চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

রাত্তিরের খাওয়ার পর্ব মিটেছে। চিংড়িমাছের মালাইকারি ছিল, ম্যানেজার বারবার অনুরোধ করছিলেন আর এক প্লেট করে গলদা চিংড়ি নেবার জন্যে, কিন্তু খাওয়ার দিকে আর কারও বিশেষ মনোযোগ ছিল না। কথাবার্তাও হচ্ছিল খুব কম। বলতে গেলে একরকম নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে আমরা যে যার নিজের ঘরে ফিরে এসেছি।

বঙ্কুবাবু আদৌ তাঁর ঘর ছেড়ে নীচে নামলেন না। রামুর খবর শুনে তিনি যে উত্তেজিত হবেন, সেটা জানাই ছিল। কিন্তু এতটাই যে বিচলিত হয়ে পড়বেন, তা ভাবিনি। বারবার বলছিলেন, “লক্ষ্মণটা তো গেছেই, এবারে এটাও যাবে!” তখনই শুনলুম যে ভুবনেশ্বরেও নাকি রামুকে নিয়ে ারাত্মক একটা ব্যাপার হয়েছিল। ঘটনাটা এইরকম। সন্ধের সময় রামু তাদের বাড়ির ছাতে পায়চারি করছিল। ছাতের মাঝ বরাবর একদিকে তাদের ওভারহেড জলের ট্যাঙ্ক। পায়চারি করতে-করতে ট্যাঙ্কটা ছাড়িয়ে এক পা এগোনো মাত্র পিছন থেকে কেউ তার গলা টিপে ধরে। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু না, সেবারেও সে কাউকে দেখতে পায়নি। এ হল গত অগস্ট মাসের ঘটনা।

বললুম, “এই ক-মাসের মধ্যে তো আর-কিছু ঘটেনি, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ঘটেনি, তবে ওই ব্যাপারটা ঘটবার পরেই বঙ্কু সতর্ক হয়ে যায়। ভুবনেশ্বর ছেড়ে ওর বাইরে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদি বা যেত, রামুকে সঙ্গে না নিয়ে যেত না। এই যে কলকাতা হয়ে আগরতলায় এল, এটা আসলে ওর ট্যুরের ব্যাপার। আপনাকে তো বলেইছি, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য মাঝেমধ্যে ওকে এইরকম ট্যুরে বেরোতে হয়। কিন্তু লক্ষ করুন, এবারেও ও রামুকে সঙ্গে না নিয়ে আসেনি। রামুকে আর-সকলের সঙ্গে আগরতলায় পাঠিয়ে ওই যে একটা বাড়তি দিন ওকে কলকাতায় থাকতে হল, ওই দিনটা ওর ঘোর দুশ্চিন্তার মধ্যে কেটেছিল। আমাকে পেয়ে যেন বর্তে গেল। বলল, রামুর একটা প্রোটেকশন দরকার, তুমি আমার সঙ্গে চলো ভাই। একে পুরনো বঙ্কু, তায় দু-হাত জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করছে, না এসে কি পারা যায়?”

বললুম, “তা তো হল, কিন্তু আপনিই বা কতদিন এদের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরবেন? আপনার আরও হাজারটা কাজ পড়ে রয়েছে, খুব বেশি দিন তো আপনি থাকতে পারবেন না!”

“তা তো পারবই না। যা বুঝতে পারছি, রামুর জন্যে একটা পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করা দরকার। দু’চারদিন দেখি, তার মধ্যে যদি একটা ফয়সালা হয়ে যায় তো ভাল, নয়তো ব্যাঙ্গালোর ফিরে গিয়ে আমাদের ব্যুরো থেকে আর-কাউকে পাঠিয়ে দিতে হবে।…..কিন্তু ও-কথা থাক, এখন এই বিজ্ঞাপনটা একবার দেখুন দেখি।”

স্যুটকেস খুলে ভাদুড়িমশাই একটা কাগজ বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। দিল্লির হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার একটা পুরনো পৃষ্ঠা, তার একটা জায়গায় একটা বিজ্ঞাপনের চারপাশে ফেল্ট পেন দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকা। নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। তাতে ইংরেজিতে যা জানানো হয়েছে, তার বাংলা মোটামুটি এই : ‘নিশাকর ঘোষ, ডাকনাম লক্ষ্মণ, বয়স ২২, দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, ছিপছিপে, শ্যামবর্ণ, লম্বা চুল, ডান কাঁধে ছোট্ট জড়ুল, গত ২০ মে দুপুরবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। সেই সময়ে তার পরনে ছিল বাদামি রঙের ট্রাউজার্স ও নীল ডোরাকাটা সাদা শার্ট। কেউ খোঁজ পেলে নিম্নোক্ত ঠিকানায় জানান। খবর নির্ভুল হলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার…’

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ফোটোগ্রাফ। ফোটোগ্রাফটাই প্রথম আমার চোখে পড়েছিল, এবং তৎক্ষণাৎ আমি চমকে উঠেছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “এ তো রামুর ফোটো। শুধু চুলটা একটু অন্যরকম। এর চোখে অবশ্য চশমাও নেই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, ও লক্ষ্মণ। ওরই ভাল নাম নিশাকর। দিবাকর অর্থাৎ রামু ওর যমজ ভাই।”

“যমজ সে তো জানি, তাই বলে এত মিল?”

“অবাক হয়ে যাচ্ছেন তো?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “গোড়ায় গোড়ায় আমিও অবাক হয়ে যেতুম। এক রকম হাইট, গায়ের রংও একরকম, আর মুখচোখের মিল তো দেখতেই পাচ্ছেন। পরের দিকে অবশ্য দুজনের অমিলটাও ক্রমে-ক্রমে ফুটে উঠতে থাকে। চেহারার নয়, চরিত্রের অমিল। রামু একটু নিরীহ গোবেচারা গোছের, লক্ষ্মণটা ডাকাবুকো। রামু সারাক্ষণ পড়াশুনো নিয়ে থাকে, ছাত্র হিসেবে খুবই ভাল, খেলাধুলোর ধার ধারে না। লক্ষ্মণের উৎসাহ খেলাধুলোয়, বিশেষ করে ক্রিকেটে। পড়াশুনোয় ওর তেমন মন নেই। রামু একটু চাপা স্বভাবের, লক্ষ্মণ খোলামেলা। রামুকে তো দেখছেন, সারাটা দিন আপন মনে থাকে, বই পড়ে। এই যে দীপক আর রাজেশ, ওরা তো ওর সমবয়সী, কিন্তু ওদের সঙ্গেও খুব-একটা মেলামেশা করে না। লক্ষ্মণ এলে কিন্তু এখানকার চেহারাই পালটে যেত, গল্পগুজব আর হই-হল্লায় সবাইকে মাতিয়ে রাখত সারাক্ষণ।”

“অর্থাৎ দু-ভাইয়ের চরিত্র একেবারেই আলাদা?”

“একেবারেই আলাদা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চেহারার ব্যাপারেও পার্থক্যটা ইদানীং স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রামু চশমা পরে, লক্ষ্মণের চশমা নেওয়ার দরকার হয়নি। অন্তত আমি যখন বছর পাঁচ-সাত আগে ওকে শেষ দেখেছি, তখনও দরকার হয়নি। তা ছাড়া, রামু তো দেখতেই পাচ্ছেন ছোট করে চুল ছাঁটে, লক্ষ্মণ কিন্তু আজকালকার ছেলেদের কায়দায় বেশ লম্বা করে চুল রাখতে আরম্ভ করেছিল। তাতে একটা সুবিধে হয়ে গিয়েছিল এই যে, কে রামু আর কে লক্ষ্মণ চট করে আমি সেটা চিনতে পারতুম।”

বললুম, “তা তো হল, কিন্তু রামুর উপরে হঠাৎ আবার এইভাবে হামলা শুরু হয়ে গেল কেন?”

“হামলা অনেক কারণেই শুরু হতে পারে, সেটা কোনও প্রশ্ন নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রশ্ন হচ্ছে, হামলাটা করছে কারা? কে না বলে ‘কারা’ বলছি সকালবেলার ঘটনার জন্যে। ওটা কারও একার কাজ হতে পারে না। ওর জন্যে অন্তত দু’জন লোক চাই।”

“এ-কথা কেন বলছেন?”

“কেন বলছি? একটু মাথা খাটালে আর এই প্রশ্নটা আপনি করতেন না। নিজেই ব্যাপারটা বুঝে নিতেন।”

“অন্য ব্যাপারে মাথা খাটানো যাবে, আপাতত আপনি এটা বুঝিয়ে বলুন। রামু গিয়েছিল দোতলার বাথরুমে। সেখানে বাথরুমের ভিতর থেকে কেউ তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এ-কাজ তো একজন লোক করতে পারে, দু’জনের কথা ভাবছেন কেন?”

ভাবছি এইজন্যে যে, এমনিতে রামুর মোটেই উপরের বাথরুমে যাবার কথা নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সে উপরের বাথরুমে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কেন বাধ্য হয়েছিল? না বাগান থেকে ঘুরে এসে সে দেখেছিল যে, তার একতলার ঘরের অ্যাটাচড বাথরুমটা ভেতর থেকে বন্ধ। তা সেটা যে-ই বন্ধ করে থাক, সে জানত যে, একতলার অন্য দুটো বাথরুমও তখন খালি নেই, ফলে উপরের বাথরুমে না-গিয়ে রামুর উপায় থাকবে না। তা হলেই বুঝতে পারছেন যে, এ কাজ কারও একার নয়। রামুকে যাতে দোতলায় যেতে হয়, তার জন্য একজন বন্ধ করে রাখবে একতলার বাথরুমের দরজা, আর দ্বিতীয়জন তখন দোতলার বাথরুমে রামুর জন্য অপেক্ষা করবে।”

বললুম, “তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু দোতলাতেও তো দু-দুটো বাথরুম রয়েছে। রামু ঢুকতে গিয়েছিল আমার বাথরুমটায়। তার বদলে সে তো আপনার বাথরুমেও ঢুকতে পারত।”

“তা পারত বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আপনি বোধহয় লক্ষ করেননি যে, আপনার ঘরের লাগোয়া একটা ছাত রয়েছে বলে আপনার বাথরুমটাও অনেক বেশি খোলামেলা, অন্তত তাতে আমারটার তুলনায় আলো অনেক বেশি। সুতরাং এটা হয়তো ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে, দুটো বাথরুমের মধ্যে আপনারটাই রামু বেশি পছন্দ করবে।”

একটুক্ষণ চুপ রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “কিংবা কে জানে, আমার বাথরুমটায় ঢুকতে গেলেও হয়তো এই একই ব্যাপার হত। অর্থাৎ সেটাতেও হয়ত লোক মোতায়েন ছিল। সেক্ষেত্রে অবশ্য ধরে নিতে হবে যে দুজন নয়, মোট তিনজন এ-ব্যাপারে ইনভলভড। কিন্তু আপাতত ওটাও আমি ভাবছি না।”

“কী ভাবছেন?”

“ভাবছি যে, ধাক্কা যদি মারলই তো এত আস্তে মারল কেন? তা হলে কি ধরে নিতে হবে যে, ধাক্কাটা যে মেরেছে, রামুকে সে একেবারে খতম করে দিতে চায়নি? স্রেফ ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিল?”

“এমনও হতে পারে যে, খতম করতেই চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।”

দু-দিকে মাথা নাড়লেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “একবার নয়, দু-বার নয়, তিন-তিনবার হামলা হল রামুর উপরে। একবার ভুবনেশ্বরে ওদের বাড়ির ছাতে, আর আজ দু-বার। তিন-তিনটে অ্যাটেমট, অথচ একটাও সাকসেসফুল হল না। না মশাই, বিশ্বাস করা শক্ত। ও তো আর পেল্লাদ নয়। মার্ডার অ্যাটেম্‌টই যদি হত, তা হলে তাগটা বারবার ফশকাত না, একটা-না-একটা ঠিকই লেগে যেত। আমার ধারণা, ওকে ভয় দেখানো হচ্ছে।”

“কে ভয় দেখাচ্ছে?”

“সেটা পরে ভাবা যাবে, এখন নীরমহলের কথাটা ভাবুন। আপনি তখন কোথায় ছিলেন?”

বললুম, “হিরোইনের রোলটা কাকে দেওয়া হবে, তাই নিয়ে আমি তখন মিসেস ঘোষের সঙ্গে কথা বলছিলুম।”

“চিৎকার শুনেই আপনারা ছুটে আসেন?

“এক-আধ সেকেন্ড দেরি হয়ে থাকতে পারে। একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলুন তো। তারপরেই সামনের দিকে ছুটে যাই।”

“ছুটে আসবার সময় কাউকে দেখতে পেয়েছিলেন?”

“দীপক আর রাজেশকে দেখতে পেয়েছিলুম। বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে তারা নীচের দিকে কিছু দেখছিল।”

“তাদের কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

“ভেবেছিলুম জিজ্ঞেস করব, কিন্তু সময় পাইনি। হঠাৎই সেখান থেকে সিঁড়ির দিকে ছুটে গিয়ে তারা নীচে নামতে থাকে। কী দেখে তারা ছুটল, সেটা বুঝবার জন্য আমি তখন অতক্ষণ তারা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে গিয়ে নীচের দিকে তাকাই। দেখি, নীচে মাটির উপরে রামু পড়ে আছে। আমিও সঙ্গে-সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসি।”

“মিসেস ঘোষ কী করছিলেন?”

“তিনি আমার পিছন পিছন আসছিলেন।”

“সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় আর কাউকে দেখেছিলেন?”

“পীতাম্বরকে দেখেছিলুম। দেখলুম, সে আমার ঠিক আগে আগে নামছে। তবে তার আগে পর্যন্ত সে কোথায় ছিল জানি না।”

“পীতাম্বর আমার কাছাকাছিই ছিল।” একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চিৎকারটা শুনে ও আর দেরি করেনি, নীচে নামতে থাকে। যা-ই হোক, আপনি যা বললেন, দ্যাট অ্যাবাউট কভারস এভরিওয়ান।”

“আপনি কোথায় ছিলেন?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “ছাতে। তবে নজরটা আকাশের দিকে ছিল না, ওটা সারাক্ষণ মাটির দিকেই রেখেছিলুম।”

“কাকে সন্দেহ হয়? দীপককে?”

“না। অন্তত নীরমহলের ব্যাপারটায় না। সিপাহিজলার ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে নীরমহলের ব্যাপারে যেমন দীপক, তেমন রাজেশকেও আমার সন্দেহের বাইরে রাখছি। আর পীতাম্বর যে সারাক্ষণ আমার কাছাকাছিই ছিল তা তো বললুমই।”

“দীপক আর রাজেশকে আপনি সন্দেহ করছেন না কেন?”

“এইজন্যে করছি না যে, ছাত থেকে আমি ওদের দুজনের উপরেই নজর রেখেছিলুম। না, ওই ইট আর যে-ই ফেলে থাকুক, ওরা ফেলেনি।”

“কিন্তু ইটটা তো ফেলা হয়েছিল। কে ফেলল? ভূতে?”

ভাদুড়িমশাই আবার একগাল হাসলেন। তারপর সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে, সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলে, গলগল করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “ঠিক দুক্কুরবেলা ভূতে মারে ঢেলা। না মশাই, পুরনো অনেক রাজবাড়িতে ভূতের উপদ্রব আছে বলে শুনেছি, কিন্তু নীরমহল তো তেমন পুরনো রাজবাড়ি নয়, ভেঙেচুরে গেছে ঠিকই কিন্তু বয়েস এখনও ষাট হয়নি। এ-সব অর্বাচীন বাড়ি ভূতেরা বিশেষ পছন্দ করে না।”

“তা হলে?”

“তা হলে আর কী, ওখানে যা ঘটেছে, তা মানুষই ঘটিয়েছে। কিন্তু সে-কথা এবং থাক। মিসেস ঘোষের সঙ্গে সময়টা কী রকম কাটল বলুন।”

“ওরে বাবা, উনি তো শুধু স্টোরির আউটলাইন লিখেই খুশি নন, হিরোইনের রোলটাও করতে চাইছেন। বলছেন যে, তাতে যেমন ঘরের টাকা ঘরেই থাকবে, তেমনি শ্যুটিংয়ের ডেট নিয়েও ঝামেলা পোহাতে হবে না।”

“আপনি ডিসকারেজ করেননি তো?”

অবাক হয়ে বললুম, “আপনিও কি পাগল হলেন নাকি? হিরোইন এক ভিলেজ বেল। সাদা বাংলায় গাঁয়ের এক সুন্দরী বালিকা। বয়েস কত? না মেরেকেটে কুড়ি। তা ওই রোলে ওঁকে মানাবে?”

“তা একটু বেমানান হবে ঠিকই।”

“একটু?” আমার চোখ প্রায় কপালে উঠবার জোগাড়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ললুম, “ওয়েল, দ্যাট টেকস দি কেক। আপনিই তো বলছিলেন যে, ওঁর বয়েস এখন পঁয়তাল্লিশ।”

“তা হয়তো বলেছি কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। কেউ কুড়িতেই বুড়িয়ে যায়, কেউ ষাটে সটান থাকে।”

“ও-সব কথা ছাড়ুন, মিসেস ঘোষের এখন মা-মাসির রোলে নামা উচিত, অন্তত এই গল্পের নায়িকার যে বয়েস, তাতে ওঁকে মানাবে না।”

“এই কথা আপনি ওঁকে বলেছেন?”

“তা অবশ্য বলিনি।….মানে ঠিক ওইভাবে বলিনি।”

“ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো?”

“বলছি। গল্পের ঘটনাস্থল নাকি ওয়েস্ট বেঙ্গল। তাই শুনে আমি বললুম, ত্রিপুরার এইসব জায়গাগুলো তা হলে ছবির মধ্যে ঢুকবে কী করে? তাতে উনি বললেন, সিপাহিজলা নীরমহল আর উদয়পুরের ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর মন্দিরকে এ-ছবিতে ঢোকাতেই হবে, তার কারণ এই তিন জায়গায় হিরোইনের ভূমিকায় উনি তিন রকমের পোশাক পরবেন। শুনে আমি বলি, হিরোইনের বয়েস তো মাত্র সতেরো আঠারো। তাতে উনি ‘সোলে’ ছবিতে হেমা মালিনীর রোলের কথা তুলে বললেন যে, বয়েসটা কোনও ফ্যাক্টর নয়, ওটা নাকি মেক-আপে ম্যানেজ হয়ে যাবে।”

ভাদুড়িমশাই হাসছিলেন। বললেন, “বাস বাস, যা বলেছেন ওই যথেষ্ট। সরাসরি ওঁকে ‘মানাবে না’ বলে দেননি তো?”

“না না, তা কেন বলব? বলা কি যায়? কোনও ভদ্রমহিলাকে কেউ মুখের উপরে ওইভাবে কিছু বলতে পারে? না না, ওভাবে কিছু বলিনি।”

“বুদ্ধির কাজ করেছেন। আর তা ছাড়া একটা কথা মনে রাখুন। পাঁটা যার, সে-ই ঠিক করবে যে, পাঁটার মাথার দিকে কোপ মারা হবে, না ন্যাজের দিকে। হিন্দিতেও এই রকমের একটা কথা আছে। যাঁর বাদর, সে-ই নাচাবে। এ-ব্যাপারে আর কারও কথা বলবার কোনও এক্তিয়ার নেই।”

“তার মানে এ ছবিও ফ্লপ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এর আগে চারটে ছবি ফ্লপ হয়েছে। আর-একটা হলে ক্ষতি নেই। মোট কথা, ‘এমন কিছু করবেন না যাতে ছবি তোলার এই তোড়জোড়টাই বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হলে মিসেস ঘোষের তো কোনও ক্ষতি নেই। উনি আর-একটা প্লট ঠিক করে আর-এক জায়গায় ছবি তুলবার বায়না ধরবেন। বঙ্কু হয়তো তাতে রাজি হবে না, কিন্তু আমাদের কাজটা যে পিছিয়ে যাবে, সেটা তো ঠিক।”

“আমাদের কাজটা আপাতত কী?”

“রামুকে কারা ভয় দেখাচ্ছে আর কেনই বা ভয় দেখাচ্ছে, সেটা বোঝা। যদি বুঝতে পারি, তা হলে…।”

ভাদুড়িমশাই কথাটা শেষ করলেন না। বললুম, “তা হলে কী?”

“এখন সেটা বলবার সময় আসেনি। তবে যদ্দুর মনে হয়, ‘আই’ম অন দ্য রাইট ট্র্যাক।”

“আমাকে কী করতে হবে?”

“আপনাকে মাত্র একটাই কাজ করতে হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিসেস ঘোষ যা-ই বলুন প্রতিবাদ করবেন না। জাস্ট প্লে অ্যালং।…নিন, অনেক রাত হয়েছে, এবারে ঘুমিয়ে পড়ুন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *