ডেভিলস আইল্যান্ড (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
দুই
কী নাম বললে? ভটকাই জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।
চিড়িয়াটাপ্পু।
কী বিদঘুটে নাম রে বাবা। টাপ্পু মানে কী?
টাপ্পু মানে, মনে হয় পাহাড় বা পাহাড় চুড়ো। ঠিক জানি না। ঋজুদা বলল।
কোন ভাষা এটা?
তাও বলতে পারব না। সম্ভবত আন্দামানি। নিকোবরি নয়।
কাল সকালে তা হলে আমরা যাচ্ছি সেখানে? অনেক চিড়িয়া আছে বুঝি?
তাই তো শুনেছি। চিড়িয়ার কলকাকলিতে মুগ্ধ হব। শুনেছি, যাওয়ার পথটিও ভারী সুন্দর। এর আগে তিন-তিনবার আন্দামানে এসেছি কিন্তু চিড়িয়াটাপ্পতে যাওয়া হয়নি। একা যেতে ইচ্ছে করেনি। এবারে তোরা এসেছিস, তাই যাওয়া যাবে সকলে মিলে।
তুমি বলেছিলে আন্দামানের মেগাপড পাখির কথা। দ্যাখা যাবে সেই পাখি চিড়িয়াটাপ্পতে গেলে?
এবারে আমি বললাম।
নাঃ। ভারত মহাসাগরের স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জে যখন আমরা জলদস্যুদের গুপ্তধনের রহস্য সন্ধানে গেছিলাম তখনও কি নেনে পাখিদের দেখতে পেয়েছিলাম? স্যেশেলসের নেনে পাখিদের মতো এরাও প্রায় নিশ্চিহ্নই হয়ে গেছে। যে সামান্য ক’টি আছে তা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অগণ্য দ্বীপের কোন দ্বীপে আছে তা কে জানে!
অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে এদের বংশ বাড়ালে হয় না?
না। এ পাখি endemic.
মানে?
মানে এদের শুধু এখানেই দেখা যায়। এখানের অনেক গাছও তাই। Endemic। অন্য জায়গাতে নিয়ে গিয়ে লাগালেও বাঁচানো যায় না।
আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সবসুদ্ধ কতগুলো দ্বীপ আছে ঋজুদা?
সব দ্বীপ এখনও গোনাই হয়নি। অনেক দ্বীপই আছে uncharted.
তারপরই বলল, মেগাপড পাখির কথাতে মনে পড়ল যে, ওই পাখিরই মতো এখানকার আদিবাসীরাও endemic.
এখানের আদিবাসী কারা?
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে কতরকম মানুষের, মানে আদিবাসীদের বাস। যেমন ধর ওঙ্গে, আন্দামানি, জাবোয়া বা নিকোবরের শোম্পেনদেরও পৃথিবীর অন্য কোথাওই দেখতে পাবি না। এ এক আশ্চর্য সুন্দর দ্বীপমালা। আমার তো ভারত মহাসাগরের স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জ থেকেও ভাল লাগে এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জকে।
তবে একটা কথা, আমি বললাম, আন্দামানে স্যেশেলস-এর মতো সুন্দর সৈকত নেই, নেই অত নানারঙা কোরাল-এর বাহার। চান করার সুখ নেই, যা আমাদের ওড়িশার পুরীতে পর্যন্ত আছে।
সেটা অবশ্য ঠিক। তবে এর সৌন্দর্যর রকম আলাদা। এর সৌন্দর্যর মধ্যে এক ধরনের উদাসী ভয়াবহতা আছে।
ঋজুদা বলল।
তিতির বলল, যাই বল ঋজুকাকা, সেলুলার জেল কিন্তু ফ্যানটাসটিক। আমি যে বাঙালি সে জন্যে ভারী গর্ব হচ্ছিল। এই কালাপানি পার করিয়ে এনে যত বন্দিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে ব্রিটিশরা নিত্য-নৈমিত্তিক অমানুষিক অত্যাচার করত তাদের মধ্যে অধিকাংশই যে বাঙালিই একথা জেনে কোন বাঙালির গর্ব না হয় বল? এই সত্যটা ভারতের অন্য সব প্রদেশের মানুষেরা কি জানেন?
ভটকাই ফুট কাটল, জানলেও কি মানেন?
তা ঠিক।
আর তাঁদের অপরাধটা কী ছিল? যার জন্যে এই দ্বীপে নির্বাসন? চুরি করেননি, ডাকাতি করেননি, খুন করেননি এমনকী ঘুষও খাননি৷ দেশকে ভালবেসেছিলেন, শুধুমাত্র এই ছিল তাঁদের অপরাধ।
ঋজুদা বলল, সত্যি!
কাল সন্ধেবেলা সেলুলার জেলে লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের শোটা দেখে এসে রাতে আমার ঘুম হয়নি ঋজুকাকা। অত অত্যাচারও করতে পারে মানুষ মানুষের উপরে?
তিতির বলল।
অত্যাচার করলে কী হয়? ওঁদের একজনও কি মাথা নুইয়েছিলেন?
না। তা কেউই নোয়াননি।
ভটকাই বলল।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন: A man can be destroyed but he cannot be defeated. ঋজুদা বলল।
শুধু মানুষ বলো না। মানুষের মতো মানুষ’ বলো। সব মানুষই কি এক ধাতুতে গড়া?
না, তা তো নয়ই! ভটকাই বলল।
ঋজুদা বলল, মির সাহেবের একটি বিখ্যাত শায়রি আছে।
কী? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হিয়া সুরত-এ আদম বহত হ্যায়, আদম নেহি হ্যায়।
ভটকাই বলল, মানে?
মানে, মানুষের চেহারার জীব এখানে গিজগিজ করছে, মানুষ নেই।
চুপ করে রইলাম তিনজনেই। ঋজুদা পাইপটাতে টোব্যাকো ভরে নিয়ে আবার আগুন জ্বালাল। সকাল থেকে খায়নি একবারও। তিন কাপ চা খাবার পরে তার প্রাণ এখন পাইপ চাইছে।
আমরা পোর্ট ব্লেয়ারের বে-আইল্যান্ড হোটেলের লবিতে বসেছিলাম। বাঁদিকে পোর্ট ব্লেয়ার। সামনেই সমুদ্রের মধ্যে একটি পাহাড়। তার ডান কোণে একটি লাইটহাউস। ঘড়ির কাঁটা ধরে আলোটা ঘুরে যায় রাতের বেলা। এই হোটলের উপরে যখন আলোটা ঝাঁপটা মারে তখন সমুদ্রমুখী সব ঘরের মধ্যেটা আলোকিত হয়ে যায় এবং পরমুহূর্তেই অন্ধকার। সন্ধের পর থেকে পরদিন ভোর অবধি এমনি করেই ঘোরে আলোটা। আমার খুব ইচ্ছা করে, দূর সমুদ্রের মধ্যের কোনও লাইটহাউসে কয়েকটা দিন কাটাই। এই লাইটহাউস তোপোর্ট ব্লেয়ারের কাছেই, মানে, লোকালয়ের কাছেই। তাই সেই ভয়াবহতা বা রহস্য নেই।
কাল রাতে আমরা যখন খাওয়ার আগে সমুদ্রের একেবারে উপরেই হোটেলের লবিতে বসেছিলাম তখন হঠাৎই ভটকাই চেঁচিয়ে উঠেছিল, দ্যাখ, দ্যাখ রুদ্র।
চমকে উঠে দেখি, একটা প্রকাণ্ড বড় সাদা-রঙা আলোঝলমল জাহাজ ওই লাইটহাউসটির ওপাশ থেকে ঘুরে সামনের সমুদ্রের খাঁড়িতে ঢুকল। পোর্ট ব্লেয়ারে যাবে। জাহাজটা এত বড় কিন্তু একেবারে নিঃশব্দে চলছে আর দেখে মনেই হচ্ছে না যে, আদৌ চলছে।
যে বেয়ারা একটু আগেই আমাদের ফ্রেশ-লাইম-সোডা দিয়ে গেছিল, সে-ই এসে ভটকাইকে বলল, খোকাবাবু, এহি হ্যায় হর্ষবর্ধন।
আমি বিস্ময়ে চেয়েছিলাম। তিতিরও, কলকাতা–পোর্ট ব্লেয়ার আর পোর্ট ব্লেয়ার কলকাতা করা বহুদিনের নাম-শোনা হর্ষবর্ধনের দিকে। তারপরেই হর্ষবর্ধন পাঁচ সেকেন্ডের জন্যে ভোঁ দিল। সমস্ত দ্বীপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, উলটোদিকের পাহাড়ে, সেই ভয়ঙ্কর ভোঁ-এর অনুরণন উঠল। জঙ্গলে বড় বাঘ ডাকলে যেমন যেমন হয়, এই কালো, ভারী জলের আন্দামান উপসাগরে হর্ষবর্ধনের ডাক শুনে তেমনই এক অনুভূতি হল আমাদের। অনুভূতি’ শব্দটা বোধহয় ঠিক হল না, বলা উচিত অভিঘাত। অভিঘাতই হল।
আমাদের আসাটা হঠাৎই ঠিক হয়েছিল বলেই প্লেনে এসেছি। জাহাজে এলে, অনেক আগে থেকে বুকিং করতে হয়। কিন্তু তাতে এলে, বেশ কয়েকদিন মজা করতে করতে ধীরে-সুস্থে আসা যেত, যাকে বলে, সমুদ্রযাত্রা’ তাও হত। তবে সে ক্ষেত্রে অনেকদিন আগে প্ল্যান করে আসতে হত। তবে প্লেনে আসারও চমক আছে। নিঃসীম সমুদ্র পেরিয়ে এসে হঠাৎই যখন চাপ চাপ গাঢ় সবুজ অরণ্যে-ভরা ছোট-বড় দ্বীপের রাজ্যের উপরে প্লেনটা এসে উপস্থিত হয় তখন যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। প্রায় সকলেই নিজের নিজের সিট ছেড়ে একবার এদিকের জানালা আরেকবার ওদিকের জানালা করে, আর স্টুয়ার্ডেসরা তাদের সামলাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সেই যে একবার পাঁচ সেকেন্ড ভোঁ দিল তো দিল, তারপর নিঃশব্দে বে-আইল্যান্ড হোটেলের সামনের খাঁড়ি থেকে বাঁদিকের অন্ধকারে মিশে গেল হর্ষবর্ধন। নিকষকালো অন্ধকার আর নিকষকালো কালাপানি যেন নিঃশব্দে গিলে ফেলল ঝলমলে জাহাজটাকে।
