আগবাড়িয়ে কিছু বলতে যায় না।

এবার আমি লজ্জা পেলাম। বললাম, জানিই না কিছু, তার বলব কী।

ভটকাই বলল, ভাবছ এখানে আমিই একমাত্র মূর্খ। কিন্তু আসলে তা নই।

যে হোম-টাস্কটা তিতির আর রুদ্র এবং ঋজুদাও বটেই, আমার জন্যে আগে ভাগে সেরে রেখেছে এবং রাখে সব সময়ই তা আমি নিজে কোন দুঃখে করতে যাব? সময়টা কাজে লাগানোর জন্যে, নষ্ট করবার জন্যে নয়। ম্যানেজমেন্টের কথা এটা, পার্সোনাল টাইম ম্যানেজমেন্ট।

আমরা সবাই এক সঙ্গে হেসে উঠলাম।

তিতির বলল, কোথায় পড়তে যাবে ম্যানেজমেন্ট? ভটকাই?

আমি তো আর বড়লোকের পোলা নই যে ইংল্যান্ড আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়াতে চলে যাব পাত্তির জোরে। আমাকে এন্ট্রান্স পরীক্ষাতে বসে জোকা, কি আহমেদাবাদ বা অন্য কোথাওই পড়তে হবে।

সেখানেও তো টাকা লাগবে পড়তে। তারা তো স্কলারশিপ দেয় না, যদিও দেওয়া অবশ্যই উচিত।

আমি বললাম।

সে টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। তোরা সকলে মিলে দিবি ধার। নইলে ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ধার নেব। আজকাল তো ব্যাঙ্কও ধার দিচ্ছে মেধাবী ছাত্রদের। আর তাও যদি না পাই তবে তোর পিস্তলটা একদিনের জন্যে ধার নিয়ে কোনও বড়লোকের নিগুণ কোনও ব্যাটা বা জামাইকে ভড়কানি দিয়ে টাকা জোগাড় করে নেব। হোয়ার দেয়ার ইজ এ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে। পড়িসনি?

ঋজুদা বলল, ভটকাই, তিতির তোকে আগেও একদিন বলেছে ও কথা। ভুলে মেরে দিয়েছিস দেখছি।

কী কথা ঋজুদা?

ইংরেজিতে ‘এ’ বলে কোনও উচ্চারণ নেই। ওটা হবে ‘আ’। তা ছাড়া The শব্দটার উচ্চারণ ‘দিও হয়, ‘দ্যও হয়। কোনও স্বরবর্ণর শব্দর আগে the থাকলে তার উচ্চারণ হয় ‘দি’ আর ব্যঞ্জনবর্ণের আগে থাকলে হয় দ্য।

স্বরবর্ণ মানে?

মানে, ভাওয়েল।

আর ব্যঞ্জনবর্ণ?

কনসোনেন্ট!

আমি বললাম।

বাংলা-মিডিয়াম স্কুলে পড়েও তো ইংরেজি ফোঁটাচ্ছে কম নয় দেখি। বাংলা শব্দ জানো না, ইংরেজি প্রতিশব্দ জানো।

ভটকাই হেসে বলল, ওই আর কী! তারপর বলল, থ্যাঙ্ক ইউ। পরে আর কখনও ভুল করব না। দি আউল, দ্য কাউ, দি এনিমি, দ্য ডেভিলস আইল্যান্ড। ঠিক আছে?

আজকাল ভটকাই এসব কচ্ছে। সময়ের দাম সম্বন্ধে সে এতটাই সচেতন হয়ে উঠেছে যে, সেকেন্ডকে ‘সেক’, ঠিককে ‘ঠি, দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সকে ‘ডি স্কুল’ বলছে। প্রোমো’ ‘রিক্যাপ’ এসব তো বলছেই।

অবশ্য সকলেই আজকাল তাই বলছে। হঠাৎ-ই সময়ের দাম এত বেড়ে গেল কেন তাই ভাবছিলাম আমি। যে সময়টা মানুষ এখন নানাভাবে বাঁচিয়ে ফেলছে, ই-মেইল, ইন্টারনেট-এর মাধ্যমে, সেই উদ্বৃত্ত সময় নিয়ে মানুষ কী করছে, কোন কোন বিশেষ কাজে লাগাচ্ছে তা জানতে খুবই ইচ্ছে করে। ইনফরমেশান টেকনোলজির এই রমরমার দিনে, যোগাযোগের এতরকম সুবিধে পেয়ে আমরা মানুষ হিসেবে কতটুকু উন্নতি করেছি আগের থেকে সে বিষয়ে একটা সমীক্ষা অবশ্যই হওয়া উচিত। মনুষ্যত্বর উন্নতি হয়েছে না অবনতি, সেটাও জানা অবশ্যই প্রয়োজন।

ভাবলামই। সব কথা, সব জায়গায়, সব সময়ে সকলকে বলা যায় না।

আমার ভাবনার ঘোর কাটিয়ে দিয়ে ঋজুদা বলল, এবারে এক কাপ করে কফি খেয়ে গায়ে জোর করে নিয়ে তিতির দিদিমনির দেওয়া আন্দামানের Intro শোনার জন্যে তৈরি হও।

বলেই, ভটকাই-এর দিকে চেয়ে বলল, কী রে! পার্সোনাল টাইম ম্যানেজার, শিখেছি কি একটু একটু?

ভটকাই লজ্জা পেয়ে বলল, ভাল হচ্ছে না কিন্তু ঋজুদা।

কফি আর বিস্ক-ফার্মের চকোলেট ক্রিম বিস্কিট এবং নোন্তা বিস্কিট খাওয়ার পরে ঋজুদা বলল, এবারে শুরু কর তিতির।

হুঁ। বলে, তিতির যেন শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে বসে ছোট ছেলেমেয়েদের বাংলা পড়াচ্ছে এমনি ভাবে শুরু করল। তিতিরের মধ্যেই একজন বর্ন-দিদিমনি আছেন। পড়াশুনো শেষ করে ও অধ্যাপনাই করবে এমনই ওর ইচ্ছা যে, সে কথা আমাকে বহুবার বলেছে।

তিতির বলল, আমি কিন্তু নিকোবর সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারব না এখন। নিকোবর গ্রুপে আছে গ্রেট নিকোবর, কাঁচাল, নানকৌড়ি, চাওরা, টেরিজা এবং ক্যাম্পবেল বে, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ নর্থ আন্দামান, সাউথ আন্দামান, মিডল আন্দামান ও লিটল আন্দামান নিয়ে। চিড়িয়াটাপ্পর এই কারবাইনস কোভ, সাউথ আন্দামানের দক্ষিণের একেবারে শেষাংশ। আন্দামানের মধ্যে অনেকই দেখার মতো দ্বীপ আছে যেমন জলিবয়, আমরা দেখেছি সাউথ সিনক, রেড স্কিন, মধুবন, রসস, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওই সব সুন্দর ছবির মতো দ্বীপের কোনওটিতেই বিদেশিদের রাতে থাকার অনুমতি মেলে না। দেশিরাও যাঁরা যান দিনে দিনেই ফিরে আসেন। রাতে জনমানবহীন এইসব সুন্দর দ্বীপে ডাইনি জ্যোৎস্নার মধ্যে বোধ হয় পরী আর মৎস্যকন্যারা জলকেলি করে বেড়ায়। ভাবলেও গা ছমছম করে। না?

বিদেশিরা থাকতে পারে না বটে কিন্তু ঋজুদার বন্ধু চাং ওয়ান বা উ থান্টদের কথা আলাদা।

আলাদা বলেই তো আমরা কাল যাচ্ছি দ্য ডেভিলস আইল্যান্ডে।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, জাস্ট আ সেক তিতির।

ঋজুদা বলল, বাবাঃ ভটকাইচন্দ্র যে ভারী সাহেব হয়ে উঠল রে রুদ্র। কী করা যায়?

তাই তো দেখছি।

আমি বললাম।

কী বলছ, বলো?

তিতির বলল।

আন্দামান নামের কোনও ইতিহাস আছে কি?

অবশ্যই আছে। অনেকের মতে লর্ড হন্ডুমান বা হনুমান থেকেই এই দ্বীপপুঞ্জের নাম হয়েছে আন্দামান।

কেন হনুমান আবার এর মধ্যে এল কী করতে? তুমি কি বি জে পি-তে যোগ দিলে না কি?

না, যোগ দিইনি। কিন্তু দিলেও বা দোষের কী? বি জে পিও তো দেশের একটি স্বীকৃত দলই। পশ্চিমবঙ্গের মতলববাজ আঁতেলরা তাঁদের নিজ নিজ গূঢ় স্বার্থর কারণে কী ভাবেন বা কী বলেন তা নিয়ে আমার কোনওই মাথাব্যথা নেই। হনুমান এলেন এই জন্যে যে অনেকের ধারণা হনুমান লঙ্কাতে লাফ দিয়ে যাবার সময়ে তাঁর, মানে হনুর ‘ধাপ’ অর্থাৎ পা পড়ত এই দ্বীপশিরে। মানে, ইংরেজিতে থাকে বলে স্টেপিং-স্টোন আর কী!

একটু থেমে তিতির বলল, আন্দামান তো আর সল্টলেকের জলার দ্বীপ নয়। এ বহু পুরনো ব্যাপার। রামায়ণে তো এর উল্লেখ মেলেই। টলেমি ও জেরিনির লেখাতেও এর উল্লেখ মেলে।

ভটকাই বলল, রামেরই অস্তিত্ব নেই আর রামায়ণ।

তিতির বলল, তা বটে। মহম্মদ, যিশুখ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ, সকলেই ছিলেন, সকলেই মান্য, শুধু রাম বলেই কেউ ছিলেন না। ভারতবর্ষ দেশটা সম্বন্ধে যাদের সামান্যতম ধারণাও আছে তারা এমন গণ্ডমূর্খের মতো কথা কখনও বলবেন না। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা ভারতবর্ষের বাইরে নয়, সেখানে কোনও অন্য গ্রহের জীবেদের বাসও নয়। ঋজুকাকার সঙ্গে বারবার ভারতদর্শন করার পরেও যে তুমি এমন মূর্খের মতো কথা বলতে পারলে তা দেখে আমি অবাক হচ্ছি।

ঠিক আছে। উইথড্র করছি কথাটা। আগে বাড়ো।

রোম্যান জিওলজিস্টরা তাঁদের তৈরি করা বিশ্বর মানচিত্রে এই দ্বীপের উল্লেখ করেছেন ‘গুড ফরচুন’ বলে। তারপরে বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পর্যটক হিউয়েন সাঙও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এই দ্বীপপুঞ্জের উল্লেখ করেছেন নগ্ন মানুষের দেশ বলে। চোল রাজারা তাঁদের তাঞ্জোর শিলালিপিতেও একে ‘Nakkavaram’, মানে,নগ্ন মানুষের দেশ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে অনেকেরই ধারণা আন্দামান নামটি এসেছে মার্কো পোলোর উল্লিখিত Andamnian থেকেই।

পোর্ট ব্লেয়ার কি কারও নামানুসারে হয়েছে? ব্লেয়ার কি কোনও সাহেবের নাম ছিল?

আমি বললাম।

রাইট।

তিতির বলল। তারপর বলল, সতেরোশো ঊনব্বইতে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস-এর জমানাতে তিনি হাইড্রোগ্রাফার, ক্যাপ্টেন আর্চিবল্ড ব্লেয়ারকে বাংলা থেকে পাঠান এই দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্রের ম্যাপ করতে। ডাঙায় যেমন ভূতত্ত্ববিদ, সমুদ্রে তেমন সমুদ্রতত্ত্ববিদ। হাইড্রোগ্রাফির বাংলা কি ঠিক বললাম ঋজুকাকা?

আমি কি তোর চেয়েও পণ্ডিত?

পাইপ ধরাতে ধরাতে বলল ঋজুদা। একটু হেসে।

তারপর বলল, কলকাতাতে ফিরে শঙ্খদার সঙ্গে কথা বলিস। ফোন নাম্বার দিয়ে দেব।

কে শঙ্খদা? শঙ্খ চৌধুরী? স্কালপটার?

না রে! তিনি তো দিল্লিতে থাকেন। কবি শঙ্খ ঘোষ। ফরফরিয়ে বেড়ান অনেকেই চেলা-চামুণ্ডা নিয়ে অল্পজলের পুঁটি মাছের মতো। কিন্তু বাংলা ভাষাটাকে গুলে খেয়েছেন শঙ্খদা। নীরেনদাকেও জিজ্ঞেস করতে পারিস। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তবে শঙ্খদার মতো অমন প্রচার বিমুখ, লাজুক, কবিসুলভ কবি জীবনানন্দর পরে সম্ভবত বাংলাতে আর কেউই হননি।

তারপর বলল, বল তিতির। ভাগ্যিস তুই ছিলি। কত কী জানছি বল তো?

তিতির কপট রাগের সঙ্গে ঋজুদাকে শাসন করে বলল, ভাল হচ্ছে না কিন্তু। ঋজুকাকা।

বলেই, শুরু করল, আর্চিবল্ড ব্লেয়ার চ্যাথাম আইল্যান্ডে এসে আস্তানা গাড়েন। চ্যাথাম আইল্যান্ড, যেখানে করাত কল আছে, এই দ্বীপপুঞ্জেরই একটি দ্বীপ এবং তা আন্দামানের মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যেই পড়ে। দুই দ্বীপের মধ্যে একটা ছোট সেতুরই ব্যবধান মাত্র। সেই আর্চিবল্ড ব্লেয়ারের নামেই নাম হয় এই দ্বীপের, পোর্ট ব্লেয়ার।

তারপর একটু থেমে বলল, সেদিন আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে যে হর্ষবর্ধন জাহাজ গেল বন্দরে তা পোর্ট ব্লেয়ারের হ্যাঁডো হাফ’ বন্দরে। অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া। দুইই পোর্ট ব্লেয়ারেই। পোর্ট ব্লেয়ারের পত্তন হবার পরে মনে হয় স্কটসম্যানদের আধিপত্য ছিল এখানে নইলে দেখলে না শহরের মধ্যে এত স্কটিশ জায়গার নামের ছড়াছড়ি! অ্যাবারডিন বাজার।

ভটকাই হঠাৎ উঠে পড়ে বলল, বাবারে! আর তিতির দিদিমনির জ্ঞান ভাল লাগছে না। চলো ঋজুদা সকলে বনের মধ্যে কিছুটা হেঁটে আসি৷ ফরেস্ট বাংলোতে গিয়ে যে লাঞ্চ খাব, খিদে করতে হবে না?

কথাটা মন্দ বলেনি ভটকাই। তোর সেকেন্ড ক্লাস হবে লাঞ্চের সময়ে চিড়িয়াটাপ্পর বন-বাংলোতে। বুঝলি তিতির।

ঠিক আছে। ভালই হল। তুমিই তো ক্লাস নিতে বাধ্য করলে আমাকে। লাঞ্চের পরে রুদ্রর গান শুনব। যে যার মতো করে জেনে নেবে যা সে জানতে চায়, জোর করে জানানোর কোনও মানেও হয় না, ফতেপুর সিক্রি বা তাজমহলের বা আগ্রা ফোর্টের গাইডদের মতো।

ঠিকই বলেছিস।

ঋজুদা বলল।

তারপর বলল, ভটকাই-এর যদি আন্দামান সম্বন্ধে আরও জানার ইচ্ছে থাকে তো সে জেনে নিজেই নেবে। তুই উলুবনে মুক্তো ছড়াতে যাবি কোন দুঃখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *